কিয়াম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
তাইওয়ানের কাওসিউং মসজিদে কিয়ামরত অবস্থায় মুসল্লিগণ।

কিয়াম (আরবি: قيام‎‎, "দাঁড়ানো/সোজা হওয়া") নামাজের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। নামাজ দাঁড়ানো অবস্থায় তাকবিরের মাধ্যমে ("আল্লাহু আকবর" বলে) শুরু হয় এবং সুস্থ মানুষের জন্যে নামাজের বড় অংশই দাঁড়িয়ে পড়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কিছু নামাজের পুরো অংশই দাঁড়িয়ে আদায় করতে হয়, যেমন: জানাজার নামাজ

কুরআনে[সম্পাদনা]

নামাজ প্রসঙ্গে কুরআনের কিছু স্থানে "আল্লাহর সামনে দাঁড়ানো" বাক্যাংশ ব্যবহার করা হয়েছে।

আপনার নামাজ (পড়ার অভ্যাসকে) কঠোরভাবে রক্ষা করুন, বিশেষ করে নামাজের মধ্যম অবস্থা; এবং আল্লাহর সামনে (মনের) একনিষ্ঠতার সঙ্গে দাঁড়ান।

— কুরআন, (২:২৩৮)

পর্যালোচনা[সম্পাদনা]

নামাজের একটি সাধারণ একক বা চক্রকে রাকাত বলা হয়, যেটি দাঁড়িয়ে থাকা (কিয়াম) ও তাকবির বলার মাধ্যমে শুরু হয়, যা হলো الله أَڪْبَر (অনুবাদ "আল্‌লাহু-আক্‌বার্‌", অর্থ "আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ")। আঙ্গুলগুলো ফাঁক ফাঁক তথা একত্রে বা কাছাকাছি না রেখে হাতগুলো কাঁধের সমান বা কানের উপর পর্যন্ত তোলা হয়।[১][২] এই অবস্থাতে কুরআনের কিছু অংশ পাঠ করা হয়।[১]

ইতিদাল হলো রুকু থেকে সোজা হয়ে দ্বিতীয়বার দাঁড়ানো। পিঠ সোজা রাখা হয় এবং বলা হয় سمع الله لمن حمده (অনুবাদ "সামি' আল্‌লাহু লিমান্‌ হামিদাহ্‌", অর্থ "আল্লাহ শোনেন এবং যে তাঁর প্রশংসা করেন তাঁকে সাড়া দেন")।[১][২] উপরন্তু, এই অবস্থায় আল্লাহর বহু প্রশংসাসূচক বাক্যের মধ্যে কিছু বলা হয় যেমন, ربنا لك الحمد (অনুবাদ "রাব্‌বানা ওয়া লাকাল্‌-হাম্‌দ্‌", অর্থ "হে আমাদের প্রভু! আর সকল প্রশংসা [কেবল] আপনার জন্য")।[২] আবার তাকবির বলা হয় এবং প্রার্থনাকারী প্রণতি করতে চলে যায়।[২]

নামাজের ধরন[সম্পাদনা]

পাঁচটি দৈনিক নামাজ, সুন্নাত নামাজ (ঐচ্ছিক নামাজ/অতিরিক্ত নামাজ) এবং অন্যান্য বেশিরভাগ নামাজে কিয়াম একটি অংশ।

জানাজার নামাজ পুরোটাই কিয়ামের সাথে আদায় করতে হয়, যেটি হলো ইসলামি শেষকৃত্য সংবলিত প্রার্থনার অংশ।

কিয়ামের সময় তিলাওয়াত[সম্পাদনা]

নামাজের সময় অধিকাংশ কুরআন তিলাওয়াত (পাঠ) কিয়ামরত অবস্থায় করা হয়। কুরআনের প্রথম সূরা আল-ফাতিহা কিয়ামরত অবস্থায় পড়া আবশ্যক।[১][২] সহীহ মুসলিমের বর্ণনামতে, আবু হুরাইরা উদ্ধৃত করেছেন যে নবি (সা) বলেন,

«مَنْ صَلَى صَلَاةً لَمْ يَقْرَأْ فِيهَا أُمَّ الْقُرْآنِ فَهِيَ خِدَاجٌ ثَلَاثًا غَيْرُ تَمَامٍ‎»
“কেউ যদি কোনো নামাজ পড়লো যেখানে সে উম্ম্‌-উল-কুরআন পাঠ করলো না, তাঁর নামাজ অসম্পূর্ণই থেকে গেলো।” (সূরা আল-ফাতিহার অন্যতম নাম "উম্ম্‌-উল-কুরআন", অর্থ "কুরআনের মা")

উপরন্তু, কুরআন থেকে অন্য যেকোনো সূরা প্রথম বা দ্বিতীয় রাকআতে ইচ্ছানুযায়ী পাঠ করা হয়।[১][২]

কিয়ামের সময় হাতের অবস্থান[সম্পাদনা]

কিয়ামের সময় কোথায় হাত রাখা হয় তা নিয়ে বিভিন্ন ইসলামি সম্প্রদায় ও শাখার মধ্যে ভিন্নতা বিদ্যমান।[৩] এই মতপার্থক্যসমূহ কাবদ-সাদল বিবাদে প্রকাশ পেয়েছে। বেশ কিছু হাদিস সুন্নিদের মাঝে ইঙ্গিত করে যে বাধ্যতামূলক না হলে কাবদ (হাত গুটিয়ে বা হাত বেঁধে প্রার্থনা করা) বাঞ্ছনীয়; যাইহোক, সাদল (হাত দুই পাশে ঝুলিয়ে রাখা) এখনও অনেক মালিকিদের নিকট পছন্দনীয়।[৪] অন্যান্য সুন্নি কর্মপদ্ধতির প্রভাবের কারণে উত্তর নাইজেরিয়ার মতো মালিকি কর্মপদ্ধতি-অনুশীলনকারী এলাকায় বিতর্কটি প্রধানত বিদ্যমান।[৫][৬]

সুন্নি দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

হানাফি[সম্পাদনা]

হানাফিদের জন্য, পুরুষেরা নাভির নিচে হাত রাখে। মহিলারা তাঁদের বুকে হাত রাখে।

মালিকি[সম্পাদনা]

সুন্নিদের মাঝে এই বিষয়টি পুরোপুরি স্বতন্ত্র (তবে শিয়াইবাদি মুসলিমদের অনুরূপ) যে অনেক মালিকি উরুতে বা দুই পাশে তাঁদের হাত ঝুলিয়ে রাখে। মদিনাতে নবির আমলের কিছু প্রজন্ম পরের নামাজ পড়ার পদ্ধতির মাঝে এই প্রথা অনুসরণকারীরা এর ভিত্তি খুঁজে পান, যেমনটি মালিক ইবন আনাস লিপিবদ্ধ করেছেন এবং তাঁর দ্বারা সহিহ (খাঁটি) হিসাবে বর্ণিত হয়েছে। "ইমাম মালিকের মতে হাত না বেঁধে নামাজ পড়া উচিত, তিনি ফরজ নামাজে হাত বাঁধাকে অবাঞ্ছনীয় এবং নফল নামাজে অনুমোদিত মনে করেন।"[৭] যাইহোক, এই প্রথা সর্বজনীন নয়, উদাহরণস্বরূপ, মালিকি পন্ডিত কাজী আয়াজ, তাঁর কাওয়াইদ আল-ইসলাম গ্রন্থে মতামত দিয়েছেন যে, এই অনুশীলনটি "কোনো খাঁটি হাদিস দ্বারা সমর্থিত নয়"।[৮][৯]

শাফিঈ[সম্পাদনা]

শাফিঈরা হাত নাভির উপরে ও বুকের নিচে বাঁধে।

হানবালি[সম্পাদনা]

হানবালিরা হানাফিদের মতো নাভির নিচেও হাত রাখতে পারে, বা শাফিঈদের মতো উপরেও রাখতে পারে।

সালাফি দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

অধিকাংশ সালাফি ডান হাত বাম হাতের উপর বুকের উপর রাখে, তবে সালাফিরা কোনো নির্দিষ্ট নিয়মের মাঝে সীমাবদ্ধ নয়, তাই বিভিন্ন সালাফিরা হানবালি, হানাফ, শাফিঈ এবং মালিকিদের পথ অনুসরণ করতে পারে। সালাফি লেখক মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানীর মতে, বাম হাতের উপর ডান হাত বুকের উপর রাখা উচিত।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

শিয়া দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

দ্বাদশী[সম্পাদনা]

দ্বাদশী শিয়ারা তাঁদের হাত উরুতে বা উভয় পাশে ঝুলিয়ে রাখে।

জায়েদি[সম্পাদনা]

জায়েদিরা তাঁদের হাত উরুতে বা উভয় পাশে ঝুলিয়ে রাখে।

ইবাদি দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

শিয়া মুসলিম ও মালিকি সুন্নিদের মতোই ইবাদিরা তাঁদের হাত উরুতে বা পাশে ঝুলিয়ে রাখে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Haddad, Yvonne Yazbeck; Smith, Jane I. (১ জানুয়ারি ২০১৪)। The Oxford Handbook of American Islam (ইংরেজি ভাষায়)। Oxford University Press। পৃষ্ঠা 162। আইএসবিএন 9780199862634 
  2. Shaikh Muhammad Ilyas Faisal, "Sifatus Salat: The Method of Salat in Light of the Authentic Ahadith." ওয়েব্যাক মেশিনে আর্কাইভকৃত ৩০ জুন ২০১৯ তারিখে Madinat al-Munawwara. 08, October 2014.
  3. Roman Loimeier (২০১৩)। Muslim Societies in Africa: A Historical Anthropology। Indiana University Press। পৃষ্ঠা 23–4। আইএসবিএন 9780253007971 
  4. Marloes Janson (২০১৩)। Islam, Youth and Modernity in the Gambia: The Tablighi Jama'at (illustrated সংস্করণ)। Cambridge University Press। পৃষ্ঠা 83। আইএসবিএন 9781107040571 
  5. Gomez-Perez, Muriel, সম্পাদক (২০০৫)। L'islam politique au sud du Sahara: identités, discours et enjeux। KARTHALA Editions। পৃষ্ঠা 344। আইএসবিএন 9782845866157 
  6. Roman Loimeier (২০১১)। Islamic Reform and Political Change in Northern Nigeria (illustrated, reprint সংস্করণ)। Northwestern University Press। পৃষ্ঠা 79–83। আইএসবিএন 9780810128101 
  7. Sharh e Muslim, volume 1, page 590, by Allama Ghulam Rasool Sa’eedi, Lahore
  8. Ibrahim Ado-Kurawa (২০০০)। Shariʼah and the press in Nigeria: Islam versus Western Christian civilization। Kurawa Holdings Ltd.। পৃষ্ঠা 219। আইএসবিএন 9789783091078 
  9. Zachary Valentine Wright (২০১৫)। Living Knowledge in West African Islam: The Sufi Community of Ibrāhīm Niasse। BRILL। পৃষ্ঠা 227। আইএসবিএন 9789004289468