শিল্পকলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
হান্স রটেনহ্যমার, অ্যালগরি অব দ্য আর্টস (১৬শ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে)। জেমালদেগালেরি, বার্লিন।

শিল্পকলা (ইংরেজি: The arts) হল অনুভূতি বহিঃপ্রকাশের কোন উপায় বা প্রণালী, যা সাধারণত সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত এবং কালের আবর্তনে এটি সংস্কৃতিকেই পরিবর্তন করতে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, শিল্পকলা হল অভ্যন্তরীণ সৃজনশীল আবেগের একটি বাস্তব পরিস্ফুটন।[১][২] শিল্পকলার প্রধান শাখাসমূহ হল সাহিত্য - যার অন্তর্গত হল কবিতা, উপন্যাস, ছোটগল্প এবং মহাকাব্য; আনুষ্ঠানিক শিল্পকলা - যার অন্তর্গত হল সঙ্গীত, নৃত্য এবং মঞ্চনাটক; রন্ধন শিল্প যেমন পিঠা তৈরি, মিষ্টান্ন তৈরিপানীয় প্রস্তুতকরণ; গণমাধ্যম শিল্প যেমন ফটোগ্রাফিচিত্রগ্রহণ এবং ভিজুয়াল আর্ট যেমন লাবলু, চিত্রকর্ম, মৃৎশিল্প এবং ভাস্কর্য নির্মাণ। কিছু শিল্পে অভিনয় বা পরিবেশনার পাশাপাশি কোন দৃশ্যমান উপাদানের (যেমন চলচ্চিত্র) এবং লিখিত শব্দ বা বাক্যের (যেমন কমিক্স) সমন্বয় ঘটানো হয়।

প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্র থেকে আধুনিক সময়ে চলচ্চিত্র পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রেই শিল্প মানুষের সাথে তার পরিবেশের সম্পর্ককে গল্প বলার ছলে প্রকাশ করে গিয়েছে

দৃশ্যকলা[সম্পাদনা]

চিত্রাঙ্কন (রংচিত্র অঙ্কন)[সম্পাদনা]

বাংলাদেশী চিত্রশিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদের অঙ্কিত মুক্তিযোদ্ধা

কোনও ধারণা বা অনুভূতি নান্দনিকভাবে প্রকাশের জন্য কোনও সমতল পৃষ্ঠতলে তুলি, আঙুল বা অন্য কোনও সরঞ্জামের সাহায্যে এক বা একাধিক রঙ পাতলা স্তরের মতো প্রয়োগ করে বা লেপন করে শুকিয়ে চিত্র অঙ্কন করাকে রংচিত্র অঙ্কন বা সংক্ষেপে চিত্রাঙ্কন (Painting) বলে। রংচিত্র অঙ্কন এক ধরনের দ্বিমাত্রিক দৃশ্যকলা, অর্থাৎ এটির উল্লম্ব দৈর্ঘ্য ও অনুভূমিক প্রস্থ, শুধুমাত্র এই দুইটি মাত্রা রয়েছে এবং এটিকে চোখ তথা দর্শনেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপভোগ করতে হয়। রংচিত্র অঙ্কনে আকৃতি, রেখা, রঙ, রঙের আভা বা মাত্রা, বুনট, ইত্যাদি উপাদানগুলিকে বিভিন্ন পদ্ধতিতে ব্যবহার করে, এগুলিকে নির্দিষ্ট সজ্জায় বিন্যস্ত করে, এগুলির সমন্বয় সাধন করে ও এগুলিকে গ্রন্থনা করে (গেঁথে) কোনও দ্বিমাত্রিক সমতল পৃষ্ঠে আয়তন, শূন্যস্থান, চলন ও আলোর অনুভূতি ফুটিয়ে তোলা হয় এবং এভাবে কোনও বাস্তব বা পরাবাস্তব ঘটনা উপস্থাপন, কোনও কাহিনীর বিষয়বস্তুর ব্যাখা প্রদান, কিংবা সম্পূর্ণ বিমূর্ত দৃশ্যমান সম্পর্ক সৃষ্টির মত শৈল্পিক অভিব্যক্তিমূলক কাজ সম্পাদন করা হয়।

রংচিত্র অঙ্কন দ্বিমাত্রিক শৈল্পিক অভিব্যক্তির প্রাচীনতম রূপগুলির একটি। মানুষের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাচীন যে শিল্পকর্মগুলি পাওয়া গেছে, রংচিত্র তাদের মধ্যে অন্যতম। প্রাচীন সভ্যতাগুলিতে, যেমন মিশরের সভ্যতাতে রেখা দিয়ে বিভিন্ন আকৃতি এঁকে তার মধ্যে রঙ লেপন করে দেওয়া হত। গ্রিক সভ্যতার খুব কমসংখ্যক রংচিত্র এখনও টিকে আছে। রোমানরা গ্রিক শিল্প দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, যার প্রমাণ মেলে পোম্পেই এবং হার্কুলেনিয়ামের সুক্ষ্ম প্রাচীরচিত্রগুলিতে।

রংচিত্র অঙ্কন শৈল্পিক অভিব্যক্তির সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় রূপগুলিরও একটি। রংচিত্র অঙ্কনের বহু বিচিত্র শৈলী আছে, যা একেকজন চিত্রকরের নিজস্ব উদ্ভাবন। দর্শন ইন্দ্রিয়কে প্রভাবিতকারী বিভিন্ন ধর্ম, শৈল্পিক অভিব্যক্তি প্রকাশের সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা, ইত্যাদি ব্যাপারে রঙের মাধ্যম, অবলম্বন ও অঙ্কনের কৌশল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একজন চিত্রকর রঙের মাধ্যম ও অবলম্বন (support) বিশেষভাবে নির্বাচন করে ও তাঁর নিজস্ব চিত্রাঙ্কন কৌশল প্রয়োগ করে অদ্বিতীয় একটি দৃশ্যমান চিত্রকে বাস্তবে রূপদান করেন।

রংচিত্র অঙ্কনে যে সমতল পৃষ্ঠতলের উপরে রঙ লেপন করা হয়, তাকে ভূমি (Base) বলে। ভূমি যে বস্তুর পৃষ্ঠতল, সেই বস্তুকে অবলম্বন (Support) বলে। অতীতে নিশ্চল অবলম্বন যেমন প্রাচীর বা দেওয়ালের পৃষ্ঠে রংচিত্র অঙ্কন করা হত (প্রাচীরচিত্র বা ম্যুরাল Mural)। বর্তমানে রংচিত্র অঙ্কনে সাধারণত বহনযোগ্য অবলম্বন ব্যবহার করা হয়, যাকে সাধারণভাবে চিত্রকরের পাটা বা ইজেল (Easel) বলা হয়। বহনযোগ্য অবলম্বনকে আবার দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায় - প্রসারিত ও অপ্রসারিত। প্রসারিত অবলম্বন বলতে চিত্রকরের পাটার কাঠামোর উপরে টানটান করে বসানো বিশেষ মোটা কাপড় বা পট (ক্যানভাস) বোঝায়। অন্যদিকে অপ্রসারিত অবলম্বন হিসেবে কাঠের বা গুঁড়াকাঠের পাতলা তক্তা (প্যানেল), পলেস্তারা, কাগজ এমনকি কদাচিৎ ধাতুর পাতও ব্যবহার করা হয়। চিত্রাঙ্কনে ব্যবহৃত রঙের মূল উপাদান হল রঞ্জক পদার্থ (সাধারণত প্রাকৃতিক খনিজ পদার্থ থেকে প্রাপ্ত)। রঞ্জক পদার্থকে অন্য একটি মাতৃপদার্থে নিলম্বিত বা আবদ্ধ করে রঙ তৈরী করা হয়, যার সুবাদে রঞ্জক পদার্থটি চিত্রের পৃষ্ঠতলে বা ভূমিতে আটকে থাকে; এই মাতৃপদার্থকে রঙের মাধ্যম (Painting medium বা সংক্ষেপে Medium) বলে। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত রঙের মাধ্যম হল তেল, পানি, টেমপেরা (ডিমের কুসুম বা এ জাতীয় আঠালো প্রলেপসদৃশ পদার্থ), গুয়াশ (পানিতে দ্রবণীয় আঠা জাতীয় পদার্থবিশেষ), সদ্যোরঙ্গ (ফ্রেসকো), মিনা (এনামেল) ও অ্যাক্রিলিক (কৃত্রিম আঠালো প্রলেপ জাতীয় পদার্থ)। রঙের মাধ্যমভেদে রঞ্জক পদার্থের বিভিন্ন ধর্ম যেমন স্বচ্ছতা বা ঔজ্জ্বল্য কমবেশি হয়ে থাকে।

রংচিত্র অঙ্কনের সবচেয়ে প্রচলিত কিছু ধরন বা শ্রেণী হল সদ্যোরঙ্গ চিত্রাঙ্কন (ফ্রেস্কো Fresco), যেখানে পানিতে দ্রবণীয় রঙ ভেজা পলেস্তারায় লেপন করে শুকাতে দেওয়া হয়; তৈলচিত্র অঙ্কন, যেখানে রঞ্জক পদার্থ ধীরে ধীরে শুকাতে থাকা তেলের মধ্যে নিলম্বিত থাকে; টেম্পেরা চিত্র অঙ্কন, যেখানে রঞ্জক পদার্থ ডিমের কুসুম বা ঐরূপ আঠালো প্রলেপ জাতীয় পদার্থে নিলম্বিত থাকে; এবং জলরঙ চিত্র অঙ্কন, যেখানে রঞ্জক পদার্থ পানিতে নিলম্বিত থাকে।

রেখাঙ্কন[সম্পাদনা]

ভাস্কর্য[সম্পাদনা]

ফরাসি ভাস্কর ওগ্যুস্ত রোদাঁ'র সৃষ্ট ভাস্কর্য ল্য পঁসর "ভাবুক"

ভাস্কর্য নির্মাণ দৃশ্যকলার একটি শাখা যেখানে ঐতিহ্যগতভাবে শক্ত বা নমনীয় উপাদান-পদার্থকে নান্দনিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী আকার, আকৃতি ও আয়তন প্রদান করে ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করা হয়। ভাস্কর্য নির্মাণকারী শিল্পীকে ভাস্কর বলে এবং উৎপাদিত শিল্পকর্মটিকে ভাস্কর্য বলে। ঐতিহ্যগতভাবে ভাস্কর্য সাধারণত দুই ধরনের হয়। প্রথমত এটি নিরাবলম্ব ভাস্কর্য হতে পারে, অর্থাৎ কোনও অবলম্বন ছাড়া স্বাধীন ও স্বতন্ত্রভাবে দণ্ডায়মান একটি শিল্পকর্ম হতে পারে। দ্বিতীয়ত এটি উদ্গত ভাস্কর্য হতে পারে, অর্থাৎ এটি কোনও পৃষ্ঠতল থেকে বেরিয়ে আসতে পারে বা অবলম্বনরূপী কোনও পৃষ্ঠতলের উপরে বসানো হতে পারে। ভাস্কর্য এমনকি দর্শককে ঘিরে রাখা পরিপার্শ্বস্থ কোনও কিছু হতে পারে। ভাস্কর্য শিল্পে কাঁচামাল বা মাধ্যম হিসেবে বিভিন্ন ধরনের পদার্থ ব্যবহৃত হতে পারে, যেমন বিশেষ কাদামাটি, ধাতু, পাথর, কাঠ, মোম, হাতির দাঁত, অস্থি, কাপড়, কাচ, পলেস্তারা, রবার কিংবা বিচিত্র যেকোনও বস্তু। এই উপাদান পদার্থগুলিকে কেটে, কুঁদে, আকার প্রদান করে, ছাঁচে ঢেলে, আঘাত করে, চাপ দিয়ে, সুতায় গেঁথে, জোড়া লাগিয়ে, ধাতু গলিয়ে, একত্রে সন্নিবিষ্ট করে বা অন্য কোনও উপায়ে সংযুক্ত করা হয় ও আকার-আকৃতি-আয়তন দান করা হয়। একজন ভাস্কর অভিমুখ, প্রতিসাম্য, অনুপাত, মাপ, সন্ধি, ভারসাম্য, ইত্যাদি মূলনীতিগুলিকে কাজে লাগিয়ে ভাস্কর্য নির্মাণ করেন।

ভাস্কর্য থেকে চিত্রকর্মের পার্থক্য হল ভাস্কর্য অনেক বেশি বাস্তব ও জীবন্ত। চিত্রকর্মে আলো-ছায়া অঙ্কনের কৌশল ব্যবহার করে ত্রিমাত্রিক স্থানের যে দৃষ্টিভ্রম সৃষ্টি করা হয়, তা ভাস্কর্যশিল্পে সম্ভব নয়। কেননা ভাস্কর্যশিল্প সংজ্ঞা অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই ত্রিমাত্রিক। ভাস্কর্য একটি দৃশ্যকলাই শুধু নয়, অর্থাৎ এটি কেবল দর্শনেন্দ্রিয় নয়, বরং স্পর্শেন্দ্রিয় তথা ত্বকের দ্বারা স্পর্শ করেও উপভোগ করা সম্ভব। একজন অন্ধ ব্যক্তিও বিশেষ ধরনের ভাস্কর্য সৃষ্টি ও উপভোগ করতে পারেন। কেউ কেউ ভাস্কর্যকে মূলত স্পর্শনীয় কলা হিসেবেই গণ্য করা উচিত বলে মত দেন, কেন না ভাস্কর্য নির্মাণের সাথে স্পর্শের সরাসরি সম্পর্ক আছে। প্রতিটি মানুষ জন্ম থেকেই ত্রিমাত্রিক বিশ্বের বাসিন্দা বিধায় ত্রিমাত্রিক বিশ্বের বিভিন্ন কাঠামো ও এগুলিতে অন্তর্নিহিত অভিব্যক্তি উপলব্ধি করতে পারে ও প্রতিক্রিয়ামূলক আবেগ অনুভব করার ক্ষমতা রাখে। ভাস্কর্য শিল্পের উদ্দেশ্য মানুষের আবেগের এই জায়গাতে নাড়া দেওয়া ও একে পরিশীলিত করা। ভাস্কর্য প্রকৃতিতে বিদ্যমান কিংবা মানবনির্মিত অসংখ্য আকৃতিকে উৎস হিসেবে ব্যবহার করতে পারে, কিংবা সম্পূর্ণ উদ্ভাবনীমূলক কিছু হতে পারে। ভাস্কর্য জ্যামিতিক আকৃতির পাশাপাশি কোমল, কঠিন, স্থির, গতিময়, টানটান, প্রবহমান, আক্রমণাত্মক, স্বচ্ছন্দ ও নিরুদ্বেগ, ইত্যাদি বিভিন্ন অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারে।

২০শ শতকের আগে ভাস্কর্যকে একটি বাস্তবের প্রতিনিধিত্বমূলক শিল্প হিসেবে গণ্য করা হত, যখন মানুষের রূপ, প্রাণী, নির্জীব বস্তু ইত্যাদির প্রতিমামূলক বা মূর্তিমূলক ভাস্কর্য নির্মাণের চল ছিল। ২০শ শতক থেকে বাস্তবের প্রতিনিধি নয়, এমন সব বিমূর্ত ভাস্কর্য নির্মাণ শুরু হয়। বর্তমানে ভাস্কর্য কেবল স্থির নয়, চলমানও হতে পারে। ঐতিহ্যগতভাবে বস্তুপিণ্ড ছিল ভাস্কর্যের মূল উপাদান। কিন্তু আজ ভাস্কর্যের অভ্যন্তরীণ শূন্যস্থানকে শৈল্পিক দৃষ্টিকোণ থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়। এমনকি শুধুমাত্র শূন্যস্থানের শৈল্পিক বিন্যাসকেও ভাস্কর্য হিসেবে গণ্য করা হয়। এছাড়া বর্তমানে প্রক্ষিপ্ত আলো দিয়ে গঠিত পদার্থহীন ফাঁপাচিত্র (Hologram) জাতীয় ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্মও ভাস্কর্য হিসেবে স্বীকৃত। সমসাময়িক যুগে এসে ভাস্কর্যের সংজ্ঞা পালটে গেছে। বর্তমানে অভিব্যক্তি প্রকাশকারী ত্রিমাত্রিক যেকোনও শিল্পকর্মকে ভাস্কর্য বলা হয়।

মৃৎশিল্প[সম্পাদনা]

দুইটি ডালিম দিয়ে কারুকাজ করা থালা, পারস্য, ১৫শ শতক

স্থাপত্য[সম্পাদনা]

পার্থানন অ্যাথেন্সের আর্কোপলস পাহাড়ের উপর দেবী অ্যাথিনা কে উৎসর্গ করে ডরিক রীতিতে নির্মিত একটি মন্দির।

সাহিত্য কলা[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Collins English Dictionary
  2. Encyclopedia of Arts Education

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

আরও পড়ুন[সম্পাদনা]