সাহাবি
| মুহাম্মাদ |
|---|
| বিষয়ের ধারাবাহিকের একটি অংশ |
সাহাবি (আরবি: الصحابي ) হলো একটি ইসলামি পরিভাষা, যার দ্বারা সেই ব্যক্তিকে বুঝানো হয়, যিনি মুসলিম অবস্থায় নবি মুহাম্মাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ইসলামের ওপর অবিচল থাকেন। এছাড়াও, সাহাবি বলতে ইসলামের প্রথম দিকে নবি মুহাম্মাদের সহযোগী, সমর্থক ও রক্ষকদেরও বোঝানো হয়, যাঁরা তাঁর সঙ্গ লাভ করেন; তাঁর দাওয়াতের প্রতি ঈমান আনেন এবং সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।[১][২]
সাহাবিগণ ইসলাম গ্রহণের জীবনের অধিকাংশ সময় তাঁর সঙ্গী ছিলেন। তাঁরা ইসলাম প্রচারে তাঁকে সহযোগিতা করেন এবং বিভিন্ন সময়ে তাঁকে রক্ষা ও সমর্থন করেন। এছাড়াও নবির মৃত্যুর পর সাহাবিরা খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই সময়কে খিলাফাতে রাশেদার যুগ বলা হয়। পরবর্তীতে তাঁরা বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের শিক্ষা প্রচার, জিহাদ পরিচালনা ও বিভিন্ন নগর ও রাষ্ট্র বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সাহাবিগণ শাম (সিরিয়া), পারস্য, মিশর, খোরাসান, ভারত ও মাওয়ারাউন নাহারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অনেক ইসলামি অভিযানের নেতৃত্ব দেন।
সংজ্ঞা
[সম্পাদনা]‘সাহাবি’ শব্দটি আরবি ভাষার ‘সুহবত’ (الصحبة) শব্দ থেকে উদ্ভূত হয়, যার অর্থ হলো সাহচর্য বা সঙ্গদান। সেই হিসেবে সাহাবি শব্দের অর্থ হলো সঙ্গী বা সাহচর্য লাভকারী। এটি একবচনে সাহাবি (আরবি: الصحابي) এবং বহুবচনে সাহাবা (আরবি: الصحابة) ও 'আসহাব' (আরবি: الاصحاب) ব্যবহৃত হয়। ইসলামি পরিভাষায় সাহাবা শব্দ দ্বারা নবি মুহাম্মাদের সঙ্গী-সাথীদের বোঝায়।
ইবনে হাজার আসকালানি বলেন: সাহাবি হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি নবি মুহাম্মদের প্রতি ঈমান সহকারে তার সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং ইসলামের ওপরই মৃত্যুবরণ করেন।
সাহাবির উল্লেখিত সংজ্ঞাটি ইমাম বুখারি, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলসহ অধিকাংশ পণ্ডিতের নিকট সর্বাধিক সঠিক বলে বিবেচিত হলেও সাহাবির সংজ্ঞার ক্ষেত্রে আরও কিছু অপ্রসিদ্ধ মতামতও আছে। যেমন, কেউ কেউ সাক্ষাতের (আল-লিকা) স্থলে চোখে দেখার (রু’ইয়াত) শর্ত আরোপ করেন। কিন্তু তাতে এমন সব ব্যক্তি বাদ পড়ে যাবেন, যারা মুমিন হওয়া সত্ত্বেও অন্ধত্বের কারণে নবিকে চোখে দেখার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হন। যেমন: আবদুল্লাহ ইবনে উম্মে মাকতুম। অথচ তিনি অতি মর্যাদাবান সাহাবি ছিলেন।
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব বলেন:
সাহাবি হওয়ার জন্য শর্ত হলো, এক বা দু’বছর নবি মুহাম্মদের সাহচর্য অথবা তার সাথে দু’একটি যুদ্ধে অংশগ্রহণ। কিছু সংখ্যক উসুলি ও কালামি আলেমের মতে, সাহাবি হওয়ার জন্য শর্ত হলো, নবির দীর্ঘ সাহচর্য ও তাঁর সুন্নতের অনুসরণের ক্ষেত্রে তার পরিচিতি ও খ্যাতি। কেউ কেউ প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার শর্তও আরোপ করেছেন। একদল আলিমের মতে, যে ব্যক্তি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর কমপক্ষে এক নজর নবিকে দেখেছেন, তিনি সাহাবি। যিনি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বে নবিজে দেখেছেন, তিনিও সাহাবি।
তবে এ হিসেবে যে, মুহাম্মদকে দেখেছেন, তিনি মুহাম্মদকে (সা.) দেখেছেন সে হিসেবে নয়, কিন্তু হাদীস বর্ণনার দিক দিয়ে এমন ব্যক্তি সাহাবী নন, বরং তাবেঈর মর্যাদা লাভ করবেন। প্রশ্ন হতে পারে, যদি কেউ মুহাম্মদের (সা.) মৃত্যুর পর সৎকারের পূর্বে তাকে দেখে থাকেন, যেমনটি ঘটেছিল আরবী কবি আবু জুয়ারিব আল-হুজালির ক্ষেত্রে- তার ব্যাপারে কি সিদ্ধান্ত হবে? আলিমদের মধ্যে এ ব্যাপারে মতবিরোধ আছে। তবে গ্রহণযোগ্য মত হলো, এমন ব্যক্তি সাহাবিদের দলভুক্ত হবেন না।
পরিশেষে বলা যায়, যে ব্যক্তি রাসূল মুহাম্মদকে (সা.) ঈমানি দৃষ্টিতে দেখেছেন,তার উপর ঈমান এনেছেন এবং ঈমানের সহিত মৃত্যুবরণ করেছে তিনি সাহাবি।
সাহাবিদের মর্যাদা
[সম্পাদনা]সাহাবিদের পরস্পরের মধ্যে মর্যাদা হিসেবে স্তরভেদ থাকতে পারে। ইবন আবদিল বার সাহাবিদের মর্যাদা বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেন: মুহাম্মদের (সা.) সুহবত ও তার সুন্নাতের হিফাজত ও ইশায়াতের দুর্লভ মর্যাদা আল্লাহ এইসব মহান ব্যক্তির ভাগ্যে লিখে রেখেছিলেন, এ কারণেই তাঁরা ‘খায়রুল কুরুন’ ও খায়রু উম্মাতিন’-এর মর্যাদার অধিকারী হয়েছেন - হাফেজ আবু বকর ইবন খতীব আল-বাগদাদী বলেন, "উল্লেখিত ভাব ও বিষয়ের হাদীস ও আখবারের সংখ্যা অনেক এবং সবই ‘নাসসুল কুরআনের’ ভাবের সাথে সংগতিপূর্ণ। অর্থাৎ তাতে সাহাবিদের সুমহান মর্যাদা, আদালাত, পবিত্রতা ইত্যাদি ভাব ব্যক্ত হয়েছে। আল্লাহ ও রাসূল কর্তৃক তাদের আদালাতের ঘোষণা দানের পর পৃথিবীর আর কোন মানুষের সনদের মুখোপেক্ষী তারা নন।
আল্লাহ ও রাসূল (সা.) তাদের সম্পর্কে কোন ঘোষণা না দিলেও তাদের হিজরাত, জিহাদ, সাহায্য, আল্লাহর রাহে ধন-সম্পদ ব্যয়, পিতা ও সন্তানদের হত্যা, দ্বীনের ব্যাপারে উপদেশ, ঈমান ও ইয়াকীনের দৃঢ়তা ইত্যাদি কর্মকাণ্ড এ কথা প্রমাণ করতো যে, আদালাত, বিশ্বাস, পবিত্রতা ইত্যাদি ক্ষেত্রে কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে যত ন্যায়পরায়ণ ও পবিত্র ব্যক্তিই জন্মগ্রহণ করুন না কেন, তারা ছিলেন সকলের থেকে উত্তম।"
কোন কোন সাহাবির জীবদ্দশায় মুহাম্মদ তাদেরকে জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন। তবে মুসলিম পণ্ডিতদের অনেকে সাহাবিদের সকলেই জান্নাতী বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ইবনে হাজার "আল–ইসাবা" গ্রন্থে স্পেনের ইমাম ইবন হাযামের মন্তব্য উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন, "সাহাবীদের সকলেই নিশ্চিতভাবে জান্নাতী।"
মুহাম্মদ (সা.) তার সাহাবিদের গালি দেওয়া বা হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে সমালোচনা করতে নিষেধ করেছেন, তিনি বলেছেন, "আল্লাহ, আল্লাহ! আমার পরে তোমরা তাদেরকে সমালোচনার লক্ষ্যে পরিণত করো না। তাদেরকে যারা ভালোবাসে, আমার মুহাব্বতের খাতিরেই তারা ভালোবাসে, আর যারা তাদেরকে হিংসা করে, আমার প্রতি হিংসার কারণেই তারা তা করে।"
কুরআনের একাধিক আয়াত ও অসংখ্য হাদিসে সাহাবিদের মর্যাদা ও ফজিলত বর্ণিত হয়েছে।
"মুহাম্মাদ আল্লাহর রাসূল; তার সহচরগণ, কাফিরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল। আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনায় তুমি তাদেরকে রুকু ও সিজদায় অবনত দেখবে। তাদের মুখমণ্ডলে সিজদার চিহ্ন থাকবে, তাওরাতে তাদের বর্ণনা এরূপই এবং ইন্জিলেও।’’ (সূরা আল–ফাতহ: ২৯)[৩]"
"মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে যারা প্রথম অগ্রগামী এবং যারা নিষ্ঠার সাথে তাদের অনুসরণ করে, আল্লাহ তাদের প্রতি প্রসন্ন এবং তারাও তাতে সন্তুষ্ট এবং তিনি তাদের জন্য প্রস্তুত করেছেন জান্নাত, যার নিম্নদেশে নদী প্রবাহিত, যেখোনে তারা চিরস্থায়ী হবে। এটা মহা কামিয়াবী।" (সূরা আত–তাওবা: ১০০)
"এ সম্পদ অভাবগ্রস্ত মুহাজিরদের জন্য যারা নিজেদের ঘরবাড়ী ও সম্পত্তি হতে উৎখাত হয়েছে। তারা আল্লাহর অনুগ্রহ ও সন্তুষ্টি কামনা করে এবং আল্লাহ ও তার রাসূলের সাহায্য করে। তারাই তো সত্যাশ্রয়ী। মুহাজিরদের আগমনের পূর্বে যারা এই নগরীতে (মদীনা) বসবাস করেছে ও ঈমান এনেছে তারা মুহাজিরদের ভালোবাসে এবং মুহাজিরদের যা দেওয়া হয়েছে তার জন্য তারা অন্তরে আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে না, আর তারা তাদেরকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয় নিজেরা অভাবগ্রস্ত হলেও।" সূরাআল–হাশর, ৮–৯
এ আয়াতে প্রথম মুহাজির ও পরে আনসারদের প্রশংসা করা হয়েছে।
এমনিভাবে সূরা আল ফাত্হ-১৮, সূরা আল ওয়াকিয়া-১০, এবং সূরা আল আনফালের ৬৪ সংখ্যক আয়াতসহ বিভিন্ন আয়াতে কোথাও প্রত্যক্ষ আবার কোথাও পরোক্ষভাবে সাহাবায়ে কিরামের প্রশংসা এসেছে। অনুরূপভাবে মুহাম্মদ নিজেও তার সাহাবীদের শানে বক্তব্য রেখেছেন। তাদের সম্মান, মর্যাদা ও স্থান নির্ধারণ করে ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। যেমন আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ থেকে বর্ণিত। মুহাম্মদ বলেছেন:
"আমার উম্মতের মধ্যে সর্বোত্তম লোক হচ্ছে আমার যুগের লোকেরা, তারপর তার পরের যুগের লোকেরা, তারপর তার পরের যুগের লোকেরা তারপর এমন একদল লোকের আবির্ভাব হবে যাদের কসম হবে তাদের সাক্ষ্যের অগ্রগামী তাদের কাছে সাক্ষী চাওয়ার আগেই তারা সাক্ষ্য দেবে।"
"তোমরা আমার সাহাবিদের গালি দেবেনা, কসম সেই সত্তার যার হাতে আমার জীবন, তোমাদের কেউ যদি উহুদ পাহাড় পরিমাণ সোনাও ব্যয় করো তবুও তাদের যে কোন একজনের ‘মূদ’ বা তার অর্ধেক পরিমাণ যবের সমতুল্য হবে না।"
মুহাম্মদ (সা.) থেকে ইবন আব্বাস বর্ণনা করেছেন:
"তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাবের যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তার ওপর আমল করতে হবে। তা তরক করা সম্পর্কে তোমাদের কারো কোন ওজর-আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না। যদি আল্লাহর কিতাবে কোন সিদ্ধান্ত না পাওয়া যায় তাহলে আমার সুন্নাতে খোঁজ করতে থাক। যদি তাতেও না পাওয়া যায় তাহলে আমার সাহাবীদের কথায় তালাশ করতে হবে। আমার সাহাবীরা আকাশের তারকা সদৃশ। তার কোন একটিকে তোমরা গ্রহণ করলে সঠিক পথ পাবে। আর আমার সাহাবীদের পারস্পরিক ইখতিলাফ বা মতপার্থক্য তোমাদের জন্য রহমত স্বরূপ।"
সাঈদ ইবনুল মুসায়্যিব উমার ইবনুল খাত্তাব থেকে বর্ণনা করেছেন রাসূলুল্লাহ (সা.)বলেছেন:
"আমার পরে আমার সাহাবীদের পারস্পরিক মতপার্থক্য সম্পর্কে আমার ‘রব’- প্রভুকে জিজ্ঞেস করলাম। আল্লাহ আমার কাছে ওহী পাঠালেনঃ হে মুহাম্মাদ, তোমার সাহাবীরা আমার কাছে আকাশের তারকা সদৃশ। তারকার মত তারাও একটি থেকে অন্যটি উজ্জ্বলতর। তাদের বিতর্কিত বিষয়ের কোন একটিকে যে আঁকড়ে থাকবে, আমার কাছে সে হবে হিদায়াতের ওপরে।"
শাফঈ আনাস ইবন মালিকের সনদে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন: আল্লাহ আমাকে ও আমার সাহাবীদেরকে মনোনীত করেছেন। তাদের সাথে আমার বৈবাহিক সম্পর্ক কায়েম করে দিয়েছেন এবং তাদেরকে আমার আনসার বানিয়ে দিয়েছেন। শেষ যামানায় এমন একদল লোকের আবির্ভাব হবে যারা তাদের অবমাননা করবে। সাবধান, তোমরা তাদের ছেলে-মেয়ে বিয়ে করবে না তাদের কাছে ছেলে-মেয়ে বিয়েও দেবে না। সাবধান, তাদের সাথে নামায পড়বে না, তাদের জানাজাও পড়বে না। তাদের ওপর আল্লাহর লা’নত।
মিশকাত শরিফে একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন, আমার উম্মাতের মধ্যে একটি ফিরকাই নিশ্চিত জান্নাতী হবে, জিজ্ঞেস করা হলো তারা কে? বললেন: যারা আমার ও আমার সাহাবিদের আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। অন্য একটি হাদিসে তিনি বলেছেন, "আমার উম্মাতের মধ্যে সাহাবিদের স্থান তেমন, যেমন খাবারের মধ্যে লবণের স্থান।"
সাহাবিদের সংখ্যা
[সম্পাদনা]সাহাবিদের সংখ্যা যে কত তা সঠিকভাবে নির্ণয় করা যায় না। ইমাম আবু যারআ আর-রাযী বলেছেন, মুহাম্মদ (সা.) যখন মারা যান, তখন যারা তাকে দেখেছেন এবং তার কথা শুনেছেন এমন লোকের সংখ্যা নারী-পুরুষ মিলে এক লাখেরও ওপরে। তাদের প্রত্যেকেই মুহাম্মদের (সা.) হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাহলে যে সকল সাহাবী কোন হাদিস বর্ণনা করেননি তাদের সংখ্যা যে কত বিপুল তা সহজেই অনুমেয়। আবু যারআর একথার সমর্থন পাওয়া যায় বুখারী ও মুসলিমে বর্ণিত কা’ব ইবন মালিকের একটি বক্তব্য দ্বারা। তিনি তাবুক অভিযান বর্ণনা প্রসঙ্গে বলেছেন,
"মানুষের সংখ্যা অনেক। কোন দফতর বা দিওয়ান তা গণনা করতে পারবে না।"
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]আর দেখুন
[সম্পাদনা]| ইসলাম বিষয়ক এই নিবন্ধটি অসম্পূর্ণ। আপনি চাইলে এটিকে সম্প্রসারিত করে উইকিপিডিয়াকে সাহায্য করতে পারেন। |