পঞ্চায়েত প্রথা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
কেরালার মুহাম্মায় পঞ্চায়েতের কার্যালয়

পঞ্চায়েত প্রথা (পঞ্চায়েত রাজ বা গ্রাম পরিষদ) হল ভারতীয় উপমহাদেশে উদ্ভূত এক ধরনের শাসন ব্যবস্থা যা প্রধানত বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল এবং শ্রীলঙ্কায় বিদ্যমান। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের স্থানীয় সরকারের প্রাচীনতম ব্যবস্থা। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা মতে ২৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকেই এ প্রথার প্রচলন ছিল।[১] "পঞ্চায়েত" শব্দের অর্থ পাঁচ (পঞ্চ) জনের "পরিষদ" (আয়েত)। ঐতিহ্যগতভাবে পঞ্চায়েতগুলো স্থানীয় জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য জ্ঞানী ও সম্মানিত প্রবীণদের নিয়ে গঠিত হয়। তবে, স্থানভেদে এ জাতীয় পরিষদের গঠনে ভিন্নতা রয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে, এই পরিষদ ব্যক্তি পর্যায়ের এবং গ্রাম পর্যায়ের বিভিন্ন বিরোধ মীমাংসা করে থাকে।

পঞ্চায়েতের প্রধানকে স্থানভেদে মুখিয়া, সরপঞ্চ বা প্রধান বলা হয়। নির্বাচন অথবা জনসাধারণের স্বীকৃতির মাধ্যমে তিনি এ পদে অধিষ্ঠিত হন। উল্লেখ্য, ঐতিহ্যগত পঞ্চায়েত প্রথা, ভারতের আধুনিক পঞ্চায়েত রাজ ও এর গ্রাম পঞ্চায়েতগুলো আর উত্তর ভারতের খাপ পঞ্চায়েত (বা বর্ণবাদী পঞ্চায়েত) মোটেও এক নয়।[২]

মধ্যপ্রদেশের নরসিঙ্গড়ে উন্মুক্ত পঞ্চায়েত

মহাত্মা গান্ধী পঞ্চায়েত প্রথাকে ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভিত্তি হিসাবে সমর্থন করেছিলেন। কারণ, এর ফলে শাসন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ ঘটে এবং প্রতিটি গ্রাম তার নিজস্ব বিষয়গুলোর জন্য দায়বদ্ধ থাকে।[৩][৪] এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গ্রাম স্বরাজ (অর্থাৎ, গ্রাম স্বশাসন) শব্দটি ব্যবহৃত হতো। অথচ ভারত তা গ্রহণ না করে এর পরিবর্তে একটি কেন্দ্রীভূত সরকার গঠন করে।[৫] তবে, পরবর্তীতে নির্বাচিত গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষমতায়ন করতে স্থানীয় পর্যায়ের বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক কাজকে বিকেন্দ্রীকরণ করা হয়েছে।[৬] কিন্তু এই ব্যবস্থা আর গান্ধীর স্বপ্নের পঞ্চায়েতি রাজের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। ১৯৯২ সালে ভারতে এই ব্যবস্থাটি আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যকর হয়।[৭]

ত্রিনিদাদ ও টোবাগোতেও এই প্রথার প্রচলন রয়েছে।[৮][৯][১০]

ভারতীয় উপমহাদেশে পঞ্চায়েত প্রথা[সম্পাদনা]

পঞ্চায়েত প্রথার ইতিহাস[সম্পাদনা]

ঋগ্বেদের সময়ে (খ্রিস্টপূর্ব ১৭০০ সাল) 'সভা' নামক গ্রামীণ স্ব-শাসিত সংস্থা থাকার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। সময়ের সাথে সাথে এই সংস্থাই পরবর্তীতে পঞ্চায়েতে (পাঁচ জনের পরিষদ) পরিণত হয়। প্রায় প্রতিটি গ্রামে তৃণমূল শাসনের জন্য পঞ্চায়েত ছিল একটি কার্যকরী প্রতিষ্ঠান। গ্রাম পঞ্চায়েত বা নির্বাচিত পরিষদের নির্বাহী ও বিচারিক উভয়ই ক্ষমতাই ছিল। পঞ্চায়েতে জমি বণ্টনের কাজও করা হত এবং খাজনা সংগ্রহ করে গ্রামের পক্ষ থেকে সরকারকে তার প্রাপ্য অংশ প্রদান করতো। এই গ্রাম পরিষদগুলোকে তত্ত্বাবধান এবং প্রয়োজনে হস্তক্ষেপ করার জন্য একটি বৃহত্তর পঞ্চায়েত বা পরিষদ ছিল।[১১]

মধ্যযুগে পঞ্চায়েত[সম্পাদনা]

মধ্যযুগের মুসলিম শাসকগণ মোটামুটি কেন্দ্রাভিমুখী শাসন ব্যবস্থা চালু করেন। এ সময় শাসক ও জনগণের মাঝে সামন্তপ্রধান ও রাজস্ব সংগ্রহকারী (জমিদার) শ্রেণির আবির্ভাব ঘটে। জমিদাররা নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধ করলে শাসকরা সাধারণত সেই জমিদারদের অঞ্চলে কোন হস্তক্ষেপ করতেন না। ফলে, গ্রামগুলোর বিচারব্যবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব জমিদারদের হাতে চলে আসে। এভাবে, পঞ্চায়েতের কর্তৃত্ব ও ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়।[১২]

ব্রিটিশ শাসনামল[সম্পাদনা]

ব্রিটিশরা স্থানীয় প্রশাসন নিয়ে খুব একটা উদ্বিগ্ন ছিল না। তাই, প্রথমদিকে তারা এ বিষয়টি স্থানীয় শাসকদের উপরেই ন্যস্ত করে। গ্রামগুলোতে বিদ্যমান পঞ্চায়েতী ব্যবস্থায় তারা কোনো হস্তক্ষেপ করেনি বা শাসকদের স্থানীয় স্তরে আরও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠন করতে প্ররোচিত করেনি।[১৩] আর, শাসকরাও 'নিয়ন্ত্রিত' স্থানীয় সংস্থা গঠনে আগ্রহী ছিলেন, যা কর আদায়ের মাধ্যমে তাদের কাজে সহায়তা করতে পারে। ১৮৫৭ সালের অভ্যুত্থানের পরে যখন ঔপনিবেশিক প্রশাসন মারাত্মক আর্থিক চাপের মুখে পড়ে, তখন তারা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে রাস্তা ও গণপূর্তের দায়িত্ব স্থানীয় সরকারগুলোর উপর ন্যস্ত করে।

বক্সারের যুদ্ধে পরাজয়ের পরে ১৭৬৫ সালে মুঘল সম্রাট শাহ আলম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলার দিউয়ানী ক্ষমতা প্রদান করেন।[১৪] দিউয়ান নিযুক্ত হয়ে কোম্পানি দুটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করে। প্রথমত, তারা গ্রামের জমি রেকর্ড অফিস বিলুপ্ত করে এবং "পাটোয়ারী" নামে একটি পদ তৈরি করে। পাটোয়ারীকে নির্দিষ্ট কয়েকটি গ্রামের সরকারী রেকর্ড রক্ষক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। দ্বিতীয়ত, তারা ম্যাজিস্ট্রেট অফিস গঠন এবং গ্রাম পুলিশ বিলুপ্ত করে। ম্যাজিস্ট্রেটরা পুলিশিংয়ের কাজ পরিচালনা করতেন দারোগাদের মাধ্যমে যারা ছিলেন ফৌজদারের অধীনস্থ রাষ্ট্রীয় কর্মচারী। এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য ছিল যথাযথভাবে জমির খাজনা আদায় করা। এই পাটোয়ারী ও দারোগারা পর্যায়ক্রমে আমাদের লোককাহিনীর একটি অংশ ওঠে। কিন্তু, এ পদক্ষেপ বাংলাকে সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের দিকে পরিচালিত করে।[১৫] দুর্ভিক্ষের প্রভাব অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকেও স্থায়ী ছিল। মূলত, এই দুটি পদক্ষেপ গ্রামীণ সম্প্রদায়কে সম্পূর্ণরূপে ক্ষমতাহীন করে দেয় এবং পঞ্চায়েতকে প্রায় ধ্বংস করে দেয়। অবশ্য, ১৮৫৭ সালের পরে ব্রিটিশরা পঞ্চায়েতকে ছোটখাটো অপরাধের দমন এবং গ্রামের বিরোধ নিষ্পত্তি করার ক্ষমতা দিয়ে প্রথাটি পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করেছিল। তবে এই পদক্ষেপগুলো গ্রামীণ সম্প্রদায়ের হারানো ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য মোটেও পর্যাপ্ত ছিল না।

১৮৭০ সালের ভাইসরয়- লর্ড মেয়ো'র রেজোলিউশন (ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণের চাহিদা মেটানোর মতো প্রশাসনিক দক্ষতা আনার জন্য) স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে অনুপ্রেরণা যোগায়। স্থানীয় সরকারের প্রতি ঔপনিবেশিক নীতির বিবর্তনে এটি একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিল।[১৬] বিকেন্দ্রীকরণ সম্পর্কিত সরকারী নীতির পরিবর্তনের জন্য অবশ্য লর্ড রিপনের অবদানকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ, তিনি ১৮৮২ সালের ১৮ মে স্থানীয় স্ব-সরকার সম্পর্কে তার বিখ্যাত রেজুলেশনে স্থানীয় সরকারের দ্বৈত বিবেচনাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন: (i) প্রশাসনিক দক্ষতা এবং (ii) রাজনৈতিক শিক্ষা। রিপন রেজোলিউশনে স্থানীয় সংস্থাগুলো গঠনে নির্বাচিত বেসরকারী সদস্যদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রাখা এবং একজন বেসরকারী চেয়ারপারসনকে সভাপতি করার ব্যাপারে নির্দেশনা ছিল। তাই, ঔপনিবেশিক আমলারা এর বিরোধিতা করেন। তাদের বিরোধিতার কারণে রিপন তার নির্বাচনী আদর্শগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেননি। ফলে, স্থানীয় কমিটিগুলোতে নির্বাচিত সদস্যদের পাশাপাশি মনোনীত সদস্যরাও রয়ে যায়। এভাবে, তিনি গ্রামীণ বোর্ডসগুলোর জন্য সর্ব প্রথম নির্বাচন পদ্ধতি চালু হয়।[১৭]

স্যার এইচডাব্লু প্রিম্রোসের অধীনে দ্য রয়্যাল কমিশন অন ডিসেন্ট্রালাইজেশন (১৯০৭) গ্রাম পর্যায়ে পঞ্চায়েতের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দেয়। কমিশন সুপারিশ করেছিল যে "বিকেন্দ্রীকরণের স্বার্থে এবং প্রশাসনের স্থানীয় কাজের সাথে জনগণকে সম্পৃক্ত করার জন্য গ্রাম পঞ্চায়েত গঠন ও বিকাশের মাধ্যমে গ্রামীণ প্রশাসন পরিচালনার চেষ্টা করা উচিত।"[১৮]

পরবর্তীতে, মন্টগে-কেমসফোর্ড সংস্কার (১৯১৯) স্থানীয় স্ব-সরকারকে স্থানান্তরিত করে প্রদেশগুলোর ভারতীয় মন্ত্রীদের অধীনে নিয়ে আসে। কিন্তু, সাংগঠনিক ও আর্থিক সংকটের কারণে সংস্কারটি পঞ্চায়েতগুলোকে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক এবং প্রাণবন্ত করতে সক্ষম হয় নি। এই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো: এ সময় বেশ কয়েকটি প্রদেশে গ্রাম পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯২৫ সালের মধ্যেই আটটি প্রদেশে পঞ্চায়েত আইন পাস হয়। আর, ১৯২৬ সালের মধ্যে ছয়টি দেশীয় রাজ্যও পঞ্চায়েত আইন পাস করেছিল।

ভারত শাসন আইন ১৯৩৫ এর অধীনে প্রাদেশিক সরকার মধ্যে পঞ্চায়েতের বিবর্তন চিহ্নিত করে। প্রদেশগুলোতে তাদের সরকার স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোর গণতান্ত্রিকীকরণের জন্য আইন প্রণয়ন করে। তবে, দায়িত্বশীল সরকারের ব্যবস্থা তৃণমূল পর্যায়ে কম দায়বদ্ধ ছিল। এ কারণেই, ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের অধীনে মধ্য প্রদেশের তৎকালীন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ডি.পি. মিশ্রা বলেছিলেন, "আমাদের প্রদেশে এবং সম্ভবত সারা দেশে ... ... স্থানীয় সংস্থাগুলোর কাজ একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছে ... ... 'অদক্ষতা' এবং 'স্থানীয় সংস্থা' যেন সমার্থক শব্দে পরিণত হয়েছে ....।"[১৯]

রয়্যাল কমিশন অন ডিসেন্ট্রালাইজেশন (১৯০৭), মন্টিগ এবং কেমসফোর্ডের সাংবিধানিক সংস্কার সম্পর্কিত প্রতিবেদন (১৯১৯), ভারত সরকার রেজোলিউশন (১৯১৯) ইত্যাদি সত্ত্বেও তদারকি ও নিয়ন্ত্রণের ভিত্তিতে একটি শ্রেণিবদ্ধ প্রশাসনিক কাঠামো প্রবর্তিত হয়। এতে, প্রশাসক পল্লী প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন। ব্রিটিশরা বিকেন্দ্রীভূত গণতন্ত্র নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল না তবে তারা ঔপনিবেশিক লক্ষ্যে অবিচল ছিল।[২০]

ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ১৯২০-এর দশক থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে স্বাধীনতা সর্বভারতীয় স্বরাজ ইস্যু এবং ভারতের স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন পরিচালনা করে। এর ফলশ্রুতিতে, স্থানীয় স্তরের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করার কাজটিকে অবহেলিত থেকে যায়। পল্লী স্থানীয় স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব ও ভূমিকা কী হওয়া উচিত সে সম্পর্কে দলটির শীর্ষ নেতাদের মধ্যে ঐকমত্য ছিল না; বরং এই বিষয়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা ছিল। এক দিকে, গান্ধী গ্রাম স্বরাজ এবং গ্রাম পঞ্চায়েতকে পুরোপুরি শক্তিশালী করার পক্ষে ছিলেন। আর অন্য দিকে, ডঃ বি আর আম্বেদকর এই ধারণার বিরোধিতা করছিলেন। তবে, মডেল রাষ্ট্রকে যেহেতু সকল সামাজিক নিপীড়নের বিরুদ্ধে সুরক্ষা তৈরি করতে হয়েছিল; তাই তাদেরকে রাজনীতিতে সংসদীয় পদ্ধতিই গ্রহণ করতে হয়।[২১] ভারতের সংবিধানের খসড়া তৈরির সময় পঞ্চায়েতী রাজ প্রতিষ্ঠানগুলো সংবিধানের অন্যায়বিচারযোগ্য অংশে ৪০ নং অনুচ্ছেদে স্থাপন করা হয়। এ অনুচ্ছেদে লেখা হয়েছে, "রাজ্য গ্রাম পঞ্চায়েতকে সংগঠিত করতে এবং স্ব-সরকারের ইউনিট হিসাবে কাজ করতে সক্ষম হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের অধিকারী করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।" তবে এটি বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় বা রাজ্য পর্যায়ে কোনও সার্থক আইন কার্যকর করা হয়নি।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়কাল[সম্পাদনা]

ভারতের স্বাধীনতার পর পঞ্চায়েতকে বিভিন্ন পর্যায়ের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটির পরিকল্পনা প্রণয়ন, বাস্তবায়ন এবং পর্যবেক্ষণে জনগণের সম্পৃক্ততা ও অংশগ্রহণ ছিল না।[২২] তাই, দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাটিতে ব্লক ডেভলপমেন্ট অফিসার, সহকারী উন্নয়ন কর্মকর্তা, গ্রাম পর্যায়ের শ্রমিকদের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সমগ্র গ্রামাঞ্চলকে জাতীয় বিস্তৃত পরিষেবা ব্লক দিয়ে আচ্ছাদন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই সাথে ওই অঞ্চলের গ্রাম পঞ্চায়েতগুলোর মনোনীত প্রতিনিধি এবং জনপ্রিয় কো-অপারেটিভ সংস্থাগুলোকেও এর সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছিল। কিন্তু, এ পরিকল্পনাটির মাধ্যমে সন্তোষজনকভাবে বিকেন্দ্রীকরণ করা সম্ভব হয়নি। তাই, বিকেন্দ্রীকরণের বিভিন্ন দিক সম্পর্কে কেন্দ্রকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন কমিটি গঠন করেছিল।

তৃণমূল পর্যায়ে জনগণকে রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণের জন্য গান্ধীর যে লক্ষ্য ছিল, তা বাস্তবায়নে ১৯৫৬ সালে, ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল বলবন্ত রাই মেহতার অধীনে একটি কমিটি গঠন করে। এই কমিটি ১৯৫৭ সালে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়। এতে তারা জেলা পর্যায়ে জেলা পরিষদ, ব্লক স্তরে পঞ্চায়েত সমিতি এবং গ্রাম পর্যায়ে গ্রাম পঞ্চায়েত নিয়ে তিন স্তরের কাঠামো গঠনের সুপারিশ করেছিল।[২৩]

১৯৯২ সালে পঞ্চায়েত রাজ আইন (৭৩ তম সংশোধন) পাস হওয়ার মাধ্যমে ভারতের পঞ্চায়েত ব্যবস্থায় পরবর্তী বড় পরিবর্তন আসে। কেন্দ্রীয় সরকার নিযুক্ত আমলাদের চেয়ে স্থানীয় সরকার আরও ভালভাবে গ্রামের প্রয়োজনগুলো সনাক্ত করতে পারবে এবং যে কোনো সমস্যায় সাড়া দিতে পারবে- এই ধারণা থেকেই আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এই আইনটি বিকেন্দ্রীকরণের দিকে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হয়।[২৪]

এই আইনের মূল বৈশিষ্ট্যগুলো হল: (ক) ২০ লাখের বেশি জনসংখ্যার রাজ্যগুলোতে পঞ্চায়েতি রাজের একটি তিন-স্তর বিশিষ্ট ব্যবস্থা প্রণয়ন; (খ) প্রতি পাঁচ বছর পর পর নিয়মিত পঞ্চায়েত নির্বাচন; (গ) তফসিলি জাতি, তফসিলি উপজাতি ও মহিলাদের জন্য আসন সংরক্ষণ (মোট আসন সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশের কম নয়); (ঘ) পঞ্চায়েতের আর্থিক ক্ষমতা সম্পর্কিত সুপারিশ করার জন্য রাজ্য অর্থ কমিশন গঠন।[২৪] মূলত, এ আইনে পঞ্চায়েতগুলোকে স্বশাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতিষ্ঠান হিসাবে কাজ করার জন্য যথেষ্ট ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

এই সংশোধনীটির বেশ কিছু ইতিবাচক প্রভাব ছিল, যার কয়েকটি উপরে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, অতিরিক্ত-রাজনৈতিক উপায়ে ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য ভোট-ব্যবসায়ের সাথে জড়িত থাকার প্রমাণও রয়েছে। অর্থাৎ, পঞ্চায়েত আইন হিসেবে বিবেচিত এই আইনের মাধ্যমে পঞ্চায়েতের কার্যক্রমে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গ্রামসভাগুলোকে যথেষ্ট ক্ষমতায়িত করা যায়নি।

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. P.B. Udgaonkar, Political Institutions & Administration, Motilal Banarasidass Publishers, 1986, আইএসবিএন 978-81-20-82087-6, ... these popular courts are first mentioned by Yajnavalkya and then by Narada, Brishaspati, Somadeva and Sukra. These writers covered a period of about a thousand years, c. 100 to 1950 A.D., and they could not have mechanically referred to the popular courts if they were not actually functioning ... 
  2. Mullick, Rohit & Raaj, Neelam (৯ সেপ্টেম্বর ২০০৭)। "Panchayats turn into kangaroo courts"The Times of India 
  3. Sisodia, R. S. (১৯৭১)। "Gandhiji's Vision of Panchayati Raj"। Panchayat Aur Insan3 (2): 9–10। 
  4. Sharma, Manohar Lal (১৯৮৭)। Gandhi and Democratic Decentralization in India। New Delhi: Deep and Deep Publications। ওসিএলসি 17678104  Hathi Trust copy, search only
  5. Hardgrave, Robert L. & Kochanek, Stanley A. (২০০৮)। India: Government and Politics in a Developing Nation (seventh সংস্করণ)। Boston, Massachusetts: Thomson/Wadsworth। পৃষ্ঠা 157আইএসবিএন 978-0-495-00749-4 
  6. Pellissery, S. (২০০৭)। "Do Multi-level Governance Meet Local Aspirations?"। Asia Pacific Journal of Public Administration28 (1): 28–40। 
  7. Singh, Vijandra (২০০৩)। "Chapter 5: Panchayate Raj and Gandhi"। Panchayati Raj and Village Development: Volume 3, Perspectives on Panchayati Raj Administration। Studies in public administration। New Delhi: Sarup & Sons। পৃষ্ঠা 84–90। আইএসবিএন 978-81-7625-392-5 
  8. "The Panchayat system as an early form of conflict resolution in Trinidad. - GCSE History - Marked by Teachers.com"www.markedbyteachers.com 
  9. "Carmona wants "Panchayat' system to resolve conflicts - Trinidad and Tobago Newsday Archives"। ৩০ মে ২০১৬। 
  10. "Return of the panchayat - Trinidad and Tobago Newsday Archives"। ১২ মে ২০০৫। 
  11. Jawaharlal Nehru, (1964), The Discovery of India, Signet Press, Calcutta, p.288
  12. "পঞ্চায়েত প্রথা - বাংলাপিডিয়া"bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-০৬ 
  13. George Mathew, Ed :Status of Panchayati Raj in the States and Union Territories of India 2000/edited by George Mathew. Delhi, Concept for Institute of Social Sciences, 2000,
  14. "দীউয়ানি - বাংলাপিডিয়া"bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-০৬ 
  15. Romesh Dutt The Economic History of India under early British Rule (1906)
  16. A Comprehensive History of India (ইংরেজি ভাষায়)। Sterling Publishers Pvt. Ltd। ২০০৩-১২-০১। আইএসবিএন 978-81-207-2506-5 
  17. "রিপন, লর্ড - বাংলাপিডিয়া"bn.banglapedia.org। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-০৬ 
  18. Report of the Royal-€OInmission on Decentralisation, 1907
  19. Venkatarangaiah, M. and M. Pattabhiram (1969), 'Local Government in India:Select Readings', Allied Publishers, New Delhi
  20. Venkatarangaiah, M. and M. Pattabhiram (1969), 'Local Government in India:Select Readings', Allied Publishers, New Delhi
  21. World Bank, (2000), Overview of Rural Decentralisation in India, Volume III, p. 18
  22. Planning Commission (২৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭)। "A Background Note on Gadgil Formula for distribution of Central Assistance for State Plans" (PDF)। সংগ্রহের তারিখ ২০১০-০৯-১৭ 
  23. Mathew, George (১৯৯৫)। Status of Panchayati Raj in the States of India, 1994। Concept Publishing Company। পৃষ্ঠা 5–। আইএসবিএন 978-81-7022-553-9 
  24. "The Constitution (Seventy-third Amendment) Act, 1992 | National Portal of India"www.india.gov.in। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৪-০৮ 

গ্রন্থপঞ্জী[সম্পাদনা]