বঙ্গ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বঙ্গ
Map of Bengal.svg
বঙ্গ ক্ষেত্রের মানচিত্র: পশ্চিমবঙ্গ,ত্রিপুরাবাংলাদেশ
বৃহত্তম শহর কলকাতা
২৩°২০′ উত্তর ৮৮°১৩′ পূর্ব / ২৩.৩৪° উত্তর ৮৮.২২° পূর্ব / 23.34; 88.22

ঢাকা
২৩°২৫′ উত্তর ৯০°১৩′ পূর্ব / ২৩.৪২° উত্তর ৯০.২২° পূর্ব / 23.42; 90.22

প্রধান ভাষা বাংলা
ক্ষেত্রফল ৪৫,১১০ বর্গকিমি 
জনসংখ্যা (২০০১) ২০৯,৪৬৮,৪০৪[১][২]
ঘনত্ত্ব ৯৫১.৩/বর্গকিমি[১][২]
শিশুমৃত্যুর হার ৫৫.৯১%[৩][৪]
ওয়েবসাইটসমূহ wbgov.combangladesh.gov.bd

বঙ্গ, বাঙ্গালাহ, বাংলা, বাংলাদেশ বা বঙ্গদেশ, দক্ষিণ এশিয়ার উত্তরপূর্বে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক এবং ভৌগোলিক অঞ্চল। এই বঙ্গ বর্তমানে একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং ভারতের একটি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ দ্বারা গঠিত। কিন্তু পূর্বে অবিভক্ত বাংলার বেশ কিছু অঞ্চল (ব্রিটিশ রাজের সময় কালে) বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের পার্শ্ববর্তী ভারতীয় রাজ্য বিহার, অসমওড়িশা অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই বাংলার অধিবাসীরা বাঙালি জাতি হিসেবে অভিহিত হয়ে থাকেন এবং বাংলা ভাষা এই অঞ্চলের প্রধান ভাষা।

বাংলার এই অঞ্চলটিতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশী ঘনত্ত্বের জনসংখ্যা বসবাস করেন যা প্রায় জনসংখ্যার ঘনত্ত্ব ৯০০/বর্গকিমি।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এই অঞ্চলটি অধিকাংশ গঙ্গাব্রহ্মপুত্র নদী বদ্বীপ বা গাঙ্গেয় বদ্বীপেঅবস্থিত,যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বদ্বীপ। দক্ষিণ বদ্বীপের অংশটিতে সুন্দরবন অবস্থিত — যা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় গরান অরণ্য এবং যেখানে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের বাস ভুমি। যদিও এই অঞ্চলের জনজীবন মুলত গ্রাম্য হলেও কলকাতা এবং ঢাকা এই দুটি মহানগর এই বাংলা অঞ্চলটিতে অবস্হিত। এই অঞ্চলের জনবাসীরা ভারতীয় সমাজের সমাজ-সাংস্কৃতিক আন্দোলন এবং ভারতের স্বাধীনতার জন্য সংঘটিত স্বাধীনতা আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।

ব্যুৎপত্তি ও জাতিতত্ত্ব[সম্পাদনা]

বাংলা বা বেঙ্গল শব্দগুলির অবিকল আদি হচ্ছে অজ্ঞাত, কিন্তু বিশ্বাস করা হয় যে শব্দটি Bang, একটি দ্রাবিড়ীয়-ভাষী উপজাতি (tribe) থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে। Bang গড়পড়তা ১০০০ খ্রিস্টপুর্বে ক্ষেত্রে অধিষ্ঠিত করেছিলেন।[৫]

অন্য তত্ত্ব বলছে যে শব্দটি ভাঙ্গা (বঙ্গ) থেকে নিষ্পন্ন হয়েছে, যেটি অস্ট্রীয় শব্দ "বঙ্গা" থেকে এসেছিল, অর্থাৎ অংশুমালী। শব্দটি ভাঙ্গা এবং অন্য শব্দ যে বঙ্গ কথাটি অভিহিত করতে জল্পিত (যেমন অঙ্গ) প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থে পাওয়া যায়, যেমনঃ বেদ, জৈন গ্রন্থে, মহাভারত এবং পুরাণে। "ভাঙ্গালা" (বঙ্গাল/বঙ্গল)-এর সবচেয়ে পুরনো উল্লেখ রাষ্ট্রকূট গোবিন্দ ৩-এর নেসারি প্লেট্‌সে উদ্দিষ্ট (৮০৫ খ্রিস্ট-আগে) যেখানে ভাঙ্গালার রাজা ধর্মপালের বৃত্তান্ত লেখা আছে।[৬]

আদ্য-অস্ট্রালয়ডেরা একটি বঙ্গের সবচেয়ে প্রথম অধিবাসী।[৭] দ্রাবিড়ীয় জাতি দক্ষিণ ভারত থেকে বঙ্গে প্রবাস করেছিলেন, যখন তিব্বতী-বার্মিজ জাতি হিমালয় থেকে প্রবাস করেছিলেন,[৭] ও তারপরে ইন্দো-আর্য জাতি অনুকরণ করেছিলেন উত্তরপশ্চিম ভারত থেকে। অধুনাতন বাঙালিরা এই জাতিগুলির বিকৃত। পাশতুনেরা, ইরানিরা, আরবেরা এবং তুর্কীরাদেরও বিকৃত, যাঁরা এইখানে পরের মেডিভাল সময়ে প্রবাস করেন, এবং ইসলাম ধর্মকে অনুকীর্ণ করেন।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

বঙ্গ

প্রায় চারহাজার বছরের পুরনো তাম্রযুগের ধ্বংসাবশেষ বাংলায় পাওয়া গেছে ।[৮][৯] ইন্দো-আর্যদের আসার পর অঙ্গ, বঙ্গ এবং মগধ রাজ্য গঠিত হয় খ্রীষ্টপূর্ব দশম শতকে । এই রাজ্যগুলি বাংলা এবং বাংলার আশেপাশে স্থাপিত হয়েছিল । অঙ্গ বঙ্গ এবং মগধ রাজ্যের বর্ণনা প্রথম পাওয়া যায় অথর্ববেদে প্রায় ১০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে । খ্রীষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতক থেকে বাংলার বেশিরভাগ এলাকাই শক্তিশালী রাজ্য মগধের অংশ ছিল । মগধ ছিল একটি প্রাচীন ইন্দো-আর্য রাজ্য । মগধের কথা রামায়ন এবং মহাভারতে পাওয়া যায় । বুদ্ধের সময়ে এটি ছিল ভারতের চারটি প্রধান রাজ্যের মধ্যে একটি । মগধের ক্ষমতা বাড়ে বিম্বিসারের (রাজত্বকাল ৫৪৪-৪৯১ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) এবং তার ছেলে অজাতশত্রুর (রাজত্বকাল ৪৯১-৪৬০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দ) আমলে । বিহার এবং বাংলার অধিকাংশ জায়গাই মগধের ভিতরে ছিল ।[৭][১০] ৩২৬ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের সেনাবাহিনী মগধের নন্দ সাম্রাজ্যের সীমানার দিকে অগ্রসর হয় । এই সেনাবাহিনী ক্লান্ত ছিল এবং গঙ্গা নদীর কাছাঁকাছি বিশাল ভারতীয় বাহিনীর মুখোমুখি হতে ভয় পেয়ে যায় । এই বাহিনী বিয়াসের কাছে বিদ্রোহ ঘোষণা করে এবং আরও পূর্বদিকে যেতে অস্বীকার করে । আলেকজান্ডার তখন তাঁর সহকারী কইনাস (Coenus) এর সাথে দেখা করার পরে ঠিক করেন ফিরে যাওয়াই ভাল । মৌর্য সাম্রাজ্য মগধেই গড়ে উঠেছিল । মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য । এই সাম্রাজ্য অশোকের রাজত্বকালে দক্ষিণ এশিয়া, পারস্য, আফগানিস্তান অবধি বিস্তার লাভ করেছিল । পরবর্তীকালে শক্তিশালী গুপ্ত সাম্রাজ্য মগধেই গড়ে ওঠে যা ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তরাংশে এবং পারস্য এবং আফগানিস্তানের কিছু অংশে বিস্তার লাভ করেছিল । বাংলার প্রথম স্বাধীন রাজা ছিলেন শশাঙ্ক যিনি ৬০৬ খ্রীষ্টাব্দ থেকে রাজত্ব করেছিলেন ।[১১] প্রথম বৌদ্ধ পাল রাজা প্রথম গোপাল ৭৫০ খ্রীষ্টাব্দে গৌড়ে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন । পাল বংশের সবচেয়ে শক্তিশালী দুই রাজা ছিলেন ধর্মপাল (রাজত্বকাল ৭৭৫-৮১০ খ্রীষ্টাব্দ) এবং দেবপাল (রাজত্বকাল ৮১০-৮৫০ খ্রিষ্টাব্দ) । ব্রিটিশ শাসনের সময়ে দুটি মারাত্মক দুর্ভিক্ষ বা মন্বন্তর বহুমানুষের জীবনহানি ঘটিয়েছিল । প্রথম দুর্ভিক্ষটি ঘটেছিল ১৭৭০ খ্রীষ্টাব্দে এবং দ্বিতীয়টি ঘটেছিল ১৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দে । ১৭৭০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির রাজত্বকালে বাংলার দুর্ভিক্ষটি ছিল ইতিহাসের সব থেকে বড় দুর্ভিক্ষগুলির মধ্যে একটি । বাংলার এক তৃতীয়াংশ মানুষের মৃত্যু ঘটেছিল ১৭৭০ এবং তার পরবর্তী বছরগুলিতে । ১৮৫৭ খ্রীষ্টাব্দের সিপাহি বিদ্রোহ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির শাসনের অবসান ঘটায় এবং বাংলা সরাসরি ভাবে ব্রিটিশ রাজবংশের শাসনাধীনে আসে । বাংলা ছিল খুব ভালো ধান উৎপাদক অঞ্চল এবং এখানে সূক্ষ সুতিবস্ত্র মসলিন তৈরি হত । এছাড়া এই অঞ্চল ছিল পৃথিবীর পাট চাহিদার মুখ্য যোগানকারী । ১৮৫০ সাল থেকেই বাংলায় ভারতের প্রধান শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠতে থাকে । এই শিল্পাঞ্চল গড়ে উঠেছিল মূলত কলকাতার আশেপাশে এবং সদ্য গড়ে ওঠা শহরতলি এলাকায় । কিন্তু বাংলার বেশিরভাগ মানুষ তখনও কৃষির উপরেই বেশি নির্ভরশীল ছিলেন । ভারতের রাজনীতি এবং সংস্কৃতিতে বাংলার মানুষেরা অগ্রণী ভূমিকা গ্রহণ করলেও বিশেষ করে পূর্ব বাংলায় তখনও খুব অনুন্নত জেলা ছিল । ১৮৭৭ খ্রীষ্টাব্দে রানী ভিক্টোরিয়া যখন ভারতের সম্রাজ্ঞী উপাধিতে নিজেকে ভূষিত করলেন তখন ব্রিটিশরা কলকাতাকে ব্রিটিশ রাজের রাজধানী বলে ঘোষণা করে । ১৯৪৭ সালের আগষ্ট মাসে ইংরেজ শাসিত ভারতবর্ষ ভাগ হয়ে গণপ্রজাতন্ত্র ভারত এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান নামে দুটি রাষ্ট্র আত্মপ্রকাশ পায়। তখন বাংলা ভাগ হয়ে পশ্চিম বাংলা ভারতের একটি অংশ এবং পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের একটি অংশে পরিণত হয়।[১০]


আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ "Provisional Population Totals: West Bengal"Census of India, 2001 (ইংরেজি ভাষায়)। অফিস অফ দ রেজিস্ট্রার গেনেরাল & সেন্সাস কমিশনার, ভারত। সংগৃহীত 2006-08-26 
  2. ২.০ ২.১ ওয়ার্ল্ড ব্যাঙ্ক ডিভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটর্স ডেটাবেস, ২০০৬।
  3. "West Bengal - Human development fact sheet" (এচটিএমএল সংরুপে পিডিএফ) (ইংরেজি ভাষায়)। ইউনাইটেড নেশন্স ডিভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম। ২০০১। সংগৃহীত 2007-03-01 
  4. "The World Factbook - Bangladesh" (এচটিএমএল) (ইংরেজি ভাষায়)। এইআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক। 2001। সংগৃহীত 2007-03-01 
  5. জেমস হাইট্‌স্‌ম্যান ও রবার্ট এল. ওয়ার্ডেন, সম্পাদক (১৯৮৯)। "Early History, 1000 B. C.-A. D. 1202"Bangladesh: A country study (ইংরেজি ভাষায়)। লাইব্রেরি অফ কংগ্রেস। 
  6. "Vangala"বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি ভাষায়)। এশিয়াটিক সোসায়টি অফ বাংলাদেশস। সংগৃহীত ২০০৭-০৪-১৩ 
  7. ৭.০ ৭.১ ৭.২ সুলতান, সাবিহা। "Settlement in Bengal (Early Period)"বাংলাপিডিয়া (ইংরেজি ভাষায়)। এশিয়াটিক সোসায়টি অফ বাংলাদেশস। সংগৃহীত ২০০৭-০৩-০৪ 
  8. "4000-year old settlement unearthed in Bangladesh"। Xinhua। 2006-March। 
  9. "History of Bangladesh"। Bangladesh Student Association। আসল থেকে 2006-12-19-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত 2006-10-26 
  10. ১০.০ ১০.১ Chowdhury, AM। "Gangaridai"Banglapedia। Asiatic Society of Bangladesh। সংগৃহীত 2006-09-08 
  11. "Shashank"Banglapedia। Asiatic Society of Bangladesh। সংগৃহীত 2006-10-26 

গ্রন্থসূচী[সম্পাদনা]

  • ব্যাক্সটার, সি (১৯৯৭), Bangladesh, From a Nation to a State, ওয়েস্টভিউ প্রেস, 0813336325, ISBN 185984121X
  • বেনেট, এ & জে হিন্ড্‌ল (১৯৯৬), London Review of Books: An Anthology, ভার্সো, 63-70, ISBN 185984121X