মুহাম্মাদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
(মুহাম্মদ থেকে পুনর্নির্দেশিত)
এই নিবন্ধটি ইসলামের নবী সম্পর্কিত। মুহাম্মাদ নামের অন্যান্য ব্যক্তির জন্য, দেখুন মুহাম্মাদ (নাম)। অন্যান্য ব্যবহারের জন্য, দেখুন মুহাম্মাদ (দ্ব্যর্থতা নিরসন)
ইসলামিক নবী
মুহাম্মাদ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)[১]
Al-Masjid AL-Nabawi Door.jpg
আরবি ক্যালিগ্রাফিতে লিখিত
মুহাম্মাদের নাম
জন্ম মুহাম্মাদ ইবনে আ'ব্দাল্লাহ
(৫৭০-০৪-২৬)২৬ এপ্রিল ৫৭০
মক্কা, আরব (অধুনা মক্কা, মক্কা প্রদেশ, সৌদি আরব)
মৃত্যু ৮ জুন ৬৩২(৬৩২-০৬-০৮) (৬২ বছর)
ইয়াস্রিব (মদীনা), আরব (অধুনা মদিনা, হেজায, সৌদি আরব)
মৃত্যুর কারণ অসুস্থতা (প্রবল জ্বর)
সমাধি মসজিদে নববী এর সবুজ গম্বুজের নিচের সমাধিক্ষেত্র, স্থান:মদীনা, সৌদি আরব
স্থানাঙ্ক: ২৪°২৮′০৩.২২″ উত্তর ০৩৯°৩৬′৪১.১৮″ পূর্ব / ২৪.৪৬৭৫৬১১° উত্তর ৩৯.৬১১৪৩৮৯° পূর্ব / 24.4675611; 39.6114389 (Green Dome)
অন্য নাম আহমাদ,আবুল কাসিম, রাসূল, নবী
বংশোদ্ভূত আরব
ধর্ম ইসলাম
দম্পতি খাদিজা বিনতু খুওয়াইলিদ (৫৯৫-৬১৯)
সাওদা বিনতু জামা (৬১৯-৬৩২)
আয়িশা (৬১৯-৬৩২)
হাফসা বিনতু উমর (৬২৪-৬৩২)
জয়নব বিনতু খুযায়মা (৬২৫-৬২৭)
উম্মে সালামা হিন্দ বিনতু আবি উমাইয়া (৬২৯-৬৩২)
জয়নব বিনতু জাহশ (৬২৭-৬৩২)
জুওয়াইরিয়া বিনতু আল-হারিস (৬২৮-৬৩২)
রামালাহ বিনতু আবী-সুফিয়ান (৬২৮-৬৩২)
রায়হানা বিনতু জায়েদ (৬২৯-৬৩১)
সাফিয়া বিনতু হুওয়াই (৬২৯-৬৩২)
মাইমুনা বিনতু আল-হারিস (৬৩০-৬৩২)
মারিয়া আল-কিবতিয়া (৬৩০-৬৩২)
সন্তান পুত্রগণ: কাসিম, আব্দুল্লাহ, ইব্রাহিম
কন্যাগণ: জয়নব, রুকাইয়াহ, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা
পিতা-মাতা পিতা: আব্দুল্লাহ
মাতা: আমিনা
আত্মীয় আলী, উমর, আবু বকর, আবু সুফিয়ান
স্বাক্ষর
মিশরের মুকাউয়িসকে লিখিত চিঠিতে মুহাম্মাদের গোলাকার সীলমোহর (১৯০৪ সালে অঙ্কিত মূল চিঠির অনুলিপন)[২]
মুহাম্মাদ
উপরে উল্লেখিত বিষয়ের উপর ধারেবাহিকের একটি অংশ
Muhammad

মুহাম্মাদ[৩]) (২৬ এপ্রিল ৫৭০ - ৮ জুন ৬৩২;[৩] আরবি উচ্চারণ শুনতে ক্লিক করুন محمد মোহাম্মদ এবং মুহম্মদও বলা হয়), (তুর্কী: মুহাম্মেদ), পূর্ণ নামঃ আবু আল-কাশিম মুহাম্মাদ ইবনে ʿআব্দ আল্লাহ ইবনে ʿআব্দ আল-মুত্তালিব ইবনে হাশিম (ابو القاسم محمد ابن عبد الله ابن عبد المطلب ابن هاشم)ইসলামের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব এবং ইসলামী বিশ্বাসমতে আল্লাহ বা ঈশ্বর কর্তৃক প্রেরিত সর্বশেষ নবী[৪][n ১][n ২] (আরবি: النبي আন-নাবিয়্যু‎) তথা "বার্তাবাহক" (আরবি: الرسول আর-রাসুল) যাঁর উপর আল কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে। অমুসলিমদের মতে তিনি ইসলামী জীবন ব্যবস্থার প্রবর্তক[৫]। অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা ও বিশেষজ্ঞদের মতে[৬][৭] মুহাম্মাদ ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় নেতা[৮][৯][১০][১১][১২] । তার এই বিশেষত্বের অন্যতম কারণ হচ্ছে আধ্যাত্মিক ও জাগতিক উভয় জগতেই চূড়ান্ত সফলতা অর্জন। তিনি ধর্মীয় জীবনে যেমন সফল তেমনই রাজনৈতিক জীবনে। সমগ্র আরব বিশ্বের জাগরণের পথিকৃৎ হিসেবে তিনি অগ্রগণ্য। বিবাদমান আরব জনতাকে একীভূতকরণ তার জীবনের অন্যতম সফলতা।

পরিচ্ছেদসমূহ

মুহাম্মাদের জন্মের পূর্বে আরবের অবস্থা[সম্পাদনা]

তৎকালীন আরব অর্থনীতির মূল ভিত্তি ছিল ব্যবসায় ও পশুপালন। নোমেডীয় অঞ্চলের সাথে এখানকার বাণিজ্য যোগাযোগ ছিল। আরব বলতে এখানে মক্কামদিনা এবং এদের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলগুলো নিয়ে গড়ে ওঠা অংশকে বুঝানো হচ্ছে, এই অংশের সাথেই মুহাম্মাদের জীবনের সাক্ষাৎ সম্পৃক্ততা ছিল।

মুহাম্মাদের জীবনের উপর তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

মুহাম্মাদের উপর অনেক জীবনীকার জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন। তাঁর জীবনীগ্রন্থকে সাধারণভাবে "সিরাত" গ্রন্থ বলে। মুহাম্মাদের ইন্তেকালের পর থেকে অনেক মুসলিম ও অমুসলিম তাঁর জীবনীগ্রন্থ লিখেছেন। এর মাঝে উল্লেখযোগ্য নামগুলি হলো মহানবীর সর্বাধিক প্রাচীনতম নির্ভরযোগ্য জীবনী সংকলন সীরাতে ইবনে ইসহাক এবং তা হতে সম্পাদিত সীরাতে ইবনে হিশাম, আল তাবারী রচিত "সীরাতে রাসূলাল্লাহ", ইবনে কাসীর রচিত "আল-সীরাত আল-নববিয়াত", মার্টিন লিংসের "মুহাম্মদ: হিজ লাইফ বেজড অন দ্য আর্লিয়েস্ট সোর্সেস", ক্যারেন আর্মর্স্ট্রং রচিত "মুহাম্মদ: এ বায়োগ্রাফি অব দ্য প্রফেট" এবং "মুহাম্মদ: এ প্রফেট অব আওয়ার টাইম", মার্মাডিউক পিকথাল রচিত "আল আমীন: এ বায়োগ্রাফি অব প্রফেট মুহাম্মদ", সাম্প্রতিককালে রচিত আর্-রাহীকুল মাখতূম, বাংলা ভাষায় গোলাম মোস্তফা রচিত বিশ্বনবী, এয়াকুব আলী চৌধুরীনুরনবী প্রভৃতি।

ইসলামী চরিতাভিধান অনুসারে জীবনী[সম্পাদনা]

জন্ম[সম্পাদনা]

মুহাম্মাদ বর্তমান সৌদি আরবে অবস্থিত মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশের বনু হাশিম গোত্রে জন্মগ্রহণ করেন[১৩][১৪]। প্রচলিত ধারনা মোতাবেক, তার জন্ম ৫৭০ খ্রিস্টাব্দের ১২ই রবিউল আওয়াল বা আরবি রবিউল আওয়াল মাসের ১২ তারিখ।[১৫]। প্রখ্যাত ইতিহাসবেত্তা মন্টগোমারি ওয়াট তাঁর পুস্তকে ৫৭০ সাল উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁর প্রকৃত জন্মতারিখ উদঘাটন সম্ভবপর নয়। তাছাড়া মুহাম্মদ নিজে কোনো মন্তব্য করেছেন বলে নির্ভরযোগ্য কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি। এজন্যই এ নিয়ে ব্যাপক মতবিরোধ রয়েছে। এমনকি জন্মমাস নিয়েও ব্যপক মতবিরোধ পাওয়া যায়। যেমন, একটি বর্ণনায় তাঁর জন্ম ৫৭১ সালের ৯ই রবিউলআওয়ালএপ্রিল ২৬সাইয়েদ সোলাইমান নদভী, সালমান মনসুরপুরী এবং মোহাম্মদ পাশা ফালাকির গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তবে নবীর জন্মের বছরেই হস্তী যুদ্ধের ঘটনা ঘটে[১৬][১৭] এবং সে সময় সম্রাট নরশেরওয়ার সিংহাসনে আরোহনের ৪০ বছর পূর্তি ছিল এ নিয়ে কারো মাঝে দ্বিমত নেই।

শৈশব ও কৈশোর কাল[সম্পাদনা]

মুহাম্মাদের পিতা আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব তাঁর জন্মের প্রায় ছয় মাস পূর্বে পরলোকগমণ করেন[১৮]। তত্কালীন আরবের রীতি ছিল যে তারা মরুভূমির মুক্ত আবহাওয়ায় বেড়ে উঠার মাধ্যমে সন্তানদের সুস্থ দেহ এবং সুঠাম গড়ন তৈরির জন্য জন্মের পরপরই দুধ পান করানোর কাজে নিয়োজিত বেদুইন মহিলাদের কাছে দিয়ে দিতেন এবং নির্দিষ্ট সময় পর আবার ফেরত নিতেন[১৯]। এই রীতি অনুসারে মুহাম্মদকেও হালিমা বিনতে আবু জুয়াইবের (অপর নাম হালিমা সাদিয়া) হাতে দিয়ে দেয়া হয়[২০]। এই শিশুকে ঘরে আনার পর দেখা যায় হালিমার সচ্ছলতা ফিরে আসে এবং তারা শিশুপুত্রকে সঠিকভাবে লালনপালন করতে সমর্থ হন। তখনকার একটি ঘটনা উল্লেখযোগ্য - শিশু মুহাম্মদ কেবল হালিমার একটি স্তনই পান করতেন এবং অপরটি তার অপর দুধভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। দুই বছর লালনপালনের পর হালিমা শিশু মুহাম্মদকে আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। কিন্তু এর পরপরই মক্কায় মহামারী দেখা দেয় এবং শিশু মুহাম্মাদকে হালিমার কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। হালিমাও চাচ্ছিলেন শিশুটিকে ফিরে পেতে। এতে তার আশা পূর্ণ হল। ইসলামী বিশ্বাসমতে এর কয়েকদিন পরই একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে - একদিন শিশু নবীর বুক চিরে কলিজার একটি অংশ বের করে তা জমজম কূপের পানিতে ধুয়ে আবার যথাস্থানে স্থাপন করে দেয়া হয় ফেরেশতা জিব্রিল ও ফেরেশতা মিকাইল।এই ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে সিনা চাকের ঘটনা হিসেবে খ্যাত।

এই ঘটনার পরই হালিমা মুহাম্মাদকে মা আমিনার কাছে ফিরিয়ে দেন। ছয় বছর বয়স পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত তিনি মায়ের সাথে কাটান। এই সময় একদিন আমিনার ইচ্ছা হয় ছেলেকে নিয়ে মদীনায় যাবেন। সম্ভবত কোন আত্মীয়ের সাথে দেখা করা এবং স্বামীর কবর জিয়ারত করাই এর কারণ ছিল। আমিনা ছেলে, শ্বশুর এবং দাসী উম্মে আয়মনকে নিয়ে ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মদীনায় পৌছেন। তিনি মদীনায় একমাস সময় অতিবাহিত করেন। একমাস পর মক্কায় ফেরার পথে আরওয়া নামক স্থানে এসে তিনি গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন[২০][২১]। মাতার মৃত্যুর পর দাদা আবদুল মোত্তালেব শিশু মুহাম্মাদকে নিয়ে মক্কায় পৌঁছেন। এর পর থেকে দাদাই মুহাম্মাদের দেখাশোনা করতে থাকেন[২০][১৭]। মুহাম্মদের বয়স যখন ৮ বছর ২ মাস ১০ দিন তখন তার দাদাও মারা যান। মৃত্যুর আগে তিনি তার পুত্র আবু তালিবকে মোহাম্মদের দায়িত্ব দিয়ে যান।

আবু তালিব ব্যবসায়ী ছিলেন এবং আরবদের নিয়ম অনুযায়ী বছরে একবার সিরিয়া সফরে যেতেন। মুহাম্মাদের বয়স যখন ১২ বৎসর তখন তিনি চাচার সাথে সিরিয়া যাওয়ার জন্য বায়না ধরলেন। প্রগাঢ় মমতার কারণে আবু তালিব আর নিষেধ করতে পারলেননা। যাত্রাপথে বসরা পৌছার পর কাফেলাসহ আবু তালিব তাবু ফেললেন। সে সময় আরব উপদ্বীপের রোম অধিকৃত রাজ্যের রাজধানী বসরা অনেক দিক দিয়ে সেরা ছিল। কথিত আছে, শহরটিতে জারজিস সামে এক খ্রিস্টান পাদ্রী ছিলেন যিনি বুহাইরা বা বহিরা নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি তার গীর্জা হতে বাইরে এসে কাফেলার মুসাফিরদের মেহমানদারী করেন। এ সময় তিনি বালক মুহাম্মাদকে দেখে শেষ নবী হিসেবে চিহ্নিত করেন.[২২]। ফুজ্জারের যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন নবীর বয়স ১৫ বছর। এই যুদ্ধে তিনি স্বয়ং অংশগ্রহণ করেন। যুদ্ধের নির্মমতায় তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হন। কিন্তু তাঁর কিছু করার ছিলনা। সে সময় থেকেই তিনি কিছু একটি করার চিন্তাভাবনা শুরু করেন। তাঁর উত্তম চরিত্র ও সদাচরণের কারণে পরিচিতমহলে সবাই তাকে "আল-আমিন" (আরবিঃ الامين, অর্থঃ "বিশ্বস্ত, বিশ্বাসযোগ্য, আস্থাভাজন") "আল-সিদ্দিক" (অর্থঃ "সত্যবাদীl") বলে সম্বোধন করতেন।[২৩][১৪][৬][২৪]

নবুয়ত-পূর্ব জীবন[সম্পাদনা]

ইসলাম ধর্ম প্রচারের প্রাথমিক দশায় আরবের মানচিত্র

আরবদের মধ্যে বিদ্যমান হিংস্রতা, খেয়ানতপ্রবণতা এবং প্রতিশোধস্পৃহা দমনের জন্যই হিলফুল ফুজুল নামক একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মাদ এতে যোগদান করেন এবং এই সংঘকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে তিনি বিরাট ভূমিকা রাখেন। বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা যায় তরুণ বয়সে মুহাম্মাদের তেমন কোন পেশা ছিলনা। তবে তিনি বকরি চরাতেন বলে অনেকেই উল্লেখ করেছেন। সাধারণত তিনি যে বকরিগুলো চরাতেন সেগুলো ছিল বনি সা'দ গোত্রের। কয়েক কিরাত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে তিনি মক্কায় বসবাসরত বিভিন্ন ব্যক্তির বকরিও চরাতেন। এরপর তিনি ব্যবসায় শুরু করেন। মুহাম্মাদ অল্প সময়ের মধ্যেই একাজে ব্যাপক সফলতা লাভ করেন। এতই খ্যাতি তিনি লাভ করেন যে তাঁর উপাধি হয়ে যায় আল আমিন এবং আল সাদিক যেগুলোর বাংলা অর্থ হচ্ছে যথাক্রমে বিশ্বস্ত এবং সত্যবাদী। ব্যবসায় উপলক্ষ্যে তিনি সিরিয়া, বসরা, বাহরাইন এবং ইয়েমেনে বেশ কয়েকবার সফর করেন। মুহাম্মাদের সুখ্যাতি যখন চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তখন খাদীজা বিনতে খুওয়াইলিদ তা অবহিত হয়েই তাকে নিজের ব্যবসার জন্য সফরে যাবার অনুরোধ জানান। মুহাম্মাদ এই প্রস্তাব গ্রহণ করেন এবং খাদীজার পণ্য নিয়ে সিরিয়ার অন্তর্গত বসরা পর্যন্ত যান।

খাদীজা মাইছারার মুখে মুহাম্মাদের সততা ও ন্যায়পরায়ণতার ভূয়সী প্রশংশা শুনে অভিভূত হন। এছাড়া ব্যবসায়ের সফলতা দেখে তিনি তাঁর যোগ্যতা সম্বন্ধেও অবহিত হন। এক পর্যায়ে তিনি মুহাম্মাদকে বিবাহ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি স্বীয় বান্ধবী নাফিসা বিনতে মুনব্বিহরের কাছে বিয়ের ব্যাপরে তার মনের কথা ব্যক্ত করেন। নাফিসার কাছে শুনে মুহাম্মাদ বলেন যে তিনি তাঁর অভিভাবকদের সাথে কথা বলেন জানাবেন। মুহাম্মাদ তাঁর চাচাদের সাথে কথা বলে বিয়ের সম্মতি জ্ঞাপন করেন। বিয়ের সময় খাদীজার বয়স ছিল ৪০ আর মুহাম্মাদের বয়স ছিল ২৫। খাদীজার জীবদ্দশায় তিনি আর কোন বিয়ে করেননি। খাদীজার গর্ভে মুহাম্মাদের ৬ জন সন্তান জন্মগ্রহণ করে যার মধ্যে ৪ জন মেয়ে এবং ২ জন ছেলে। তাদের নাম যথাক্রমে কাসেম, যয়নাব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম', ফাতিমা এবং আবদুল্লাহ। ছেলে সন্তান দুজনই শৈশবে মারা যায়। মেয়েদের মধ্যে সবাই ইসলামী যুগ পায় এবং ইসলাম গ্রহণ করে এবং একমাত্র ফাতিমা ব্যতিত সবাই নবীর জীবদ্দশাতেই মৃত্যুবরণ করে।

মুহাম্মাদের বয়স যখন ৩৫ বছর তখন কা'বা গৃহের পূনঃনির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। বেশ কয়েকটি কারণে কাবা গৃহের সংস্কার কাজ শুরু হয়। পুরনো ইমারত ভেঙে ফেলে নতুন করে তৈরি করা শুরু হয়। এভাবে পুনঃনির্মানের সময় যখন হাজরে আসওয়াদ (পবিত্র কালো পাথর) পর্যন্ত নির্মাণ কাজ শেষ হয় তখনই বিপত্তি দেখা দেয়। মূলত কোন গোত্রের লোক এই কাজটি করবে তা নিয়েই ছিল কোন্দল। নির্মাণকাজ সব গোত্রের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু হাজরে আসওয়াদ স্থাপন ছিল একজনের কাজ। কে স্থাপন করবে এ নিয়ে বিবাদ শুরু হয় এবং চার-পাঁচ দিন যাবৎ এ বিবাদ অব্যাহত থাকার এক পর্যায়ে এটি এমনই মারাত্মক রূপ ধারণ করে যে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত ঘটার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এমতাবস্থায় আবু উমাইয়া মাখজুমি একটি সমাধান নির্ধারণ করে যে পরদিন প্রত্যুষে মসজিদে হারামের দরজা দিয়ে যে প্রথম প্রবেশ করবে তার সিদ্ধান্তই সবাই মেনে নেবে। পরদিন মুহাম্মাদ সবার প্রথমে কাবায় প্রবেশ করেন। এতে সবাই বেশ সন্তুষ্ট হয় এবং তাকে বিচারক হিসেবে মেনে নেয়। আর তার প্রতি সবার সুগভীর আস্থাও ছিল। যা হোক এই দায়িত্ব পেয়ে মুহাম্মাদ অত্যন্ত সুচারুভাবে ফয়সালা করেন। তিনি একটি চাদর বিছিয়ে তার উপর নিজ হাতে হাজরে আসওয়াদ রাখেন এবং বিবদমান প্রত্যেক গোত্রের নেতাদের ডেকে তাদেরকে চাদরের বিভিন্ন কোণা ধরে যথাস্থানে নিয়ে যেতে বলেন এবং তারা তা ই করে। এরপর তিনি পাথর উঠিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপন করেন।

একাদশ শতাব্দীর পারসিয়ান কুরআনের একটি পৃষ্ঠা

নবুওয়ত প্রাপ্তি[সম্পাদনা]

ইসলামিক তথ্যসূত্রানুসারে চল্লিশ বছর বয়সে ইসলামের নবী মুহাম্মাদ নবুওয়ত লাভ করেন, অর্থাৎ এই সময়েই সৃষ্টিকর্তা তাঁর কাছে বানী প্রেরণ করেন। আজ-জুহরি বর্ণিত হাদীসে অনুসারে মুহাম্মাদ সত্য দর্শনের মাধ্যমে ওহী লাভ করেন। ত্রিশ বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পর মুহাম্মাদ প্রায়ই মক্কার অদূরে হেরা গুহায় ধ্যানমগ্ন অবস্থায় কাটাতেন। তাঁর স্ত্রী খাদিজা নিয়মিত তাঁকে খাবার দিয়ে আসতেন। হাদীসের বর্ননা অনুযায়ী এমনি একদিন ধ্যানের সময় ফেরেশতা জিব্রাইল তার কাছে আল্লাহ প্রেরিত বানী নিয়ে আসেন এবং তাকে এই পংক্তি কটি পড়তে বলেন:

পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তার নামে যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিন্ড থেকে। পাঠ করুন, আপনার পালনকর্তা মহা দয়ালু, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন, শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।[২৫]

উত্তরে মুহাম্মাদ জানান যে তিনি পড়তে জানেন না, এতে জিব্রাইল তাঁকে জড়িয়ে ধরে প্রবল চাপ প্রয়োগ করেন এবং আবার একই পংক্তি পড়তে বলেন। কিন্তু এবারও মুহাম্মাদ নিজের অপারগতার কথা প্রকাশ করেন। এভাবে তিনবার চাপ দেয়ার পর মুহাম্মাদ পংক্তিটি পড়তে সমর্থ হন। মুসলিমদের ধারনা অনুযায়ী এটিই কুরআনের প্রথম আয়াত গুচ্ছ; সূরা আলাকের প্রথম পাঁচ আয়াত। বর্ননায় আরোও উল্লেখ আছে প্রথম বানী লাভের পর মুহাম্মাদ এতই ভীত হয়ে পড়েন যে কাঁপতে কাঁপতে নিজ গ্রহে প্রবেশ করেই খাদিজাকে কম্বল দিয়ে নিজের গা জড়িয়ে দেয়ার জন্য বলেন। বারবার বলতে থাকেন, "আমাকে আবৃত কর"। খাদিজা নবীর সকল কথা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করেন এবং তাঁকে নবী হিসেবে মেনে নেন। ভীতি দূর করার জন্য মুহাম্মাদকে নিয়ে খাদিজা নিজ চাচাতো ভাই ওয়ারাকা ইবন নওফেলের কাছে যান[২৬]। নওফেল তাঁকে শেষ নবী হিসেবে আখ্যায়িত করে।[২৭][২৭] ধীরে ধীরে আত্মস্থ হন নবী। তারপর আবার অপেক্ষা করতে থাকেন পরবর্তী প্রত্যাদেশের জন্য। একটি লম্বা বিরতির পর তাঁর কাছে দ্বিতীয় বারের মত স্রষ্টার বানী আসে। এবার অবতীর্ণ হয় সূরা মুদ্দাস্‌সির-এর কয়েকটি আয়াত। এর পর থেকে গোপনে ইসলাম প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন মুহাম্মাদ।

মক্কী জীবন[সম্পাদনা]

হেরা গুহা, এখানেই মুহাম্মাদ প্রথম প্রত্যাদেশ পান

গোপন প্রচার[সম্পাদনা]

প্রত্যাদেশ অবতরণের পর মুহাম্মাদ বুঝতে পারেন যে, এটি প্রতিষ্ঠা করতে হলে তাকে পুরো আরব সমাজের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়াতে হবে; কারণ তৎকালীন নেতৃত্বের ভীত ধ্বংস করা ব্যতীত ইসলাম প্রচার ও প্রতিষ্ঠার অন্য কোন উপায় ছিলনা। তাই প্রথমে তিনি নিজ আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের মাঝে গোপনে ইসলামের বাণী প্রচার শুরু করেন। মুহাম্মাদের আহ্বানে ইসলাম গ্রহণকারী প্রথম ব্যক্তি ছিলেন তার সহধর্মিণী খাদিজা। এরপর মুসলিম হন মুহাম্মাদের চাচাতো ভাই এবং তাঁর ঘরেই প্রতিপালিত কিশোর আলী, ইসলাম গ্রহণের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১০ বছর। ইসলামের বাণী পৌছে দেয়ার জন্য নবী নিজ বংশীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি সভা করেন; এই সভায় কেউই তাঁর আদর্শ মেনে নেয়নি, এ সভাতে শুধু একজনই ইসলাম গ্রহণ করে, সে হলো আলী। ইসলাম গ্রহণকারী তৃতীয় ব্যক্তি ছিল নবীর অন্তরঙ্গ বন্ধু আবু বকর। এভাবেই প্রথম পর্যায়ে তিনি ইসলাম প্রচারের কাজ শুরু করেন। এবং এই প্রচারকাজ চলতে থাকে সম্পূর্ণ গোপনে।

প্রকাশ্য দাওয়াত[সম্পাদনা]

তিন বছর গোপনে দাওয়াত দেয়ার পর মুহাম্মাদ প্রকাশ্যে ইসলামের প্রচার শুরু করেন। এ ধরণের প্রচারের সূচনাটা বেশ নাটকীয় ছিল। মুহাম্মাদ সাফা পর্বতের ওপর দাড়িয়ে চিৎকার করে সকলকে সমবেত করেন। এরপর প্রকাশ্যে বলেন যে, "আল্লাহ ছাড়া কোন প্রভু নেই এবং মুহাম্মাদ আল্লাহ্‌র রাসূল"। কিন্তু এতে সকলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রচণ্ড খেপে যায়।

মক্কায় বিরোধিতার সম্মুখীন[সম্পাদনা]

মুহাম্মাদের বিরুদ্ধবাদীরা কয়েকটি স্তরে তাঁর উপর নির্যাতন শুরু করেঃ প্রথমত উস্কানী ও উত্তেজনার আবহ সৃষ্টি, এরপর অপপ্রচার, কুটতর্ক এবং বিপরীত যুক্তি। এগুলোতেও কাজ না হওয়াতে এক সময় ইসলামের প্রচারকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা শুরু হয় এবং তা পরিচালনা করার নেয়ার জন্য একটি অপপ্রচার গোষ্ঠী গড়ে তোলা হয়। একই সাথে তৎকালীন আরব কবি ও চাটুকারদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় মনোরঞ্জক সাহিত্য ও গান-বাজনার দল, এমনকি এক পর্যায়ে মুহাম্মাদের সাথে আপোষেরও প্রচেষ্টা চালায় কুরাইশরা। কিন্তু মুহাম্মাদ তা মেনে নেননি; কারণ আপোষের শর্ত ছিল প্রচারবিহীনভাবে ইসলাম পালন করা অথবা বহুঈশ্বরবাদী পৌত্তলিকতাকে সাথে নিয়ে ইসলাম প্রচার করা, অথচ প্রতিমাবিহীন একেশ্বরবাদের দিকে মানুষকে ডাকাই ছিল তার ধর্ম প্রচারের সর্বপ্রথম ঐশী দ্বায়িত্ব।

ইথিওপিয়ায় হিজরত[সম্পাদনা]

ধীরে ধীরে যখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতা চরম রূপ ধারণ করে, তখন নবী কিছু সংখ্যক মুসলিমকে আবিসিনিয়ায় হিজরত করতে পাঠান। সেখান থেকেও কুরাইশরা মুসলিমদের ফেরত আনার চেষ্টা করে, যদিও তৎকালীন আবিসিনিয়ার সম্রাট নাজ্জাশীর কারণে তা সফল হয়নি।

গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের ইসলাম গ্রহণ[সম্পাদনা]

এরপর ইসলামের ইতিহাসে যে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটি ঘটে তা হল নবীজী (সাঃ) এর চাচা হামযা এবং কুরাইশ নেতা উমর ইবনুল খাত্তাবের ইসলাম গ্রহণ। মুহাম্মাদ সবসময় চাইতেন যেন আবু জেহেল ও উমরের মধ্যে যেকোন একজন অন্তত ইসলাম গ্রহণ করে। তাঁর এই ইচ্ছা এতে পূর্ণতা লাভ করে। আরব সমাজে উমরের বিশেষ প্রভাব থাকায় তাঁর ইসলাম গ্রহণ ইসলাম প্রচারকে খানিকটা সহজ করে, যদিও কঠিন অংশটিই তখনও মুখ্য বলে বিবেচিত হচ্ছিল। এরপূর্বে মুহাম্মাদের চাচা হামযা ইসলাম গ্রহণ করেন। তার ইসলাম গ্রহণে আরবে মুসলিমদের আধিপত্য কিছুটা হলেও প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে ওমরের ইসলাম গ্রহণে তা আরও মজবুত হয় এবং নবীজী (সাঃ) সহ সকল মুসলিমগণ ওমরের কাছ থেকে সার্বিক নিরাপত্তা দানের আশ্বাস পেয়ে তখন থেকে ওমরের সাথে কাবা প্রাঙ্গনে প্রকাশ্যে উপাসনা করা শুরু করেন|

একঘরে অবস্থা[সম্পাদনা]

এভাবে ইসলাম যখন শ্লথ গতিতে এগিয়ে চলছে তখন মক্কার কুরাইশরা মুহাম্মাদ ও তার অনুসারী সহ সহ গোটা বনু হাশেম গোত্রকে একঘরে ও আটক করে। তিন বছর আটক থাকার পর তারা মুক্তি পায়।

দুঃখের বছর ও তায়েফ গমন[সম্পাদনা]

কিন্তু মুক্তির পরের বছরটি ছিল মুহাম্মাদের জন্য দুঃখের বছর। কারণ এই বছরে খুব স্বল্প সময়ের ব্যবধানে তার স্ত্রী খাদিজা ও চাচা আবু তালিব মারা যায়। দুঃখের সময়ে নবী মক্কায় ইসলামের প্রসারের ব্যাপরে অনেকটাই হতাশ হয়ে পড়েন। হতাশ হয়ে তিনি মক্কা বাদ দিয়ে এবার ইসলাম প্রচারের জন্য তায়েফ যান (অবশ্য তায়েফ গমনের তারিখ নিয়ে মতভেদ রয়েছে)। কিন্তু সেখানে ইসলাম প্রচার করতে গিয়ে তিনি চূড়ান্ত অপমান, ক্রোধ ও উপহাসের শিকার হন। এমনকি তায়েফের লোকজন তাদের কিশোর-তরুণদেরকে মুহাম্মাদের পিছনে লেলিয়ে দেয়; তারা ইট-প্রস্তরের আঘাতে নবীকে রক্তাক্ত করে দেয়। কিন্তু তবুও তিনি হাল ছাড়েননি; নব নব সম্ভবনার কথা চিন্তা করতে থাকেন।

মি'রাজ বা উর্দ্ধারোহন[সম্পাদনা]

ইসলামী ভাষ্যমতে মুহাম্মাদ এক রাতে মক্কায় অবস্থিত মসজিদুল হারাম থেকে জেরুজালেমে অবস্থিত মসজিদুল আকসায় যান; এই ভ্রমণ ইসলামে ইসরা নামে পরিচিত। কথিত আছে, মসজিদুল আকসা থেকে তিনি একটি বিশেষ যানে করে উর্দ্ধারোহণ করেন এবং মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করেন এবং এ সময় তিনি বেহেশ্‌তদোযখ সহ মহাবিশ্বের সকল স্থান অবলোকন করেন। এই যাত্রা মুসলমানদের কাছে মি'রাজ নামে পরিচিত। ইসলামী সূত্রানুসারে এই সম্পূর্ণ যাত্রার সময়ে পৃথিবীতে কোন সময়ই অতিবাহিত হয়নি বলে ধারনা করা হয়|

মদীনায় হিজরত[সম্পাদনা]

মসজিদ-এ-নববী

মুহাম্মাদের আহ্বানে মক্কায় বেশকিছু লোক ইসলামের প্রতি উৎসাহী হয়ে ইসলাম গ্রহণ করে। তারা মূলত হজ্জ্ব করতে এসে ইসলামে দাওয়াত পেয়েছিল। এরা আকাব নামক স্থানে মুহাম্মাদের কাছে শপথ করে যে তারা যে কোন অবস্থায় তাদের নবী মুহাম্মাদকে রক্ষা করবে এবং ইসলামে প্রসারে কাজ করবে। এই শপথগুলো আকাবার শপথ নামে সুপরিচিত। এই শপথগুলোর মাধ্যমেই মদীনায় ইসলাম প্রতিষ্ঠার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং একসময় মদীনার ১২ টি গোত্রের নেতারা একটি প্রতিনিধিদল প্রেরণের মাধ্যমে মুহাম্মাদকে মদীনায় আসার আমন্ত্রণ জানায়[২৮][২৯] । মদীনা তথা ইয়াসরিবে অনেক আগে থেকে প্রায় ৬২০ সাল পর্যন্ত গোত্র গোত্র এবং ইহুদীদের সাথে অন্যদের যুদ্ধ লেগে থাকে। বিশেষত বুয়াছের যুদ্ধে সবগুলো গোত্র যুদ্ধে অংশ নেয়ায় প্রচুর রক্তপাত ঘটে[২৮]। এ থেকে মদীনার লোকেরা বুঝতে সমর্থ হয়েছিল যে, রক্তের বিনিময়ে রক্ত নেয়ার নীতিটি এখন আর প্রযোজ্য হতে পারেনা। এজন্য তাদের একজন নেতা দরকার যে সবাইকে একতাবদ্ধ করতে পারবে। এ চিন্তা থেকেই তারা মুহাম্মাদকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল[৬], যদিও আমন্ত্রণকারী অনেকেই তখনও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। এই আমন্ত্রণে মুসলিমরা মক্কা থেকে হিজরত করে মদীনায় চলে যায়। সবশেষে মুহাম্মাদ ও আবু বকর ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মদীনায় হিজরত করেন[৩০][৩১]। তাদের হিজরতের দিনেই কুরাইশরা মুহাম্মাদকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল যদিও তা সফল হয়নি। এভাবেই মক্কী যুগের সমাপ্তি ঘটে। যারা মুহাম্মাদের সাথে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেছিল তারা "মুজাহিরুন" নামে পরিচিত হয়ে উঠল। [৬]

মাদানী জীবন[সম্পাদনা]

নিজ গোত্র ছেড়ে অন্য গোত্রের সাথে যোগদান আরবে অসম্ভব হিসেবে পরিগণিত হত। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে সেরকম নয়, কারণ এক্ষেত্রে ইসলামের বন্ধনই শ্রেষ্ঠ বন্ধন হিসেবে মুসলিমদের কাছে পরিগণিত হত। এটি তখনকার যুগে একটি বৈপ্লবিক চিন্তার জন্ম দেয়। ইসলামী পঞ্জিকায় হিজরতের বর্ষ থেকে দিন গণনা শুরু হয়। এজন্য ইসলামী পঞ্জিকার বর্ষের শেষে AH উল্লেখিত থাকে যার অর্থ: After Hijra।

স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও সংবিধান প্রণয়ন[সম্পাদনা]

মুহাম্মাদ মদীনায় গিয়েছিলেন একজন মধ্যস্থতাকারী এবং শাসক হিসেবে। তখন বিবদমান দুটি মূল পক্ষ ছিল বনু আওসবনু খাজরাজ। তিনি তার দায়িত্ব সুচারুরুপে পালন করেছিলেন। মদীনার সকল গোত্রকে নিয়ে ঐতিহাসিক মদীনা সনদ স্বাক্ষর করেন যা পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম সংবিধান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকে। এই সনদের মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যে সকল রক্তারক্তি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এমনকি এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতির গোড়াপত্তন করা হয় এবং সকল গোত্রের মধ্যে জবাবদিহিতার অনুভুতি সৃষ্টি করা হয়। আওস, খাযরাজ উভয় গোত্রই ইসলাম গ্রহণ করেছিল। এছাড়াও প্রধানত তিনটি ইহুদী গোত্র (বনু কাইনুকা, বনু কুরাইজা এবং বনু নাদির)। এগুলোসহ মোট আটটি গোত্র এই সনদে স্বাক্ষর করেছিল। এই সনদের মাধ্যমে মদীনা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মুহাম্মাদ হন তার প্রধান।

মক্কার সাথে বিরোধ ও যুদ্ধ[সম্পাদনা]

মুহাম্মাদ (সা:) এর নাম(محمد) লিখা একটি আরবি লিপি

মদীনায় রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরপরই মক্কার সাথে এর সম্পর্ক দিন দিন খারাপ হতে থাকে। মক্কার কুরাইশরা মদীনা রাষ্ট্রের ধ্বংসের জন্য যুদ্ধংদেহী মনোভাব পোষণ করতে থাকে। মুহাম্মাদ মদীনায় এসে আশেপাশের সকল গোত্রের সাথে সন্ধি চুক্তি স্থাপনের মাধ্যমে শান্তি স্থাপনে অগ্রণী ছিলেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] কিন্তু মক্কার কুরাইশরা গৃহত্যাগী সকল মুসলিমদের সম্পত্তি ছিনিয়ে নেয়। এই অবস্থায় ৬২৪ সালে মুহাম্মাদ ৩০০ সৈন্যের একটি সেনাদলকে মক্কার একটি বাণিজ্যিক কাফেলাকে বাধা দেয়ার উদ্দেশ্যে পাঠায়। কারণ উক্ত কাফেলা বাণিজ্যের নাম করে অস্ত্র সংগ্রহের চেষ্টা করছিল। কুরাইশরা তাদের কাফেলা রক্ষায় সফল হয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য যুদ্ধের ডাক দেয়। আত্মরক্ষামূলক এই যুদ্ধে মুসলিমরা সৈন্য সংখ্যার দিক দিয়ে কুরাইশদের এক তৃতীয়াংশ হয়েও বিজয় অর্জন করে। এই যুদ্ধ বদর যুদ্ধ নামে পরিচিত যা ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৫ মার্চ তারিখে সংঘটিত হয়। মুসলিমদের মতে, এই যুদ্ধে আল্লাহ মুসলিমদের সহায়তা করেছিলেন। এই সময় থেকেই ইসলামের সশস্ত্র ইতিহাসের সূচনা ঘটে। এরপর ৬২৫ সালের ২৩ মার্চে উহুদ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এতে প্রথম দিকে মুসলিমরা পরাজিত হলেও শেষে বিজয়ীর বেশে মদীনায় প্রবেশ করতে সমর্থ হয়। কুরাইশরা বিজয়ী হওয়া সত্ত্বেও চূড়ান্ত মুহূর্তের নীতিগত দূর্বলতার কারণে পরাজিতের বেশে মক্কায় প্রবেশ করে। ৬২৭ সালে আবু সুফিয়ান কুরাইশদের আরেকটি দল নিয়ে মদীনা আক্রমণ করে। কিন্তু এবারও খন্দকের যুদ্ধে মুসলিমদের কাছে পরাজিত হয়। যুদ্ধ বিজয়ে উৎসাহিত হয়ে মুসলিমরা আরবে একটি প্রভাবশালী শক্তিতে পরিণত হয়। ফলে আশেপাশের অনেক গোত্রের উপরই মুসলিমরা প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়।

মদীনার ইহুদিদের সাথে সম্পর্ক[সম্পাদনা]

তুরস্কের এদ্রিনে মহানবীর নামের স্বাক্ষর সম্বলিত লিপি

কিন্তু এ সময় মদীনার বসবাসকারী ইহুদীরা ইসলামী রাষ্ট্রের জন্য হুমকী হয়ে দেখা দেয়। মূলত ইহুদীরা বিশ্বাস করতনা যে, একজন অ-ইহুদী শেষ নবী হতে পারে। এজন্য তারা কখনই ইসলামের আদর্শ মেনে নেয়নি এবং যখন ইসলামী রাষ্ট্রের শক্তি বুঝতে পারে তখন তারা এর বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে। মুহাম্মাদ প্রতিটি যুদ্ধের পরে একটি করে ইহুদী গোত্রের উপর আক্রমণ করেন। বদর ও উহুদের যুদ্ধের পর বনু কাইনুকা ও বনু নাদির গোত্র সপরিবারে মদীনা থেকে বিতাড়িত হয়; আর খন্দকের পর সকল ইহুদীকে মদীনা থেকে বিতাড়ন করা হয়।[৩২] মুহাম্মাদের এই ইহুদী বিদ্বেশের দুটি কারণের উল্লেখ পাওয়া যায়, একটি ধর্মীয় এবং অন্যটি রাজনৈতিক[৩৩]। ধর্মীয় দিক দিয়ে চিন্তা করলে আহলে কিতাব হয়েও শেষ নবীকে মেনে না নেয়ার শাস্তি ছিল এটি। আর রাজনৈতিকভাবে চিন্তা করলে, ইহুদীরা মদীনার জন্য একটি হুমকী ও দুর্বল দিক ছিল। এজন্যই তাদেরকে বিতাড়িত করা হয়।[৩৪]

হুদাইবিয়ার সন্ধি[সম্পাদনা]

কুরআনে যদিও মুসলিমদের হজ্জ্বের নিয়ম ও আবশ্যকীয়তা উল্লেখ করা আছে, তথাপি কুরাইশদের শত্রুতার কারণে মুসলিমরা হজ্জ্ব আদায় করতে পারছিল না। মুহাম্মাদ এক দিব্যদর্শনে দেখতে পান তিনি হজ্জ্বের জন্য মাথা কামাচ্ছেন। এ দেখে তিনি হজ্জ্ব করার জন্য মনস্থির করেন এবং ৬ হিজরী সনের শাওয়াল মাসে হজ্জ্বের উদ্দেশ্যে ১৪০০ সাহাবা নিয়ে মক্কার পথে যাত্রা করেন। কিন্তু এবারও কুরাইশরা বাধা দেয়। অগত্যা মুসলিমরা মক্কার উপকণ্ঠে হুদাইবিয়া নামক স্থানে ঘাটি স্থাপন করে। এখানে কুরাইশদের সাথে মুসলিমদের একটি শান্তি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় যা ইতিহাসে হুদাইবিয়ার সন্ধি নামে সুপরিচিত। এই সন্ধি মতে মুসলিমরা সে বছর হজ্জ্ব করা ছাড়াই মদীনায় প্রত্যাবর্তন করে। সন্ধির অধিকাংশ শর্ত মুসলিমদের বিরুদ্ধে গেলেও মুহাম্মাদ এই চুক্তি সম্পাদন করেছিলেন।

বিভিন্ন রাষ্ট্রনায়কদের কাছে পত্র প্রেরণ[সম্পাদনা]

মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী মুহাম্মাদ সারা বিশ্বের রাসূল হিসেবে প্রেরিত হয়েছিলেন এবং পৃথিবীর সব জায়গায় ইসলামের আহ্বান পৌঁছে দেয়া তাঁর দায়িত্ব ছিল। হুদায়বিয়ার সন্ধির পর কুরাইশ ও অন্যান্য আরব গোত্রগুলো থেকে আশ্বস্ত হয়ে তিনি এ কাজে মনোনিবেশ করেন। সেসময়ে পৃথিবীর প্রধান রাজশক্তিগুলো ছিল ইউরোপের রোম সাম্রাজ্য, এশিয়ার পারস্য সাম্রাজ্য এবং আফ্রিকার হাবশা সাম্রাজ্য। এছাড়াও মিশরের 'আযীয মুকাউকিস', ইয়ামামার সর্দার এবং সিরিয়ার গাসসানী শাসনকর্তাও বেশ প্রতাপশালী ছিল। তাই ষষ্ঠ হিজরীর জিলহজ্জ মাসের শেষদিকে একইদিনে এদেঁর কাছে ইসলামের আহ্বানপত্রসহ ছয়জন দূত প্রেরণ করেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

প্রেরিত দূতগণের তালিকা[সম্পাদনা]

  1. দাহিয়া ক্বালবী কে রোমসম্রাট কায়সারের (হিরাক্লিয়াস বা হিরাকল নামে অধিক পরিচিত) কাছে।
    রোমসম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে মুহাম্মাদের প্রেরিত চিঠি
  2. আবদুল্লাহ বিন হুযায়ফা আস-সাহমীকে পারস্যসম্রাট কিসরা বা খসরু পারভেজের (খসরু ২) কাছে।
  3. হাতিব বিন আবূ বুলতা'আ কে মিশরের (তৎকালীন আলেকজান্দ্রিয়ার) শাসনকর্তা মুকাউকিসের কাছে।
    মুকাউকিসের কাছে মুহাম্মদ(সাঃ) এর চিঠি
  4. আমর বিন উমাইয়া কে হাবশার রাজা নাজ্জাশীর কাছে।
  5. সলীত বিন উমর বিন আবদে শামস কে ইয়ামামার সর্দারের কাছে।
  6. শুজা ইবনে ওয়াহাব আসাদী কে গাসসানী শাসক হারিসের কাছে।
  7. আল আলা আল হাদরামিকে বাহরাইনের শাসক মুনজির ইবন সাওয়া আল তামিমি'র কাছে।
    বাহরাইনের শাসক মুনজিরের নিকট প্রেরিত চিঠি

শাসকদের মধ্য হতে বাদশাহ নাজ্জাসী ও মুনজির ছাড়া আর কেউ তখন ইসলাম গ্রহণ করেননি।

মক্কা বিজয়[সম্পাদনা]

সূরা আন-নাজম এর শেষ আয়াত

দশ বছরমেয়াদি হুদাইবিয়ার সন্ধি মাত্র দু' বছর পরেই ভেঙ্গে যায়। খুযাআহ গোত্র ছিল মুসলমানদের মিত্র,অপরদিকে তাদের শত্রু বকর গোত্র ছিল কুরাইশদের মিত্র। একরাতে বকর গোত্র খুযাআদের ওপর অতর্কিতে হামলা চালায়। কুরাইশরা এই আক্রমণে অন্যায়ভাবে বকর গোত্রকে অস্ত্র দিয়ে সহযোগিতা করে। কোন কোন বর্ণনামতে কুরাইশদের কিছু যুবকও এই হামলায় অংশগ্রহণ করে। এই ঘটনার পর মুহাম্মাদ কুরাইশদের কাছে তিনটি শর্তসহ পত্র প্রেরণ করেন এবং কুরাইশদেরকে এই তিনটি শর্তের যে কোন একটি মেনে নিতে বলেন। শর্ত তিনটি হলো;

  • কুরাইশ খুযাআ গোত্রের নিহতদের রক্তপণ শোধ করবে।
  • অথবা তারা বকর গোত্রের সাথে তাদের মৈত্রীচুক্তি বাতিল ঘোষণা করবে।
  • অথবা এ ঘোষণা দিবে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি বাতিল করা হয়েছে এবং কুরাইশরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত।

কুরাইশরা জানালো যে, তারা শুধু তৃতীয় শর্তটি গ্রহণ করবে। কিন্তু খুব দ্রুত কুরাইশ তাদের ভুল বুঝতে পারলো এবং আবু সুফয়ানকে সন্ধি নবায়নের জন্য দূত হিসেবে মদীনায় প্রেরণ করলো। কিন্তু মুহাম্মাদ কুরাইশদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং মক্কা আক্রমণের প্রস্তুতি শুরু করলেন।
৬৩০ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মাদ দশ হাজার সাহাবীর বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কাভিমুখে রওয়ানা হলেন।সেদিন ছিল অষ্টম হিজরীর রমজান মাসের দশ তারিখ। বিক্ষিপ্ত কিছু সংঘর্ষ ছাড়া মোটামুটি বিনাপ্রতিরোধে মক্কা বিজিত হলো এবং মুহাম্মাদ বিজয়ীবেশে সেখানে প্রবেশ করলেন। তিনি মক্কাবাসীর জন্য সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলেন। তবে দশজন নর এবং নারী এই ক্ষমার বাইরে ছিল। তারা বিভিন্নভাবে ইসলাম ও মুহাম্মাদ এর কুৎসা রটাত। তবে এদের মধ্য হতেও পরবর্তিতে কয়েকজনকে ক্ষমা করা হয়। মক্কায় প্রবেশ করেই মুহাম্মাদ সর্বপ্রথম কাবাঘরে আগমন করেন এবং সেখানকার সকল মূর্তি ধ্বংস করেন। মুসলমানদের শান-শওকত দেখে এবং মুহাম্মাদ এর ক্ষমাগুণে মুগ্ধ হয়ে অধিকাংশ মক্কাবাসীই ইসলাম গ্রহণ করে। আল কুরআনে এই বিজয়ের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে।

মক্কা বিজয়ের পর[সম্পাদনা]

আরও দেখুন: চেরামন পেরুমলমালিক দীনার

মৃত্যু[সম্পাদনা]

মুহাম্মাদের কবরের উপর নির্মিত সবুজ গম্বুজ মসজিদ এ নববী ,মদিনা, সৌদি আরব

বিদায় হজ্জ থেকে ফেরার পর হিজরী ১১ সালের সফর মাসে মুহাম্মদ জ্বরে আক্রান্ত হন। জ্বরের তাপমাত্রা প্রচন্ড হওয়ার কারণে পাগড়ির ওপর থেকেও উষ্ণতা অনুভূত হচ্ছিল। অসুস্থ অবস্থাতেও তিনি এগারো দিন নামাজের ইমামতি করেন। অসুস্থতা তীব্র হওয়ার পর তিনি সকল স্ত্রীর অনুমতি নিয়ে আয়েশা (রা:) এর কামরায় অবস্থান করতে থাকেন। তাঁর কাছে সাত কিংবা আট দিনার ছিল,মৃত্যুর একদিন পূর্বে তিনি এগুলোও দান করে দেন। বলা হয়, এই অসুস্থতা ছিল খাইবারের এক ইহুদি নারীর তৈরি বিষ মেশানো খাবার গ্রহণের কারণে। অবশেষে ১১ হিজরী সালের রবিউল আউয়াল মাসের ১২ তারিখ সন্ধ্যায় তার ইন্তকাল হয়। এ সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর। আলী তাঁকে গোসল দেন এবং কাফন পরান। আয়েশার কামরার যে স্থানে তিনি ইন্তেকাল করেন, জানাযার পর সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়। বর্তমান মসজিদে নববীর অভ্যন্তরে তাঁর কবর রয়েছে।

মুহাম্মাদ এর কবর
আয়িশা এর কক্ষে মুহাম্মাদ এর কবর

সংস্কারক হিসেবে মুহাম্মাদ[সম্পাদনা]

ইসলামী বর্ণনামতে মুহাম্মাদের অলৌকিকত্ব[সম্পাদনা]

আরও পড়ুন: খাসায়েসুল কুবরাচন্দ্র বিভাজন

মুসলমানদের মতে মুহাম্মদের অসংখ্য অলৌকিক ক্ষমতার মধ্যে প্রকাশ্য অলৌকিকত্ব সংখ্যা দশ হাজারেরও অধিক[৩৫]। প্রখ্যাত পণ্ডিত জাল্লুদ্দিন সুয়ুতির খাসায়েসুল কুবরা নামক গ্রন্থে মুহাম্মাদের মুজিযা সম্পর্কিত ঘটনাগুলো আলাদাভাবে লিপিবদ্ধ করেছেন। নাশফী যিকরীন নাবিয়্যিল হাবীব মাওলানা আশরাফ আলী থানভী আল কোরানের সুরা ক্বামারে মুহাম্মদের প্রার্থনায় চন্দ্র দ্বিখন্ডিত হওয়ার কথা বলা আছে। বদর যুদ্ধের আগের দিন বদর নামক স্থানে পৌঁছে মুহাম্মদ বললেন ‘এটা আমুকের শাহাদাতের স্থান, এটা অমুকের হত্যার স্থান... সাহাবীরা বলেন ‘রাসুলুল্লাহ! সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যার জন্য যে স্থান দেখিয়েছেন, তার সামান্য এদিক সেদিক হয়নি।’ (মুসলিম) ইসলামের একটি বর্ননায় উল্লেখ আছে মুহাম্মদের স্পর্শে এক সাহাবীর ভাংগা পা ভালো হয়ে যায়। সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে আতীক এর পা ভেংগে গেলে তিনি তা মুহাম্মদকে জানালে মুহাম্মদ তার পায়ের উপর হাত বুলালেন। সাহাবী বলেন- ‘এতে আমার পা এমনভাবে সুস্থ হয়ে গেলো যেন তাতে আমি কখনো আঘাতই পাইনি। (বুখারী) ইসলামের আরেকটি বর্ননায় পাওয়া যায় মুহাম্মদ তার ক্ষমতা বলে স্বল্প খাদ্যে হাজার মানুষের পরিতৃপ্ত ভোজন করেছিলেন। (বুখারী, মুসলিম)

অমুসলিমদের দৃষ্টিভঙ্গি[সম্পাদনা]

দার্শনিক নেপোলিয়ন বোনাপার্ট মুহাম্মাদকে একজন আদর্শ আইন নির্মাতা এবং মহামানব আখ্যা দিয়ে মুহাম্মাদ এবং ইসলামের ভূয়সী প্রশংসা করেন।[৩৬][৩৭][৩৮] ইতিহাসবিদ টমাস কার্লাইল[৩৯][৪০] এবং উইলিয়াম মন্টমেগেরি ওয়াট[৪১][৪২][৪৩][৪৪][৪৫] তাদের নিজ নিজ বইয়ে মুহাম্মাদকে ইতিহাসের একজন অন্যতম প্রভাবশালী ইতিবাচক সংস্কারক হিসেবে উল্লেখ করেন। এছাড়া মাইকেল এইচ. হার্ট তাঁর বিশ্বের শ্রেষ্ঠ একশ মনিষী নামক জীবনীগ্রন্থে মুহাম্মদ কে প্রথম স্থানে রেখেছেন।

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. "Why send durood on prophet(saws)"। সংগৃহীত 13 March 2012 
  2. "the original of the letter was discovered in 1858 by Monsieur Etienne Barthelemy, member of a French expedition, in a monastery in Egypt and is now carefully preserved in Constantinople. Several photographs of the letter have since been published. The first one was published in the well-known Egyptian newspaper Al-Hilal in November 1904" Muhammad Zafrulla Khan, Muhammad: Seal of the Prophets, Routledge & Kegan Paul, London, 1980 (chapter 12). The drawing of the document published in Al-Hilal was reproduced in David Samuel Margoliouth, Mohammed and the Rise of Islam, London (1905), p. 365, which is the source of this image.
  3. ৩.০ ৩.১ Elizabeth Goldman (1995), p. 63, gives 8 June 632, the dominant Islamic tradition. Many earlier (mainly non-Islamic) traditions refer to him as still alive at the time of the invasion of Palestine. See Stephen J. Shoemaker,The Death of a Prophet: The End of Muhammad's Life and the Beginnings of Islam, University of Pennsylvania Press, 2011.
  4. কুরআন 33:40
  5. Morgan, Diane (2009)। Essential Islam: A Comprehensive Guide to Belief and Practice। পৃ: 101। আইএসবিএন 978-0-313-36025-1। সংগৃহীত 4 July 2012 
  6. ৬.০ ৬.১ ৬.২ ৬.৩ Buhl, F.; Welch, A. T. (1993). "Muḥammad". Encyclopaedia of Islam 7 (2nd ed.). Brill Academic Publishers. pp. 360–376. ISBN 90-04-09419-9.
  7. Watt (1974) p. 231
  8. Tan Ta Sen, Dasheng Chen (2000)। Cheng Ho and Islam in Southeast Asia। Institute of Southeast Asian Studies। পৃ: 170। আইএসবিএন 981-230-837-7। সংগৃহীত 2015-03-17 
  9. Zvi Ben-Dor Benite (2005)। The dao of Muhammad: a cultural history of Muslims in late imperial China। Harvard University Asia Center। পৃ: 182। আইএসবিএন 981-230-837-7। সংগৃহীত 2015-03-17 
  10. Benite (2005), p.187
  11. Hyunhee Park (2012)। Mapping the Chinese and Islamic Worlds। Cambridge University Press। পৃ: 120। আইএসবিএন 9781107018686। সংগৃহীত 2015-03-17 
  12. J. Gordon Melton (2014)। Faiths Across Time: 5,000 Years of Religious History। ABC-CLIO। পৃ: 929। আইএসবিএন 9781610690256। সংগৃহীত 2015-03-17 
  13. ১৪.০ ১৪.১ Encyclopedia of World History (1998), p. 452
  14. Esposito, John L. (ed.) (2003)। The Oxford Dictionary of Islam। পৃ: 198। আইএসবিএন 978-0-19-512558-0। সংগৃহীত 19 June 2012 
  15. Marr JS, Hubbard E, Cathey JT. (2014): The Year of the Elephant. figshare. http://dx.doi.org/10.6084/m9.figshare.1186833 Retrieved 22:19, Oct 21, 2014 (GMT)
  16. ১৭.০ ১৭.১ Watt (1974), p. 7.
  17. Meri, Josef W. (2004), Medieval Islamic civilization 1, Routledge, পৃ: 525, আইএসবিএন 978-0-415-96690-0, সংগৃহীত 3 January 2013 
  18. Watt, "Halimah bint Abi Dhuayb", Encyclopaedia of Islam.
  19. ২০.০ ২০.১ ২০.২ An Introduction to the Quran (1895), p. 182
  20. Watt, Amina, Encyclopaedia of Islam
  21. Armand Abel, Bahira, Encyclopaedia of Islam
  22. Khan, Majid Ali (1998)। Muhammad the final messenger (1998 সংস্করণ)। India: Islamic Book Service। পৃ: 332। আইএসবিএন 81-85738-25-4 
  23. Esposito (1998), p. 6
  24. সূরা আলাক্ব: মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কুরআনের ৯৬ নং সূরা; প্রথম পাঁচ (১ - ৫) আয়াত। www.islamdharma.net -এ প্রাপ্ত কুরআনের বাংলা অনুবাদ থেকে নেয়া হয়েছে।
  25. Esposito (2010), p.8
  26. ২৭.০ ২৭.১ John Esposito, Islam, Expanded edition, Oxford University Press, p.4–5
  27. ২৮.০ ২৮.১ Watt, The Cambridge History of Islam, p. 39
  28. Esposito (1998), p. 17.
  29. An Introduction to the Quran (1895), p. 187
  30. Moojan Momen (1985), p. 5
  31. Esposito (1998), pp.10-11
  32. F.E.Peters(2003), p.77
  33. F.E.Peters(2003), p.76-78
  34. থানভী, আশরাফ আলী। নাশরুত তিব ফী যিকরীন নাবিয়্যিল হাবীব 
  35. Talk Of Napoleon At St. Helena'' (1903), pp. 279–280
  36. Brockopp, Jonathan E., সম্পাদক (2010)। The Cambridge Companion to Muhammad। Cambridge Companions to Religion। Cambridge University Press। আইএসবিএন 978-0-521-71372-6 
  37. Younos, Farid (2010)। Islamic Culture। Cambridge Companions to Religion। AuthorHouse। পৃ: 15। আইএসবিএন 978-1-4918-2344-6 
  38. Carlyle, Thomas (1841)। On heroes, hero worship and the heroic in history। London: James Fraser। পৃ: 87। 
  39. Kecia Ali (2014)। The Lives of Muhammad। Harvard UP। পৃ: 48। 
  40. Watt, Bell (1995) p. 18
  41. Watt (1974), p. 232
  42. Watt (1974), p. 17
  43. Watt, The Cambridge history of Islam, p. 37
  44. Lewis (1993), p. 45.

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • গোলাম মোস্তফা। বিশ্বনবী 
  • মাওলানা মুহাম্মদ তফাজ্জল হোসাইন (২০০২)। হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (স):সমকালীন পরিবেশ ও জীবন। ইসলামিক রিসার্চ ইনস্টিটিউ বাংলাদেশ। 
  • Andrae, Tor (2000)। Mohammed: The Man and His Faith। Dover। ISBN 0-486-41136-2 
  • Armstrong, Karen (1993)। Muhammad: A Biography of the Prophet। San Francisco: Harper। ISBN 0-06-250886-5 
  • Cook, Michael (1983)। Muhammad। Oxford University Press। ISBN 0-19-287605-8 (reissue 1996)। 
  • Dashti, Ali (1994)। Twenty-Three Years: A Study of the Prophetic Career of Mohammad। Mazda। ISBN 1-56859-029-6 
  • Glubb, John Bagot (1970)। The Life and Times of Muhammad। Hodder & Stoughton। ISBN 0-8154-1176-6 (reprint 2002)। 
  • Guillaume, Alfred, ed. (1955)। The Life of Muhammad: A Translation of Ibn Ishaq's Sirat Rasul Allah। Oxford University Press। ISBN 0-19-636033-1 
  • Hamidullah, Muhammad (1998)। The Life and Work of the Prophet of Islam। [s.n.](Islamabad: Islamic Research Institute)। ISBN 969-8413-00-6 
  • Haykal, Muhammad Husayn (1995)। The Life of Muhammad। Islamic Book Service। ISBN 1-57731-195-7 
  • Lings, Martin (1987)। Muhammad: His Life Based on Earliest Sources। Inner Traditions International, Limited। ISBN 0-89281-170-6 
  • Motzki, Harald, ed. (2000)। The Biography of Muhammad: The Issue of the Sources (Islamic History and Civilization: Studies and Texts, Vol. 32)। Brill। ISBN 90-04-11513-7 
  • Rodinson, Maxime (1961)। Muhammad। New Publishers। ISBN 1-56584-752-0 
  • Rubin, Uri (1995)। The Eye of the Beholder: The Life of Muhammad as Viewed by the Early Muslims (A Textual Analysis)। Darwin Press। ISBN 0-87850-110-X 
  • Schimmel, Annemarie (1985)। And Muhammad is His Messenger: The Veneration of the Prophet in Islamic Piety। The University of North Carolina Press। ISBN 0-8078-4128-5 
  • Warraq, Ibn (2000)। The Quest for the Historical Muhammad। Prometheus Books। ISBN 1-57392-787-2 
  • Watt, W. Montgomery (1961)। Muhammad: Prophet and Statesman। Oxford University Press। ISBN 0-19-881078-4 
  • Berg, Herbert (Ed.) (2003)। Method and Theory in the Study of Islamic Origins। E. J. Brill। ISBN 90-04-12602-3 
  • Lewis, Bernard (2002)। The Arabs in History (6th edition সংস্করণ)। Oxford University Press। ISBN 0-19-280310-7 
  • Stillman, Norman (1975)। The Jews of Arab Lands: a History and Source Book। Jewish Publication Society of America। ISBN 0-8276-0198-0 

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

সাধারণ[সম্পাদনা]

মুসলিম রচিত[সম্পাদনা]

অমুসলিম রচিত[সম্পাদনা]


উদ্ধৃতি ত্রুটি: "n" নামের গ্রুপের <ref> ট্যাগ রয়েছে, কিন্তু এর জন্য <references group="n"/> ট্যাগ দেয়া হয়নি