সামরিক শাসন

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পোল্যান্ডে সামরিক শাসন কালে

সামরিক শাসন হল সর্বোচ্চ পর্যায়ের সামরিক কর্তার শাসন যেখানে শাসনকর্তা হন সামরিক বাহিনীর প্রধান স্বয়ং। পূর্ববর্তী সরকারের প্রশাসনিক, আইনি ও বিচারবিভাগীয় ব্যবস্থার বাতিলকরনের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেন উক্ত সামরিক প্রধান। সাময়িকভাবে সাধারণ শাসকদের ব্যার্থতায় তাদের হাত থেকে সমস্ত ক্ষমতা সামরিক শাসকের হাতে যায় ও কার্যকরী হয়। (উদাঃ নিরাপত্তাজনিত কারণে বা জরুরি অবস্থার ভিত্তিতেও সামরিক শাসন চালু হতে পারে)

সরকার জনগণের ওপর জোর করে সামরিক শাসন চাপিয়ে দিতে পারে আইনের শাসনকে বলবৎ করার নামে। সাধারণত প্রাসাদ বিপ্লব বা প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে (২০০৬ এবং ২০১৪ সালে থাইল্যান্ডে যেমন ঘটেছিল) সামরিক শাসন জারী হতে পারে। গণ আন্দোলন দমনে (১৯৮৯ এ চীনের তিয়েনআনমেন স্কোয়ার, ১৯৮৯ বা ২০০৯ এ ইরানের সবুজ আন্দোলন), রাজনৈতিক বিরোধীতাকে সামাল দিতে (পোলান্ডে, ১৯৮১) বা অভ্যুত্থান/অনাগত অভ্যুত্থানকে দমন করতে সামরিক শাসন জারী হওয়ার ইতিহাস আছে। এছাড়া বৃহৎ প্রাকৃতিক বিপর্যয় ইত্যাদিতেও তা হতে পারে। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন প্রকার জরুরি অবস্থায় এই শাসনের বিধান দেখতে পাওয়া যায়।

জাতীয় গোলযোগে, সাধারণ নির্বাচিত সরকারের ব্যর্থতায় সামরিক শাসন জারী হওয়ার উদাহরণ আছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানি ও জাপান ও আমেরিকান গৃহযুদ্ধের পরে দেশের পূনর্গঠনের সময়।

নানা দেশে[সম্পাদনা]

অস্ট্রেলিয়া[সম্পাদনা]

১৮২০ এর মধ্যভাগ হতে ১৮৩২ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীদের সাথে অস্ট্রেলিয়া দেশের এবরজিনিস উপজাতিদের তীব্র যুদ্ধকে 'ব্ল্যাক ওয়ার' বলা হয়ে থাকে। হিংসা প্রতিরোধে ও যথেচ্ছ এবরজিনিস উপজাতি হত্যা নিবারন করতে লেফটেন্যান্ট গভর্নর জর্জ আর্থার ১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বরে সামরিক আইন জারী করেছিলেন। তিন বছর এই আইন জারী থাকে। এটি ছিল অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের দীর্ঘতম সময়ব্যাপী জারী থাকা সামরিক আইন।

ব্রুনেই[সম্পাদনা]

ব্রুনাই গৃহযুদ্ধ বা বিদ্রোহের সময় ১৯৬২ সালের ৮ ডিসেম্বর সামরিক আইন জারী হয়েছিল ব্রুনাইতে

কানাডা[সম্পাদনা]

মিশর[সম্পাদনা]

মিশরে জরুরি অবস্থা ১৯৬৭ সাল থেকে ক্রমাগতভাবে জারী হয়েছে। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি আনোয়ার আল সাদাক হত্যার পর জরুরি অবস্থা জারী হয়। তিন বছর পর পর সংসদ জরুরি অবস্থা পূন জারী করে আসে। দাহাব বোমাবর্ষণ এর পর দুই বছর পরেই জরুরি অবস্থার পূন জারী করা হয়, সন্ত্রাসবিরোধী কঠোর অবস্থান নেওয়ার জন্যে।

মিশর দেশের সামরিক শাসনে সমস্ত ক্ষমতার অধিকারী সংবিধান, সংসদ, জনপ্রতিনিধি বা জনগণ নয়, একচ্ছত্র ভাবে তা চলে যায় সেনাবাহিনীর সুপ্রীম কাউন্সিলের হাতে।

ইরান[সম্পাদনা]

আয়ারল্যান্ড[সম্পাদনা]

লর্ড লেফটেন্যান্ট, লর্ড উইমবোন ১৯১৬ সালে আয়ারল্যান্ডে সামরিক আইন জারী করেন ডাবলিনের রাস্তার নিয়ম শৃঙ্খলা আনতে। পরে ব্রিটিশ শাসকের অনুমতিক্রমে সারা দেশেই জারী হয় সামরিক আইন। আইরিশ গৃহযুদ্ধে ও আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা যুদ্ধর সময় ব্রিটিশ সরকার সামরিক শাসন বহাল রেখেছিল গোটা আয়ারল্যান্ডে। বর্তমান আইরিশ সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সামরিক আইন জারী করতে পারে জাতীয় জরুরি অবস্থার ক্ষেত্রে। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই এমনকি জরুরি অবস্থা, সামরিক শাসনাধীনেও কারো মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যায়না।

ইজরায়েল[সম্পাদনা]

পাকিস্তান[সম্পাদনা]

পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জা ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর সামরিক আইন জারী করেছিলেন। জেনারেল মহম্মদ আইয়ুব খানকে প্রধান শাসক নিয়োগ করার পর আইয়ুব নিজেই সংসদীয় কতৃপক্ষের ক্ষমতা ও এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সামরিক ক্ষমতার অধিকারী আইয়ুব রাষ্ট্রপতি মির্জাকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেন ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর। এরপর থেকেই পাকিস্তান রাজনীতির সামরিকীকরণের সূচনা হয়। চার বছর পরে ১৯৬২ সালে সংবিধানের কিছু পরিবর্তন সাধিত হয় এবং ২৫ মার্চ ১৯৬৯ দ্বিতীয়বার পাকিস্তানে সামরিক আইন জারী হয়। রাষ্ট্রপতি আইয়ুব সামরিক বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করেন সেনাবাহিনী প্রধান, জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে। পশ্চিম পাকিস্তানে জেনারেল ইয়াহিয়া একক ক্ষমতার অবলুপ্তি করন করতে ব্যক্তি বিশেষে ভোটাধিকারের নিয়ম চালু করেন। জুলফিকার আলী ভুট্টো তৃতীয়বার সামরিক শাসন চালু করেন ২১ ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে। বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের পরে। জেনারেল মহম্মদ জিয়া উল হক ১৯৭৭ সালে চতুর্থবারের জন্যে আবার সামরিক শাসন জারী করেছিলেন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ভুট্টোকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করেন জেনারেল জিয়া। এরপর সামরিক শক্তি বলে বেলুচিস্তান ও অন্যান্য প্রদেশের অশান্তি বিক্ষোভকে দমন করেন তিনি। জিয়া প্লেন দুর্ঘটনায় মারা যান।

১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফকে সরিয়ে সেনাপ্রধান পারভেজ মুশাররফ ক্ষমতায় আসেন যদিও ঘোষিতভাবে সামরিক আইন জারী করা হয়নি। মুশারফ চিফ এক্সিকিউটিভ হিসেবে ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন যতক্ষন না রাষ্ট্রপতি রফিক তারার পদত্যাগ ও মুশারফ নতুন রাষ্ট্রপতি না হন। ২০০২ সালের নির্বাচনে জাফারুল্লাহ খান জামালি প্রধানমন্ত্রীত্ব পান। সরকার রাষ্ট্রপতি মুশারফ ও নির্বাচিত মন্ত্রীসভার সাধারণ বোঝাপড়ার মাধ্যমেই চলতে থাকে। ২০০৭ সালে জেলারেল মুশারফ জরুরি অবস্থা জারী করেন ও পক্ষান্তরে সামরিক শাসনই জারী হয় দেশব্যাপী। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে বরখাস্ত করা হয়। ২০০৭ সালে ১২ নভেম্বর মুশারফ সামরিক আইনে কিছু পরিবর্তন করে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেন বাহিনীকে।

ফিলিপাইনস[সম্পাদনা]

পোল্যান্ড[সম্পাদনা]

দক্ষিণ কোরিয়া[সম্পাদনা]

১৯৪৬ সালের অক্টোবর মাসে কোরিয়ার ইউনাইটেড স্টেটস আর্মি মিলিটারি সরকার সামরিক আইন জারী করে দেগু দাঙ্গার প্রেক্ষিতে। এর দু বছর পরে ১৯৪৮ সাকের ১৭ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি সিংম্যান রি'র জমানায় সামরিক আইন লাগু হয়েছিল জেজু বিদ্রোহ দমনে। এপ্রিল অভ্যুত্থান দমন করতেও ১৯৬০ সালে আবার সামরিক আইন জারী হয়েছিল দক্ষিণ কোরিয়াতে।

সুইজারল্যান্ড[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে ১৯৭৭ সালে জিয়াউর রহমান ও ১৯৮১ সালে এরশাদ সামরিক আইন জারি করে।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]