উসামা ইবনে যায়িদ
নবি মুহাম্মাদের সেনাপতি (সর্বশেষ) উসামা ইবনে যায়িদ أُسَامَة بن زَيْد | |
|---|---|
| ডাকনাম | হিব্বু রাসুলুল্লাহ আবু মুহাম্মাদ |
| জন্ম | ৭ হি.পূর্ব/ আনু. ৬১৫–৬১৮ মক্কা, হেজাজ, আরব |
| মৃত্যু | ৫৪ হিজরি/আনু. ৬৮০ [১] মদিনা, উমাইয়া খিলাফত |
| পদমর্যাদা | নবি মুহাম্মাদের সেনাপতি (৬৩২) |
| যুদ্ধ/সংগ্রাম | |
| সম্পর্ক |
|

উসামা ইবনে যায়িদ ইবনে হারেসা ( আরবি: أسامة بن زيد بن حارثة ) একজন ছিলেন ইসলামের প্রারম্ভিক যুগের একজন মুসলিম এবং নবি মুহাম্মাদের সাহাবি। তিনি যায়েদ ইবনে হারেসার পুত্র ছিলেন। যায়েদ ইবনে হারিসা ছিলেন নবির দত্তকপুত্র। তাঁর মাতা ছিলেন উম্মে আয়মান, যিনি নবি মুহাম্মদের সেবিকা হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং তিনি পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করেন।[২]
নবি মুহাম্মাদ তাকে একটি সামরিক অভিযানের সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ করেন। এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অন্তর্গত বালকা অঞ্চলে আক্রমণ চালানো। তাঁর এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল মু’তার যুদ্ধের প্রতিশোধ নেওয়া। ঐ যুদ্ধে উসামার পিতা যায়েদ ইবনে হারেসা শহিদ হন।[৩] এই সামরিক অভিযানটি ইতিহাসে উসামা ইবনে যায়েদের অভিযান নামে পরিচিত। নবি তাঁর জীবনের শেষ সময়ে এই অভিযানের বাহিনী প্রস্তুত করেন এবং অল্পবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও উসামাকে সেনাপতির দায়িত্ব প্রদান করেন। উসামার নেতৃত্বে পরিচালিত এই অভিযান সফল হয়। তাঁর বাহিনীই ছিল প্রথম মুসলিম সেনাদল, যারা সফলভাবে বাইজেন্টাইন ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশ করে আক্রমণ চালায়। এর ফলে পরবর্তী সময়ে শাম (সিরিয়া) জয়ের পথ সুগম হয় এবং পরবর্তীতে মুসলিমরা শাম ও মিশরে বিজয় অর্জন করে।
পটভূমি ও প্রাথমিক জীবন
[সম্পাদনা]উসামা ইবনে যায়দ ছিলেন বারাকাহর পুত্র, যিনি ইতিহাসে উম্মে আয়মান নামে অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি একজন আবিসিনীয় নারী ছিলেন।[৪] উসামার পিতা ছিলেন যায়েদ ইবনে হারেসা। তাঁর পিতা-মাতার বিবাহ ইসলাম গ্রহণের পর সম্পন্ন হয়েছিল এবং উসামার জন্ম হিজরতের পূর্বে হয়।
উসামার মা উম্মে আইমান প্রথমে নবির পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ও মাতা আমিনার গৃহে একজন দাসী হিসেবে সেবা করতেন। আমিনাহর ইন্তিকালের পর তিনি নবির তত্ত্বাবধানে আসেন।[৫] আবওয়ায় আমিনার মৃত্যু হলে বারাকাহ শিশু মুহাম্মদের লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং তাঁকে নিয়ে মক্কায় তাঁর দাদা আবদুল মুত্তালিবের গৃহে চলে যান।[৬] সেখানেও তিনি শৈশবকাল থেকে প্রাপ্তবয়স্ক[৭] হওয়া পর্যন্ত নবি মুহাম্মাদের সেবায় নিয়োজিত ছিলেন।[৮] নবি মুহাম্মাদ যখন খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদকে বিবাহ করেন, তখন তিনি বারাকাহর মুক্তির ব্যবস্থা করেন এবং তাঁর প্রথম বিবাহ দেন খাজরাজ গোত্রের সাহাবি উবাইদ ইবনে যায়দের সাথে। এই বিবাহ থেকে জন্ম নেন আইমান ইবনে উবাইদ, যার কারণে বারাকাহ “উম্মে আইমান” (আইমানের মা) নামে পরিচিত হন।[৯]
উসামার পিতা যায়েদ ইবনে হারিসা ছিলেন নবির একজন বিশিষ্ট সাহাবী ও দত্তকপুত্র। তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগে ইসলাম গ্রহণকারীদের মধ্যে ব্যক্তি অন্যতম ছিলেন। বর্ণনা অনুযায়ী, ইসলাম গ্রহণে তিনি নবির স্ত্রী খাদিজা ও চাচাতো ভাই আলি ইবনে আবি তালিবের পর তৃতীয় ব্যক্তি ছিলেন। [১০] যায়েদ আরব উপদ্বীপের নাজদের বনু কালব গোত্রের উদরা শাখার সদস্য ছিলেন।[১১][১২] যায়েদের মাতা সুদা বিনতে সালাবা তাঈ গোত্রের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।[১৩][১৪] এভাবে উসামা এমন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন, যাদের সঙ্গে নবি মুহাম্মাদের গভীর ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তাঁর পরিবার কুরাইশদের নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। উসামার সঙ্গে নবি মুহাম্মাদের সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। তিনি নবির সঙ্গে হুনাইনের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।[১৫] ঐতিহাসিক ইবনে কাসির উল্লেখ করেন যে, ইবনে ইসহাকের সূত্রে জাবের ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, হুনাইনের যুদ্ধে শত্রুর আকস্মিক আক্রমণে মুসলিম বাহিনীর মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ করেন। কিন্তু কিছু মুহাজির সাহাবি দৃঢ়ভাবে অবস্থান নিয়ে নবিকে রক্ষা করেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন আবু বকর, উমর ইবনুল খাত্তাব, আলি, আব্বাস, আবু সুফিয়ান ইবনুল হারিস, ফাদল ইবনে আব্বাস, রাবিয়া ইবনুল হারিস, উসামা ইবন যায়েদ ও তাঁর সৎভাই আইমান ইবনে উবায়েদ। সেদিন নবিকে রক্ষা করতে গিয়ে আইমান ইবনে উবাইদ শহিদ হন। [১৬]
উহুদ যুদ্ধে উসামা তাঁর সমবয়সী আরো কয়েকজন কিশোর সাহাবির সাথে নবি মুহাম্মাদের কাছে উপস্থিত হন। তারাও যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। নবি তাদের মধ্যে কয়েক জনকে নির্বাচন করলেন এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কারণে অন্যদের ফিরিয়ে দেন, যাদের মধ্যে উসামা ইবনে যায়েদও ছিলেন।[২]
খন্দকের যুদ্ধেও তিনি আরো কয়েকজন কিশোর সাহাবির সাথে যোদ্ধাদের লাইনে দাঁড়ান। উহুদের মত এবারও তাঁকে যেন বাদ দেওয়া না হয়, তাই তিনি তাঁর পায়ের আাঙ্গুলে ভর দিয়ে উঁচু হয়ে দাঁড়ান। তবে এবার নবি তাকে নির্বাচন করেন এবং তিনি যুদ্ধে সেবক হিসেবে অংশগ্রহণ করেন।[২]
কিছু বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার কারণে প্রথম পর্যায়ের অভিযানসমূহে অংশগ্রহণের সুযোগ পাননি। তিনি ‘হারকা’ অভিযানে সর্বপ্রথম অংশগ্রহণ করেন, যা সাত অথবা আট হিজরিতে সংঘটিত হয়। এই অভিযান সম্পর্কে তিনি বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল আমাদের হারকার দিকে পাঠালেন। যুদ্ধে শত্রুরা পরাজিত হয়ে পালাতে শুরু করল। আমি এক আনসারি সাহাবির সাথে পলায়নরত একজনের পিছু ধাওয়া করলাম। যখন সে আমাদের নাগালের মধ্যে এসে গেল, তখন জোরে জোরে ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলতে লাগল। তার এই ঘোষণা শুনে আনসারি সাহাবি হাত গুটিয়ে নিলেন; কিন্তু আমি তাকে বর্শা ছুড়ে হত্যা করলাম। অভিযান থেকে ফেরার পর ঘটনাটি নবির কাছে বর্ণনা করা হলে তিনি আমাকে বলেন, তুমি কেন তাকে হত্যা করতে গেলে? আমি বললাম, সে প্রাণ বাঁচানোর জন্য এমনটি করেছে। তখন তিনি বলেন, তুমি কেন তাঁর হৃদয় বিদীর্ণ করে দেখলে না?[২] উসামা তার পিতা সেনাপতি যায়িদ ইবনে হারেসার সাথে মু'তার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং তখন তার বয়স আঠারো বছরেরও কম। এ যুদ্ধে তাঁর পিতা যায়েদ শহিদ হন।[২]
অভিযান
[সম্পাদনা]তাঁর অভিযানটি ছিল ইসলামি রাষ্ট্রের প্রাথমিক সামরিক অভিযানগুলির একটি। এটি তাঁর নেতৃত্বে ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের জুনে সংঘটিত হয়, যেখানে মুসলিম বাহিনী বাইজেন্টাইন সিরিয়ায় (শাম অঞ্চলে) আক্রমণ চালায়।.[১৭][১৮]
বিদায় হজের পর নবি মুহাম্মাদ উসামা বিন যায়েদের নেতৃত্ব একটি বাহিনী প্রস্তুত করেন, যাদের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বালকা অঞ্চলে অভিযান চালানোর জন্য বলা হয়। এতে তিনি নিজের পরিবারের সদস্যদের ব্যতীত সকল সাহাবিকে উসামার সঙ্গে শামে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেন। তাঁর এই অভিযানের উদ্দেশ্য ছিল মুতার যুদ্ধে নিহত মুসলমানদের হত্যার প্রতিশোধ নেওয়া, যেখানে উসামার পিতা ও নবির দত্তকপুত্র জায়দ ইবনে হারিসা নিহত হন।[১৯] উসামা ইবনে যায়েদের নেতৃত্ব অভিযান শুরু করতে কিছু মানুষ আপত্তি জানায়। কারণ তখন তাঁর বয়স খুব কমই ছিল; তবে নবি মুহাম্মদ এসব উদ্বেগকে উপেক্ষা করেন।[১৮][২০]
এই ঘটনার ব্যাপারে সহিহ বুখারিতে উল্লেখিত হয়েছে:
নবি মুহাম্মাদ উসামাকে সেনাবাহিনীর কমান্ডার নিযুক্ত করেন (যাদের সিরিয়ায় পাঠানো হবে)। তখন মুসলমানদের মধ্যে উসামার ব্যাপারে (নেতিবাচক) কথাবার্তা হচ্ছিল। তখন নবি বলেন, "তোমরা উসামা সম্পর্কে যা বলছ, তা আমি জানি। (জেনে রেখো যে) সে আমার কাছে সর্বাধিক বিশ্বস্ত ব্যক্তি। সহীহ বুখারী, ৫:৫৯:৭৪৪ (ইংরেজি)
ইবনে সা'দ বর্ণনা করেন:
যখন ১১ হিজরির সফর মাসের চার রাত বাকি ছিল, তখন নবি মুহাম্মাদ মানুষের মধ্যে ঘোষণা করলেন যে, রোমের উদ্দেশ্যে অভিযানের জন্য প্রস্তুত হও। পরের দিন তিনি উসামা ইবনে জায়েদকে ডেকে বললেন: যাও, তোমার পিতার মর্মান্তিক মৃত্যুর স্থানে পৌঁছাও। ঘোড়া নিয়ে তাদের ওপর চড়াও হও। আমি তোমাকে এই বাহিনীর নেতৃত্ব প্রধান করছি। সকালে অগ্রসর হয়ে তাদের ওপর আক্রমণ করো এবং তাদেরকে আগুনে পুড়িয়ে দাও। দ্রুত চল যাতে খবর পৌঁছানোর আগেই সেখানে পৌঁছুতে পার। যদি আল্লাহ তোমাকে বিজয় দান করেন, তাহলে তাদের মাঝে বেশি সময় নষ্ট করো না। পরের বুধবার তিনি কিছুটা অসুস্থ ছিলেন। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি নিজ হাতে উসামা ইবনে যায়েদের হাতে পতাকা তুলে দিয়ে বললেন: আল্লাহর নামে, আল্লাহর পথে যুদ্ধে যাও। যারা আল্লাহকে অস্বীকার করে তাদের বিরুদ্ধে লড়ো।" উসামা তার বাহিনী নিয়ে বের হলেন এবং বুরাইদা ইবনুল হুসাইব আল-আস্লামিকে তার অধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ দিলেন। তারা “জারফ” অঞ্চলে ক্যাম্প স্থাপন করলেন। সেই সময় এমন কোনো প্রাথমিক মুহাজির বা আনসার বাদ গেলেন না, যারা সেই অভিযানে অংশগ্রহণ করেননি। তাঁদের মধ্যে ছিলেন: আবু বকর, ইমর ইবনুল খাত্তাব, আবু উবায়দাহ ইবনুল জাররাহ, সা'দ ইবনে আবি ওয়াক্কাস ও সাঈদ ইবনে যায়েদ প্রমুখ। কিছু মানুষ মন্তব্য করেন: "এই ছেলেকে কি প্রাথমিক মুহাজিরদের নেতৃত্ব দেওয়া হচ্ছে?" এতে নবি প্রচণ্ড রেগে গেলেন। তিনি মাথায় কাপড় বেঁধে মিম্বারে উঠলেন এবং আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, হে মানুষেরা, আমি শুনেছি যে, উসামার নেতৃত্বের ব্যাপারে কেউ আমার প্রতি অভিযোগ তুলেছে। যদি তোমরা উসামার নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পার, তাহলে (এর দ্বারা মূলত) তোমরা তার পিতার নেতৃত্বের ক্ষেত্রেও তর্ক করেছ। আমি আল্লাহর শপথ করি, যারা নেতৃত্বের যোগ্য, তারা নেতৃত্বের যোগ্যই। তার পুত্রও তার পিতার মতো নেতৃত্বের যোগ্য। তারা [আমার] প্রিয় মানুষদের অন্তর্ভুক্ত এবং তারা উভয়ই সৎ। তাঁরা সৎ পথে নেতৃত্ব দিতে সক্ষম। তার সাথে সদয় হও, কারণ সে তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।" শনিবার ১০ রবিউল আউয়াল তিনি মিম্বার থেকে নেমে বাড়ি ফিরে গেলেন। সেই সময় উসামার সঙ্গে যেসব মুসলমান যাত্রা করতে যাচ্ছিলেন, তারা নবিকে বিদায় জানাতে এলেন। নবি বারবার বললেন: "উসামার যাত্রা সফল করো।" এর পরের রবিবার তিনি আরো অসুস্থ বোধ করেন। উসামা তার ক্যাম্প থেকে এসে নবির কাছে মাথা নত করলেন এবং নবি তাকে চুম্বন করলেন। নবি হাত তুলে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। উসামা পরে তার ক্যাম্পে ফিরে গেলেন। সোমবার নবি সুস্থতা বোধ করলেন। তিনি উসামাকে বলেন: "আল্লাহর বরকতে যাত্রা কর।" আসামা বিদায় নিয়ে বের হলেন এবং সৈন্যদের যাত্রা শুরু করার নির্দেশ দিলেন। যখন তিনি ঘোড়ায় উঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তার মা উম্মে আয়মান এসে বলেন, "নবি তো মারা যাচ্ছেন!" তাঁর সঙ্গে উমর ইবনুল খাত্তাব ও আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ ছিলেন। এ কথা শুনে তারা তাড়াতাড়ি নবির কাছে গেলেন। তিনি সোমবার ১২ রবিউল আউয়াল মৃত্যুবরণ করেন। এরপর জারফে থাকা মুসলমানরা মদিনায় ফিরে এলেন। বুরাইদা ইবনুল হুসাইব উসামার পতাকাসহ শহরে প্রবেশ করেন এবং তা নবির দরজার কাছে স্থাপন করেন। এরপর যখন লোকেরা আবু বকরের হাতে খিলাফতের বাইয়াত গ্রহণ করল, তখন তিনি বুরাইদা ইবনুল হুসাইব আল-আসলামিকে নির্দেশ দিলেন, যেন তিনি নবির দেওয়া সেই পতাকা (লিওয়া) উসামার ঘরে পৌঁছে দেন এবং তিনি যেন নির্ধারিত গন্তব্যের উদ্দেশ্যে রওনা হন। বুরাইদা সেই পতাকা নিয়ে উসামার প্রথম সামরিক শিবিরে পৌঁছান। তখন আরবের বিভিন্ন গোত্র ইসলাম ত্যাগ করে মুরতাদ হয়ে গেলে অনেকেই আবু বকরের কাছে প্রস্তাব রাখেন যে, উসামার অভিযান আপাতত স্থগিত রাখা হোক। কিন্তু আবু বকর তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। পরে আবু বকর ও উমর ইবনুল খাত্তাব উসামার কাছে অনুরোধ করেন, যেন তিনি কিছু সাহাবিকে মদিনায় অবস্থান করার অনুমতি দেন; তখন উসামা তাদের অনুরোধ গ্রহণ করেন। ১১ হিজরি সনের রবিউস সানি মাসের চাঁদ উঠলে উসামা অভিযানে বের হন। তিনি ‘আবনা’ অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন এবং প্রায় বিশ রাত পথ অতিক্রম করেন। এরপর তিনি আকস্মিক আক্রমণ পরিচালনা করেন। মুসলিম বাহিনীর স্লোগান ছিল: “ইয়া মানসুর, আমিত!” (হে বিজয়ী, আঘাত হানো!)। তখন তারা শত্রুপক্ষের যে-ই সামনে আসে, তাকেই হত্যা করে। কিছু মানুষকে বন্দি করেন এবং বিভিন্ন স্থানে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। উসামা তার পিতা যায়েদ ইবনে হারেসার ঘোড়া সাবহাতে আরোহণ করেছিলেন। এই অভিযানে তিনি পিতার হত্যাকারীকেও হত্যা করেন। সন্ধ্যা হলে তিনি বাহিনীকে ফিরে আসার নির্দেশ দেন এবং বাহিনী দ্রুতগতিতে মদিনার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। তারা নয় রাতের ভ্রমণে ওয়াদি আল-কুরায় পৌঁছে যায়। এরপর উসামা তাদের নিরাপদ অবস্থানে থাকার সংবাদ জানানোর উদ্দেশ্যে মদিনায় একজন বার্তাবাহক মদিনায় পাঠান। সেখানে বিশ্রাম করে তারা পুনরায় যাত্রা শুরু করেন এবং ছয় দিনের মধ্যে মদিনায় পৌঁছান। এ অভিযানে মুসলমানদের কেউ হতাহত হয়নি। মদিনায় তাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের সংবাদে আবু বকর মুহাজির ও মদিনাবাসীদের নিয়ে তাদের অভ্যর্থনা জানাতে বের হন। উসামা তার পিতার ঘোড়া সাবহাতে চড়ে মদিনায় প্রবেশ করেন। তখন তাঁর সামনে পতাকা বুরাইদাহ ইবনুল হুসাইব পতাকা বহন করেন। তিনি মসজিদে গিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন; তারপর নিজ গৃহে প্রত্যাবর্তন করেন। এদিকে হিমস শহরে অবস্থানকারী সম্রাট হিরাক্লিয়াস উসামার অভিযানের খবর পেলে বালকা অঞ্চলে একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী প্রেরণ করেন এবং যারা সেখানে অবস্থান করতে থাকে।[২১]
মূলত উসামার বাহিনীই প্রথম মুসলিম সেনাবাহিনী হিসেবে বাইজেন্টাইন অঞ্চলে আক্রমণ করতে সক্ষম হয়। এর ফলে পরবর্তীতে মুসলিমরা লেবানন ও মিশর জয় করতে পারে, যা উসামার জীবদ্দশায় ঘটে।[২১][২১]
হাদিস বর্ণনা
[সম্পাদনা]মুহাদ্দিসরা উল্লেখ করেন, তার বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা মোট একশ’ আটাশটি। তার মধ্যে পনেরটি ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম উভয়ই বর্ণনা করেন। হাসান ইবনে আলী, মুহাম্মাদ ইবনে আব্বাস, আবু হুরাইরা, কুরাইব, আবু উসমান নাহদি, ’আমর ইবনে উসমান, আবু ওয়ায়িল, আমের ইবনে সা’দ, হাসান বসরী প্রমুখ সাহাবি ও তাবঈ তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন।[৮]
তাঁর সূত্রে বর্ণিত হাদিস
[সম্পাদনা]উসামা ইবনে যায়েদের সূত্রে বর্ণিত উল্লেখযোগ্য ও প্রসিদ্ধ কয়েকটি হাদিস হলো:
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসলামা বলেন, উসামা ইবনে যায়েদ থেকে বর্ণিত রয়েছে যে, তিনি বলেন, আল্লাহর রাসুল আরাফার ময়দান থেকে রওয়ানা হলেন। তখন একটি গিরিপথে গিয়ে তিনি বাহন থেকে নেমে প্রস্রাব করে অযু করেন; কিন্তু তিনি উত্তমরূপে অযু করলেন না। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল, আপনি কি নামাজ আদায় করবেন? উত্তরে তিনি বলেন, নামাজের স্থান তো সামনে। এরপর পুনরায় তিনি বাহনে আরোহন করেন। এভাবে মুযদালিফায় পৌঁছেন এবং বাহন থেকে নেমে অযু করেন। তবে এবার তিনি উত্তমরূপে অযু করেন। তখন নামাজের ইকামাত দেওয়া হলে তিনি মানুষেদর নিয়ে মাগরিবের নামাজ আদায় করেন। তারপর সাহাবিরা সবাই নিজেদের অবতরণ স্থলে উট বেঁধে রাখে। একটু পর পুনরায় এশার নামাজের জন্য ইকামাত দেওয়া হল। তিনি মানুষদের নিয়ে এশার নামাজ জামাতে আদায় করেন। তখন উভয় নামাজের মাঝে তিনি অন্য কোনো নামাজ আদায় করেননি।[২২]
আবদান ও মুহাম্মাদের সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, উসামা ইবনে যায়িদ থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, নবির কাছে তাঁর একজন কন্যা (যায়নাব) লোক পাঠিয়ে জানালেন যে, আমার এক পুত্র মুমূর্ষ অবস্থায় রয়েছে, তাই আপনি আমাদের এখানে আসুন। তখন নবি তার মাধ্যমে বলে পাঠালেন যে, আমার পক্ষ থেকে তাকে সালাম জানিয়ে বলবে, যা কিছু আল্লাহর অধিকারে রয়েছে, তিনি তা নিয়ে যান। তাঁর কাছে সবকিছুর জন্য একটি নির্ধারিত সময় রয়েছে। তাই সে যেন ধৈর্য ধারণ করে এবং [তার বিনিময়ে] সাওয়াবের আশা করে। তখন জয়নব কসম করে তাঁর কাছে লোক পাঠিয়ে বললেন যে, তিনি যেন অবশ্যই আসেন। তখন নবি দাঁড়ান এবং যাওয়ার জন্য তৈরি হলেন। তখন তাঁর সাথে ছিলেন সা'দ ইবনে উবাদাহ, মুয়াজ ইবনে জাবাল, উবাই ইবনে কাব, যায়েদ বিন সাবিত ও আরো কয়েকজন সাহাবি। [নবি সেখানে পৌঁছালে] তখন শিশুটিকে রাসুলের কোলে তুলে দেওয়া হলো। তখন তার জান বের হওয়ার জন্যে ছঠফট করছিল। রাবি (বর্ণনাকারী) বলেন, আমার ধারনা, তিনি বলেছিলেন, তার শ্বাস যেন মশকের মত (আওয়াজ করছিল)। তখন নবির দুই চোখ দিয়ে অশ্রু ঝরছিল। সা’দ বিন উবাদা বলেন, হে আল্লাহর রাসুল, এ কি [আপনি কান্না করছেন]? তখন তিনি বলেন, এটা হলো রহমত, যা মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অন্তরে আমানত হিসেবে গচ্ছিত রেখেছেন। আল্লাহ তো তাঁর দয়ালু বান্দাদের প্রতিই দয়া করেন।[২২]
আসবাগের সূত্রে বর্ণিত আছে, উসামা ইবনে যায়দ থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! আপনি মক্কা গেলে আপনার বাড়ির কোথায় অবস্থান করতে চাইবেন? তিনি বলেন, আকিল কি [আমার জন্য] কোনো সম্পত্তি বা বাড়ি-ঘর রেখে গেছে? আকিল ও তালিব তাঁদের পিতা আবু তালিব ইবনে আবদুল মুত্তালিবের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন এবং জাফর ও আলি হননি। কারণ তাঁরা দুজনে ছিলেন মুসলিম এবং আকিল ও তালিব ছিলেন কাফির। এ জন্যই উমর ইবনুল খাত্তাব বলেন, মু’মিন ব্যক্তি কখনো কাফিরের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী সাব্যস্ত হয় না।[২২]
প্রথম ফিতনায় অবস্থান
[সম্পাদনা]যখন ইসলামের ইতিহাসে প্রথম গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তখন তিনি নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করেন। গৃহযুদ্ধে খলিফা উসমানের হত্যার পর মুসলিম সমাজে বিভাজন সৃষ্টি হলে মুসলিমরা দুই দলে বিভক্ত হয়ে যায়। একদিকে ছিলেন চতুর্থ খলিফা আলি ও তাঁর সমর্থকরা এবং অন্যদিকে ছিলেন সিরিয়ার শাসক মুয়াবিয়া ও তাঁর অনুসারীরা। এই অবস্থায় উসামা ইবনে যায়েদ সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ অবস্থানে অটল থাকেন। এই গৃহযুদ্ধে তিনি আলিকে সত্যপন্থী বলে বিশ্বাস করতেন; তবুও তিনি যুদ্ধে অংশ নেননি। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, যে ব্যক্তি আল্লাহকে এক বলে স্বীকার করে এবং নবিকে মানে, তার বিরুদ্ধে অস্ত্র তোলা বৈধ নয়। তখন তিনি আলির কাছে বার্তা পাঠিয়ে জানান, “আপনি যদি সিংহের মুখের ভেতরেও থাকতেন, তবুও আমি আপনার সঙ্গে সেখানে যেতাম; কিন্তু এই ব্যাপারে আমি তা ঠিক মনে করছি না। গোটা সংঘাতের সময় তিনি নিজের ঘরেই অবস্থান করেন। যখন তাঁর কিছু সাথী তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, কেন তিনি যুদ্ধে অংশ নিচ্ছেন না; তখন তিনি বলেন, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর একত্ববাদের ঘোষণা দেয়, আমি তার বিরুদ্ধে কখনো যুদ্ধ করব না।[২১]
মৃত্যু
[সম্পাদনা]উসমান হত্যাকাণ্ডের পর উসামা সব ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। পরবর্তীতে আলিও শহিদ হলে তাঁর পুত্র হাসান খিলাফতের দাবি পরিত্যাগ করে মুয়াবিয়ার হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। তখন অন্যান্য অনেক সাহাবির সঙ্গে উসামাও মুয়াবিয়ার আনুগত্য স্বীকার করেন। এরপর তিনি প্রথমে সিরিয়ার দামেস্ক শহরের পশ্চিমাংশে কিছুদিন বসবাস করেন। পরে তিনি ওয়াদি আল-কুরায় যান এবং সেখান থেকে শেষ পর্যন্ত মদিনায় ফিরে আসেন। তিনি মদিনার নিকটবর্তী জুরফ নামক স্থানে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে দাফন করা হয়। উসমার মৃত্যুসাল নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। ইবনে আবদুল বারের মতে, তাঁর মৃত্যু ৫৪ হিজরি সালে হয়। অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে, তিনি মুয়াবিয়ার খিলাফতের শেষ সময় পর্যন্ত জীবিত ছিলেন। কেউ উল্লেখ করেছেন যে, তাঁর মৃত্যু ৬১ হিজরি সালে সংঘটিত হয়।[২৩]
তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Muhammad al-Jarir al-Tabari, Al-Tarikh al-Rusul wa'l-Muluk. Translated by Ella Landau-Tasseron (1998). Volume 39: Biographies of the Companions and Their Successors (Albany: State University of New York Press), 65.
- 1 2 3 4 5 Baladhuri, Vol. 1, p. 96
- ↑ Razwy, Sayed Ali Asgher। A Restatement of the History of Islam & Muslims। পৃ. ২৮৩।
- ↑ Bewley/Saad vol. 8 p. 157.
- ↑ Ibn Sa`d, vol. 8, p. 223; Baladhuri, Vol. 1, p. 96
- ↑ Ibn Qutaybah, p. 150
- ↑ Baladhuri, Vol. 1, p. 472
- 1 2 Ibn Hajar, al-Ithaba, vol.8, p. 380
- ↑ Ibn Sa`d, vol. 8, p. 223; Ibn Sa`d, vol. 4, p. 61
- ↑ Razwy, Sayed Ali Asgher। A Restatement of the History of Islam & Muslims। পৃ. ৫৩।
- ↑ Landau-Tasseron/Tabari p. 6.
- ↑ Lecker, p. 773.
- ↑ Landau-Tasseron/Tabari p. 6.
- ↑ Zuhri, p. 177; al-Tabarani, vol. 25, p. 86
- ↑ mahallati, vol.2, p. 26
- ↑ Ibn Kathir, The Battles of the Prophet, pp. 175–176
- ↑ Abu Khalil, Shawqi (১ মার্চ ২০০৪)। Atlas of the Prophet's biography: places, nations, landmarks। Dar-us-Salam। পৃ. ২৪৯। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৯৬০৮৯৭৭১৪।
- 1 2 Gil, A history of Palestine, 634-1099, p. 31.
- ↑ Razwy, Sayed Ali Asgher। A Restatement of the History of Islam & Muslims। পৃ. ২৮৩।
- ↑ Mubarakpuri, The Sealed Nectar (Free Version), p. 303
- 1 2 3 4 ইবনে সা'দ। আল-তাবাকাত আল-কুবরা। বৈরুত: দার সাদের। পৃ. ২/১৮৯-৯১।
- 1 2 3 "বর্ণনাকারীঃ উসামাহ ইবনু যায়দ (রাঃ)"। সংগ্রহের তারিখ ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।
- ↑ Muhammad al-Jarir al-Tabari, Al-Tarikh al-Rusul wa'l-Muluk. Translated by Ella Landau-Tasseron (1998). Volume 39: Biographies of the Companions and Their Successors (Albany: State University of New York Press)। পৃ. ৬৫।