রাক্ষস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
কর্ণাটকের যক্ষগণে দৃশ্যায়িত রাক্ষস

রাক্ষস হিন্দু পৌরাণিক বিশ্বাস অনুযায়ী একপ্রকার দানবীয় প্রাণী। রাক্ষসরা পরবর্তীকালে বৌদ্ধ পুরাণে স্থান লাভ করে। রাক্ষসদের মানুষ ভক্ষণ করার কথাও বর্ণিত আছে। স্ত্রী রাক্ষসকে রাক্ষসী বলা হয় এবং মানুষের রূপ ধরা রাক্ষসীকে বলা হয় মনুষ্য-রাক্ষসী। কখনো কখনো অসুর এবং রাক্ষসবৃন্দ একই রূপে আখ্যায়িত হয়।

হিন্দু বিশ্বাসে[সম্পাদনা]

বৈদিক এবং পৌরাণিক আখ্যানে[সম্পাদনা]

বলা হয় যে, সত্য যুগ-এর শেষের দিকে ব্রহ্মার নিদ্রাবস্থার নিঃশ্বাস থেকে রাক্ষসদের সৃষ্টি হয়েছিল। রাক্ষসরা জন্মানোর সাথে সাথেই এত রক্তপিপাসু হয়ে পড়ে যে, তাঁরা তাঁদের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মাকে ভক্ষণ করতে উদ্যত হয়। ব্রহ্মা চিৎকার করেন 'রক্ষাম!' , (সংস্কৃতে যার অর্থ রক্ষা করা) এবং বিষ্ণু তাঁকে রক্ষা করতে প্রকট হন (ব্রহ্মার এই আর্তনাদ থেকেই তাঁদের নাম হয় রাক্ষস)। বিষ্ণু রাক্ষসদেরকে পৃথিবী থেকে বিতাড়িত করে ছাড়েন।

তাঁদের ভাষিক উৎস ঋগ্বেদের দশম মণ্ডলের ৮৭ নং সূক্তে পাওয়া যায়। তাতে তাঁদেরকে মানুষের মাংস ভক্ষণ করা যতুধনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।[১]

কোনো কোনো জায়গায়, রাক্ষসদেরকে ঋষি কশ্যপের বংশজাত বলা হয়, তবুও শৈল্পিক কারণে বেদে তেমন কোনো উল্লেখ নেই। সম্ভবত, বেদ সৃষ্টির সময় রাক্ষসরা কশ্যপের বংশের হওয়ার কথা প্রচলিত ছিল যেহেতু বংশের ধারণা বেদের লিখনশৈলীর জন্য সম্পূর্ণ বাইরের ছিল, তাই হয়তো পুরাণাদিতে রাক্ষসদেরকে কশ্যপের বংশধর বলা হলেও বেদে সেই কথা নেই।

উৎস[সম্পাদনা]

কশ্যপের বিবাহ প্রজাপতি দক্ষর ১৩ জন কন্যার সাথে হয়েছিল, যার মধ্যে ছিল অদিতি, দিতি এবং দনু।

  • দনুর পুত্ররা দানব;
  • দিতির পুত্ররা দৈত্য এবং
  • অদিতির পুত্ররা আদিত্য, দেব বা, সুর।

বিবরণ[সম্পাদনা]

রাক্ষসদেরকে দেখতে সর্বদাই কুৎসিত বলে দর্শানো হয় - তাঁরা বিশাল, ভয়ংকর, তাঁদের মুখ থেকে দুটি বিষদাঁত বেরিয়ে থাকে এবং তাঁদের বড় বড় নখ আছে। তাঁরা স্বার্থপর, জন্তুর মতো এবং মানব ভক্ষণকারী ছিল বলা হয়। তাঁরা মাংসের গন্ধ সনাক্ত করতে পারত। অধিক ভয়ানক রাক্ষসদের চোখ এবং চুল জ্বলন্ত ছিল, এবং তাঁরা হাতে করে মানুষের রক্ত গ্রহণ করত। তাঁরা ওড়ার, অদৃশ্য হওয়ার কৌশল জানত। তাঁরা মায়ার বলে আকার পরিবর্তন এবং বিভিন্ন জন্তুর রূপ ধারণ করতেও জানত। স্ত্রী রাক্ষসদের রাক্ষসী বলা হয়।[২]

হিন্দু কাব্যে[সম্পাদনা]

রামায়ণ এবং মহাভারতের জগতে রাক্ষসরা ছিল এক জনবহুল গোষ্ঠী। ভাল এবং মন্দ, দুই প্রকারের রাক্ষসের উদাহরণ পাওয়া যায়। রাক্ষসরা যুদ্ধে ভাল এবং মন্দ, দুই পক্ষের হয়েই যুদ্ধ করেছিল। তাঁরা অতি শক্তিশালী যোদ্ধা, নিপুণ জাদুকর এবং মায়াবী ছিল। রাক্ষসরা মায়ার দ্বারা এমন দৃশ্য সৃষ্টি করত যা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠত বা সত্যি না জানার জন্য একেবারে সত্যিকারের মত লাগত। কিছু রাক্ষসকে মানব ভক্ষণকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়।

রাক্ষসদেরকে প্রায়শই সৈনিকের রূপে দেখানো হয়েছে। পরবর্তিতে, কিছু রাক্ষস অত্যন্ত বল অর্জন করে নায়ক বা প্রতিনায়ক হিসাবে খ্যাতিলাভ করেছিল।

রামায়ণে[সম্পাদনা]

লঙ্কার যুদ্ধ রাবণের রাক্ষসসেনা এবং রামের বানরসেনার মধ্যে হয়েছিল।

  • দশ মাথাওয়ালা রাবণ ছিল রাক্ষসদের একজন রাজা, এবং রাম-এর শত্রু। মার্কণ্ডেয় ঋষির লেখা অনুযায়ী, রাবণ রামের পত্নী সীতাকে হরণ করে নিজের রাজধানী লঙ্কায় নিয়ে গিয়েছিল। রাম বানর রাজা সুগ্রীব-এর সহায়তায় বানর সেনার সাহায্য নিয়ে রাবণকে বধ করে সীতাকে উদ্ধার করেন।[৩]
  • রাবণের কনিষ্ঠ ভ্রাতা বিভীষণ রামকে সীতা অন্বেষণে সাহায্য করেন।[৪]


রামায়ণে কবন্ধ, তাড়কা, সূর্পনখা, মারীচ, সুবাহু, খর, কুম্ভকর্ণ, ইন্দ্রজিৎ ইত্যাদি রাক্ষসের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল।

মহাভারতে[সম্পাদনা]

মহাভারতের পাণ্ডব নায়ক ভীম হিড়িম্বা নাম্নী এক রাক্ষসীর স্বামী ছিলেন।

  • হিড়িম্ব একজন রাক্ষস ছিল। সে ছিল মানব ভক্ষণকারী। পাণ্ডবদের গন্ধ পেয়ে সে ভগ্নী হিড়িম্বাকে প্রেরণ করে। হিড়িম্বা ভীমের প্রেমে পড়ে এবং ভীমকে সব সত্য প্রকাশ করে। ভীম হিড়িম্বকে বধ করার পর তাঁদের বিয়ে হয় এবং পরবর্তীকালে ঘটোৎকচ নামে এক পুত্র জন্মলাভ করে।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ঘটোৎকচ পাণ্ডবদের হয়ে প্রবল পরাক্রমে যুদ্ধ করে। কৌরবপক্ষীয় সেনাপতি কর্ণের ছোঁড়া দৈবী শক্তি অস্ত্রে তাঁর মৃত্যু ঘটে। তাঁর পত্নী ছিল অহিলাবতী এবং পুত্র বরবরিকা। হিমাচল প্রদেশ-এর মানালীতে ঘটোৎকচের একটি মন্দির আছে।

কর্ণ কর্তৃক ঘটোৎকচের উপর আক্রমণ

বৌদ্ধ বিশ্বাসে[সম্পাদনা]

থেরাবাদী বৌদ্ধ সাহিত্যে[সম্পাদনা]

মহাযান বৌদ্ধ সাহিত্যে[সম্পাদনা]

পদ্ম সূত্র-এ বুদ্ধদেবের কিছু রাক্ষসকন্যাকে সূত্রটির সুরক্ষার দায়িত্ব অর্পণ করার কথা উল্লেখ আছে। তাঁরা এটির সুরক্ষার জন্য শিষ্যবর্গকে জাদুকরী ধরণীও শিখিয়েছিল।[৫]

জাপানী পরম্পরায় রাক্ষসদেরকে রাচেৎচু(羅刹) বলা হয়।

বিভিন্ন ভাষায় রাক্ষস[সম্পাদনা]

ইন্দোনেশিয় এবং মালয় ভাষায় ' রাক্সাসা 'র অর্থ "বিশালকায় দৈত্য", "প্রকাণ্ড" বা "বৃহৎ এবং শক্তিশালী" বা "রাক্ষস"।[৬]

বাংলা ভাষায় ' রাক্ষস '-এর অর্থ এমন ব্যক্তি যে কোনো লাজলজ্জা বা থামবার প্রয়োজন অনুভব না করেই খায়। তেমনি ভাবেই, ইন্দোনেশিয় এবং মালয় ভাষায় " রাকুস "-এর অর্থ হয়েছে লোভী[৬]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. http://en.wikisource.org/wiki/The_Rig_Veda/Mandala_10/Hymn_87
  2. Gopal, Madan (১৯৯০)। K.S. Gautam, সম্পাদক। India through the ages। Publication Division, Ministry of Information and Broadcasting, Government of India। পৃ: ৭২। 
  3. Ramayana (Book III: Vana Parva, Section 271 ff.)
  4. Ramayana (Book III: Vana Parva, Section 281 ff.)
  5. Lotus Sutra, chapter 26, Burton Watson translation
  6. Atmosumarto, Sutanto (২০০৪)। A learner's comprehensive dictionary of Indonesian। Atma Stanton। পৃ: 445। আইএসবিএন 9780954682804 

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • Freeman, Michael and Claude Jacques (২০০৩)। Ancient Angkor। Bangkok: River Books। 
  • Rovedo, Vittorio (১৯৯৭)। Khmer Mythology: Secrets of Angkor। New York: Weatherhill। 

অতিরিক্ত পঠন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

  • The Mahabharata of Vyasa translated from Sanskrit into English by Kisari Mohan Ganguli, online version