পোড়াদহ মেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
পোড়াদহ মেলা
পোড়াদহ মেলা১.JPG
পোড়াদহ মেলা
অবস্থা প্রতিবছর একবার বসে
অবস্থান (সমূহ) পোড়াদহ, গাবতলী উপজেলা, বগুড়া জেলা
দেশ বাংলাদেশ
প্রবর্তিত ১৬শ শতাব্দীতে

পোড়াদহ মেলা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি প্রাচীন লোকজ মেলা। বগুড়া জেলা শহর হতে ১১ কিলোমিটার পূর্বদিকে ইছামতি নদীর তীরে পোড়াদহ নামক স্থানে প্রতি বছর যে মেলা বসে তাই “পোড়াদহ মেলা” নামে পরিচিত।[১] বাংলাদেশে যে কয়টি গ্রাম্য মেলা পুরাতন জৌলুষ নিয়ে সগর্বে টিকে আছে তার মধ্যে বগুড়ার 'পোড়াদহ মেলা' অন্যতম। প্রায় চার শত বছর পূর্বে শুরু হওয়া মেলাটি আজও তার পুরাতন ঐতিহ্য ধরে রেখেছে।

পটভূমি[সম্পাদনা]

পোড়াদহ মেলা, যাকে বলা হয় ঐতিহাসিক পোড়াদহ মেলা শুরুর সঠিক সাল জানা যায় না। তবে বলা হয় বর্তমান সময় থেকে প্রায় চারশত[১][২] বছর পূর্বে কোন এক সময়ে মেলা সংগঠনের স্থানে একটি বিশাল বটবৃক্ষ ছিল। একদিন হঠাৎ করে সেখানে এক সন্ন্যাসীর আবির্ভাব হয়। তারপর সেখানে দলে দলে সন্ন্যাসীরা এসে একটি আশ্রম তৈরি করে। এলাকার হিন্দু সম্প্রদায়েরর কাছে সেটি একটি পূণ্য স্থানে পরিনত হয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন সেখানে প্রতিবছর মাঘ মাসের শেষ দিনের কাছের (শেষ দিনের পূর্বের অথবা শেষ দিনের পরের বুধবার) সন্ন্যাসী পূজার আয়োজন করে। দুরদুরান্ত থেকে ভক্তরা প্রতি বছর সেই দিনটিতে এসে সমাগত হতে থাকে। দিন গড়ানোর সাথে সাথে প্রতিবছর লোকসমাগম বাড়তে থাকে। আস্তে আস্তে পূজার দিনটিতে একটি গ্রাম্য মেলার গোড়াপত্তন হয়। এক সময় সন্ন্যাসীরা স্থানটি ত্যাগ করে চলে গেলেও হিন্দু সম্প্রদায় সন্ন্যাসী পুজাটি বন্ধ করে দেয়নি। ধীরে ধীরে মেলাটির পরিচিতি বাড়তে থাকে। দুর দুরান্তথেকে মেলা দেখতে লোকজন আসে। পুজা পার্বণ মুলত হিন্দু সম্প্রদায়ের উৎসব হলেও এই মেলা ধর্মের গন্ডি পেরিয়ে সব ধর্মের মানুষকে উৎসবে একত্র করে। এখন সন্ন্যাসী পুজাটি চালু থাকলেও সকল ধর্মের হাজার হাজার মানুষ মেলাতে এসে উপস্থিত হয়।[৩]

নামকরণের ইতিহাস[সম্পাদনা]

সন্ন্যাসী পুজা উপলক্ষে মেলাটি শুরু হয়েছিল তাই এর নাম প্রথম অবস্থায় ছিল সন্ন্যাসী মেলা। মেলাটি পোড়াদহ নামক স্থানে সংগঠিত হয়। লোক মুখে স্থানের নাম অনুসারে পোড়াদহর মেলা হিসাবে চলতে চলতে একসময় এর নাম পোড়াদহ মেলা হিসাবে প্রচলিত হয়ে যায়। মেলা উপলক্ষে আশেপাশের গ্রামের যেসব মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে তারা জামাই নিয়ে বাপের বাড়িতে হাজির হয় বলে অনেকে একে 'জামাই মেলা'[৪] হিসাবে সম্মোধন করেন। আবার মেলায় বড় বড় হরেক প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় বলে কিছু লোক একে 'মাছের মেলা' বলে ডেকে থাকেন। বিভিন্ন জন বিভিন্ন নামে সম্মোধন করলেও এটি মূলত 'পোড়াদহ মেলা' নামেই সবার কাছে পরিচিত।

যাতায়াত ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

মেলায় যাবার জন্য বগুড়া জেলা সদরের চেলোপাড়ায় গোলাবাড়ি সি এন জি স্ট্যান্ডে সি এন জি অথবা অটোতে উঠলেই যাত্রিদের মেলায় পৌছে দেয়।[৫]

মেলার সময়কাল[সম্পাদনা]

মেলা মূলত একদিন বুধবার।[৬] সেদিন দুর দুরান্তের মানুষ মেলায় আসে। তবে একদিনের মেলা হলেও স্থানীয়ভাবে সপ্তাহব্যাপী উৎসব লেগে থাকে। মেলা উপলক্ষে প্রতিটি বাড়িতে আত্বীয় স্বজনরা এসে জড়ো হয়। চারিদিকে উৎসব মুখোর অবস্থা বিরাজ করে। মূলমেলার পরদিন বৃহস্পতিবার একই স্থানে এবং আশেপাশের গ্রামে গ্রামে চলে ছোট আকারের বউ মেলা। মূল মেলাটি সরকারী তত্বাবধানে আয়োজন করা হলেও বউ মেলা স্থানীয় গ্রামবাসীর উদ্দোগে আয়োজন করা হয়। গ্রামের যেসব মহিলা কাজের চাপে অথবা রক্ষনশীল মনমানসিকতার কারনে মূল মেলায় যেতে পারেনা তাদের জন্যই বিশেষ করে এই আয়োজন করা হয়। বউ মেলার একটি বিশেষত্ব হলো এখানে শুধুমাত্র মেয়েরা প্রবেশ করতে এবং কেনাকাটা করতে পারে।[৬]

কেনাকাটা[সম্পাদনা]

মাছ[সম্পাদনা]

পোড়াদহ মেলার প্রধান আকর্ষন মাছ। মেলায় পাওয়া যায় বিভিন্ন প্রজাতির হরেক রকমের বড় বড় মাছ। বড় বড় মাছ গুলো প্রথমে ভোর বেলায় মেলায় স্থাপিত অস্থায়ী আড়ৎগুলোতে এসে জমা হয়। সেখান থেকে খুচরা ব্যবসায়ীরা মাছগুলো কিনে মেলার নিজ নিজ দোকানে নিয়ে যায়। দোকানগুলোতে দিনভর কেনাকাটা চলতে থাকে। মেলায় আসা বিভিন্ন প্রজাতির মাছের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো রুই, কাতলা, মৃগেল, বোয়াল, সিলভার কার্প, কালবাউস, পাঙ্গাস মাছ ইত্যাদি। মেলায় সবচেয়ে বেশি বিক্রয় হয় 'বাঘা আইড়'[৭] মাছ স্থানীয় ভাবে যাকে 'বাগাড়' মাছ বলা হয়। মেলায় দুই মন থেকে আড়াই মণ ওজনের বাঘা আইড় পাওয়া যায়। এছাড়া পনের থেকে বিশ কেজি ওজনের রুই কাৎলা পাঙ্গাস মাছ পাওয়া যায়।

আসবাবপত্র[সম্পাদনা]

মেলায় কাঠের, স্টিল ও লোহার বিভিন্ন ডিজাইনের আসববাপত্র[৮] যেগুলো অনেক সূলভ মূল্যে পাওয়া যায়।

কসমেটিক ও গিফট সামগ্রী[সম্পাদনা]

মেলায় বিভন্ন জেলা হতে লোকজন উন্নতমানের কসমেটিক, খেলনা, গিফট সামগ্রী এর দোকান দেয়। সাধারণত শিশু এবং মহিলাদের ভিড় লেগে থাকে। আছে চুড়ি, কানের দুল, মালা, কাজল, মেকাপ বক্স সহ সকল সাজার জিনিস। খেলনার মধ্যে থাকে ব্যাট, বল ভিডিও গেমস ইত্যাদি।

মিষ্টি[সম্পাদনা]

পোড়াদহ মেলার অন্যতম আকর্ষন মিষ্টি। রসগোল্লা, সন্দেশ, জিলাপী, নিমকি, তিলের নাড়ু, খই, শুকনা মিষ্টি। আরও আকর্ষনীয় হলো বড় বড় আকারের মিষ্টি। একেকটি মিষ্টি দেড় থেকে দুই কেজি ওজনের হয়ে থাকে।

খাবারের দোকান[সম্পাদনা]

মেলায় লোকজনের খাওয়া দাওয়ার জন্য বসানো হয় অস্থায়ী হোটেল, আছে ফুচকা চটপটি, ভাজাপোড়া ও আইসক্রীমের দোকান।

বিবিধ[সম্পাদনা]

মেলা উপলক্ষে দৈনন্দিন জিনিসের বাজার বসে। মাংস, কাঁচাবাজার, মসলা, গৃহস্থালীর দৈনন্দিন জিনিস পত্র যেমন ছুরি, দা, বটি এগুলোও পাওয়া যায়।

বিনোদন[সম্পাদনা]

মেলায় কেনাকাটার পাশাপাশি রয়েছে বিনোদনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। ছোট থেকে বড় সকলের জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত বিনোদনের ব্যবস্থা। ছোটদের জন্য আছে নাগড়দোলা, মিনি ট্রেন, ঘোড়ার গাড়ি, সার্কাস। বড়দের জন্য রয়েছে মটর সাইকেল খেলা, যাত্রাপালা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

মেলার নিরাপত্তা ব্যবস্থা[সম্পাদনা]

মেলায় জেলাউপজেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রসাশনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।[৯] তিনদিন ধরে পুলিশ প্রশাসনের লোকজন মেলা প্রাঙ্গনে দায়িত্ব পালন করে।

মেলার ছবি[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "বগুড়ায় ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা"প্রিমিয়ার নিউজ সিন্ডিকেট লিমিটেড। সংগৃহীত ১৮ মে ২০১৫ 
  2. "বগুড়ার গাবতলীতে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা আজ"amardeshonline.com। সংগৃহীত ১৮ মে ২০১৫ 
  3. "দৈনিক ইনকিলাব - অনলাইন সংস্করণ"dailyinqilab.com। সংগৃহীত ১৮ মে ২০১৫ 
  4. মোস্তফা কামাল স্বপন, লিডার ট্রেনার বাংলাদেশ স্কাউট, জেলা কাব লিডার বগুড়া জেলা।
  5. "উপজেলার দর্শনীয় স্থান"bogra.gov.bd। সংগৃহীত ১৮ মে ২০১৫ 
  6. "ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা কাল॥ বউ মেলা বৃহস্পতিবার - daily nayadiganta"The Daily Nayadiganta। সংগৃহীত ১৮ মে ২০১৫ 
  7. "বগুড়ায় পোড়াদহ মেলায় ৯০ কেজির বাগাড়!"প্রথম আলো। ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৫। সংগৃহীত ১৮ মে ২০১৫ 
  8. "মাছের মেলা: বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী উৎসব"BdFISH Bangla। সংগৃহীত ১৮ মে ২০১৫ 
  9. "বগুড়ার চলছে ঐতিহ্যবাহী পোড়াদহ মেলা"cnanews24.com। সংগৃহীত ১৮ মে ২০১৫ 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]