আলিয়া মাদ্রাসা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

আলিয়া মাদ্রাসা ভারতীয় উপমহাদেশের ইসলামী ও আধুনিক সমন্বয়ে শিক্ষা ব্যবস্থা। আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন শিক্ষা পদ্ধতি।[১][২] ১৭৮০ সালে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের (১৭৩২-১৮১৮ সালে) অনুমোদনক্রমে ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষার সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা। আর এরমধ্যে দিয়েই উপমহাদেশে আলিয়া মাদ্রাসা নামক শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন ঘটে।[৩] বাংলাদেশের আলিয়া মাদ্রাসাসমূহ বাংলাদেশের সরকারি শিক্ষাবোর্ড বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ডের অন্তর্ভুক্ত। আলিয়া মাদ্রাসায় আরবি বিষয়ের পাশাপাশি বাংলা ও ইংরেজিসহ সাধারণ শিক্ষার কিছু সাধারণ বিষয় পড়ানো হয়। বিভিন্ন সরকারি চাকরির পরীক্ষায় তারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন।[৪][৫][৬][৭]

আলিয়া মাদ্রাসার ইতিহাস[সম্পাদনা]

১৭৮০ সালে লর্ড ওয়ারেন হেস্টিংসের অনুমোদনক্রমে ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষার সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা। ব্রিটিশ শাসনামলে ইংরেজি শিক্ষার নতুন ধারা ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয় ১৮৫৪ সালের পরবর্তীকালে। আর উপমহাদেশের প্রথম কওমি মাদ্রাসা দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৬ সালে। এতে প্রতীয়মান হয় যে উপমহাদেশে সাধারণ শিক্ষা ও বেসরকারি পর্যায়ে ইসলামি শিক্ষা, তথা কওমি ধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু হওয়ার আগেই আলিয়া নেসাবের শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হয়। তাই গোটা ভারতবর্ষে আলিয়া মাদ্রাসা নেসাবের শিক্ষাব্যবস্থাটিই এতদঞ্চলের প্রাতিষ্ঠানিক ও উচ্চতর ধারার সর্বপ্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থা। সময়ের ব্যবধানে কলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা ভারত ভাগের পর ১৯৪৭ সালে ঢাকায় স্থানান্তরিত হয় এবং নামকরণ করা হয় ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা[৮]

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়ে (১৯৪৯-৭০ খ্রি.) আলিয়া মাদ্রাসা ধারার এ শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের জন্য একাধিক শিক্ষা কমিটি ও কমিশন গঠন করা হয়। এবং বাংলাদেশ স্বাধীনের পরে আলিয়া মাদ্রাসা সমূহ ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত হয়। এবং পরবর্তীতে মাদ্রাসার জন্য আলাদা বোর্ড বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড গঠন করা হলে মাদ্রাসাসমূহ এই বোর্ডে স্থানান্তরিত হয়। এবং ফাজিল ও কামিলের উচ্চ শিক্ষার জন্য ২০০৬ সালে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়, এবং ২০১৬ সালে ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় গঠন হলে আলিয়া মাদ্রাসাসমূহ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে স্থানান্তরিত হয়।[৯]

শিক্ষা ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

আলিয়া মাদ্রাসায় ইবতেদায়ি থেকে কামিল পর্যন্ত ১৬ বছরের পড়ালেখায় রয়েছে পাঁচটি ধাপ। ইতবেদায়ি বা প্রাথমিক পর্যায়ে কোরান শরিফ পড়া ও মুখস্ত করার ওপর জোর দেওয়া হয়। এই পর্যায়ের অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামের মৌলিক বিষয়, আরবি, বাংলা, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল ও সাধারণ বিজ্ঞান।

দাখিল (মাধ্যমিক)[সম্পাদনা]

দাখিল বা মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের জন্য কোরান পড়া ও মুখস্ত করার সঙ্গে যুক্ত হয় কোরানের বিভিন্ন আয়াতের ব্যাখ্যা বা তাফসির। এই পর্যায়ে এসে শিক্ষার্থীদের আরবি, ইসলামি দর্শন, ইসলামি আইন ও তত্ত্ব এবং এগুলোর ব্যবহার পড়ানো হয়। দাখিল শ্রেণীর সকল শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের সাধারণ সিলেবাসের সমস্ত কিছুই পড়তে হয়। এবং অতিরিক্ত হিসাবে কুরআন, হাদিস, আল ফিকহ ও আরবি এই চারটি বিষয় পড়তে হয়। এছাড়া মাদ্রাসার দাখিল পর্যায়ের বিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের বাংলাদেশের সাধারণ সিলেবাস মোতাবেক পদার্থ, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও উচ্চতর গণিত পড়তে হয়। তার মানে সাধারণভাবে বলতে গেলে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা ব্যবস্থা ও সিলেবাস বাংলাদেশের সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার সিলেবাস থেকে অভিন্ন নয়।[১০]

আলিম (উচ্চ মাধ্যমিক)[সম্পাদনা]

আলিম বা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বা কলা বিভাগকে বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকে শিক্ষার্থীদের জন্য। উভয় বিভাগের শিক্ষার্থীদেরই কোরান ও হাদিস ও শরিয়া আইন পড়তে হয়। অন্যদিকে, কলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের আরবি ও ফার্সি ভাষা এবং বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও জীববিজ্ঞানসহ অন্যান্য বিষয় পড়তে হয়।

ফাজিল (স্নাতক সমমান)[সম্পাদনা]

ফাজিল বা স্নাতক পর্যায়ে আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের শুধু কলা বিভাগের বিষয়গুলো নিয়ে পড়াশোনার সুযোগ রয়েছে। যেমনঃ কুরআন, হাদিস, আল ফিকহ, আরবি ব্যকরন, ইসলামের ইতিহাস প্রভৃতি। পূর্বে আলিয়া মাদ্রাসায় ফাজিল পর্যায়ে শুধু ৩ বছরের ডিগ্রি কোর্স চালু ছিলো, তবে বর্তমানে ডিগ্রি কোর্সের সাথে সাথে স্নাতক সমমান কোর্স চালু হয়েছে।

কামিল (স্নাতকোত্তর)[সম্পাদনা]

আলিয়া মাদ্রাসায় কামিল বা স্নাতকোত্তর পর্যায় শিক্ষা গ্রহণের সর্বোচ্চ পর্যায়। কামিল পর্যায়ের কোর্সে শিক্ষার্থীদের কেবল ধর্ম বিষয়ে পড়ানো হয়। এই পর্যায়ে এসে তাদের হাদিস, তাফসির (কোরান শরিফের ব্যাখ্যা), ইসলামি আইন ও আরবি সাহিত্য, ইসলামের ইতিহাস বিশেষায়িতভাবে পড়ানো হয়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Welle (www.dw.com), Deutsche। "'আলিয়ার সাথে কওমিকে গুলিয়ে ফেলা ভুল' | DW | 22.01.2021"DW.COM। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৮ 
  2. "আলিয়া ও কওমি মাদরাসা পারস্পরিক সম্পর্ক"Daily Nayadiganta। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-১০ 
  3. "উপমহাদেশে মাদ্রাসা শিক্ষার সূচনা ও বিকাশ | কালের কণ্ঠ"Kalerkantho। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-১০ 
  4. প্রতিবেদক, নিজস্ব। "মাদ্রাসাশিক্ষার ধারা ও উপধারা"Prothomalo। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-০৮ 
  5. Welle (www.dw.com), Deutsche। "'আমাদের টার্গেট দক্ষ আলেম তৈরি, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার নয়' | DW | 24.04.2017"DW.COM। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-১০ 
  6. Admin, Web (২০১৪-০৩-০৯)। "The Madrassa Education and Its Historical Evolution in Bangladesh"Alochonaa (Dialogue) (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-১০ 
  7. Welle (www.dw.com), Deutsche। "মাদ্রাসায় পড়া 'সফল' নারীদের কথা | DW | 22.01.2021"DW.COM। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-১০ 
  8. "মাদ্রাসা - বাংলাপিডিয়া"bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-১০ 
  9. "মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়নে প্রত্যাশা"SAMAKAL (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-১০ 
  10. "মাদ্রাসার বাংলা অংক ও ইংরেজি খাতা দেখবেন স্কুল শিক্ষকরা"SAMAKAL (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২১-০৬-১০