হিমাচল প্রদেশ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
হিমাচল প্রদেশ
Himachal Pradesh
হিমাচল প্রদেশ
স্থানাঙ্ক: ৩১°৬′১২″ উত্তর ৭৭°১০′২০″ পূর্ব / ৩১.১০৩৩৩° উত্তর ৭৭.১৭২২২° পূর্ব / 31.10333; 77.17222
প্রতিষ্ঠা ২৫ জানুয়ারি, ১৯৭১
এলাকার ক্রম 17th
জনসংখ্যা (2011)
 • মোট ৬৮,৫৬,৫০৯
 • ক্রম 17th
ওয়েবসাইট www.himachal.nic.in/welcome.asp
সারহান প্রাসাদ হিমাচল প্রদেশ
ভীমাকালী মন্দির,সারাহান

হিমাচল প্রদেশ (হিন্দি: हिमाचल प्रदेश, পাঞ্জাবি: ਹਿਮਾਚਲ ਪ੍ਰਦੇਸ਼) উত্তর ভারতের একটি ক্ষুদ্রকায় রাজ্য। এই রাজ্যের আয়তন ২১,৪৯৫ বর্গমাইল (৫৫,৬৭২ বর্গকিলোমিটার)।[১] হিমাচল প্রদেশের উত্তর সীমায় জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্য; পশ্চিম ও দক্ষিণ পশ্চিমে পাঞ্জাব রাজ্য; দক্ষিণে হরিয়ানাউত্তরপ্রদেশ রাজ্য; দক্ষিণ-পূর্বে উত্তরাখণ্ড রাজ্য ও পূর্বে তিব্বত অবস্থিত। হিমাচল প্রদেশ শব্দটির আক্ষরিক অর্থ তুষারাবৃত পর্বতসংকুল অঞ্চল[২]

হিমাচল প্রদেশের অপর নাম দেবভূমি (দেবতাদের দেশ)। ঋগ্বৈদিক যুগের পূর্ব থেকেই এই অঞ্চলে ইন্দো-আর্য প্রভাব লক্ষিত হয়। অ্যাংলো-গোর্খা যুদ্ধের পর এই অঞ্চল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সরকারের অধীনস্থ হয়। পার্বত্য পাঞ্জাবের সিবা রাজ্য (Siba State of Punjab Hills) ব্যতীত এই অঞ্চলের অপরাপর অংশ প্রথম দিকে পাঞ্জাবের অন্তর্গত হয়। উল্লেখ্য সিবা রাজ্য ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত মহারাজা রঞ্জিত সিংহের শাসনাধীন ছিল।[৩] ১৯৫০ সালে হিমাচল একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল ঘোষিত হয়। এরপর ১৯৭১ সালের হিমাচল প্রদেশ রাজ্য আইন অনুযায়ী ভারতীয় প্রজাতন্ত্রের অষ্টাদশ রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে হিমাচল প্রদেশ। এ রাজ্যে বহু স্বনামধন্য বোর্ডিং স্কুল অবস্থিত।

মাথাপিছু আয়ের হিসেব অনুযায়ী হিমাচল প্রদেশ ভারতের একটি প্রথম সারির রাজ্য। বরফগলা জলে পুষ্ট নদীর প্রাচুর্যের কারণে এই রাজ্য দিল্লি, পাঞ্জাবরাজস্থান রাজ্যকে প্রচুর পরিমাণে জলবিদ্যুৎ বিক্রয় করে থাকে।[৪] হিমাচল প্রদেশের অর্থনীতি জলবিদ্যুৎ, পর্যটন ও কৃষির উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল।[৫]

হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা হিমাচল প্রদেশের জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশ। অনুপাতের হিসেবে ভারতের এই রাজ্যেই হিন্দুদের সংখ্যা সর্বাধিক। ২০০৫ সালের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশানাল সমীক্ষা অনুসারে, কেরলের পর হিমাচল প্রদেশ ভারতের দ্বিতীয় সর্বাধিক দুর্নীতিমুক্ত রাজ্য।[৬]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

বর্তমানে হিমাচল প্রদেশ নামে পরিচিত ভূখণ্ডের প্রাচীন ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব ২২৫০-১৭৫০ অব্দের মধ্যবর্তী সময়ে বিকশিত হয়ে ওঠা সিন্ধু সভ্যতার সমসাময়িক।[৭] কৈলি, হালি, দাগি, ধৌগ্রি, দাসা, খাসা, কিন্নর ও কিরাত প্রভৃতি উপজাতিবর্গ প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে এই অঞ্চলে বসবাস করছে। বৈদিক যুগে এই অঞ্চলে "জনপদ" নামে অভিহিত একাধিক ক্ষুদ্রকায় গণরাষ্ট্র অবস্থিত ছিল। পরবর্তীকালে এই রাষ্ট্রগুলি গুপ্ত সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়।[৮] এরপর কিছুকাল হর্ষবর্ধনের শাসনাধীনে একত্রিত থাকার পর আবার এই অঞ্চল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যায়। এই সব রাজ্যের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন স্থানীয় ভূস্বামীরা। এই সকল ভূস্বামীদের অনেকেই ছিলেন রাজপুত রাজকুমার। এই রাজ্যগুলি ছিল স্বাধীন রাজ্য। পরে বিভিন্ন সময়ে মুসলমান আক্রমণকারীদের হাতে এই রাজ্যগুলি তাদের স্বাধীনতা হারায়।[৭] দশম শতাব্দীর প্রথম ভাগে মামুদ গজনভি কাংড়া জয় করেন। তৈমুরসিকন্দর লোদি রাজ্যের নিম্ন পার্বত্য অঞ্চলে সেনা অভিযান চালিয়েছিলেন। তাঁরা এই অঞ্চলে একাধিক যুদ্ধে লিপ্ত হন ও বহু দুর্গ দখল করেন।[৭] মুঘল আমলে এই অঞ্চলের অনেক পার্বত্য রাজ্যই মুঘল সার্বভৌমত্ব স্বীকার করে নিয়ে সম্রাটকে কর দানে সম্মত হয়েছিলেন।[৯]

সংসার চন্দ (১৭৬৫ -১৮২৩ খ্রিষ্টাব্দ)

১৭৬৮ সালে যোদ্ধা উপজাতি গোর্খারা নেপালে ক্ষমতায় আসে।[৭] তাঁরা তাঁদের সামরিক বাহিনীকে একত্রিত করে রাজ্যসীমা বৃদ্ধিতে মনোনিবেশ করেন।[৭] ধীরে ধীরে গোর্খারা সিরমৌরশিমলা দখল করে নেয়। অমর সিংহ থাপার নেতৃত্বে গোর্খারা কাংড়া আক্রমণ করে। ১৮০৬ সালে একাধিক স্থানীয় শাসকের সহায়তায় তারা কাংড়ার শাসক সংসার চন্দকে পরাজিত করতে সক্ষম হন। যদিও গোর্খারা কাংড়া দুর্গ দখল করতে পারেনি। এই দুর্গটি ১৮০৯ সালে মহারাজা রঞ্জিত সিংহের অধিকারে আসে। পরাজিত হয়ে গোর্খারা দক্ষিণে রাজ্যবিস্তারে মনযোগ দেয়। পরে রাজা রাম সিংহ রঞ্জিত সিংহকে পরাস্ত করে সিবা দুর্গ জয় করেছিলেন।[৭]

এর ফলে অ্যাংলো শিখ যুদ্ধের সূচনা হয়। তরাই অঞ্চলে ব্রিটিশদের সঙ্গে তাঁদের প্রত্যক্ষ সংগ্রাম শুরু হয়। এর পরে ব্রিটিশরা তাদের শতদ্রু-তীরবর্তী অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করে।[৭] এরপর ব্রিটিশরাই ধীরে ধীরে এই অঞ্চলের শাসনকর্তৃত্ব দখল করে নেয়।[৭] ব্রিটিশ সরকারের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ধর্মীয় ও সামরিক নীতির প্রতিক্রিয়ায় ১৮৫৭ সালে মহাবিদ্রোহ সংঘটিত হলেও হিমাচল অঞ্চলের অধিবাসীরা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠেনি।[৭] বরং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাঁরা ব্রিটিশদের সঙ্গে সহযোগিতাই করেছিল।[৭] কেউ কেউ আবার মহাবিদ্রোহ দমনে ব্রিটিশদের সাহায্যও করেন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন চাম্বা, বিলাসপুর, ভাগল ও ধামীর শাসকেরা। বুশারের শাসকেরা অবশ্য ব্রিটিশ স্বার্থবিরোধী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।[৭]

১৮৫৮ সালে রানি ভিক্টোরিয়ার ঘোষণাপত্র জারির পর পার্বত্য অঞ্চলের ব্রিটিশ শাসনক্ষেত্রগুলি ব্রিটিশ রাজশক্তির প্রত্যক্ষ শাসনাধীনে আসে। চাম্বা, মান্ডি, বিলাসপুর প্রভৃতি রাজ্য ব্রিটিশ শাসনে বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশেষ উন্নতিলাভ করে।[৭] প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় পার্বত্য রাজ্যগুলি ব্রিটিশ সরকারের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে সেনা ও রসদ উভয়ই সরবরাহ করে যুদ্ধের ব্রিটিশদের সাহায্য করে। এই রাজ্যগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য কাংড়া, জসওয়ান, দাতারপুর, গুলের, নুরপুর, চাম্বা, সুকেত, মান্ডি, ও বিলাসপুর[৭]

স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালের ১৫ এপ্রিল হিমাচল প্রদেশ চিফ কমিশনার শাসিত প্রদেশের মর্যাদা পায়। এই প্রদেশটি শিমলার পার্শ্ববর্তী পার্বত্য জেলাসমূহ এবং পূর্বতন পাঞ্জাব অঞ্চলের দক্ষিণের পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে গঠিত ছিল। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের সংবিধান প্রবর্তিত হলে হিমাচল গ-শ্রেণির রাজ্যের মর্যাদা পায়। ১৯৫৬ সালের ১ নভেম্বর হিমাচল প্রদেশ একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে পরিণত হয়।[৭] ১৯৭০ সালের ১৮ ডিসেম্বর সংসদে হিমাচল প্রদেশ রাজ্য আইন পাস হয়। এর পর ১৯৭১ সালের ২৫ জানুয়ারি হিমাচল প্রদেশ ভারতের অষ্টাদশ পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।[৭]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. "Statistical Facts about India"। www.indianmirror.com। সংগৃহীত ২০০৬-১০-২৬ 
  2. "Literal meaning of Himachal Pradesh"। www.himachalpradesh.us। সংগৃহীত ২০০৭-০৫-২০ 
  3. "History section"। Suni system (P)। সংগৃহীত ২০০৭-০৪-২৮ 
  4. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; eco1 নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  5. NEW ERA OF ECONOMIC DEVELOPMENT IN HIMACHAL PRADESH OPPORTUNITIES AND CHALLENGES EXECUTIVE SUMMARY yesbank.in Retrieved on- April 2008
  6. "India Corruption Study - 2005"Transparency International। সংগৃহীত ২০০৭-০৫-২৯ 
  7. ৭.০০ ৭.০১ ৭.০২ ৭.০৩ ৭.০৪ ৭.০৫ ৭.০৬ ৭.০৭ ৭.০৮ ৭.০৯ ৭.১০ ৭.১১ ৭.১২ ৭.১৩ ৭.১৪ "History of Himachal Pradesh"। National informatics center, Himachal Pradesh। সংগৃহীত ২০০৮-০৩-৩১ 
  8. "History of Himachal Pradesh"। HimachalPradeshIndia.com। সংগৃহীত ২০০৮-০৩-৩১ 
  9. Verma, V। "Historical Perspective"The Emergence of Himachal Pradesh: A Survey of Constitutional Developments। Himachal Pradesh (India): Indus Publishing। পৃ: 28–35। আইএসবিএন 8173870357। সংগৃহীত ২০০৮-০৩-৩১ 

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

টেমপ্লেট:Himachal Pradesh topics