গাবতলী উপজেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
গাবতলী
উপজেলা
গাবতলী বাংলাদেশ-এ অবস্থিত
গাবতলী
গাবতলী
বাংলাদেশে গাবতলী উপজেলার অবস্থান
স্থানাঙ্ক: ২৪°৫২′৩০″ উত্তর ৮৯°২৭′০″ পূর্ব / ২৪.৮৭৫০০° উত্তর ৮৯.৪৫০০০° পূর্ব / 24.87500; 89.45000স্থানাঙ্ক: ২৪°৫২′৩০″ উত্তর ৮৯°২৭′০″ পূর্ব / ২৪.৮৭৫০০° উত্তর ৮৯.৪৫০০০° পূর্ব / 24.87500; 89.45000 উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন
দেশ  বাংলাদেশ
বিভাগ রাজশাহী বিভাগ
জেলা বগুড়া জেলা
আয়তন
 • মোট ২৩৯.৬১ কিমি (৯২.৫১ বর্গমাইল)
জনসংখ্যা (২০১১)[১]
 • মোট ৩,১৯,৫৮৮
 • ঘনত্ব ১৩০০/কিমি (৩৫০০/বর্গমাইল)
স্বাক্ষরতার হার
 • মোট ৪৬.৬%
সময় অঞ্চল বিএসটি (ইউটিসি+৬)
ওয়েবসাইট প্রাতিষ্ঠানিক ওয়েবসাইট উইকিউপাত্তে এটি সম্পাদনা করুন

গাবতলী উপজেলা বাংলাদেশের বগুড়া জেলার একটি প্রশাসনিক এলাকা। গাবতলীকে ১৯৮৩ সালে উপজেলায় উন্নিত করা হয়।

অবস্থান ও আয়তন[সম্পাদনা]

গাবতলী উপজেলা মানচিত্র

বগুড়া শহর থেকে এই উপজেলা প্রায় ১০ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত। এর পূর্বে সারিয়াকান্দি উপজেলা, পশ্চিমে বগুড়া সদরশিবগঞ্জ উপজেলা, উত্তরে সোনাতলা উপজেলা এবং দক্ষিণে শাজাহানপুর উপজেলা

ইতিহাস[সম্পাদনা]

প্রশাসনিক এলাকা[সম্পাদনা]

গাবতলী উপজেলা পরিষদ গেট

এই উপজেলায় ১টি পৌরসভা (গাবতলী পৌরসভা), ১১টি ইউনিয়ন, ১০৪টি মৌজা ও ২১১টি গ্রাম, একটি পুলিশ থানা (গাবতলী মডেল থানা) ও একটি পুলিশ ফাঁড়ি (বাগবাড়ী) রয়েছে।[২] এটি বগুড়া-৭ সংসদীয় আসনের অধীন। গাবতলী উপজেলার ইউনিয়নসমুহ হলোঃ

জনসংখ্যার উপাত্ত[সম্পাদনা]

২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী উপজেলার মোট জনসংখ্যা ৩,১৯,৫৮৮জন। উপজেলার মোট জনসংখ্যার মধ্যে ১,৫৯,১৮৬জন পুরুষ এবং ১,৬০,৪০২ জন মহিলা। প্রতি বর্গ কিলোমিটার জনসংখ্যা ঘনত্ব ১৩৩৪ জন। শহরে বাসকারী লোকের সংখ্যা ২১,৪৫৫ জন এবং গ্রামে বাসকারী লোকের সংখ্যা ২,৯৮,১৩৩ জন।[৫] মোট জনসংখ্যার মধ্যে ২২৩৭০১ জন ভোটার রয়েছেন যার মধ্যে ১১১৩৩৮ জন পুরুষ এবং ১১২৩৬৩ জন মহিলা ভোটার।[৬]। জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার ১০.১৩%।

বাড়িঘর[সম্পাদনা]

উপজেলার মোট জনসংখ্যার ২.৩% মানুষ পাকা, ১৭.৫% মানুষ আধাপাকা, ৭৯.৮% মানুষ কাঁচা এবং ০.৪% মানুষ ঝুপরীতে বসবাস করে।

পানীয় জলের ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

উপজেলার মোট জনসংখ্যা মধ্যে পানীয় জলের জন্য ৯৮% লোক টিউবওয়েল ০.৩% লোক ট্যাপ এবং ১.৭% লোক অন্যান্য ব্যবস্থার উপর নির্ভর করে।

পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

উপজেলার ৬৫.১% মানুষ স্যানিটারী টয়লেট, ২৫% মানুষ নন স্যানেটারী টয়লেট এবং ৯.৯% মানুষের কোন স্যানিটেশন ব্যবস্থা নেই।

বিদ্যুৎ[সম্পাদনা]

উপজেলার ১১ টি ইউনিয়নেই বিদ্যুৎ সুবিধা বিদ্যামান। মোট জনসংখ্যার ৪৬.২% লোক বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আছে।

যোগাযোগ ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

গাবতলী সদর সংলগ্ন চকবোচাই গ্রামে রেল সড়ক

উপজেলার প্রধান যোগাযোগ এর মাধ্যম সড়ক পথ। গাবতলী উপজেলায় মোট ১৮৮ কিলোমিটার পাঁকা রাস্তা, ১১ কিলোমিটার ইটের রাস্তা এবং ৩১৫ কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা রয়েছে। এছাড়া উপজেলায় মোট ৫১১টি ব্রিজ ও কালভার্ট রয়েছে যার সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ৪৬৪৭ মিটার।[৭] এছাড়া উপজেলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ১০ কিলোমিটার মিটারগেজ লাইন রয়েছে। রয়েছে দুটি রেলওয়ে স্টেশন (গাবতলী ও সুখানপুকুর)।

শিক্ষা[সম্পাদনা]

২০১১ সালে চালানো জরিপ মতে উপজেলার মোট সাক্ষরতার হার ৪৬.৬% এর মধ্যে পুরুষ সাক্ষরতার হার ৪৮.৯% এবং মহিলা সাক্ষরতার হার ৪৪.৩%। উপজেলায় সবচেয়ে বেশি সাক্ষরতার হার পৌরসভার অন্তর্গত ২ নং ওয়ার্ডে ৭৭.২% এবং সর্বনিম্ন সাক্ষরতার হার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নে ৩৯.৪%।[৮]

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান[সম্পাদনা]

  • কলেজ

উপজেলায় মোট ১০ টি কলেজ রয়েছে। এর মধ্যে সরকারী কলেজ ১টি, বেসরকারী কলেজ (ডিগ্রি/অনার্স) ৪ টি, উচ্চমাধ্যমিক কলেজ ৩টি, স্কুল এন্ড কলেজ ১টি।[৯] উল্লেখযোগ্য কলেজ গুলো হলো ১. গাবতলী সরকারী কলেজ (উপজেলার একমাত্র সরকারি কলেজ)। ২. সুখানপুকুর সৈয়দ আহম্মেদ বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ

  • মাধ্যমিক বিদ্যালয়

উপজেলায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৪টি তার মধ্যে ১টি সরকারী এবং বেসরকারী ৩৩টি। উল্লেখযোগ্য বিদ্যালয় গুলো- ১. গাবতলী সরকারী বালিকা উচ্চবিদ্যালয় (উপজেলার একমাত্র সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়)। ২. গাবতলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। ৩. মড়িয়া আর এম পি উচ্চ বিদ্যালয়। ৪. কাগইল করুনাকান্ত উচ্চ বিদ্যালয়।

  • প্রাথমিক বিদ্যালয়

সরকারী ভাবে সকল বেসরকারী রেজিস্টার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারী করণের পর উপজেলায় মোট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১৬৪ টি[১০] এছাড়াও উপজেলায় আরো ৪টি কিন্ডার গার্টেন রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ১. মড়িয়া সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়। ২. গাবতলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ৩. নেপালতলী সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়।

  • ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

উপজেলায় মোট ৬২টি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে দাখিল মাদ্রাসা ২১ টি, আলীম মাদ্রাসা ৫ টি, ফাজিল মাদ্রাসা ২ টি এবং ৩৪ টি এবতেদায়ি, আলীয়া ও কওমী মাদ্রসা রয়েছে। [৯]

চিকিৎসা ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

গাবতলী উপজেলার হাসপাতাল

উপজেলার চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত মানের। উপজেলা সদরে একটি ৫০ শয্যা বিশিষ্ট সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় ১১ টি সাস্থ্যা ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া পশু পাখির চিকিৎসার জন্য রয়েছে একটি সরকারী প্রানী হাসপাতাল

উপজেলা সমাজ সেবা কার্যক্রম[সম্পাদনা]

উপজেলায় মোট ক্লাবের সংখ্যা ৭০ টি। যা মধ্যে ২৫ টি চলমান আছে। উপজেলা প্রসাশনের পক্ষ থেকে ১৩৪ জন প্রতিবন্ধীকে ঋণদান করা হয় যার মধ্যে ৮৬ জন পুরুষ এবং ৪৫ জন মহিলা রয়েছে। পল্লী সমাজ সেবা কার্যক্রমের আওতায় ২০৯৪ জনকে ঋনদান করা হয় যার মধ্যে ১০৩৪ জন পুরুষ এবং ১০৬০ জন মহিলা। অশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় রয়েছে ৫০ জন এর মধ্যে ৩১ জন পুরুষ ও ১৯ জন মহিলা। উপজেলা থেকে ভিভিন্ন ক্ষেত্রে ভাতা প্রদান করা হয় এর মধ্যে ৩৫৫ জনকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, ৬৫১ জনকে বয়স্ক ভাতা, ৩০৭২ জনকে বিধবা ভাতা, ৯৪৪ জনকে প্রতিবন্ধী ভাতা দেয়া হয়।[১১]

কৃষি[সম্পাদনা]

উপজেলায় মোট কৃষি জমির পরিমাণ ১৯৪২০ হেক্টর। ৭৬৮৮১ জন কৃষক কৃষি কাজের সাথে যুক্ত আছেন। এর মধ্যে ভুমিহীন কৃষক ১০৬৭৭ জন, ক্ষুদ্র কৃষক ৩০৬৬৯ জন, ৩৬১০ জন মাঝারি কৃষক, ১৫০ জন বড় কৃষক এবং ৩১৭৭৫ জন প্রান্তিক কৃষক রয়েছে।[১২]

রবি মৌসুম[সম্পাদনা]

রবি মৌসুমে ১৮১৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান, ১৫৫০ হেক্টর জমিতে আলু, ৮০০ হেক্টর জমিতে সরিষা, ১৩৮ হেক্টর জমিতে গম, ১৩ হেক্টর জমিতে ভূট্টা, ১২৩৩ হেক্টর জমিতে শাকসবজি, ১৬ হেক্টর জমিতে মিষ্টি আলু, ৩০০ হেক্টর জমিতে মরিচ, ১৮৪ হেক্টর জমিতে পেয়াজ এবং ৪৬ হেক্টর জমিতে রসুনের চাষ হয়।

খরিপ মৌসুম[সম্পাদনা]

খরিপ মৌসুমে ১২০০ হেক্টর জমিতে পাট, ৫০০ হেক্টর জমিতে আউশ বীজ তলা, ৫৬৬ হেক্টর জমিতে শাকসবজি, ১৫ হেক্টর জমিতে ভুট্টা, ৮০ হেক্টর জমিতে মরিচ, ৪০ হেক্টর জমিতে আদা, ৫০ হেক্টর জমিতে হলুদ, ৬০ হেক্টর জমিতে পেপে, ৬০ হেক্টর জমিতে কলা এবং ৬০ হেক্টর জমিতে বাঙ্গি চাষ হয়।

সেচ ব্যাবস্থা[সম্পাদনা]

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার তথ্য মতে কৃষি জমিতে সেচের জন্য উপজেলাতে মোট ৪০ টি বিদ্যুত চালিত গভীর নলকূপ, ১৩১৭ টি বিদ্যুত চালিত অগভীর নলকূপ এবং ৯৭২৬ টি ডিজেল চালিত অগভীর নলকূপ রয়েছে।

প্রাণী পালন[সম্পাদনা]

উপজেলায় মোঠ দুগ্ধ খামার ৩১১ টি যার মধ্যে ২৭৮ টি নিবন্ধিত ও ৩৩ টি অনিবন্ধিত। মহিষের ১৭ টি অনিবন্ধিত খামার রয়েছে। ছাগলের ২৩ টি খামারের মধ্যে ১০ টি নিবন্ধিত আর ১৩ টি অনিবন্ধিত। ভেড়া পালনের খামার সংখ্যা ১৫০ টি যার মধ্যে ১২৫ টির নিবন্ধন আছে ২৫ টি অনিবন্ধিত। লেয়ারের খামার আছে ১৯১ টি ১৬১টি নিবন্ধিত। এছাড়া ৮৯ টি ব্রয়লার এবং ২৯ টি হাঁস পালন খামার রয়েছে।

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

উপজেলার অর্থনীতি মূলত ব্যবসা নির্ভর।

হাট-বাজার

উপজেলায় মোট ২২টি হাট-বাজার রয়েছে।[১৩]

বাজার[সম্পাদনা]

উপজেলার মধ্যে গোলাবড়ী বাজার বেশ প্রসিদ্ধ। এছাড়াও বিভিন্ন জায়গায় বাজার বসে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো নেপালতলী বাজার, বাগবাড়ি, সুখান পুকুর, দাড়াইল বাজার, পাচ মাইল, কাগইল, রামেশ্বরপুর, দূগর্গাহাটা, দাড়াইল, নেপালতলী, কদমতলী ও বাইগুনিতে বাজার বসে।

হাট[সম্পাদনা]

উপজেলায় মোট ৫টি বড় আকারের হাট বসে। এসব হাটে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর সাথে সাথে গরু ছাগল পাওয়া যায়। হাটগুলো হলো-

  1. ডাকুমারা হাট(উপজেলার সবচেয়ে বড় হাট, হাট বার রবিবার ও বৃহস্পতিবার)
  2. পেরীর হাট (হাট বার রবিবার ও বুধবার)
  3. নারুয়ামালা হাট (হাটবার শুক্র ও সোমবার)
  4. তরণী হাট(হাটবার শুক্রবার ও মঙ্গলবার)
  5. মহিষাবান হাট(হাটবার শনিবার)
  6. বুরুজ হাট[১৪]

নদী ও জলাধার[সম্পাদনা]

গাবতলী উপজেলায় মোট ৪ টি নদী আছে। এগুলো হলো-

  1. বাঙালি নদী(উপজেলার পূর্বদিকে প্রবাহিত)
  2. মরা বাঙালি(বাঙালি নদীর শাখা যা উপজেলার পূর্ব হতে পশ্চিমে প্রবাহিত)
  3. ইছামতী(উপজেলার উত্তর দিকে হয়ে দক্ষিণে প্রবাহিত)
  4. গজারিয়া নদী।

নদী গুলোর সম্মিলিত দৈর্ঘ্য ২৯ কিলোমিটার। এছাড়া উপজেলায় মোট ২৭ টি সরকারী পুকুর(আয়তন ৪৩.০১ একর), প্লাবন ভূমি(আয়তন ৬৫৬৪ হেক্টর), ২০ টি বিল(আয়তন ২২৭.৯৯ একর, কাৎলাহারের বিল ও উনচুরকির বিল উল্লেখযোগ্য), ৪২৮৮টি ব্যক্তিগত পুকুর(আয়তন ১৫১৮.১৪ একর), ১৫টি আদর্শ গ্রাম/আবাসন পুকুর(আয়তন ৬৩৯০ একর) ও ২টি মৎস অভয়াস্রম(আয়তন ১.৮২ একর) রয়েছে।[১৫]

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস[সম্পাদনা]

গাবতলী উপজেলা শহীদ মিনার

বাংলাদেশের গৌরব ময় মুক্তিযুদ্ধে সারা দেশের মানুষের পাশাপাশি গাবতলী উপজেলার মানুষ অনন্যা ভুমিকা পালন করেছে। গাবতলী উপজেলা ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয়। উপজেলা সদরের অতি সন্নিকটে রেল স্টেশন এবং গাবতলী উপজেলা পার্শবর্তী সারিয়াকান্দি উপজেলায় যাবার একমাত্র মাধ্যম হওয়ায় হানাদার বাহিনীর কাছে এই উপজেলার ভৌগোলিক গুরত্ব ছিল অপরিসীম। এর জন্য উপজেলায় হানাদর বাহিনীর আনাগোনা ছিল সবচেয়ে বেশি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ভাষনের পর থেকেই গাবতলীতে স্বাধীনতার প্রস্তুতি শুরু হয়। উপজেলার মুক্তিকামী মানুষজন ধীরে ধীরে সংগঠিত হতে থাকে। ২৫ মার্চ কালো রাত্রিতে পাকহানাদার বাহিনী দেশের নিরস্ত মানুষের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। ঐদিনই পাক হানাদার বাহিনী রংপুর থেকে বগুড়া শহরে প্রবেশ করে এবং আক্রমণ চালায়। সারা বগুড়া জেলার মানুষ যখন আতঙ্কিত, দ্বিধাগ্রস্থ তখন বগুড়া জেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আমিনুল ইসলাম পিন্টু সরকারের নেতৃত্বে মু্ক্তিযোদ্ধারা বন্দুক সংগ্রহ করে পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাতে থাকে। এ যুদ্ধে বগুড়া ২ নং রেলগেটে টিটু নামে এক মুক্তিযোদ্ধ শহীদ হন। পরবর্তীতে গাবতলীতে মুক্তিযোদ্ধাকালীন গ্রুপ কমান্ডার হুমায়ন আলম চান্দুর নেতৃত্বে মরহুম মোর্তেজা আলী মজনু, মোজাহার আলী, খলিলুর রহমান, মনজুর মোর্শেদ সাজু, অানোয়ারুল ইসলাম রন্টু, ইব্রাহীম আলী, মতিউর রহমান, সেকেন্দার আলী, মরহুম সাবেদ আলী সহ আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা ভারতের দার্জিলিং এর মূর্তি ক্যাম্পে(মুজিব ক্যাম্প) ২৮ দিনের অস্ত্র প্রশিক্ষন গ্রহণ করেন এবং রংপুরের বুড়িমারী ৬ নং সেক্টরে যোগদান করেন। এর কিছুদিন পর তারা গেরিলা যুদ্ধ করার জন্য গাবতলীতে চলে আসেন। শুরু হয় গাবতলীতে রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের ইতিহাস। মুক্তিযোদ্ধারা গাবতলী নাড়ুয়ামালা রেলব্রিজের কাছে পাহাড়ারত হানাদার ও রাজাকারদের উপর গভীর রাতে হামলা চালান এবং তাদের সেখান থেকে পিছু হটতে বাধ্য করেন। মুক্তিযোদ্ধারা উপজেলার সাধারণ মানুষের সহযোগিতায় গাবতলী ও সুখানপুকুর রেলস্টেশনের মাঝামাঝি ডওর এলাকায় রেললাইন উপরে ফেলে রংপুরের সাথে বগুড়ার রেল যোগাযোগ বিছিন্ন করে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধারা রেল পথের বিভিন্ন জায়গায় ও রেল ব্রীজে প্রহরারত রাজাকারদের ধরে নিয়ে আসে। সুখানপুকুর রেলস্টেশনে অবস্থান নেওয়া রাজাকারদের উপর হুমায়ল আলম চান্দু, মিজানুর রহমান বাদশা, আলমগীর রহমান, রবিউল করিম, মোস্তাফিজার রহমান পটল, আনোয়ারুল ইসলাম, মোসলেম উদ্দিন, অনসার আলী সহ নাম না জানা আরো কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা আক্রমণ করে বসেন। ঐ যুদ্ধের সময় উপজেলার বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম গুলিবিদ্ধ হন। তার দুটি আঙ্গুল শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের তুমুল আক্রমণের মুখে হানাদার বাহিনী গাবতলী থানার দিকে পালিয়ে যায়। তারপর মুক্তিযোদ্ধারা গাবতলী থানা, সিও অফিস ও রেল স্টেশনে স্থাপিত পাক বাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণের জন্য অগ্রসর হলে পাকবাহিনী মর্টার শেল নিক্ষেপ শুরু করে। তখন মুক্তিযোদ্ধারা আত্বরক্ষার্থে পিছু হটে আসে। ৪ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে এগিয়ে আসে। ভারতীয় বিমান বাহিনী গাবতলী রেলস্টেশনে স্থাপিত মর্টারের উপর বোমা নিক্ষেপ শুরু করলে মুক্তিযোদ্ধারা স্থল পথে যুদ্ধ করতে করতে থানার দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১৪ ডিসেম্বর গাবতলী থানা ও সিও অফিস এলাকায় পাক বাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে প্রচন্ড গোলাগুলি শুরু হয়। আক্রমণে পাক সেনারা থানা এলাকা ছেড়ে দক্ষিণ দিকে পালিয়ে যেতে থাকে। মুক্তিযোদ্ধারাও হাল না ছেড়ে তাদের পিছু ধাওয়া করতে থাকে। এক পর্যায়ে পাক সেনারা ক্ষিদ্রপেরী নামক গ্রামের এক জঙ্গলে আত্বগোপন করে। মুক্তিযোদ্ধারা খবর পেয়ে তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং প্রচন্ড গুলি বর্ষন করে। গাবতলী থানা থেকে পালিয়ে আসা সাতজন পাক সেনা সেখানে নিহত হয় বাকিরা পালিয়ে যায়। ঐ দিনই গাবতলী উপজেলা মুক্তাঞ্চল ঘোষণা করা হয়। চারিদিকে আনন্দের বাতাস বইতে থাকে। আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই সেদিন রাস্তায় নেমে বিজয় উল্লাস করতে থাকে।[১৬]

যারা চিরস্মরনীয়[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালে গাবতলী উপজেলার ১০ জন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। ৩ জন মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। আর এ পর্যন্ত ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে মারা যান[১৭]। শহীদ মুক্তিযোদ্ধারা হলেন-

  1. শহীদ হাবিলদার মো: কামরুজ্জামান খলিফা (বীর বিক্রম)
  2. শহীদ ওসমান গনি
  3. শহীদ কাজী আবদুল মান্নান
  4. শহীদ টিটু
  5. শহীদ জাহেদুর রহমান বাদল
  6. শহীদ আবদুস সাত্তার
  7. শহীদ আবদুল হামীদ
  8. শহীদ কমর উদ্দিন
  9. শহীদ মাসুদ রহমান
  10. শহীদ আব্দুল মান্নান

ঐতিহ্যবাহী উৎসব[সম্পাদনা]

উপজেলার সবচেয়ে বড় উৎসব পোড়াদহ মেলা। উপজেলা সদর হতে ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে গোলাবাড়ি বাজারের কাছাকাছি পোড়াদহ নামক স্থানে ইছামতি নামক নদীর তীরে প্রতিবছর এই মেলা হয়ে আসছে। মেলা হয় প্রতিবছর বাংলা মাঘ মাসের শেষ দিনের কাছের বুধবার(পরের অথবা আগের)। কথিত আছে প্রায় চারশত বছর আগে পোড়াদহ নামক স্থানে বটবৃক্ষের নিচে কিছু সংখ্যাক সন্ন্যাসী আশ্রম তৈরি করে। তখন থেকে শুরু হয় সন্ন্যাসী পুজা। মুলত এটি হিন্দু ধর্মালম্বীদের উৎসব হলেও কালের বিবর্তনে উৎসবটি ধর্মের গন্ডি পেরিয়ে পরিনত হয়েছে সকল ধর্মের মানুষের মিলন মেলায় এবং উপজেলার সবচেয়ে বড় উৎসবে। মেলা মূলত একদিনের হলেও সপ্তাহ ব্যাপী উৎসব চলতে থাকে। মেলা উপলক্ষে দুরদুরান্তের আত্বীয় স্বজন এসে প্রতিটি বাড়ি ভরে যায়। যেসব মেয়েদের বিয়ে হয়েছে তারা জামাই, ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাপের বাড়ি বেড়াতে আসে। তাই অনেকের কাছে এই মেলা জামাই মেলা নামেও পরিচিত। মূল মেলা হয় বুধবার। মেলার প্রধান আকর্ষন বড় বড় মাছ। শুধু মাছ কেনার জন্য হলেও দুর দুরান্তের জেলার মানুষ সেদিন মেলায় আসে। মাছের পাশাপাশি থাকে বড় বড় মিষ্টি। এছাড়া থাকে গৃহস্থালির দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্য। পাওয়া যায় কাঠের এবং স্টিলের আসবাবপত্র। আছে ছোট এবং বড়দের বিনোদনের হরেক রকম ব্যাবস্থা। আছে ছোটদের খেলনা বড়দের কসমেটিক সামগ্রী। বিনোদনের ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে মটরসাইকেল খেলা, নাগড় দোলা এবং যাত্রা পালা। মূল মেলার পরদিন বৃহস্পতিবার একই স্থানে এবং আশেপাশের গ্রামে গ্রামে চলে বউ মেলা। বাড়ির যেসব মেয়েরা কাজের চাপে আগেরদিন মেলায় যেতে পারেনা তাদের জন্যই এই বিশেষ ব্যবস্থা। এই মেলায় শুধু মেয়েরাই যেতে পারে।[১৮]

কৃতী ব্যক্তিত্ব[সম্পাদনা]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "এক নজরে গাবতলী উপজেলা"বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। জুন ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ ৭ মে ২০১৫ 
  2. উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসারের কার্যালয়, তারিখ: ১২.০৫.২০১৫
  3. বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন (জুন ২০১৪)। "ইউনিয়ন পরিষদ সমূহ"। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার। সংগ্রহের তারিখ ৫ জুলাই ২০১৪ 
  4. "উপজেলার পটভূমি"bogra.gov.bd 
  5. উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসারের কার্যালয়। তারিখ: ১২.০৫.২০১৫
  6. বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, গাবতলী উপজেলা সার্ভার স্টেশন। তারিখ: ১২.০৫.২০১৫
  7. উপজেলা নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালায়। তারিখ: ১৩.০৫২০১৫
  8. উপজেলা পরিসংখ্যান অফিসারের কার্যালয়। তারিখ: ১২.০৫.২০১৫।
  9. "এক নজরে গাবতলী উপজেলা"bogra.gov.bd 
  10. উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কার্যালয়। তারিখ: ১৩.০৫.১৫
  11. উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার কার্যালয়। সংগ্রহের তারিখ: ১৩.০৫.১৫
  12. উপজেলা কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তার কার্যালয়। ১৪.০৫.২০১৫
  13. উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়। তারিখ: ১৩.০৫.২০১৫
  14. "ব্যবসা-বাণিজ্য"bogra.gov.bd 
  15. উপজেলা মৎস কর্মকর্তার কার্যালয়। তারিখ: ১৩.০৫.২০১৫।
  16. বীর মুক্তিযোদ্ধা হাুমায়ন আলম চান্দু, কমান্ডার, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ গাবতলী উপজেলা কমান্ড।
  17. বীর মুক্তিযোদ্ধা হুমায়ুন আলম চান্দু, কমান্ডার বাংলাদেম মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, গাবতলী উপজেলা কমান্ড।
  18. "পোড়াদহ মেলা"karatoa.com.bd 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]