চন্দ্র বিভাজন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

চন্দ্র দ্বিখণ্ডন (ইংরেজি: Splitting of the Moon, (আরবি: انشقاق القمر‎‎)) হল ইসলামী ঐতিহাসিক বর্ণনানুসারে, ইসলামের নবী মুহাম্মদ(সা:)কর্তৃক প্রদর্শিত একটি মু’যিজা বা অলৌকিক ক্ষমতা। নবুয়াতের পরবর্তী সময়ে মক্কায় থাকাকালীন নিজ বংশ কুরাইশের পৌত্তলিকদের অলৌকিকতা উপস্থাপনের প্রস্তাবে তিনি আল্লাহর নিকট চন্দ্র দ্বিখন্ডিতকরণের জন্য প্রার্থনা করেন। আল্লাহ এ কবুল করেন। অতঃপর মুহাম্মাদ (সা:) আঙ্গুল দিয়ে ইশারা করলে তৎক্ষণাৎ পূর্ণিমার চাঁদটি দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়।[১] এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে সূরা আল-ক্বামার বা “চন্দ্র” নামে একটি সূরা অবতীর্ণ হয় যার প্রথম দুই আয়াত 54:1-2 উক্ত ঘটনাকে নির্দেশ করে:

اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانشَقَّ الْقَمَرُ وَإِن يَرَوْا آيَةً يُعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُّسْتَمِرٌّ

কেয়ামত আসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে। তারা যদি কোন নিদর্শন দেখে তবে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এটা তো চিরায়ত জাদু।

ঘটনার পরিপ্রেক্ষিত[সম্পাদনা]

মদীনায় হিযরাতের ৫ বৎসর পূর্বে মক্কার কাফির ও মুশরিকদের একদল নেতা একবার আল্লাহ’র রাসুল হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র কাছে আসে। তাদের মধ্যে আবু জেহেল, ওয়ালিদ বিন মুগিরাহ, আস ইবনে ওয়ায়েল, আস ইবনে হিশাম, আসওয়াদ ইবনে আবদে ইয়াগুস, আসওয়াদ ইবনে মুত্তালিব, যাম‘আহ ইবনুল আসওয়াদ, নযর ইবনে হারেস ইত্যাদি ছিল। ঐ দিন রাতের আকাশে পূর্ণ চাঁদ দেখা যাচিছল। তারা বললো, ‘আপনার নবুওতের দাবী যদি সত্য হয়ে থাকে তাহলে এই চাঁদকে দ্বিখণ্ডিত হতে বলুন’। মুহাম্মাদ (সা:) বললেন, ‘এ কাজ করলে কি তোমরা ঈমান আনবে?’ তারা বললো, ‘হ্যা।” অতঃপর রাসূল (সা.) আল্লাহর কাছে এ বিষয়ে প্রার্থনা করলেন। তার প্রার্থনা কবুল হলো। অতঃপর চাঁদ স্পষ্টভাবে দ্বিখণ্ডিত হয়ে গেল এবং দুই খণ্ডের মাঝখানে হেরা পর্বত দৃশ্যমান হলো। দুই খণ্ডের এক খণ্ড আবী কুবাইস পাহাড় বরাবর, অপরটি কাইকা’আন বরাবর দৃশ্যমান হলো। ইবনে কাসীর সহ সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রাথমিককালের ইসলামী ইতিহাস রচয়িতাগণ এ ঘটনাকে নির্ভুল বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।[২][৩][৪] এ সময় মুহাম্মাদ (সা:) বলছিলেন, ‘সাক্ষী থাক ও দেখ’। কাফির ও মুশরিকরা এই অসাধারণ দৃশ্য দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল। কিন্তু তারা ঈমান না এনে বললো, ‘মনে হয়, আপনি আমাদেরকে যাদু করেছেন’। চন্দ্র দ্বিখণ্ডিত করার এ ঘটনাকে বলা হয় ‘শাক্কুল ক্বামার (আরবি: انشقاق القمر‎‎)) যার পরিপ্রেক্ষিতে সূরা কামার (চন্দ্র) অবতীর্ণ হয়। এর প্রথম দুই আয়াত হলো: 54:1-2

اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانشَقَّ الْقَمَرُ وَإِن يَرَوْا آيَةً يُعْرِضُوا وَيَقُولُوا سِحْرٌ مُّسْتَمِرٌّ

এর অর্থ হলো, “কেয়ামত সমাসন্ন, চন্দ্র বিদীর্ণ হয়েছে। তারা যদি কোনো নিদর্শন দেখে তবে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে এটা তো চিরাচরিত জাদু’’।

বিভিন্ন অভিমত[সম্পাদনা]

ইবনে কাসীর সহ সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রাথমিককালের ইসলামী ইতিহাস রচয়িতাগণ এ ঘটনাকে নির্ভুল বলে রায় দিয়েছেন।[২][৩][৪] আধুনিক কালে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে অনেকেই এ ঘটনা নিয়ে বিতর্ক ও সমালোচনা করেছেন এবং এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তি উক্ত আয়াতের সাথে সম্পর্কিত এই ঘটনাটিকে সত্য বলে বিশ্বাস ও ব্যাখ্যাকরেন, অপরদিকে কিছু মুসলিম ও অমুসলিম পণ্ডিত এই আয়াতটিকে বিচার দিবসে ঘটিতব্য ঘটনা হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। বিরূদ্ধবাদীরা উক্ত ঘটনাটিকে দৃষ্টিভ্রম হিসেবে দাবী করেন।

সূরা আল-ক্বামারের বিষয়বস্তু[সম্পাদনা]

নবুয়াত প্রাপ্তির পর আল্লাহ’র রাসুল হযরত মুহাম্মাদ (সা.) আল্লাহ’র একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপনের জন্য যখন মক্কার মানুষদের আহবান করছিলেন, তখন তাকে ক্রমবর্ধমান প্রতিকূলতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল। তাঁর আহবানের বিরূদ্ধে মক্কার কাফেররা যে হঠকারী পন্থা অবলম্বন করে আসছিলো এ সূরায় সে বিষয়ে তাদেরকে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার যে খবর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিচ্ছিলেন তা যে সত্যিই সংঘটিত হতে পারে এবং তার আগমনের সময়ে যে অত্যন্ত নিকটবর্তী — চন্দ্র খণ্ডিত করে দেওয়ার বিস্ময়কর ঘটনা তার সুষ্পষ্ট প্রমাণ। চন্দ্রের মত একটি বিশাল উপগ্রহ তাদের চোখের সামনে বিদীর্ণ হয়ে গিয়েছিলো। তার দুটি অংশ পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি আরেকটি থেকে এত দূরে চলে গিয়েছিলো যে প্রত্যক্ষদর্শীরা একটি খণ্ডকে পাহাড়ের এক পাশে অপর খণ্ডটিকে অপর পাশে দেখতে পেয়েছিলো। তারপর দুটি অংশ মুহূর্তের মধ্যে আবার পরস্পর সংযুক্ত হয়েছিলো। বিশ্ব ব্যবস্থা যে অনাদি, চিরস্থায়ী ও অবিনশ্বর নয়, বরং তার ধ্বংস ও ছিন্নভিন্ন হতে পারে এটা তার অকাট্য প্রামাণ। বড় বড় তারকা ও গ্রহরাজি ফেটে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়তে পারে, একটি আরেকটির ওপর আছড়ে পড়তে পারে এবং কিয়ামতের বিস্তারিত বর্ণনা দিতে গিয়ে কুরআনে তার যে চিত্র অংকন করা হয়েছে তার সব কিছুই যে ঘটতে পারে, শুধু তাই নয় বরং এ ঘটনা এ ইংগিতও দিচ্ছিলো যে, বিশ্ব ব্যবস্থা ধ্বংস ও ছিন্নভিন্ন হওয়ার সূচনা হয়ে গিয়েছে এবং কিয়ামত সংঘটিত হওয়ার সময় অতি নিকটে এসে পড়েছে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ দিকটির প্রতিই মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললেনঃ “তোমরা দেখো এবং সাক্ষী থাকো”। কিন্তু কাফেররা এ ঘটনাকে যাদুর বিস্ময়কর কর্মকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করলো এবং তা না মানতে বদ্ধপরিকর রইল। এ হঠকারিতার জন্য তাদেরকে এ সূরায় তিরস্কার করা হয়েছে। বক্তব্য শুরু করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, এসব লোক যুক্তিতর্কও মানে না, ইতিহাস থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করেনা; স্পষ্ট নিদর্শনাদি চোখে দেখেও বিশ্বাস করে না। এরা কেবল হাশরের দিনের একচ্ছত্র অধিপতির দিকে ছুটে যেতে থাকবে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "মহানবী সাঃ এর চাঁদ দ্বিখন্ডিত করার ঘটনাটি সম্পর্কে জেনে নিন"atn24online। atn24online। ৫ আগস্ট ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৭ জুলাই ২০১৬ 
  2. Ibn Kathir, Tafsir ibn Kathir, Sura Qamar, verses 54:1-2
  3. Sahih Muslim, The Book Giving Description of the Day of Judgement, Paradise and Hell, Book 039, Number 6725
  4. "According to al-Tabari, all the expositors (ahl al-ta'wil) agree on essentially this same account for the occasion for the revelation of these verses." cf. Thomas E. Burman, Religious Polemic and the Intellectual History of the Mozarabs, C.1050-1200, p.150

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

[[বিষয়শ্রেণী:ইসলামের ইতি হাস]]