ঘোড়াঘাট উপজেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
ঘোড়াঘাট
উপজেলা
ঘোড়াঘাট বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
ঘোড়াঘাট
ঘোড়াঘাট
বাংলাদেশে ঘোড়াঘাট উপজেলার অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৫°১৪′৪৮″ উত্তর ৮৯°১৩′২″ পূর্ব / ২৫.২৪৬৬৭° উত্তর ৮৯.২১৭২২° পূর্ব / 25.24667; 89.21722স্থানাঙ্ক: ২৫°১৪′৪৮″ উত্তর ৮৯°১৩′২″ পূর্ব / ২৫.২৪৬৬৭° উত্তর ৮৯.২১৭২২° পূর্ব / 25.24667; 89.21722 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশ বাংলাদেশ
বিভাগরংপুর বিভাগ
জেলাদিনাজপুর জেলা
আয়তন
 • মোট১৪৮.৬৭ কিমি (৫৭.৪০ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা [১]
 • মোট১,০৩,১১৯
 • জনঘনত্ব৬৯০/কিমি (১৮০০/বর্গমাইল)
সময় অঞ্চলবিএসটি (ইউটিসি+৬)
প্রশাসনিক
বিভাগের কোড
৫৫ ২৭ ৪৩
ওয়েবসাইটপ্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট Edit this at Wikidata

ঘোড়াঘাট উপজেলা বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা।

অবস্থান[সম্পাদনা]

রংপুর বিভাগের দিনাজপুর জেলার দক্ষিণের সর্বশেষ উপজেলা এটি। এর উত্তরে নবাবগঞ্জ উপজেলা, পূর্বে পলাশবাড়ী উপজেলাগোবিন্দগঞ্জ উপজেলা, দক্ষিণে পাঁচবিবি উপজেলাও গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা এবং পশ্চিমে হাকিমপুর উপজেলা

ঘোড়াঘাট দুুর্গ

ঘোড়াঘাট দুর্গ দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলায় অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম একটি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। প্রাচীন এ দুর্গে খননকার্য পরিচালনার সময় বহু ধর্মীয় ও অন্যান্য স্থাপনার সন্ধান পাওয়া যায় তবে এর মধ্যে কয়েকটি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ ও ঢিবি ব্যতীত তেমন কিছু অবশিষ্ট নেই।

প্রশাসনিক এলাকা[সম্পাদনা]

ঘোড়াঘাট উপজেলার মোট ৪টি ইউনিয়ন ও ১ টি পৌরসভা রয়েছে; ইউনিয়ন সমূহঃ

  • বুলাকীপুর
  • পালশা
  • সিংড়া
  • ঘোড়াঘাট
পৌরসভার নাম
  • ঘোড়াঘাট পৌরসভা

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৭৯৩ সালে ঘোড়াঘাট অবিভক্ত দিনাজপুর জেলার থানা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।[২]

ঘোড়াঘাট উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

    ঘোড়াঘাট নিঃসন্দেহে একটি প্রাচীন জনপদ- ইতিহাসের নানা সুত্র থেকে সে তথ্য অবগত হওয়া যায়। মহাকালের অমোঘ নিয়মে সময়ের পট পরিবর্তন ও রাজনৈতিক উত্থান পতনের দরুণঅতীতের অনেক ইতিবৃত্ত হারিয়ে গেছে। সরকারি কিংবা বেসরকারি পর্যায়ে লিখিত হয়নি এখানকার কোন অতীত বৃত্তামত্ম। বিচ্ছিন্ন কিছু তথ্য ও বিবরণী সরকারি জেলা গেজেটিয়ারে পাওয়া যায়। স্থানীয় ইতিহাস লিখনের ক্ষেত্রে তা যৎসামান্য মাত্র। যে সম লেখক প্রতিবেদক ঘোড়াঘাট এলাকা পরিদর্শক করে প্রতিবেদন লিপিবদ্ধ করে গেছেন তা ইতিহাস লেখনের ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। জনশ্রম্নতিনির্ভর কিছু ঘটনা পাওয়া যায় যার সবটা ইতিহাস সম্মত নয়। সঠিক তথ্য ও উপাত্তের দুষ্প্রাপ্যাতার কারণেই ঘোড়াঘাটের অতীত বৃত্তান্ত অনেকটা তমসাচ্ছন্ন। তারপরেও নানা উৎস থেকে আহরিত তথ্যের উপর ভিত্তি করে এ জনপদের ধারাবাহিক ইতিবৃত্ত সর্ম্পকেই কিছুটা ধারণা দেবার চেষ্টা করা হয়েছে এই  আলোচ্য অধ্যায়ে।

প্রাচীনকালে ঘোড়াঘাট কোন রাজার অধীনে শাসিত হয়েছে সঠিকভাবে তা জানা যায় না। তবে মহাভারতীয যুগে ( ৫ হাজার বছর আগে) এই ক্ষুদ্র জনপদে মৎস্যদেশের অধীনে ছিল। মৎস্য দেশের রাজধানী ছিল ঘোড়াঘাট থেকে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণ ও পশ্চিম দিকে ‘বিরাট’ নামক জায়গায়। বিরাট রাজার ঘোড়াঘাট আবল ছিল আলোচ্য ঘোড়াঘাটে। মহাভারতের কাহিনীতে বলা হয়েছে , রাজা বিরাটের রাজ সভায় পঞ্চ পান্ডবেরা দ্রৌপদীসহ ছদ্দবেশে ১২ বছর নির্বাসনের এক বছর অজ্ঞাত বাস করেছেন। পান্ডব গণ ছদ্মবেশে রাজা বিরাটের রাজবাড়িতে কর্মচারী হিসেবে কাজ করে। তাদের চালচলনের সন্দেহ হলে জিজ্ঞাসাবাদে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসে। রাজা তাদের আচরণে মুগ্ধ হন এবং পরবর্তীতে কৌরবদের সাথে যুদ্ধ পান্ডবদের পক্ষে রাজা বিরাট অংশ গ্রহণ করেছিলেন। যদিও সে যুদ্ধে রাজাবিরাট ও তৎপুত্র উত্তর মারা যান। যুদ্ধের পরে মৎস্যদেশের চরম ভাগ্যবিপর্যয় দেখা দেয়। পরবর্তীতে কে এই জনপদের রাজা হন তা জানা যায় না ইতিহাস কিংবা অন্য কোন বিবরনী থেকে।

ধারনা করা যায়, ঘোড়াঘাটের দক্ষিণে বোগদহ-সাহেবঞ্জ ও তার আশেপাশের এলাকায় একটি জনপদ ছিল। সেখানকার মাটির গভীরে প্রাচীন সমাজ সভ্যতার পরিচয়বাহী দীঘি-পুকুর, দালান-বাড়ি ও বৌদ্ধকীর্তির ধ্বংসাবশেষ রয়েছে।  স্থানটি নরেঙ্গা রাজার রাজধানী ছিল বলে কোন কোন বিবরনী পাওয়া যায়।খুব সম্ভব বিরাট রাজার পতনের পরে ঘোড়াঘাট এই নরেঙ্গা রাজ্যের অধীনে শাসিত হয়েছে। তবে সে শাসনের বিশদ কোন বিবরণ নেই। এখনো ঐ স্থানটি নরেঙ্গাবাদ নামেই খ্যাত। সেখানে উক্ত নামে একটি ডাকঘরও আছে। বর্তমানে ঐ স্থানটি গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ থানাধীন। ঘোড়াঘাট -গোবিন্দগঞ্জ পাকা রার উভয় পাশে বড় বড় দীঘি পুকুর। পথিকদের দৃষ্টি আকর্ষন করে। দীঘিগুলোই এখন প্রাচীন সমাজ সভ্যতার স্বাক্ষী।

মৌর্য যুগঃ ( খ্রিঃ পূর্ব ৩২৪-১৮৫)

       প্রাচীন ভারতবর্ষে ৬টি ভুক্তির মধ্যে পৌন্ড্রবর্ধন ভুক্তি একটি। ভুক্তি হলো তৎকালীন প্রদেশ সমতুল্য একটি বৃহৎ জনপদ। এই ভুক্তির কেন্দ্রস্থল ছিল বতমান বগুড়ার মহাস্থান গড়ে। এখান থেকেই মৌর্য সম্রাট অশোকের একটি শাসনলিপি প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে এ ধারণা পোষণ করেছেন ইতিহাসবিদগণ। মৌর্য শাসনলিপি প্রাপ্তির পরিপ্রেক্ষিতে এ ধারনা পোষণ করেছেন ইতিহাসবীদ গণ। মৌর্য শাসনকালে ঘোড়াঘাট পৌন্ডবর্ধন ভুক্তির অধীনে শাসিত হয়েছে এটা নিশ্চিত। করতোয়া নদীকেন্দ্রিক প্রাচীন কিরাদীয় সভ্যতার দুটি প্রধান কেন্দ্রের মধ্যে মহাস্থান গড়ের পরেই ছিল ঘোড়াঘাট ও তৎসন্নিহিত এলাকা।  খুব সম্ভব এ অঞ্চলে কিরাদ ও নিষাদ জাতির লোকদের প্রাধান্য ছিল তৎকালে। তাদের হাতেই ঘোড়াঘাট এলাকাসমেত আশেপাশের এলাকার কৃষি কাজের  সূচনা হয়। মৌর্য সম্রাট অশোকের সময় বৌদ্ধ ধর্মের পরিচয়বাহী একাধিক মঠ, বিহার ও স্ত্তপ-এর সন্ধান পাওয়া গেছে পৌন্ড্রবর্ধন  সীমানার মধ্যে। আগেই উলেস্নখ করা হয়েছে, ঘোড়াঘাটের দক্ষিণে সাহেবগঞ্জ এলাকার মাটির গভীরে প্রাচীন সভ্যতার পরিচয়বাহী নগরের  অস্থিত্ব এখনো বিদ্যমান। এ সভ্যতার নিদেশন মৌর্য আমলের আগের বলে দাবি করা যায়। ঘোড়াঘাট মৌর্যযুগে পৌন্ড্রবর্ধনের একটি গুরম্নত্বপূর্ণ এলাকা ছিল, যা পরবর্তী গুপ্ত রাজাদের শাসনাধীনে চলে যায়।

গুপ্ত শাসন: (খ্রিঃ ৩য়- ৬৩৮ পর্যমত্ম)

  মৌর্য শাসনের পরে শুরম্ন হয়  গুপ্ত শাসন। তিনশত বছরের অধিক সময় গুপ্তশাসন বহাল ছিল। গুপ্তরাজারা ভাগিরথী নদীর  পূর্ব  দিকে রাজ্য বিসত্মার নজর দেন তৃতীয় শতাব্দীর পরে। তার আগে ভগিরথী নদী ডিঙ্গিয়ে যারা এ অঞ্চলে আসতো প্রায়শ্চিত্ত না করে তাদের সমাজে নেয়া হতোনা। কিন্তু আধিপত্য বিসত্মারের ক্ষেত্রে ঐ প্রথা বা নিয়ম বেশী দিন টিকে থাকেনি। গুপ্ত রাজারাও ভাগিরথী নদীর পূর্বাঞ্চলে রাজ্য বিসত্মারে মনোযোগী হন। তাদের রাজ্য বিসত্মারের ধারাবাহিকতায়  গুপ্ত রাজাদের বেশ কয়েকজন রাজা এ অঞ্চল শাসন করেছেন। তাদের সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। গুপ্ত যুগের শেষের দিকে পৌন্ডবর্ধন ভূক্তির ৩ টি বিষয়ের সন্ধান পাওয়া পাশ দিয়ে প্রবাহিত ‘কাটা যমুনা’ নদীর পশ্চিম    তীর ছিল  কোটিবর্ষ বিষয়ের পূর্ব   সীমানা।এর কেন্দ্রস্থল ছিল পশ্চিম বঙ্গের গঙ্গারামপুর থানায় । প্রাচীন কোটিবর্ষ বিষয়ের সীমানার মধ্যে দামোদপুর নামে একটি স্থানের পরিচয় পাওয়া যায়(ফুলবাড়ি রেল স্টেশন থেকে ১৩ কি.মি. পশ্চিমে।) আর একই নদীর পূর্বতীর থেকে পূর্ব দিকে করতোয়া নদীর পশ্চিম সীমানা পর্যমত্ম ছিল পঞ্চনগরী বিষয়ের সীমানা। বর্তমান ফুলবাড়ি ,বিরামপুর, নবাবগঞ্জ, হিলিসহ ঘোড়াঘাট ছিল দূর অতীতে পঞ্চনগরী বিষয়ের সীমানাভূক্ত ছোট প্রাচীন জনপদ। কারণ, ঘোড়াঘাটের সীমানার দামোদপুর নামে দ্বিতীয় আর একটি প্রাচীন জনপদ আছে। যা দক্ষিণ দামোদরপুর গুপ্তবংশীয়  রাজা তৃতীয়  কুমার গুপ্তের পুত্র দামোদর গুপ্তের সাক্ষ্য বহন করছে। উভয় জায়গায় পুরাতন দিঘী-পুকুরের অসিত্মত্ব এখনো রয়েছে। ঘোড়াঘাটের দামোদরপুরে আজ পর্যমত্ম কোন গুপ্তবংশীয় রাজার তাম্রলিপি আবিস্কার না হলেও ১৯১৫ সালে ফুলবাড়ীর দামোদরপুর থেকে ৫টি তাম্রলিপি আবিস্কার হয়েছে । পাঁচটি তাম্রলিপির একটি দামোদর গুপ্ত কর্তৃক ২১৪ গুপ্ত সনে (৫৪৩ খ্রি:) উৎকীর্ণ । এটি কোটিবর্ষ নগরীর সচিবালয়  থেকে জারি হয়েছে। ঐ সময় পৌন্ডবর্ধন ভূক্তির ভূক্ত্যপরিক বা প্রদেশপাল ছিলেন মহারাজ দেবভট্টরক।

         এখানে উলেস্নখ্য, পলাশবৃন্দকে বিষয়ের কেন্দ্রস্থল বর্তমান গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বলে কোন কোন গবেষক ধারণা করেন।  গুপ্ত সম্রাটদের শাসনাকালে পৌন্ড্রবর্ধন ভুক্তির সীমানা উত্তরে হিমালয় পর্বতের পাদদেশ থেকে দক্ষিণে পদ্মাতীর পর্যন্ত বিসত্মৃত ছিল। সে হিসেবে পলাশবাড়ী ও ঘোড়াঘাট উলেস্নখিত সীমানার মধ্যেই ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। তখন হয়তো ঘোড়াঘাটের দামোদরপুরে গুপ্তরাজাদের একটি স্থানীয় ছোট শাসন কেন্দ্র ছিল যা পরবর্তীকালে গুরম্নত্ব হারিয়ে ফেললে অন্যত্র প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে। দামোদরপুরের একাধিক দীঘির উচ পাহাড় এখানো পথিকদের মনে নানা কৌতুহল সৃষ্টি করে । বর্তমানে বুলাকীপুর ইউনিয়নের একবটি মৌজা এই দামোদরপুর। সেখানে প্রায় কাছাকাছি ৪/৬ টি দীঘি আছে। এখানো দীঘিগুলো আশেপাশে বসত গড়ে ওঠেনি।

প্রসঙ্গত উলেস্নখ্য ১৯৩০ সালের হিলির বৈগ্রাম থেকে প্রথম কুমার গুপ্তের যে তাম্রলিপি আবিষ্কার হয়েছে তাতে পলাশবৃন্দক ও পুরাণবৃন্দকহরি স্থানের নাম পাওয়া যায়। আলোচ্য ঘোড়াঘাটের আশেপাশে পালশা ও শ্রীহবিহারী নামে দুটি মৌজা আছে। উভয় স্থানে পুরাকীর্তির চিহ্ন বিদ্যমান। খুব সম্ভব তাম্রলিপির পলাশ বৃন্দক ও পুরাণবৃন্দকহরি নামের অপভ্রংশ। সেই গুপ্ত রাজাদের শাসনাকালে এতদাঞ্চলে গড়ে ওঠা বৌদ্ধকীর্তি সমূহ ধ্বংস হয় গুপ্তবংশীয় রাজা শশাংঙ্খের আমলে। ৫৯৩-৬৩৮ খ্রিঃ পর্যমত্ম রাজা শশাংকের রাজত্বকাল। তার রাজধানী ছিল বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার কর্ণসুবর্ণে। তার রাজ্য গৌড় রাজ্য বলে পরিচিত ছিল এবং তিনি বৌদ্ধ বিদ্বেষী ছিলেন। তার অত্যাচারে ঘোড়াঘাটের আশেপাশে গড়ে ওঠা বৌদ্ধকীর্তিসমূহ ধ্বংস হয়ে যায়।  তার অত্যাচারেই ঘোড়াঘাটের দক্ষিণে বোগদহ সাহেবগঞ্জ এলাকার ( বর্তমানে গাইবান্ধা জেলার অমত্মর্গত) বৌদ্ধ সভ্যতার পরিচয়বাহী নগর ও উপাসনালসমূহ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। সমসাময়িক কালে বৌদ্ধধর্ম অনুযায়ী কামরুপের রাজা ভাস্করবর্মা কনৌজ অধিপিতি হর্ষবর্ধনের সাথে মিত্রতাসুত্রে আবদ্ধ হয়ে উত্তর দিক থেকে গৌড়রাজা আক্রমণ করে। ৬৩৮ খ্রিঃ এর যুদ্ধে গৌড়রাজ শশাংক পরাজিত ও নিহত হয়। কিছু দিনের জন্য সমুদয় পৌন্ড্রবর্ধন অঞ্চল ভাস্করবর্মার শাসনাধীনে চলে যায়। বলতে গেলে গুপ্তদের শাসন এখান থেকেই শেষ হয়।

পাল শাসনঃ (৭৫৫-১১৭৫ খ্রিঃ)

    পাল বংশের  প্রতিষ্ঠাতা গোপাল ছিলেন গুপ্তদের অধীনস্থ একজন সামমত্ম রাজা। তার জয়স্কন্দবর বা রাজধানী ছিল ঘোড়াঘাট এর পলস্নরাজ নামক স্থানে। সেখানে নগর, দুর্গ, দীঘিপুকুর ও মন্দিরাদি ছিল সুসজ্জিত। এখনও ঘোড়াঘাটের পালশা, গোপালপুর, পলস্নরাজ, বেলওয়া সেই পাল রাজাদের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। পালরা ক্ষমতায় ছিলেন প্রায় ৪০০ বছর। পালরাজা গোপাল মাৎস্যন্যায় যুগের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে কতিপয় আমত্য ও ছোট রাজাদের পরামর্শে ক্ষমতা গ্রহণ করেন। পরে গুপ্ত দের প্রশাসনিক ও রাজস্ব এলাকাকে অক্ষুন্ন রেখে প্রথম দিকে পৌন্ডবর্ধন নগরীতেই রাজ্যর কেন্দ্রস্থল হিসেবে গড়ে তোলেন রাজধানী। সেখানে রাজধানী হলেও ঘোড়াঘাট তার পার্শ্ববর্তী জনরম্নপে শাসিত হয়েছে সুদীর্ঘকাল। পালদের এলাকা বরেন্দ্র ভূমিকে জনক ভূ হিসেবে দাবি করতেন। অথ্যাৎ পিতৃভূমি। ঘোড়াঘাটের মোট ভূমির প্রায় ৬৫ ভাগ লাল বরেন্দ্র ভূমি। প্রথম রাজা গোপালের মৃত্যুর পরে পুত্র ধর্মপাল ক্ষমতা গ্রহণ করেন। তার সময় পাল রাজ্যের যেমন বিসত্মৃতি ঘটে তেমনি বৌদ্ধ ধর্মেরও বেশ উন্নতি হয়। তিনি পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার, বিক্রমশীলা বৌদ্ধ বিহার ও কুমিলস্না জেলার ময়নামতি বৌদ্ধ বিহার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।

             পালযুগের যে সমসত্ম কীর্তি ঘোড়াঘাট উপজেলা সীমানায় রয়েছে সে সব স্থানের নাম একটু আগেই উলেস্নখ করা হয়েছে। তার মধ্যে ঘোড়াঘাটের পালশা ইউনিয়নের বেলওয়া গ্রামে প্রাপ্ত ২ টি তাম্র লিপি বেশ তাৎপর্যময়। ১৯৪৬ সালে বামনদীঘির দক্ষিণপাড়ে বসবাসকারী খাড়ে সাঁওতালের উঠোন থেকে চুলা খনন কালে দেড় ফুট মাটির নিচে ২ টি তাম্রলিপি আবিষ্কার হয়। তার একটি ছিল রাজা মহীপালের ( ৯৮৮-১০৩৮ খ্রিঃ ) এবং অপরটি ছিল পৌত্র তৃতীয় বিগ্রহ পাল এর (১০৫৫-১০৭০ খ্রিঃ )। প্রথম মহিপালের তাম্রলিপি দ্বারা তার পঞ্চম বিষয়ের অমত্মর্গত পুন্ডলিকা দূতক এর মাধ্যমে পৌন্ডবর্ধন ভুক্তির অমত্মঃপাতি পঞ্চনগরী বিষয়ের অমর্ত্মগত পুন্ডরিকা মন্ডলিস্থ ফাণিতবীথির অধীন ৩ খানা গ্রাম দান করেন। দান গ্রহণ কারী ছিলেন হসিত্মদাস গোত্রের ব্রাহ্মণ জীবথর শর্মা এবং দানের কিছু অংশ ছিল গণেশ্বর সমেত গ্রাম পুস্করিনীর জন্য এবং এ প্রতিষ্ঠানের বিগ্রহের নাম ছিল গণেশ্বর। দ্বিতীয় তাম্রশাসন দ্বারা মহারাজা তৃতীয় বিগ্রহপাল কর্তৃক শ্রীত্রিলোচন নাম দূতক এর মাধ্যমে পৌন্ডবর্ধন ভুক্তির অসিত্মপাতি ফাণিতবীথি বিষয়ের অমত্মর্গত পুন্ডরিক ন্ডলের অধীনে বেলওয়া ও তাম্রলিপিতে উলেস্নখিত ঘোড়াঘাটের চকবয়রা ও বেলওয়া ( বেলস্নাবা )- গ্রাম দুটি যে পাল আমলে এতে কোন সন্দেহ নেই। প্রথম মহীপালের তাম্রশাসনে যে লক্ষ্ণীন্দর দূতক এর নাম উলেস্নখ আছে সেই সুত্র ধরেই এ অঞ্চল বহুল প্রচার লাভ করেছে ‘ বেহুলা লখীন্দরের’ উপাখ্যান। ঐ সময় ঘোড়াঘাটের উত্তরে নবাবগঞ্জ থানা সীমানায় মাহমুদপুর ইউনিয়নের চকজুনিদের পালদের একটি টাকশাল ছিল মর্মে জানা যায়। ১০ঐ স্থানটি বেহুলার বাসর ঘর নামে অবহিত। খুব সম্ভব বেলওয়া নামক স্থানে পালদের পুন্ডরিকা মন্ডলের সাথে নবাবগঞ্জের ছোট শাসন কেন্দ্রের সর্ম্পক ছিল যা উপরে বর্ণিত তাম্রলিপির পাঠ থেকে জানা যায়। তৎকালে এ অঞ্চল হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্টি ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও বসবাস করতো বলে ঐ দুটি তামশাসন আমাদেরকে জানিয়ে দেয়। চকজুনিদ এলাকার পাল আমলের একাধিক নির্দশনের ধ্বংসাবশেষ এখানো বিদ্যমান। ২০০৭ সালে সেখানকার কালাদুর্গীর ধাপ (ঢিপি) আংশিক খননের পরে সেটি বৌদ্ধকীর্তি বলে চিহ্নিত হয়েছে।

সেন আমলঃ ( ১১৬২-১২০৩ খ্রিঃ)

      সেনগণ সম্ভবত চালুক্য রাজ ষষ্ঠ বিক্রমাদিত্যের সঙ্গে বঙ্গদেশে আসেন এবং পশ্চিমবঙ্গের রাঢ় অঞ্চলের প্রথমে বসবাস আরম্ভ করেন। প্রথম দিকে তারা পালদের অধীনে চাকরি গ্রহণ করেন । পাল বংশের দূর্বলতার সুযোগে একাদশ শতাব্দীতে সামমত্ম সেন ও তার পুত্র হেমমত্ম সেন পশ্চিমবঙ্গে একটি ক্ষুদ্র রাজ্য স্থাপন করেন।১৫ সেন রাজারা হলেন সামমত্ম সেন, হেমমত্ম সেন, বিজয় সেন, বলস্নাল সেন, লক্ষণ সেন, পুত্র বিশ্বরম্নপ সেন ও কেশব সেন সহ ৭ জন রাজা। তাদের রাজধানী ছিল গৌড়ের লক্ষ্ণণাবতীতে। রাজা বিজয় সেনের মৃত্যুর পরে (১১৫৮) খ্রিঃ বৌদ্ধ ও হিন্দু নাগরিকগণ সেন শাসনে চরম অত্যাচারে জীবন বাঁচাতে চীন, তিববত, নেপাল, প্রভৃতি দেশে চলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন। সে সময় ঘোড়াঘাট অঞ্চলের বৌদ্ধকীর্তি সমূহ পরিত্যক্ত হয়। লক্ষ্ণণ সেনের সময় তার রাজ্যের পূর্ব সীমানা পূর্বদিকে ( কামরম্নপের অংশ ব্যতীত ) ঘোড়াঘাট সহ ঢাকার সোনারগাঁ পর্যমত্ম বিসত্মৃত ছিল। ঘোড়াঘাটের উত্তরে চতরা হাট  এলাকার রংপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার অমত্মর্গত নীলগড় কামরম্নপ রাজ্যের সীমানা ভুক্ত ছিল। সেখানে সেন বংশীয় রাজাদের আধিপত্য অটুট ছিল। সেন শাসনামলে কামরম্নপের রাজ্যভুক্ত রঙ্গপুরের দক্ষিণাঞ্চল ( চতরা হাট) সেন শাসন মুক্ত ছিল। যাহোক রাজা লক্ষ্ণনসেন এর রাজত্বের শেষ দিকে ১২০৩ খ্রিঃ মুসলিম তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বিন ব্খতিয়ার খলজী মাত্র ১৭ জন ঘোড়াসওয়ার সমেত অতর্কীতে নুদীয় নগরী আক্রমণ করে রাজা লক্ষন সেনকে পূর্ববঙ্গে বিতাড়ন করে বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রথম মুসলিম রাজ্যের গোড়াপত্তন করেন।

তুর্কী শাসনঃ ( ১২০৩-১২২৭ খ্রিঃ)

       তুর্কী বীর ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন-বখতিয়ার খলজি ১২০৩ খ্রিঃ বরেন্দ্র বিজয়ের পরে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন গৌড়ের লক্ষ্ণণাবতীতে (লাখনেসŠতি) । বিজিত অঞ্চলে সুশাসন প্রতিষ্ঠাকল্পে ৩টি বিভাগে ভাগ করে তিন জন শীর্ষস্থানীয় আমীরকে স্থানীয় শাসনকর্তা ( মুকতা) হিসেবে প্রেরণ করেন। তখনকার দিনে প্রশাসনিক এই বিভাগগুলো ইকতা এবং ইকতার শাসনকর্তা নামে অভিহিত ছিল। ইকতাগুলো হলো লাখনৌতি, গঙ্গাতীর ও বরসৌলা। শেষোক্ত ‘বরসৌলা’ আইন ই- আকবরীতে সরকার ঘোড়াঘাটের অমত্মর্গত বরসৌলা এর সর্ম্পক থাকতে পারে বলে বর্ণিত হয়েছে।১৬ ঘোড়াঘাটের উত্তরে নবাবগঞ্জ এর ভাদুরিয়া বাজার থেকে আনুমানিক ২ কিলোমিটার পূর্ব দিকে রাসত্মার ধারে বড়শৌলা নামে একটি গ্রাম আছে। গ্রামের আশেপাশে  দীঘি পুকুর সহ কিছু পুরাকীর্তির চিহ্ন নজরে পড়ে। খুবসম্ভব বীরশালা ( সেনানিবাস) থেকে বরশৌলা নামটি উৎপত্তি ( যদিও এটি কোন মৌজা নয়) এই বরশৌলায় বখতিয়ার এর পূর্বাঞ্চলীয় ইকতা ছিল বলে অনুমান করা যায়।  এই স্থান থেকে উত্তর পূর্ব দিকে ৩ কিলোমিটার দূরে ( ভাদুরিয়ার উত্তরে) প্রাচীন হরিনাথপুর দুর্গের অবস্থান । এই দুর্গের পূর্ব দিকেই বখতিয়ারের ইকতা ছিল বলে তা স্থানের নাম ও আশেপাশের পুরাকীর্তির দৃষ্টে অনুমান করা যায়। বখতিয়ারের বিজিত অঞ্চলের পূর্ব সীমানা যে করতোয়া নদী পর্যমত্ম বিসত্মৃত ছিল এতে কোন সন্দেহ নেই। এই বরশৌলা ইকতার উত্তর সীমানা নির্দেশ করা যায় নবাবগঞ্জ থানার উত্তর পূর্ব সীমানায় ভোটারপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত ঘিরনাই নদী। ঘিরনাইয়ের উত্তরপাড়ে বর্তমান রংপুর জেলার অন্তর্গত হলেও অতীতে কামরুপ রাজ্যের সীমানাভুক্ত ছিল। সমগ্র পাবর্তীপুর , নবাবগঞ্জ, বিরামপুর, ফুলবাড়ী, হাকিমপুর             (কাটাযমুনার পূর্বপাড়) , ঘোড়াঘাট এবং পাঁচবিবি থেকে পূর্বদিকে শেলর্ষ ( বগুড়া) পরগণার অংশ বিশেষ নিয়ে বরশৌলা ইকতার সীমানা নির্ধারিত হয়েছিল বলে অনুমান করা যায়। যার কেন্দ্রস্থল ঘোড়াঘাট এর উপকণ্ঠে বড়শৌলায় ছিল। এখান থেকেই সমগ্র ইকতা। এই ইকতার প্রথম শাসকর্তা ছিলেন বখতিয়ার খলজির অন্যতম আমীর আলীমর্দান খলজি। তার সময়ে এ স্থান মর্দান কোট নামেই খ্যাত থাকলেও পরে ঘোড়াঘাট হিসেবেই সমধিক পরিচয় লাভ করে। বরশৌলা গ্রামের উত্তর পশ্চিম দিকে এবং পূর্ব দিকে কানাগাড়ী এলাকার বড় দীঘির  চতুপাশে যে বিসত্মীর্ণ জমি রয়েছে সেখানেই আলীমর্দান খলজীর সেনা ছাউনি ছিল এমনটা অনুমান করা যায়। যেহেতু ইকতার কেন্ত্র কোথায় ছিল তা এখনো সঠিকভাবে চিহ্নিত হয়নি ইতিহাসের পাতায়। তাই এখানে ইকতা থাকার পক্ষে সম্ভাব্য স্থান নির্দেশ করা যায়।

      ধারণা , কামতা রাজার আক্রমণ প্রতিহত করার জন্যই এখানে ইকতার কেন্দ্র গড়ে তোলা হয। নিশ্চয় ঐ সময় ঘোড়াঘাটের গুরম্নত্ব সমর কৌশলীরা বুঝতে পেরেছিরেন। উলেস্নখ্য ঘোড়াঘাটের দক্ষিণ- পূর্ব দিকে করতোয়া নদীর পূর্বপাড়ে দশম শতাব্দীতে গড়ে উঠা বর্ধনকোট নগরীর কেন্দ্রস্থল ছিল গোবিন্দগঞ্জে। এটা কামরম্নপের সীমানাভুক্ত একটি জনপদ। কামরম্নপ রাজ্যের দ্বিতীয় আর একটি জনপদ ছিল ঘোড়াঘাটের কয়েক মাইল উত্তরে রংপুরের পীরগঞ্জ থানার চতরাহাটে। যা কামত্মদুয়ার নামে খ্যাত। এ ছাড়াও পূর্ববঙ্গে লক্ষ্ণণসেনের আক্রমণ ঠেকাতে সীমামত্ম এলাকা ঘোড়াঘাটে আলীমর্দান খলজি একটি দুর্গ স্থাপন করেন।১৭ তবকাতে নাসিরীয় ভাষ্য মতে ১২০৫ সালে বখতিয়ার খলজি তিববত আভিযানে বের হন ১০ হাজার যোদ্ধা নিয়ে। তার বাহিনী বিশাল খরস্রোতা করতোয়া নদীর তীর ধরে ১০ দিনের পথ অতিক্রম করে কামরম্নপ সীমানায় পৌছে যায়। ১২০৬ সালে বখতিয়ার তিববত অভিযানে ব্যর্থ হন এবং বহু যোদ্ধা হারিয়ে অসুস্থ্য অবস্থায় দেবকোটে ফিরেযান। এর কয়েক দিন পরেই বরসৌলা ইকতার আমীর আলী মর্দান খলজির হাতে বখতিয়ার খলাজি নিহত হন। পরবর্তী আমীর গণ ১২২৭ খ্রিঃ পর্যন্ত তুর্কী শাসন পরিচালনা করেন। এর পরে কত দিন পর্যন্ত ঘোড়াঘাট অঞ্চলে তুর্কীশাসন বহাল ছিল তা অজ্ঞাত।

এখানে উলেস্নখ্য, তুর্কীশাসনের ফলে ঘোড়াঘাট বা বরসৌলা ইকতায় মুসলমান যোদ্ধা ও কর্মচারির আগমন ঘটেছিল নিশ্চয়। তারা সেনাচৌকির আশেপাশেই থাকতো। মুসলিম সুলতানাৎ প্রতিষ্ঠা হওয়ার দরম্নণ নানা পেশার লোক তথা পীর, দরবেশ, আলেম, মওলানা ব্যবসায়ী ও ধর্মপ্রচারকদের আগমন ঘটে এ অঞ্চলে। তাদের মেহনতে এই অমুসলিম এলাকায় ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজ চলতে থাকে। ইসলাম প্রচারের এই ধারাবাহিকতা পরবর্তী সুলতানী আমলেও অব্যাহত ছিল। নও মুসলিমদের ধর্মীয় জ্ঞান দানের জন্য স্থানে স্থানে মসজিদ, মক্তব্য, মাদ্রাসা ও খানকা গড়ে তোলার ব্যবস্থা করা হয়।১৮ এখানে ওখানে গড়ে ওঠে মুসলিম বসত। ফারিসত্মার ভাষ্য মতে বখতিয়ার খলজী রঙ্গপুর দখল করে সেখানে রাজধানী প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিহাসের এ কথা মেনে নিলে রঙ্গপুর বরসৌলা (ঘোড়াঘাট) ইকতার মধ্যে ছিল কোনই সন্দেহ নেই।

সুলতানী আমলঃ (১২২৭-১৫৩৮ খ্রিঃ)

      সুলতানী আমলে প্রায় ৪৫ জনের বেশি সংখ্যক সুলতান ঘোড়াঘাট অঞ্চলসহ বঙ্গ শাসন করেন। এরি মধ্যে বঙ্গ কখনো দিলস্নীর অধীনে আবার কখনো স্বাধীনভাবে শাসিত হয়েছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে অর্থাৎ ১২৫৫ সালে লক্ষ্ণণাবর্তীর তৎকালীন শাসনকর্তা মালিক ইখতিয়ার উদ্দিন ইউজবক (মঘিসউদ্দিন ইউজবক) ঘোড়াঘাটের করতোয়া নদী পার হয়েই কামরূপ রাজ্য আক্রমণ করেন। ১২৫৭ সালের এই অফিযানে তিনি বিপর্যয়ের সম্মুখিত হন।১৯ পরবর্তী সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ এর সময় (১৪৩৫-১৪৫৯ খ্রিঃ) দিনাজপুর ভূ-ভাগের ঘোড়াঘাট অঞ্চল নাসিরাবাদ নামে পরিচিত লাভ করে। সেখানে তার একটি টাকশাল ছিল।২০ এর পরে নাসিরম্নদ্দীনের পুত্র সুলতান রম্নকনউদ্দিন বরবক শাহ ১৪৫৯-১৪৭৬ খ্রিঃ পর্যমত্ম রাজত্ব করেন। তার সময়ে ঘোড়াঘাটে পূর্ব-উত্তর  দিকে কামরূপের কামেশ্বর পদবীধারী রাজাদের আধিপত্য বজায় ছিল। প্রকাশ থাকে যে, এক সময় রাজশাহী, বগুড়া, রংপুর, দিনাজপুর তথা গোটা উত্তর বঙ্গই ঘোড়াঘাট নামে অভিহিত হতো। ( শেরপুরের ইতিহাস, অধ্যক্ষ মোঃ রোস্তম আলী) ১৯৯৯, পৃষ্টা- ১৫

        কামরূপ রাজ্যের সীমামত্ম এলাকার প্রজাগণ নদী পার হয়ে ঘোড়াঘাট এলাকায় প্রবেশ করে ফসল ও জান মালের ক্ষতি সাধন করতো। এমন অবস্থা দমনের উদ্দেশ্যে গৌড়ের সুলতান রম্নকনউদ্দিন বরবক শাহ সেনাপতি ইসমাইল গাজীকে ঘোড়াঘাট অঞ্চলে প্রেরণ করেন। প্রথম দিকে নওগাঁর মাহিসমেত্মাষের যুদ্ধে গাজী পরিজিত হয়ে দ্রম্নত সটকে পড়েন এবং ১২ জন পাইক নিয়ে ঘোড়াঘাট অঞ্চলে প্রবেশ করেন। এখানে তিনি প্রাচীন পরিত্যক্ত একটি গড়ে ১২ জন পাইক সহ অবস্থান করেন। এই বার পাইক থাকার কারণেই স্থানটির নাম বারপাইকের গড় হয়েছে। পরে সুযোগ বুঝে চতরাহাটের ‘নীলগড়ে’ বসবাসরত রাজা কামেশ্বরের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। আরো জানা যায়, ঘোড়াঘাটের পশ্চিমে ডুগডুগী মোকাম থেকে যুদ্ধের ডুগডুগি বেজে উঠেছিল। এ জন্য পরবর্তী সময়ে সে স্থান ডুগডুগি মোকাম নামে পরিচিত হয়।২১ এখানেই পাইকপাড়া নামে এই মৌজা আছে। যুদ্ধের পাইক সেখানে থাকতেন বলে এ নামকরণ হয়েছে। যাহোক ১৪৬০ সারে কামরূপের আংশিক বিজিত হয়েছিল গাজীর দ্বারা। গাজীই সর্বপ্রথম কৃতিত্বের অধিকারী যিনি কামরূপ-রঙ্গপুরের সেনবংশীয় রাজা কামেশ্বরকে পরাজিত করে প্রাচীন রঙ্গপুরকে মুসলিম সুলতানাতের অধীনে আনেন। ইসলাম প্রচারের যে ধারা বখতিয়ারের আমলে শুরম্ন হয় অনেকটা পূর্ণতা পায় শাহ ইসমাইল গাজীর আমলে। একই সাথে তিনি বিজিত অঞ্চলে ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তার চেষ্টায় কামরূপ ও তৎসন্নিহিত অঞ্চলে ইসলামের বাণী প্রচারিত হয়।  তার ধর্মানুরাগ, আচরণ ও কর্তব্য কাজে নব দীক্ষিত মুসলমানরা নব জীবনের সন্ধান পান। ক্রমে গাজীর সুনাম চর্তুদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এতে ঘোড়াঘাট দুর্গের অধিনায়ক ভান্দুসী রায় ঈর্ষান্বিত হন এবং সুলতানের আগে গিয়ে ষড়যন্ত্রমূলক উক্তি করেন যে, গাজী কামরূপের পরাজিত রাজার সাথে আতাত করে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চালাচ্ছেন।২২ সুলতান এ সংবাদ আবগত হয়ে গাজীকে ধৃত করে শিরোচ্ছেদ করেন। গাজীর খন্ডিত মসত্মক গৌড়ে সুলতানের দরবারে আনীত হয়। পরে সুলতান ভান্দুসী রায়ের ষড়যন্ত্র অবগত হয়ে গভীর অনুশোচনা করেন এবং শাহী সমাধি ক্ষেত্রে দাফনের ব্যবস্থা করেন। রংপুর, দিনাজপুর ও উড়িষ্যায় শাহ ইসমাইল গাজীর স্মৃতি বিজড়িত দরগাহ ও মাজার আছে। এর মধ্যে ঘোড়াঘাটের সাহেবগঞ্জ মৌজায় পাকা রাসত্মার পশ্চিম ধারে ইসমাইল গাজীর একটি সমাধি আছে। এ ছাড়াও চতরাহাটের উপকন্ঠে কাঁটাদুয়ারে প্রধান সমাদি, পীরগঞ্জের বড়দরগা, পীরগাছার বড় দরগাহ ও উগিষ্যার গড় মান্দারণে ইসমাইল গাজীর সমাধি ও দরগাহ আছে। সুলতান রম্নকনউদ্দিন সমগ্র দিনাজপুর সহ গৌড়রাজ্য শাসন করে ১৪৭৬ খ্রিঃ মারা যান। এর পরে শুরম্নহয় হোসেন শাহী শাসন। তবে সেনবংশীয় রাজা নীলাম্বর কামতা রাজ্যের শাসক ছিলেন এ সময়। তার আমলে ঘোড়াঘাট ও রংপুরের একাধিক প্রতিরক্ষামূলক দুর্গ নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা হয়েছিল।

        ১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিঃ পর্যমত্ম আলাউদ্দিন হোসেন শাহ গৌড়ের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি সমগ্র বাংলার বাইরেও আধিপত্য বিসত্মার করেছিলেন। হোসেন শাহ এর আমলে দিনাজপুর জেলার উত্তর-পূর্ব সীমান্ত অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রবাহিত করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরবর্তী কিছু এলাকা কামতা রাজ্যের অধীনে ছিল। তার রাজাছিলেন কামতেশ্বর উপাধিধারী সেন বংশীয় রাজারা। তাদের দক্ষিণাঞ্চলী রাজধানী ছিল ঘোড়াঘাটের কয়েক মাইল উত্তরে চতরাহাটের উপকন্ঠে নীলগড়ে। জানা যায়, এই ঘোড়াঘাট থেকেই হোসেন শাহ আসাম অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তিনি কামতেশ্বর রাজা নীলাম্বরকে পরিজিত (১৪৯৩ সালে) করে ঐসমসত্ম এলাকা গৌড়রাজ্যের অন্তর্ভূক্ত করেন। যুদ্ধের সেনাপতি ছিলেন পুত্র নশরত শাহ। হোসেন শাহ কুড়িগ্রাম জেলার ভিতরবন্দ এলাকা দখল করে সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করে দেন ৯১২ হিঃ  ২২ জমাদিউল আউয়াল (১৫০৬ খ্রিঃ) তারিখে। তিনি কাটাদুয়ারে শাহ ইসমাইল গাজীর মাজার সংস্কার করেন এবং একটি মসজিদ নির্মাণ করে দেন। ঘোড়াঘাটের  পশ্চিম উত্তরে (হিলি রোডে) সহরগাছি মৌজায় একটি বড় দীঘির পাড়ে অবস্থিত সুরা মসজিদটি আলাউদ্দিন হুসেন শাহ এর আমলে নির্মিত বলে গবেষকদের ধারনা। এই সুলতানের আমলে খুরাসান অঞ্চলের তুরাবর্তী বংশের কাকশাল গোত্রের লোকজন এসে ঘোড়াঘাটে আবাসস্থল গড়ে তোলেন। সুলতান তাদেরকে এ অঞ্চলে জায়গীর প্রদান করে কামরূপ রাজ্যের যে কোন আক্রমণ প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেন। সে সময় বরবক শাহ কর্তৃক নির্মিত দুর্গের সংস্কার সাধন করেছিলেন তিনি।২৩ এই সময় থেকেই ঘোড়াঘাটে কাকশাল গোত্রের লোকজনের প্রধান্য লাভ করে।

       

       হোসেন শাহ গৌড়ে থাকলেও তিনি একডালা দুর্গ ও ছোট পাড়ুয়াতে সময় সময় অবস্থান করতেন। এই একডালা দুর্গের অবস্থান পাঁচবিবির কসবা নামক স্থানে। ছোট পাড়ুয়ার অবস্থান ঘোড়াঘাট থেকে ১৫ মাইল পশ্চিমে বলিহারি বা বলাহার গ্রাম। পালশা ইউনিয়নের পুড়ইল গ্রাটিকেই অতীতের পাড়ুয়া নামে আমারা অভিহিত করতে পারি। যেহুতু ঐ দুটি ঐতিহাসিক স্থান এখনো নির্ণিত হয়নি। হোসেন শাহের পরে পুত্র নশরত শাহ সিংহাসনে বসেন ১৫১৯ সালে। তার আমলে ঘোড়াঘাট শহরের সংস্কার সাধিত হয় এবং তার নামানুসারে এ স্থানের নামকরণ করেন নশরতাবাদ। সেখানে একটি  টাকশাল স্থাপিত হয়। এই নশরতাবাদ টাকশাল থেকে ৯২৪ হিজরীতে মুদ্রা জারি হয়েছিল। খুবসম্ভব এ টাকশাল ছিল ঘোড়ঘাটের লালদহ বিলের মধ্যখানের স্থলভাগের উপরে। দঃ জয়বেদপুর মেওজায় চর্তুদিকে পরিখা বেষ্টিত এক ভূখন্ড এখনো দৃষ্টিগোচর হয়। এমন সুরক্ষিত স্থানেই টাকশাল থাকা সম্ভব। নশরত শাহ এর আমলে আসাম আভিযান সাফল্যমন্ডিত হয় এবং আসামের রাঙ্গামাটি নামক স্থানে একটি ফৌজদার স্থাপিত হয়।২৪ রাঙ্গামাটি বিজিত হওয়ার ফলে বিশাল এক ভূখন্ড নশরত শাহ এর শাসনাধীনে আসে। ১৫৩২ সারে নশরত শাহ মারা গেলে পুত্র ফিরোজ শাহ সিংহাসন লাভ করেন। তিনিও বেশি দিন ক্ষমতায় থাকতে পারেননি। তার চাচা গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহ ক্ষমতা দখল করেন। তার আমলেও ঘোড়াঘাটের নশরতাবাদ টাকশাল অটুট ছিল। ১৫৩৮ সালে পাঠান বীর শেরখান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদ শাহকে পরাজিত করে বাংলা জয় করেন। এ সময় থেকেই বঙ্গে পাঠান  রাজত্বের সূচনা হয়। ঘোড়াঘাট অঞ্চল পাঠানদের শক্তিশালী কেন্দ্র হিসেবে পরবর্তী মোগল যুগ পর্যন্ত টিকে ছিল।

বলতে গেলে ঐ সময়ে ঘোড়াঘাট থেকেই পাঠানরা উত্তরে রংপুর, কামরূপ, আসাম ও ঢাকা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। যখন যে এলাকা দখলে এসেছে সেখান পাঠানরা জায়গীরদারী নিয়ে সলতানের পক্ষে কাজ করেছেন। গড়ে তুলেছেন মুসলিম স্থাপনা। ঐ সমস্ত এলাকায় ইসলাম প্রচারের কাজে পীর দরবেশ গণ দিবা রাত্রি পরিশ্রম করে গেছেন।

পাঠান আমলঃ (১৫৩৯-১৫৭৬ খ্রিঃ)

       ১৫৪০ সালে কনৌজের যুদ্ধে মোগল সম্রাট হুমায়ুনকে পরাজিত করে শেরখান দিল্লীর মসনদে আরোহণ করেন। এর আগে তিনি শেরগড় দুর্গ অধিকার করে শেরশাহ উপাধি গ্রহণ করেছিলেন। তখন বাংলার শাসনকর্তা ছিলেন খিজির খান। বাংলা ছিল দিল্লীর অধীন। শেরশাহ শাসনতান্ত্রিক সুবিধার জন্য সমগ্র বাংলাকে ২৪টি শিক ও ৭৮৭ টি মহালে/পরগণায় (ছোট শাসন কেন্দ্র) বিভক্ত করেন। শিকগুলো সরকার নামেই পরিচিত ছিল। ১৫৩৮-৫৬ সালের মধ্যে বগুড়ার শেরপুরে একটি শিক ছিল। শিক এর শাসনকর্তা শিকদার নামে পরিচিত। পরে এ স্থান শেরপুর মুর্চা বা সামরিক ঘাঁটিতে পরিণত হয়।২৫ সামসাময়িককালে গৌড়ের পূর্ব দিকে ঘোড়াঘাট একটি প্রশাসনিক ইউনিট হিসেবে বিশেষ শুরুত্ব লাভ করে। উভয় স্থান করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে অবস্থিত। সুলতানী আমলে আগত কাকশাল ও পাঠনদের চেষ্টায় সমৃদ্ধ শালী জনপদে পরিণত হয় ঘোড়াঘাট। গৌড়ের একাধিক পাঠান সুলতান কামতা রাজ্যের আক্রমণ থেকে রাষ্ট্রের প্রান্তসীমা রক্ষার জন্যে কতকগুলো পাঠান সরদারকে ঘোড়াঘাটে জায়গীর প্রদান করেন। শেরশাহের মৃত্যুর পরে তার পুত্র ও কয়েক জন সুর উপাধিধারী শাসকের নাম অবগত হওয়া যায় ইতিহাস থেকে। ঐ সময়ে পার্শ্ববর্তী কামরূপরাজ্যের রাজাদের শ্যেন দৃষ্টি এ অঞ্চলের উপরে পড়ে।  ঘোড়াঘাট থেকেই তা প্রতিহত করা হয়। ঐ সময়ের কোন নিদর্শন ঘোড়াঘাটের কোথাও টিকে নেই। এর পরে করবানী বংশের শাসন শুরু হয়। কররানী বংশের শাসকদের সাথে মোগলদের সর্ম্পকের অবনতি ঘটে। এতে উভয়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে ১৫৭৬ সালের ১২ জুলাই রাজমহলের যুদ্ধে দাউদখান কররানীর পতন ঘটে। মোগল শক্তির পক্ষ্যে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন সেনাপতি মুমিন খান। এ জন্য তিনি আকবরের নিকট থেকে খানে খানন উপাধি লাভ করেন। পাঠান শক্তির পতন শুরু হলেও ঘোড়াঘাট, শেরপুর  পাবনার চাটমোহর এলাকাতে তাদের কর্তৃত্ব বহাল ছিল অনেক দিন। মোগল অভিযান প্রতিহত করার লক্ষ্যে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পাঠান দলপতিদের আক্রমণ অব্যাহত ছিল।

মোগল শাসনঃ (১৫৭৬-১৭২৭ খ্রিঃ)

    সম্রাট বাবর মোগল সাম্রাজ্যের গোড়া পত্তন করলেও তার সময়ে রাজ্যের বিস্তৃতি ও স্থায়ীত্ব হয়নি। এর সামান্য উন্নতি লক্ষ্য করা যায় তার পুত্র হুমায়ুনের সময়ে। হুমায়ুনের মৃত্যুর পরে তার একমাত্র নাবালক পুত্র আকবর সিংহাসনের আরোহণ করেন। অল্প বয়স্ক আকবরের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বৈরাম খাঁ। ১৫৭৬ খ্রিঃ রাজমহলের যুদ্ধের পরে বঙ্গ ও পূর্ববঙ্গ বিজয়ের দিকে দৃষ্টি পড়ে সম্রাট আকবরের।

সংগ্রহে ঃ (মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ওসমানপুর, ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর)

সুরা মসজিদ বা শুজা মসজিদঃ

বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। এটি দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার অন্তর্গত একটি প্রাচীন মসজিদ। এটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা। এই মসজিদে গ্রানাইটসহ নানা মূল্যবান পাথরের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

বার পাইকের গড়

বাংলাদেশের রংপুর বিভাগেঅবস্থিত একটি প্রাচীন স্থাপনা। এটি মূলত দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার অন্তর্গত একটি প্রাচীন দুর্গ। এটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এর তালিকাভুক্ত একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা

জনসংখ্যার উপাত্ত[সম্পাদনা]

এই উপজেলার মোট জনসংখ্যা ১,০৩,১১৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৫২,৫৫৪ জন এবং মহিলা ৫০,৫৬৫ জন। লোকসংখ্যার ঘনত্ব ১৮০৯ জন (বর্গকিলোমিটারে)।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

ঘোড়াঘাট উপজেলা চারটি ইউনিয়ন এবং ১ টি পৌরসভায় বিভক্ত। দেশের অন্যান্য উপজেলার মত এখানে একক কোন অর্থনৈতিক কেন্দ্র গড়ে উঠেনি। থানা প্রশাসন ঘোড়াঘাটে হলেও উপজেলা ভবনসহ অন্যান্য কাঠামো উসমানপুরে অবস্থিত। আবার প্রধান অর্থনৈতিক কেন্দ্র হচ্ছে রানীগঞ্জ হাট।

নদীসমূহ[সম্পাদনা]

এ উপজেলায় মাত্র দুটি নদী আছে। একটি করতোয়া অন্যটি মইলা নদী বা মরা করতোয়া। নদী দুটির পরিচয় নিম্নরূপ-

করতোয়াঃ

জনশ্রুতি আছে শিব-পাবর্তীর বিয়ের সময় হিমালয় জামাতার হাতে যে জল ঢেলে দিয়েছিলেন তা মাটিতে পড়ে একটি নদীর সৃষ্টি হয়। কার মানে হাত আর তোয়া মানে জল। এ থেকেই করতোয়া নামের উৎপত্তি। জনশ্রুতি যাই থাকুক, বাস্তবিকভাবে এ নদীর উৎপত্তি হয়েছে হিমালয় পর্বতের ঋহ্মবাম গ্রন্থি থেকে। তারপরে ভারতের জলাইগুড়ি জেলা হয়েবোংলাদেশের পঞ্চগড় জেলা সীমানায় প্রবেশ করেছে। অতঃপর ক্রমে দক্ষিণ দিকে বোদা, দেবীগঞ্জ, নীলফামারী দিয়ে বদরগঞ্জ ও নবাবগঞ্জের পূর্ব সীমানা স্পর্শ করে ঘোড়াঘাটে প্রবেশ করেছে। ঘোড়াঘাট দুর্গনগরীর পাশ দিয়ে চলে গেছে দক্ষিণে গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাঁটাখালি ব্রিজের স্থানে। ব্রিজের তল দিয়ে পূর্ব দিকে বাঙ্গালী হয়ে যমুনায় মিলিত হয়েছে। ১৭৮৭ সালের আগে এ নদীর প্রবাহ ছিল গোবিন্দগঞ্জের পশ্চিম পাশ দিয়ে দক্ষিণ দিকে।  অতঃপর মহাস্থানগড়ের পূর্বপাশ ঘেঁষে আরো দক্ষিণে সিরাজগঞ্জের হুড়াসাগর পর্যন্ত প্রবাহ চালু ছিল। ১৭৮৭ সালের পাহাড়ী ঢলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে কাটাখালি ব্রিজের তল দিয়ে প্রবাহিত হতে তাকে। দূর অতীতে এ  নদী ক-ল-তু নামে খ্যাত ছিল। তুর্কী আমলে এ নদী বেগমতি নামে খ্যাত ছিল। মোগল আমলে করতোয়া নামেই এর সমাধিক পরিচয় পাওয়া যায়। এ নদী যেমন প্রশস্ত ছিল তেমনি ছিল গভীর, আর ছিল প্রখর স্রোত। স্রোতের তীব্রতার কারণেই এ নদী দিয়ে ছোট ছোট নৌযান চলাচল করা কঠিন ছিল। পাল আমলে কৈবর্ত্য বা কর্বট জাতিরা এ নদীর তীরে বসবাস করতো। তারও আগে নিষাদ/কিরাত জাতির বাস ছিল। এ নদীর উভয় পাড়ে বিশেষ বিশেষ স্থানে অনেক বন্দর, মন্দির ও তীর্থস্থান গড়ে উঠেছিল অতীতে। সেগুলোর মধ্যে ঘোড়াঘাটের ঋষিঘাট মন্দির একটি। মোগল আমলে ঘোড়াঘাটে একটি প্রসিদ্ধ নদী বন্দর ছিল। যেখানে প্রত্যহ পণ্য বোঝাই শত শত নৌকা আসা যাওয়া করতো। মহাকালের পরিক্রমায় নদী এখন ক্ষীণকায়। নাব্যতা হারিয়ে এখন জলশূন্য। অনেক স্থানে সারা বছর পানি থাকে না। এখন ত্রিমোহনী ঘাটের দক্ষিণ দিকে একটি বেইলী ব্রিজ নির্মিত হয়েছে ১৯৯৬ সালে। তার উপর দিয়েই যানবাহন ও লোকজন চলাচল করে।

মইলা নদীঃ

এ নদীর উৎপত্তিস্থল পার্শ্ববতীৃ উপজেলা নবাবগঞ্জের আশুড়ার বিল। সেখান থেকে আঁকাবাঁকা পথে দক্ষিণ-পূর্ব  দিকে দাউদপুর হাটের উত্তর পাশ দিয়ে হেয়াতপুর, খোদাইপুর, মালদহ ও ঈশ্বরপুর মৌজার  মাঝ দিয়ে চেল গেছে দারিয়া। তারপরে আরো দক্ষিণে মোগরপাড়ার পাশ দিয়ে ঘোড়াঘাটের বুলাকীপুর ইউনিয়নে প্রবেশ করে। বলগাড়ীহাটের নিকট দিয়ে দক্ষিণ দিকে চলে গেছে। সাতপাড়া গড় স্পর্শ করে ঋষিঘাটের আগে বড় করতোয়ার সাথে মিলিত হয়েছে। এটা মরা করতোয়া নামেও পরিচিত। কথিত আছে এ নদী পথেই বেহুলা তার মৃত স্বামীকে উজানের দেবঘাটে (নবাবগঞ্জে) নিয়ে গিয়েছিলেন জীবন ফিরে পাওয়ার অভিলাষে। শেরউইলের মানচিত্রে এ নদী ‘কামদহ’ নামে উলে­খিত হয়েছে। সিংড়া ইউনিয়নে এ নদীর তীরে (নদীর দক্ষিণ দিকে) সাতপাড়া মৌজায় একটি প্রাচীন দুর্গের চিহ্ন আছে। দুর্গটি কামরূপের রাজা নীলাম্বর তৈরি করেন বলে কোচবিহারের ইতিহাসে উলে­খ আছে। সুলতানী আমলে দুর্গটি বারপাইকের গড় নামে খ্যাত হয়। প্রাচীন এ নদীতে এখন সারা বছর পানি থাকে না। বর্ষাকালে নদীটির দু’কুল ভরে ওঠে। দু-এক মাস পরেই আবার পানি শুকে যায়। এ নদীর তীরে গড়ে ওঠা ঋষিঘাট তীর্থ ক্ষেত্র বহুকাল আগে থেকেই হিন্দু নর-নারীদের নিকট পবিত্র। এই তীর্থস্থানে প্রতি বছর বারুনী স্নান হয়। এ উপলক্ষে এক দিনের জন্য মেলাও বসে। আশেপাশের হিন্দু নর-নারী ছাড়াও অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকেরাও মেলায় আসে। (জেলা গেজেটীয়ারঃদিনাজপুর-১৯৯১ সাল)। হালে স্নানঘাট ঘেঁষেই চারকোণী একচূড়া বিশিষ্ট্য প্রদক্ষিণ পথওয়ালা একটি মন্দির নির্মিত হয়েছে। এই মন্দির থেকে ২০০ গজ দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আর একটি নির্মীয়মান মন্দির রয়েছে। দূর অতীতে এই মন্দির দুটি এলাকার দু’জন বড় ভূস্বামী নিমার্ণ করে দিয়েছিলেন।

সংগ্রহে ঃ (মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ওসমানপুর, ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর)

কৃতী ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

  • শাহ ইসমাইল গাজী :       ঘোড়াঘাটের মাটি খুড়ে যে ক’জন পূন্যাত্মার পদভারে ধন্য হয়েছে তাদের মধ্যে শাহ ইসমাইল গাজী একজন। ঘোড়াঘাট দূর্গের পশ্চিম ধারে সাহেবগঞ্জ মৌজায় তাঁর মাজার অবস্থিত। গোবিন্দগঞ্জুফুলবাড়ী সহাসড়ক এই মাজারের পাশ দিয়ে গন্তব্যে চলে গেছে। গাজীকে জড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের মুখে মুখে বহু কিংবদন্তী ছড়িয়ে আছে। তার সর্ম্পকে যতটুকু জানা যায়, তা হলো শাহ ইসমাইল গাজী একাধারে ছিলেন মক্কার নবী বংশের সন্তান, গৌড়ের সুলতান রুকুনউদ্দিন বরবক শাহ এর প্রধান সেনাপতি। ঘোড়াঘাট কামরুপ অঞ্চলে ইসলাম প্রচারক ও আধ্যাত্ববাদী সাধক পুরুষ।
    জানা যায়, দিনি পবিত্র মক্কা নগরে নবী বংশে জন্মগ্রহণ করেন আনুমানিক ১৪৩০ সালের দিকে। যৌবনে তিনি ধার্মিক ছিলেন ও ধর্ম উপদেশ দান করতেন। তার ওস্তাদের ছোট ভাই মওলানা কমলউদ্দিন কোরান শরীফ তেলাওয়াতকালে পাঠ করেন-‘‘ধর্মযুদ্ধে জীবন দাতাদের উচ্চ পুরুস্কার আছে আল্লাহতালার কাছে। এই আয়াত শোনার পরে ধর্মযোদ্ধা হওয়ার বাসনা তার মনে উদয় হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ১২০ জন যোদ্ধা/ সাথী নিয়ে তিনি পারস্য হয়ে এলন হিন্দুস্তান। অনেক কায়ক্রেশ সহ্য করে গৌড়ের সুলতান রুকনউ&&দ্দন বরবক শাহ এর দরবারে পৌছেন তিনি। বরবক শাহ ১৪৫৯-১৪৭৬ খ্রিঃ পর্যন্ত গৌড় রাজ্য শাসন করেছিলেন। সুলতানের দরবারে কাচরির আবেদন জানালে সুলতান তাকে শর্তসাপেক্ষে চাকরি দিতে রাজী হন। শর্তটি ছিল সেখানকার ছটিয়া পটিয়া নদীতে একটি মজবুত বাঁধ দিতে হবে যাতে বন্যার  সময় সেখানকার প্রজারা ব্যাপক ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পায়। সুলতানের কথায় শাহ ইসমাইল গাজী সম্মত হলেন এবং তার সঙ্গীদের নিয়ে বাঁধ নির্মাণের কাজে হাত দিলেন। কিছু দিনের মধ্যে সেখানে তিনি একটি মজবুত বাঁধ নির্মাণ করে দিয়ে সুলতানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সমর্থ হন। অতঃপর সুলতানের সেনাবাহিনীতে তার ও সহযোগীদের চাকরি হয়। ইতোমধ্য গড় মান্দারণের রাজা গজপতি সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। এই বিদ্রোহ দমনের জন্য শাহ ইসমাইল এর নেতৃত্বে যুদ্ধাভিযান প্রেরিত হয়। যুদ্ধে তিনি বিজয়ী হয়ে ফিরে আসেন। সুলতান এতে খুশি হয়ে তাকে গাজী উপাধি দান করেন এবঙ প্রধান সেনাপতিরূপে পদোন্নতি দেন। এরপরে ঘোড়াঘাট এলাকায় কামরূপ রাজ্যের প্রজাদের উৎপাত দমনের জন্য গাজীর নেতৃত্বে দ্বিতীয় আর একটি অভিযান প্রেরিত হয়। দিনাজপুরের সন্তোষ (নওগাঁ) নামক স্থানে গাজীর সাথে কামরূপ রাজার সৈন্যদের মধ্যে যুদ্ধ বাঁধে। এই যুদ্ধে গাজী বহু সৈন্য হারিয়ে মাত্র ১২ জন পাইক নিয়ে সরে পড়েন। পরে ঘোড়াঘাটের বারপাইকের গড়ে আশ্রয় গ্রহণ করে উপযুক্ত সুযোগের অপেক্ষা করতে থাকেন। পরে তার ভাগিনেয় মোহাম্মদ শাহকে দুর্গ/গড়ের কর্তৃত্ব গিয়ে তিনি জলমোকাম নামক স্থানে (চতরাহাটের নিকট) গিয়ে ধ্যানমগ্ন হন। সে সময়ে দক্ষিণ- পশ্চিম কামরূপ অঞ্চলের করতোয়া নদীর তীরবর্তী এলাকার শাসক ছিলেন খেন বংশীয় রাজা। কামেশ্বের বা কান্তেশ্বর নামে এই বংশের রাজারা পরিচিত ছিলেন। ঐ বংশের রাজাদের দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজধানী ছিল রংপুর জেলাধীন পীরগঞ্জ থানার অন্তর্গত বড়বিলা পরগণার নীলগড়ে। রাজা যুদ্ধ না করে সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করতে রাজী নয়। এর পরেই রাজা একাধিক রাতে কিছু অলৌকিক ঘটনা দেখেন, যার করণ কারণ খুঁজে অস্থির হন। শেষটায় বুঝতে পারলেন, শাহ ইসমাইল গাজীর এই কাজ। রাজা কামেশ্বর সাধক পুরুষ গাজীর সাথে যুদ্ধ না করা সমীচীন মনে করে সুলতানের বশ্যতা স্বীকার করে যুদ্ধের বিষয়টি আপোষ করেন। এর পরে গাজী, গৌড়ের সুলতানের কাছে কামরূপ অঞ্চল বিজয়ের সু-সংবাদ প্রেরণ করেন। সুলতান এই সংবাদ পেয়ে অত্যন্ত খুশি হন। এদিকে গাজী নিবিঘ্নে কামরূপ রাজ্যের অভ্যন্তরে ইসলাম ধর্ম প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ঐ সময়ে গৌড় রাজ্যের অন্তর্গত ঘোড়াঘাটের দুর্গাধিপতি ছিলেন হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভান্দুসী রায়। গাজীর জনপ্রিয়তা ও রাজার প্রিয় ভাজন হওয়ার সংবাদে তিনি ঈর্ষান্বিত হন। ভান্দুসী রায় গৌড়ে গিয়ে গাজীর বিরুদ্ধে সুলতানের দরবারে ষড়যন্ত্রমূলক কথাবার্তা লাগায় যে, সুলতানকে অস্বীকারপূর্বক গাজী রাজার সাথে আতাত করে স্বাধীন রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। এ কথা শোনার পরে সুলতান গাজীর উপর নাখোশ হন এবং তার শিরোচ্ছেদ করার নিদেশ দেন। সুলতানের নিদেশ পেয়ে কয়েক জন যোদ্ধা গৌড় থেকে ঘোড়াঘাট অঞ্চলে আসেন। ঐ সময়ে গাজী অনেক শিষ্যসমেত রংপুরের পীরগাছা এলাকার (বর্তমানে) বড় দরগায় ইসলাম প্রচার নিয়োজিত ছিলেন। সুলতানের যোদ্ধঅলঅ সেখানে তাকে ঘেরাও করেন এবং কাঁটাদুয়ারে আনতে থাকেন। পার্শ্ববর্তী রঙপুর জেলার পীরগঞ্জ থানার ইসমাইল পুর মৌজায় (বিশ্ব রোডের ধারে) বড় দরগা নামক স্থানে গাজীর দ্বিতীয় একটি আখড়া ছিল। এখান থেকে তিনি উত্তরে মিঠাপুকুর ও কামরূপ এলাকায় ইসলাম প্রচার করতেন ।এই বড় দরগা থেকে গাজীকে সিয়ে যাওয়া হয় পীরগঞ্জ থানার ভিতর দিয়ে দক্ষিণে (১.৪ কিলোমিটার ) দারিয়াপুরে । সেখানে গাজীর হাত বান্ধা হয় এবং সুলতানের ফরমান পাঠ করানো হয়। পরবর্তীকালে হাতবান্ধা থেকে স্থানটির নাম হাতিবান্ধা হয়েছে। সেখানে খান রাজাদের একটি দুর্গ ছিল। গাজী কর্তৃক বিজিত হওয়া পরে সেখানে মুসরিম কৃষ্টির সূত্রপাত হয়। এখনো সেখানে ৩ গম্বুজ বিশিষ্ট একটি মসজিদ, ৩টি প্রাচীন সমাধি ও বিশাল একটি জলাশয় আছে। যাহোক ধৃত গাজীকে সুলতানের ফরমান পড়ে শুনানো হয়। ফরমানের নির্দেশনা প্রতি কাজী শ্রদ্ধা জানান। অতঃপর গাজীকে নিয়ে যাওয়া হয় চতরাহাটের উপকন্ঠে কাটাদুয়ারে (চতরাহাটের দক্ষিণে)। ঐতিহাসিক রকম্যানের হতে ১৪৭৪ খ্রিঃ এর ৪ঠা জানুযারী (১৪ শাবান, ৮৭৮ হিজরী) আছরের নামাজের পরে গাজীর শিরোচ্ছেদ করা হয়। তার মন্তক ঘোড়াঘাটের উপর দিয়ে গৌড়ে নিয়ে যাওয়ার সময় পথে নানা অলৌকিক ঘটনা ঘটে। গৌড়ে সুলতানের দরবারে ঘটনাক্রমে ভান্দুসী রায়ের ষড়যন্ত্র অন্মোচিত হয়। সুলতান নিজের ভুল বুঝতে পেরে গভীর অনুশোচন করেন এবং গাজীর কর্তিত মন্তক শাহী কবরস্থানে সমাধিস্থ করার নির্দেশ দেন। পরে সুলতান স্বপত্নীক কাটাদুয়ারে এসে (যেখানে ধড় সমাধিস্থ করা হয়) গাজীর সমাধি জিয়ারত করেন এবঙ অনেক ভূমি মাজারের হেফাজত ও খেদমত জন্য লাখেরাজ করে দেন। ১৫ উঁটু ও ১.৫০ একর জমিজুড়ে গাজীর মাজার চত্বর, যা এখানো জিয়ারত হয়। শিরোচ্ছেদের পর একধিক স্থানে গাজীর মাজার ও দরগা গড়ে তোলা হয়েছে বলে জানা যায়।
    কবির সাকের মাহমুদঃ কবি সাকের মাহমুদ ছিলেন কবি হেয়াত মামুদের সমসাময়িক কবি। তৎকালীন সরকার ঘোড়াঘাট এর অধীনে বর্ধনকুঠির জমিদার রাজ কবি ছিলেন তিনি। তার জন্ম আনুমানিক ১৭৪৯-৫০ সালের মধ্যে বর্তমান গাইবান্ধা জেলার আদিয়াখালি রিফাইতপুর গ্রামে। পিতা শেখ মামুদ।
    করম আলী খাঁ :         সরকার ঘোড়াঘাটের শেখ মোগল ফৌজদর ছিলেন করম আলী খান। জন্ম মর্শিদাবাদে, নবাব আলীবর্দী খানের পরিবারে ১৭৩৬ সালের ৩১ অক্টোবর। তার পিতা নবাবের মাত্র ১২ বছর বয়সে ১৭৪৮ খ্রিঃ ঘোড়াঘাটের দায়িত্ব পালন করেন। জানা যায় তিনি মোজাফ্ফর নামা গ্রন্থ রচনা করেছিলেন।
    মাওলানা আব্দুল কাদেরঃ      বুলাকীপুর ইউনিয়নের উদয়ধূল গ্রামের বাসিন্দা। জন্ম পাশ্ববর্তী উপজেলার হলাইজানা গ্রামে ১৯০৭ সালে শরীফ মুসলমান পরিবারে।
  • সংগ্রহে ঃ (মোঃ ফরিদুল ইসলাম, ওসমানপুর, ঘোড়াঘাট, দিনাজপুর)

বিবিধ[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসুত্র[সম্পাদনা]

  1. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন, ২০১৪)। "উপজেলা সর্ম্পকিত তথ্য : এক নজরে উপজেলা"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সংগ্রহের তারিখ ১৭ ডিসেম্বর ২০১৪  এখানে তারিখের মান পরীক্ষা করুন: |তারিখ= (সাহায্য)[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
  2. ধনঞ্জয় রায়, দিনাজপুর জেলার ইতিহাস, কে পি বাগচী অ্যান্ড কোম্পানি কলকাতা, প্রথম প্রকাশ ২০০৬, পৃষ্ঠা ২১১

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]