লায়লা বিনতে আল-মিনহাল

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

লায়লা বিনতে আল-মিনহাল (এছাড়াও লাইলা) (আরবি: ليلى بنت المنهال‎‎) ছিলেন মুহাম্মাদের একজন সাহাবিয়া (একজন নারী মুসলিম বিশ্বাসী যিনি ইসলামিক নবী মুহাম্মাদকে ব্যক্তিগতভাবে দেখেছেন) এবং মালিক ইবনে নুয়ায়রাহর স্ত্রী।

লায়লা আল মিনহালের কন্যা ছিলেন এবং পরবর্তীতে তিনি উম্মে তামিম নামেও পরিচিতি পান। তাকে সে সময়ের আরবের সবচেয়ে সুন্দরী নারীদের মধ্যে একজন হিসেবে গণ্য করা হতো। যখন তিনি প্রাপ্তবয়স্ক হলেন, বহু পুরুষ তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলেও তিনি সেগুলো প্রত্যাখ্যান করেন। অবশেষে, মালিক ইবনে নুয়ায়রাহর সাথে তার পরিচয় হয় এবং তাকেই তিনি বিয়ে করেন।

মালিক ইবনে নুয়ায়রাহ[সম্পাদনা]

মালিক কিছু স্বতন্ত্র গুণাবলীর অধিকারী একজন গোত্রপ্রধান ছিলেন; তিনি ভাল যোদ্ধা ছিলেন, দানশীলতার জন্য পরিচিত ছিলেন, এবং একজন জনপ্রিয় কবি ছিলেন। সাহসিকতা, দানশীলতা এবং কবিত্ব সে সময়ে আরবের সবচেয়ে প্রশংসনীয় গুণাবলি ছিল। নবী মুহাম্মাদের জীবদ্দশায় তাকে খাজনা আদায়কারী হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল।

মালিক ইবনে নুয়ায়রাহর গোত্রের উপর আক্রমণ[সম্পাদনা]

মুহাম্মাদের মৃত্যুর পর আরবে ছড়িয়ে পড়া রিদ্দার যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে, আবু বকর তার সবচেয়ে প্রতিভাবান সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদকে চারপাশের এলাকার গোত্রগুলোকে আত্মসমর্পণ করানোর জন্য ৪০০০ সৈন্যসহ নাজদে প্রেরণ করলেন। মালিক মদিনা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তার কর্মকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত ছিলেন। মুহাম্মাদের মৃত্যুর পর, তিনি মদিনার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিদ্রোহে নেমে পড়েন। মুহাম্মাদ্র মৃত্যুর অল্পদিন পরেই, তিনি তার গোত্রের লোকদের কাছে সকল খাজনা ফিরিয়ে দিলেন এই বলে যে, আমি শুধুমাত্র গাধীরে নির্বাচিত লোকটির (আলী ইবনে আবু তালিব) কাছেই খাজনা দেবো।[১] অধিকন্তু, তার বিরুদ্ধে অভিযোগের আরেকটি কারণ হল তিনি স্বঘোষিত নবী সাজাহর সাথে একটি বিনিময় চুক্তিতে সাক্ষর করেছিলেন। এই চুক্তিতে বলা হয়েছিলো, প্রথমে তারা স্থানীয় শত্রুদেরকে মিলেমিশে মোকাবিলা করবে, আর এরপর তারা মদিনা রাষ্ট্রের মুখোমুখি হবে।[২] মালিক যখন শক্তিশালী আরব গোত্রগুলোর বিরুদ্ধে খালিদের বিজয়ের খবর জানতে পারলেন, তিনি তার গোত্রের লোকদের খালিদের যুদ্ধের দিকে অগ্রসর হতে বারণ করে ঘরে থেকে শান্তি কামনা করতে বললেন।[৩] তিনি নিজেও মরুর ভেতর দিয়ে নিজ পরিবার সহ পালিয়ে গেলেন। পাশাপাশি, নিজেকে মদিনা রাষ্ট্রের (ভবিতব্য ইসলামী সাম্রাজ্য) প্রতি অনুগত প্রমাণ করতে, তিনি খাজনা আদায় করে তা মদিনায় পাঠিয়ে দিলেন। তার কাফেলাটি বাত্তাহ নগরীতে খালিদের সানাবাহিনির দ্বারা আটক হল। খালিদ তাঁদের সাজাহর সাথে চুক্তিতে সাক্ষরের বিষয়ে প্রশ্ন করলেন, কিন্তু তারা বললেন যে এটা করা হয়েছিল শুধুমাত্র তাঁদের শত্রুদের প্রতি প্রতিশোধ নিশ্চিত করার স্বার্থে।[৪] খলিদ নাজদে পৌঁছে, কোন প্রতিপক্ষ সেনাদলকে পেলেন না, তাই তিনি নিকটস্থ গ্রামগুলোতে অশ্বারোহী দূত প্রেরণ করলেন এবং তাঁদেরকে প্রতিটি দলের প্রতি আযান (ইসলামী প্রার্থনার ডাক) দেয়ার নির্দেশ দিলেন। জিরার বিন আযওয়ার নামের এক দলনেতা আযানের উত্তর না দেয়ার অভিযোগে মালিকের পরিবারকে গ্রেফতার করলেন।

মালিক ইবনে নুয়ায়রাহর মৃত্যু[সম্পাদনা]

শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

গ্রেফতার হওয়ার পর, মালিকে তার অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হল, মালিকের আবু বকরকে নির্দেশ করে "তোমার মনিব এই বলেছেন, তোমার মনিব সেই বলেছেন" এভাবে উত্তর দেন। খালিদ মালিককে রাষ্ট্রদ্রোহী স্বধর্মত্যাগী ঘোষণা করে তার মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিলেন।[৫] খালিদ মালিক ইবনে নুয়ায়রাহকে হত্যা করলেন এবং তার স্ত্রী লায়লা বিনতে মিনহালকে ধর্ষণ করলেন[৬]। যদিও সুন্নিগণ দাবি করেন যে, খালিদ একই রাতে লায়লাকে বিয়ে করেন, শিয়াগণ এর বিরোধিতায় বলেন যে, খালিদের উচিত ছিল বিধবা লায়লার ইদ্দতের (ইসলামে স্বামী অন্তর্ধানের বিঁধবার পুনঃবিবাহের বিরতি) চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করা এবং তার পর তাকে বিয়ে করা। আবু কাতাদা আল-আনসারী ছিলেন মুহাম্মাদের একজন সাহাবী যিনি খালিদকে মদিনায় সঙ্গ দিতেন।[৭] খালিদ কর্তৃক মালিকের মৃত্যুদণ্ডে তিনি এতোটাই মর্মাহত হলেন যে, তিনি তাৎক্ষনিকভাবে মদিনায় ফিরে গিয়ে আবু বকরকে বললেন যে তিনি মুসলিম হত্যাকারী কোন সেনাপতির অধীনে কাজ করতে পারবেন না।[৭] মালিকের মৃত্যু ও খালিদ কর্তৃক তার স্ত্রীকে গ্রহণের ঘটনা সমালোচনার জন্ম দিল। আবু বকরর বিশ্বস্ত সঙ্গী আবু কাতাদা সহ তার সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তা বিশ্বাস করতেন যে, খালিদ লায়লাকে পাওয়ার জন্য মালিকে হত্যা করেন। খালিদের চাচাতো ভাই ও আবু বকরের অন্যতম প্রধান উপদেষ্টা উমর বিন খাত্তাবের পিড়াপিড়িতে আবু বকর খালিদকে কৈফিয়ত দেয়ার জন্য মদিনায় ডেকে পাঠালেন।[৮] মদিনায়, ‘উমর খালিদকে বললেন: “তুমি আল্লাহর শত্রু! তুমি একজন মুসলিমকে হত্যা করে তার স্ত্রীকে নিয়ে নিয়েছ। আল্লাহর কসম, আমি তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করব। [৯]' উমর আবু বকরের কাছে খালিদকে তাৎক্ষনিক পদচ্যুত করার দাবি জানালেন। তিনি বললেন যে, খুন ও ব্যভিচারের দ্বৈত অপরাধে খালিদকে বিচারাধীন হওয়া উচিত। ইসলামী আইন অনুসারে, খালিদকে পাথর মেরে হত্যা করা উচিত ছিল, কিন্তু আবু বকর খালিদকে বাঁচিয়ে দিলেন এই বলে যে খালিদ শুধু একটি "বিচারকার্যে ত্রুটি" করেছে মাত্র।[১০]

সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

৬৩২ সালের নভেম্বরে গ্রেফতার হওয়ার পর, খালিদ মালিকে তার অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলেন। মালিকের প্রতিউত্তরকে খালিদ এভাবে ব্যাখ্যা করেন যে, যদিও সে (মালিক) ও তার অনুসারীরা মুসলিম ছিল, তবুও তারা আবু বকরকে খাজনা দিতে ইচ্ছুক ছিল না। খালিদ একে যে কোন মূল্যে নিজ জীবন বাঁচানোর জন্য মালিকের একটি পরিষ্কার ফন্দি হিসেবে ধরে নিলেন। মুহাম্মাদের মৃত্যুর পর খজনার অর্থ বিতরণ করে দেয়া ও সাজাহর সাথে তার চুক্তির নিশ্চিৎ প্রমাণ পাওয়ার পর,[২] খালিদ মালিককে স্বধর্মত্যাগী হিসেবে ঘোষণা করলেন এবং তার মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দিলেন।[৫]

মালিকের মৃত্যুর পর লায়লা ও খালিদ[সম্পাদনা]

যে রাতে খালিদ মালিককে হত্যা করেন, সে রাতেই তিনি মালিকের বিধবা স্ত্রী লায়লা বিনতে মিনহালকে বিয়ে করেন, যিনি সে সময় আরবের অন্যতম সুন্দরী নারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।[৫] খালিদের সাথে লায়লার বিয়ে পরবর্তীতে একটি বিতর্কিত আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়, কারণ একদল লোক ভেবেছিল যে খালিদ লায়লাকে পাবার জন্যই মালিকে হত্যা করেছিল। খালিদের চাচাতো ভাই ও পরবর্তী খলিফা উমরও এই দলে ছিলেন। খলিফা আবু বকর খালিদকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার জন্য ডেকে পাঠালেন। যথাযথ বিবেচনার পর, খলিফা সিদ্ধান্ত নিলেন যে খালিদের কোন দোষ নেই। তিনি খালিদকে লায়লার সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য তিরস্কার করলেন এবং তাকে সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার জন্য মুক্তভাবে ছেড়ে দিলেন, আর কিছু লোক বিশ্বাস করত, মালিক একজন মুসলিম ছিল, তাই এই ঘটনায় ভুল একটি হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা ছিল, এ কারণে আবু বকর মালিকের উত্তরাধিকারীদের কাছে রক্তপণ পরিশোধ করার নির্দেশ দিলেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. reference=al-Balazuri: book no: 1, page no:107.
  2. reference=al-Tabari: Vol. 2, page no: 496.
  3. reference= Tabari: Vol. 2, Page no: 501-502.
  4. reference= Tabari: Vol) p. 501-2.
  5. reference=Tabari: Vol. 2, Page no: 5)
  6. "liable for rape", Shattered: The Sectarian Divide and Start of the Feminist Revolution in Islam By Syed Abbas Rizvi, S. Khasim T. Rizvi, p. 51; In Medina, Umar told Khâlid: “You enemy of Allâh! You killed a Muslim man and thereafter took his wife. By Allâh, I will stone you. Tabari: Vol. 2, Page no: 274)
  7. (A Restatement of the History of Islam and Muslims, Ali Razwy, Chapter 55)
  8. Akram 2004, পৃ. 183
  9. reference=Tabari: Vol. 2, Page no: 274)
  10. (A Restatement of the History of Islam and Muslims, Ali Razwy, Chapter 55)

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]