চণ্ডীদাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
চণ্ডীদাস
জন্ম ১৩৭০
নানুর (বীরভূম); মতান্তরে, ছাতনা (বাঁকুড়া)
মৃত্যু ১৪৩০
ভাষা বাংলা
জাতি বাঙালি
ধরন বৈষ্ণব পদাবলী
বিষয় কবিতা/পদাবলী
উল্লেখযোগ্য রচনাসমূহ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন
সঙ্গী রজকিনী রামী


চণ্ডীদাস (১৩৭০-১৪৩০) মধ্যযুগের চতুর্দশ শতকের বাঙালি কবি। তিনি চৈতন্য-পূর্ব বাংলা সাহিত্যে বৈষ্ণব পদাবলী রচয়িতা হিসেবে বিশিষ্ট স্থান অধিকার করে আছেন। চৈতন্যদেবের জন্মের আগে থেকেই চণ্ডীদাসের নামোল্লেখিত বহু গীতিপদ মানুষের মুখে মুখে ফিরত। জনশ্রুতি আছে, রজকিনী রামী তাঁর সহজসাধনের সঙ্গিনী ছিলেন।

চণ্ডীদাসের পদাবলীর রেকর্ডিং-এ

বাংলা ভাষায় রাধাকৃষ্ণের প্রেম সম্পর্কিত প্রায় ১২৫০ টির অধিক কাব্যের সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে রচয়িতা হিসেবে বড়ু চণ্ডীদাস, দীন চণ্ডীদাসদ্বিজ চণ্ডীদাস তিনটি ভিন্ন নামের উল্লেখ রয়েছে আবার কোনোটিতে রচয়িতার নামের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় নি। এ কাব্যগুলো ভণিতা নামে পরিচিত। ভণিতা একই ব্যক্তি কর্তৃক রচিত কিনা তা পরিষ্কার করে জানা যায় না। আধুনিক পণ্ডিতরা ধারনা করে থাকেন, বর্তমান যে সকল কবিতা চণ্ডীদাসের নামে রয়েছে তা অন্তত চারজন ভিন্ন চণ্ডীদাস কর্তৃক রচিত হয়েছে। ভণিতা কাব্যের রচনাশৈলী অনুযায়ী তাদের পৃথক করা যায়।[১]

প্রথম চণ্ডীদাস হিসেবে অনন্ত বড়ু চণ্ডীদাসকে ধারণা করা হয় যিনি আনুমানিক ১৪ শতকে বীরভূম জেলায় (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ) জন্ম নেন; তিনি মধ্যয়ুগীয় বাংলা কবিতার অন্যতম নিদর্শন শ্রীকৃষ্ণকীর্তন রচনা করেন।[২] তবে ড. মিহির চৌধুরী কামিল্যা ভাষাতাত্ত্বিক তথ্যপ্রমাণের সাহায্যে প্রমাণ করেছেন, ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’ রচয়িতা বড়ুচণ্ডীদাস বাঁকুড়া জেলার সদর মহকুমাস্থ ছাতনার অধিবাসী ছিলেন। [৩][৪] তার আসল নাম অনন্ত, কৌলিক উপাধি বড়ু, এবং গুরুপ্রদত্ত নাম চণ্ডীদাস[২] এই কাব্যে তিনি নিজেকে অনন্ত বড়ু চন্ডীদাস হিসাবে ভণিতা দিয়েছেন। তিনি বাসলী/বাশুলী দেবীর উপাসক ছিলেন। বীরভূম এর নানুরে এই দেবীর মন্দির আছে। "বড়ু" শব্দটি "বটু" বা "বাড়ুজ্যে" (বন্দ্যোপাধ্যায়) শব্দের অপভ্রংশ বলে মনে করা হয়। চণ্ডীদাসের মৃত্যু সম্বন্ধে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের আবিষ্কর্তা বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভ স্থানীয় প্রবাদের উল্লেখ করেছেন — বীরভূমের নানুরে বাশুলীদেবীর মন্দিরের কাছে চণ্ডীদাসের কীর্তন দলের একটি নাট্যশালা ছিল। চণ্ডীদাস একবার গৌড়ের নবাবের রাজসভায় গান গাওয়ার অনুরোধ রক্ষা করতে সেখানে যান। তাঁর কণ্ঠে ভক্তি-প্রেমের গান শুনে নবাবের বেগম মুগ্ধ হয়ে যান এবং তিনি চণ্ডীদাসের গুণের অনুরাগিণী হয়ে পড়েন। বেগম একথা নবাবের কাছে স্বীকার করলে নবাব ক্রোধের বশে চণ্ডীদাসকে মৃত্যুর দণ্ডাদেশ দেন। আত্মীয় বন্ধুবর্গের সামনে চণ্ডীদাস হস্তিপৃষ্ঠে আবদ্ধ হয়ে নিদারুণ কশাঘাত সহ্য করে প্রাণবিসর্জন দেন; বেগম সেই দৃশ্য দেখে শোকে মুর্চ্ছিতা হয়ে প্রাণবিয়োগ করেন।[৫]

দীন চণ্ডীদাস এবং দ্বিজ চণ্ডীদাস নামক ভণিতার দুইজন কবিকে চৈতন্য-পরবর্তী যুগের কবি বলে ধারণা করা হয়।

পদাবলী[সম্পাদনা]

সহজিয়া ভাবধারায় চণ্ডীদাস রচিত মানবিক প্রেমের কয়েকটি পদ -

"ব্রহ্মাণ্ড ব্যাপিয়া আছয়ে যে জন, কেহ না জানয়ে তারে।
প্রেমের আরতি যে জন জানয়ে সেই সে চিনিতে পারে।।"

"মরম না জানে, মরম বাথানে, এমন আছয়ে যারা।
কাজ নাই সখি, তাদের কথায়, বাহিরে রহুন তারা।
আমার বাহির দুয়ারে কপাট লেগেছে – ভিতর দুয়ার খোলা।"

"কহে চণ্ডীদাস, কানুর পীরিতি – জাতিকুলশীল ছাড়া।"

"প্রণয় করিয়া ভাঙ্গয়ে যে। সাধন-অঙ্গ পায় না সে।"

"কি লাগিয়া ডাকরে বাঁশী আর কিবা চাও।
বাকি আছে প্রাণ আমার তাহা লৈয়া যাও। "

সহজিয়া গুরুবাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি লেখেন,

"শুনহ মানুষ ভাই, সবার উপরে মানুষ বড়, তাহার উপরে নাই।"

[৬]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "বড়ু চণ্ডীদাস"bn.vikaspedia.in (বাংলা ভাষায়)। বিকাশপিডিয়া। সংগৃহীত জুলাই ২৪, ২০১৫ 
  2. নীলরতন সেন। "কবি বড়ু চণ্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণকীর্তন"milansagar.com (বাংলা ভাষায়)। ভারত: milansagar। সংগৃহীত জুলাই ২৪, ২০১৫ 
  3. শ্রীকৃষ্ণকীর্তন বড়ুচণ্ডীদাস বিরচিত, ডঃ মিহির চৌধুরী কামিল্যা, শিলালিপি, কলকাতা, ২০০৫ (২য় প্রকাশ), প্রবেশক পৃষ্ঠা ৫
  4. প্রবন্ধ বাঁকুড়ার উপভাষা ও শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বাঁকুড়ার উপভাষা, ড. মিহির চৌধুরী কামিল্যা, হরষিৎ মিশন, কলকাতা, ১৯৭২
  5. দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গভাষা ও সাহিত্য, প্রথম খণ্ড, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ, কলকাতা-১৩, প্রকাশ: ১৯৮৬
  6. Dinesh Chandra Sen, Brihat Banga, 2nd volume, Dey's publishing: Jan 1993, Kolkata: 700073, ISBN 81-7079-186-3

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]