পীরগঞ্জ উপজেলা, ঠাকুরগাঁও

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
পীরগঞ্জ
উপজেলা
পীরগঞ্জ বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
পীরগঞ্জ
পীরগঞ্জ
বাংলাদেশে পীরগঞ্জ উপজেলা, ঠাকুরগাঁওয়ের অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৫°৫১′১৫″ উত্তর ৮৮°২১′৪৮″ পূর্ব / ২৫.৮৫৪১৭° উত্তর ৮৮.৩৬৩৩৩° পূর্ব / 25.85417; 88.36333স্থানাঙ্ক: ২৫°৫১′১৫″ উত্তর ৮৮°২১′৪৮″ পূর্ব / ২৫.৮৫৪১৭° উত্তর ৮৮.৩৬৩৩৩° পূর্ব / 25.85417; 88.36333 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশ বাংলাদেশ
বিভাগরংপুর বিভাগ
জেলাঠাকুরগাঁও জেলা
আয়তন
 • মোট৩৫৩.৩ কিমি (১৩৬.৪ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১)[১]
 • মোট২,৪৩,৫৩৫
 • জনঘনত্ব৬৯০/কিমি (১৮০০/বর্গমাইল)
সাক্ষরতার হার
 • মোট৪৭.৮%
সময় অঞ্চলবিএসটি (ইউটিসি+৬)
পোস্ট কোড৫১১০ উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
ওয়েবসাইটপ্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট Edit this at Wikidata

পীরগঞ্জ উপজেলা বাংলাদেশের ঠাকুরগাঁও জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। পীরগঞ্জ প্রশাসনিকভাবে থানা হিসেবে গঠিত হয় ১৮৭০ সালে এবং ১৯৮৩ সালের ৭ই নভেম্বর এটি উপজেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।[২]

অবস্থান[সম্পাদনা]

ঠাকুরগাঁও জেলা হতে ২০ কি:মি: দক্ষিণ দিকে অবস্থিত। পীরগঞ্জ আয়তন ও জনসংখ্যার দিক থেকে ঠাকুরগাঁও জেলার দ্বিতীয় বৃহত্তম উপজেলা। ইহা ২৫৹৫৯' উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮৹১৫' ও ৮৮৹২২' পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত।[৩] এই উপজেলার উত্তরে ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা, পূর্বে দিনাজপুর জেলার বীরগঞ্জবোচাগঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং পশ্চিমে ঠাকুরগাঁও জেলার রানীশংকাইল উপজেলা অবস্থিত।

নামকরণ[সম্পাদনা]

পীরগঞ্জ উপজেলার নামকরণ নিয়ে সুপ্রতিষ্ঠিত কোন ইতিহাস পাওয়া যায় না। তবে অধিকাংশের মতে এই জনপদে সুলতানি আমলে ইসলাম ধর্ম প্রচার এবং ইসলামী ধ্যান-ধারণার গোড়াপত্তন হয়েছিল পীর মাশায়েখ সমাজের সাধক পুরুষ হযরত পীর সিরাজউদ্দিন আউলিয়া সাহেবের হাত ধরে। সমসাময়িক অনেক পীর আউলিয়া পীরগঞ্জে ধর্ম প্রচারের জন্য আসেন। তাদের মধ্যে অন্যতম দুর্লভপুর গ্রামের পীর বাহারানা সৈয়দ, সাটিয়া গ্রামের পীর শাহজাহী, ভেলাতৈড় ভদ্রপাড়া গ্রামের পীর দরবগাজী এবং পীরগঞ্জ সংলগ্ন গোগর গ্রামের বনপীর। পীর-মাশায়েখ ও আউলিয়াগণের পদচারণায় মুখরিত এই জনপদ সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধশালী হতে শুরু করে। পীর আউলিয়াগণের এই অঞ্চল পরিচিতি পেতে থাকে পীরগঞ্জ নামে। তবে নামকরণের এই ভিত্তির বিষয়ে জনশ্রুতি ছাড়া সঠিক ইতিহাস এর সন্ধান পাওয়া যায়না।

মুক্তিযুদ্ধ[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালে ৭ই মার্চে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মজিবুর রহমানের স্বাধীনতার দিক নিদের্শনামূলক ভাষণের পর ২৩ মার্চ সারা দেশের ন্যায় পীরগঞ্জেও পাকিস্তানি পতাকা পোড়ানো হয় এবং বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলন করা হয়। সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রবীণ নেতা ডাঃ আব্দুর রাজ্জাক বর্তমান পাইলট হাইস্কুল প্রাঙ্গণস্থ শহীদ মিনারের সামনে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় 'আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি' গানটি দ্বৈত কণ্ঠে পরিবেশন করেন শিল্পী মজিবর রহমান ও মেহের এলাহী। অতঃপর ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে পাক হানাদার বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে নিরস্ত্র বাঙালির উপর। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানুষ গড়ে তোলে প্রতিরোধ। এরই ধারাবাহিকতায় পীরগঞ্জের আনসার সদস্য ইসাহাক আলীর নেতৃত্বে কয়েকজন যুবক ছুটে যায় দিনাজপুরের কুঠিবাড়ী ইপিআর ক্যাম্পে। সেখানে প্রতিরোধ গড়ে তোলে পাক হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। সেখানে পাক হানাদারদের গুলিতে নিহত হন পীরগঞ্জের বীরহলি গ্রামের ইসাহাক আলী। যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে পীরগঞ্জের প্রথম শহীদ। এরপর ১৭ই এপ্রিল পীরগঞ্জে প্রবেশ করে পাক হানাদার বাহিনী। জ্বালাও পোড়াও অভিযানের পর তত্কালীন আওয়ামী লীগ সভাপতি ডাঃ সুজাউদ্দীন আহম্মেদ, প্রফেসর গোলাম মোস্তফা, আব্দুল জব্বার, মোজাফর হোসেনসহ বেশ কয়েকজনকে ধরে নিয়ে গিয়ে জামালপুর ফার্মে গুলি ও বেয়নেট খুচিয়ে হত্যা করার পর লাশ ফেলে রেখে যায় পাক হানাদর বাহিনী। তারপর দীর্ঘ ৯ মাসের সংগ্রামে পীরগঞ্জের শহীদ সালাহউদ্দীনসহ দামাল ছেলেরা মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যুদ্ধ করে ৩ ডিসেম্বর'৭১ পাক হানাদর বাহিনীর দখল থেকে পীরগঞ্জ মুক্ত করেন।

প্রশাসনিক এলাকা[সম্পাদনা]

১৮৫৯ সালে পীরগঞ্জে একটি থানা স্থাপিত হওয়ার পর এটি প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে । অতঃপর সাবেক প্রেসিডেন্ট এইচ এম এরশাদের আমলে ৭/১১/১৯৮৩ তারিখে পীরগঞ্জ থানা উপজেলায় উন্নীত হয়। এছাড়াও, পীরগঞ্জের চতুর্পাশ্বের ৭ টি মৌজা যথাঃ রঘুনাথপুর, মিত্রবাটি, জগথা, পালিগাঁও, ভাকুরা, ভেলাতৈর ও গুয়াগাঁও নিয়ে গঠিত হয় পীরগঞ্জ পৌরসভা ১৯৮৯ সালে। এ পৌরসভা ও ১১ টি ইউনিয়ন যথা - ভোমরাদহ, কোষারাণীগঞ্জ , খনগাঁও , বেগুনবাড়ী, সৈয়দপুর, পীরগঞ্জ, হাজীপুর, দৌলতপুর, সেনগাাঁও, জাবরহাট, বৈরচুনা নিয়ে গঠিত হয় পীরগঞ্জ উপজেলা । পরবর্তী কালে বেগুনবাড়ী ইউনিয়ন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার অন্তর্ভুক্ত হয় ।

বর্তমান পীরগঞ্জ উপজেলার গ্রামের সংখ্যা ১৬৮। আয়তন ৩৫৩.৩ বর্গ কিলোমিটার।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

(ক) পীরগঞ্জ উপজেলা সদরে অবস্থিত পীরগঞ্জ সরকারি কলেজ এলাকায় শিক্ষার আলো বিস্তার করে আসছে ১৯৬৩ সাল থেকে। সমপ্রতি পীরগঞ্জ সরকারি কলেজ অর্থনীতি এবং ডি এন কলেজ রাষ্টবিজ্ঞান ও সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু করায় শিক্ষা ক্ষেত্রে নব দিগন্তের সুচনা হয়েছে। আগামী বছর হতে পীরগঞ্জ সরকারি কলেজে বাংলা, ইংরেজি, হিসাব বিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা ও ইসলামের ইতিহাস বিষয়ে অনার্স কোর্স চালুর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায় রয়েছে। এছাড়াও উপজেলায় রয়েছে বেসরকারি কলেজ ১১টি ও কারিগরি কলেজ ৮টি। কলেজ পর্যায়ে অনার্স কোর্সে ছাত্র/ছাত্রী সংখ্যা বর্তমানে ১২৬ জন এবং ডিগ্রি পাস কোর্সে ৩ হাজার ৭৩৯ জন। উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্র ২ হাজার ৮০০ এবং ছাত্রী ২ হাজার ৩০০ মিলে মোট ৫ হাজার ১০০ জন।

(খ) উপজেলায় সরকারি গার্লস হাই স্কুল ১টি ও বেসরকারি হাইস্কুল ৮৩টি। মাধ্যমিক স্তরের ছাত্র ৯ হাজার ৮৪৫ এবং ছাত্রী ৯ হাজার ৩৪৪ মিলে মোট শিক্ষার্থী ১৯ হাজার ১৮৯ জন। সিনিয়র মাদ্রাসা ৪টি, দাখিল মাদ্রাসা ২২টি ও এবতেদায়ী মাদ্রাসা ১০টি।

(গ) উপজেলায় প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৭৫টি। শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছাত্র ১৮ হাজার ৭৭১ ও ছাত্রী ১৭ হাজার ৮৯৯ মিলে মোট ৩৬ হাজার ৬৭০ জন। মোট ৭৪৪ জন শিক্ষক নিরন্তন শিক্ষাদান ব্রত পালন করে চলেছেন কোমলমতি শিশুদের জ্ঞান বিকাশে।

স্বাস্থ্য[সম্পাদনা]

  • উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্র : ১ টি
  • উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র : ১ টি
  • ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র : ৭ টি
  • কমিউনিটি ক্লিনিক : ২২ টি
  • প্রাইভেট ক্লিনিক : ৩ টি

জনসংখ্যার উপাত্ত[সম্পাদনা]

২০১১ সালের আদমশুমারী অনুযায়ী এখানকার লোক সংখ্যা ২,৪৩,৫৩৫ জন; যার মধ্যে পুরুষ ১,২২,৫৫৩ জন এবং মহিলা ১,২০,৯৮২জন। এখানে মোট ভোটার: ১,৫৮,৮৯৪ জন। উপজাতিয় অধিবাসী ৩,৬১৪ জন।

১৯৯১ সালের আদমশুমারি অনুসারে জনসংখ্যা ছিল ১,৮৩,২৯২ জন।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

শিল্প[সম্পাদনা]

পীরগঞ্জ উপজেলায় শিল্প কারখানা বলতে অলিম্পিয়া নামে একটিমাত্র অটো রাইসমিল। এছাড়া বিশিষ্ট ব্যবসায়ী শাহজাহান আলী রনি অটোরাইস নামে একটি অটোরাইস মিল নির্মাণ করছেন। এছাড়াও উপজেলায় ২৮১টি চাল ও আটাকল রয়েছে, যেখানে প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক কর্মচারী ও ফড়িয়া ব্যাপারী পরিবারের জীবিকা নির্বাহ হচ্ছে। এছাড়াও স'মিল রয়েছে ২৪টি।

কৃষি[সম্পাদনা]

পীরগঞ্জ উপজেলার ভুমি বেলে, বেলে দোআঁশ ও এটেল দোআঁশ প্রকৃতির। এটেল দোআঁশ ও বেলে দোআঁশ নিচু জমিতে ইরি বোরো আমন এবং বেলে ও বেলে দোআঁশ-উঁচু জমিতে গম, ভুটা এবং শীত-গ্রীষ্মের শাক-সবজি, তৈলবীজ জাতীয় ফসল উত্পাদন হয় প্রচুর। পীরগঞ্জ উপজেলা সমুদ্রপৃষ্ঠ হতে ৫২ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত হওয়ায় এবং বার্ষিক ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার মিঃমিঃ অর্থাত্ সুষম বৃষ্টিপাত হওয়ায় এ উপজেলায় বন্যা হয় না বললেই চলে। ভূমি, মৃত্তিকা, বৃষ্টিপাত, জলবায়ুর গতি-প্রকৃতির ভিত্তিতে দেশের কৃষি পরিবেশিক অঞ্চলকে যে ৩০টি ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে তার মধ্যে পুরাতন হিমালয় পাদভূমি অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে পীরগঞ্জ উপজেলাসহ সমগ্র ঠাকুরগাঁও জেলা।

ভাষা[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের অন্যান্য এলাকার মত পীরগঞ্জ উপজেলাতেও আঞ্চলিক ভাষার ঐতিহ্য রয়েছে। এই অঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষা এলাকার মানুষের ভাব বিনিময়ের অকৃত্রিম মাধ্যম। আঞ্চলিক বাংলা ভাষার পাশাপাশি শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত সমাজে শুদ্ধ বাংলা চর্চাও রয়েছে।

পীরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় রয়েছে সাধু ভাষার ক্রিয়াপদের একত্র উচ্চারণ কৌশল, উর্দু, হিন্দি, অসমিয়, উড়িয়া, নেপালী শব্দের সরাসরি বা কিছুটা বিকৃত উচ্চারণ। ফলে পীরগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষা দেশের অন্যান্য আঞ্চলিক ভাষা থেকে ভিন্নতা পেয়েছে। এই উপজেলায় রয়েছে বিভিন্ন আদিবাসীর বসবাস।

উপজেলার পাড়িয়া, মল্লিকপুর, করনাই, বড়বাড়ি, দস্তমপুর, বৈরচুনা, চক-বাসুদেবপুরসহ আরও বেশকিছু জায়গায় আদিবাসি সাঁওতালরা বসবাস করে। তারা সাঁওতালি ভাষায় কথা বলে। এছাড়াও এখানে কিছু সংখ্যক ওঁড়াও, মুন্ডা ও মুসোহর আদিবাসী রয়েছে। তারা তাদের নিজ নিজ ভাষায় কথা বলে।

আবহমানকাল ধরে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান, আদিবাসী ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সহাবস্থানে এই অঞ্চলে অর্পূব এক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংস্কৃতি বিরাজ করছে। তবে অন্যান্য অঞ্চলের মত এই অঞ্চলের মানুষের মধ্যেও আচার-ব্যবহার, অভ্যাস, রীতিনীতি, চলাফেরা, ধ্যান-ধারনায় ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।

সাহিত্য ও সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

বৃটিশ আমলে ভেলাতৈড় ভদ্রপাড়ার খাদেম মতিয়র রহমান নিয়মিত কবিতা লিখতেন। ভারতবর্ষ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাসঞ্জাত একটি ভ্রমণ কাহিনীও লিখেন তিনি। ষাটের দশকে বীরহলী গ্রামের খয়রাত আলী 'চৌর্য্য অপরাধ ও তার প্রতিকার' শিরোনামে একটি গবেষণামূলক পুস্তক প্রকাশ করেন। এছাড়া বিভিন্ন সংগঠন অমর ২১শে উপলক্ষে স্থানীয় ক্ষুদে লেখকদের লেখা সম্বলিত স্মরণিকা নিয়মিত প্রকাশ করত। স্বাধীনতা উত্তর কালে মহান ২১শে, স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস উপলক্ষে এ ধরনের প্রকাশনা অব্যাহত আছে। এছাড়া শহীদ বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা ও ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের উপর লেখা 'স্মৃতি-৭১' গ্রন্থ প্রকাশ করেন তার সহধর্মিণী আনোয়ারা মোস্তফা এবং পীরগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধের উপর ছাত্র ইউনিয়নের 'মুক্তিযুদ্ধ ও পীরগঞ্জ' নামে একটি পুস্তকও প্রকাশিত হয়, যেখানে অনেক অজানা তথ্য লিপিবদ্ধ আছে। সত্তরের দশকে পীরগঞ্জ ডিগ্রী কলেজে নিয়মিত প্রকাশিত হত 'দেয়াল পত্রিকা'। ১৯৯৫ ও ২০০৫ সালে পীরগঞ্জ সরকারি কলেজের শিক্ষক বদরুল হুদা প্লাবনের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় সাহিত্য সংকলন 'সমকাল'। সমপ্রতি পীরগঞ্জ পাঠচক্র নামে একটি সংগঠন গত ২ বছর ধরে প্রকাশ করে আসছে বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে বার্ষিক প্রকাশনা 'সাহিত্য পত্র'। নাট্যাঙ্গনে ন্যাপ নেতা মরহুম ডাঃ রাজ্জাক, সাবেক এমপি মরহুম মকলেছুর রহমান, খোকা চৌধুরী, ময়না, বাদশা (সাবেক পরিচলাক পঃ পঃ), মরহুম মকসেদুল আলম, ইমদাদুল হক (সাবেক এমপি), সাবেক এমপি হাফিজ উদ্দীন আহম্মেদ, স্বর্গীয় ডাঃ সতীশ চন্দ , নাজমাসহ আরও বেশকিছু নাট্যপ্রেমী নিয়মিত নাট্যচর্চা ও মঞ্চ অভিনয় করতেন। কালের বিবর্তনে ঝিমিয়ে পড়া নাট্যাঙ্গনে পত্রিকা হকার গৌতম দাস বাবলু'র অঙ্গীকার নাট্য নিকেতন আবির্ভূত হয়েছে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। ষাটের দশকের শেষ দিকে পীরগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল বাঙালির স্বাধিকার সংগ্রামের চেতনায় ভাস্বর। এ সময় মরমী শিল্পী মরহুম রফিকুল ইসলামের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় উত্তরা শিল্পী সংসদের ব্যানারে মরহুম মকিম উদ্দীন (উপ-সচিব), মজিবর রহমান, সালেহা বেগম, আমেনা বেগম, জমির উদ্দীন, মরহুম মাস্টার কালাম, মেহের এলাহী, সাবেক পৌর মেয়র গোলাম হোসেন, জগদীশ চন্দ দাস, মোত্তালেব (ডিজিএম রাকাব), আবুল হোসেন, নাজমা বেগম, দুলালী, হাসিনা, তসলিমসহ এক ঝাঁক তরুণ তরুণী মাতিয়ে রেখেছিলেন সাংস্কৃতিক অঙ্গন। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে সত্তর ও আশির দশকেও এই ধারা অব্যাহত ছিল। কিন্তু এর পর পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এবং শিল্পী রফিকুল ও কালামের মৃত্যুতে এ ধারা ঝিমিয়ে পড়লেও হালে সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দীন আহম্মেদ, সাবেক সংসদ সদস্য ইমদাদুল হক, সাবেক পৌর মেয়র রাজিউর রহমান রাজু ও উপজেলা প্রশাসন বিশেষত উপজেলা নির্বাহী অফিসারের ঐকান্তিক পৃষ্ঠপোষকতায় সমকাল সংস্কৃতিক গোষ্ঠী, গীতবীথি সংগীত নিকেতন, উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, অন্তরঙ্গ শিল্পী গোষ্ঠী, ফয়সালের নৃত্যের তালে তালে একাডেমী, মহসীনের নিত্য গোষ্ঠী, ইএসডিও'র আদিবাসী শিল্পী পরিষদ সাংস্কৃতিক অঙ্গন মাতিয়ে রেখেছে।

নদীসমূহ[সম্পাদনা]

পীরগঞ্জ উপজেলায় ৩ টি নদী রয়েছে। সেগুলো হচ্ছে টাঙ্গন নদী, কাহালাই নদীলাচ্ছি নদী[৪][৫]

ক্রীড়াঙ্গন[সম্পাদনা]

শিক্ষা সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাশাপাশি ক্রীড়াঙ্গনেও পিছিয়ে নেই পীরগঞ্জ। অন্যান্য খেলাধুলার সাথে মহিলা ফুটবলে অভাবনীয় কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে পীরগঞ্জ মহিলা ফুটবল দল। উপজেলার কোষারানিগঞ্জ ইউনিয়নের রামদেবপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের নিয়ে বিদ্যালয়ের শিক্ষক বাদশারুলের একান্ত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠা মহিলা ফুটবল দলটি বেশ কয়েক বছর ধরে ঠাকুরগাঁও জেলা দল হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে। এই দলের খেলোয়াড় মুনমুন ইতিমধ্যে জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা ফুটবল দলে। এছাড়াও ঢাকার আবাহনী ক্লাবের হয়েও বিভিন্ন টুর্নামেন্টে অংশ নিয়ে বর্তমানে বাংলাদেশ আনসার ভিডিপি মহিলা ফুটবল দলের স্থায়ী সদস্য সে। এ দিকে জাফুরা, মনসা, মৌসুমী, হামিদা, বেবী, মনিকা, সন্ধ্যা, নিপা বিভিন্ন ফুটবল লীগ/টুর্নামেন্টে ঢাকার মহামেডান ক্লাব, আরামবাগ ক্লাবসহ বিভিন্ন ক্লাবের হয়ে খেলায় অংশগ্রহণ করে অভাবনীয় সাফল্য অর্জন করেছে। এছাড়া স্থানীয় আজাদ স্পোর্টিং ক্লাব, বিএনএস ক্লাব ও উদয়ন ক্লাবের অবদানও উল্লেখযোগ্য।

কৃতী ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

  • অধ্যাপক গোলাম মোস্তফা - শহীদ বুদ্ধিজীবী;
  • ইকরামুল হক - সাবেক এমসিএ ও বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানের স্বাক্ষরকারী;
  • শহীদুল্লাহ শহীদ - রাজনীতিবিদ(ওয়াকার্স পার্টি), সাবেক সংসদ সদস্য;
  • মোঃ ইমদাদুল হক - রাজনীতিবিদ(আওয়ামীলীগ), সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য;
  • হাফিজ উদ্দীন আহম্মেদ - রাজনীতিবিদ(জাতীয়পার্টি), সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য ও সাবেক জেলা চেয়ারম্যান;
  • মোকলেসুর রহমান - রাজনীতিবিদ(আওয়ামীলীগ), সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য;
  • ডা: আব্দুল মালেক - রাজনীতিবিদ(ন্যাপ)-সাবেক জাতীয় সংসদ সদস্য। পীরগঞ্জের রাজনৈতিক সম্রাট হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তি।
  • মরহুম এম এ গফফার- অধ্যাপক, রাজনীতিবিদ(বিএনপি), পীরগঞ্জ পৌরসভার প্রথম মেয়র ও প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান;
  • মোঃ গোলাম হোসেন - রাজনীতিবিদ(জাতীয় পার্টি), সাবেক পৌর মেয়র, সাবেক নাট্য শিল্পী;
  • কশিরুল আলম - রাজনীতিবিদ(আওয়ামী লীগ), বর্তমান পৌর মেয়র;
  • ইসাহাক আলী- রাজনীতিবিদ(জাতীয় পার্টি), সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান;
  • ডাঃ আব্দুর রাজ্জাক, - রাজনীতিবিদ(ন্যাপ;)
  • রাজিউর রহমান রাজু -সাবেক পৌর মেয়র, রাজনীতিবিদ(বিএনপি);
  • জিয়াউল ইসলাম জিয়া - উপজেলা চেয়ারম্যান ও রাজনীতিবিদ(বিএনপি);

উল্লেখযোগ্য স্থান[সম্পাদনা]

  • রাজভিটা - জাবরহাট ইউনিয়ন।
  • পীরডাঙ্গী কবরস্থান - বাংলাদেশের সর্ব বৃহৎ কবরস্থান।
  • ফানসিটি শিশুপার্ক - পীরগঞ্জ পৌরসভার বিপরীত দিকে।
  • শালবন - থুমনিয়া, সাগুনী ও জগন্নাথপুর।
  • সাগুনী রাবার ড্যাম।

প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন[সম্পাদনা]

ক) রাজভিটাঃ একটি ইতিহাসসমৃদ্ধ প্রাচীন এলাকা পীরগঞ্জের জাবরহাট ইউনিয়নের হাটপাড়া গ্রামের টাঙ্গন নদীর তীর ঘেঁষে বিস্তীর্ণ উঁচু স্থানটি রাজভিটা নামে পরিচিত যা ইতিহাস অনুসন্ধানীদের আর্কষণীয় স্থান। এই স্থানে একটি প্রাচীন কষ্টিপাথরের শিলালিপিসহ পুরনো ইটের অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গেছে। আরও পাওয়া গেছে কালো পাথরের বড় বড় খন্ড। ২ ফুট ৬ ইঞ্চি ( ১ ফুট ৩ ইঞ্চি মাপের প্রাপ্ত শিলা লিপিটির ওজন আনুমানিক ১ মণ। এতে যে অক্ষর উত্কীর্ণ রয়েছে তা পাঠোদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তবে এতে যে, চিত্র উত্কীর্ণ আছে তা উট, শূকর ও ঘোড়ার বলে ধারণা করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তিগণ এগুলো শের শাহ আমলের প্রত্নতাত্ত্বিক নির্দশন বলে অনুমান করছেন। এ রাজভিটা ্প্রায় ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ২৫০ মিটার প্রস্থ। রাজভিটা থেকে ৩ কিলোমিটার দক্ষিণে শের শাহ্ আমলে নির্মিত ঐতিহাসিক পূর্ণিয়া সড়ক থাকার কারণে অনেকেই রাজভিটাকে শের শাহ্ আমলের জমিদারীর নির্দশন বলে ধারণা করছেন। দিনাজপুর সরকারি মহিলা কলেজের শিক্ষক ড. এম এ গনি এই রাজভিটার উপরে গবেষণা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।

খ) ভিমটিয়া শীবমন্দির নাকি ইমামবাড়া ঃ
পীরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ২ কিঃ মিঃ পূর্বে ভিমটিয়া গ্রামে রয়েছে একটি প্রাচীন অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ। অট্টালিকাটি ৩/৪শ বছর পূর্বের বলে স্থানীয় অধিবাসীরা জানান। উক্ত অট্টালিকার চূড়াসহ পূর্ব ও দক্ষিণের দেয়াল ধসে পড়েছে। এখনও উত্তর ও পশ্চিমের দেয়াল দাঁড়িয়ে আছে। অট্টালিকার পাশের বাড়ীর নবতিপর বৃদ্ধ মনতাজ আলী ও আমির হোসেন এবং ইলিয়াস আলী জানান দক্ষিণের ভেঙ্গে পড়া দেয়ালে দরজা ছিল। উক্ত অট্টালিকার দরজায় ও দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে নক্শা আছে । অট্টালিকার উচ্চতা সরজমিন থেকে অনুমান ৪০ ফুট। ঠাকুরগাঁও পরিক্রমায় এই ধ্বংসাবশেষটিকে শীবমন্দির বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু ভীমটিয়া গ্রামের আলহাজ্ব ওমর ফারুখ জানান, তাদের গ্রামে কখনো হিন্দু বসতি ছিল না। পীরগঞ্জ সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক মোঃ বদরুল হুদা প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষক ড. গনি'র উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, নির্মাণ শৈলীর বিচারে ভিমটিয়া গ্রামের ধ্বংসাবশেষটি শীব মন্দির নয়, ইমামবাড়া।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন ২০১৪)। "এক নজরে পীরগঞ্জ উপজেলা"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। ১৫ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ২৪ মার্চ ২০১৫ 
  2. "পীরগঞ্জের ইতিহাস ঐতিহ্য :: দৈনিক ইত্তেফাক"archive.ittefaq.com.bd। সংগ্রহের তারিখ ২০১৯-০২-০২ 
  3. http://pirganjthakurgaon.yolasite.com
  4. ড. অশোক বিশ্বাস, বাংলাদেশের নদীকোষ, গতিধারা, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি ২০১১, পৃষ্ঠা ৩৩৫, আইএসবিএন ৯৭৮-৯৮৪-৮৯৪৫-১৭-৯
  5. মানিক মোহাম্মদ রাজ্জাক, বাংলাদেশের নদনদী: বর্তমান গতিপ্রকৃতি, কথাপ্রকাশ, ঢাকা, ফেব্রুয়ারি, ২০১৫, পৃষ্ঠা ৬১৭, ISBN 984-70120-0436-4.

5. দৈনিক ইত্তেফাক (পীরগঞ্জের ইতিহাস ও ঐতিহ্য)

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]