সালিম মাওলা ইবনে আবু হুজাইফা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(সালিম মাওলা আবু হুযায়ফা থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

সালিম মাওলা আবু হুজায়ফা (سالم مولى أبي حذيفة) (মৃত্যু ৬৩২ খ্রি) ছিলেন মুহাম্মাদের একজন অন্যতম সাহাবা[১] তিনি আবু হুজাইফা ইবনে উতবার একজন মুক্ত দাস ছিলেন। তিনি ভণ্ড নবী মুসাইলিমার বিরুদ্ধে প্রেরিত যুদ্ধে পতাকাবাহক হিসেবে অংশ নেন এবং ব্যাপক সাহসিকতা প্রদর্শন করেন। এই যুদ্ধে তিনি শহীদ হন।[২]

নাম ও বংশ পরিচয়[সম্পাদনা]

সালিম মাওলা আবু হুজায়ফা এর মূলনাম সালিম এবং কুনিয়াত (উপনাম) আবু আব্দুল্লাহ। তার পিতার নামের ব্যাপারে মতভেদ আছে, ইবনে মুন্দাহ বলেছেন উবায়েদ ইবনে রাবিয়া। আবার কেও বলেছেন মা’কাল। তিনি ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত, পারস্যের ইসতাখরান নামক অঞ্চল তার পিতৃপুরুষের আবাসভূমি। তিনি ঘটনাক্রমে সুবাইতা বিনতে ইউয়া আল আনসারীর দাস হিসেবে মদিনায় পৌছায়। এবং সুবাইতা সালিমকে নিঃশর্ত মুক্ত করে দিলে তার স্বামী আবু হুজাইফা তাকে ছেলে হিসেবে গ্রহণ করে। এবং তিনি সালিম ইবনে আবু হুজাইফা নামে পরিচিত হন।[৩]

পরিচয়ে মতভেদ[সম্পাদনা]

সালিম মাওলাকে কেউ কেউ তাকে আবু হুজাইফার দাস বলেও উল্লেখ করেছেন। এইদিক দিয়ে তাকে মুহাজির সাহাবা গণ্য করা হয়। অন্যদিকে সুবাইতার আযাদকৃত দাস হিসেবে তাকে আনসার সাহাবাও বলা হয়। আবার তিনি পূর্বপুরুষ হিসেবে পারস্যের সন্তান হওয়ার কারণে কেউ কেউ তাকে অনারব সাহাবাও বলে থাকেন।[২]

সালিম মাওলা নামের কারণ[সম্পাদনা]

সালিম মাওলা মক্কায় তার পালক পিতা আবু হুজাইফার সাথে বসবাস করতেন। ইসলামী বিধান অনুসারে একদিন আল্লাহ্‌ কুরআনের আয়াত নাযিল করে‌ পালিতপুত্র গ্রহণের প্রথা বাতিল করে দিলো। বলা হলো তারা যেন সবাই তাদের পিতার নামে সম্পৃক্ত করে ডাকে। তখন প্রত্যেক পালিত পুত্র নিজ নিজ জন্মদাতা পিতার নামে পরিচিতি গ্রহণ করলো। যেমন যায়িদ ইবনে মুহাম্মদ হলো যায়িদ ইবনে হারিসা। কিন্তু সালিমের পিতৃপরিচয় ছিল অজ্ঞাত। তাই তিনি তার মনিবের পরিচয় গ্রহণ করলেন। নাম দেওয়া হলঃ সালিম মাওলা আবু হুজাইফা, আবু হুজাইফার বন্ধু-সাথী, বা অভিভাবক।[২]

ইসলাম গ্রহণ[সম্পাদনা]

ইসলামের প্রাথমিক লগ্নেই সালিম মাওলা তার মনিব আবু হুজাইফার সাথে ইসলাম গ্রহণ করেন। এই আবু হুজাইফা ছিলেন মক্কার কুরাইশ সর্দার ইসলামের শত্রু উতবা ইবনে রাবিয়ার ছেলে। প্রাথমিক অবস্থায় তারা দুইজনই গোপনে ইবাদত করতেন। তারা দুইজনই বলিষ্ঠ ঈমানদার ব্যক্তি ছিলেন।[৪]

আবু হুজাইফা তার পালক পুত্র সালিম মাওলার প্রতি ছিলো আন্তরিক, এমনকি ভাইয়ের মেয়ে (ভ্রাতুষ্পুত্রী) ফাতিমা বিনতে ওয়ালিদ বিন আতাবা বিন রাবিয়াকে, সালিমের সাথে বিয়ে দেন। তবে সালিম মাওলা নিঃসন্তান ছিলেন।[২]

মদিনায় হিজরত[সম্পাদনা]

মুহাম্মাদের হিজরতের পূর্বেই তিনি তার দ্বীনি বন্ধু ও অভিভাবক আবু হুজাইফার সাথে মদিনায় হিজরত করেন। মদিনায় তিনি হযরত আব্বাদ ইবন বিশরের অতিথি হন। যদিও মুহাম্মাদ মক্কায় তাকে আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহর সাথে দ্বীনি ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে দেন। এবং হিজরতের পরে মুহাম্মাদ মদিনায় তাকে মুয়াজ ইবনে মায়েজ আল আনসারীর সাথে ভ্রাতৃসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে দেয়।

যুদ্ধে অংশগ্রহণ[সম্পাদনা]

সালিম মাওলা ইবনে আবু হুজাইফা বদর, উহুদ, খন্দকসহ সকল যুদ্ধেই তিনি মুহাম্মাদের সাথেই অংশগ্রহণ করেছিলেন।[৫]

বদরের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

সালিম মাওলা বদরের যুদ্ধে কুরাইশদের শত্রু উমাইর ইবনে আবি উমাইরকে নিজ হাতে হত্যা করেন।[৬]

দাওয়াতি কার্যক্রমে[সম্পাদনা]

মক্কা বিজয়ের পর মুহাম্মাদ মক্কার চারিদিকের গ্রাম ও গোত্রগুলিতে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছানোর জন্য প্রতিনিধি দল পাঠাতে লাগলেন। মুহাম্মাদ এসব প্রতিনিধি পাঠাচ্ছিলেন আহ্বানকারী হিসেবে যোদ্ধা হিসেবে নয়। সালিম মাওলা বনু জুজাইমা গোত্রের নিকট প্রেরিত একটি দলে খালিদ ইবনে ওয়ালীদের নেতৃত্বে অংশগ্রহণ করেছিলেন। খালিদ গন্তব্যস্থলে পৌঁছার পর ঘটনাক্রমে তরবারী চালালেন এবং তাতে প্রতিপক্ষের যথেষ্ট ক্ষয়ক্ষতি হলো। এই ঘটনায় সালিম মাওলা মুহাম্মাদের দাওয়াতি কার্যক্রমের কথা মাথায় রেখে খালিদের এই কাজের বিরোধিতা করেন এবং তার সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পরেন। সালিম মাওলা একজন সাধারণ দাস হয়েও খালিদকে ভয় পাইনি। পরবর্তীতে অবশ্য মুহাম্মাদ সালিম মাওলার এই কাজকে সমর্থন করেছিলো এবং খালিদকে ভৎসর্না করে এই কাজের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে মাফ চেয়েছিলো।[১][৫]

আবু বকরের আমলে[সম্পাদনা]

ইয়ামামার যুদ্ধে[সম্পাদনা]

আবু বকরের আমলে ভণ্ড নবী মুসাইলিমার বিরুদ্ধে ইয়ামামার যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তার সাথে তার দ্বীনী ভাই আবু হুজাইফাও অংশগ্রহণ করেছিলো। যুদ্ধের প্রথম পর্বে মুসলিম বাহিনী কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। এরপর খালিদ ইবনে ওয়ালিদ মুসলিম বাহিনীকে নতুন করে সংগঠিত করেন এবং অভূতপূর্ব কায়দায় তিনি বাহিনীকে বিন্যস্ত করেন। প্রথমদিকে যখন মুসলিম বাহিনী পিছু হটে যাচ্ছিল, তখন সালেম মাওলা চিৎকার করে বলছিলো,

ইয়ামামার যুদ্ধে প্রথমে মুসলিম বাহিনীর পতাকা ছিলো যায়িদ ইবনুল খাত্তাবের হাতে। তিনি শাহাদাত বরণ করলে পতাকাটি মাটিতে পড়ে যায়; সঙ্গে সঙ্গে সালেম মাওলা তা তুলে ধরেন। কেউ কেউ তার শারীরিক দুর্বলতার জন্য পতাকা বহনে আপত্তি করে বলে, “আমরা তোমার দিক থেকে শত্রুবাহিনীর আক্রমণের আশঙ্কা করছি।” সালেম বলেন, “তাহলে তো আমি হয়ে যাব কুরআনের এক নিকৃষ্ট বাহক।[১][৭]

শত্রু বাহিনীকে আক্রমণের পূর্বে আবু হুজাইফা ও সালিম মাওলা পরস্পর বুক মেলালেন এবং ইসলামের পথে শহীদ হওয়ার জন্য অঙ্গীকারাবদ্ধ হন। তারপর উভয়ে শত্রুবাহিনীর উপরে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আবু হুজাইফা একদিকে মুসাইলামা কাজ্জাবের বাহিনীর উপর আক্রমণ করতে করতে চিৎকার করে বলছিলো, “ওহে কুরআনের ধারকরা, তোমরা তোমাদের আমল দ্বারা কুরআনকে সজ্জিত কর।” আর একদিকে সালেম মাওলা শত্রুদের উপর আক্রমণ করছে আর চিৎকার করে বলছেন, “আমি হয়ে যাবো কুরআনের একজন নিকৃষ্ট বাহক; যদি আমার দিক হতে শত্রুবাহিনীর।

যুদ্ধ করতে করতে এক ধর্মত্যাগীর তরবারির তীব্র আঘাত তার ডান হাতে কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো, তার হাত থেকে যুদ্ধের পতাকা পরে যেতে লাগলো, তখন তিনি তৎক্ষণাৎ বাম হাতে পতাকাটি উঁচু করে ধরেন। বাম হাতটিও শত্রুর আঘাতে কেটে পড়ে গেলে পতাকাটি গলার সাথে পেঁচিয়ে ধরেন। এ অবস্থায় তিনি কুরআনের একটি আয়াত উচ্চারণ করতে থাকলেন,

মুহাম্মাদ আল্লাহর এক রাসুল ছাড়া আর কিছু নন। অতীতে কত নবীর সহযোগী হয়ে কত আল্লাহওয়ালা ব্যক্তিই না যুদ্ধ করেছে। আল্লাহর পথে তাদের উপর যে বিপদ আপতিত হয়েছে, তাতে তারা দুর্বল হয়ে পড়েনি এবং থেমেও যায়নি। আল্লাহ ধৈর্য্যশীলদের ভালবাসেন।”

এই যুদ্ধে তার চির জীবনের সঙ্গী আবু হুজাইফাও শাহাদত বরণ করেন।[১]

মৃত্যু শয্যায়[সম্পাদনা]

সালিম মাওলা একসময় মাটিতে টলে পরেন, তখনও তার দেহে জীবনের স্পন্দন অবশিষ্ট ছিল। মুসাইলামা কাজ্জাবের নিহত ধর্মত্যাগীদের পলায়নের মাধ্যমে মুসলমানদের বিজয় ও যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। মুসলমানরা আহত ও নিহতদের খোঁজ করতে লাগলো।[১] সালিম মাওলাকে তারা জীবনের শেষ অবস্থায় খুঁজে পেল। সালিমের ইচ্ছানুযায়ী নিহত আবু হুজাইফা ও সালিমের পতাকা বহনে আপত্তি জানানো সাহাবার মাঝে তাকে শুইয়ে দেওয়া হলো, এই অবস্থায় তিনি শাহাদত বরণ করেন।[১]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

সালিম মাওলা ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে ইয়ামামার যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন। তার অভিভাবক ও দ্বীনী ভাই আবু হুজাইফাও এই যুদ্ধে শাহাদত বরণ করেন।[১]

তার মৃত্যুর পর তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির ব্যাপারে ওসীয়ত করে যান, এক তৃতীয়াংশ দাসমুক্তি ও অন্যান্য ইসলামী উন্নয়নমূলক কাজের জন্য এবং এক তৃতীয়াংশ পূর্বতন মনিব সুবাইতা বিনতে ইউয়ার জন্য। আবু বকর সুবাইতার অংশ তার কাছে পাঠালে তিনি তা গ্রহণে অস্বীকৃতি জানান ও বলেন, আমি তো তাকে নিঃশর্ত মুক্তি দিয়েছি, বিনিময়ে কোনো কিছু আশা করিনি।পরে খলিফা উমার তা বায়তুল মালে জমা দেন।[৮]

গুণাগুণ[সম্পাদনা]

কুরআন তেলওয়াত[সম্পাদনা]

সাহাবাদের যুগে 'কিরআত' শিল্পে যাদেরকে শীর্ষস্থানীয় গণ্য করা হতো, সালিম তাদের একজন। তিনি সুমধুর কন্ঠের অধিকারী ছিলেন, এমনকি তার কিরআত শুনতে শুনতে একদিন মুহাম্মাদ তার ঘরে ফিরতে দেরী করে ফেলেছিলেন। এবং মুহাম্মাদ তার কুরআন তেলওয়াত শুনে প্রশংসা করেছেন।[৫][৯]

আবদুল্লাহ ইবনে উমার বলেন, মুহাম্মাদ মদিনায় হিজরতের পূর্বে যারা মদীনায় হিজরত করেছিলেন, মসজিদে কুবায় সালিম মাওলা তাদের নামাজে ইমামতি করতেন। আবু বকর,উমর সহ বিশিষ্ট সাহাবারা তার পেছনে নামায আদায় করতেন।[৯][১০]

মুহাম্মাদ চার ব্যক্তির নিকট কুরআনকে শিক্ষাকে নির্ভরযোগ্য বলেছিলেন, তারা হলোঃ আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ, সালিম মাওলা ইবনে আবু হুজাইফা, উবাই ইবনে কা’বমুয়ায ইবনে জাবাল।”[৯][১১]

স্পষ্টভাষী[সম্পাদনা]

সালিম মাওলা ছিলেন একজন স্পষ্টভাষী সাহাবা, তার সামনে কেও অন্যায় করলে তিনি সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ করতেন, এমনকি তিনি খালিদকেও ছাড়েননি। তাঁর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য ছিল যে, তার বন্ধুরা তার নাম দিয়েছিলো -‘সালিম মিনাস সালেহীন’-সত্যনিষ্ঠদের দলভুক্ত সালিম।

উমর ইবনুল খাত্তাব সালিমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। মৃত্যুর পূর্বে খলিফা নির্বাচনের ব্যাপারে বলেছিলেন, “আজ সালিম জীবিত থাকলে শুরার পরামর্শ ছাড়াই আমি তাকে খিলাফতের দায়িত্ব দিতাম ।[৫]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]


তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Salim Mawla Abu Hudhayfa"Military Wiki (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৫-১২ 
  2. A Restatement of the History of Islam and Muslims। Al-Islam.org। 
  3. "Salim Mawla Abu Hudhayfa - Salim Mawla Abu Hudhayfa - qwe.wiki"it.qwe.wiki। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৫-১২ 
  4. "Men of Excellence"Al Hakam (ইংরেজি ভাষায়)। ২০১৯-০৪-২৬। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৫-১২ 
  5. (উসুদুল গাবা-২/২৪৬) 
  6. (ইবন হিশাম-১/৭০৮) 
  7. (হায়াতুস সাহাবা-১/৫৩৫) 
  8. (আল ইসতিয়াব, উসুদুল গাবা-২/২৪৭) 
  9. "কোরআনের অনন্য বাহক সালেম মাওলা আবি হুজাইফা (রা.)"আলোকিত বাংলাদেশ। ৩ মার্চ ২০১৬। 
  10. "কোরআনের সাধক সাত সাহাবি | কালের কণ্ঠ"Kalerkantho। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৫-১২ 
  11. "হজরত সালিম : যার কাছে কুরআন শিখতে বলেছিলেন বিশ্বনবি"jagonews24.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৫-১২ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]