তাজপুর বন্দর

স্থানাঙ্ক: ২১°৩৯′ উত্তর ৮৭°৪৩′ পূর্ব / ২১.৬৫° উত্তর ৮৭.৭১° পূর্ব / 21.65; 87.71
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
তাজপুর বন্দর
অবস্থান
দেশ ভারত
অবস্থানতাজপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিমবঙ্গ
স্থানাঙ্ক২১°৩৯′ উত্তর ৮৭°৪৩′ পূর্ব / ২১.৬৫° উত্তর ৮৭.৭১° পূর্ব / 21.65; 87.71
বিস্তারিত
পরিচালনা করেআদানি বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল লিমিটেড
মালিকপশ্চিমবঙ্গ সরকার
পোতাশ্রয়ের ধরনগভীর সমুদ্র বন্দর
উপলব্ধ নোঙরের স্থান
প্রোতাশ্রয়ের গভীরতা১৬ মিটার (৫২ ফু)
চ্যানেলের (প্রবেশ পথ) দৈর্ঘ্য১৮ কিলোমিটার (১১ মা)

তাজপুর বন্দর[১] হল পশ্চিমবঙ্গেরর পূর্ব মেদিনীপুর জেলার তাজপুরে একটি প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দর। বন্দরটি তাজপুরের নিকট বঙ্গোপসাগরের উপকূলে নির্মিত হবে বন্দর।[২] বন্দর নির্মাণের দায়িত্ব আদানি বন্দর ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল লিমিটেডকে প্রদানের বিষয়ে পশ্চিমবঙ্গ সরকার ২০২২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে সম্মতি জানিয়েছিল।[৩][৪] বন্দর নির্মাণের পর, এটি হবে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম গভীর সমুদ্র বন্দর।[৫] অনুমান করা হচ্ছে, যে বন্দরটি ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে।[৫][৬]

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের একটি বিবৃতি থেকে জানা যায়, যে জোয়ারের সমর্থন সহ বন্দরের ড্রাফ্ট প্রায় ১৬ মিটার হবে, প্রস্তাবিত বন্দরটি ১,০০,০০০ টন পণ্যবাহী (ডেডওয়েট টনেজ) জাহাজ সহ কেপ-আকারের জাহাজগুলিকে প্রবেশের অনুমতি দেবে।[৭]

অবস্থান[সম্পাদনা]

তাজপুর বন্দর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে তাজপুরে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে অবস্থিত। বন্দরটি ভারতের তৃতীয়-জনবহুল মহানগর কলকাতা থেকে ১৭০ কিমি (১১০ মাইল)[৮] দূরে অবস্থিত। এটি সড়ক পথে শিল্প শহর আসানসোল ও বন্দর শহর হলদিয়া থেকে যথাক্রমে ৩৮০ কিমি (২৪০ মাইল) ও ১০০ কিমি (৬২ মাইল) অবস্থিত।

প্রস্তাবিত বন্দরটি ১১৬বি নং জাতীয় সড়ক থেকে ৫ কিমি (৩.১ মাইল) এবং নিকটতম রামনগর রেলওয়ে স্টেশন থেকে ৮ কিমি (৫.০ মাইল) দূরে অবস্থিত।[৮]

পটভূমি[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গ এর প্রধান বন্দর হল কলকাতা বন্দর (হলদিয়া বন্দর সহ)। কিন্তু হুগলি নদীর নাবত্য কমে যাওয়ার জন্য সমুদ্রগামী বড় জাহাজ কলকাতা বন্দরহলদিয়া বন্দরে নোঙর করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এই কারণে রাজ্যের শিল্পে গতি কমছে। কলকাতা ও আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পা অঞ্চলের পণ্য-দ্রব্য আমদানি ও রপ্তানি পারাদ্বীপ বন্দর এর নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। যা রাজ্যের বন্দর শিল্পে ও হলদিয়া শিল্পা অঞ্চলের ভবিষ্যত অনিশ্চিত। এই কারণে রাজ্য সরকার তাজপুর বন্দর প্রকল্প গ্রহণ করে।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ২০১৬ সালে তাজপুরে বন্দর তৈরি করার কথা প্রথম ঘোষণা করেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রথমে একক উদ্যোগে এই বন্দর গড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। পরবর্তীকালে ভারত সরকার এই প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব পাঠিয়েছিল। রাজ্য সেই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে কেন্দ্রকে প্রস্তাবিত বন্দরের ২৬ শতাংশ অংশীদারিত্ব দিতে রাজি হয়। কিন্ত ভারত সরকার ৭৬ শতাংশ অংশীদারিত্বের দাবি করেছিল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের থেকে জানানো হয়, যে যদি ভারত সরজদি দক্ষিণ ২৪ পরগনার সাগরদ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে জুড়তে মুড়িগঙ্গার উপর একটি সেতু তৈরি করে দেয় তাহলে ভারত সরকারকে তাজপুর বন্দরের ৭৬ শতাংশ অংশীদারিত্ব প্রদান করা হবে। ভারত সরকার রাজ্যের প্রস্তাব মেনে নেওয়ার পরেও[৯] সেতু নির্মাণ প্রকল্প নিয়ে কোনও উদ্যোগ গ্রহণ করেনি কেন্দ্র।[১০]

বন্দর গড়ে তোলার জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের শিল্প নিগম ২০২১ সালের ১৮ই অক্টোবর দরপত্রের আহ্বান করে। দেশ ও বিদেশের চারটি বন্দর নির্মাণকারী সংস্থা দরপত্র জমা করেছিল। সেই সংস্থাগুলি হল—সিঙ্গাপুর বন্দর কর্তৃপক্ষ, দুবাই পোর্ট, আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকনমিক জোন ও জিন্দাল গোষ্ঠী।‌‌[১১] আরও কিছু সংস্থাকে সুযোগ দিতে দু’বার দরপত্র জমার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছিল।[১০]

নিউটাউনের ইকো পার্কে ২০২২ সালের ১২ই অক্টোবর সন্ধ্যায় আয়োজিত বিজয়া সম্মেলনীতে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আদানি গোষ্ঠীর চেয়ারম্যান গৌতম আদানির পুত্র করণ আদানির নিকট নির্মাণের অনুমতিপত্র হস্তান্তর করেন।[৫][১২]

বন্দরের বিবরণ[সম্পাদনা]

প্রস্তাবিত তাজপুর বন্দর হল একটি গভীর সমুদ্র বন্দর। বন্দটির নির্মাণে প্রয়োজনীয় জমি তাজপুর সমুদ্র উপকূলের সমুদ্র পলি দ্বারা ভরাট করে তৈরি করা হবে। বন্দরটির গভীরতা হবে ১৬ মিটার, ফলে সমুদ্রগামী বড় জাহাজ বন্দরে নোঙর করতে সক্ষম হবে। ১২.১ মিটার গভীরতা ও ৩.৯ মিটার উঁচু জোয়ারের সমর্থন সহ একটি ১৬ মিটার ড্রাফ্ট বন্দরে বজায় থাকবে, যা এক লক্ষ ডিডব্লিউটি বহনক্ষম বৃহৎ ক্যাপসাইজ জাহাজকে বন্দরে প্রবেশের অনুমোদন প্রদান করবে।[৮] গভীর সমুদ্রর থেকে বন্দরে জাহাজ চলাচলের জন্য একটি ১৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চ্যানেল নির্মাণ করতে হবে।[৮]

সরকারি সহযোগিতা[সম্পাদনা]

বন্দর গঠনের জন্য রাজ্য সরকার পরিকাঠামো গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে। বন্দর থেকে জাতীয় সড়ক পর্যন্ত ১৪ মিটার চওড়া চার লেন এর সড়ক রাজ্য সরকার তৈরি করবে। এছাড়া এখানে একটি ফ্রেড রেলওয়ে স্টেশন নির্মানের কথা রয়েছে।

নির্মাণ ব্যয়[সম্পাদনা]

অনুমান করা হচ্ছে বন্দরটি নির্মাণ মোট ২৫ হজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হবে। বন্দরে ১৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হবে। সংশ্লিষ্ট বন্দরের জন্য প্রয়োজনীয় মূল অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য আরও ১,০০০ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। এই বন্দর নির্মাণ প্রকল্প প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ২৫,০০০ কর্মসংস্থান এবং পরোক্ষভাবে এক লাখেরও বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে।[৮]

জটিলতা[সম্পাদনা]

পশ্চিমবঙ্গ সরকার রাজ্যের শিল্প ক্ষেত্রে গতি বৃদ্ধির জন্য তাজপুর বন্দর প্রকল্প গ্রহণ করে। এছারা হলদিয়া ও কলকাতা বন্দরের নাব্যতা কমে যাওয়ার জন্যও নতুন বন্দর প্রয়োজন ছিল। একই কারণে ভারত সরকারপশ্চিমবঙ্গ সরকার সাগর দ্বীপে ভোর সাগর বন্দর নির্মানের পরিকল্পনা নেয়। তবে রাজ্য সরকার সাগর বন্দর ছাড়াও বেসরকারি উদ্দোগে তাজপুর বন্দর প্রকল্প ঘোষণা করে। এতে সাগর বন্দর নির্মান প্রকল্প থেকে কেন্দ্র সরকার সরে আসার পরিকল্পনা নেয়। কারণ কেন্দ্র সরকারের মতে তাজপুরে বেসরকারি উদ্দোগে বন্দর তৈরি হলে সাগর বন্দর লাভবান হবে না। সঙ্গে হলদিয়া ও কলকাতা বন্দরে পন্য পরিবহন অনেক কমে যাবে।[১৩] প্রথমে কেন্দ্র সরকার প্রস্তাব দেয় দুটি বন্দর কেন্দ্র ও রাজ্য যৌথ উদ্দোগে গড়ার। পড়ে রাজ্য সরকার এই প্রস্তাবে রাজি হয়। শেষে ঘোষণা করা হয় সাগর ও তাজপুর দুটি বন্দরই নির্মান করা হবে। তাজপুর বন্দর প্রথম ধাপে নির্মান করা হবে আর সাগর বন্দর দ্বিতীয় ধাপে নির্মিত হবে।

২০১৯ সালের আগেই তাজপুর বন্দরের ‘টেকনো ইকনমিক ফিজিবিলিটি রিপোর্ট’ তৈরি করে মন্ত্রিসভার অনুমোদনও মিলে যাবে বলে জাহাজ মন্ত্রকের আশা। সে ক্ষেত্রে ২০১৯-এই তাজপুর বন্দর তৈরির কাজ শুরু সম্ভব হবে [১৪]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "তাজপুর হয়ে পণ্য উত্তর-পূর্বে"। আনন্দবাজার প্রত্রিকা। ৯ অক্টোবর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০১৭ 
  2. "তাজপুর বন্দর প্রকল্পের দরপত্র শীঘ্রই"আনন্দবাজার প্রত্রিকা। সংগ্রহের তারিখ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬ 
  3. "West Bengal govt nod to Adani's Tajpur greenfield port development"। Kolkata: www.business-standard.com। Business Standard। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ 
  4. "WB Govt approves issuance of Letter of Intent to APSEZ for Tajpur Port development"। www.thehindubusinessline.com। The Hindu Business Line। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ 
  5. "বিজয়া সম্মেলনীতে আদানি গোষ্ঠীকে তাজপুরে ১৫ হাজার কোটির বন্দর নির্মাণের অনুমতি দিলেন মমতা"। Kolkata: www.anandabazar.com। Anandabazar। ১২ অক্টোবর ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ১২ অক্টোবর ২০২২ 
  6. Suman Chakraborti (২০ সেপ্টেম্বর ২০২২)। "Adani bags Rs 25,000 crore Tajpur port development project in WB"। timesofindia.indiatimes.com। Times of India। সংগ্রহের তারিখ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ 
  7. "Bengal awards Tajpur port to Adani"। Kolkata: www.telegraphindia.com। The Telegraph India। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ 
  8. "Adani Group to get letter of intent from govt for Tajpur port"। Kolkata: www.indianexpress.com। The Indian Express। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ 
  9. "জটিলতা শেষ, কেন্দ্র শরিক হবে তাজপুরে" 
  10. "২৫ হাজার কোটি বিনিয়োগ, তাজপুর বন্দর আদানির"। কলকাতা: www.bartamanpatrika.com। বর্তমান পত্রিকা। ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ 
  11. "টেন্ডার খুলবে ফেব্রুয়ারিতে, তাজপুর পরিদর্শনে আদানি সহ চার গোষ্ঠী"। কলকাতা: www.bartamanpatrika.com। বর্তমান পত্রিকা। ২৩ জানুয়ারি ২০২২। সংগ্রহের তারিখ ২০ সেপ্টেম্বর ২০২২ 
  12. Jayatri Nag (১২ অক্টোবর ২০২২)। "West Bengal govt hands over LoI to Adani Ports for Tajpur port" (ইংরেজি ভাষায়)। economictimes.indiatimes.com। The Economic Times। সংগ্রহের তারিখ ১২ অক্টোবর ২০২২ 
  13. "Tajpur port, productivity crucial for KoPT survival"। India Today। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০১৭ 
  14. "নতুন বন্দরের জন্য নদীপথ"। আনন্দবাজার প্রত্রিকা। ৯ অক্টোবর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১৮ অক্টোবর ২০১৭