বিষয়বস্তুতে চলুন

বোধিবৃক্ষ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

এ বৃক্ষের নীচে বা ছায়াতলে বসে রাজ সন্ন্যাসী সিদ্ধার্থ সাধনা করে বোধিজ্ঞান বা বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন বলে এ বৃক্ষকে বৌদ্ধরা গৌরব করে অশ্বত্থ বৃক্ষ না বলে বোধি বা জ্ঞানবৃক্ষরূপে আখ্যায়িত করেছে।

বুদ্ধ তিন প্রকারের চৈত্যের কথা উল্লেখ করেছেন। সেগুলি হল পারিভৌগিক চৈত্য, উদ্দেশিক চৈত্য ও শারীরিক চৈত্য। বুদ্ধের দেহাবশেষকে শারীরিক চৈত্য বলা হয়। বুদ্ধের উদ্দেশ্যে নির্মিত স্তুপাদিকে উদ্দেশিক চৈত্য বলা হয়। যে বস্তু সমূহ বুদ্ধ তাঁর জীবনে ব্যবহার করেছেন সেগুলোকে পারিভৌগিক চৈত্যরূপে পরিগণিত হয়। বোধিবৃক্ষের ছায়া, অক্সিজেন গ্রহণ করে তথাগত ধ্যান করে বুদ্ধত্বজ্ঞান লাভ করেছেন বলে বোধিবৃক্ষ পারিভৌগিক চৈত্যরূপে অভিহিত হয়।

বুদ্ধত্ব লাভ করার পর তথাগত বুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে পুরা সাতদিন দাঁড়িয়ে বোধিবৃক্ষের দিকে অপলক নেত্রে তাকিয়ে বোধি বৃক্ষকে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিলেন এ বৃক্ষ তাঁকে ছায়া ও অক্সিজেন দান করেছিলেন বলে। একটা বৃক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন পৃথিবীর ইতিহাসে ইহা একটি বিরল ঘটনা।

বুদ্ধগয়ার ধরণীতে ধম্ম তরঙ্গকে পল্লবিত করতে বোধি বৃক্ষ এখনও বিদ্যমান রয়েছে।

তথাগত বুদ্ধ সে স্থানেই যেখানে আজও বজ্রাসন বিরাজমান আছে তথায় সম্যক সম্বোধি প্রাপ্ত করেছিলেন। সম্যক সম্বোধি প্রাপ্ত করে তথাগত বোধিবৃক্ষের নীচে ছায়াতলে বজ্রাসনে বসে এক সপ্তাহ পর্য্যন্ত সম্বোধি জ্ঞানের অপরিমিত সুখ অনুভব করেছিলেন। দ্বিতীয় সপ্তাহ অনিমেষ লোচনে বোধিবৃক্ষের দিকে দাঁড়িয়ে অপলক নেত্রে তাকিয়ে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। যে কারণে বুদ্ধের অনুসারিরা বোধি বৃক্ষকে সর্বদা বন্দনা করি।

তিনি যে বৃক্ষের নীচে বসে সাধনা করে সম্বোধি লাভ করেন তা হল অশ্বত্থ বা পিপল বৃক্ষ। তথাগতের জ্ঞান বা বোধি লাভের কারণে এ পিপল বৃক্ষকে বুদ্ধের অনুসারিরা বোধি বৃক্ষ বলে থাকি। বর্তমানে বুদ্ধগয়ার মহাবোধি মহাবিহারের পশ্চাতে দাঁড়িয়ে থাকা বৃক্ষ হল মূল বোধিবৃক্ষের চতুর্থ বংশধর।

মূল বোধি বৃক্ষের পূজা- বন্দনা করার পরে মহান সম্রাট অশোক খ্রীষ্ট পূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে এ মহাবোধি চৈত্য নির্মাণ করিয়েছিলেন। এখনও এ মহাবিহার সম্রাট অশোকেরই মহান স্মৃতি বহন করে। কলিঙ্গ যুদ্ধ বিজয় করে শান্তির অন্বেষার সম্রাট অশোক বুদ্ধের শরণাপন্ন হন। তিনি শান্তির খোঁজে প্রায়ই বোধি বৃক্ষের নীচে এসে ধ্যান মগ্ন থাকতেন। ইহা তাঁর দ্বিতীয় রাণী তিষ্যরক্ষিতার পছন্দ হত না। কারণ তিনি বুদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন বলে উল্লিখিত আছে। একারণে রাণী তিষ্যরক্ষিতা কর্তৃক বোধিবৃক্ষ কর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু শিখর জীবিত থাকার কারণে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই পুন পল্লবিত হয়ে মহীরূহ আকার ধারণ করে। সে বার প্রায় ৮০০ বছর পর্যন্ত বৃক্ষ বিরাজমান ছিল। এ দ্বিতীয় বংশের বৃক্ষটিকে বাংলার বৌদ্ধ বিদ্বেষী রাজা শশাঙ্ক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের প্রতি অনুরাগ প্রদর্শন করতে গিয়ে আগুনে পুড়িয়ে ছিলেন।

এ আগুনে জ্বলা বৃক্ষটির শিখর হতে পুনরায় অঙ্কুরোদ্গম হয়েছিল। ইহাকে তৃতীয় বংশধর বলা হয়। এ তৃতীয় বংশধরের বৃক্ষটি প্রায় ১২৫০ বছর পর্যন্ত জীবিত ছিল। ১৮৭৬ সালে উত্তর পুর্ব ভারতে এক প্রাকৃতিক দুর্যোগরূপ ঝড় তুফানের কবলিত হলে তৃতীয় প্রজন্মের এ বোধিবৃক্ষটি সমূলে ধরাশায়ী হয়ে যায়। ইহাকে আর বাঁচানো সম্ভব হয়নি। পরে বৃটিশ প্রত্নতত্ববিদ Sir Lord Alexander Cunningham ১৮৮১ সালে শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুর হতে মুল বোধি বৃক্ষের চারা এনে এখানে রোপন করেন। ইহা হল মুল বৃক্ষের চতুর্থ বংশধর। তবে মুল বৃক্ষের শাখা বলে আমরা ইহাকেও মুল বৃক্ষ বলে ধরে নিতে পারি। ইহা মুল বৃক্ষ হতে ভিন্ন কোন বৃক্ষ নয়।

মহান সম্রাট অশোকের কন্যা রাজকুমারী সংঘমিত্রা, যিনি ভিক্ষুণী হয়ে বুদ্ধগয়া হতে বোধিবৃক্ষের শাখা নিয়ে শ্রীলঙ্কার তৎকালীন রাজধানী অনুরাধাপুরে রোপন করিয়েছিলেন, সে বোধিবৃক্ষ এখন তথায় জীবন্ত বিদ্যমান রয়েছে। এবং ইহার ঐতিহাসিক রেকর্ড সুরক্ষিত রয়েছে। ২০০৭ সালে বুদ্ধগয়া স্থিত বোধিবৃক্ষের DNA টেষ্ট হয়েছে। তাতে প্রমাণিত হয়েছে যে, বুদ্ধগয়ার মহাবোধিবৃক্ষ শ্রীলঙ্কার অনুরাধাপুরের শ্রীমহাবোধিবৃক্ষেরই অংশ। এ জয়শ্রী মহাবোধিবৃক্ষ থেকে উৎপন্ন অন্য বোধিবৃক্ষ মহত্বপূর্ণ বৌদ্ধস্থানে আজ আমরা দেখতে পাই।

The Mahabodhi Tree at the Sri Mahabodhi Temple in Bodh Gaya
Sculpture of the Buddha meditating under the Mahabodhi tree
The Vajrashila, where the Buddha sat under the Bodhi Tree in Bodh Gaya

বোধিবৃক্ষ (সংস্কৃত: बोधि, সিংহলি: බෝධිය, তামিল: அரசமரம், দেবনাগরী: पीपल क पेड़ পিপল ক পেড়), হল ভারতের বুদ্ধগয়ায় অবস্থিত একটি অশ্বত্থ বৃক্ষ, যার তলায় ধ্যান করে বৌদ্ধধর্মের প্রবর্তক সিদ্ধার্থ গৌতম বোধিলাভ করে বুদ্ধ হয়েছিলেন। সংস্কৃত ভাষায় 'বোধি' শব্দের অর্থ 'জ্ঞান'। ধর্মীয়মতে, বোধিবৃক্ষ তার হৃদয়াকৃতির পাতা দ্বারা সহজেই চেনা যায়। গৌতম বুদ্ধ পঁয়তিরিশ বছর বয়সে,বৈশাখী পূর্ণিমা তিথিতে পূর্বদিকে মুখ করে সুজাতার দেওয়া পায়েসান্ন ঊনপঞ্চাশ গ্রাসে গ্রহণ করে মধ্যম পন্থা অবলম্বন করার মানস নিয়ে যে অশ্বত্থ বৃক্ষের নিচে ধ্যানমগ্ন হয়েছিলেন তাকেই বলা হয় বোধিদ্রুম বা বোধিবৃক্ষ। বৌদ্ধদের নিকট এই জাতীয় বৃক্ষই পরম ভক্তিতে বোধিবৃক্ষ হিসেবে পূজিত হয়। বোধিবৃক্ষের পাদদেশে জলসিঞ্চন বৌদ্ধদের নিকট একটি অতি পুণ্যের কাজ। বোধিবৃক্ষের প্রতি সম্মান জানিয়ে বোধিবৃক্ষ বন্দনা করা হয়। প্রতিটি বৌদ্ধবিহারে বোধিবৃক্ষের উপস্থিতি একটি অপরিহার্য বিষয়। ধ্যানমগ্নকালে বোধিবৃক্ষ বুদ্ধকে ছায়া প্রদান করায় বুদ্ধ বোধিবৃক্ষের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেন। সম্রাট অশোক তার পুত্র মহেন্দ্র ও তার কন্যা সংঘমিত্রাকে বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারকালে সিংহলে বোধিবৃক্ষের চারা দিয়ে পাঠান। এই চারা বুদ্ধগয়ায় যে বোধিবৃক্ষের নিচে বসে বুদ্ধ বোধি লাভ করেন সেই বৃক্ষেরই বংশধর। বোধিবৃক্ষের শাখাতেই পরলোকগত জ্ঞাতিবর্গের উদ্দেশ্যে সাদা বর্ণের কাপড়ের তৈরি সিলিন্ডার আকৃতির বিশেষ বস্তু টাঙানো হয়।