বঙ্গোপসাগর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বঙ্গোপসাগর
বঙ্গোপসাগর -
অবস্থান দক্ষিণ এশিয়া
প্রকার উপসাগর
মূল উৎস ভারত মহাসাগর
অববাহিকার দেশসমূহ ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা
সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য ২,০৯০কিমি; c.১,৩০০ মাইল
সর্বোচ্চ প্রস্থ ১,৬১০ কিমি; ১,০০০ মাইল
পৃষ্ঠদেশীয় ক্ষেত্রফল ২,১৭২,০০০ বর্গকিমি
গড় গভীরতা ২,৬০০ মিটার; ৮,৫০০ ফিট
সর্বোচ্চ গভীরতা ৪,৬৯৪ মি; ১৫,৪০০ ফিট

বঙ্গোপসাগর হচ্ছে ভারত মহাসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশে অবস্থিত একটি উপসাগর। এটি অনেকটা ত্রিভূজাকৃতির। এর পশ্চিম দিকের সীমানায় রয়েছে ভারতশ্রীলংকা, উত্তরে রয়েছে বাংলাদেশ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য (এই দুই বাংলায় এর ব্যপ্তি বলেই এর নাম হয়েছে বঙ্গোপসাগর), থাইল্যান্ডের দক্ষিণাংশ এবং আন্দামান নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ রয়েছে পূর্ব দিকে। এর দক্ষিণ সীমানা শ্রিলংকার একেবারে দক্ষিণের দন্দ্রা হেড থেকে একেবারে সুমাত্রার উত্তর সীমানা পর্যন্ত একটি কাল্পনিক রেখাকে মনে করা হয়। বঙ্গোপসাগরের প্রায় ২,১৭২,০০০ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

বাংলাদেশ ও ভারত থেকে অনেক নদী, বঙ্গোপসাগরে এসে পতিত হয়েছে, যার মধ্যে প্রধান নদীগুলো হচ্ছে, উত্তরে, গঙ্গা, মেঘনা এবং ব্রহ্মপুত্র, এবং দক্ষিণ মহানন্দা, গোদাবরী, কৃষ্ণা এবং কাবেরী। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনার অববাহিকাতে উৎপত্তি হয়েছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবনের। গুরুত্বপূর্ণ বন্দর গুলোর মধ্যে বাংলাদেশের প্রধান দুই সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রাম বন্দরখুলনার মংলা, কুদ্দালোর, চেন্নাই, কাকিনাডা, মাচিলিপত্নম, বিশাখাপত্নম, পারাদিপ, কলকাতা এবং ইয়াংগুন বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত।

বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বে রয়েছে পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার

বঙ্গোপসাগরে জেলে নৌকার দৃশ্য

আয়তন[সম্পাদনা]

ব্যুৎপত্তি[সম্পাদনা]

দশম শতাব্দীতে বঙ্গোপসাগর নিয়ে ভারতীয় রাজ্যসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে এর নাম ছিলো "দ্য চোলা লেক"। বাংলা শব্দটি সংস্কৃত ভাষার বঙ্গ শব্দ থেকে এসেছে, যা দ্বারা গঙ্গা মোহনার জল বোঝায়।[১]

নদ-নদী[সম্পাদনা]

উপগ্রহের ছবি: বঙ্গোপসাগরের উপকুলে সুন্দরবন, একাধিক নদী এসে পড়েছে এর বুকে

বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক বৃহৎ নদী পূর্ব থেকে পশ্চিমে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়েছে। তন্মধ্যে উত্তরদিক থেকে গঙ্গা, মেঘনা এবং ব্রহ্মপুত্র; দক্ষিণদিক থেকে মহানদী, গোদাবরী, কৃষ্ণা, ইরাবতী এবং কাবেরী নদী উল্লেখযোগ্য। ৬৪ কিলোমিটারব্যাপী (৪০ মাইল) কৌম নদী সবচেয়ে ছোট নদী হিসেবে সরু খাল দিয়ে এবং ২,৯৪৮ কিলোমিটারব্যাপী (১,৮৩২ মাইল) বিশ্বের ২৮তম দীর্ঘ নদী হিসেবে ব্রহ্মপুত্র নদ বাংলাদেশ, চীন, নেপালভারতের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হয়েছে। সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর ব-দ্বীপকে ঘিরে গঠিত হয়েছে। মায়ানমারের (সাবেক বার্মা) ইরাওয়াদি (সংস্কৃত ইরাবতী) নদীও এ উপসাগরে মিলিত হয়েছে এবং একসময় গভীর ও ঘন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের সৃষ্টি করেছিল।

সমুদ্র বন্দর[সম্পাদনা]

বিশাখাপত্মম, ভারতের ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর।

বাংলাদেশের প্রধান দুটি সমুদ্রবন্দর চট্টগ্রামমংলা বন্দর এই উপসাগরে অবস্থিত। ভারতের প্রধান সমুদ্র বন্দরের মধ্যে কাকিনাদা, চেন্নাই, বিশাখাপত্মম, কলকাতা, তৃণকমলি, পন্ডিচেরী এবং পারাদিপ। মায়ানমারের পূর্ববর্তী রাজধানী ও সর্ববৃহৎ নগরী ইয়াংগুন, বঙ্গোপসাগরের একটি উল্লেখযোগ্য সমুদ্রবন্দর।

দ্বীপপুঞ্জ[সম্পাদনা]

বঙ্গোপসাগরে অনেকগুলো দ্বীপমালা রয়েছে। তন্মধ্যে - আন্দামান, নিকোবর এবং মার্গুই দ্বীপপুঞ্জ অন্যতম। উত্তর-পূর্বে মায়ানমার উপকূলের চিদুবা দ্বীপপুঞ্জ কয়েকটি কর্দমাক্ত আগ্নেয়গিরির জন্য বিখ্যাত যা মাঝে মাঝে সক্রিয় হয়। গ্রেট আন্দামান হচ্ছে আন্দামান দ্বীপমালার প্রধান দ্বীপ; অন্যদিকে রিচি'র দ্বীপটি ক্ষুদ্রতম দ্বীপপুঞ্জের আওতাধীন। ৫৭২টি দ্বীপের মধ্যে ৩৭টিতে অধিবাসী রয়েছে। আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপেই বেশীরভাগ লোক বাস করে যা মোট জনগোষ্ঠীর ৬.৫%।[২]

সমুদ্র সৈকতসমূহ[সম্পাদনা]

কক্সবাজার, বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিস্তৃত সমুদ্র সৈকত। [৩]
সেন্ট মার্টিন্স দ্বীপ, বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ
সমুদ্র সৈকত অবস্থান
কক্সবাজার বাংলাদেশ
কুয়াকাটা বাংলাদেশ
সেন্ট মার্টিন্‌স দ্বীপ বাংলাদেশ
বকখালি ভারত
দিঘা ভারত
চাঁদিপুর ভারত
পুরী ভারত
বিশাখাপত্তনম ভারত
মেরিনা সৈকত ভারত
গাপালি মায়ানমার
অরুগ্রাম শ্রীলংকা

সমুদ্রবিজ্ঞান সম্পর্কীয়[সম্পাদনা]

ভারত মহাসাগরের অন্তর্গত বঙ্গোপসাগর একটি লোনা পানির সমুদ্র।

ঘূর্ণিঝড় ও ঘূর্ণিবাত্যা[সম্পাদনা]

যখন বঙ্গোপসাগরে উৎপত্তি হয়ে ৭৪ মাইল (১১৯ কিলোমিটার) গতিবেগে বাতাস ঘূর্ণায়মান অবস্থায় মৌসুমী ঘূর্ণিঝড়ে রূপান্তরিত হয় তখন তা সাইক্লোন বা ঘূর্ণিবাত্যা নামে আখ্যায়িত হয়। এ সাইক্লোন বা ঘূর্ণিবাত্যাই আটলান্টিক মহাসাগরে হারিকেন নামে পরিচিত।[৪] ১৯৭০ সালে এরকমই এক প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ভোলায় ১ লক্ষ থেকে ৫ লক্ষ অধিবাসী প্রাণ হারান যা স্মরণ করে আজো অনেক লোক শিউরে উঠেন। নীচে প্রাকৃতিক দূর্যোগের দেশ হিসেবে চিহ্নিত বাংলাদেশে বয়ে যাওয়া সাইক্লোনের তালিকা দেয়া হলোঃ-

ঘূর্ণিঝড়ের নাম
ক্রমিক নং সাল বিবরণ কোড নাম
২০১০ প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় লায়লা
২০০৮ অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় নার্গিস
২০০৭ অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় সিডর
২০০৬ অতি তীব্র ঘূর্ণিঝড় মালা
২০০৬, সেপ্টেম্বর টাইফুন জ্যাংসেন
২০০৪, নভেম্বর টাইফুন মুইফা
২০০২, মে উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় ২বি
১৯৯১, এপ্রিল বাংলাদেশ সাইক্লোন
১৯৮৯, নভেম্বর টাইফুন গে
১০ ১৯৮৫, মে উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় ওয়ান ১বি
১১ ১৯৮২, এপ্রিল সাইক্লোন ওয়ান ১বি
১২ ১৯৮২, মে উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় টু ২বি
১৩ ১৯৮২, অক্টোবর উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় থ্রী ৩বি
১৪ ১৯৮১, ডিসেম্বর সাইক্লোন থ্রী ৩বি
১৫ ১৯৮০, অক্টোবর উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় ওয়ান ১বি
১৬ ১৯৮০, ডিসেম্বর অজানা ঘূর্ণিঝড় ফোর ৪বি
১৭ ১৯৮০, ডিসেম্বর উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় ফাইভ ৫বি
১৮ ১৯৭১ সাইক্লোন ওড়িষ্যা
১৯ ১৯৭০, নভেম্বর ভোলা সাইক্লোন

ঐতিহাসিক স্থান[সম্পাদনা]

বিবেকানন্দের ইলম
  • বঙ্গোপসাগরের নীচে শ্রী বৈশাখেসয়ারা স্বাম্পী (Vaisakheswara Swampy) মন্দিরের ধ্বংসাবশেষ আছে।[৫]
  • মহাবলিপুরাম নামক সাতটি বৌদ্ধ ধর্ম মন্দির এখানে আছে। মহাবলিপুরামের তীরবর্তী মন্দিরটি অষ্টম শতাব্দীতে নির্মান করা হয়।
  • বিবেকানন্দর ইল্লম, আর একটি গুরুত্বপূর্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা যা এখানে সংরক্ষিত হয়েছে। ফ্রেডরিক টিউডর নামক রাজা কর্তৃক ১৮৪২ সালে বরফ সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরনের উদ্দেশ্যে এটি নির্মান করা হয়। স্বামী বিবেকানন্দের বিখ্যাত ভাষন এখানে কার্নান প্রাসাদের ধারন করা আছে।
  • কনার্ক, সূর্য মন্দির বা কৃষ্ণ বৌদ্ধ মন্দিরের স্থান। ১২০০ সালের দিকে এই পবিত্র স্থানটি নির্মান করা হয়েছিল এবং তা বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষিত হয়েছে।
  • ধানিসখাদিতে অবস্থিত রামানাথ মন্দির, যেখানে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর মিলিত হয়েছে।[৬]

অর্থনৈতিক গুরুত্ব[সম্পাদনা]

কৌশলগত উপযোগিতা[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের জন্য[সম্পাদনা]

বঙ্গোপসাগরে নৌবাহিনীর যৌথ মহড়া: ভারত, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অষ্ট্রেলিয়াসিঙ্গাপুর

বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্রসীমা হবার কারনে দেশের উন্নয়নে বঙ্গোপসাগরের বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী তাদের বাৎসরিক মহড়া এই সাগরেই করে থাকে[৭] এবং আন্তর্জাতিক মহড়াও এখানেই হয়ে থাকে। বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী নিয়ে গঠিত শেষ যৌথ মহড়াটি হয় ২০০৯ সালের শুরুর দিকে।[৮]

চীনের জন্য[সম্পাদনা]

গুজব আছে যে বঙ্গোপসাগরে মায়ানমারের কোকো দ্বীপে চীনের একটি সামুদ্রিক ঘাটি আছে।[৯]

ভারতের জন্য[সম্পাদনা]

কৌশলগত দিক দিয়ে বঙ্গোপসারগর ভারতের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ন কারন বঙ্গোপসারগরের উপকূল দিয়ে তাদের কিছু দুরবর্তী দ্বীপ আছে (আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ) এবং কলকাতা, চেন্নাই, ভিজাগতুতিকরিন(Tuticorin) এর মত সমুদ্র বন্দর আছে। ১৯৭১ সালের পাক-ভারত যুদ্ধে নৌবাহিনীর বেশির ভাগ আক্রমনই হয়েছিল বঙ্গোপসারগরে।[১০]

পরিবেশগত ক্ষতি[সম্পাদনা]

দূষণ[সম্পাদনা]

প্রতি বছর জানুয়ারী থেকে মার্চ বা তার কাছাকাছি মাসগুলোতে দক্ষিণ এশিয়া এবং ভারত মহাসাগর থেকে আসা বায়ু দূষণ মেঘ বঙ্গোপসাগরের উপর জমা হয়। যার মধ্যে জানবাহনের ধোয়া, রান্নাবান্নায় নির্গত ধোয়া এবং শিল্প-কারখানার বর্জ্য অন্যতম।[১১]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

ব্রিটিশ পেনাল কলোনী[সম্পাদনা]

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের রস দ্বীপ (Ross Island)।

আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের একটি অংশ রস দ্বীপে (Ross Island) ১৮৯৬ সালে কালা পানি অথবা ক্ষুদ্রাতির কারাগার তৈরি হয়। যা ব্রিটিশ পেনাল কলোনী হিসেবে ব্যবহৃত হত এবং সেখানে রাজনৈতিক বন্দীদের আজীবন কারাবাস দেয়া হত।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

আরো পড়ুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

  1. ৪৯৭ ভি সুরিয়া নারায়ণ: বঙ্গোপসাগরের সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা
  2. বঙ্গোপসাগর:HighBeam Encyclopedia
  3. সংক্ষিপ্ত ব্রিটানিকা

উৎস[সম্পাদনা]