মানুষ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মানুষ
সংরক্ষণ অবস্থা
বৈজ্ঞানিক শ্রেণীবিন্যাস
জগৎ: প্রাণী জগৎ
পর্ব: কর্ডাটা
শ্রেণী: স্তন্যপায়ী
বর্গ: প্রাইমেট
পরিবার: হোমিনিডae
উপপরিবার: Homininae
গোত্র: Hominini
গণ: Homo
প্রজাতি: H. সেপিয়েন্স
ট্রাইনোমীল নাম
Homo sapiens sapiens
লিনীয়াস, 1758

মানুষ (Homo sapiens, primarily ssp. Homo sapiens sapiens) হল প্রাইমেট গণভুক্ত একটি স্তন্যপায়ী প্রাণী। এরা দুপায়ে ভর দিয়ে চলে এবং দলবদ্ধভাবে সামাজিক জীবন যাপন করে। জটিল ও বিশদ ভাষার ব্যবহার এদেরকে প্রাণীজগতের মধ্যে স্বকীয় করে তুলেছে।

উৎপত্তি[সম্পাদনা]

আরো দেখুন: মানব বিবর্তন

মানুষের বিবর্তন সম্পর্কে নানা নৃতাত্ত্বিক মতবাদ আছে। খুব সম্ভবত আজকের সব মানুষ একই উৎস থেকে উদ্ভূত হয়ে পরে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল। মানুষের খুব নিকটাত্মীয় কিন্তু ভিন্ন উৎসজাত অন্যান্য শাখাগুলি অতীতে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় আজ শিম্পাঞ্জীগরিলা মানুষের নিকটতম আত্মীয়।

বিবর্তন তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ আর পৃথিবীর বুকে চড়ে বেড়ানো অন্যান্য নরবানরেরা অনেক অনেককাল আগে একই পূর্বপুরুষ থেকে উদ্ভূত হয়ে বিবর্তিত হয়েছে এবং আলাদা আলাদা ধারা বা লিনিয়েজ তৈরি করেছে। সে হিসেবে আমরা আধুনিক নরবানরগুলোর সাথে সম্পর্কযুক্ত হলেও সরাসরি উত্তরসূরী নই। আমরা আসলে এসেছি বহুদিন আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক ধরনের সাধারণ পূর্বপুরুষ হিসেবে কথিত প্রাইমেট থেকে। বানর থেকে মানুষের উদ্ভব হয়নি, বরং সঠিকভাবে বলতে গেলে বলা যায় যে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে মানুষ প্রজাতিরও উদ্ভব ঘটেছে বহুদিন আগে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া এক ধরনের প্রাইমেট থেকে। শিম্পাঞ্জি, গরিলা এবং ওরাং ওটাং-এর মতো প্রাণীকূলেরও উদ্ভব ঘটেছে সেই একই সাধারণ পূর্বপুরুষ থেকে। প্রাণের বিকাশ এবং বিবর্তনকে একটা বিশাল গাছের সাথে তুলনা করা যায়। একই পূর্বপূরুষ থেকে উদ্ভূত হয়ে বিবর্তনীয় জাতিজনি বৃক্ষের বিভিন্ন ডাল পালা তৈরি হয়েছে । এর কোন ডালে হয়তো শিম্পাঞ্জির অবস্থান, কোন ডালে হয়ত গরিলা আবার কোন ডালে হয়ত মানুষ। অর্থাৎ, একসময় তাদের সবার এক সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিলো, ১.৪ কোটি বছর আগে তাদের থেকে একটি অংশ বিবর্তিত হয়ে ওরাং ওটাং প্রজাতির উদ্ভব ঘটে। তখন, যে কারণেই হোক, এই পূর্বপুরুষের বাকি জনপুঞ্জ নতুন প্রজাতি ওরাং ওটাং এর থেকে প্রজননগতভাবে আলাদা হয়ে যায় এবং তার ফলে এই দুই প্রজাতির বিবর্তন ঘটতে শুরু করে তাদের নিজস্ব ধারায়। আবার প্রায় ৯০ লক্ষ বছর আগে সেই মুল প্রজাতির জনপুঞ্জ থেকে আরেকটি অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং পরবর্তিতে ভিন্ন ধারায় বিবর্তিত হয়ে গরিলা প্রজাতির উৎপত্তি ঘটায়। একইভাবে দেখা যায় যে, ৬০ লক্ষ বছর আগে এই সাধারণ পুর্বপুরুষের অংশটি থেকে ভাগ হয়ে মানুষ এবং শিম্পাঞ্জির বিবর্তন ঘটে। তারপর এই দুটো প্রজাতি প্রজননগতভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তখন থেকেই একদিকে স্বতন্ত্র গতিতে এবং নিয়মে মানুষের প্রজাতির বিবর্তন ঘটতে শুরু করে, আর ওদিকে আলাদা হয়ে যাওয়া শিম্পাঞ্জির সেই প্রজাতিটি ভিন্ন গতিতে বিবর্তিত হতে হতে আজকের শিম্পাঞ্জিতে এসে পৌঁছেছে।

ব্যুৎপত্তি[সম্পাদনা]

মানুষ শব্দটি এসেছে "মনুষ্য" বা "মানব" শব্দের অপভ্রংশ হিসাবে।

"মানুষ" শব্দের বিভিন্ন অর্থ[সম্পাদনা]

বিশেষ্য[সম্পাদনা]

  1. মানব জাতি
  2. একজন অনুভূতিশীল ব্যক্তি
  3. পরিণত বা প্রাপ্তবয়স্ক

ক্রিয়াপদ[সম্পাদনা]

  1. মানুষ করা = লালন-পালন (উপযুক্ত শিক্ষাদানও এরই অঙ্গ)
  2. মানুষ হওয়া =
  • পরিণত-মনষ্ক হওয়া
  • স্বাবলম্বী (উপার্জন-ক্ষম) হওয়া

সমার্থক শব্দ[সম্পাদনা]

মানব, মনুজ, মনুষ্য, মনিষ্যি, নর, লোক, জন,ব্যক্তি।

বিপরীত অর্থ[সম্পাদনা]

যখন মানুষ = অনুভুতিশীল, বিপরীত: অমানুষ, (বিশেষণ: অমানবিক= অমানুষিক )

যখন মানুষ = মানব জাতি, বিপরীত: না-মানুষ, মানষ্যেতর (ইতর=ভিন্ন)

যখন মানুষ = পরিণত বা প্রপ্তবয়স্ক, বিপরীত: ছেলেমানুষ (অপরিণত, শিশু)

যখন মানুষ = পুরুষ, স্ত্রীলিঙ্গ: মানুষী, মেয়েমানুষ (মানবী, নারী) (কদাচিৎ ব্যবহৃত; হলে মানুষ-মানুষী যুগ্ম ভাবে )

মানব জাতি[সম্পাদনা]

পায়োনীয়ার মহাকাশযানে প্রেরীত তাম্রফলক-লিখন

প্রাণীবিদ্যা অনুসারে মানুষ (অর্থাৎ আমরা) শিম্পাঞ্জীদের নিকটাত্মীয় একরকম দ্বিপদ স্তন্যপায়ী প্রাণী। মানব জাতি সম্পর্কিত গবেষণা এক বিশেষ বিষয় যার নাম নৃতত্ত্ব.

প্রাণীবিদ্যা বিভাগীয় অবস্থান[সম্পাদনা]

রাজ্য
Kingdom
পর্ব
Phylum
শ্রেণী
Class
বর্গ
Order
পরিবার
Family
গোত্র
Tribe
গণ
Genus
প্রজাতি
Species
প্রাণী
Animalia
কর্ডাটা
কর্ডাটা
স্তন্যপায়ী
Mammalia
প্রাইমেট
Primate
হোমিনিডে
Hominidae
হোমিনিনি
Hominini
হোমো
homo
সেপিয়েন্স
sapiens
বৈজ্ঞানিক নাম: হোমো সেপিয়েন্স
Homo sapiens

সামাজিক বিবর্তন[সম্পাদনা]

অন্যন্য বাঁদর জাতীয় স্তন্যপায়ীর মত মানুষও সাধারণতঃ দলবদ্ধ-ভাবে থাকে। কিন্তু মানুষের স্থায়ী বসতি প্রতিষ্ঠা অপেক্ষাকৃত নতুন (১৫ হাজার বছরর কম)। প্রাইমেটকে বানরের শব্দার্থ হিসেবে বিবেচনা করলে এটা স্বীকার করতেই হবে যে, মানুষও একধরনের প্রাইমেট বা বানর জাতীয় প্রানী বৈ কিছু নয়। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে মাঙ্কি একটি অধিবর্গ বা প্যারাফাইলেটিক গ্রুপ, আধুনিক ফাইলোজেনেটিক্সে প্যারাফাইলেটিক গ্রুপ শক্তভাবে এড়িয়ে চলা হয়। আমরা কোন মাঙ্কি অবশ্যই নই, তবে অবশ্যই অবশ্যই আমরা প্রাইমেট। আমাদের পাশাপাশি অবস্থিত একজোড়া চোখ, ত্রিমাত্রিক, রঙ্গীন, স্টেরিও দৃষ্টি, চোখের পেছনে বিশাল বড় একটা মাথা, আড়াই শত দিনের কাছাকাছি গর্ভকালীন সময়, বয়ঃপ্রাপ্ত হবার পূর্বে একটা অস্বাভাবিক রকম বিশাল শৈশব, ল্যাটেরাল থেকে ক্রমান্বয়ে স্ক্যাপুলার ডোর্সাল অক্ষে পিছিয়ে যাওয়া (regression), পেন্ডুলার পিনেস এবং টেস্টস, অস্বাভাবিক বিকাশপ্রাপ্ত প্রাইমারি সেন্সরি কর্টেক্স আমাদের বানায় বানরজাতীয় জীব বা প্রাইমেট, এটা আমরা পছন্দ করি আর নাই করি। মানুষ সহ সব বনমানুষই স্তন্যপায়ী প্রানীর অন্তর্গত প্রাইমেট বর্গে পড়েছে। এখন পর্যন্ত প্রাইমেটদের দু'শরও বেশি প্রজাতির সন্ধান বিজ্ঞানীরা পেয়েছেন। মানুষকে এই প্রাইমেট বর্গের মধ্যে হোমিনিডি অধিগোত্রের অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচনা করা হয়।

ভাষার আবির্ভাব[সম্পাদনা]

মানুষের বুদ্ধির উন্নতি মানুষের জটিল ভাষা ব্যবহার করার ক্ষমতার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত।তাই এরা আজ আধুনিক সভ্যতা আবিস্কার করতে পেরেছে।

শারীরিক গঠন ও প্রক্রিয়া বিবর্তন[সম্পাদনা]

চার পায়ের বদলে দুই পায়ে চলতে আরম্ভ করার সাথে সাথে মানব শরীর-গঠন ও শরীর-প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে নানা পরিবর্তন দেখা দিতে আরম্ভ করে। যেমন পেটের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলিকে নীচে পড়ে যাওয়ার থেকে রক্ষা করার জন্য শ্রোণীচক্রের (Pelvic girdle) ব্যাস (diameter) ছোট হয়। বাচ্চার জন্মের পথ সরু হয়ে যাওয়াতে গর্ভে মস্তিষ্ক বৃদ্ধি সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই বাচ্চাকে ভূমিষ্ঠ হতে হয়। তার ফল সদ্যোজাত মানবশিশু শারীরিক ও মানসিকভাবে পরনির্ভরশীল। তাকে বহুদিন মা-বাবা ও অন্যান্যদের অভিভাবকত্বে বড় হতে হয়। এখানে ভাষার অবদান গুরত্বপূর্ণ। মুখ ও গলার গঠনে পরিবর্তন হওয়ার কারণে মানুষ অনেক জটিল মনোভাব আদানপ্রদানে সক্ষম হয়। মানুষের উদ্বর্তনের সবথেকে মূল্যবান উপহার মস্তিষ্কের উন্নতি। মানুষের মস্তিষ্ক প্রাণীরাজ্যে বৃহত্তম না হলেও আপেক্ষিকভাবে বৃহত্তরদের অন্যতম। মানুষ জন্মাবার বহুবছর অবধি স্নায়ুতণ্ত্রের বিকাশ অব্যহত থাকে। অন্যান্য মানুষদের সঙ্গে ভাষা ও ভঙ্গীর সাহায্যে ভাব বিনিময় করতে করতে বহু আচার-ব্যবহার অধীকৃত হয়, যা জন্মগত ভাবে (জীনের মাধ্যমে) সহজে বর্তায়না। দলবদ্ধ সমাজব্যবস্থাও এতে উপকৃত হয়। কিছু বিশেষজ্ঞের মতে বয়স্কা মহিলদের মাসিকবন্ধ হয় তথা রজোনিবৃত্তি ঘটে বলে তাদের ভুমিকা মায়ের বদলে দিদিমায় উপনীত হয়[১], ফলে তাদের দুই প্রজন্ম পরের মানবশিশুদেরও সুরক্ষা বর্ধিত হয়, শিক্ষা ত্বরান্বিত হয়। মানুষই একমাত্র প্রাণী যাদের বয়ঃসন্ধিরজোনিবৃত্তি আছে।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Global Mammal Assessment Team (2008). Homo sapiens. In: IUCN 2009. IUCN Red List of Threatened Species. Version 2009.2. <www.iucnredlist.org>. Downloaded on 03 March 2010.