শ্রীলঙ্কা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(সিংহল থেকে পুনর্নির্দেশিত)
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন

স্থানাঙ্ক: ৭° উত্তর ৮১° পূর্ব / ৭° উত্তর ৮১° পূর্ব / 7; 81

গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী প্রজাতন্ত্র শ্রীলঙ্কা
ශ්‍රී ලංකා ප්‍රජාතාන්ත්‍රික සමාජවාදී ජනරජය (সিংহলি)
Srī Lankā Prajātāntrika Samājavādī Janarajaya
இலங்கை ஜனநாயக சோசலிச குடியரசு (তামিল)

Ilaṅkai jaṉanāyaka sosalisa Kudi Arasu
পতাকা Emblem
জাতীয় সঙ্গীত: "শ্রীলঙ্কা মাতা"
রাজধানীশ্রী জয়াবর্ধেনেপুরা কোট্টে
(প্রশাসনিক)

কলম্বো (বাণিজ্যিক)
বৃহত্তম শহর কলম্বো
সরকারি ভাষা
স্বীকৃত ইংরেজী
জাতিগোষ্ঠী(2012[২]) ৭৪.৯% সিংহলি
১১.২% শ্রীলঙ্কীয় তামিল
৯.২% মুর
৪.২% ভারতীয় তামিল
০.৫% অন্যান্য
ধর্ম
জাতীয়তাসূচক বিশেষণ শ্রীলঙ্কীয়
সরকার একক অর্ধ রাষ্ট্রপতি শাসিত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র
 •  রাষ্ট্রপতি মৈত্রীপাল সিরিসেন
 •  প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমসিংহ
 •  আইনসভার বক্তা দেশবন্ধু কারু জয়সুরিয়া
 •  প্রধান বিচারপতি প্রিয়সৎ দেব
আইন-সভা আইনসভা
 •  স্বায়ত্ত্বশাসন ২১শে মাঘ ১৩৫৪ বঙ্গাব্দ (৪ঠা ফেব্রুয়ারী ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ) 
 •  প্রজাতন্ত্র ৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৯ বঙ্গাব্দ (২২শে মে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দ) 
 •  সাম্প্রতিক সংবিধান ২১শে ভাদ্র ১৩৮৫ বঙ্গাব্দ (৭ই সেপ্টেম্বর ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দ) 
 •  মোট  কিমি (১২০তম)
 বর্গ মাইল
 •  জল/পানি (%) ৪.৪
জনসংখ্যা
 •  ২০১৬ আনুমানিক ২১২০৩০০০[৪] (৫৮তম)
 •  ২০১২ আদমশুমারি ২০২৭৭৫৯৭[৫] (৫৭তম)
 •  ঘনত্ব ৩০৯/কিমি (৪০তম)
/বর্গ মাইল
মোট দেশজ উৎপাদন
(ক্রয়ক্ষমতা সমতা)
২০১৭ আনুমানিক
 •  মোট $২৭৮.৪১৫ বিলিয়ন[৬]
 •  মাথা পিছু $১৩০১২[৬]
মোট দেশজ উৎপাদন (নামমাত্র) ২০১৭ আনুমানিক
 •  মোট $৮৪.০২৩ বিলিয়ন[৬]
 •  মাথা পিছু $৩৯২৭[৬]
জিনি সহগ (২০১০)৩৬.৪[৭]
মাধ্যম
মানব উন্নয়ন সূচক (২০১৬)বৃদ্ধি ০.৭৬৬[৮]
উচ্চ · ৭৩তম
মুদ্রা শ্রীলঙ্কা রুপি (LKR)
সময় অঞ্চল শ্রীলঙ্কা প্রমাণ সময় (ইউটিসি+৫:৩০)
তারিখ বিন্যাস
  • দিন-মাস-বৎসর
  • বৎসর-মাস-দিন
গাড়ী চালনার দিক বাম
কলিং কোড +৯৪
আইএসও ৩১৬৬ কোড LK
ইন্টারনেট টিএলডি
ওয়েবসাইট
www.gov.lk

শ্রীলঙ্কা (সিংহলি: ශ්‍රී ලංකාව, শ্রী লাংকাবা, তামিল: இலங்கை, ইলাংগাই) দক্ষিণ এশিয়ার একটি দ্বীপ রাষ্ট্র। এর সরকারি নাম গণতান্ত্রিক সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী শ্রীলঙ্কা১৯৭২ সালের আগে এই দ্বীপ সিলন নামেও পরিচিত ছিল। এর প্রশাসনিক রাজধানীর নাম শ্রী জয়াবর্ধেনেপুরা কোট্টে। এর প্রধান শহর কলম্বোভারতের দক্ষিণ উপকূল হতে ৩১ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত। ২ কোটি জনসংখ্যার এই দেশে ১৪% এর অধিক লোকজনের দৈনিক আয় ১.২৫ মার্কিন ডলারের নীচে। প্রাচীনকাল থেকেই শ্রীলঙ্কা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হিসেবে পরিচিত। সিংহলি সম্প্রদায় এই দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী। উত্তর-পূর্ব দিকের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নিয়ে তামিল সম্প্রদায় দেশের সর্ববৃহৎ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়। অন্যান্য সম্প্রদায়ের মধ্যে মূর, বার্ঘের, কাফির, মালয় ঊল্লেখযোগ্য। শ্রীলঙ্কা চা, কফি, নারিকেল, রাবার উৎপাদন ও রফতানিতে বিখ্যাত। নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সংবলিত সমুদ্রসৈকত, ভূদৃশ্য তদুপরী সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শ্রীলঙ্কাকে সারা পৃথিবীর পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

নামকরণ[সম্পাদনা]

প্রাচীনকাল থেকেই শ্রীলঙ্কা অনেক নামে পরিচিত হয়ে আসছে। প্রাচীন গ্রীক ভূগোলবিদগণ একে তপ্রোবান এবং আরবরা সেরেনদীব নামে ডাকত। ১৫০৫ খ্রিস্টাব্দে পর্তুগিজরা এই দ্বীপে পৌঁছে এর নাম দেয় শেইলাও যার ইংরেজি শব্দ হল Ceylon। ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশদের অধীনে থাকা অবস্থায় তারা এই নামেই পরিচিত ছিল। ১৯৪৮ সালে এই নামেই স্বাধীনতা পায় এবং পরে ১৯৭২ সালে দাপ্তরিক নাম পরিবর্তন করে রাখা হয়,‌‍‌‍‌‌মুক্ত, সার্বভৌম ও স্বাধীন প্রজাতন্ত্রী শ্রীলঙ্কা। শ্রীলঙ্কা নামটি এসেছে সংস্কৃত শব্দ "শ্রী" ও "লংকা" থেকে। শ্রী শব্দের অর্থ পবিত্র এবং লংকা অর্থ দ্বীপ।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

শ্রীলঙ্কান মুদ্রা, প্রথম শতাব্দী

প্রাচীনকাল থেকেই শ্রীলঙ্কা একটি গুরুত্বপুর্ণ সামুদ্রিক সৈকত ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে বণিকদের কাছে পরিচিত। মধ্যপ্রাচ্য, পারস্য, বার্মা, থাইল্যান্ড, মালয়শিয়া, ইন্দোনেশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ এখানে ব্যবসা করত। ১৫০৫ সালে পর্তুগীজরা সর্বপ্রথম এখানে পৌঁছায়। ১৭শ শতাব্দীর দিকে ডাচরা আসে যদিও ১৭৯৬ সালে দ্বীপটি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে চলে যায়। ১৮১৫ সালে ক্যান্ডি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে এলে সম্পূর্ণরূপে ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ইউরোপীয় উপনিবেশ এখানে চা, রাবার, চিনি, কফি এবং নীলের চাষ শুরু করে। তখন কলম্বোকে প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। তারা আধুনিক বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, রাস্তাঘাট এবং চার্চ তথা পশ্চিমা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিল। ১৯৩০ সালের দিকে স্থানীয়দের প্রতি ব্রিটিশদের নির্যাতন-অত্যাচারের জন্য স্বাধীনতার আন্দোলন শুরু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতার আন্দোলন জোরদার হতে থাকে। ১৯৪৮ সালের ৪ঠা ফেব্রুয়ারি সিলন নামে দেশটি স্বাধীনতা পায়। ১৯৬০ সালের ২১শে জুলাই শ্রীমাভো বন্দেরনায়েক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে কাজ শুরু করেন। তিনি ছিলেন সারা পৃথিবীর প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী১৯৭২ সালে শ্রীমাভো বন্দেরনায়েকের প্রধানমন্ত্রীত্বে সিলন থেকে শ্রীলঙ্কা নামকরণ করা হয়।

ভূগোল ও জলবায়ু[সম্পাদনা]

শ্রীলঙ্কা ইন্ডিয়ান প্লেটের উপর অবস্থিত যা পূর্বে ভারত-অস্ট্রেলিয়ান প্লেটের অংশ ছিল। শ্রীলঙ্কা ভারতমহাসাগরের উপর, বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। শ্রীলঙ্কাকে ভারতীয় উপমহাদেশের মূলভূমি অংশ থেকে পৃথক করা হয় মান্নার উপসাগরীয় অঞ্চল এবং পল স্ট্রেট দ্বারা। হিন্দু পৌরানিক কাহিনী অনুযায়ী রামের শাসন আমলে ভারতের মূল ভূমি থেকে রাম সেতু নামে একটি সংযোগ ছিল। ব্রিটিশ উপনিবেশের বর্ণনাকারীদের মতে ১৪৮০ সালের ঝড়ে ধ্বংস হবার আগে ইহা একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি ছিল। কেবল দক্ষিণ দিকের বেড়ে ওঠা পর্বতমালা ছাড়া দ্বীপটির বেশির ভাগ উপকূলীয় সমতল ভূমি। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২৫২৪ মিটার(৮২৮০ ফিট) উঁচু পিদুরুতালাগালা শ্রীলঙ্কার সর্বোচ্চ বিন্দু। শ্রীলংকায় ১০৩ টি নদী রয়েছে। এর মধ্যে দীর্ঘতম হল মহাভেলি নদী যা ৩৩৫ কিলোমিটার (২০৪ মাইল) বিস্তৃত।

শ্রীলঙ্কার গড় তাপমাত্রা ১৬ সে. যা গ্রীষ্মকালে সর্বোচ্চ ৩৩ সে.পর্যন্ত হতে পারে । দিন রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য ৪ থেকে ৭ সে.। সাধারণত দক্ষিণাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় আর্দ্রতা সবচেয়ে বেশি থাকে, কলম্বোর মত জায়গায় সারা বছর প্রায় ৭০% আর্দ্রতা থাকে, জুন মাসের দিকে মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে তা সর্বোচ্চ ৯০% পর্যন্ত হয়।

উদ্ভিদ ও প্রাণীজগত[সম্পাদনা]

শ্রীলংকা ইন্দোমালয়া ইকোজোনের মধ্যে থাকা বিশ্বের ২৫ টি জীববৈচিত্র্য হটস্পটগুলির মধ্যে একটি । শ্রীলংকায় এশিয়ার সর্বোচ্চ জীববৈচিত্র্য দেখতে পাওয়া যায় যদিও দেশটি আকারে অপেক্ষাকৃত ছোট। বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও প্রাণী উল্লেখযোগ্যভাবে দেখা যায় যেখানে ৩২১০ টি ফুলের উদ্ভিদের মধ্যে ২৭% উদ্ভিদ এবং ২২% স্তন্যপায়ী প্রাণী স্থানীয়। শ্রীলংকা ২৪ টি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণাগার ঘোষণা করেছে যাদের মধ্যে রয়েছে এশিয়ান হাতি, চিতাবাঘ, শ্লথ বিয়ার, অনন্য ছোট লরিস, বিভিন্ন ধরনের হরিণ, বিপন্ন বন্য শূকর, পোর্কিউপাইনস এবং ভারতীয় প্যাঙ্গলিন্স

অনুর্বর জাফনা উপদ্বীপে প্রচুর পরিমাণে বাবলা জন্মায়। শুষ্ক ভুমির গাছগুলির মধ্যে সাটিনউড, আবলুস, মেহগনি এবং সেগুন অত্যন্ত মূল্যবান প্রজাতি। আর্দ্র অঞ্চলটি একটি গ্রীষ্মমন্ডলীয় চিরহরিৎ বন যেখানে লম্বা গাছ, প্রশস্ত বৃক্ষপত্রাবলী, আঙ্গুর ও শাক লতাগুল্মের ঘন জঙ্গল দেখা যায়।

সরকার[সম্পাদনা]

শ্রীলঙ্কার সুপ্রীম কোর্ট, কলম্বো।

শ্রীলঙ্কার সংবিধান অনুযায়ী দেশটি গণতান্ত্রিক, সামজতান্ত্রিক, প্রজাতন্ত্রী হিসেবে পরিচিত হবে, দেশটিকে একেশ্বরবাদী রাষ্ট্রও বলা হয়েছে। সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে সংসদীয়রাষ্ট্রপতি শাসিত ব্যবস্থার সমন্বয়ে। শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রপতি একাধারে রাষ্ট্রপ্রধান, সামরিক বাহিনীর প্রধান প্রশাসক ও সরকার প্রধান এবং তিনি নির্বাচিত হন ছয় বছরের জন্য। রাষ্ট্রপতি দেশের সংসদ এবং ২২৫ সদস্যের আইন প্রণয়নকারী পরিষদের কাজে দায়বদ্ধ। রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত সংসদ সদস্যের মধ্য থেকে একজনকে মন্ত্রী সভার প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেন। প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতির ডেপুটি হিসেবে কাজ করেন এবং সংসদের সরকারি দলের নেতৃত্ব দেন। প্রতিটি জেলা হতে সংসদ সদস্যরা সার্বজনীন ভোটে নির্বাচিত হন। রাষ্ট্রপতি সংসদের একবছর কার্যক্রম অতিবাহিত হবার পর সংসদ স্থগিত অথবা সমাপ্তি ঘোষনা করতে পারেন। সংসদ সকল প্রকার আইন প্রণয়ন করার ক্ষমতা রাখে। শ্রীমাভো বন্দেরনায়েক শ্রীলঙ্কার নির্বাচিত প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী। তাঁর সুযোগ্যকন্যা চন্দ্রিকা কুমারাতুঙ্গা ১৯৯৪ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রপতি হবার আগে ১৯৯৪ সালের আগষ্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। মৈত্রীপাল সিরিসেনরানিল বিক্রমাসিংহে ৯ জানুয়ারি, ২০১৫ তারিখে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

কলোম্ব বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্র, কলোম্ব

চিনামন, রাবার, সিলন চা রপ্তানির জন্য শ্রীলঙ্কা বিখ্যাত। ইংরেজ শাসনের সময় স্থাপিত আধুনিক সমুদ্রবন্দর এই দ্বীপ দেশটিকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলেছে। শ্রীলঙ্কার আবাদভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা দেশের দারিদ্র্যতা ও অর্থনৈতিক অসমতাকে বৃদ্ধি করছে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত সমাজতান্ত্রিকতা সরকারের অর্থনীতিকে মারাত্মক প্রভাবিত করেছে। সে সময় উপনিবেশিক চাষাবাদ ভেঙ্গে পৃথক করা হয়েছে এবং শিল্প কলকারখানাকে জাতীয়করন করা হয়। যখন জীবনযাত্রার মান ও সাক্ষরতার হার উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়েছে তখন নিম্ম উৎপাদন হার ও কম বৈদেশিক বিনিয়োগের কারণে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ব্যাহত হয়েছে। ১৯৭৭ সালের পর শ্রীলংকার সরকার বেসরকারিকরণকে উৎসাহিত করেছে। যেহেতু চা, কফি, চিনি, রাবার এবং অন্যান্য কৃষি পণ্য উৎপাদন ও রপ্তানি সমহারে গুরুত্বপূর্ন ছিল তাই সরকারীভাবে খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরন, বস্ত্রশিল্প, টেলিযোগাযোগ এবং শিল্পভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি বিশেষ নজর দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালে কৃষিজাত পন্যের রিপ্তানি কমে দাড়ায় ২০% (যেখানে ১৯৭০ সালে ছিল ৯৩%) অপরদিকে বস্ত্র ও গার্মেন্টস ক্ষেত্রে বেড়ে দাড়ায় ৬৩%। ১৯৯০ এর দশকের শুরুর দিকে জিডিপি ছিল ৫.৫% যা ১৯৯৭-২০০০সালে দাড়ায় ৫.৩%। ২০০৩ সালে কলম্বো স্টক এক্সচেঞ্জ বিশ্বের সর্বোচ্চ উৎপাদনশীল হিসেবে নিজেদের প্রমাণ করায় এবং দক্ষিণ এশিয়ার সর্বোচ্চ মাথাপিছু আয়ের দেশ হল শ্রীলংকা।

রাজনীতি[সম্পাদনা]

শ্রীলঙ্কার রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রতিনিধিত্বমূলক গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় সংঘটিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকার প্রধান। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের উপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং আইনসভা উভয়ের উপর ন্যস্ত। শ্রীলঙ্কার রাজনীতি প্রধানত সাবেক রাষ্ট্রপতি মহিন্দ রাজাপক্ষের বামপন্থী শ্রীলঙ্কা ফ্রিডম পার্টি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমসিংহের ডানপন্থী ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। তাছাড়াও কিছু বৌদ্ধধর্মাবলম্বী, সমাজতান্ত্রিক এবং তামিল জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল আছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক[সম্পাদনা]

শ্রীলঙ্কা যদিও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে তেমন তৎপর নয় । এই দেশের পাসপোর্টে ১৬টি দেশে বিনা ভিসায় ভ্রমণ করা যায়, যা পাসপোর্ট শক্তি সূচকে ৮৪তম স্থানে রয়েছে।[৯] এদেশ বহুদেশীয় সংস্থা যেমন জাতিসংঘের সাথে যুক্ত। নিজের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং উন্নয়ন বেগবান করাই এসকল সংস্থায় যোগদানের মুল উদ্দ্যেশ্য। তাছাড়াও কমনওয়েলথ,সার্ক, বিশ্ব ব্যাংক, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন তহবিল, এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক এবং কলম্বো পরিকল্পনার সদস্য দেশ।

সামরিক বাহিনী[সম্পাদনা]

প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের অন্তর্গত শ্রীলঙ্কার সামরিক বাহিনী সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী এই তিন শক্তির সমন্বয়ে গঠিত। এখন পর্যন্ত দেশটিতে কখনই সামরিক শাসন জারি হয়নি যদিও স্বেচ্ছায় যোগদান করা ২৩০,০০০ জন সক্রিয় সামরিক সদস্য রয়েছে। সামরিক বাহিনীকে সহয়তা করার জন্য প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আরো দুটি আধাসামরিক বাহিনী আছে: স্পেশাল টাস্ক ফোর্সসিভিল ডিফেন্স ফোর্স।২০০৯ সালের ১০ আগষ্ট পর্যন্ত কোন কোস্ট গার্ড বাহিনী ছিল না, শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনী তাদের কাজ করত। ১৯৪৮ সালে যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাবার পর থেকেই সামরিক বাহিনীর প্রধান কাজ ছিল অভ্যন্তরীন নিরাপত্তা বজায় রাখা। যার বেশির ভাগটা জুড়ে আছে এলটিটিইএর সাথে দীর্ঘ ৩০ বছরের যুদ্ধ। ২০০৯ সালের ১৮ মে এলটিটিই প্রধান ভিলুপিল্লাই প্রভাকরনের মৃত্যুর মাধ্যমে এই যুদ্ধের সমাপ্তি হয়েছে বলে সামরিক বাহিনী দাবী করে আসছে।

জনউপাত্ত[সম্পাদনা]

Sri Lanka religiosity (Pew Research)[১০]
religion percent
বৌদ্ধ
  
৭০%
হিন্দু
  
১৩%
ইসলাম
  
১০%
খ্রিস্ট
  
৭%
Other
  
০.০৪%
Source: Census of Population and Housing, 2011[৩]

শিক্ষা ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

উন্নয়নশীল দেশের মধ্যে শ্রীলঙ্কা সর্বোচ্চ সাক্ষর জনসংখ্যার একটি দেশ, যার সাক্ষরতার হার ৯২% এবং ৮৩% মানুষ মাধ্যমিক শিক্ষায় শিক্ষিত। শিশুদের ৯ বছর মেয়াদী বিদ্যালয়ের প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামুলক করা হয়েছে। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. সি. ডব্লিউ. ডব্লিউ কান্নানগারা কর্তৃক ১৯৪৫ সালে প্রণীত অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থা এ দেশের সাক্ষরতায় বিরাট অবদান রাখে। তিনি শ্রীলঙ্কার প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারের লক্ষে একটি করে মাধ্যমিক মহা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। ১৯৪২ সালে বিশেষ শিক্ষা কমিটি একটি যোগ্য ও মানসম্মত শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য প্রস্তাব করে। বেশির ভাগ বিদ্যালয়ে গ্রেড ১ থেকে ১৩ পর্যন্ত পাঠদান ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত ও’লেভেল এবং এ’লেভেল পরীক্ষা যথাক্রমে ১১ এবং ১৩ গ্রেডে অনুষ্ঠিত হয়। বেশির ভাগ বিদ্যালয় ব্রিটিশ বিদ্যালয়ের ধাঁচে গড়ে তোলা হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি অনেক আন্তর্জাতিক মানের বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। শ্রীলঙ্কায় প্রায় ১৬টি সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। তার মধ্যে কলোম্ব বিশ্ববিদ্যালয়, পেরাদেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, কেলানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, জয়াবর্ধনপুরা বিশ্ববিদ্যালয়, জাফনা বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম।

শ্রীলঙ্কা ইন্সটিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি।

যোগাযোগ ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

শ্রীলঙ্কায় পরিবহন ক্ষেত্রে ব্যবহৃত GM EMD G12 - ALBERTA লোকোমোটিভ

শ্রীলঙ্কার বেশির ভাগ শহরের মধ্যেই রেলওয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপিত হয়েছে জাতীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে। ১৯৮৭ সালের ২৬শে এপ্রিল প্রথম রেলওয়ে লাইন স্থাপিত হয়েছিল কলম্বোক্যান্ডির মধ্যে। শ্রীলঙ্কার মোট সড়কের পরিমাণ ১১,০০০কিমি (৬,৮৪০মাইল) যার বেশির ভাগই পাকা সড়ক। জাতীয় অর্থনীতিকে সচল রাখতে এবং দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থাকে উন্নত করতে সরকার অনেক রাজপথ নির্মাণ করার কর্মসূচী হাতে নিয়েছে। তার মধ্যে কলম্বো-কতোনায়েক, কলম্বো-ক্যান্ডি, কলম্বো-পেডিনা এবং অন্যান্য শহরের মধ্যবর্তী সংযোগ সড়ক কলম্বোর যানজট কমানোর জন্য। ভারতের চেন্নাই ও জাফনার মধ্যবর্তী সংযোজ সেতু করার পরিকল্পনা সরকারের আছে। শ্রীলঙ্কার ৪৩০ কিমি অন্তবর্তী জল যোগাযোগ রয়েছে। শ্রীলঙ্কার ১২টি পাকা বিমান বন্দর এবং দুইটি সাধারণ বিমান উড্ডয়ন ও অবতরন কেন্দ্র রয়েছে। দেশটি তার গভীর সমুন্দ্রবন্দরের জন্য সারা বিশ্বে পরিচিত তার মধ্যে কলম্বো, ত্রিকামেলি ও গল অন্যতম।

ভাষা[সম্পাদনা]

সিংহলী এবং তামিল শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রীয় ভাষা। শতকরা ১০ ভাগ লোক ইংরেজিতে সার্বক্ষণিক কথা বলে এবং শিক্ষা, গবেষণা ও ব্যবসায়িক কাজে ইংরেজি ভাষার ব্যবহার অনেক বেশি। বার্ঘার সম্প্রদায়ের লোকজন পর্তুগিজ ও ডাচ ভাষা ভিন্ন উচ্চারণে বলে থাকে। অন্যদিকে মালয় সম্প্রদায়ের লোকজন মালয়ের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে থাকে। শ্রীলঙ্কার ৭০% মানুষ বৌদ্ধ, ১৫% হিন্দু ও ৭.৫% ইসলাম ধর্মাবলম্বী।

গণমাধ্যম[সম্পাদনা]

জাতীয় বেতার কেন্দ্র, সিলন বেতার এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন বেতার কেন্দ্র। ১৯২৩ সালে এডওয়ার্ড হার্পার কর্তৃক এই কেন্দ্রটি স্থাপিত হয় এবং প্রতিবেশী দেশগুলোতে এর ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। শ্রীলংকা ব্রড কাস্টিং কর্পোরেশনের অধীনে এই কেন্দ্র হতে সিংহলী, তামিল, ইংরেজি ও হিন্দী ভাষায় অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। ১৯৮০ সাল থেকে অনেক বেসরকারি বেতার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয় এবং তারা বানিজ্যিক জনপ্রিয়তা ও সাফল্য পায়। ইনডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশন নেটওয়ার্ক নামে ১৯৭৯ সালে সর্বপ্রথম টেলিভিশন সম্প্রসারণ শুরু হয়। ১৯৯২ সালে বেসরকারী টেলিভিশন সংস্থা চালুর আগে টেলিভিশন সম্প্রচার সম্পূর্ণ সরকার নিয়ন্ত্রিত ছিল। বহুল প্রচলিত ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার মধ্যে ডেইলি মিরর, দ্যা সানডে অবজার্ভার এবং দ্যা সানডে টাইমস উল্লেখযোগ্য।

খেলাধূলা[সম্পাদনা]

এসসিসি মাঠে শ্রীলংকা এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে অনুষ্ঠিত ক্রিকেট ম্যাচ, র্মাচ ২০০১।

যদিও শ্রীলংকার জাতীয় খেলা ভলিবল তবুও ক্রিকেট এখানে সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয়। অন্যান্য খেলার মধ্যে রাগবি, ফুটবল, আথলেটিক্স,টেনিস ও নানা রকম জলক্রীড়া প্রচলিত। ক্রিকেটে ১৯৯০ সাল থেকে শুরু করে শ্রীলংকা ক্রিকেট দল অনেক উল্লেখযোগ্য জয় পেয়েছে। তার মধ্যে রয়েছে ১৯৯৬ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ, ১৯৯৬২০০৪ সালের এশিয়া কাপ এবং ২০০৭ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের রানার্সআপ। শ্রীলংকার সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত বিভিন্ন খেলার আয়জন করা হয়। এখানে কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের খেলার মাঠ রয়েছে।শ্রীলংকা ১৯৯৬ সালে পাকিস্তানভারতের সাথে ক্রিকেট বিশ্বকাপের আয়জক ছিল এবং তারা ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপ আয়জক দেশ।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Department of Official Languages" 
  2. "South Asia ::SRI LANKA"। CIA The World Factbook। 
  3. "Sri Lanka Census of Population and Housing, 2011 – Population by Religion" (PDF)। Department of Census and Statistics, Sri Lanka। ২০ এপ্রিল ২০১২। 
  4. Department of Census and Statistics Sri Lanka
  5. "Census of Population and Housing 2011 Enumeration Stage February – March 2012" (PDF)Department of Census and Statistics – Sri Lanka। ৬ ডিসেম্বর ২০১৩ তারিখে মূল (PDF) থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১৫ জুলাই ২০১৪ 
  6. "World Economic Outlook Database, October 2016"International Monetary Fund। সংগ্রহের তারিখ ২০ মে ২০১৭ 
  7. "Gini Index"। World Bank। সংগ্রহের তারিখ ২ মার্চ ২০১১ 
  8. "2016 Human Development Report Statistical Annex" (PDF)। United Nations Development Programme। ২০১৬। পৃষ্ঠা 211। সংগ্রহের তারিখ আগস্ট ১২, ২০১৬ 
  9. "Passport Power" 
  10. Pew Research Center's Religion & Public Life Project: Sri Lanka. Pew Research Center. 2010.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

  1. সরকারী ওয়েব
  2. শ্রীলংকা:ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক
  3. শ্রীলংকা: Open Directory Project
  4. উইকিমিডিয়া অ্যাটলাসে শ্রীলংকা
  5. ভ্রমণ গাইড