বাংলা সঙ্গীত

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(বাংলা সংগীত থেকে পুনর্নির্দেশিত)

বাংলা সংগীত বাংলার সহস্রাব্দপ্রাচীন ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ সাংগীতিক ঐতিহ্যটিকে নির্দেশ করে। ঐতিহাসিক বাংলা অঞ্চলটি বর্তমানে ভারতীয় রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ ও স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রে বিভক্ত। বাংলা ভাষায় রচিত ও বিভিন্ন শৈলীর সুরে সমৃদ্ধ বাংলা সংগীতধারাটি এই উভয় অঞ্চলেই ব্যাপক জনপ্রিয়তার অধিকারী।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ধর্মীয় সংগীত[সম্পাদনা]

বাংলার প্রাচীন সংগীতকলা সংস্কৃত স্তোত্রসঙ্গীত প্রভাবিত। এই সময়কার বৈষ্ণব ভাবাশ্রিত কিছু ধর্মসংগীতিগুলি আজও পূর্ব ভারতীয় মন্দিরগুলিতে গীত হয়। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কবি জয়দেব বিরচিত গীতগোবিন্দম্ এই জাতীয় সঙ্গীতের একটি বিশিষ্ট উদাহরণ। মধ্যযুগে নবাব ও বারো ভূঁইয়া নামে খ্যাত শক্তিশালী ভূস্বামীবর্গের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিপালিত সংগীতধারায় আবার হিন্দু ও মুসলমান সাংগীতিক রীতির এক অপূর্ব সমন্বয় দেখা যায়।

প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় গানগুলির অধিকাংশই ছিল ধর্মীয় সংগীত। মধ্যযুগের প্রথম পাদে বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গোবিন্দদাস, জ্ঞানদাস, ও বলরামদাস প্রমুখ বৈষ্ণব পদকর্তাগণ রাধা-কৃষ্ণ বিষয়ক গানে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক প্রেমচেতনার একটি পার্থক্য দর্শিয়েছেন। আবার মধ্যযুগের শেষ পাদে রামপ্রসাদ সেনকমলাকান্ত ভট্টাচার্য প্রমুখ শাক্তপদাবলিকারগণ তাঁদের গানে ঈশ্বরকে শুদ্ধ মাতৃরূপে বন্দনার কথা বলেছেন। বৈষ্ণব ও শাক্তপদাবলি (শ্যামাসংগীত ও উমাসংগীত) উভয়েরই মূল উপজীব্য হিন্দু ভক্তিবাদ|ভক্তিবাদী দর্শন। বৈষ্ণব সংগীতে যখন জীবাত্মা-পরমাত্মাকেন্দ্রিক প্রেমভক্তির তত্ত্ব প্রচারিত হয়, তখনই শাক্তগানে তন্ত্র ও শুদ্ধা মাতৃবন্দনার এক সম্মিলন গড়ে ওঠে।

বাউল গান[সম্পাদনা]

অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় বাউল নামে এক অধ্যাত্মবাদী চারণকবি সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটে। মনে করা হয়, তান্ত্রিক কর্তাভজা সম্প্রদায় ও ইসলামি সুফি দর্শনের ব্যাপক প্রভাব পড়েছিল এঁদের গানে। বাউলরা তাঁদের চিরন্তন অন্তর্যামী সত্ত্বা মনের মানুষ-এর ঘুরে ঘুরে গান গাইতেন এবং ধর্মে ধর্মে অযৌক্তিক ভেদাভেদ ও আনুষ্ঠানিকতার কথা তুলে ধরতেন। কুষ্টিয়ার লালন ফকিরকে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাউল মনে করা হয়। তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্যক্তিত্ব ছিলেন। বাউল সঙ্গীতের আরও দুই বিশিষ্ট নাম হলেন মধ্যযুগের হাসন রাজা ও আধুনিক যুগের বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিম

বিষ্ণুপুর ঘরানা[সম্পাদনা]

বিষ্ণুপুর ঘরানা হল ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীতের হিন্দুস্তানী ধারার দ্রুপদ সংগীতের একটি ঘরানা। দিল্লির বাহাদুর খান, যিনি তানসেনের একজন উত্তরসূরী ছিলেন, তিনি এ বিষ্ণুপুর সংগীতের প্রবক্তা। বাহাদুর খানকে রাজা দ্বিতীয় রঘুনাথ সিংহদেব মল্ল রাজদরবারে নিয়ে আসেন।[১]

রবীন্দ্রসঙ্গীত[সম্পাদনা]

বাংলা সঙ্গীতের সর্বাপেক্ষ প্রসিদ্ধ ধারাটি হল রবীন্দ্রসংগীতরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সারা জীবনে ২,২৩০টি গান রচনা করেছিলেন। ভক্তি, প্রেম, প্রকৃতি, দেশাত্মবোধ ইত্যাদি নানা বিষয়কেন্দ্রিক এই গানগুলিই রবীন্দ্রসঙ্গীত বা রবীন্দ্রগান নামে পরিচিত। এই গানগুলির কথা প্রাচীন হিন্দু ধর্মশাস্ত্র উপনিষদ ও মধ্যযুগীয় বৈষ্ণব পদাবলি ও বাউল গানের প্রভাব গভীর। সুরের দিক থেকে হিন্দুস্তানি ও কর্ণাটিক শাস্ত্রীয় সংগীত, কীর্তন, শ্যামাসংগীত, বাউল গান, এমনকি ইংরেজি, আইরিশ ও স্কটিশ লোকসংগীতেরও প্রভাব রয়েছে রবীন্দ্রনাথের গানে। রবীন্দ্রসঙ্গীতের বিশিষ্ট গায়ক-গায়িকারা হলেন: শান্তিদেব ঘোষ, শৈলজারঞ্জন মজুমদার, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, দেবব্রত বিশ্বাস, সুচিত্রা মিত্র, পঙ্কজ কুমার মল্লিক, সন্তোষ সেনগুপ্ত, সুবিনয় রায়, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, অশোকতরু বন্দ্যোপাধ্যায়, সাগর সেন, সুমিত্রা সেন, ঋতু গুহ, পূরবী মুখোপাধ্যায়, পূর্বা দাম, সুশীল মল্লিক, মোহন সিংহ, শর্মিলা রায় পোমো, স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায়, ইন্দ্রাণী সেন, স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্ত, প্রমিতা মল্লিক, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, শ্রাবণী সেন, শাসা ঘোষাল প্রমুখ। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ভারতবাংলাদেশ রাষ্ট্রের জাতীয় সংগীত, যথাক্রমে, জনগণমন-অধিনায়ক জয় হেআমার সোনার বাংলা গানদুটি রবীন্দ্রসংগীত।

নজরুলগীতি ও অন্যান্য ঐতিহ্যবাহী গান[সম্পাদনা]

বাংলা সঙ্গীতের আর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধারা হল বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সৃষ্ট নজরুলগীতি বা নজরুলসংগীত। সুপ্রভা সরকার, ধীরেন্দ্রচন্দ্র মিত্র, ফিরোজা বেগম, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, ড. অঞ্জলি মুখোপাধ্যায়, ধীরেন বসু, পূরবী দত্ত, অনুপ ঘোষাল, সোহরাব হোসেন, ফিরদৌসী আরা প্রমুখ এই ধারার বিশিষ্ট গায়ক। নজরুল রচিত "চল্‌ চল্‌ চল্‌, ঊর্ধগগনে বাজে মাদল" নজরুলগীতিটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রণসংগীত।

রবীন্দ্রনাথ বা নজরুল ছাড়াও রামনিধি গুপ্ত (নিধুবাবু), অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেনের গানও দুই বাংলায় সমান জনপ্রিয়।

১৮৬৭ সালে আয়োজিত হিন্দুমেলা বা স্বদেশী মেলায় দেশাত্মবোধক গানের ধারণাটির উদ্ভব হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত বন্দেমাতরম গানটি দেশাত্মবোধক গান হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। বর্তমানে এটি ভারতের জাতীয় স্তোত্র। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা পর্যন্ত দেশাত্মবোধক গান বাংলা সংগীতে একটি বৃহৎ অংশ অধিকার করে ছিল। শুধুমাত্র ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনই নয়, বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ ও পশ্চিমবঙ্গের গণআন্দোলনেও এই দেশাত্মবোধক ও গণসঙ্গীতের ভূমিকা অনস্বীকার্য।[২]

আধুনিক গান[সম্পাদনা]

বাংলা আধুনিক গানের ধারাটিও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। এই ধারায় উল্লেখযোগ্য গায়ক-গায়িকারা হলেন: হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মান্না দে, কিশোর কুমার, রাহুল দেব বর্মন, শচীন দেব বর্মন, গীতা দত্ত, শ্যামল মিত্র, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায়, সতীনাথ মুখোপাধ্যায়, দ্বিজেন বন্দ্যোপাধ্যায়, কানন দেবী, সুধীরলাল চক্রবর্তী, জগন্ময় মিত্র, দিলীপকুমার রায়, আঙুরবালা, ইন্দুবালা, উৎপলা সেন, সুপ্রীতি ঘোষ, আলপনা বন্দ্যোপাধ্যায়, প্রতিমা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাবিনা ইয়াসমিনরুনা লায়লা। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য, পান্নালাল ভট্টাচার্য, মৃণালকান্তি ঘোষ, ভবানীচরণ দাস, রাধারাণী দেবী ও গীতশ্রী ছবি বন্দ্যোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা ভক্তিগীতি এবং আব্বাসউদ্দীন আহমদ ও নির্মলেন্দু চৌধুরী বাংলা লোকসঙ্গীতের কয়েকটি অবিস্মরণীয় নাম।

বাংলা গীতিকারদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অজয় ভট্টাচার্য, হিমাংশু দত্ত, সলিল চৌধুরী, হিরেন বসু, সুবোধ পুরকায়স্থ, প্রণব রায়, শৈলেন রায়, গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, শ্যামল গুপ্ত, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় ও মুকুল দত্ত। অন্যদিকে সুরকারদের মধ্যে উল্লেখ্য রবি শংকর, হিমাংশু দত্ত, সলিল চৌধুরী, কমল দাশগুপ্ত, রাইচাঁদ বড়াল, তিমিরবরণ ভট্টাচার্য, কালীপদ সেন, নচিকেতা ঘোষ, রবিন চট্টোপাধ্যায়, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়, সুধীন দাশগুপ্ত, শচীন দেব বর্মন, রাহুল দেব বর্মন, ও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়।

১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশের আজম খানের ব্যান্ড উচ্চারণ এবং আখন্দ (লাকী আখন্দহ্যাপী আখন্দ) ভাতৃদ্বয় দেশব্যাপী সঙ্গীতের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। বন্ধু ইশতিয়াকের পরামর্শে সৃষ্টি করেন একটি এসিড-রক ঘরানার গান জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে! তিনি দাবী করেন এটি বাংলা গানের ইতিহাসে- প্রথম হার্ডরকরবীন্দ্রসদনে কনসার্টের সময়ে মহীনের ঘোড়াগুলি, ১৯৭৯; বাম থেকে: রাজা ব্যানার্জী, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায়, তাপস দাস, প্রণব সেনগুপ্ত, গৌতম চট্টোপাধ্যায় এবং রঞ্জন ঘোষালএব্রাহাম মজুমদার এবং বিশ্বনাথ চট্টোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন, যদিও এখানে অদৃশ্যমান। মহীনের ঘোড়াগুলি[৩] পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের বাংলা ব্যান্ড সংগীতে প্রথম ব্যান্ড বলে স্বীকৃত [৪][৫] । পরবর্তীকালে ১৯৮০ এবং ১৯৯০-এর দশকে যখন পশ্চিমী প্রভাব আরো ব্যাপক হয়ে ওঠে, তখন বাংলা ব্যান্ড ভারত এবং বাংলাদেশে অল্পবয়সী ছেলেমেয়েদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং তখন থেকে বাংলা সংস্কৃতিতে সংযুক্ত হয়েছে। এর দশক থেকে পাশ্চাত্য ধ্যানধারণা ও আধুনিক নগরজীবনকেন্দ্রিক বাংলা ব্যান্ড সংগীত ও জীবনমুখী গানের উদ্ভব হয় কলকাতাঢাকা শহরে। ----> জীবনমুখী গানে কবীর সুমন, নচিকেতাঅঞ্জন দত্ত আধুনিক বাংলা গানের এই সময়কার তিন দিকপাল শিল্পী। বাংলা ব্যান্ডগুলির মধ্যে ভূমি, চন্দ্রবিন্দু, লক্ষ্মীছাড়া, মাইলস, নগর বাউল, ফিডব্যাক, সোলস, ফসিলস, ক্যাকটাস, ক্রসউইন্ডজ ও ইনসোমনিয়া। এই সময়েই অজয় চক্রবর্তী, রাশিদ খান প্রমুখ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত শিল্পী রাগাশ্রয়ী বাংলা আধুনিক গানের পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছেন।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "The Bishnupur Gharana"। Saxonian Folkways। সংগৃহীত ৬ অক্টোবর ২০১৬ 
  2. Chatterjee, Gita. Bengal's Swadeshi Samgīt. Published in Banerjee, Jayasri (ed.), The Music of Bengal. Baroda: Indian Musicological Society, 1987.
  3. অভিষেক গাঙ্গুলি (এপ্রিল ০১, ২০০২)। "সিটি বীট্‌স - আর্বান ফোক মিউসিক ইন লেট মডার্ন কলকাতা"সরাই রীডার (978-8190142908): ৫১। সংগৃহীত অক্টোবর ০৮, ২০১৪ 
  4. "ভারতীয় রক ব্যান্ড"। thumbnails.visually.netdna-cdn.com। সংগৃহীত মে ১৬, ২০১৪ 
  5. সৌনক ঘোষাল (ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৪)। "Heavy on this side, hard on the other: Ideal recipe for Bengal-Bangla tie-up"দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া (ভারত)। সংগৃহীত মে ০৯, ২০১৫