আবু বকর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(আবু বকর ইবন আবী কুহাফা থেকে পুনর্নির্দেশিত)
আবু বকর
রাশিদুন খিলাফতের ১ম খলিফা
খলিফাতুর রাসুল
  • সিদ্দিক الصدِّيق
  • গুহার সঙ্গী
  • কবরের সঙ্গী
আবু বকর সিদ্দিক
শাসনকাল ৮ জুন ৬৩২ – ২২ আগস্ট ৬৩৪
পূর্বসূরি মুহাম্মদ (খলিফা হিসেবে উত্তরসুরি হন)
উত্তরসুরি উমর ইবনুল খাত্তাব
স্ত্রী
কুতাইলা বিনতে আবদুল উজ্জা (তালাকপ্রাপ্ত)
উম্ম রুমান
আসমা বিনতে উমাইস
হাবিবা বিনতে খারিজা
সন্তান
 ;পুত্র
কন্যা
পূর্ণ নাম
আবদুল্লাহ বিন আবি কুহাফা
(عبد الله بن أبي قحاف (أبو بكر
("আবু বকর" নামে পরিচিত)
পিতা উসমান আবু কুহাফা
মাতা সালমা উম্মুল খাইর
ভাই
  • মুতাক
  • উতাইক
  • কুহাফা ইবনে উসমান
বোন
  • ফাদরা
  • কারিবা
  • উম্মে আমির
বংশধর সিদ্দিকি
জন্ম অক্টোবর ৫৭৩
মক্কা, আরব উপদ্বীপ
মৃত্যু ২২ আগস্ট ৬৩৪(৬৩৪-০৮-২২) (৬১ বছর)
মদিনা, রাশিদুন খিলাফত
সমাধি মসজিদে নববী, মদিনা

আবু বকর (আরবি: أبو بكر‎) (৫৭৩ খ্রিষ্টাব্দ – ২৩ আগস্ট ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দ) ছিলেন মুহাম্মদ (সা) এর একজন প্রধান সাহাবি, ইসলামের প্রথম খলিফা এবং প্রথম মুসলিমদের মধ্যে অন্যতম। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে প্রথম ইসলাম গ্রহণের সম্মান তাকে দেয়া হয়। এছাড়া তিনি রাসুল মুহাম্মদ (সা) এর শ্বশুর ছিলেন। রাসুল মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর পর তিনি খলিফা হন এবং মুসলিমদের নেতৃত্ব দেন। মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি অতুলনীয় বিশ্বাসের জন্য তাকে “সিদ্দিক” বা বিশ্বস্ত উপাধি প্রদান করা হয়েছে।[১] তাই তাকে আবু বকর সিদ্দিক নামেও সম্বোধন করা হয়।

তরুণ বয়সে আবু বকর একজন বণিক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন। তিনি আরব ও প্রতিবেশি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য অঞ্চলে ভ্রমণ করেছেন। এর মাধ্যমে তিনি সম্পদশালী হয়ে উঠেন এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তিনি তার গোত্রের একজন নেতা হয়ে উঠেছিলেন।[২] ইয়েমেন থেকে বাণিজ্য শেষে ফেরার পর তিনি মুহাম্মদ (সা) এর ইসলাম প্রচারের সংবাদ পান। এরপর তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণ অন্য অনেকের ইসলাম গ্রহণের উৎসাহ যুগিয়েছে।[৩] আবু বকরের মেয়ে আয়িশার সাথে মুহাম্মদ (সা) এর বিয়ের ফলে তাদের দুজনের সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ঠ হয়।[১]

আবু বকর একজন একনিষ্ঠ উপদেষ্টা হিসেবে মুহাম্মদ (সা) এর সহযোগিতা করেছেন। তার জীবদ্দশায় আবু বকর বেশ কয়েকটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। তাবুকের যুদ্ধে তিনি তার সমস্ত সম্পদ দান করে দেন।[৪] হুদায়বিয়ার সন্ধিতে আবু বকর অংশ নিয়েছিলেন এবং তিনি ছিলেন এই চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষী।[৪]

আবু বকরের খিলাফত দুই বছরের কিছু বেশি সময় স্থায়ী হয়েছিল। এরপর তিনি অসুস্থ হয়ে মারা যান। তার খিলাফতকাল দীর্ঘ না হলেও তিনি একজন সফল শাসক ছিলেন। মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর পর নবী দাবি করা ব্যক্তিদের তিনি রিদ্দার যুদ্ধে সফলভাবে দমন করেছেন এবং তৎকালীন দুটি পরাশক্তি পারস্য ও বাইজেন্টাইনদের উপর সফল অভিযান পরিচালনা করেছেন। অভিযানের ধারাবাহিকতায় কয়েক দশকে মুসলিম খিলাফত ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যের একটিতে পরিণত হয়।

পরিচ্ছেদসমূহ

বংশধারা ও উপাধি[সম্পাদনা]

আবু বকরের শাসনামলে খিলাফতের সীমানা।

আবু বকরের পূর্ণ নাম আবদুল্লাহ ইবনে উসমান ইবনে আমির ইবনে আমর ইবনে কাব ইবনে সাদ ইবনে তায়িম ইবনে মুররাহ ইবনে কাব ইবনে লুয়াই ইবনে গালিব ইবনে ফিহর আল কুরাইশি।[৫]

মুহাম্মদ (সা) এর সাথে আব বকরের বংশলতিকা পেছনের দিকে অষ্টম পর্যায়ে একইরূপ। মুররাহ ইবনে কাব তাদের উভয়ের পূর্বপুরুষ। মুহাম্মদ (সা) এর পূর্বপুরুষের ধারা হল মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব ইবনে হাশিম ইবনে আবদ মানাফ ইবনে কুসাই ইবনে কিলাব ইবনে মুররাহ।[৬]

কুরআনে আবু বকরকে “গুহার দ্বিতীয় ব্যক্তি” হিসেবে সম্বোধন করা হয়েছে। হিজরতের সময় মুহাম্মদ (সা) এর সাথে আত্মরক্ষার্থে সাওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নেয়ার কারণে এভাবে সম্বোধন করা হয়েছে। আবু বকর মিরাজের ঘটনা শোনা মাত্র বিশ্বাস করেছিলেন বলে তাকে মুহাম্মদ (সা) সিদ্দিক উপাধিতে ভূষিত করেছেন।

ইমাম জাফর আল-সাদিক ছিলেন মায়ের দিক থেকে আবু বকরের বংশধর। পিতার দিক থেকে তিনি আলি ইবনে আবি তালিবের বংশধর ছিলেন।

মুহাম্মদ (সা) এর অসংখ্য হাদিস আবু বকরের মেয়ে ও মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রী আয়িশার মাধ্যমে বর্ণিত হয়েছে। নারীদের মধ্যে তিনি সবচেয়ে অধিক হাদিস বর্ণনাকারী। আবু বকরের মৃত্যুর পর তার সন্তান মুহাম্মদ ইবনে আবি বকরকে আলি ইবনে আবি তালিব লালনপালন করেছেন। উমাইয়াদের হাতে মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর নিহত হওয়ার পর আয়িশা তার ভাইপো কাসিম ইবনে মুহাম্মদকে শিক্ষা দেন ও লালনপালন করেন। এছাড়া আয়িশা তার আরেক ভাইপো উরওয়াহ ইবনে জুবায়েরকে শিক্ষাপ্রদান করেছেন যিনি তার সন্তান হিশাম ইবনে উরওয়াহকে শিক্ষা দেন। হিশাম ইবনে উরওয়াহ ছিলেন ইমাম মালিক ইবনে আনাসের প্রধান শিক্ষক।

কাসিমের মা ছিলেন আলির পরিবারের সদস্য। তার কন্যা ফারওয়াহ বিনতে কাসিমের সাথে মুহাম্মদ আল বাকিরের বিয়ে হয়। তাদের সন্তান ছিলেন ইমাম জাফর আল-সাদিক। এদিক থেকে কাসিম প্রথম খলিফা আবু বকরের নাতি এবং জাফর আল সাদিকের দাদা।

আবু বকরের আরেকজন নাতি আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের মুহাম্মদ (সা) এর নাতি হুসাইন ইবনে আলির খুব ঘনিষ্ঠ ছিলেন। হুসাইন নিহত হওয়ার পর তিনি উমাইয়াদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান।[৭] পরবর্তীতে আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়ের উমাইয়া বাহিনীর হাতে নিহত হন।

প্রথম জীবন[সম্পাদনা]

আবু বকর ৫৭৩ সালের দিকে মক্কার কুরাইশ বংশের বনু তাইম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেছেন।[৬] তার বাবার নাম আবু কুহাফা ও মায়ের নাম সালমা বিনতে সাখার।

অন্যান্য আরব শিশুদের মত আবু বকর তার বাল্যকাল অতিবাহিত করেন। দশ বছর বয়সে তিনি তার বাবার সাথে একটি বাণিজ্য কাফেলায় করে সিরিয়া যান। পরে তিনি বাণিজ্যকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে তিনি সিরিয়া, ইয়েমেন প্রভৃতি স্থানে সফর করেছেন। এসব সফরের ফলে তিনি ধনী ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন হয়ে উঠেন। তার পিতা বেঁচে থাকলেও আবু বকর গোত্রের প্রধান হিসেবে সম্মান পেতে থাকেন।

আবু বকর শিক্ষিত ছিলেন এবং কাব্যের প্রতি তার আগ্রহ ছিল। তার স্মৃতিশক্তি ভালো ছিল এবং আরব গোত্রসমূহের বংশলতিকা নিয়ে পান্ডিত্য ছিল।

ইসলাম গ্রহণ[সম্পাদনা]

আবু বকর প্রথম যুগের ইসলাম গ্রহণকারীদের অন্যতম। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে তিনি প্রথম ইসলামগ্রহণ করেছিলেন। এ সম্পর্কে বলা হয়েছে যে অন্যান্য সবাই ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কিছু মাত্রায় দ্বিধায় ছিল কিন্তু আবু বকর বিনা দ্বিধায় ইসলাম গ্রহণ করেন।

ইসলাম গ্রহণের পর জীবন[সম্পাদনা]

আবু বকরের স্ত্রী কুতাইলা বিনতে আবদুল উজ্জা ইসলাম গ্রহণ করেননি। আবু বকর তাকে তালাক দিয়েছিলেন। তার অন্য স্ত্রী উম্ম রুমান ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ছেলে আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর ছাড়া অন্য সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। ফলে আবু বকরের সাথে তার বিচ্ছেদ ঘটে। আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর পরবর্তীতে মুসলিম হয়েছিলেন।

আবু বকরের ইসলাম গ্রহণ অনেককে ইসলাম গ্রহণে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি তার ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের ইসলাম গ্রহণে উৎসাহ যোগান।[৮][৯] তার দ্বারা উৎসাহিত হয়ে অনেকে গ্রহণ করেছিলেন।

আবু বকরের অনুপ্রেরণায় ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে রয়েছেন:[৩]

আবু বকরের ইসলাম গ্রহণ সুদূরপ্রসারী ফলাফল এনেছিল। মক্কায় এসময় দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল। দাসদের মধ্যে অনেকে ইসলাম গ্রহণ করে। সাধারণ মুক্ত ব্যক্তিরা ইসলাম গ্রহণের পর বিরোধীতার সম্মুখীন হতে থাকে তবে তারা তাদের নিজ গোত্রের নিরাপত্তা ভোগ করত। কিন্তু দাসদের কোনো নিরাপত্তা ছিল না এবং তারা নির্যাতনের সম্মুখীন হয়। আবু বকর দাসদের প্রতি সদয় হয়ে অনেককে কিনে নিয়ে মুক্ত করে দেন। আবু বকরের মুক্ত করা দাসরা অধিকাংশ নারী, বৃদ্ধ বা দুর্বল ব্যক্তি ছিল[১০]

তার মুক্ত করা দাসদের মধ্যে রয়েছেন:

কুরাইশদের নির্যাতন, ৬১৩[সম্পাদনা]

ইসলাম প্রচারের প্রথম তিন বছর মুসলিমরা তাদের বিশ্বাস প্রকাশ্যে প্রচার শুরু করেনি। এরপর আল্লাহর তরফ থেকে মুহাম্মদ (সা) এর উপর প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের নির্দেশ আসলে তিনি তাতে অগ্রসর হন। এরপর মুসলিমদের উপর বিভিন্নভাবে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। আবু বকরও নিগ্রহের স্বীকার হয়েছিলেন।

মক্কায় শেষ বছরসমূহ[সম্পাদনা]

৬১৭ খ্রিষ্টাব্দে কুরাইশদের পক্ষ থেকে বনু হাশিম গোত্রকে একঘরে করে রাখা হয়। ফলে তারা মক্কার সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এর পূর্বে কিছু মুসলিম আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন।

৬২০ খ্রিষ্টাব্দে মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রী খাদিজা ও চাচা আবু তালিব মারা যান। এরপর সংঘটিত হওয়া মিরাজের ঘটনা আবু বকর বিনা প্রশ্নে বিশ্বাস করেছিলেন যার কারণে তাকে সিদ্দিক উপাধি দেয়া হয়।

মদিনায় হিজরত[সম্পাদনা]

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমরা মদিনায় হিজরত করতে শুরু করে। কয়েকটি দলে এই হিজরত হয়। মুহাম্মদ (সা) ও আবু বকর একই সাথে হিজরত করেন। মুহাম্মদ (সা) তার কাছে গচ্ছিত মক্কাবাসীর সম্পদ ফিরিয়ে দেয়ার জন্য আলি ইবনে আবি তালিবকে দায়িত্ব দিয়ে যান। হামলার আশংকায় তারা মদিনামুখী উত্তরের পথ না ধরে দক্ষিণমুখী ইয়েমেনগামী পথ ধরে অগ্রসর হন এবং পাঁচ মাইল দূরে সাওর পর্বতের গুহায় আশ্রয় নেন[১১]। আবু বকরের ছেলে আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর এসময় তাদের সাথে রাতে থাকতেন এবং ভোরের পূর্বে মক্কায় ফিরে আসতেন যাতে অন্যদের মনে সন্দেহ সৃষ্টি না হয়[১২]। এছাড়াও আবু বকরের এক দাস আমির বিন ফুহাইরাহ পর্বত পর্যন্ত ছাগল চরাতেন যাতে আবদুল্লাহ ইবনে আবু বকরের চলাচলের চিহ্ন মুছে যায়। এছাড়াও তিনি তাদের ছাগলের দুধ পান করাতেন[১৩]। আবু বকরের মেয়ে আসমা বিনতে আবি বকর তাদের খাবার নেয়ার কাজ করতেন।[১৪]

হিজরতের সংবাদ জানতে পেরে তাদের ধরার জন্য মক্কা থেকে বিভিন্ন লোক বিভিন্ন দিকে পাঠানো হয়। অনুসন্ধানকারীরা গুহা পর্যন্ত পৌছে গেলে আবু বকর চিন্তিত হয়ে উঠেন। মুহাম্মদ (সা) তাকে অভয় দিয়ে বলেন,

এরূপ দুজন সম্পর্কে তোমার কী ধারণা যাদের তৃতীয়জন হলেন আল্লাহ।[১৫]

এ বিষয়ে কুরআনে উল্লেখ রয়েছে,

যদি তোমরা তাকে সাহায্য না কর, (তবে স্মরণ কর) আল্লাহ তাকে সাহায্য করেছিলেন যখন অবিশ্বাসীরা তাকে তাড়িয়ে দিয়েছিল। সে ছিল দুজনের একজন। যখন তারা গুহার মধ্যে ছিল, সে তখন তার সঙ্গীকে বলেছিল, "মন খারাপ করো না, আল্লাহ তো আমাদের সাথেই আছেন"। তারপর আল্লাহ তার উপর প্রশান্তি বর্ষণ করলেন। (সূরা তওবা, আয়াত ৪০)

এই আয়াতে দুজনের একজন দ্বারা আবু বকরকে বোঝানো হয়েছে।

গুহায় তিনদিন ও তিনরাত অতিবাহিত করার পর তারা দুজন মদিনার দিকে অগ্রসর হন। তারা মদিনার শহরতলী কুবায় পৌছে সেখানে কিছু সময় অতিবাহিত করেন। এরপর তারা মদিনায় পৌছান।

মদিনার জীবন[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ (সা) মদিনায় একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন। এরপর মসজিদে নববী নির্মাণ করা হয়। আবু বকর এর নির্মাণকাজে অংশ নিয়েছিলেন। মুহাম্মদ (সা) অন্যান্য সাহাবিদের ন্যায় আবু বকরের সাথে খারিজাহ বিন জাইদ আনসারিকে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছিলেন।

খারিজাহ বিন জাইদ মদিনার শহরতলী সুনহে থাকতেন। আবু বকরও সেখানে বসতি স্থাপন করেন। আবু বকরের পরিবার মদিনায় চলে আসার পর তিনি মুহাম্মদ (সা) এর নিকটে একটি বাড়ি কেনেন।[১৬]

মক্কার তুলনায় মদিনার জলবায়ু ছিল আর্দ্র। ফলে মুহাজির মুসলিমদের অনেকে নতুন পরিবেশে অসুস্থ হয়ে পড়ে। আবু বকরও অসুস্থতায় আক্রান্ত হন এবং বেশ কয়েকদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। এসময় খারিজা ও তার পরিবার তার সেবা করে। মক্কায় আবু বকর একজন কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি মদিনায়ও একই ব্যবসা শুরু করেন। মদিনায় দ্রুত তার ব্যবসা সমৃদ্ধি লাভ করে।

মুহাম্মদ (সা) এর অধীনে সামরিক অভিযান[সম্পাদনা]

বদর ও উহুদের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে আবু বকর মুসলিম ও কুরাইশদের মধ্যে সংঘটিত প্রথম যুদ্ধ বদরের যুদ্ধে অংশ নেন। তিনি মুহাম্মদ (সা) এর তাবুর প্রহরার দায়িত্বে ছিলেন। পরের বছর উহুদের যুদ্ধেও তিনি অংশ নিয়েছেন।

ইহুদি গোত্রের সাথে সংঘর্ষ[সম্পাদনা]

পরে আবু বকর ইহুদি বনু নাদির গোত্রের বিরুদ্ধে অভিযানে অংশ নিয়েছেন।

খন্দকের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

৬২৭ সালে তিনি খন্দকের যুদ্ধ এবং পরবর্তী বনু কুরাইজা অভিযানে অংশ নিয়েছেন।[৪] খন্দকের যুদ্ধের সময় মুহাম্মদ (সা) সৈনিকদের বেশ কয়েকটি দলে ভাগ করে একেক অংশ রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তন্মধ্যে একটি আবু বকরের তত্ত্বাবধানে ছিল। শত্রুরা নানাভাবে পরিখা অতিক্রমের চেষ্টা করলেও আবু বকর তার দায়িত্বপ্রাপ্ত অংশে আক্রমণ ঠেকিয়ে দেন। তার নামে সে অংশে একটি মসজিদ নির্মিত হয় যা মসজিদ-ই-সিদ্দিকি বলে পরিচিতি লাভ করে।[১৭]

৬২৮ সালে তিনি হুদায়বিয়ার সন্ধিতে অংশ নিয়েছিলেন। তিনি এই সন্ধির অন্যতম স্বাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন।[৪] তিনি খায়বারের যুদ্ধেও অংশ নিয়েছেন।

মক্কা বিজয়[সম্পাদনা]

৬৩০ সালে আবু বকর মক্কা বিজয়ে অংশ নিয়েছেন। এর পূর্বে তার বাবা উসমান আবু কুহাফা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

হুনায়ন ও তাইফের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

৬৩০ সালে তিনি হুনায়নের যুদ্ধ এবং তাইফ অবরোধে অংশ নেন। হুনায়নের যুদ্ধের সময় মুসলিম সেনাবাহিনী হুনায়ন উপত্যকার মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকা শত্রুদের তীরের সম্মুখীন হয়। অপ্রস্তুত অবস্থায় হামলা হওয়ায় মুসলিমদের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হয়েছিল। অনেকে ছুটোছুটি শুরু করলেও কয়েকজন সাহাবি মুহাম্মদ (সা) কে রক্ষায় আত্মনিয়োগ করেন। আবু বকর তন্মধ্যে অন্যতম।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

তাবুক অভিযান[সম্পাদনা]

৬৩০ সালে তাবুক অভিযানের সিদ্ধান্ত হয়। এতে সহায়তার জন্য মুহাম্মদ (সা) মুসলিমদের কাছে সাহায্যের হাত বাড়াতে বলেন। উসমান ইবনে আফফান এতে প্রায় নয়শ উট এবং একশ ঘোড়া পর্যন্ত দান করেন।[১৮] উমর ইবনুল খাত্তাব তার সম্পদের অর্ধেক দান করেন।[১৯] আবু বকর তার সকল সম্পদ দান করে এক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তার বক্তব্য ছিল, "আমি আল্লাহ ও তার রাসুলকে আমার ও আমার পরিবারের জন্য রেখেছি"। এই ঘটনা আল্লামা ইকবালের একটি কবিতার পটভূমি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।

আমিরুল হজ্জ হিসেবে আবু বকর[সম্পাদনা]

৬৩১ সালে মুসলিমদের একটি দল জাহিলিয়াতের চর্চা মুক্তভাবে হজ্জের উদ্দেশ্যে মক্কা গমন করে। আবু বকর এই দলের নেতৃত্ব দেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনি প্রথম আমিরুল হজ্জ বা হজ্জের নেতা হিসেবে স্বীকৃত।

আবু বকর ও হাজিদের দলটি হজ্জের উদ্দেশে রওয়ানা হবার পর হজ্জ এবং অমুসলিমদের সাথে সম্পর্কের বিষয়ে কুরআনের আয়াত অবতীর্ণ হয়। তা জানানোর জন্য আলিকে প্রেরণ করা হয়। আবু বকর তার কাছে জানতে চান যে তিনি নেতৃত্ব দিতে এসেছেন নাকি নির্দেশ নিয়ে এসেছেন। আলি জানান যে তিনি নির্দেশ নিয়ে এসেছেন।

মক্কায় হজ্জের পর ১০ জিলহজ তারিখে কুরবানির দিন হজ্জের জন্য কংকর নিক্ষেপের স্থান জামারায় আলি নতুন নির্দেশ ঘোষণা করেন। এতে বলা হয়,

  1. এরপর থেকে অমুসলিমরা হজ্জের জন্য কাবায় আসতে পারবে না।
  2. কেউ নগ্নভাবে কাবা তাওয়াফ করতে পারবে না।
  3. মুশরিকদের সাথে সম্পাদিত চুক্তিসমূহ বিলুপ্ত করা হয় এবং এসকল বিষয় নিস্পত্তি করার জন্য চার মাস সময় দেয়া হয়। চুক্তির আওতা বহির্ভূতদের ক্ষেত্রেও চারমাসের সময়ের কথা বলা হয়। তবে যদি মুশরিকরা মুসলিমদের সাথে চুক্তি সম্পাদনে ত্রুটি না করে বা মুসলিমদের বিরুদ্ধে কারো সাহায্য না করে তবে তাদের অঙ্গীরকারনামা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত বলবত রাখা হয়।

সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব[সম্পাদনা]

আবু বকর একটি সামরিক অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন যা আবু বকর সিদ্দিকের অভিযান বলে পরিচিত।[২০] নজদে এই অভিযান সংঘটিত হয়।[২০]

মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যু[সম্পাদনা]

বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার কিছুকাল পর মুহাম্মদ (সা) অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পায়। এমতাবস্থায় তিনি তার মৃত্যুর চারদিন আগ পর্যন্ত নামাজের ইমামতি করেছেন। [২১] এরপর অসুস্থতার মাত্রার কারণে ইমামতি করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। তিনি এসময় আবু বকরকে নামাজের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করেন।[২২]

মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যু সংবাদ প্রচার হওয়ার পর উমর ইবনুল খাত্তাব অশান্ত হয়ে পড়েন এবং তা মানতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন যে যেভাবে মুসা (আ) তূর পাহাড়ে চল্লিশ দিন ছিলেন তেমনি মুহাম্মদ (সা) ফিরে আসবেন। এসময় আবু বকর তার সুনহের বাড়ি থেকে এসে আয়িশার ঘরে প্রবেশ করেন। এখানে মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যু হয়েছিল। তিনি বলেন,

আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবান হোক। আল্লাহ আপনার উপর দু'বার মৃত্যু একত্রিত করবেন না, এ মৃত্যু আপনার ভাগ্যলিপিতে ছিল সেটা এসে গেছে। [২৩]

এরপর তিনি বাইরে এসে ঘোষণা করেন,

তোমাদের মধ্যে যারা মুহাম্মদ (সা) এর পূজা করতে তারা জেনে রাখুক যে মুহাম্মদ (সা) মৃত্যুবরণ করেছেন। আর যারা আল্লাহর ইবাদত করতে, অবশ্যই আল্লাহ সর্বদাই জীবিত থাকবেন কখনো মৃত্যুবরণ করবেন না।

আবু বকর কুরআন থেকে তিলাওয়াত করেন:

'মুহাম্মদ (সা) একজন রাসুল ছাড়া আর কিছু নয়। তার পূর্বে অনেক রাসুল গত হয়েছেন। সুতরাং তিনি যদি মারা যান বা নিহত হন তবে কি তোমরা পিঠ ফিরিয়ে পিছু হটবে? আর যে পিঠ ফিরিয়ে সরে পড়ে সে কখনও আল্লাহর ক্ষতি করতে পারবে না। আর আল্লাহ শীঘ্রই কৃতজ্ঞদেরকে পুরস্কৃত করবেন।" (সুরা আল ইমরান, আয়াত ১৪৪)

আবু বকরের বক্তব্যের পর উমরের অবস্থা শান্ত হয়।

খলিফা নির্বাচন[সম্পাদনা]

খলিফা আবু বকরের শাসনের সর্বো‌চ্চ সীমানা।

মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকার নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। মুহাজিরআনসাররা নিজেদের মধ্য থেকে নেতা নির্বাচনের পক্ষে ছিল। কিছু গোত্র পুরনো প্রথা অনুযায়ী গোত্রভিত্তিক নেতৃত্ব ব্যবস্থায় ফিরে যেতে চায়। আনসাররা সাকিফা নামক স্থানে একত্রিত হয়ে এ বিষয়ে আলোচনা শুরু করে। এরপর আবু বকর, উমর ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ এখানে আসেন। সভার আলোচনায় এক পর্যায়ে উমর ইবনুল খাত্তাব আবু বকরের প্রতি তার আনুগত্য প্রকাশ করেন এবং আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহও তার অনুসরণ করেন। এরপর বাকিরাও আবু বকরকে নেতা হিসেবে মেনে নেয়। সুন্নিরা তাকে "খলিফাতুর রাসুল" বা "আল্লাহর রাসুলের উত্তরাধিকারী" বলে সম্মান করে থাকে। তবে শিয়ারা আবু বকরকে বৈধ খলিফা বলে স্বীকার করে না। শিয়া মতাদর্শ অনুযায়ী আলি ইবনে আবি তালিব প্রথম খলিফা হিসেবে যোগ্য।

শাসনকাল[সম্পাদনা]

হাজিয়া সোফিয়ায় ক্যালিগ্রাফিক শৈলীতে লেখা আবু বকরের নাম, ইস্তানবুল, তুরস্ক

আবু বকরের খিলাফত ২৭ মাস অর্থাৎ দুই বছরের কিছু বেশি সময় স্থায়ী ছিল। এই সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তাকে বেশ কিছু অস্থিতিশীলতার সম্মুখীন হতে হয় এবং তিনি তা সফলভাবে মোকাবেলা করেন। নতুন নবী দাবিকারী বিদ্রোহীদেরকে তিনি রিদ্দার যুদ্ধে দমন করেছেন। তিনি বাইজেন্টাইনসাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করেন যা ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরবর্তীতে উমর ইবনুল খাত্তাব এবং উসমান ইবনে আফফান এই অভিযান অব্যাহত রেখেছিলেন। এসব অভিযানের ফলে মুসলিম সাম্রাজ্য কয়েক দশকের মধ্যে শক্তিশালী হিসেবে আবির্ভূত হয়। খলিফা হওয়ার পর তিনি অন্যান্যদের পরামর্শক্রমে তার কাপড়ের ব্যবসা ছেড়ে দেন এবং রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে ভাতা গ্রহণ করতেন।

রিদ্দার যুদ্ধ[সম্পাদনা]

মানচিত্রে রিদ্দার যুদ্ধের সময় গুরুত্বপূর্ণ লড়াই সংঘটনের স্থান।

আবু বকরের খিলাফত লাভের পর বেশ কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়। ফলে রাষ্ট্রের কাঠামোর উপর আঘাত আসে। বেশ কিছু আরব গোত্র বিদ্রোহ করে এবং কয়েকজন ব্যক্তি নবুওয়ত দাবি করে। তাদের মধ্যে মুসায়লিমা ছিল অন্যতম প্রধান। বিভিন্ন গোত্রের তরফ থেকে বক্তব্য আসে যে তারা শুধু মুহাম্মদ (সা) এর প্রতি অনুগত ছিল এবং তার মৃত্যুর পর মিত্রতা শেষ হয়েছে। প্রাচীন আরবে এই ধরনের প্রথা প্রচলিত ছিল যার আওতায় গোত্রের নেতার মৃত্যুর পর মিত্রতা সমাপ্ত হত।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] এছাড়াও বিদ্রোহ গোত্রগুলো যাকাত দিতে অস্বীকৃতি জানায়। আবু বকর তাদের দাবি অস্বীকার করেন এবং বিদ্রোহ দমনে অগ্রসর হন।

এসকল ঘটনা ফলে রিদ্দার যুদ্ধের সূচনা হয়। মধ্য আরবে মুসায়লিমা ইয়ামামা থেকে ধর্মদ্রোহিতার নেতৃত্ব দেয়। বিদ্রোহের অন্যান্য কেন্দ্রসমূহ দক্ষিণ ও পূর্বে বাহরাইন, ওমান, মাহরা, ইয়েমেনে অবস্থিত ছিল।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] আবু বকর তার পরিকল্পনা প্রণয়ন করে মুসলিম সেনাবাহিনীকে ১১টি দলে গঠন করেন। সবচেয়ে শক্তিশালী সেনাদলের নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের সাথে লড়াইয়ের জন্য তাদের ব্যবহার করা হত। তুলনামূলক কম শক্তিশালীদের সাথে লড়াইয়ে অন্য সেনাদলগুলোকে নিয়োজিত করা হত। আবু বকর প্রথমে পশ্চিম ও মধ্য আরবের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা, এরপর মালিক ইবনে নুয়াইরাকে মোকাবেলা করা এবং চূড়ান্তভাবে সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ মুসায়লিমার মুখোমুখি হওয়ার পরিকল্পনা করেন। বেশ কিছু সফল ও ধারাবাহিক অভিযানের পর শেষপর্যন্ত খালিদ বিন ওয়ালিদ মুসায়লিমাকে ইয়ামামার যুদ্ধে পরাজিত করতে সক্ষম হন।[২৪] শেষপর্যন্ত সকল বিদ্রোহীকে দমন করা হলে আরব পুনরায় খিলাফতের আওতায় ঐক্যবদ্ধ হয়।

৬৩২ সালের জুলাই মাসে আবু বকর মুহাম্মদ (সা) এর নিজ গোত্র বনু হাশিমের সদস্যদের নিয়ে একটি সেনাদল গঠন করেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] আলি ইবনে আবি তালিব, তালহা ইবনে উবাইদিল্লাহজুবায়ের ইবনুল আওয়াম প্রত্যেকে সেনাদলের এক তৃতীয়াংশের নেতৃত্ব লাভ করেন। তারা জু কিসার যুদ্ধে স্বঘোষিত নবী তুলায়হার সেনাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে।[২৫] তুলায়হা ও তার অনুসারীরা রিদ্দার যুদ্ধের সময় মদিনা আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিল। এই যুদ্ধে তুলায়হাকে পরাজিত করা হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

কুরআন সংকলন[সম্পাদনা]

আবু বকর সর্বপ্রথম গ্রন্থাকারে কুরআন সংকলন করেন। ইতিপূর্বে কুরআনের বিভিন্ন অংশ বিচ্ছিন্নভাবে লিপিবদ্ধ ছিল। এছাড়াও হাফেজরা কুরআন মুখস্থ করে রাখতেন। ইয়ামামার যুদ্ধে অনেক হাফেজ শহীদ হলে উমর ইবনুল খাত্তাব গ্রন্থাকারে কুরআন সংকলনের জন্য আবেদন জানান। এই প্রথা মুহাম্মদ (সা) এর সময় ছিল না বলে প্রথমে আবু বকর এতে রাজি ছিলেন না। কিন্তু উমর তাকে রাজি করাতে সক্ষম হন। এজন্য জায়েদ ইবনে সাবিতকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এর সদস্যরা সবাই হাফেজ ছিলেন। তারা কুরআনের সকল অংশ সংগ্রহ করে একক গ্রন্থ হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন এবং হাফেজদের স্মৃতির সাথে সেগুলো মিলিয়ে দেখা হয়।

মৃত্যুর আগে আবু বকর কুরআনের এই কপিটি তার উত্তরসুরি উমর ইবনুল খাত্তাবকে দিয়ে যান। উমরের শাসনকালে এটি তার কাছেই রক্ষিত ছিল। উমর কুরআনটি তার মেয়ে ও মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রী হাফসা বিনতে উমরকে দিয়ে যান। পরবর্তী খলিফা উসমান ইবনে আফফান এই কুরআনের আরো প্রতিলিপি তৈরি করিয়ে তা খিলাফতের বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেছিলেন।

সামরিক সম্প্রসারণ[সম্পাদনা]

রিদ্দার যুদ্ধে বিদ্রোহ দমন করার পর আবু বকর বিজয় অভিযান শুরু করেন। এসময় বাইজেন্টাইনসাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়। এসকল অভিযান সফল হয়েছিল। পরবর্তী খলিফারাও এই অভিযান চালু রাখেন। অভিযানের ধারাবাহিকতায় কয়েক দশকে মুসলিম সাম্রাজ্যে ইতিহাসের সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্যের অন্যতম হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ইরাকের মাধ্যমে অভিযান শুরু করা হয়েছিল। এটি ছিল পারস্য সাম্রাজ্যের সবচেয়ে ধনী প্রদেশ। আবু বকর সবচেয়ে দক্ষ সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদকে সাসানীয় সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেছিলেন।

সাসানীয় সাম্রাজ্য জয়[সম্পাদনা]

খালিদ বিন ওয়ালিদের ইরাক জয়ের সময় অগ্রসরের পথ।

উত্তর-পূর্ব দিকে পারস্য সাম্রাজ্য এবং উত্তর-পশ্চিম দিকে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে আক্রমণ করা হয়েছিল। এসকল অভিযানের তিনটি উদ্দেশ্য ছিল বলে গণ্য করা হয়: ১. আরব এবং এই দুই সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী স্থানে বেশ কিছু আরব যাযাবর গোত্রের বসবাস ছিল যারা এই দুই সাম্রাজ্যের মিত্র হিসেবে কাজ করত। আবু বকরের আশা ছিল যে তারা ইসলাম গ্রহণ করবে এবং তাদের আরব ভাইদের সাথে একতাবদ্ধ হবে। ২. পারস্য ও রোমানদের কর ব্যবস্থা ছিল অন্যায্য প্রকৃতির। তাই এসকল অঞ্চলের বাসিন্দারা মুসলিমদের অধীনে থাকতে পছন্দ করবে বলে বিশ্বাস করা হত। ৩. দুইটি বৃহৎ সাম্রাজ্যের মধ্যবর্তী স্থানে থাকার ফলে আরব নিরাপদ ছিল না। তাই ইরাক ও সিরিয়া আক্রমণ করে সীমান্ত অঞ্চল থেকে প্রতিপক্ষ হটিয়ে দেয়ার জন্য আবু বকর অগ্রসর হন।[২৬] উত্তর পূর্ব আরবের একজন গোত্রপ্রধান মুসান্না ইবনে হারিসা ইরাকের পারস্য শহরগুলোতে আক্রমণ করেন। এসকল অভিযান সফল হয় এবং এ থেকে অনেক যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জিত হয়। মুসান্না ইবনে হারিসা মদিনা গিয়ে খলিফা আবু বকরকে তার সাফল্যের ব্যাপারে জানান। তাকে তার লোকেদের নেতা নিয়োগ দেয়া হয়। এরপর তিনি ইরাকের আরো ভেতরে প্রবেশ করেন। তার হালকা অশ্বারোহী বাহিনীর দ্রুত চলাচলের সুযোগ নিয়ে তিনি মরুভূমির নিকটবর্তী যেকোনো শহরে আক্রমণ করে দ্রুত মরুভূমিতে আত্মগোপনে চলে যেতে পারতেন। সাসানীয় বাহিনীর পক্ষে তার পিছু নেয়া সম্ভব ছিল না। মুসান্নার কার্যক্রম আবু বকরকে সীমানা সম্প্রসারণে প্রভাবিত করে।[২৭]

আবু বকর ইরাকের মাধ্যমে অভিযান শুরু করেন। সাসানীয়রা শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হওয়ায় এসকল অভিযানে পরাজিত হওয়ার আশংকা ছিল। সাফল্যের জন্য আবু বকর দুইটি পদক্ষেপ নেন, প্রথমত, স্বেচ্ছাসেবীদের নিয়ে সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন, দ্বিতীয়ত, তার সেরা সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদকে প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। ইয়ামামার যুদ্ধে মুসায়লিমাকে পরাজিত করার পর খালিদ ইয়ামামায় থাকাবস্থায় তাকে সাসানীয় সাম্রাজ্যে অভিযানের নির্দেশ দেয়া হয়। তাকে আল হিরা অভিযানের দায়িত্ব দেয়া হয়। আবু বকর তাকে অতিরিক্ত সৈন্য দিয়ে সাহায্য প্রেরণ করেন। উত্তরপূর্ব আরবের গোত্রপ্রধান মুসান্না ইবনে হারিসা, মাজহুর বিন আদি, হারমালা ও সুলমাকে নির্দেশ দেয়া হয় যাতে তারা তাদের লোকজনসহ খালিদের অধীনে কাজ করেন। ৬৩৩ সালের মার্চের তৃতীয় সপ্তাহের দিকে (১২ হিজরির মুহররমের প্রথম সপ্তাহ) খালিদ ইয়ামামা থেকে ১০,০০০ সেনা নিয়ে অগ্রসর হন।[২৭] গোত্রপ্রধানরা প্রত্যেকে ২,০০০ সৈনিক নিয়ে খালিদের সাথে যোগ দেন। এভাবে খালিদ তার ১৮,০০০ সেনা নিয়ে পারস্য সাম্রাজ্যে প্রবেশ করেন।

ইরাকে প্রবেশের পর খালিদ পরপর চারটি যুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। এগুলো হল শিকলের যুদ্ধ, নদীর যুদ্ধ, ওয়ালাজার যুদ্ধউলাইসের যুদ্ধ। ৬৩৩ সালের এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে এই যুদ্ধগুলো সংঘটিত হয়। এসময় পারস্য সাম্রাজ্য আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে সমস্যাগ্রস্থ ছিল। ৬৩৩ সালের মে মাসের শেষ সপ্তাহে ইরাকের রাজধানী আল হিরা মুসলিমদের পদানত হয়। কিছু সময় বিরতির পর জুন মাসে খালিদ আনবারের উপর অবরোধ আরোপ করেন। প্রথমে প্রতিরোধ এলেও পরে জুলাই মাসে তারা আত্মসমর্পণ করে।

এরপর খালিদ দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে জুলাই মাসে আইনুল তামিরের যুদ্ধে শহর জয় করেন। ইতিমধ্য প্রায় সমগ্র ইরাক মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে এসে পড়ে। এসময় উত্তব আরব থেকে আরেক মুসলিম সেনাপতি আয়াজ বিন গানাম সাহায্য চান। তার দল বিদ্রোহী কিছু গোত্রের ফাদে পড়ে গিয়েছিল। খালিদ দাউমাতুল জান্দালের দিকে অগ্রসর হন এবং আগস্টের শেষ সপ্তাহে দাউমাতুল জান্দালের যুদ্ধে বিদ্রোহীদের পরাজিত করেন। আরব থেকে ফিরে এসে তিনি বৃহৎ আকারের একটি পারস্য বাহিনীর অগ্রসর হওয়ার খবর পান। তাদের সাথে কিছু আরব মিত্রও ছিল। খালিদ তাদের পরাজিত করার জন্য দক্ষভাবে পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তিনি তার পুরো বাহিনীকে তিনটি দলে বিভক্ত করেন এবং রাতের বেলা তিনটি ভিন্ন দিক থেকে আক্রমণ পরিচালনা করেন। এসময় মুজিয়ার যুদ্ধ, সান্নির যুদ্ধ এবং জুমাইলের যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা হয়। এসকল যুদ্ধে পরাজয়ের ফলে ইরাকে পারস্য সাম্রাজ্যে কর্তৃত্বের অবসান হয়। পারসিয়ান রাজধানী তিসফুন অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে ছিল। রাজধানী আক্রমণের পূর্বে খালিদ দক্ষিণ ও পশ্চিমের অকল পারসিয়ান বাহিনীকে পরাজিত করেন। এরপর তিনি সীমান্তবর্তী ফিরাজ শহরের দিকে অগ্রসর হন এবং ৬৩৩ সালের ডিসেম্বরে সাসানীয়, বাইজেন্টাইন ও খ্রিষ্টান আরবদের সম্মিলিত বাহিনীকে ফিরাজের যুদ্ধে পরাজিত করেন। ইরাক অভিযানের এটি ছিল শেষ যুদ্ধ। তিসফুনের পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ কাদিসিয়া আক্রমণের জন্য অগ্রসর হওয়ার সময় তার কাছে আবু বকরের নির্দেশ এসে পৌছায় যাতে তাকে সিরিয়ান ফ্রন্টে মুসলিম সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নিতে আদেশ দেয়া হয়।[২৮]

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যে অভিযান[সম্পাদনা]

লেভান্টে রাশিদুন খিলাফতের অভিযানের পথ।

সাসানীয় সাম্রাজ্যে সফল অভিযানের ফলে খালিদের উপর আবু বকরের আস্থা বৃদ্ধি পায়। তিনি চারটি বৃহৎ সেনাদল জু কিসায় গহন করেন এবন তাদের রোমান সিরিয়ায় প্রেরণ করেন। প্রত্যেক সেনাদলের আলাদা কমান্ডার ও লক্ষ্যবস্তু ছিল। কমান্ডাররা গোয়েন্দা মারফত জানতে পাড়েন যে আজনাদায়নে একটি বড় আকারের বাইজেন্টাইন সেনাদল অগ্রসর হচ্ছে। তাই সেনাপতিরা অগ্রসর না হয়ে আবু বকরের কাছে অতিরিক্ত সাহায্য চেয়ে পাঠান। এসময় ইরাকে মুসলিমদের অবস্থা সবল হওয়ায় আবু বকর খালিদকে নির্দেশ দেন যাতে তিনি তার ইরাকের বাহিনীর অর্ধেক নিয়ে সিরিয়ার দিকে অগ্রসর হন। খালিদকে সিরিয়ায় মুসলিম সেনাবাহিনীর দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তৎকালীন বাইজেন্টাইন প্রদেশ সিরিয়া বর্তমান সিরিয়া, জর্ডান, ইসরায়েল, ফিলিস্তিনি অঞ্চল, লেবানন ও দক্ষিণ তুরস্ক নিয়ে গঠিত ছিল। ইরাক থেকে সিরিয়ার দিকে যাওয়ার দুইটি পথ ছিল। একটি ছিল দাউমাতুল জান্দালের মধ্য দিয়ে আরেকটি রাকার মধ্য দিয়ে। খালিদ অধিক প্রচলিত দাউমাতুল জান্দালের পথ ত্যাগ করেন। এই পথ ছিল দীর্ঘ এবং এতে সিরিয়া পৌছাতে সপ্তাহ লেগে যেত। তিনি রাকার মেসোপটেমিয়ান পথও এড়িয়ে যান কারণ বাইজেন্টাইন গেরিসন উত্তর সিরিয়া ও উত্তর মেসোপটেমিয়ার অংশ ছিল। তাদের মুখোমুখি হলে গন্তব্যে পৌছানোর সময় বেশি প্রয়োজন হত। এসবের পরিবর্তে খালিদ সিরিয়ান মরুভূমির মধ্য দিয়ে সংক্ষিপ্ত ও অপ্রচলিত পথের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেন। এভাবে খালিদ উত্তর সিরিয়ায় প্রবেশ করেন। তিনি বাইজেন্টাইনদেরকে ডানদিক থেকে আক্রমণ করেন। তার অতর্কিত আক্রমণ বাইজেন্টাইনদের উপর প্রভাব ফেলেছিল।

খালিদ বিন ওয়ালিদের সিরিয়া জয়ের সময় অগ্রসরের পথ।

খালিদ ৬৩৪ সালের জুনে সিরিয়ায় প্রবেশ করেছিলেন এবং দ্রুত সীমান্তবর্তী সাওয়া, আরাক, তাদমুর, সুখনা, কারইয়াতাইন ও হাওয়ারিন দুর্গ দখল করেন। এরপর তিনি দামেস্কের দিকে অগ্রসর হন। এরপর তিনি বুসরা দিকে যান। এই ছিল গাসানীয় আরব রাজ্যে রাজধানী। তারা বাইজেন্টাইনদের মিত্রপক্ষ ছিল। তিনি অন্যান্য মুসলিম সেনাপতিদের নির্দেশ দেন যাতে তারা বাহিনী নিয়ে বুসরায় জড়ো হয়। মারাজ আল রাহাবে খালিদ গাসানীয় সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন। ইতিমধ্যে সিরিয়ায় মুসলিম সেনাবাহিনীর সর্বো‌চ্চ কমান্ডার আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ আরেক সেনাপতি শুরাহবিল ইবনে হাসানাকে বুসরা আক্রমণের আদেশ দেন। শুরাহবিল তার ক্ষুদ্র সেনাদল নিয়ে বুসরা অবরোধ করেন। বাইজেন্টাইন ও তাদের আরব মিত্ররা এই বাহিনীকে কোনো বড় মুসলিম বাহিনীর অগ্রবর্তী দল ভেবে আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা দুর্গ নগর থেকে বেরিয়ে এসে শুরাহবিলের বাহিনীকে আক্রমণ করে। খালিদ সেখানে পৌছে তাদের সাথে যোগ দেন। খালিদ, শুরাহবিল ও আবু উবাইদার সম্মিলিত বাহিনী এরপর বুসরার যুদ্ধে যোগ দেয়। এর ফলে গাসানীয় রাজবংশের সমাপ্তি ঘটে।

এখানে খালিদ খলিফার নির্দেশ মোতাবেক আবু উবাইদার কাছ থেকে মুসলিম সেনাবাহিনীর দায়িত্বগ্রহণ করেন। বড় আকারের একটি বাইজেন্টাইন সেনাদল আজনাদায়নে জমায়েত হওয়া শুরু করে। খালিদের নির্দেশ অনুযায়ী মুসলিম বাহিনী আজনাদায়নে জমায়েত হয়। এখানে সংঘটিত আজনাদায়নের যুদ্ধে বাইজেন্টাইনদের পরাজয়ের ফলে সিরিয়া মুসলিমদের হাতে পতিত হয়। খালিদ বাইজেন্টাইনদের শক্ত ঘাটি দামেস্ক জয়ের সিদ্ধান্ত নেন। খালিদ দামেস্কে পৌছে শহর অবরোধ করেন। বাকি অঞ্চল থেকে শহর বিচ্ছিন্ন করে ফেলার জন্য দক্ষিণে ফিলিস্তিনের পথে, উত্তরে দামেস্ক-এমেসার পথে এবং অন্যান্য কিছু স্থানে সেনা মোতায়েন করেন। শেষপর্যন্ত ৩০ দিনের অবরোধের পর খালিদ দামেস্ক জয় করতে সক্ষম হন। দামেস্কের পতনের সংবাদ পাওয়ার পর হেরাক্লিয়াস এমেসা থেকে এন্টিওকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। বার্ষিক করের বিনিময়ে নাগরিকদের শান্তিতে বসবাসের সুযোগ দেয়া হয়। দূরে চলে যাওয়ার জন্য বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীকে তিন দিনের সুযোগ দেয়া হয়। এই সময়সীমা শেষ হওয়ার পর খালিদের নেতৃত্বে দামেস্কের ১৯০ মাইল উত্তরে বাইজেন্টাইনদের সাথে মারজ আল দিবাজের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। আবু বকর মারা যাওয়ার পর তার উত্তরসুরি হিসেবে উমর ইবনুল খাত্তাব খলিফা হন। তিনি খালিদকে পদচ্যুত করে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহকে সিরিয়ার মুসলিম সেনাবাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

মদিনায় আবু বকর মসজিদ।

৬৩৪ সালের ২৩ আগস্ট অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতার মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় তিনি বিছানায় শায়িতাবস্থায় থাকেন। আবু বকর তার উত্তরসুরি মনোনীত করার জন্য প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন যাতে তার মৃত্যুর পর মুসলিমদের মধ্যে সমস্যা দেখা না দেয়। অন্যান্য সাহাবীদের সাথে পরামর্শ করে তিনি উমর ইবনুল খাত্তাবকে তার উত্তরসুরি হিসেবে নিয়োগ দেন।

৬৩৪ সালের ২৩ আগস্ট আবু বকর মারা যান। আয়িশার ঘরে মুহাম্মদ (সা) এর পাশে তাকে দাফন করা হয়।

পরিবার[সম্পাদনা]

বাবা: উসমান আবু কুহাফা [২৯]
মা: সালমা উম্মুল খাইর [২৯]
ভাই: মুতাক
ভাই: উতাইক [৩০]
ভাই: কুহাফা ইবনে উসমান
বোন: ফাদরা [২৯]
বোন: কারিবা [২৯]
বোন: উম্মে আমির [২৯]
স্ত্রী: কুতাইলা বিনতে আবদুল উজ্জা (তালাকপ্রাপ্ত) [২৯]
মেয়ে: আসমা বিনতে আবি বকর [২৯]
নাতি আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের
নাতি আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান
নাতি আবু আতিক মুহাম্মদ ইবনে আবদুর রহমান
নাতি উরওয়া ইবনুল জুবায়ের
নাতনি হাফসা বিনতে আবদুর রহমান
ছেলে: আবদুল্লাহ ইবনে আবি বকর [২৯]
স্ত্রী: উম্মে রুমান [২৯]
সৎ ছেলে: তুফায়েল ইবনে আবদুল্লাহ (আবদুল্লাহ ইবনে হারিসের ছেলে)
ছেলে: আবদুর রহমান ইবনে আবি বকর [২৯]
মেয়ে: আয়িশা [২৯]
স্ত্রী: আসমা বিনতে উমাইস [২৯]
ছেলে: মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর [২৯]
নাতি কাসিম ইবনে মুহাম্মদ
স্ত্রী: হাবিবা বিনতে খারিজা
মেয়ে: উম্মে কুলসুম বিনতে আবি বকর

অবদান[সম্পাদনা]

আবু বকরের খিলাফতকাল দুই বছরের কিছু বেশি সময় স্থায়ী ছিল। সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য শাসন করলেও এসময়ে তিনি ইসলামত্যাগীদের দমন, সাসানীয় ও বাইজেন্টাইনদের বিরুদ্ধে সফল অভিযানের মত সফলতা অর্জন করেন। আবু বকরকে সাহাবিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ গণ্য করা হয়।

প্রথম খলিফা হিসেবে ইসলামের ইতিহাসে আবু বকরের আলাদা স্থান রয়েছে। তিনি একমাত্র খলিফা যিনি মৃত্যুর সময় সরকারি কোষাগারে তার ভাতার অর্থ পরিমাণ পরিশোধ করেছিলেন।[৩১] বাইতুল মাল নামক সরকারি কোষাগারের তিনি প্রতিষ্ঠাতা।

ইসলামগ্রহণের পূর্বেও আবু বকর মদ পান করতেন না। কুরাইশ বংশে বংশলতিকা বিষয়ে তার অসাধারণ পান্ডিত্য ছিল।

সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

সুন্নিরা আবু বকরকে আশারায়ে মুবাশশারা্র অন্যতম হিসেবে সম্মান করে। মুহাম্মদ (সা) এর সরাসরি উত্তরসুরি হওয়ার কারণে তাকে "খলিফাতুর রাসুল" বলা হয়। আবু বকর আজীবন মুহাম্মদ (সা) এর ঘনিষ্ঠ সাহায্যকারী ছিলেন। অসুস্থতার কারণে মুহাম্মদ (সা) তার জীবনের শেষ দিনগুলোতে আবু বকরকে নামাজে ইমামতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন। রাসুলের মৃত্যুর পর উত্তরসুরি নির্বাচন নিয়ে সৃষ্ঠ মতপার্থক্য সামাল দিতে আবু বকর, উমর ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তিনি উমরের খলিফা হওয়ার পক্ষে মত প্রকাশ করেছিলেন। তবে উমর আবু বকরের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন।

শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

দ্বাদশবাদি শিয়ারা আবু বকরের বিষয়ে ভিন্ন ধারণা পোষণ করে। তাদের মতে আলি ইবনে আবি তালিব খিলাফত লাভের অধিক দাবিদার ছিলেন। তবে জায়েদিরা দ্বাদশবাদিদের অনুরূপ মত পোষণ করে না। আবু বকরের মৃত্যুর পর তার ছেলে মুহাম্মদ ইবনে আবি বকরকে আলি লালনপালন করেছেন।[৩২] উমাইয়াদের হাতে মুহাম্মদ ইবনে আবি বকর মারা যাওয়ার পর মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রী আয়িশা তার ভাইপো কাসিম ইবনে মুহাম্মদকে লালনপালন করেছেন। কাসিম ইবনে মুহাম্মদের মা ছিলেন আলির পরিবারের সদস্য। কাসিমের মেয়ে ফারওয়াহ বিনতে কাসিমের সাথে মুহাম্মদ আল বাকিরের বিয়ে হয় এবং তিনি জাফর আল সাদিকের মা। এদিক থেকে কাসিম ইবনে মুহাম্মদ ছিলেন আবু বকরের নাতি এবং জাফর আল সাদিকের নানা।

অমুসলিম দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

এডওয়ার্ড গিবন আবু বকরের সম্পর্কে লিখেছেন:

The moderation, and the veracity of Abu Bakr confirmed the new religion,[৩৩] and furnished an example for invitation.

উইলিয়াম মুইর বলেন যে:

his conversation agreeable and his demeanor affable and much sought after by the Quraysh and he was popular throughout the city.... The faith of Abu Bakr was the greatest guarantee of Muhammad's sincerity in the beginning of his career, and indeed, in a modified sense, throughout his life.[৩৪] To have such a person as a staunch adherent of his claim, was for Muhammad a most important step.

উইলিয়াম মন্টগোমারি ওয়াট লিখেছেন:

From 622 to 632 he (Abu Bakr) was Mohammed's chief adviser, but had no prominent public functions except that he conducted the pilgrimage to Mecca in 631, and led the public prayers in Medina during Mohammed's last illness.[৩৫]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. ১.০ ১.১ Juan Eduardo Campo, "Encyclopedia of Islam", Infobase Publishing, 2009 [১]
  2. The Middle East Journal by the Middle East Institute, Washington, D.C., published 1991
  3. ৩.০ ৩.১ Shahid Ashraf, "Encyclopaedia of Holy Prophet and Companions", Anmol Publications PVT. LTD., 2004, ISBN 81-261-1940-3 [২]
  4. ৪.০ ৪.১ ৪.২ ৪.৩ Tabqat ibn al-Saad book of Maghazi, page no:62
  5. Tabaqat ibn Sa'd 3/ 169
  6. ৬.০ ৬.১ SIDIQ-I-AKBAR HAZRAT ABU BAKR by PROF. MASUD-UL-HASAN PAGE 1
  7. Najeebabadi, Akbar Shah (2001). The History of Islam V.2. Riyadh: Darussalam. pp. 110. ISBN 9960892883
  8. al-Bidayah wa'an-Nihayah 3/26
  9. Merriam-Webster's Encyclopedia of World Religions by Wendy Doniger ISBN 978-0-87779-044-0
  10. The Mohammedan Dynasties: Chronological and Genealogical Tables with Historical Introductions (1894) by Stanley Lane-Poole, published by Adamant Media Corporation ISBN 978-1-4021-6666-2
  11. আর-রাহীকুল মাখতূম, লেখক সফিউর রহমান মুবারকপুরী, অনুবাদ আব্দুল খালেক রহমানী, মুয়ীনুদ্দীন আহমাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, চতুর্থ সংস্করণ
  12. আর-রাহীকুল মাখতূম, লেখক সফিউর রহমান মুবারকপুরী, অনুবাদ আব্দুল খালেক রহমানী, মুয়ীনুদ্দীন আহমাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, চতুর্থ সংস্করণ
  13. আর-রাহীকুল মাখতূম, লেখক সফিউর রহমান মুবারকপুরী, অনুবাদ আব্দুল খালেক রহমানী, মুয়ীনুদ্দীন আহমাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, চতুর্থ সংস্করণ
  14. Islamic Culture by the Islamic Cultural Board Published 1927 s.n. Original from the University of Michigan, digitized 27 March 2006.
  15. আর-রাহীকুল মাখতূম, লেখক সফিউর রহমান মুবারকপুরী, অনুবাদ আব্দুল খালেক রহমানী, মুয়ীনুদ্দীন আহমাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, চতুর্থ সংস্করণ
  16. Hazrat Abu Bakr, the First Caliph of Islam by Muhammad Habibur Rahman Khan Sherwani, published 1963 Sh. Muhammad Ashraf. Original from the University of Michigan. Digitized 14 November 2006.
  17. SIDIQ-I-AKBAR HAZRAT ABU BAKR by PROF. MASUD-UL-HASAN page 36 Published and Printed by A. SALAM, FEROZSONS Ltd 60 Shahrah-e-Quaid-e-Azam, Lahore
  18. আর-রাহীকুল মাখতূম, লেখক সফিউর রহমান মুবারকপুরী, অনুবাদ আব্দুল খালেক রহমানী, মুয়ীনুদ্দীন আহমাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, চতুর্থ সংস্করণ
  19. আর-রাহীকুল মাখতূম, লেখক সফিউর রহমান মুবারকপুরী, অনুবাদ আব্দুল খালেক রহমানী, মুয়ীনুদ্দীন আহমাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, চতুর্থ সংস্করণ
  20. ২০.০ ২০.১ Atlas of the Prophet's biography: places, nations, landmarks, By Shawqī Abū Khalīl, Pg205
  21. আর-রাহীকুল মাখতূম, লেখক সফিউর রহমান মুবারকপুরী, অনুবাদ আব্দুল খালেক রহমানী, মুয়ীনুদ্দীন আহমাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, চতুর্থ সংস্করণ
  22. আর-রাহীকুল মাখতূম, লেখক সফিউর রহমান মুবারকপুরী, অনুবাদ আব্দুল খালেক রহমানী, মুয়ীনুদ্দীন আহমাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, চতুর্থ সংস্করণ
  23. আর-রাহীকুল মাখতূম, লেখক সফিউর রহমান মুবারকপুরী, অনুবাদ আব্দুল খালেক রহমানী, মুয়ীনুদ্দীন আহমাদ, তাওহীদ পাবলিকেশন্স, চতুর্থ সংস্করণ
  24. Tabari: Vol. 2, p. 518
  25. Hitti, Philip Khuri (১৯৪৬)। History of the ArabsLondon: Macmillan and Co.। পৃ: ১৪১। 
  26. Akbar Shah Najeebabadi, The history of Islam. B0006RTNB4.
  27. ২৭.০ ২৭.১ Tabari: Vol. 2, p. 554.
  28. Akram, chapters 19–26.
  29. ২৯.০০ ২৯.০১ ২৯.০২ ২৯.০৩ ২৯.০৪ ২৯.০৫ ২৯.০৬ ২৯.০৭ ২৯.০৮ ২৯.০৯ ২৯.১০ ২৯.১১ ২৯.১২ "Family Tree Abu bakr"। Quran search online। সংগৃহীত ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১২ 
  30. Tarikh ar-Rusul wa al-Muluk 3/ 425
  31. https://archive.org/stream/TheBiographyOfAbuBakrAsSiddeeq/TheBiographyOfAbuBakrAs-siddeeq#page/n719/mode/2up
  32. Nahj al-Balagha Sermon 71, Letter 27, Letter 34, Letter 35
  33. Decline and Fall of the Roman Empire
  34. Life of Muhammad
  35. Encyclopædia Britannica, Vol. I, page 54, 1973

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

  • Walker, Adam, Abu Bakr al-Siddiq, in Muhammad in History, Thought, and Culture: An Encyclopedia of the Prophet of God (2 vols.), Edited by C. Fitzpatrick and A. Walker, Santa Barbara, ABC-CLIO, 2014.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

আবু বকর
সুন্নি ইসলাম শিরোনাম
নতুন পদবী রাশিদুন খলিফা
৬৩২–৬৩৪
উত্তরসূরী
উমর