খিদিরপুর ডক

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
কলকাতা বন্দরের খিদিরপুর ডক

খিদিরপুর ডক বা খিদিরপুর জাহাজঘাট হল কলকাতা বন্দরের তিনটি ডকের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ প্রাচীনতম ডক। এই ডকটি ভারতের তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম আধুনিক ডক। এই ডকটি ১৮৯২ সালে চালু হয়। এই ডক নির্মানের পূর্বে কলকাতা বন্দর হুগলি নদীতে সমুদ্রগামী জাহাজ থেকে পণ্য খালাস করত। এই ডক নির্মানের পরে কলকাতা বন্দরের পণ্য পরিবহন বৃদ্ধি পায়। এই ডকটি হুগলি নদীর পূর্ব তীরে একটি খাড়িতে নির্মিত হয়। খিডিরপুর ডকের খাড়িতে দুটি সেতু নির্মিত হয়েছে খাড়ির উত্তর ও দক্ষিণের যোগাযোগ সহজ করতে। বর্তমানে খিদিরপুর ডকেরে বছরে পণ্য পরিবহন ক্ষমতা ১৮ মিলিয়ন টন।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

খিদিরপুর ডক নির্মাণের আগের ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৭৯০ সালে বাঁকশাল ঘাটের নিকটে প্রথম ডক নির্মাণ করা হয়। ইতোমধ্যেই ১৭৮১ সালে একটি ভাসমান ডক নির্মাণের জন্য কর্নেল ওয়াটসনকে বন্দরের দক্ষিণ সীমানায় একটি জায়গা প্রদান করা হয়। ওয়াটসন খিদিরপুরে একটি মেরিন ইয়ার্ড স্থাপন করেছিলেন এবং ১৭৮১ সালে ভাসমান ডক নির্মাণের কাজও শুরু করেছিলেন, কিন্তু গোকুল ঘোষালের পরিবারের সাথে আইনগত দ্বন্দ্ব শুরু হলে তাকে বাধ্য হয়ে এ প্রকল্প বন্ধ করতে হয়। ওয়াটসন পরবর্তীকালে শিপইয়ার্ডের দিকে মনোনিবেশ করেন এবং ব্যবসা থেকে তার অবসর গ্রহণের পূর্বে এখান থেকে অল্প কয়েকটি জাহাজ নির্মিত হয়েছিল। ওয়াটসনের পরে কলকাতায় জাহাজ নির্মাণ কারখানা গড়ে তোলার বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়, তবে সেগুলির কোনোটিই বোম্বের পারসি এন্টারপ্রাইজের জাহাজ নির্মাণ কর্মকান্ডের সাথে তুলনীয় ছিল না। যাহোক, উনিশ শতকের প্রথম দিকে ব্রিটিশ পোতসমূহের জন্য ভারতীয় পোতসমূহকে স্থান ছেড়ে দিতে হয়। ১৮২০-এর দশকে কলকাতা ও ডায়মন্ড হারবারে ভাসমান ডক নির্মাণের ব্যাপারে বেশ কয়েকটি পরিকল্পনা নেওয়া হয়, কিন্তু সেগুলির কোনোটিই বাস্তবায়িত হয় নি। ১৮৪২ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় কলকাতা বন্দরে নোঙ্গর করা জাহাজগুলির ব্যাপক ক্ষতি সাধন করলে এ বিষয়টি আবার আলোচনায় আসে।[১]

কিন্তু কলকাতা বন্দরের খিদিরপুর ডক নির্মাণ ও আধুনিকীকরণের বিষয়টি আড়ালে পড়ে যায় ১৮৬০-এর দশকে মাতলা নদীতে নতুন একটি বন্দর প্রতিষ্ঠার এক ব্যর্থ প্রচেষ্টায়। উদ্যোগ গ্রহণকারীদের একটি বিকল্প চিন্তা থেকে পোর্ট ক্যানিং প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়। কেননা ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তাদের ধারণা ছিল নদীর পলিজনিত সমস্যা অকালেই কলকাতা বন্দরের মৃত্যু টেনে আনবে, ঠিক যেভাবে তিনশ বছর আগে এ হুগলির তীরবর্তী সাঁতগাও বন্দরটির মৃত্যু হয়েছিল। কিন্তু ততদিনে কলকাতা ব্রিটিশদের কাছে এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল যে, একে ছেড়ে যাওয়া তত সহজ ছিল না। কলকাতা বন্দরের ব্যবস্থাপনায় আরও দক্ষতা আনয়নের লক্ষ্যে সরকার পোর্ট ট্রাস্ট গঠনে সক্রিয় হয়, যা কিনা ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাণিজ্যকে একটি শক্ত ভিত্তি প্রদান করে। কলকাতা কর্পোরেশনের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে প্রথমদিককার পরীক্ষামূলক রিভার ট্রাস্টটি ব্যর্থ হওয়ার পর ১৮৭০ সালের অক্টোবর মাস থেকে যখন পোর্ট ট্রাস্ট তার কাজ শুরু করে তখন কলকাতা বন্দরে জেটির সংখ্যা ছিল মাত্র চারটি ও মাল খালাসের জন্য ঘাট ছিল একটি, যেখানে ৫২টি জাহাজ নোঙ্গর করতে পারত এবং তার মোট ধারণ ক্ষমতা ছিল ৪৮,০০০ টন। ১৮৭১-৭২ সালের মধ্যে জেটির সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৬টিতে, আর সেখানে জাহাজ নোঙ্গর করতে পারত ১৪৩টি এবং মাল ধারণ ক্ষমতাও বেড়ে দাড়ায় ২২২,০০০ টনে। জাহাজ ঘাটের দৈর্ঘ্যও বৃদ্ধি পায় লক্ষ্যণীয়ভাবে।

এ ঘাটে প্রধানত পণ্যসামগ্রী যেমন, শষ্য, বীজ এবং কাঁচামাল ও আধ্যপ্রস্ত্তত পাটজাত দ্রব্য ওঠানামা করত। আসাম ও উত্তর বাংলা থেকে দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়া চা রপ্তানির কারণে ১৮৭০-এর দশকে স্ট্রান্ড ব্যাংক দ্বীপে একটি গুদাম ঘর নির্মাণ করতে হয়।

১৮৯২ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল[সম্পাদনা]

উনিশ শতকের শেষ ভাগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো ১৮৯২ সালে খিদিরপুরে ডক নির্মাণ।[১] এটি ছিল কলকাতার বণিক সম্প্রদায়ের ক্রমাগতভাবে দাবির ফল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পূর্ব বিশ বছরে খিদিরপুর ডকের দ্বারা কলকাতা বন্দরের মাধ্যমে আমদানি-রপ্তানি ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর ক্রমোন্নতি পরিলক্ষিত হয়। উপকূলীয় বাণিজ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ বিকাশ ঘটে, বিশেষ করে কয়লা রপ্তানিতে। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গের পর পূর্ব বাংলা ও আসাম সরকার কলকাতা বন্দর তথা খিদিরপুর ডকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দরের উন্নয়ন ঘটালেও তা তেমন ফলপ্রসূ হয় নি। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে মহামন্দার প্রভাবে বাধাগ্রস্ত হলেও এ অঞ্চলে আধুনিক শিল্পকারখানার উন্নয়নের সাথে সাথে খিদিরপুর ডকের আধুনিক রূপায়ন ঘটতে থাকে। তারপরও মহামন্দা শুরুর আগে থেকেই গার্ডেন রিচ-এর কিং জর্জ ডক ১৯২৯ সাল থেকে চালু হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যা তুলনামূলকভাবে খিদিরপুর ডকের উন্নয়নে স্থবিরতার জন্য চিহ্নিত, তা ১৯৩০-এর দশকের মাঝামাঝি কিছু সময়ের জন্য বাণিজ্যিক পুনরুদ্ধারে কাজে বিঘ্ন ঘটায়। ভারতের স্বাধীনতার পর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের মাধ্যমে এ ধারাসমূহ পুনর্জীবীত হয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূতিকাগার হিসেবে কলকাতার গুরুত্ব যেমন ছিল, ঠিক তেমনি ব্রিটিশ শাসনের অবসানে এর ক্রমাবনতিও ঘটে।  কলকাতা বন্দর তথা খিদিরপুর ডক একটি বাণিজ্যিক বন্দর তথা পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার হলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানি সেনাবাহিনী এই সময় দুই বার কলকাতা বন্দরের খিদিরপুর ডকে উপর বোমাবর্ষণ করে।

১৯৪৭ সাল থেকে ২০০০ সাল[সম্পাদনা]

পূর্বতন বন্দর কর্তৃপক্ষ ১৯৭৫ সাল অবধি ডকটির দায়িত্বে রত ছিল। এরপর ১৯৬৩ সালের প্রধান বন্দর কর্তৃপক্ষ আইন কার্যকর হলে, খিদিরপুর ডক নতুন কলকাতা পোর্ট ট্রাস্ট বা কলকাতা বন্দর কর্তৃপক্ষের অধিনে চলেযায়।

২০০০ সাল থেকে বর্তমান[সম্পাদনা]

পরিকাঠাম[সম্পাদনা]

খিদিরপুর ডকটি কলকাতা বন্দরের প্রাচীনতম ডক হওয়ার ডকটির প্রযুক্তি ও পরিষেবা অনেকটা প্রাচীন প্রদ্ধতির। এই ডকে মোট ১৮ টি বার্থ রয়েছে। এছাড়া ডকে তিনটি ডাই ডক ও ৬ টি বয়া বা মুরিং রয়েছে। ডকটির জলের গভীর ৫-৭ মিটার। এই ডকে জাহাজ চলাচল প্রধানত জোয়ারের জলের উপর নির্ভর করে।

খিদিরপুর ডকের ডাই ডক গুলির আয়োতন হল-

খিদিরপুর ডকের ডাই ডক
ডক ডাইডকের ক্রম আয়োতন
খিদিরপুর ডক ১৬০.০২ মিটার (৫২৫.০ ফু) x ১৯.৫ মিটার (৬৪ ফু)
খিদিরপুর ডক ১৪২.৯৫ মিটার (৪৬৯.০ ফু) x ১৯.৫ মিটার (৬৪ ফু)
খিদিরপুর ডক ১০২.১ মিটার (৩৩৫ ফু) x ১৪.৬৩ মিটার (৪৮.০ ফু)

আমদানি-রপ্তানি[সম্পাদনা]

খিদিরপুর ডক প্রধানত শুষ্ক পন্য পরিবহন করে। এই ডকে কয়লা, বার্মা কাঠ, রাসায়নিক পদার্থ পরিবহন করা হয়। এই ডক থেকে ছোট বার্জে করে উত্তর ভারতে পণ্য পরিবহন করা হয়।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Calcutta Port Trust - Brief History"। Calcutta Port Trust। ১৩ মার্চ ২০০৭ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]