মুগীরা ইবনে শুবা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

মুগীরা ইবনে শুবা (মৃত্যু- ৫০ হিজরি) মুহাম্মদের একজন বিশিষ্ট সাহাবা ছিলেন ।তিনি আরবের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক কূটনীতিবিদ ছিলেন ।তিনি বিভিন্ন সময়ে কুফা,বসরা শাসক হিসেবে নিয়োগ পান । তিনি একজন হাদিস বর্ণনাকারী সাহাবা ছিলেন ।

নাম ও বংশ পরিচয়[সম্পাদনা]

মুগীরা ইবনে শুবার মূলনাম আবু আবদিল্লাহ মুগীরা, এবং তার উপনাম/কুনিয়াত হল আবু মুহাম্মাদআবু ঈসা ।তার পিতার নাম শুবা ইবনে আবি আমের, তিনি বনী সাকীফ গোত্রের সন্তান। তাঁর মায়ের নাম উমামা বিনতু আফকাম,তিনি বনী নাসের ইবন মুয়াবিয়া গোত্রের কন্যা।[১]

ইসলাম গ্রহণ[সম্পাদনা]

হিজরী পঞ্চম সনে খন্দক যুদ্ধের বছর ইসলাম গ্রহণ করেন এবং ঐ বছরই মক্কা থেকে মদীনায় হিজরাত করে মুহাম্মাদ(সাঃ) সাহচর্যে অবস্থান করতে থাকেন।[২][৩]

তিনি হুদাইবিয়া অভিযানে মুহাম্মাদ(সঃ) এর সফরসঙ্গী হয়ে বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণ করেন করেন । হুদাইবিয়ার সময় কুরাইশরা মক্কায় প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করে।[৪] কুরাইশ পক্ষে মুগীরার চাচা উরওয়া ইবনে মাসউদ আস সাকাফী মুহাম্মাদের সাথে আলোচনার জন্য আসে। তখন মুগীরা ইবনে শুবা মুহাম্মাদের পিছনে সশস্ত্র অবস্থায় দণ্ডায়মান ছিলেন ।[৫][৬]

হুদাইবিয়ার পর তিনি একাধিক অভিযানে অংশগ্রহণে করেন। মুহাম্মদ(সাঃ) একটি বিশেষ বাহিনীর সাথে তাকে ও আবু সুফিয়ান ইবনে হার্বকে তায়েফে পাঠান। তারা বীরত্ব তায়েফ অভিযানে সফল হন ।

মুহাম্মদের শেষ জীবনে[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ(সঃ) এর মৃত্যুর পর তার দাফন-কাফনের সময় মুগীরা উপস্থিত ছিলেন।এবং তিনিই মুহাম্মদের কবর থেকে সর্বশেষে উঠেন । (তাবাকাত)

রাশিদুন খিলাফতের আমলে[সম্পাদনা]

আবু বকরের যুগে[সম্পাদনা]

মুহাম্মদের মৃত্যুর পর প্রথম দুই খলীফার যুগে অধিকাংশ যুদ্ধে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আবু বকরের নির্দেশে সর্বপ্রথম তিনি ‘বাহীরা’ অভিযানে যান। ইয়ামামার ধর্মত্যাগীদের নির্মূল করার ব্যাপারেও তিনি অংশগ্রহণ করেন।

ইয়ামামার যুদ্ধে ভণ্ড নবীদের বিদ্রোহ দমনের পর তিনি ইরাক অভিযানে অংশগ্রহণ করেন। ‘

পারস্য অভিযান[সম্পাদনা]

বুয়াইব’ বিজয়ের পর মুসলিম বাহিনী কাদেসিয়ার দিকে অগ্রসর হলে পারস্য সেনাপতি বীর রুস্তম মুসলমানদের আলোচনার প্রস্তাব করেন। মুসলমান বাহিনী আলোচনার প্রস্তাবে রাজি হয় এবং সর্বশেষ আলোচনার জন্য যান মুগীরা ইবনে শুবা । মুগীরা রুস্তমের সঙ্গে অনেক সময় ধরে আলোচনা করে করে মীমাংসা-সিদ্ধান্ত না করতে পারলে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পরে ।[৭]

নাহাওয়ান্দের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

১৯ হিজরী অর্থাৎ ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে কাওমাস ও ইসপাহানবাসীরা শাহানশাহ ইয়াজদগিরদ এর সাথে যোগাযোগ করে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ৬০ হাজার সৈন্যের এক বাহিনী গড়ে তোলে।

আম্মার ইবনে ইয়াসির খলীফা উমরকে বিষয়টি জরুরী ভিত্তিতে অবহিত করেন। উমর বসরা ও কুফার শাসনকর্তাকে নিজ বাহিনী নিয়ে নাহাওয়ান্দের দিকে অগ্রসর হতে নির্দেশ দেন । এবং তিনি নুমান ইবন মুকরিনকে সেনাপতি নিয়োগ দেন । এবং উমর ঘোষণা দেন, নুমান ইবনে মুকাররিন শহীদ হলে সেনাপতি হবে হুজাইফা ইবনে ইয়ামান,এ শহীদ হলে সেনাপতি হবে জারির ইবনে আব্দুল্লাহ আল বাজালী,এ শহীদ হলে সেনাপতি হবে মুগীরা ইবনে শুবা[৭]

মুসলিম সৈন্যরা নাহাওয়ান্দের নিকটে শিবির স্থাপন করলে পারস্য বাহিনী আবারো আলোচনার প্রস্তাব দেন । কিন্তু এবার মুগীরা ইবনে শুবা আলোচনার জন্য গেলে প্রথম বারের থেকে অধিক বাকবিতণ্ডা হয় এবং দুই দলই যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে ।

মুসলিম বাহিনীর বাম ভাগের দায়িত্বে নিয়োজিত করা হল মুগীরা ইবনে শুবাকে। নাহাওয়ান্দের এই যুদ্ধে নুমান ইবনে মুকাররিন শাহাদত বরণ করেন এবং পারস্য বাহিনী পরাজয় বরণ করে।[৮]

হামদান অভিযান[সম্পাদনা]

নাহাওয়ান্দের পর বিভিন্ন অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন বাহিনী পাঠিয়ে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়। হামদান অভিযানের সার্বিক দায়িত্ব মুগীরার ওপর অর্পিত হয়। তিনি সাফল্যের সাথে তিনি হামদানবাসীদের পরাজিত করে তাদেরকে সন্ধি করতে বাধ্য করেন। ইয়ারমুকের যুদ্ধেও তিনি যোগ দেন। এ যুদ্ধে তিনি চোখে মারাত্মক আঘাত পান।[৯][১০]

উমরের যুগে[সম্পাদনা]

বসরা শহর পত্তনের পর খলিফা উমর তাকে সেখানকার শাসক হিসেবে নিয়োগ করেন। তিনি বসরার ওয়ালী থাকাকালীন অনেক নিয়ম-পদ্ধতি চালু করেন। সৈনিকদের বেতন-ভাতা ইত্যাদি দেওয়ার জন্য সর্বপ্রথম বসরায় একটি পৃথক দফতর প্রতিষ্ঠা করেন ।[৯] কিছুদিন পর তার চরিত্রের দোষারোপের কারণে খলিফা উমার তাকে বসরার শাসক পদ থেকে বরখাস্ত করেন। তদন্তের পরে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন।[১১]

এ ঘটনার পর খলিফা উমার কুফার শাসক আম্মার ইবন ইয়াসিরের স্থলে মুগীরা ইবনে শুবাকে নিয়োগ দেন। উমারের খিলাফতের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এ পদে বহাল ছিলেন।

উসমানের আমলে[সম্পাদনা]

খলিফা উসমান তাকে পুনরায় উক্ত পদ থেকে বরখাস্ত করেন।[১২] তবে খলীফা উসমানকে মুগীরা ইবনে শুবা সবসময় সৎ পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতেন। এমনকি উসমান গৃহবন্ধি অবস্থায় থাকাকালীন সময় যুদ্ধ ঘোষণা অথবা গোপনে মক্কায় চলে যাওয়ার পরামর্শ দেন।[১৩]

আলীর যুগে[সম্পাদনা]

হযরত আলী ও মুয়াবিয়ার মধ্যে বিরোধ শুরু হলে প্রথম দিকে মুগীরা ইবনে শুবা আলীর পক্ষে ছিলেন এবং খলিফা আলীকে তালহাযুবাইরকে যথাক্রমে কুফা ও বসরার গভর্নর নিয়োগ করতে ও মুয়াবিয়াকে তার পূর্ব পদে বহাল রাখতে পরামর্শ দেন। কিন্তু আলী এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।[১৪] উসমানের হত্যার পর মুসলিম জাতির মধ্যে সংঘাত-সংঘর্ষ হয়, তিনি এসব সংঘর্ষ থেকে নিজেকে সযত্নে দূরে থাকেন।

কিন্তু সিফফিনে যুদ্ধের পর দুমাতুল জান্দালে সালিশী সমাধান করতে ব্যর্থ হলে মুগীরা মুয়াবিয়ার পক্ষ নেন এবং প্রকাশ্যে আলীর বিরোধিতা শুরু করেন ।[১৫][১৬] মুগীরা মুয়াবিয়া পক্ষ নিলে,মুগীরার তীক্ষ্ণ বুদ্ধি মুয়াবিয়ার খুব উপকারে আসে ।মুগীরা মুয়াবিয়াকে বিভিন্ন সময় পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেছেন । পারস্যের শাসক যিয়াদকে মুগীরা মুয়াবিয়ার অনুগত বানিয়ে সাহায্য করেন ।

হিজরী ৪১ সনে আমীর মুয়াবিয়া মুগীরা ইবনে শুবাকে কুফার শাসক হিসাবে নিয়োগ করেন। কুফার কিছু লোক বিদ্রোহ ঘোষণা করলে তিনি দক্ষতার সাথে সেই বিদ্রোহ দমন করেন।

হাদিস বর্ণনা[সম্পাদনা]

হাদীসের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত ১৩৩ টি হাদীস পাওয়া যায়। এরমধ্যে ৯টি বুখারী ও মুসলিম শরীফ উভয়ই (মুত্তাফাকুন আলাইহি) বর্ণনা করেছেন। এবং একটি বুখারী ও দুটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন।

বহু সাহাবী ও তাবেয়ী তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন।

তার তিন পুত্র -

উরওয়া ইবনে মুগীরা

হামযা ইবনে মুগীরা

আককার ইবনে মুগীরা

অন্যান্যের মধ্যে -

যুবাইর ইবনে ইয়াহয়িয়া

মিসওয়ার ইবনে মাখরাম

কায়েস ইবনে আবি হাযেম

মাসরূক ইবনে আজদা

নাফে ইবনে হুবায়রা

উরওয়া ইবনে যুবাইর

আমর ইবনে ওয়াহহাব প্রমুখ ব্যাক্তিবর্গ।

রাজনৈতিক বিচক্ষণতা[সম্পাদনা]

মুগীরা ইবনে শুবা একজন বিজ্ঞ কূটনীতিক ও রাজনৈতিক পরামর্শদাতা ছিলেন । তাকে আরবের প্রসিদ্ধ কূটনীতিকদের মধ্যে গণ্য করা হয়। ইমাম শাবী বলেন, আরবের বিজ্ঞ কূটনীতিক ব্যক্তি চারজন –

মুয়াবিয়া ইবন আবি সুফিয়ান,

আমর ইবনুল আস

মুগীরা ইবনে শুবা ও

যিয়াদ ।[১৭][১৮]

তার অনেক বিখ্যাত কূটনীতিক ইতিহাস রয়েছে । খলিফা উমরের সময়ে তার নামে অর্থ চুরির মামলা দায়ের করে বসরার শাসক থেকে বরখাস্ত করা হলে । তিনি অতি বিচক্ষনতার সাথে নিজেকে প্রমাণাদি নিয়ে নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে সক্ষন হন।[১৫]

সাহাবী নুমান ইবনে মুকাররিন মুগীরাকে বলেছেন, "তুমি বুদ্ধিমত্তা, পরামর্শদান ও সঠিক মতামতের অধিকারী ব্যক্তি"[১৯]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

মুগীরা ইবনে শুবা ৫০ হিজরিতে কুফায় প্লেগ রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।[২০]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. আল-ইসতিয়াব 
  2. (আল-ইসাবা-৩/৪৫২) 
  3. উসূদুল গাবা-৪/৪০৬ 
  4. (হায়াতুস সাহাবা-১/১০২) 
  5. (বুখারীঃ কিতাবুশ শুরুত ফিল জিহাদ ওয়াল মুসালিহা) 
  6. উসুদুল গাবা-৪/৪০৬ 
  7. (হায়াতুস সাহাবা-১/২২০, ২২২-২৩, ৩/৬৮৭-৯২) 
  8. (তারীখুল উম্মাহ আল-ইসলামিয়্যাহ-১/২০৯) 
  9. (আল-ইসাবা-৩/৪৫৩) 
  10. (উসুদুল গাবা-৪/৪০১) 
  11. (উসুদুল গাবা-৪/৪০৬) 
  12. (উসুদুল গাবা – ৪/৪০৭) 
  13. (হায়াতুস সাহাবা-২/৩৯৬) 
  14. (আল-ইসতিয়াব) 
  15. (আল-ইসাবা ৩/৪৫৩) 
  16. মুসতাদরিক-৩/৪৫০ 
  17. (উসুদুল গাবা-৪/৪০৭) 
  18. আল ইসাবা ৩/৪৫৩ 
  19. (হায়াতুস সাহাবা – ১/৫১২) 
  20. (বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – দ্বিতীয় খন্ড) 

টীকা[সম্পাদনা]

বই রেফারেন্সঃ

(বইঃ আসহাবে রাসূলের জীবনকথা – দ্বিতীয় খন্ড)

লেখকঃ ড. মুহাম্মাদ আবদুল মাবুদ