মিজোরাম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
মিজোরাম
ভারতের রাজ্য
মিজোরামের অফিসিয়াল সীলমোহর
সীলমোহর
ভারতে মিজোরামের অবস্থান (লাল রঙে চিহ্নিত)
ভারতে মিজোরামের অবস্থান (লাল রঙে চিহ্নিত)
স্থানাঙ্ক (আইজল): ২৩°২২′ উত্তর ৯২°৪৮′ পূর্ব / ২৩.৩৬° উত্তর ৯২.৮° পূর্ব / 23.36; 92.8স্থানাঙ্ক: ২৩°২২′ উত্তর ৯২°৪৮′ পূর্ব / ২৩.৩৬° উত্তর ৯২.৮° পূর্ব / 23.36; 92.8
দেশ  ভারত
অঞ্চল উত্তর-পূর্ব ভারত
গঠন ২০ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৭
রাজধানী আইজল
বৃহত্তম শহর আইজল
জেলা 8
সরকার
 • রাজ্যপাল আজিজ কোরেশি [১]
 • মুখ্য মন্ত্রী Pu Lalthanhawla (কংগ্রেস)
 • আইনসভা এককক্ষবিশিষ্ট (৪০ সিট)
 • সংসদীয় আসন
 • হাইকোর্ট গৌহাটি হাইকোর্ট
আয়তন
 • মোট ২১০৮৭ কিমি (৮১৪২ বর্গমাইল)
এলাকার ক্রম ২৪তম
জনসংখ্যা (২০১১)
 • মোট ১০,৯১,০১৪
 • ক্রম ২৭তম
 • ঘনত্ব ৫২/কিমি (১৩০/বর্গমাইল)
সময় অঞ্চল IST (ইউটিসি+০৫:৩০)
আইএসও ৩১৬৬ কোড IN-MZ
সাক্ষরতা ৯১.৫৮%[২](৩য়)২০১১ আদমশুমারি
রাষ্ট্রভাষা মিজো[৩]
ওয়েবসাইট mizoram.gov.in
এটি মিজোরামের রাজ্য আইন, ১৯৮৬ কর্তৃক একটি পূর্ণ রাজ্যাবস্থায় উন্নীত করা হয়।

মিজোরাম (ইংরেজি উচ্চারণ: শুনুনi/ˌmɪzrəm/) উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি রাজ্যআইজল মিজোরামের রাজধানী। মি (জাতি), জো (পাহাড়) এবং রাম (ভূমি), এই তিনটি শব্দ থেকে উদ্ভূত মিজোরাম বলতে "পাহাড়ি জাতির ভূমি" বোঝায়।[৪] ভারতের উত্তর-পূর্বে, এটি সর্বদক্ষিণের স্থলবেষ্টিত রাজ্য এবং ভারতের সাতভগিনী রাজ্যের ত্রিপুরা, আসাম, মণিপুর এই তিনটি রাজ্যের সাথে যার সীমানা রয়েছে। এর আয়তন ২১০৮৭ বর্গকিলোমিটার। এছাড়াও প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং মায়ানমারের প্রায় ৭২২ কিলোমিটার এলাকা নিয়ে মিজোরামের সীমানা অবস্থিত।[৫] এর সর্বমোট আয়তন ২১,০৮৭।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

মিজোদের উৎপত্তি, ভারতের উত্তর-পূর্বের অন্যান্য আদিবাসীদের মতো রহস্যময়।

কিন্তু গৃহীত ধারণা থেকে জানা যায়, তারা মায়ানমারের একটা অংশ, চায়না থেকে বার্মা যাওয়া লোকজনই মূলত মিজো । বৃহত্তর মঙ্গোলিয়ান জাতির অংশ তারা। পশ্চিম মায়ানমারে তারা ১ হাজার বছর ধরে আছে বলে ধারণা করা হয়। প্রকৃত পক্ষে মায়ানমারে পশ্চিমাংশে মিজোরা ৭ম শতাব্দিতে অভিবাসিত হয়। মিজোরা যাযাবরদের ন্যায় নতুন নতুন স্থানে গমন করার ফলে অন্যান্য প্রতিবেশী উপজাতিদের সাথে দ্বন্দ্বসংঘাত লেগে থাকত। তাই তারা ১৫ শতকের শেষ দিকে সামাজিক উন্নয়ন ও শৃংখলার জন্য ঈযরবভঃধরহংযরঢ় চালু করে একজনকে গোত্র প্রধান মনোনীত করে। এটি পরে উত্তরাধিকার সূত্রে বড় ছেলে বা বড় পুত্র ঈযরবভঃধরহংযরঢ় হতেন। প্রথম মিজো চিফ হলেন একজন (খঁংবর) লুসাই। যার গোত্রীয় নাম তধযসঁধশধ। যামোয়াকার বংশধরেই পাহাড়ের বিশাল এক এলাকা দীর্ঘদিন শাসন করেন। পরে অষ্টাদশ শতাব্দিতে মিজোদের মায়ানমার থেকে বহির্গমন এক মহাকাব্যিক ব্যাপার ছিল। যা ভয়ংকর সংগ্রাম ও বীরত্বপূর্ণ ঘটনায় ভরা ছিল। একসময় তারা মায়ানমার সীমান্তের ঞরধঁ জরনবৎ অতিক্রম করে। ব্রিটিশ ভারতবর্ষের আসামের কাছাড়, পার্বত্য চট্টগ্রাম, সিলেটের বিভিন্ন স্থানে ঝধরষড় (স্থানীয় লুসাই নেতা/মিজো নেতা) গণ ব্যাপক ধংসযজ্ঞ চালায়। এ সময় কাচার এলাকায় ব্রিটিশ সরকারের পরিচালিত চা-বাগানের এক শ্বেতাঙ্গ কর্মকর্তাকে হত্যা ও তার কন্যাকে অপহরণ করলে ক্ষুব্ধ ব্রিটিশ শাসক অভিযানের মাধ্যমে ধরে এনে মিজোদের একজন ঝধরষড়-কে কঠিন শাস্তি প্রদান করে। ঊনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এ ঘটনা ঘটায়। যামোয়াকার বংশধরেরাই এক সময় ঝধরষড় হিসেবে পরিচিতি লাভ করে এবং তেজী ও যোগ্য শাসক পরিগণিত হয়। তারা গ্রাম্য প্রশাসন ব্যবস্থা যথার্থ ভাবে চালু করতে সক্ষম হয়। গ্রাম্য প্রধানদেরকে তারা খধষ বলে অভিহিত করতেন এবং লালরাই গ্রামের ঝগড়া-বিবাদ নিরসন এবং চাষাবাদ কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এছাড়াও আশ্রয় প্রার্থীদের আশ্রয়ের এবং থাকার ব্যবস্থা করতেন। এই গ্রাম প্রধানদের কাজে সাহায্যে করতো প্রবীণদের নিয়ে গঠিত একটি পরিষদ। এই পরিষদকে টঢ়ধ বলা হতো। চার্চ এর পুরোহিত বা ধর্মগুরুদের (চঁরঃযরধস) এবং কামার (ঞযরৎফবহম), বিচারক (ঞষধহমধঁ) নিয়োগ কার্যক্রমও পরিচালনা করতেন লালরা। চাল এবং মাংস দিয়ে এসব কর্মচারীদের পারিতোষিক বা বেতন প্রদান করা হতো।

ভূগোল[সম্পাদনা]

চিম্পটুইপুই (উপরে) এবং টুইপুই নদী

মিজোরামের উত্তর-পূর্ব ভারত একটি একটি স্থলবেষ্টিত রাজ্য যার দক্ষিণাংশে মিয়ানমার ও বাংলাদেশের প্রায় ৭২২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানা রয়েছে, এবং উত্তরাংশের সীমানায় মণিপুর, আসাম ও ত্রিপুরা অবস্থিত। এটি ২১.০৮৭ কিমি (৮,১৪২ বর্গ মাইল) বিষিষ্ট ভারতের পঞ্চম ক্ষুদ্রতম রাজ্য। এটি ২১°৫৬'উত্তর থেকে ২৪°৩১'উত্তর, এবং ৯২°১৬'পূর্ব থেকে ৯৩°২৬'র্পর্ব পর্যন্ত বিস্তৃত।[৬] কর্কটক্রান্তি প্রায় এ রাজ্যের মাঝখান দিয়ে সঞ্চালিত হয়েছে। সর্বাধিক উত্তর-দক্ষিণ দূরত্ব ২৮৫ কিমি, এবং সর্বোচ্চ পূর্ব-পশ্চিমে প্রসারিত ১১৫ কিমি. পর্যন্ত।

পাহাড়, হ্রদ ও নদীর দেশ মিজোরাম। সারা রাজ্যে প্রায় ২১টি বড় বড় পাহাড়শ্রেণী ও বিভিন্ন উচ্চতার চূড়া রয়েছে এবং বিভিন্ন পাহাড়শ্রেণীর ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মধ্যে দু’এক ফালি সমতল জমিরও দেখা পাওয়া যায়। পশ্চিম দিকের পাহাড়গুলোর গড় উচ্চতা প্রায় ১০০০ মিটার যা পূর্ব দিকে ক্রমশঃ ১৩০০ মিটার পর্যন্ত উঠে গেছে। কোন কোন অঞ্চলে আরও উঁচু পাহাড়শ্রেণী রয়েছে যেগুলো উচ্চতায় ২০০০ মিটারেরও বেশী। রাজ্যের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত ঢ়যধহিমঢ়ঁর বা ঞযব ইষঁব গড়ঁহঃধরহ। এর উচ্চতা ২,২১০ মিটার। এটি মিজোরামের সর্বোচ্চ চূড়া।

জলবায়ু[সম্পাদনা]

মিজোরামের হালকা জলবায়ু বিরাজমান, গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা ২০ থেকে ২৯° সে (৬৮ থেকে ৮৪° ফা) থাকে, এবং শীতকালে তাপমাত্রা পরিসীমা থেকে ৭ থেকে ২২°সে (৪৫ থেকে ৭২° ফা) তাপমাত্রা। এই অঞ্চল মৌসুমী বায়ু দ্বারা প্রভাবিত, শুষ্ক (ঠান্ডা) মৌসুমে সামান্য বর্ষণের পাশাপাশি মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারী বর্ষণ হয়ে থাকে।

আইজল, মিজোরামের রাজধানী-এর আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য
মাস জানু ফেব্রু মার্চ এপ্রিল মে জুন জুলাই আগস্ট সেপ্টে অক্টো নভে ডিসে বছর
সর্বোচ্চ °সে (°ফা) গড় ২০٫৪
(৬৯)
২১٫৭
(৭১)
২৫٫২
(৭৭)
২৬٫৮
(৮০)
২৬٫৩
(৭৯)
২৫٫৫
(৭৮)
২৫٫৩
(৭৮)
২৫٫৫
(৭৮)
২৫٫৭
(৭৮)
২৪٫৭
(৭৬)
২৩٫০
(৭৩)
২১٫০
(৭০)
২৪٫২৬
(৭৫٫৬)
সর্বনিম্ন °সে (°ফা) গড় ১১٫৪
(৫৩)
১২٫৮
(৫৫)
১৫٫৬
(৬০)
১৭٫৫
(৬৪)
১৮٫১
(৬৫)
১৮٫৯
(৬৬)
১৯٫১
(৬৬)
১৯٫১
(৬৬)
১৯٫২
(৬৭)
১৮٫০
(৬৪)
১৫٫১
(৫৯)
১২٫২
(৫৪)
১৬٫৪২
(৬১٫৬)
গড় অধঃক্ষেপণ মিমি (ইঞ্চি) ১৩٫৪
(০٫৫৩)
২৩٫৪
(০٫৯২)
৭৩٫৪
(২٫৮৯)
১৬৭٫৭
(৬٫৬)
২৮৯٫০
(১১٫৩৮)
৪০৬٫১
(১৫٫৯৯)
৩২০٫৪
(১২٫৬১)
৩২০٫৬
(১২٫৬২)
৩০৫٫২
(১২٫০২)
১৮৩٫৭
(৭٫২৩)
৪৩٫২
(১٫৭)
১৫٫৩
(০٫৬)
২,১৬১٫৪
(৮৫٫০৯)
উৎস: [৭]

রাজনীতি[সম্পাদনা]

প্রশাসন[সম্পাদনা]

জেলা[৮] জনসংখ্যা
(২০১১)
জনসংখ্যা ঘনত্ব
কিমি প্রতি
আইজল ৪০০,৩০৯ ১১৭
লুংলেই ১৬১,৪২৮ ৩৫
চাম্ফাই ১২৫,৭৪৫ ৩৭
Lawngtlai ১১৭,৮৯৪ ৩৯
Mamit ৮৬,৩৬৪ ২৯
কোলাসিব ৮৩,৯৫৫ ৫৬
Serchhip ৬৪,৯৩৭ ৪৭
Saiha ৫৬,৫৭৪ ৫২

ভাষা[সম্পাদনা]

মিজোরামের রাষ্ট্রভাষা এবং মৌখিক পারস্পরিক ক্রিয়ার জন্য সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত ভাষা হল মিজো, কিন্তু শিক্ষা, প্রশাসন, আনুষ্ঠানিকতা এবং র্রাষ্ট্রপরিচালনার জন্য ব্যাপকভাবে ইংরেজি ব্যবহৃত হয়। এছাড়াও লুশাই নামে পরিচিত, দুহলিয়ান উপভাষা ছিল মিজোরামের প্রথম ভাষা যা মিজো ভাষা হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। হ্মার, মারা, লাই, পেইত, গাঙতে ইত্যাদি উপভাষায় সাথেও এই ভাষা মিশ্রিন ঘটেছে। খ্রিস্টান ধর্মপ্রচারকদের মিজো লিপি উন্নত করে। রোমান লিপির সংমিশ্রণে এবং একটি ধ্বনিবিজ্ঞান-ভিত্তিক বানান পদ্ধতি বিশিষ্ট ট্রেসের সাথে হান্তরিয়ান লিপ্যন্তর পদ্ধতিতে এই ভাষার লিখন পদ্ধতি গড়ে ওঠে। মিজো বর্ণমালার ২৫টি অক্ষর রয়েছে: A, AW, B, CH, D, E, F, G, NG, H, I, J, K, L, M, N, O, P, R, S, T, Ṭ, U, V, Z। মিজো ভারতের রাষ্ট্রভাষাসমূহের (রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে) মধ্যে একটি। অষ্টম শ্রেণী পর্যন্ত হিন্দি সকল শিক্ষার্থীদের জন্য আবশ্যিক বিষয় এবং এখানে এর ক্রমবর্ধমান ব্যবহার রয়েছে।[৯] এছাড়াও রাজ্যের নেপালি অভিবাসী কর্তৃক নেপালি ভাষা ব্যবহৃত হয়ে থাকে।

ধর্ম[সম্পাদনা]


Circle frame.svg

ধর্মের তালিকা (২০১১)[১০][১১]

  ইসলাম (১.৩৫%)
  জৈন ধর্ম (০.০৩%)
  শিখধর্ম (০.০৩%)
  অন্যান্য (০.১৬%)

২০১১ সালের আদমশুমারী অনুসারে মিজোরামের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠ (৮৭%) মিজো খৃস্টান ধর্মালম্বী যারা প্রধানত প্রেসবিটারিয়ান,[১২] বাকি জনসংখ্যার ৮.৩% বৌদ্ধ, ৩.৬% হিন্দু ধর্মালম্বী। কয়েক হাজার মানুষ রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নৃতাত্ত্বিক মিজো, যারা ইহুদি ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। রাজ্যের জনসংখ্যার প্রায় ১.১% মুসলিম। মিজোরামে বেশিরভাগ মুসলমান জাতিগতভাবে রোহিঙ্গা। অবশিষ্ট ৩,০০০ মানুষ শিখ, জৈন এবং অন্যান্য ধর্মালম্বী।[১২]

মিজোরামে ধর্ম[১২]
ধর্ম শতকরা হার
খ্রিস্ট ধর্ম
  
৮৭.৯৭%
বৌদ্ধ ধর্ম
  
৬.৯৩%
হিন্দুধর্ম
  
৩.৫৫%
ইসলাম
  
১.১৩%
অন্যান্য
  
০.৩৩%
খ্রিস্ট ধর্ম
এটিসি, মিজোরাম

মিজোরাম প্রেসবিটারিয়ান গীর্জার প্রধান খ্রিস্টান সম্প্রদায়, যা একজন ওয়েলশ ধর্মপ্রচারক রেভারেন্ড ডি.ই. জোন্স কর্তৃক ১৮৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়।[১৩] ব্রিটিশ সাম্রাজ্য থেকে ভারতের স্বাধীনতা অর্জনের সময়, লুশাই আদিবাসী জাতির ৮০% খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়।[১৪]

বৌদ্ধ ধর্ম

২০০১ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী মিজোরামের জনসংখ্যার প্রায় ৭০.৪৯৪ জন মানুষ বৌদ্ধ ধর্মের অনুসারী।

হিন্দুধর্ম

২০০১ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী মিজোরামের প্রায় ৩১.৫৬২ জন হিন্দু ধর্মের অনুসারী, যা মোট জনসংখ্যার শতকারা ৩.৫৫%।

অন্যান্য

এছাড়াও মিজোরামের কিছু সংখ্যক মানুষ ইহুদি ধর্ম অনুশীলন করে থাকে, ২০০১ সালের আদমশুমারি প্রতিবেদন অনুযায়ী তাদের সংখ্যা প্রায় ৮৬৬ জন।

সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

উৎসব[সম্পাদনা]

মিজোদের তিনটি বড় উৎসব রয়েছে: মিম কুট (গরস কঁঃ) ছাপচার কুট ( ঈযধঢ়পযধৎ কঁঃ) এবং পাউল কুট( চধষি কঁঃ)। এ তিনটি উৎসব কোন না কোন ভাবে কৃষিকর্মের সাথে সম্পৃক্ত।

মিম কুট[সম্পাদনা]

এ উৎসবটি সাধারণত আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে ভুট্টা ফসল ঘরে তোলার সময় অনুষ্ঠিত হয়। মৃত আত্মীয়-স্বজনদের স্মরণে উৎসর্গীকৃত এ উৎসবটির মূলে রয়েছে কালের স্মরণ ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের চেতনা। মৃতদের স্মরণে তৈরী একটি উঁচু মাচানের উপর প্রথম ফসল উৎসর্গ করা হয়।

ছাপচার কুট[সম্পাদনা]

বসন্তকালে জুম কাটা শেষ হলে এ উৎসবটি পালন করা হয়। মিজোদের সব চাইতে আনন্দময় উৎসব এটি। ঋতুটিও খুবই উপযোগী। বসন্ত ঋতুকে জায়গা করে দিয়ে শীত ধীরে ধীরে বিদায় নেয়। এ সময় প্রকৃতি পুনরুজ্জীবন লাভ করে ও মানুষের জীবনে সজীবতা বয়ে নিয়ে আসে। বয়স ও লিঙ্গ ভেদে মিজোরা এ উৎসবে অংশ গ্রহণ করে। বর্ণিল পোশাকে সজ্জিত হয়ে ছেলেমেয়েরা নাচের উৎসবে মেতে উঠে যা অনেক সময় সারা রাত ধরে চলতে থাকে।

পাউল কুট[সম্পাদনা]

ডিসেম্বর-জানুয়ারি মাসে ফসল কাটার পরে এ উৎসবটি উদ্যাপিত হয়। এখানেও ধন্যবাদ বা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের বিষয়টি বড় হয়ে দেখা দেয় কারণ জমি কর্ষণ ও ফসল কাটার মত কঠিন কাজটি এখন শেষ হয়েছে। সমবেত ভুরি ভোজন ও নাচের আয়োজন হয়। স্মারক মাচানের উপর মায়েরা বসে তাদের শিশু সন্তানদের খাওয়ায়। ঈযধঢ়পযধৎ কঁঃ উৎসব উদ্যাপনকালে যে সামাজিক প্রথাটি পালন করা হয় তা ঈযযধহিমযহধঃি নামে পরিচিত। তঁভধহম বা ধেনো মদ পানও এ উৎসবের একটি অংশ। দু’দিন ধরে উদ্যাপিত এ উৎসবের পরের পুরো একটি দিন বিশ্রামের দিন। এ দিন কেউই কাজে বেরোয় না।

নৃত্য[সম্পাদনা]

মনোরম পরিবেশ ও সমৃদ্ধ সংস্কৃতিতে ঋদ্ধ মিজোরা জাতি হিসেবে প্রাণবন্ত ও অত্যন্ত মিশুক। গান করতে যেমন, নাচতেও মিজোরা ভালবাসে। তারা এমন কিছু লোকজ ও সমবেত নৃত্যের জন্য গর্ব করতে পারে যা তারা কালের ধারায় বংশানুক্রমে ধারণ করে আসছে। মিজোদের নাচগুলো তাদের উচ্ছল ও নিরুদ্বেগ প্রাণসত্তার প্রকাশ । এটি এখানে বলে রাখা প্রয়োজন যে, মিজোদের নাচগুলো মঞ্চের উপর অনুষ্ঠানযোগ্য কোন কর্ম নয়। এটি তারা স্বভাবগত ভাবে বিকশিত করেছে সমবেত ভাবে সম্পৃক্ত হ’তে ও অংশগ্রহণ করতে।

চিরাউ[সম্পাদনা]

মিজো নাচের মধ্যে সবচেয়ে বর্ণিল এ ঈযবৎধি নৃত্য। এ নাচে বাঁশ ব্যবহার করা হয়। বাঁশগুলো ঠুকলে যে শব্দ বেরোয়, সেই শব্দই এ নাচের তাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। নৃত্যশিল্পীরা সমান্তরাল একজোড়া বাঁশের মধ্যে পরিবর্তন সাপেক্ষে একবার লাফিয়ে ঢুকে আবার বোরয়ে এসে এবং জোড়া বাঁশের একদিক থেকে অন্যদিকে লাফিয়ে লাফিয়ে নাচ করতে থাকে। কিছু ব্যক্তি উভয় পার্শ্বে মুখোমুখি বসে বাঁশগুলোকে মাটি বরাবর ধরে রাখে। ছন্দোময় তালে তারা বাঁশগুলোকে ঠুকে পর্যায়ক্রমে একবার ফাঁক ও একবার সংযুক্ত কারে। এটি নাচের গতিকেও নির্দেশ করে। এ নাচে পা ফেলা ও তার ধরনের মধ্যে বিভিন্নতা রয়েছে এবং তা অঞ্চলভেদে ভিন্নও। আজকাল চিরাউ (ঈযবৎধ)ি নাচটি যে কোন সময়ে করা হয়। কিন্তু আগেকার দিনে সন্তান প্রসবের সময় মরে যাওয়া মায়ের আত্মার নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করার জন্য এ নাচ করা হতো। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কিছু দেশে ঈযবৎধ-িএর অনুরূপ তাদের নিজস্ব বাঁশনৃত্য রয়েছে। মিজোরাম, ২০১০ খ্রিস্টাব্দে অনুষ্ঠিত ঈযধঢ়পযধৎ কঁঃ উৎসবের সময় ১০ হাজার নৃত্যশিল্পীর অংশগ্রহণে ঈযবৎধি নাচের অনুষ্ঠানটি করে বৃহত্তম গণ-বাঁশ নৃত্য হিসেবে ‘‘গিনেস বুক’’-এর রেকর্ডে স্থান করে নিয়েছে।

সামাজিক প্রথা[সম্পাদনা]

মিজোদের মধ্য বর্তমানে খ্রিস্টানিটি চালু হলেও এখনো তাদের নিজস্ব প্রথাগত আইনও বহাল আছে। মিশনারীরা মিজোদের নিজস্ব প্রথাগুলি পরিবর্তনের জন্য কোন প্রকার চাপ প্রয়োগ করে না। তবে যে সব প্রথা এবং ঐতিহ্য অর্থহীন বা ক্ষতিকর সেগুলি ধর্মদেশনার বা প্রচারণার মাধ্যমে ধীরে ধীরে বিলুপ্ত করা হয়েছে। এভাবেই চা খাওয়ার পরিবর্তে ুঁ নামে এক জাতীয় পানীয় পানের অভ্যাস গড়ে তুলেছে মিজোরা। পশু হত্যার উৎসবও এখন ত্যাগ করেছে মিজোরা। তবে কনে পণ দেওয়ার রীতিটি বহাল রয়ে গেছে।

কনে পণ[সম্পাদনা]

বর কর্তৃক কনেকে পণ দেওয়া হচ্ছে মিজো সম্প্রদায়ের বিবাহ রীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। তবে কনে পণের বিভিন্ন নিয়ম নীতি আছে।

বিবাহ[সম্পাদনা]

মিজো বিবাহ সম্পন্ন হয় আইনগত প্রক্রিয়ায় ও আশীর্বাদ প্রথার নিয়মে। তবে ছেলে এবং মেয়ে আশীর্বাদ প্রাপ্ত হয়ে মুক্ত ভাবে মেলামেশা করতে পারে। যদি দুজনের মধ্যে মনের মিল না হয় তাহলে আশীর্বাদ ভেঙে যেতে পারে। মিজোদের বিবাহ সাধারণত গীর্জাতেই হয়ে থাকে। আধুনিক ও পশ্চিমা স্টাইলে মিজোরা বিবাহ পোষাক পরিধান করে থাকে। কিন্তু মাঝে মাঝে কনেরা মিজোদের প্রথাগত পোষাক ‘‘পঞ্চেই’’ এবং সাদা ব্লাউজ পড়ে। সাধারণত কনেকে বরের ঘরে নিয়ে আসার সময় প্রথাগত একটি আচ্ছাদন দেওয়া হয়। যার নাম চঁধহফঁস। যেটি দিয়ে মৃত্যুর পর আবার তাকে সমাহিত করা হয়।

উত্তরাধিকার[১৫][সম্পাদনা]

সাধারণত মিজো পুরুষরাই সম্পদের উত্তরাধিকারী হয়। তবে পারিবারিক সম্পত্তি পরিবারের ছোট ছেলেই পেয়ে থাকে। যদিও পিতা ইচ্ছে করলে অন্যান্য সন্তানদেরকেও সম্পদের ভাগ দিতে পারে। কারো সন্তান না থাকলে পুরুষ পক্ষের নিকট আত্মীয়রা সম্পদের উত্তরাধিকারী হবে। কেউ মারা গেলে তাঁর বিধবা স্ত্রী ও অপ্রাপ্ত বয়স্ক সন্তানের দায়িত্ব ভাই সম্পর্কীয় কোন আত্মীয় নিতে পারে। তিনি পরিবার এবং সম্পদের দেখাশুনা করবেন। অন্তত একজন সন্তান প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করে থাকে। যদি কাছের পুরুষ আত্মীয় না থাকে, তখন বিধবাটি তাঁর স্বামীর ট্রাস্টি হিসেবে গণ্য হবেন ছেলে উপযুক্ত না হওয়া পর্যন্ত। মিজোদের প্রথাগত নিয়মে পরিবারের ছোট সন্তান সম্পদের উত্তরাধিকারী হলেও ব্স্তাবে বর্তমানে মিজো সম্প্রদায়ে সকল সন্তানকে সম্পদ ভাগ করে দেওয়ার রীতি প্রচলিত হয়েছে। তথাপি ছোট সন্তানের অগ্রাধিকার রয়ে গেছে, কারণ এক্ষেত্রে ছোট সন্তানকে ভাগের দুই অংশ দেওয়া হয়। যিনি মারা যান, তাঁর যদি কোন পুরুষ আত্মীয় স্বজন না থাকে তখন মৃত ব্যক্তি স্ত্রী ও কন্যা সম্পদের উত্তরাধিকারী হতে পারে।

যোগাযোগ[সম্পাদনা]

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ভারতের অন্যান্য অংশের সঙ্গে এই রাজ্যের তেমন পরিবহণ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি। আকাশপথে আইজল-এর সাথে কলকাতাদিল্লী শহরের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। বর্তমানে ভারতীয় রেল বৈরাবি শহর পর্যন্ত রেলপথ বিস্তার করেছে। অদূর ভবিষ্যতে তা রাজ্যের রাজধানী আইজল পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. http://mizoram.nic.in/gov/governor.htm
  2. "Census Population"Census of India। Ministry of Finance India। সংগৃহীত ৭ আগস্ট ২০১২ 
  3. Commissioner, Linguistic Minorities। 41st report: July 2002 - June 2003। পৃ: paras ২৮.৪, ২৮.৯। আসল থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৭-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত ১৬ জুলাই ২০০৭ 
  4. Sajnani, Encyclopaedia of Tourism Resources in India, Volume 1, আইএসবিএন ৮১-৭৮৩৫০১৭৩, page 241
  5. About Mizoram DIRECTORATE OF INFORMATION & PUBLIC RELATIONS, Government of Mizoram
  6. Rintluanga Pachuau,pagal Mizoram: A Study in Comprehensive Geography, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭২১১-২৬৪-৬, Chapter 3
  7. "Monthly mean maximum & minimum temperature and total rainfall based upon 1901–2000 data" (PDF)। India Meteorology Department। পৃ: ৮। সংগৃহীত ২০ জুন ২০১৪ 
  8. জেলা মিজোরাম সরকার
  9. "It’s time to learn Hindi in Mizoram"indegenousherald.com (Agartala)। জুলাই ২০০৮। সংগৃহীত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ 
  10. "Population by religion community - 2011"Census of India, 2011। The Registrar General & Census Commissioner, India। আসল থেকে ২৫ আগস্ট ২০১৫-এ আর্কাইভ করা। 
  11. Mizoram Populatiolln Census 2011
  12. "Mizoram"Population by religious communitiesIN: Census। ২০০১। .
  13. T Raatan, Encyclopaedia of North-east India: Arunachal Pradesh, Manipur, Mizoram; আইএসবিএন ৯৭৮-৮১৭৮৩৫০৬৮৪
  14. C. Nunthara (2002), Mizoram: Society and Polity, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১৭৩৮৭০৫৯০, pp 59-63
  15. নওশের আলী খান, সাখাওয়াত হোসেন রুবেল। "রাতের আইজল যেন স্বপ্নপুরী" 

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]

  1. B. Hamlet, Encyclopaedia of North-East India: Mizoram, Volume 5, আইএসবিএন ৮১৭০৯৯৭৯২৫
  2. C. Nunthara, Mizoram: Society and Polity, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১৭৩৮৭০৫৯০
  3. T. Raatan, Encyclopaedia of North-east India: Arunachal Pradesh Manipur Mizoram, আইএসবিএন ৯৭৮-৮১৭৮৩৫০৬৮৪
  4. Zoramdinthara, Mizo Fiction: Emergence and Development, আইএসবিএন ৯৭৮-৯৩-৮২৩৯৫-১৬-৪

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]