কলকাতা বন্দর

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট থেকে পুনর্নির্দেশিত)
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
কলকাতা বন্দর
Kolkata port 20170924 100222.jpg
কলকাতা বন্দরে খিদিরপুর ডকে একটি জাহাজ
অবস্থান
দেশ  ভারত
অবস্থান খিদিরপুর,কলকাতা,পশ্চিমবঙ্গ
স্থানাঙ্ক ২২°১৪′ উত্তর ৮৮°১৪′ পূর্ব / ২২.২৩° উত্তর ৮৮.২৪° পূর্ব / 22.23; 88.24
বিস্তারিত
চালু ১৮৭০
পরিচালনা করে কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ
মালিক কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ,জাহাজ মন্ত্রক,ভারত সরকার
পোতাশ্রয়ের প্রকার নদী বন্দর ,গভীর সমুদ্র বন্দর
উপলব্ধ নোঙরের স্থান কলকাতা-২৮ টি
হলদিয়া-১২ টি
জেটি ৮৬
পোতাশ্রয়ের গভীরতা কলকাতা ৬ মিটার (২০ ফু)
হলদিয়া ৮ মিটার (২৬ ফু)
পরিসংখ্যান
জলযানের আগমন ৩,২৩০
বার্ষিক কার্গো টন ৫০.১৯৫ মিলিওন টন (২০১৫-২০১৬)
বার্ষিক কন্টেইনারের আয়তন ৬,৬২,৮৯১ TEUs (২০১৫-২০১৬)
যাত্রী গমনাগমন ৩৯,৫৫২
বার্ষিক আয় ১,৮৬৭.৬৯ কোটি (US$৩৭২.৬ মিলিয়ন) (২০১৪-২০১৫)
মোট আয় -৬৮ কোটি (US$১৩.৫৭ মিলিয়ন) (২০১৪-২০১৫)
প্রধান আমদানি দ্রব্য যন্ত্রপাতি, খনিজ তেল, রাসায়নিক সার, কাঁচা সুত, ইস্পাত, অটোমোবাইল প্রভৃতি
প্রধান রপ্তানি দ্রব্য পাট ও পাট জাতদ্রব্য, সুতির বস্ত্র, চর্ম, লৌহ খনিজ, কয়লা, ম্যাঙ্গানিজ, ফ্লাইস ওস প্রভৃতি
ডক ও জেটি ৩ টি (খিডিরপুর ডক, নেতাজি সুভাষ ডক ও হলদিয়া ডক) , বজবজ তরল পন্য জেটি

কলকাতা বন্দর কলকাতা শহরে অবস্থিত একটি নদীবন্দর। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই বন্দরটির গোড়াপত্তন করেছিলেন। বর্তমানে ভারতের চালু বন্দরগুলির মধ্যে এই বন্দরটি প্রাচীনতম। ২০১৫ সালের হিসাবে কলকাতা বন্দর বিশ্বের ৮৫ তম ব্যস্ত বন্দর(বাল্ক পন্যের হিসাবে)|

ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতা বন্দর ছিল ব্রিটিশ ভারতের প্রধান বন্দর। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে পশ্চাদভূমি হ্রাসপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে এই বন্দরের সাময়িক অবনতি ঘটে। তবে বিংশ শতাব্দীর সূচনায় পূর্ব ভারতের অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও পরিকাঠামোগত উন্নতি্র ফলে বর্তমানে কলকাতা বন্দর দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মালবাহী বন্দরে পরিণত হয়েছে।

বর্তমানে কলকাতা বন্দরের দুটি পৃথক ডক ব্যবস্থা রয়েছে – কলকাতায় কলকাতা ডক ও হলদিয়ায় হলদিয়া ডক চত্বর নামে একটি গভীর জলের ডক।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৮৫২ সালের কলকাতা বন্দরের দৃশ্য

মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের নিকট হতে বাণিজ্য সনদ লাভের পরই ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কলকাতা বন্দরের গোড়াপত্তন ঘটায়। ভারত শাসনভার কোম্পানির হাত থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে হস্তান্তরিত হলে, ১৮৭০ সালে সরকার বন্দর কমিশন গঠন করে। কলকাতা বন্দর একটি বাণিজ্যিক বন্দর তথা পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল। জাপানি সেনাবাহিনী এই সময় দুই বার বন্দরের উপর বোমাবর্ষণ করে। পূর্বতন বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৯৭৫ সাল অবধি বন্দরের দায়িত্বে রত ছিল। এরপর ১৯৬৩ সালের প্রধান বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন কার্যকর হলে, কলকাতার বর্তমান পোর্ট ট্রাস্ট বা বন্দর কর্তৃপক্ষ গঠিত হয়।

ডক ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

কলকাতা বন্দরের খিদিরপুর ডকে একটি পন্যবাহী জাহাজের মাল খালাসের দৃশ্য

কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষ বা কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট দুটি পৃথক ডকসমষ্টির দায়িত্বে নিযুক্ত রয়েছে: কলকাতা ডক ব্যবস্থাহলদিয়া ডক চত্বর। কলকাতা ডক ব্যবস্থার অধীনে রয়েছে খিদিরপুর ডক, নেতাজি সুভাষ ডক, বজবজ নদী মুরিং ও ডায়মন্ড হারবার নোঙরখানা। বজবজ ডক চত্বরে রয়েছে ইমপাউন্ডেড ডক, তিনটি তৈল জেটি, তিনটি বজরা জেটি ও হলদিয়া নোঙরখানা।

বন্দর চ্যানেল[সম্পাদনা]

কলকাতা বন্দরের প্রবেশ পথ বা চ্যানেল হুগলি নদীতে একটি জাহাজ

কলকাতা বন্দরে ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেল বা প্রবেশ পথ রয়েছে। এটি হুগলি নদীর মোহনা থেকে শুরু হয়ে কলকাতা শহরের কাছে কলকাতা ডক পর্যন্ত বিস্তৃত। চ্যানেলটি গড়ে ৭ মিটার (২৩ ফু) গভীর। তবে মোহনার কাছে এই চ্যানেল ৯ থেকে ১০ মিটার গভীর। হলদিয়া বন্দর চ্যানেলটি ৭.৫ মিটার (২৫ ফু) এর বেশি গভীর। বঙ্গোপসাগর এর স্যান্ড হেডেন থেকে চ্যানেলটি প্রায় ২০৩ কিলোমিটার দীর্ঘ। এই চ্যানেল অনেকগুলি ডুবোচর রয়েছে ও চ্যানেলটি ঘনঘন বাঁকযুক্ত ফলে জাহাজ চলাচলে অসুবেধা হয়।

আমদানি-রপ্তানি[সম্পাদনা]

কলকাতা বন্দরের প্রধান আমদানি দ্রব্য হল কোক কয়লা, যন্ত্রপাতি,খনিজ তেল প্রভৃতি।বন্দর থেকে রপ্তানি করা হয় পাটযাত দ্রব্য, কয়লা ,পেট্রোরাসায়নিক দ্রব্য, চা, মেঙ্গানিজ, লৌহ আকরিক, ফ্লাই অ্যাস প্রভৃতি।বন্দরটির হলদিয়া ডক ব্যবহার কার হয় বাল্ক জাতীয় পণ্য আমদানি রপ্তাানিতে এবং সামান্য কিছু কন্টেইনার পণ্য পরিবহন করে ।কলকাতা ডক ব্যবস্থা প্রধানত ব্যবহার করা হয় কন্টেইনার পরিবহনে।এছারাও কলকাতা ডক ব্যবস্থা বাল্ক পণ্য পরিবহন করে।২০১৫-২০১৬ সালে কলকাতা বন্দর ৫০.১৯ মিলিয়ন টন পণ্য ও ৬,৬২৮৯১ টিইউএস কন্টেইনার পরিবহন করেছে।এর মধ্যে কলকাতা ডক ব্যবস্থা ১৬ মিলিয়ন টন পণ্য ও ৫ লক্ষের বেশি কন্টেইনার এবং হলদিয়া ডক ৩৪ মিলিয়ন টন পণ্য ও ১ লক্ষের বেশি কন্টেইনার পরিবহন করেছে।

বছর কার্গো কন্টেইনার (টিইউএস)
২০১৫-২০১৬ ৫০.১৯ মিলিয়ন টন ৬,৬২,৮৯১
২০১৪-২০১৫ ৪৬ মিলিয়ন টন ৬,৩০,০০০
২০১৩-২০১৪ ৪১ মিলিয়ন টন ৬ ,০০,০০০
২০১২-২০১৩ ৩৯ মিলিয়ন টন

নতুন বন্দর ও জেটি[সম্পাদনা]

বর্তমান কলকাতা বন্দর বা কলকাতা- হলদিয়া বন্দরের নাব্যতা কমে যাওয়ায় বন্দরের পণ্য আমদানি রপ্তানি কমেছে।এই কারনে পশ্চিমবঙ্গে সাগরদ্বীপে ১০.৫ মিটার গভীরতার সাগর বন্দর গড়া হচ্ছে যেখানে কলকাতা বন্দর এর গভীরতা ৬ মিটার (২০ ফু) ও হলদিয়া বন্দরের গভীরতা ৮ মিটার (২৬ ফু) ।প্রস্তাবিত সাগর বন্দর প্রকল্পটিকে আর্থিকদিক থেকে সম্ভাবনাময় করে তুলতে ৫১৫ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। এই বন্দরটির উন্নয়নে গত দু’বছর ধরে কেন্দ্রীয় জাহাজ চলাচল মন্ত্রক যে নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে সরকারের এই অনুমোদন তারই একটি অঙ্গ। এই প্রকল্পটি রূপায়ণের কাজে যুক্ত করা হয়েছে ভোর সাগর পোর্ট লিমিটেড অর্থাৎ বিএসপিএল’কে। সমগ্র প্রকল্পটি রূপায়ণে কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট এবং পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অংশীদারিত্বের মাত্রা হবে যথাক্রমে ৭৪ শতাংশ ও ২৬ শতাংশ।

বন্দরের নতুন করে পরিকাঠামো উন্নয়নের জন্যই পিপিপি মডেলে চারটি বার্জ জেটি তৈরি করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের বার্জ জেটিগুলি বেশ বড় মাপের তৈরি করা হচ্ছে বলে খবর। এই জেটিগুলির মাধ্যমে বাল্ক জাতীয় এবং লিকুইড জাতীয় কার্গো পরিবহণ করা যাবে।হলদিয়া বন্দরের পাশেই হলদি নদী ও হুগলী নদীর পাড় বরাবর নতুন চারটি বার্জ জেটি তৈরিতে উদ্যোগী হয়েছে। এগুলিকেই বলা হচ্ছে আউটার টার্মিনাল। ৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে সবচেয়ে বড় আউটার টার্মিনাল তৈরি হতে চলেছে। এই টার্মিনালটি তৈরি হবে হলদিয়া ভবনের ঠিক বিপরীতে। পাশাপাশি শালুকখালিতে ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে লিকুইড কার্গো হ্যান্ডেলিংয়ের বার্জ তৈরি হচ্ছে। ৪১৩ কোটি টাকার আউটার টার্মিনালের কাজ পেতে টেন্ডারে যোগ দিয়েছে দু’টি গোষ্ঠী। ইতিমধ্যেই ৭৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বার্জ জেটি আর ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে স্বয়ংক্রিয় ফ্লোটিং ক্রেন তৈরির কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়ার পর দক্ষিণ ভারতের বোথরা শিপিং এজেন্সি বরাত পেয়েছে।

ট্রান্সলোডিং[সম্পাদনা]

যে সব বড় জাহাজ নাব্যতার অভাবে কলকাতা বা হলদিয়া বন্দর অবধি পৌঁছতে পারবে না, তাদের জন্য গভীর সমুদ্রেই পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করে দেয় ট্রান্সলোডিং অপারেশন। পিপিপি মডেল অনুসরণ করে এই কাজে কেওপিটি-র সঙ্গে হাত মিলিয়েছে জিন্দল আইটিএফ। ২৫০ কোটি টাকা লগ্নি করেছে তারা। জিন্দল আইটিএফ-এরই এমভি যুগলরাজ এবং এমভি ভিগনরাজ নামে দু’টি ট্রান্সলোডার এখন কাজ সামলাচ্ছে। এরা একসঙ্গে অনেকগুলো ক্রেনের সাহায্যে বড় জাহাজ থেকে নির্বিঘ্নে পণ্য খালাস করতে পারে এবং সেই পণ্য ওই সব ক্রেনের সাহায্যেই ছোট জাহাজে তুলেও দিতে পারে। ২০১৩ থেকে এখনও অবধি ১৭টি বড় জাহাজে ট্রান্সলোডিং চালানো হয়েছে। পণ্য নেমেছে ১২ লক্ষ ১৭ হাজার ২৪৬ মেট্রিক টন। ২০১৩ সালের অক্টোবর মাস থেকে ট্রান্সলোডিং-এর কাজ শুরু হয়েছে। বর্তমানে বঙ্গোপসাগরের মধ্যে তিনটি এলাকায়— স্যান্ডহেডস, কণিকা স্যান্ড [১]এবং সাগরে— ট্রান্সলোডিং চলছে। ফলে ২০১৪-১৫তেই কলকাতা ও হলদিয়া বন্দরে পণ্য আমদানির পরিমাণ ১২ শতাংশ বাড়েছে। সে বার ৪ কোটি ৬০ লক্ষ ২৯ হাজার টন পণ্য খালাস করেছিল কেওপিটি। ২০২০-র মধ্যে বৃদ্ধির পরিমাণ ২৫ শতাংশ ছোঁবে বলে বন্দর কর্তৃপক্ষ আশাবাদী।মনে করা হচ্ছে ২০১৯-২০২০ সালে শুধুমাত্র ট্রান্স লোডিং এর মাধ্যমে কলকাতা বন্দর ২.৫ কোটি বা ২৫ মিলিয়ন টন পণ্য খালাস করবে।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • কলকাতা: এক পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস, অতুল সুর, জেনারেল প্রিন্টার্স অ্যান্ড পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ১৯৮১
  • কলকাতা: একাল ও সেকাল, রথীন মিত্র, আনন্দ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ, কলকাতা, ১৯৯১
  • ইতিহাসে খিদিরপুর, সমর দত্ত, দে বুক স্টোর, কলকাতা, ২০০৫

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]


  1. "কণিকা স্যান্ডে-জিন্দাল- বন্দর চুক্তি।"। সংগৃহীত ২৪-০১-২০১৭