বাংলাদেশে একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন
| বাংলাদেশে ইসলাম |
|---|

বাংলাদেশে একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বলতে বুঝানো হয় বাংলাদেশে ইসলামী উচ্চ শিক্ষার ইতিহাস ও বিবর্তন ও নানা ঘটনার পরিক্রমায় বাংলাদেশে একটি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হওয়া, যেটা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ নামে পরিচিত।[১] বাংলাদেশে বহু পূর্ব থেকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন চলছিলো। এই আন্দোলন ১৭৭৫ সালে ওয়ারেন হেস্টিংসের নিকটে একটি উচ্চতর মাদরাসা প্রতিষ্ঠার আবেদন দিয়ে শুরু হয়েছিলো। এরপর আবু নসর অহীদ, মাওলানা আকরম খা, মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা ভাসানীসহ বহু ইসলামি পণ্ডিত এই আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। কিন্তু সরকার পক্ষের অনীহার কারণে ও নানা প্রতিকূলতায় একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়নি, সর্বপ্রথম ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়ায় বাংলাদেশের প্রথম সরকার স্বীকৃত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়, যা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া নামে পরিচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ধরণ ও সংখ্যা
[সম্পাদনা]বাংলাদেশে আলিয়া ও কওমি শিক্ষা ব্যবস্থায় উচ্চ শিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বা এর পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। বর্তমান বাংলাদেশে সরকার স্বীকৃত ৫টি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এছাড়া সরকারি স্বীকৃতি বাইরে কওমি কিছু মাদ্রাসার বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্রেণীর প্রোগ্রাম চালু আছে।[২] সরকারি স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়গুলো:
- ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ (১৯৭৯, সরকারি)
- ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি, গাজীপুর (১৯৭৯, ওআইসি পরিচালিত)
- আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (১৯৯৫, বেসরকারি)
- বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা (২০০৬, বেসরকারি)
- ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা (২০১৩, সরকারি)
তবে এসব বিশ্ববিদ্যালয় বাদেও কিছু কওমি মাদ্রাসা রয়েছে, যেগুলোতে উচ্চতর শিক্ষা প্রদান করা হয়, যেমনঃ হাটহাজারী মাদ্রাসা (১৮৯৬), ব্রাহ্মণবাড়িয়া ইউনুছিয়া মাদ্রাসা (১৯১৪), চট্টগ্রাম মেখল মাদরাসা (১৯৩১) পটিয়া মাদ্রাসা (১৯৩৮), যাত্রাবাড়ি বড় মাদরাসা (১৯৬৯), ঢাকা জামিয়া রাহমানিয়া আরাবিয়া (১৯৮৬) প্রভৃতি।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন
[সম্পাদনা]১৭৭৫-১৯২০
[সম্পাদনা]আলিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা (১৭৭৫)
১৭৭৫ সালের দিকে কলকাতার কিছু ইসলামী শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ভারতীয় বড়লাট ওয়ারেন হেস্টিংসের নিকত একটি উচ্চতর মাদরাসা প্রতিষ্ঠার আবেদন করে। সেই প্রেক্ষিতে ১৭৮০ সালে উচ্চতর পড়াশোনার জন্য মাদ্রাসা-ই আলিয়া (বর্তমানে আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু ১৮৩৭ সালে সরকারি নির্দেশে এখানে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হলে আরবী ও ইসলামি শিক্ষা ব্যাহত হয়।[৩] ইংরেজি শিক্ষার আশানুরূপ ফল না হওয়ায় মাদ্রাসার তৎকালীন অধ্যক্ষ উইলিয়াম নাসা লিজ এবং বাংলার গভর্নর ফ্রেডরিক জেমস হালিডে ১৮৫৮ সালে কলকাতা আলিয়া মাদরাসা বিলোপের সুপারিশ করে।[৪] তবে মুসলিমদের আন্দোলনের চাপে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে আসেন।[৫]
ঢাকায় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন (১৯০৬)
১৯০৬ সালে নবাব সলিমুল্লাহর উদ্যোগে মুসলিম লীগের ছত্রছায়ায় পুরো ভারত উপমহাদেশের উল্লেখযোগ্য মুসলিম শিক্ষাবিদদের নিয়ে ঢাকায় সর্বভারতীয় মুহাম্মাদান শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।[৬] সম্মেলনের উদ্দেশ্য ছিলো ঢাকাকে মুসলমানদের জন্য শিক্ষার উপযোগী করে তোলা।[৭] ১৯১০ সালের সম্মেলনে আবু নসর অহীদ মাদরাসা শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয়ে একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।[৮] ১৯১১ সর্বভারতীয় মুহাম্মাদান শিক্ষা বিষয়ক সম্মেলনের পূর্ববাংলা ও আসাম শাখার সভা আয়োজন হয়, সেখানে স্যার সৈয়দ আহমদ আলিগড়ের মতো ঢাকাতেও একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রস্তাব দেন।[৯] পরের বছর স্যার সলিমুল্লাহ নওয়াব আলী ও ফজলুল হকের নেতৃত্বে একটি দল মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপন করেন।[১০] তবে কলকাতার হিন্দুদের বিরোধিতার কারণে ঢাকায় একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা কঠিন ছিলো। এছাড়াও ১৯১২ সালে আবু নসর ওহিদ নাথান কমিশনে ইসলামিক স্টাডিজ অনুষদসহ ঢাকায় একটি আবাসিক ‘মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানান।[১১] কিন্তু নাথান কমিশন ইসলামিক স্টাডিজ স্বতন্ত্র অনুষদ প্রস্তাব করলেও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন ইসলামিক স্টাডিজকে একটি বিভাগ হিসাবে সুপারিশ করে এবং এই সুপারিশ অনুমোদন পায়।[১২][১৩]
১৯২০-১৯৪১
[সম্পাদনা]বগুড়ায় আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা (১৯১৩)
ঢাকায় একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যপারে ব্রিটিশ সরকারের স্বতঃস্ফূর্ত মনোভাব না থাকায়, বাংলার শিক্ষিত মুসলমানরা নিজেরাই উদ্যোগ গ্রহণের চিন্তা করেন।[১৪] ১৯১৩ সালে মওলানা আকরম খাঁকে সভাপতি এবং মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী জয়েন্ট সেক্রেটারির দায়িত্ব দিয়ে আনজুমানে ওলামায়ে বাঙ্গালা গঠন করা হয়। ১৯১৩ সালের মার্চ মাসে বগুড়া জেলার বানিয়া পাড়ায় সংগঠনটির একটি মিটিং করা হয় এবং বগুড়ায় জেলায় একটি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ইসলামাবাদী এক্টভিস্ট হিসাবে মাসিক মোহাম্মদী ও আল এসলামসহ নানা পত্রিকায় এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা নিয়ে লেখালেখি শুরু করেন।[১৫]
চট্টগ্রামে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা (১৯৩১)
ইসলামাবাদী ১৯২০ সালে ব্যক্তিগত উদ্যোগে চট্টগ্রামের পটিয়া থানার দিয়াং পাহাড়ের পাদদেশে ৬ শত বিঘা জমি নিয়ে ইসলামি বা মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ফান্ড গঠন করেন। তারা পরিকল্পনা করে ১৯৩১ সালের মধ্যে ২৫ লক্ষ টাকা সংগ্রহ করে এই কাজ বাস্তবায়ন করবে।[১৬] ১৯৩১ সালে তৎকালীন সরকার মমিন কমিটি গঠন করে অতীতের সকল রিপোর্ট পর্যালোচনার দায়িত্ব দেন। কিন্তু এ কমিটির অনুকূল রিপোর্ট পেশ করলেও তা বাস্তবায়নে দীর্ঘ দেরি হওয়ায় ১৯৩৫ সালে মাওলানা শওকত আলী কোন উপায় না পেয়ে দেশে প্রথম বেসরকারি ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠা আন্দোলনের কর্মী ও সমর্থক ছিলেন জঙ্গে জিহাদ, শাহ বদিউল আলম, শাহ জুলফিকার প্রভৃতি ব্যক্তিবর্গ। এরপরেও তারা আর্থিক সংকটসহ নানা কারণে কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি।[১৭][১৮]
ইউনিভার্সিটি অব ইসলামিক লার্নিং প্রতিষ্ঠার সুপারিশ (১৯৪১)
অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক ১৯৩৮ সালে মওলা বক্স কমিটি গঠন করেন। ১৯৩৯ সালে তৎকালীন জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার সেক্রেটারি মাওলানা এটিএম মুস্তাফিজুর রহমান (১৯৩৮-৩৯) প্রধানমন্ত্রী এ কে ফজলুল হকের নিকট ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ১৯৪১ সালে মওলা বক্স কমিটি ‘ইউনিভার্সিটি অব ইসলামিক লার্নিং’ প্রতিষ্ঠার জোর সুপারিশ করে।
১৯৪১-১৯৬৪
[সম্পাদনা]ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ (১৯৬৪-১৯৬৪)
এছাড়াও ১৯৪৬-৪৭ সালে সৈয়দ মোয়াজ্জেম উদ্দীন হোসেন কমিটি’, ১৯৪৯ সালে মাওলানা আকরম খাঁর ইস্ট বেঙ্গল এডুকেশন সিস্টেম রিকনস্ট্রাকশন কমিটি, ১৯৫৭ সালে আতাউর রহমান খান শিক্ষা সংস্কার কমিটি এবং ১৯৫৮ সালে এস এম শরীফ কমিশন ‘ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার সুপারিশকে জোর সমর্থন করে।[৫]
১৯৬৩ সালের তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এস এম হোসাইন উক্ত কমিশনের অধীনে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি গঠন করে তদন্ত করে।[১৯] তদন্ত শেষে ১৯৬৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নিম্নে বর্ণিত একটি গুরুত্বপূর্ণ রিপোর্ট পেশ করে। এই রিপোর্টে ইসলামি ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থার সমন্বয় করার কথা উল্লেখ ছিলো। সেগুলোর অন্যতম হলো:
- আধুনিক শিক্ষার সাথে মাদরাসা শিক্ষার একত্রিকরণ
- ইসলামি শিক্ষার ওপর গুরুত্ব নিশ্চিতকরণ ও ইসলামিয়াতে গবেষণায় সুবিধা প্রদান।
- বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি পাঠ্যসূচিভুক্ত করে জাতীয় শিক্ষা কমিশন কর্তৃক সুপারিশের সাথে মাদরাসা শিক্ষার ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা।
- মাদরাসা শিক্ষার্থীদের যুগের চাহিদা অনুযায়ী সকল চাকরি লাভের শিক্ষা প্রদান।
বরিশালে, সুনামগঞ্জ, চট্টগ্রামে ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আশ্বাস (১৯৬৪)
১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আব্দুল মোনায়েম খান পূর্ববাংলার জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে বরিশালের কাসেমাবাদে (গৌরনদী উপজেলার গ্রাম) ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।[২০] এছাড়াও মোনায়েম ১৯৬৫ সালে চট্টগ্রামে ও প্রায় একই সময়ে সুনামগঞ্জেও ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দেন। কিন্তু এই আশ্বাসই সফলতার মুখ দেখেনি, এই ঘোষণায় কোন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়নি।[১৪][২০]
১৯৭৪-১৯৭৮
[সম্পাদনা]টাঙ্গাইলে ভাসানীর সন্তোষ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ (১৯৭৪)
ভাসানী ১৯৫৭ সালে কাগমারী সম্মেলনে এই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংগঠনিক কার্যক্রম শুরু করতে পারেন নি, ১৯৭০ সালে মাওলানা ভাসানী "আমার পরিকল্পনায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়" শিরোনামে লিখিত নিবন্ধের মাধ্যমে তার প্রস্তাবিত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের চূড়ান্ত প্রস্তাব করেন।[২১] এরপর সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড (সইবি ট্রাস্টি বোর্ড) গঠন করে কার্যক্রম হাতে নিলেও কিন্তু দেশের রাজনৈতিক জটিলতার কারণে কার্যক্রম আর সামনে এগায় নি।[২২]
এসব কিছুর উপর অনাস্থা হয়ে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৪ সালে টাঙ্গাইল জেলার সন্তোষে (টাঙ্গাইল সদর উপজেলার একটি গ্রাম) ব্যক্তিগত উদ্যোগে সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।[২৩] তিনি সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণরুপ দিতে পারেননি, কিন্তু এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ প্রায় ১১টা স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।[২৪]
১৯৯৭ সালে টাঙ্গাইল জেলায় একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। এর পরিপ্রক্ষিতে সন্তোষ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ট্রাস্টি বোর্ড সরকারের নিকট টাঙ্গাইল জেলার সদর উপজেলার সন্তোষেই একটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের প্রস্তাব পেশ করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১২ অক্টোবর ১৯৯৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন, নাম দেওয়া হয় মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।[২৫]
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
[সম্পাদনা]কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৭৯)
[সম্পাদনা]১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে কোন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়নি। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার ১ ডিসেম্বর ১৯৭৬ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেয়। ১৯৭৭ সালের ২৭ জানুয়ারি প্রফেসর মুহাম্মাদ আব্দুল বারীকে সভাপতি করে ৭ সদস্যবিশিষ্ট ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ২০ অক্টোবর ১৯৭৭ সালে ইতিবাচক রিপোর্ট পেশ করে। ৩১ মার্চ - ৮ এপ্রিল ১৯৭৭ সালে মক্কায় ওআইসির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানদের এক সম্মেলনে বিভিন্ন মুসলিম রাষ্ট্রে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করা হয়। এই সুপারিশের ভিত্তিতে ২২ নভেম্বর ১৯৭৯ সালে কুষ্টিয়ার শান্তিডাঙ্গা-দুলালপুর নামক স্থানে ১৭৫ একর জমিতে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।[২৬] শুরুতে এটা ওআইসি কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার কথা থাকলেও নানা প্রতিকূলতায় এটা হয়ে উঠেনি।[২৭]
গাজীপুরে আইইউটি (IUT) (১৯৮১)
[সম্পাদনা]ওআইসির ১৯৭৭ সালের ৩১ মার্চ-৮ এপ্রিল তারিখের সম্মেলনে বাংলাদেশে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (ইবি) প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব করে। কিন্তু এরপরের বছর ১৯৭৮ সালের ২৪-২৮ এপ্রিলে ওআইসি বাংলাদেশে ভিন্ন একটি প্রযুক্তিভিত্তিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথাও ঘোষণা দেয়। এই বিশ্ববিদ্যালয় নাম ইসলামিক সেন্টার ফর টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল ট্রেনিং (ICTVTR) নাম থাকলেও পরবর্তিতে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি নাম লাভ করে।
অনন্য বিশ্ববিদ্যালয়
[সম্পাদনা]চট্টগ্রামে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯৫)
শুরুতে প্রতিষ্ঠাতাগণ একটি মহিলা মাদ্রাসা করার চিন্তা করে প্রতিষ্ঠানটি চালু করলেও, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের এক্ট ১৯৯২ অনুসারে ১৯৯৫ সালের ১১ ফেব্রুআরি চট্টগ্রামের চকবাজারে একটি টিনশেড ভবনে প্রতিষ্ঠানটি যাত্রা শুরু করে।[২৮][২৯]
বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (২০০৬)
২০০৬ সালে কামালুদ্দীন জাফরীর অনুরোধে প্রধান মন্ত্রী খালেদা জিয়া এটি চালু করেন। সাইয়্যেদ কামাল উদ্দিন জাফরী বর্তমানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান।[৩০]
ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় (২০১৩)
আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলীসহ দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম-উলামার দেশের আলিয়া মাদ্রাসাগুলো পরিচালনার জন্য সমন্বয়কারী স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবী তোলেন।[৩১][৩২] যার অধীনে আলিয়া মাদ্রাসাগুলোর ফাজিল ও কামিল শ্রেণী পরিচালিত হবে।[৩৩] ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০১২ এর খসড়ার নীতি আলোকে ২০১৩ সালে জাতীয় সংসদে বিশ্ববিদ্যালয়টি অনুমোদন পায়।[৩৪] এই মাদ্রাসার অধীনে বাংলাদেশের সকল আলিয়া মাদ্রাসা পরিচালিত হয়ে থাকে।
আন্দোলন কর্মী
[সম্পাদনা]বাংলাদেশ বা পূর্ব বাংলায় একটি সরকারি পূর্ণাঙ্গ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আন্দোলন বহু মানুষ করেছেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য আন্দোলনকর্মী হলো:
- আবু নসর অহীদ
- মাওলানা আকরম খা
- মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী
- মাওনালা আব্দুল্লাহিল বাকী
- ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ
- মাওলানা শওকত আলী
- শামসুল হক ফরিদপুরী
- মুহসিন উদ্দিন দুদু মিয়া
- আবু জাফর মোহাম্মদ সালেহ
- মাওলানা আব্দুর রহিম
- জঙ্গে জিহাদ
- শাহ বদিউল আলম
- শাহ জুলফিকার
- এটিএম মুস্তাফিজুর রহমান
- নূর মুহাম্মদ আজমী
- খতিব উবায়দুল হক
- মুহাম্মদ ইয়াকুব শরীফ
- মাওলানা এমএ মান্নান
- মুহিউদ্দীন খান
- মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী
- আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ Afsaruddin, Asma (2005). Muslim views on education: Parameters, purview, and possibilities. Journal of Catholic Legal Studies, 44(1), 143-177.।
- ↑ প্রতিবেদক, নিজস্ব। "বাংলাদেশে মাদ্রাসাশিক্ষা: প্রতিযোগিতা, সমঝোতা ও আদর্শিক দ্বন্দ্ব*"। Protichinta। সংগ্রহের তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ আলী খান, আব্বাস। বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস। পৃ. ১৬২–১৬৩।
- ↑ "কলকাতা মাদ্রাসা - বাংলাপিডিয়া"। bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ১১ নভেম্বর ২০২১।
- 1 2 "লক্ষ্য থেকে দূরে সরে যাচ্ছে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়"। দৈনিক সংগ্রাম। সংগ্রহের তারিখ ১১ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ Sajid Maqsood (২০২৩)। THE MUSLIMS EDUCATION POLICY (1906-1927)। Egypt: PalArch's Journal of Archaeology of Egypt। পৃ. ৪৩৩। আইএসএসএন 1567-214X।
- ↑ ব্রিটিশ শাসনামলে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিবর্তন (১৮৫৮-১৯১১)। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়। পৃ. ৯ ইউনিট।
- ↑ Hussain, Muhammad Jahangir (জুলাই–ডিসেম্বর ২০১৯)। "Making and Shaping of the Dhaka University: The Role of the Muslim Leaders" (পিডিএফ)। Jagannath University Journal of Arts (৯ম খণ্ড, ২ নং সংস্করণ)। পৃ. ১৪১। আইএসএসএন 2519-5816। সংগ্রহের তারিখ ২৯ এপ্রিল ২০২৫।
- ↑ নাজিয়া খানম (২০১২)। "বুদ্ধিজীবী"। ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। আইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১। ওসিএলসি 883871743। ওএল 30677644M।
- ↑ মোহাম্মদ আলমগীর (২০১২)। "সলিমুল্লাহ, খাজা"। ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। আইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১। ওসিএলসি 883871743। ওএল 30677644M।
- ↑ "একশো' বছর আগে যে পটভূমিতে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়"। বিবিসি বাংলা। সংগ্রহের তারিখ ১১ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "নাথান কমিশন - বাংলাপিডিয়া"। bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ১১ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন - বাংলাপিডিয়া"। bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ১১ নভেম্বর ২০২১।
- 1 2 বিন ওয়ালী উল্লাহ, রিদওয়ান। "৩৫ বছরে পদার্পণ : 'চাওয়া"। ছাত্রসংবাদ (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৭ এপ্রিল ২০২৫।
- ↑ Ragib, Hammad (৪ অক্টোবর ২০১৯)। "মাওলানা আকরম খাঁ : মুসলিম সাংবাদিকতার পথিকৃৎ আলেম"। Fateh24। সংগ্রহের তারিখ ১১ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয় ও মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী। বলাকা প্রকাশন (চট্টগ্রাম)। পৃ. ৭। আইএসবিএন ৯৭৮৯৮৪৯২০৫৭২২।
- ↑ "মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী (রহ.)-এর জীবনালেখ্য"। banglanews24.com। ২২ আগস্ট ২০১৯। সংগ্রহের তারিখ ১২ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "আঞ্জুমান-ই-উলামা-ই-বাঙ্গালা - বাংলাপিডিয়া"। bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ১১ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ কামরুজ্জামান, ড. মো. (২৪ নভেম্বর ২০২৩)। "বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার অতীত ও বর্তমান"। মাসিক আল-ইতিছাম (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১ মে ২০২৫।
- 1 2 "আজ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দিবস"। The Daily Sangram। সংগ্রহের তারিখ ১২ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "২৩ বছরে পদার্পণ করল মাভাবিপ্রবি"। Odhikar। সংগ্রহের তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০২১।[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
- ↑ "২২তম বছরে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়"। thedailycampus.com। সংগ্রহের তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় - বাংলাপিডিয়া"। bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "মজলুম জননেতা মওলানা ভাসানী"। Daily Nayadiganta। সংগ্রহের তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "History of Mawlana Bhashani Science and Technology University"। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০২১।[স্থায়ীভাবে অকার্যকর সংযোগ]
- ↑ "৪২-এ ইবি : প্রাপ্তি ও প্রত্যাশা"। Daily Nayadiganta। সংগ্রহের তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "২২ নভেম্বর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় দিবস"। banglanews24.com। ২২ নভেম্বর ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ ১৩ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "'IIUC প্রতিষ্ঠার ইতিহাস | প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মেলবন্ধন'"। www.varsityvoice.net। ১৪ নভেম্বর ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "২৫ বছরে আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম"। Odhikar। ১৪ নভেম্বর ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "Bangladesh Islami University"। web.archive.org। University Grants Commission। ২০ নভেম্বর ২০১৬। ২০ নভেম্বর ২০১৬ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ নভেম্বর ২০২১।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: বট: মূল ইউআরএলের অবস্থা অজানা (লিঙ্ক) - ↑ "ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় আশা পূরণের পরও আশঙ্কা | কালের কণ্ঠ"। Kalerkantho। ২৫ অক্টোবর ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ১৪ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয়: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি"। Daily Manobkantha। ১৪ নভেম্বর ২০২১ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৪ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ "Law passed to modernise madrasa education"। দ্য ডেইলি স্টার (ইংরেজি ভাষায়)। ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ১৪ নভেম্বর ২০২১।
- ↑ প্রতিবেদক, নিজস্ব। "ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠায় বিল পাস"। দৈনিক প্রথম আলো। সংগ্রহের তারিখ ১৪ নভেম্বর ২০২১।
