কালীগঞ্জ উপজেলা, লালমনিরহাট

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
কালীগঞ্জ
উপজেলা
কালীগঞ্জ বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
কালীগঞ্জ
কালীগঞ্জ
বাংলাদেশে কালীগঞ্জ উপজেলা, লালমনিরহাটের অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৫°৮′২″ উত্তর ৮৯°১২′৫১″ পূর্ব / ২৫.১৩৩৮৯° উত্তর ৮৯.২১৪১৭° পূর্ব / 25.13389; 89.21417স্থানাঙ্ক: ২৫°৮′২″ উত্তর ৮৯°১২′৫১″ পূর্ব / ২৫.১৩৩৮৯° উত্তর ৮৯.২১৪১৭° পূর্ব / 25.13389; 89.21417 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশ  বাংলাদেশ
বিভাগ রংপুর বিভাগ
জেলা লালমনিরহাট জেলা
আয়তন
 • মোট ২৩৬.৯৪ কিমি (৯১.৪৮ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১)
 • মোট ২,৪৫,৫৯৫[১]
স্বাক্ষরতার হার
 • মোট ৪৭.৫%
সময় অঞ্চল বিএসটি (ইউটিসি+৬)
ওয়েবসাইট অফিসিয়াল ওয়েবসাইট উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন

কালীগঞ্জ বাংলাদেশের লালমনিরহাট জেলার অন্তর্গত একটি উপজেলা

অবস্থান[সম্পাদনা]

কালীগঞ্জ উপজেলার আয়তন ২৩৬.৯৬ বর্গ কিলোমিটার। এর উত্তরে হাতীবান্ধা উপজেলা ও ভারতের কুচবিহার জেলা, পূর্বে আদিতমারী উপজেলা, পশ্চিমে জলঢাকা উপজেলা (নীলফামারী জেলা) এবং দক্ষিনে গংগাচড়া উপজেলাকিশোরগঞ্জ উপজেলা অবস্থিত।

প্রশাসনিক এলাকা[সম্পাদনা]

পূর্বে কালীগঞ্জ থানা ফুরুনবাড়ী নামে অভিহিত ছিল। ভারতের কোচবিহার রাজ্যের সাথে সম্পর্ক যুক্ত থাকলেও মূলত রংপুর জেলার অধীনস্থ উত্তর সীমান্তে অবস্থান ছিল। শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য ঊনবিংশ শতাব্দির পূর্ব ভাগে বর্তমানের গোড়ল মৌজার ফুরুন বাড়ীতে একটি পুলিশ ফাড়ি স্থাপিত হয়েছিলো। ১৩০৪ বঙ্গাব্দে বেঙ্গল ডুয়ারস রেলপথ (বিডি আর) প্রতিষ্ঠিত হলে অপেক্ষাকৃত ভালো যোগাযোগের প্রয়োজনে ফুরুনবাড়ী পুলিশ ফাড়িটি কালীগঞ্জে স্থানান্তিত করা হয়।

১৭৯৩ খ্রীস্টাব্দে ১২ নং রেগুলেশন অনুযায়ী রংপুর জেলার ২১ টি থানা নিয়ে রংপুর জেলা সৃষ্টি হয় , তার মধ্যে কালীগঞ্জ হাতিবান্ধা ও আদিতমারী অঞ্চল নিয়ে ফুরুনবারি থানা গঠিত ছিল। বুকাননের সার্ভে রিপোর্টে (১৮০৬-১৬) সে সময়ে রংপুর জেলা (জলপাইগুড়িসহ) ২৪ টি থানায় বিভক্ত ছিল এবং ফুলবাড়িথানার আয়তন ছিল ১৮০ বর্গ মাইল । ধারনা করা হয় কালীগঞ্জ, হাতিবান্ধা এবং আদিত্মারি থানার বহু অংশ সে সময়ের ফুরুনবাড়ি সীমানার বাইরে ছিল । কারণ বর্তমানে উক্ত ৩ টি থানার সীমানা আদিতমারী - ৭৫ বর্গমাইল , কালীগঞ্জ- ৯২ বর্গমাইল এবং হাতিবান্ধা - ১১২ বর্গমাইল, মোট ২৭৯ বর্গমাইল ।

রংপুর জেলার ভবানিগঞ্জ (গাইবান্ধা), তিনটি থানার সমম্বয়ে গাইবান্ধা, গোবিন্দগঞ্জ এবং সুন্দরগঞ্জনিয়ে ১৮৫৭ সালে মহকুমা সৃষ্টি হয়। বাকি থানা গুলো জেলা-সদর মহকুমার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৮৭৫ সালে সদর মহকুমাকে ২ টি মহকুমায় (রংপুর সদর ও নীলফামারী)বিভক্ত করলে নতুন ভাবে থানা বিন্যাসে ৫ টি থানা নিয়ে রংপুর সদর মহকুমার আয়তন দাড়ায় ১১৪১ বর্গমাইল। তখন বর্তমানে কালীগঞ্জ বা সে সময়ের ফুরুনবারির আয়তন হয় ২৩৫ বর্গমাইল। ১৯০১ সালের আদমশুমারি রিপোর্টে ফুরুনবাড়িথানা ১৮৭৫ সালে কালিগঞ্জে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে তুশভান্দার জমিদারীর (দু আনা কাজিরহাট) তখন একটি বড় বন্দরে পরিনত হয়। সে সময়ের তিস্তা নদী কালীগঞ্জের পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয়। পরবর্তীতে তিস্তা নদী সড়ে গিয়ে গঙ্গাচরার পাশ দিয়ে প্রবাহিত হয় । ১৯১৩ সালে হাতিবান্ধা থানা সৃষ্টির পূর্ব পর্যন্ত কালীগঞ্জ থানা রংপুর জেলার সর্ব উত্তরে অবস্থিত সীমান্তবর্তিত থানা হিসেবে পরিচিত ছিল । ১৯৮১ সালের ৯ ই এপ্রিল পর্যন্ত কালীগঞ্জ ১৬ টি ইউনিয়নের সমম্ব্যে একটি বিশাল থানা ছিল। ঐ সালের ১০ ই এপ্রিল ৮ টি ইউনিয়ন ভেঙ্গে আদিত্মারি থানার সৃষ্টি হয় । ১৯৮২ সালের ১৫ ই ডিসেম্বর কালীগঞ্জ থানা উপজেলায় উন্নীত হয়।এ উপজেলার প্রথম উপজেলা নির্বাহী অফিচার হিসেবে যোগদান করেন জনাব মোঃ আনছার আলী এবং প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন আলহাজ করিম উদ্দিন আহমেদ। ।২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে লালমনিরহাট-২ (কালীগঞ্জ-আদিতমারী) আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ । তিনি ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিযুক্ত হন খাদ্য মন্ত্রণালয়ে তিনি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতার সাথে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত সফলভাবে পালন করায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাকে ১৯ জুন ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি কে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব প্রদান করেন এবং ২১ জুন, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

কাকিনা জমিদার বাড়ি ও জমিদার বংশ: বর্তমানে কালিগঞ্জ উপজেলাধীন কাকিনা ইউনিয়নের কাকিনা মৌজায় এক কালে গড়ে উঠেছিলো বড় বড় ইমারত বিশিষ্ট জমিদার বাড়ি , যা কালের স্রোতে নিশ্চিহ্ন হোয়ে গেছে । কাকিনা জমিদার বাড়ির অতিত সৃতি ধারণ করে এখন নীরবে দারিয়ে রয়েছে শুধু মাত্র –‘ হাওয়াখানা ‘ । ইতিহাস বিশ্লেষণে জানা যায়, মহারাজা মোদ নারায়ণের সময় কাকিনা ছিল কোচবিহার রাজ্জাধিন একটি চাকলা । তৎকালে কাকিনার চাকলাদার ছিলেন ইন্দ্র নারায়ন চক্রবর্তী । ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে ঘোড়া ঘাটের ফৌজদার এবাদত খাঁ মহারাজা মোদ নারায়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে কোচ রাজ্যে অভিযান চালানোর সময় রঘু রামের দুই পুত্র রাঘবেন্দ্র নারায়ন ও রাম নারায়ন ফৌজদারের পক্ষ অবলম্বন করেন। মোগলদের এ অভিযানে কোচ বাহিনী পরাজিত হলে ইন্দ্র নারায়ন চক্রবর্তীকে কাকিনার চাকলাদার পদ থেকে অপসারন করা হয় এবং রাঘবেন্দ্র নারায়ণকে পরগণা বাষট্টি ও রাম নারায়নকে পরগণা কাকিনার চৌধুরী নিযুক্ত করা হয় । এভাবেই ইন্দ্র নারায়ন চক্রবর্তীর চাকলাদারি শেষ হোয়ে কাকিনায় রাম নারায়নের মাধ্যমে নতুন জমিদারীর সূচনা ঘটে । রাম নারায়ন চৌধুরীর পিতা রঘু রাম সম্পর্কে যতদূর জানা যায় , চাকলাদার ইন্দ্র নারায়ন চক্রবর্তীর সময় তিনি কাকিনা চাকলার একজন সাধারণ কর্মচারী ছিলেন। তবে রঘু রামের পিতা রমানাথ ১৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে কোচবিহার মহারাজা প্রাণ নারায়ণের সময় (১৬৩২-৬৫খ্রিঃ) রাজ দপ্তরে মজুমদারেরে কাজে নিয়োজিত ছিলেন । যা হোক , ১৬৮৭ খ্রিস্টাব্দে রাম নারায়ণ কাকিনা পরগণার চৌধুরী নিযুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে কাকিনায় যে জমিদারীর সূচনা ঘটেছিল , জমিদার মহেন্দ্র রঞ্জনের সময় তার অপরিণামদর্শী খরচ ও বিলাসিতার কারণে তা ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। মহাজনদের বকেয়া ও সরকারি রাজস্ব পরিশোধে সক্ষম না হওয়ায় ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে তার জমিদারী নিলাম হোয়ে যায় । ১৯২৬- ৩০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় তিনি সপরিবারে কাকিনা ত্যাগ করে কাসিয়াং ( দার্জিলিং) –এ চলে যান । ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের দিকে সেখানেই তার জীবনাবসান ঘটে। কাকিনা জমিদার বংশ তালিকায় যে কয়েকজন জমিদারের উল্লেখ পাওয়া যায়, তারা হলেন- ১। রাম নারায়ণ চৌধুরী ( জমিদারীর সূচনা- ১৬৮৭ খ্রিঃ) ২। রুদ্র রায় চৌধুরী ৩। রসিক রায় চৌধুরী ( অপুত্রক অবস্থায় মারা যান । স্ত্রী অলকানন্দা পরে জমিদারী চালান এবং দত্তক পুত্র গ্রহণ করেন ) ৪। রাম রুদ্র রায় চৌধুরী ( দত্তক পুত্র। ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জমিদারী চালান) ৫। শম্ভু চন্দ্র রায় চৌধুরী ( মৃত্যু – ১৮৬৮ খ্রিঃ) ৬। মহিমা রঞ্জন রায় চৌধুরী (দত্তক পুত্র । জন্ম -৩ ফেব্রুয়ারি ১৮৫৩ খ্রিঃ এবং মৃত্যু -১ এপ্রিল ১৯০৯ খ্রিঃ) ৭। মহেন্দ্র রঞ্জন রায় চৌধুরী ( ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দের দিকে নিলামের মধ্য দিয়ে জমিদারীর সমাপ্তি ) বর্ণিত জমিদার গণের মধ্যে সবচেয়ে বেশী সময় ধরে জমিদারী পরিচালনা করেন শম্ভু চন্দ্র রায় চৌধুরী । বড় বড় ইমারত বিশিষ্ট জমিদার বাড়ি তাঁর সময়ই নির্মিত হয়েছিলো বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। জমিদার মহিমা রঞ্জন চৌধুরীর আমলে এখানে একটি যাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো । ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যুর পর তদীয় পুত্র মহেন্দ্র রঞ্জন রায় চৌধুরী জাদু ঘরের স্থলে ‘মহিমা রঞ্জন মেমোরিয়াল হাই ইংলিশ স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমানে ‘কাকিনা মহিমা রঞ্জন সৃতি দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়’ নামে পরিচিত ।

স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান[সম্পাদনা]

  • ইশোরকোল উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • দলগ্রাম দ্বি-মুখী উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • তালুক শাখাতী উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • করিম উদ্দিন কলেজ ।
  • করিমপুর দাখিল মাদ্রাসা ।
  • করিম উদ্দিন একাডেমি।
  • কালীগঞ্জ পলিটেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট।
  • মদনপুর বৈরাতি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ।
  • দক্ষিণ ঘনেশ্যাম করিম উদ্দিন সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।
  • মধ্য ঘনেশ্যাম প্রাথমিক বিদ্যালয় ।
  • কাশিরাম সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ।
  • কাশিরাম আঃ গফুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।
  • হাজরানিয়া উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • ভোট্মারী এস সি উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • গাগলার পাড় উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • শাখাতি দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়।
  • বারাজান এস সি উচ্চ বিদ্যালয়।
  • চাপারহাট উচ্চ বিদ্যালয়।
  • বানিনগর উচ্চ বিদ্যালয়।
  • কাকিনা মহিমা রঞ্জন স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • তুষভান্ডার রমনীমোহন সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়।
  • তুষভান্ডার নছর উদ্দিন সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • জছির উদ্দিন বিদ্যা নিকেতন ।
  • তুষভান্ডার সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ।
  • বাবুর আলী পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • এন জামান সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় ।
  • দক্ষিণ ঘনেশ্যাম উচ্চ বিদ্যালয় ।
  • চন্দ্রপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়।
  • চন্দ্রপুর হাই স্কুল এন্ড কলেজ।
  • নওদাবাস এস এস সি (ভোকেশনাল) & দাখিল মাদ্রাসা(চন্দ্রপুর)।
  • গফুরপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়।
  • লোহাকুচি উচ্চ বিদ্যালয়

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

অর্থনৈতিক মেরুদন্ড কৃষি । কৃষিজাত পণ্যের মধ্যে ধান.পাট, তামাক, ভুট্টা, গম, শাক-সবজি উল্লেখযোগ্য

সামাজিক সংগঠন[সম্পাদনা]

গোড়ল ছাত্র কল্যাণ সংঘ, লালমনিরহাট

কৃতী ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

  • শেখ ফজলল করিম: নীতিবাদী সাহিত্য সাধক। জন্ম – বাংলা ১২৮৯ সালের ৩০ চৈত্র ( ইতিহাস গবেষক সমর পালের মতে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দের ১৪ এপ্রিল )- মৃত্যু ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে ২৮ সেপ্টেম্বর।

* করিম উদ্দিন আহমেদ: লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার একজন আলোকিত মানুষ আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমদ। জন্মস্থান গ্রাম- কাশীরাম, ডাকঘর- করিমপুর, উপজেলা- কালীগঞ্জ, জেলা- লালমনিরহাট। জন্মসন- ১৯ মার্চ ১৯২৩ সাল। তাঁর পিতার নাম মৌলভী আছিম উদ্দিন আহমদ, মাতার নাম নেছাবি বেওয়া।

তাঁর জন্ম সাধারণ কৃষক পরিবারে হলেও কর্মের জোরেই অবস্থার দিন দিন পরিবর্তন ঘটে। ১৯৪৫ সালে প্রথম ব্যবসায় হয় তাঁর হাতেখড়ি। কিছুদিন মাড়োয়ারীর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চাকুরী ও পরে স্বল্প পুঁজির ব্যবসা তিনি শুরু করেন। নানা মহলের আস্থাভাজন ও বিশ্বস্ততার কারণে কোলকাতা, ভৈরব, নারায়নগঞ্জ, চট্টগ্রাম, ঝালকাঠি ও সিলেটসহ বিভিন্ন জায়গায় তাঁর পাট ও তামাক ব্যবসা সম্প্রসারিত হয়ে পড়ে। ফলে এলাকায় একজন বিত্তশালী ও সংবেদনশীল মানুষে পরিণত হন তিনি।

তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা মদনপুর বৈরাতির নিলাম্বর পন্ডিতের পাঠশালায়। পরে রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার অন্তর্গত চিলাখাল পাইকান মাদ্রাসা থেকে তিনি ‘খারিজি’ পাশ করে পাকুরিয়া শরীফ মাদ্রাসায় তিনি ভর্তি হন। অবশেষে তুষভান্ডার উচ্চ বিদ্যালয়ে দশম শ্রেনী পর্যন্ত তিনি পড়াশুনা করেন।

১৯৫৪ সালে ইউনিয় বোর্ডে নির্বাচিত হওয়ার মাধ্যমে জনসেবায় তিনি আত্মনিয়োগ করেন। একনাগাড়ে ষোল বছর তিনি ইউনিয়ন বোর্ডে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। সাবেক পূর্ব পাকিস্তান আমলে কালীগঞ্জে একটি উন্নয়ন পরিষদ গঠন করা হয়। তিনি এই পরিষদের সেক্রেটারী মনোনীত হন এবং উন্নয়ন কর্মকান্ডে অবদানের জন্য ‘গভর্ণর’ পুরস্কারে ভূষিত হন। ১৯৭০ সালে তিনি সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। করিম উদ্দিন আহমদ তরুণ বয়সেই ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনে মুকুন্দ দাশের অন্যতম সহযোগী ছিলেন। তিনি এ আন্দোলনের ভলান্টিয়ার হিসেবে তুষভান্ডার বাজারে খাজনা বন্ধ করতে গেলে গ্রেফতার হন। মূলত গরীব দুঃখী মানুষের পাশে থেকে তাদের স্বার্থই তিনি উপলব্ধি করেছেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় তাঁরই প্রেরণায় প্রথম শহীদ মিনার ‘চিরঞ্জবী কালীগঞ্জ’ নির্মিত হয়। তিনি ১৯৫৯ সালে কালীগঞ্জ করিম উদ্দিন পাবলিক পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় স্থাপন করেন। বর্তমানে এটি কালীগঞ্জ উপজেলার শীর্ষস্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বর্তমানে ‘করিম উদ্দিন স্মৃতি বৃত্তি পরীক্ষা’ চালু করে এবং মেধানুসারে প্রথম হতে দশম স্থান প্রাপ্তদের পুরস্কার ও সনদপত্রের ব্যবস্থা রেখেছেন। ১৯৭২ সালে করিম উদ্দিন পাবলিক ডিগ্রী কলেজ ও ১৯৭৩ সালে করিম উদ্দিন প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা ক্ষেত্রে তাঁর বক্তব্য বিষয়কে পরিস্কার করে গেছেন। ১৯৭৩ সালে করিমপুর নেছাবিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও এতিম খানা প্রতিষ্ঠা করেন। এছাড়াও থানার অসংখ্যা স্কুল মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা হিসেবে এলাকায় স্মরণীয় হয়ে আছেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধের সময় করিম উদ্দিন আহমদ কালীগঞ্জ সংগ্রাম পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। সাবেক ইপিআর, আনসার ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তিনি মুক্তিবাহিনী গঠন করেন। তাঁর নিজস্ব বাসভবনে এর প্রধান কার্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ ৪ মাস এলাকাটি ‘মুক্ত’ এলাকা হিসেবে থাকায় স্থানীয় যুবকদের এখানে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এসময় তিনি কালীগঞ্জ মাঠে এক বিশাল জনসভায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। পরে পাক বাহিনীর দখলের কারণে তিনি কুচবিহার জেলার সিতাই থানায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। সেখানে স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সম্মতিক্রমে তিনি দুটি যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাংলাদেশী যুবকদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণদানের ব্যবস্থা করেন। পরবর্তীতে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগে কিনি মুক্তিযুদ্ধের সহায়তা করেন। এই সময় তিনি উত্তরাঞ্চলীয় মুক্তিবাহিনীর সংগঠক হিসেবে বাংলাদেশ ও ভারতে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের শেষ কয়েক মাস তাঁর বাড়ীটি পাকবাহিনীর কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্বাধীনতা উত্তরকালে বিধ্বস্ত এলাকাটিতে পূর্নগঠনে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। সীমান্তবর্তী ভারতীয় জেলা কুচবিহারের সরকারী কর্তৃপক্ষের সম্মতি নিয়ে তিনি এলাকায় সর্বস্বহারা কৃষকদের মধ্যে হালের গরু বিতরণসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির সরবরাহের ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তাঁর একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় ‘রংপুর- দিনাজপুর পল্লী সংস্থা’ (আরডিআরএস) প্রতিষ্ঠিত হয়। সংস্থার প্রধান মিঃ হুডনিকে এলাকায় নিয়ে এসে এর প্রধান কার্যালয় স্থাপন করা হয়। এটি এখনও বিভিন্ন কার্যক্রম চালু রেখেছে।

১৯৭৩ সালে তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একজন ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন। ১৯৮৫ সালে জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে তিনি প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৯০ সালের ১৭ই মার্চ তার জ্যেষ্ঠ পুত্র নুরুজ্জামান আহমেদ জনগনের প্রত্যক্ষ ভোটে উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হলে তার হাতে রাজনীতির হাল ছেড়ে দিয়ে রাজনীতি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। করিম উদ্দিন আহমদ শুধু রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিত্ব নন তিনি সাহিত্য ও সংস্কৃতি অনুরাগী ছিলেন। লোকসাহিত্য ও আঞ্চলিক ভাষার গবেষক ধর্মনারায়ণ সরকার ভক্তিশাস্ত্রীকে তাঁর রচিত গবেষণা গ্রন্থ ‘উত্তর বাংলার লোকসাহিত্য ও ভাষা’ গ্রন্থ প্রকাশে মুদ্রণ ব্যয় বহন করে তিনি উৎসাহিত ও অনুপ্রাণিত করেছেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় উপজেলার অন্যতম সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘অন্বেষা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী’ প্রতিষ্ঠা পায়।

লালমনিরহাট কালীগঞ্জের কীর্তিমান পুরুষ করিম উদ্দিন আহমদ ১৯৯১ সালের ২৮শে আগষ্ট তারিখে নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।

নুরুজ্জামান আহমেদঃ  বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাশিরাম গ্রামে ১৯৫০ সালের ৩ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি এক সম্ভ্রান্ত রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। তাঁর পিতা আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমেদ দু’বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম নূর জাহান বেগম।জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ তৃণমূল রাজনীতিতে একজন সফল এবং সৎ রাজনীতিবিদ হিসেবে সুপরিচিত মুখ। তিনি তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়া বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাথে ছাত্রজীবন থেকেই সম্পৃক্ত। জনাব নুরুজ্জামান আহমেদের পিতা আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমেদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খুব কাছের রাজনৈতিক সহচর হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নিজ পিতার রাজনৈতিক আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ ছাত্রজীবনেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সক্রিয় সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেন। জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, পেশা নির্বিশেষে সকল মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। তৃণমূলে বিপুল কর্মীবাহিনী তাঁর রাজনৈতিক জীবনের প্রধান চালিকাশক্তি ও হাতিয়ার। রাজনৈতিক জীবনের শুরুতে জনগণ তাঁকে স্থানীয় সরকারের ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত করে। পরবর্তীতে তিনি গণপজাতন্ত্রী বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।তৃণমূল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে ১৯৮৩ সাল থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ১৯৯০ ও ২০০৯ সালে দু’বার তিনি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের প্রার্থী হিসেবে লালমনিরহাট-২ (কালীগঞ্জ-আদিতমারী) আসন থেকে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিযুক্ত হন। খাদ্য মন্ত্রণালয়ে তিনি স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও দক্ষতার সাথে তাঁর ওপর অর্পিত দায়িত্ব অত্যন্ত সফলভাবে পালন করেন।১৯ জুন ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি কে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে মন্ত্রণালয়ের পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব প্রদান করা হয় এবং ২১ জুন, ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।মাননীয় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি’র আরও একটি বড় পরিচয় হচ্ছে তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর বাবা জনাব আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমেদও একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।মাননীয় সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী জনাব নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি উত্তরবঙ্গের বিখ্যাত কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ১৯৬৯ সালে কৃতিত্বের সাথে বি.কম ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি ১৯৬৭ সালে এইচ.এস.সি ও ১৯৬৫ সালে লালমনিরহাট জেলার তুষভান্ডার হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সাথে এস.এস.সি পরীক্ষায় উত্তির্ণ হন।রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি মাননীয় প্রতিমন্ত্রী জনাব নুরুজ্জামান আহমেদের সাহিত্য, কবিতা ও গান নিয়ে রয়েছে প্রগাঢ় আগ্রহ। অবসর সময়ে তিনি কবিতা আবৃত্তি চর্চা করেন। অবসরে গান শোনাও তাঁর প্রিয় অভ্যাস। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর অন্যতম প্রিয় কবি। কবিতায় মাননীয় প্রতিমন্ত্রীর প্রিয় উদ্ধৃতির একটি হচ্ছে রবি ঠাকুরের কবিতা-“আকাশ ভরা সূর্য তারা, বিশ্ব ভরা প্রাণ,তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।।”ব্যক্তিগত জীবনে মাননীয় প্রতিমন্ত্রী বিবাহিত এবং ৩ সন্তানের গর্বিত পিতা। তাঁর সহধর্মীনির নাম হোসনে আরা বেগম। মাননীয় প্রতিমন্ত্রী’র প্রথম সন্তান পারমিতা জামান চৌধুরী, ২য় সন্তান জনাব রাকিবুজ্জামান আহমেদ ও ৩য় সন্তান শাকিলা আজাদ। 

তিনি ২৬ আগস্ট ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র হজ্জব্রত পালনের লক্ষ্যে সৌদি আরব গমন করেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন, ২০১৪)। "এক নজরে কালীগঞ্জ উপজেলা"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সংগৃহীত ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৪ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]