নমস্কার

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
নমস্কার ভঙ্গিমায় মোহিনীঅট্টম নৃত্যশিল্পী

নমস্কার (উচ্চারণ: [nomoʃkar] অথবা উচ্চারণ: [nɔmoʃkar]; এছাড়াও নমস্তে এবং নমস্কারম্) হল ভারতীয় উপমহাদেশে, বিশেষত ভারতনেপালে, এবং ভারতীয় প্রবাসীদের মধ্যে প্রচলিত হিন্দু রীতি থেকে উদ্ভূত একটি সম্মানীয় সম্ভাষণ। এটি অভিবাদন ও সম্ভাষণ উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়।[১][২] এই রীতিটি বাঙালিদের মধ্যেও বিশেষ জনপ্রিয় এবং বাংলা সম্ভাষণের প্রধান নিজস্ব ভঙ্গি। নমস্কার কথাটি উচ্চারণ করা হয় হাতের তালুদুটোকে পরস্পর সংলগ্ন করে কিছুটা নত হয়ে, এই সময় আঙুলগুলো উপরের দিকে নির্দেশিত থাকে আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ বুকের কাছে থাকে। এই ভঙ্গিটিকে অঞ্জলি মুদ্রা বা প্রণামাসন বলা হয়।[৩] আবার কোনো শব্দ উচ্চারণ না করেও এই ভঙ্গিমাটি সম্পন্ন করা যায়, এতে অর্থের কোনো পরিবর্তন হয় না।

ব্যুৎপত্তি, অর্থ ও উৎস[সম্পাদনা]

থাই মন্দিরের মূর্তি।

নমস্কার (নমস্ + কার) শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ভাষার নমস্কার (সংস্কৃত: नमस्कार, উচ্চারিত [nəməskaːrə]) শব্দ থেকে, নম এবং কৃ ধাতুর সাথে ঘঞ্ প্রত্যয়ের সংযুক্তিতে সৃষ্ট কার (কৃ + ঘঞ্) শব্দের সন্ধিতে।[৪] ধ্বনিটির আগে নমঃ শব্দটি বসায় সন্ধির জন্য তা নমস্ হয়েছে।[৫][৬]

নম কথাটির অর্থ 'প্রণাম', 'অভিবাদন', 'সম্মাননা' বা 'নত হওয়া'[৭] এবং কার কথার অর্থ 'কার্য' বা 'করা' ('কৃ' ধাতুর কর্ম কারক)। অর্থাৎ, নমস্কার কথাটির আভিধানিক অর্থ হল "প্রণাম করা" বা "সম্মান করা"।[৮]

বাংলা ছাড়া ভারতের কিছু অঞ্চলে অভিবাদনের এই রীতিটি নমস্তে (সংস্কৃত: नमस्ते, উচ্চারিত [nəməst̪eː]) নামে পরিচিত। এই শব্দটিও সংস্কৃত থেকে আগত। এর অর্থ "তোমাকে প্রণাম"। নম এবং তে (যুষ্মদ্ বা তুমি শব্দের ষষ্ঠীর একবচন রূপ) শব্দদ্বয়ের সন্ধিতে তৈরি হয়েছে শব্দটি। সন্ধির জন্যই নমঃ রূপান্তরিত হয়েছে নমস্-এ।

সংস্কৃতে তিন বা ততোধিক ব্যক্তিকে এই সম্ভাষণ করা হলে বলা হয় নমোবঃনম এবং যুষ্মদ্ শব্দের ষষ্ঠী বা সম্বন্ধ পদের বহুবচন রূপ বঃ সন্ধি করে শব্দটি সৃষ্টি করেছে।[৪] ধ্বনির আগে বসায় নমঃ হয়েছে নমোনমোবঃ-এর ব্যবহার তুলনামূলক কম।[৫]

আরো কম প্রচলিত একটি রূপভেদ হল নমোবাম্। দু'জন ব্যক্তিকে সম্ভাষণ করতে হলে এটি ব্যবহৃত হয়। বাম্ হল যুষ্মদ্ শব্দের ষষ্ঠীর দ্বিবচন রূপ।[৪]

উপস্থাপন[সম্পাদনা]

সিন্ধু সভ্যতায় খননকার্যে প্রচুর পুরুষ ও নারীর টেরাকোটা মূর্তি পাওয়া গেছে, যারা নমস্কার ভঙ্গিরত।[৯][১০] প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এই মূর্তিগুলির আনুমানিক সময়কাল নির্ধারণ করেছেন ৩০০০ থেকে ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।[১১][১২]

ব্যবহার[সম্পাদনা]

হাতদুটো পরস্পর সংলগ্ন করে মিষ্টি হাসির সাথে নমস্কার অভিবাদন ― ভারতের একটি জনপ্রিয় রীতি।
ঐশ্বর্যা রাই নমস্কার করছেন।

এই রীতিটি ভারত, নেপাল, বাংলাদেশ, এশিয়ার অন্য কিছু অঞ্চল এবং যেখানে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আদি মানুষ বসবাস করে, সেখানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।[১৩] নমস্কার বা নমস্তে সম্ভাষণ, অভিবাদন এবং আত্মীয়, অতিথি কিংবা আগন্তুককে স্বাগত জানবার একটি সম্মানজনক রীতি।[২] কিছু গ্রন্থে বলা আছে, কারোর কোনো দান বা উপহার গ্রহণে বিনয় জানাতে, অথবা কোনো ব্যক্তির কৃপার প্রতি ধন্যবাদ জানাতেও নমস্কার ব্যবহার করা যেতে পারে।[১৪]

আবার মন্দিরে বা পূজার ষোড়শ উপচারের মধ্যে নমস্কার অন্যতম উপচার। অর্থাৎ শাস্ত্র অনুসারে, নমস্কার যেমন দেবদেবীর পুজোর একটি আচার, তেমনিই অতিথি বা অন্য ব্যক্তিকে সম্ভাষণেরও এক অঙ্গ।[১৫][১৬] এর মাধ্যমে একজন অপরকে নম্রতা, বিনয়, সম্মান ও যত্ন প্রকাশ করতে পারেন। এমনকি এর মাধ্যমে বিদায়ও জানানো যায়। তৈত্তিরীয় উপনিষদ্ নামক প্রাচীন হিন্দু গ্রন্থে নমস্কারকে "অতিথিদেবো ভব" নামে অভিহিত করা হয়েছে (অর্থাৎ, অতিথি দেবতাতুল্য)।[১৭][১৮]

প্রণামের ছয়টি রূপের একটি হল নমস্কার। ভারতে নমস্কার এবং প্রণামকে অভিন্ন হিসেবেই মনে করা হয়।[১৯][২০]

আঞ্চলিক রূপভেদ[সম্পাদনা]

নমস্কার ভঙ্গিমায় বাঙালি যুগল।

বাংলায় অভিবাদনের এই রীতিটি নমস্কার নামেই পরিচিত, আবার কখনো-কখনো আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে প্রণাম কথাটিও বলা হয়। অসমীয়া (নমস্কাৰ) এবং ওড়িয়ায় (ନମସ୍କାର) "নমস্কার" কথাটিই বলা হয়। হিন্দিনেপালিতে "নমস্তে" (नमस्ते) এবং "নমস্কার" (नमस्कार) দুটোই বলা হয়। নেপালে নমস্কার শব্দটি সাধারণত গুরুজনদের ডাকা ও শ্রদ্ধা জানাতে ব্যবহার করা হয়। কন্নড়ে একজন ব্যক্তিকে "নমস্কারা" (ನಮಸ್ಕಾರ) আর একাধিক ব্যক্তিকে "নমস্কারাগলু" (ನಮಸ್ಕಾರಗಳು) বলে সম্ভাষণ জানানো হয়। তেলুগুতে একজনের জন্য "দণ্ডমু" (దండము) বা "নমস্কারম্" (నమస్కారం) এবং একের বেশিজনের ক্ষেত্রে "দণ্ডালু" বা "নমস্কারালু" বলা হয়। এছাড়াও আনুষ্ঠানিক "প্রণামমু" (ప్రణామము) প্রচলিত। তামিলে নমস্কারকে বলা হয় ভানাক্কম বা "বণক্কম" (வணக்கம்), এর উৎপত্তি "বণঙ্গু" (வணங்கு) শব্দ থেকে, যার অর্থ সম্ভাষণ। মলয়ালম ভাষায় নমস্কারম্ (നമസ്കാരം) শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:Gestures

  1. Sanskrit English Disctionary University of Koeln, Germany
  2. Constance Jones and James D. Ryan, Encyclopedia of Hinduism, আইএসবিএন ৯৭৮-০-৮১৬০-৫৪৫৮-৯, p. 302
  3. Chatterjee, Gautam (২০০১), Sacred Hindu Symbols, Google books, পৃষ্ঠা 47–48 .
  4. Thomas Burrow, The Sanskrit Language, pp. 263–268
  5. Thomas Burrow, The Sanskrit Language, pp. 100–102
  6. Namah Sanskrit Dictionary
  7. "Cologne Digital Sanskrit Lexicon", Cologne Digital Sanskrit Dictionaries (search results), University of Cologne, সংগ্রহের তারিখ মার্চ ২৪, ২০১২ .
  8. Namaste Douglas Harper, Etymology Dictionary
  9. Sharma & Sharma (2004), Panorama of Harappan Civilization, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১৭৪৭৯০৫৭৬, Kaveri Books, page 129
  10. Origins of Hinduism Hinduism Today, Volume 7, Issue 2 (April/May/June), Chapter 1, p. 3
  11. Seated Male in Namaskar pose National Museum, New Delhi, India (2012)
  12. S Kalyanaraman, Indus Script Cipher: Hieroglyphs of Indian Linguistic Area, আইএসবিএন ৯৭৮-০৯৮২৮৯৭১০২, pp. 234–236
  13. Ying, Y. W., Coombs, M., & Lee, P. A. (1999), Family intergenerational relationship of Asian American adoblescents, Cultural Diversity and Ethnic Minority Psychology, 5(4), pp. 350–363
  14. Joseph Shaules (2007), Deep Culture: The Hidden Challenges of Global Living, আইএসবিএন ৯৭৮-১৮৪৭৬৯০১৬৬, pp. 68–70
  15. James Lochtefeld, The Illustrated Encyclopedia of Hinduism, Volume 2, আইএসবিএন ০-৮২৩৯-২২৮৭-১, pages 720
  16. Fuller, C. J. (২০০৪), The Camphor Flame: Popular Hinduism and Society in India, Princeton, NJ: Princeton University Press, পৃষ্ঠা 66–70, আইএসবিএন 978-0-691-12048-5 
  17. Kelkar (2010), টেমপ্লেট:Doi-inline, Services Marketing Quarterly, 31(4), 420-433
  18. Roberto De Nobili, Preaching Wisdom to the Wise: Three Treatises, আইএসবিএন ৯৭৮-১৮৮০৮১০৩৭৮, page 132
  19. R.R. Mehrotra (1995), How to be polite in Indian English, International Journal of the Sociology of Language. Volume 116, Issue 1, Pages 99–110
  20. G. Chatterjee (2003), Sacred Hindu Symbols, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১৭০১৭৩৯৭৭, pp. 47–49