রাশিদুন খিলাফত

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
রাশিদুন খিলাফত
الخلافة الراشدة
খিলাফত

 

 

৬৩২–৬৬১

পতাকা

৬৫৪ সালে খলিফা উসমানের শাসনামলে রাশিদুন সাম্রাজ্য সর্বোচ্চ সীমায় পৌছায়।
রাজধানী মদীনা (৬৩২–৬৫৬)
কুফা (৬৫৬–৬৬১)
ভাষাসমূহ আরবি(দাপ্তরিক), আরামায়িক, আর্মেনীয়, বার্বার, জর্জিয়ান, গ্রীক, হিব্রু, তুর্কি, ফার্সি, কুর্দি
ধর্ম ইসলাম
সরকার খিলাফত
আমিরুল মুমিনিন¹
 -  ৬৩২–৬৩৪ আবু বকর
 -  ৬৩৪–৬৪৪ উমর
 -  ৬৪৪–৬৫৬ উসমান
 -  ৬৫৬–৬৬১ আলী
ইতিহাস
 -  সংস্থাপিত ৬৩২
 -  ভাঙ্গিয়া দেত্তয়া হয়েছে ৬৬১
আয়তন  বর্গ কি.মি. ( বর্গ মাইল)
জনসংখ্যা
 -  আনুমানিক  
     ঘনত্ব বর্গ কি.মি.  ( বর্গ মাইল)
মুদ্রা দিনার, দিরহাম
বর্তমানে অংশ
আমিরুল মুমিনিন (أمير المؤمنين), খলিফা (خليفة)
সতর্কীকরণ: "মহাদেশের" জন্য উল্লিখিত মান সম্মত নয়
ঐতিহাসিক আরব রাজ্য এবং রাজবংশ

রাশিদুন খিলাফত (আরবি: الخلافة الراشدية‎) (ইংরেজি ভাষায়:al-khilāfat ar-Rāshidīyah) (৬৩২ - ৬৬১) ইসলামের প্রথম চার খলিফার শাসনকালকে বলা হয়। ৬৩২ সালে (হিজরি ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ১০ হিজরি) নবী মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর পর এই খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়। সর্বোচ্চ সীমায় উপনীত হওয়ার পর এটি সমগ্র আরব উপদ্বীপ, লেভান্ট থেকে উত্তর ককেসাস, পশ্চিমে মিসর থেকে বর্তমান তিউনিসিয়া ও পূর্বে ইরানীয় মালভূমি থেকে মধ্য এশিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।

পরিচ্ছেদসমূহ

উৎপত্তি[সম্পাদনা]

রাশিদুন খিলাফতের বিস্তার।

৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে হযরত মুহাম্মদ(সা:)-এর মৃত্যুর পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা যখন তাঁর দাফনের কাজে ব্যস্ত ছিলেন তখন মদিনার আনসারদের মধ্যে তাঁর উত্তরসুরি নিয়ে মতপার্থক্য দেখা দেয়। উমরআবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ দুজনেই আবু বকরের প্রতি তাঁদের আনুগত্য প্রকাশ করেন। মদিনার আনসারমুহাজিররা অচিরেই তাদের অনুসরণ করে। আবু বকর (রা:) এভাবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রথম খলিফা রাসুলুল্লাহ (আল্লাহর রাসুলের উত্তরাধিকারী) হিসেবে অভিষিক্ত হন এবং ইসলামের প্রচারের জন্য কাজ শুরু করেন। প্রথমে তাকে বিদ্রোহী আরব গোত্রগুলোকে দমন করতে হয় যারা ইসলাম ত্যাগ করে পূর্ব ব্যবস্থায় ফিরে গিয়েছিল। আবু বকর সম্রাট ছিলেন না এবং এমন কোনো উপাধি কখনো দাবি করা হয়নি। তার তিন উত্তরসুরিও একই পন্থা অবলম্বন করেন।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

আবু বকরের ক্ষমতালাভ[সম্পাদনা]

আবু বকর ছিলেন মুহাম্মদ (সা) এর বয়োজ্যেষ্ঠ সাহাবি। মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর পর তার দুই সাহাবি আবু বকর ও উমর সাকিফা বনি সাদায় তার উত্তরসুরি নির্বাচনের জন্য আলোচনায় বসেন। এসময় তার পরিবার তার দাফনের কাজে নিয়োজিত ছিল। খলিফা কে হবে তা নিয়ে মুসলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য দেখা দেয়। আনসাররা নবীর সাহায্যকারী হিসেবে বিবেচনা করে আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহকে খলিফা হিসেবে মনোনীত করে।[১] মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করা মুহাজির এবং মদিনার আনসারদের মধ্যে এ নিয়ে মতবিরোধ তৈরী হয়। শেষ পর্যন্ত আবু বকর খলিফা হিসেবে মনোনীত হন।[২] এর মাধ্যমে খিলাফত নামক নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্টান গড়ে উঠে। আবু বকরের ক্ষমতালাভের পর খুব দ্রুত সমস্যা মাথাচাড়া দেয় এবং তা রাষ্ট্রের জন্য হুমকি হয়ে উঠে। মুহাম্মদ (সা) এর জীবদ্দশাতেই কিছু ধর্মদ্রোহিতার ঘটনা ঘটে এবং এ সংক্রান্ত সর্বপ্রথম সংঘর্ষ তার জীবদ্দশাতেই হয়।

প্রথম বড় ধরনের ধর্মদ্রোহিতার ঘটনা ঘটে ইয়েমেনে। এটি আসওয়াদ আল আনসির ঘটনা বলে পরিচিত।[৩] ইয়েমেনের পারস্য বংশোদ্ভূত মুসলিম গভর্নর ফিরোজ তাকে হত্যা করেন।[৪] তার হত্যার ঘটনা মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর কিছু পর মদিনায় পৌছে। ইসলাম গ্রহণকারী অধিকাংশ গোত্রই হিজরতের নবম বা দশম সালে ইসলামে আসে।

ধর্মত্যাগের ঘটনা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে তা আরবের প্রত্যেকটি গোত্রকে প্রভাবিত করে। মক্কা, মদিনা, তাইফের সাকিফ গোত্র ও ওমানের আজদ গোত্র এর বাইরে ছিল। কিছু কিছু ক্ষেত্রে পুরো গোত্র ধর্মত্যাগ করে। কিছু ক্ষেত্রে ইসলামকে অস্বীকার না করলেও জাকাত দিতে অস্বীকারের ঘটনা ঘটে। অনেক গোত্রীয় নেতা নিজেকে নবী দাবি করা শুরু করে। গোত্রগুলো দাবি করে যে তারা মুহাম্মদ (সা) এর কাছে আনুগত্য স্বীকার করেছিল এবং তার মৃত্যুর পর এটি কার্যকর হবে না। আবু বকর আপত্তি করে বলেন যে তারা রাসুলের প্রতি না বরং মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তিনি এসময় মুসলিমদের খলিফা ছিলেন। ধর্মত্যাগ ইসলামি আইনে সর্বোচ্চ ধরনের অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হয়। আবু বকর বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন।

এর মাধ্যমে রিদ্দার যুদ্ধ শুরু হয়। মধ্য আরবের ধর্মত্যাগীদের নেতৃত্ব ছিল স্বঘোষিত নবি মুসায়লামা। অন্যরা দক্ষিণ ও পূর্বের অন্যান্য অঞ্চল যেমন বাহরাইন, মাহরাইয়েমেনে নেতৃত্বে দিচ্ছিল। আবু বকর বিদ্রোহ দমনের জন্য পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। তিনি মুসলিম সেনাবাহিনীকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করেন। সবচেয়ে শক্তিশালী ও প্রাথমিক বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন খালিদ বিন ওয়ালিদ। বিদ্রোহীদের শক্তিশালী বাহিনীগুলোর সাথে লড়াইয়ের জন্য খালিদের সেনাদের ব্যবহার করা হয়। অন্যান্য সেনাদলগুলো তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহীদের মোকাবেলায় ব্যবহার করা হত। আবু বকরের পরিকল্পনা ছিল প্রথমে পশ্চিম ও মধ্য আরব (যা মদিনার নিকটবর্তী ছিল) নিষ্কন্টক করা, এরপর মালিক ইবনে নুয়ায়রাহকে মোকাবেলা করা ও শেষে সবচেয়ে বিপদজনক শত্রু মুসায়লামাকে শায়েস্তা করা। বেশ কিছু ধারাবাহিক সাফল্যের পর খালিদ বিন ওয়ালিদ শেষপর্যন্ত ইয়ামামার যুদ্ধে মুসায়লামাকে পরাজিত করেন।[৫] হিজরি ১১ সালে এ যুদ্ধ শুরু ও সমাপ্ত হয়। ১২ হিজরিতে আরব মদিনায় অবস্থান করা খলিফার নেতৃত্ব একীভূত হয়। বিদ্রোহী নবীদের যুদ্ধে পরাজয়ের মাধ্যমে আবু বকর আরবকে ইসলামের অধীনে সুসংহত করেন এবং ইসলামি রাষ্ট্রকে পতনের হাত থেকে রক্ষা করেন।

বিদ্রোহ দমনের পর আবু বকর বিজয় অভিযান শুরু করেন। এ বিজয় অভিযানের মাধ্যমে কয়েক দশকের মধ্যে বিশ্বের একটি বৃহৎ সাম্রাজ্য জন্ম নেয়। আবু বকর সাসানীয় প্রদেশের মধ্য সবচেয়ে ধনী ইরাক দিয়ে শুরু করেন। ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি তার সবচেয়ে রণকুশলী সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদকে সাসানীয় সাম্রাজ্য আক্রমণের জন্য প্রেরণ করেন। রোমান সিরিয়া আক্রমণের জন্য তিনি চারটি সেনাদল পাঠান, কিন্তু চূড়ান্ত অপারেশন ইরাক জয়ের পর ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে খালিদকে সিরিয়ান ফ্রন্টে বদলি করার পর তার অধীনেই সম্পন্ন হয়।

উমরের ক্ষমতালাভ[সম্পাদনা]

আবু বকর সামরিক ও রাজনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে উমরের গুরুত্ব দিতেন এবং তাকে তার উত্তরসুরি মনোনীত করে যান। তিনি তার মনোনয়নের কথা জানিয়ে যান এবং উমর তার মৃত্যুর পর খলিফার দায়িত্ব লাভ করেন। পূর্বসূরির শুরু করা বিজয় অভিযান উমর চালিয়ে যান। তিনি পারস্য সাম্রাজ্যের আরো ভেতরে, উত্তরে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অঞ্চলগুলোতে এবং পশ্চিমে মিশরে অভিযান পরিচালনা করেন। উমর সেনাপতি হিসেবে কোনো যুদ্ধে অংশ নেননি। তবে তিনি অভিযান অব্যাহত রাখেন ও ইসলামি রাষ্ট্রের সীমানা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখেন। এসব অঞ্চল শক্তিশালী সাম্রাজ্য কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হত কিন্তু বাইজেন্টাইন ও সাসানীয়দের মধ্যকার দীর্ঘকালব্যপী চলা সামরিক সংঘর্ষের ফলে দুর্বল হয়ে পড়ায় মুসলিমরা সহজে তাদের পরাস্ত করতে সক্ষম হয়। ৬৪০ নাগাদ মুসলিমরা মেসোপটেমিয়া, সিরিয়াফিলিস্তিন অধিকার করে নেয়; ৬৪২ নাগাদ মিশর, এবং ৬৪৩ নাগাদ সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্য অধিকারে চলে আসে।

খিলাফত তার সীমানা বৃদ্ধির সময় উমর এর জন্য রাজনৈতিক কাঠামো দাড় করাতে শুরু করেন। সরকারি কার্যকলাপ পরিচালনার জন্য তিনি একটি দিওয়ান সৃষ্টি করেন। সামরিক বাহিনীকে সরাসরি রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ও খরচের আওতায় আনা হয়। অধিকৃত ভূখন্ডে তিনি অমুসলিমদের ইসলামে আসতে বাধ্য করেননি এবং পারসিয়ানদের মত সরকারকে কেন্দ্রীভূতও করেননি। তিনি তার প্রজাদের নিজস্ব ধর্ম, ভাষা ও প্রথা ধরে রাখার অনুমতি দেন এবং তাদের নিজস্ব শাসন বজায় রাখার সুযোগ দেন। তবে তাদের উপর একজন গভর্নর (আমির) ও একজন অর্থনৈতিক কর্মকর্তা (আমিল) থাকতেন।

বিজয়ের ফলে অর্জিত সম্পদ উমর জাগতিক কাজে ব্যবহার করতেন। সাহাবিদেরকে পেনশন দেয়া হত। তারা ধর্মীয় অধ্যয়নে নিয়োজিত হতেন এবং নিজ নিজ লোকেদের মধ্যে নেতৃত্ব দিতেন। উমরকে ইসলামি বর্ষপঞ্জি “হিজরি সন” প্রণয়নের জন্য স্মরণ করা হয়। মুহাম্মদ (সা) এর হিজরতের বছরকে স্মরণ করে এটি ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে শুরু ধরা হয়।

৬৪৪ খ্রিষ্টাব্দে উমর ফজরের নামাজের সময় একজন পারসিয়ান দাস পিরুজ নাহাওয়ান্দির (আরবরা তাকে আবু লুলু বলে ডাকত) ছুরিকাঘাতে মারাত্মকভাবে আহত হন।

উসমানের নির্বাচন[সম্পাদনা]

উমরের মৃত্যুর পূর্বে তিনি পরবর্তী খলিফা নির্বাচনের জন্য ছয়জন সদস্যের একটি কমিটি নিয়োগ দেন এবং তাদের মধ্য থেকে একজনকে খলিফা হিসেবে বেছে নিতে বলেন। কমিটির সদস্যরা উমরের মত কুরাইশ বংশের সদস্য ছিলেন।

কমিটি বাছাইয়ের সময় শেষপর্যন্ত উসমান ও আলিকে সম্ভাব্য উত্তরসুরি হিসেবে রাখে। আলি ছিলেন বনু হাশিম গোত্রের সদস্য যা মুহাম্মদ (সা) এর নিজের গোত্র। সেসাথে তিনি তার চাচাত ভাই, জামাতা ও তার ইসলাম প্রচারের সময় থেকে সঙ্গী। উসমান ছিলেন উমাইয়া গোত্রের সদস্য।

উসমান বার বছর খলিফা হিসেবে শাসন করেন। শাসনের প্রথম অর্ধেক বছর তিনি সহজে শাসন পরিচালনা করলেও পরের বছরগুলো পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। মিশরীয়রা বিরোধীতা শুরু করে এবং আলির প্রতি নিজেদের দৃষ্টিনিবন্ধ করে। উসমানের পর আলি খলিফা হন।

আভ্যন্তরীন সমস্যা সত্ত্বেও উসমান উমরের বিজয় অভিযান অব্যাহত রাখেন। রাশিদুন সেনাবাহিনী বাইজেন্টাইনদের কাছ থেকে উত্তর আফ্রিকা জয় করে এবং এমনকি স্পেন আক্রমণ করে ইবেরিয়ান উপদ্বীপের উপকূল জয় করে। তারা রোডসসাইপ্রাস আক্রমণ করে। ৬৫২ খ্রিষ্টাব্দে সিসিলি উপকূল আক্রমণ করা হয়।[৬] রাশিদুন সেনারা সম্পূর্ণ সাসানীয় সাম্রাজ্য জয় করে এবং পূর্ব সীমান্ত সিন্ধু নদ পর্যন্ত পৌছায়।

কুরআনের প্রমিত পাঠের উপর উসমানের অবদান তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও মহৎ কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়।

চারজন খলিফার শাসনাধীন অঞ্চল।
  রাশিদুন খিলাফতের শক্তঘাটি।
  রাশিদুন খিলাফতের অনুগত রাষ্ট্র।
  গৃহযুদ্ধের সময় প্রথম মুয়াবিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল (৬৫৬-৬৬১)।
  গৃহযুদ্ধের সময় আমর ইবনুল আসের নিয়ন্ত্রণাধীন অঞ্চল (৬৫৮-৬৬১)।[৭]

উসমানের অবরোধ[সম্পাদনা]

প্রতিবাদ অবরোধে রূপ নেয়ার পর উসমান গৃহযুদ্ধ এড়ানর জন্য কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকেন এবং আলোচনায় আগ্রহ দেখান। বিদ্রোহীদের প্রতি তার নম্র ব্যবহার তাদের সাহস বাড়িয়ে দেয় এবং তারা জোরপূর্বক তার বাড়িতে ঢুকে কুরআন তিলাওয়াত করা অবস্থায় তাকে হত্যা করে।

সংকট ও ভাঙন[সম্পাদনা]

তৃতীয় খলিফা উসমানের হত্যাকান্ডের পর মদিনার সাহাবিরা আলিকে খলিফা মনোনীত করেন। আলি কয়েকজন প্রাদেশিক গভর্নরকে পদচ্যুত করেন। তাদের মধ্যে কেউ কেউ উসমানের আত্মীয় ছিল। তাদের স্থলে মালিক আল আশতারসালমান ফারসির মত আস্থাভাজনদের নিয়োগ দেন। এরপর আলি তার রাজধানী মদিনা থেকে সরিয়ে বর্তমান ইরাকে অবস্থিত মুসলিম গেরিসন শহর কুফায় নিয়ে যান।

জনগণের মধ্য থেকে উসমান হত্যার বিচারের জন্য দাবি উঠতে থাকে। যুবাইর ইবনুল আওয়াম, তালহা ইবন উবাইদিল্লাহ ও মুহাম্মদ (সা) এর বিধবা স্ত্রী আয়েশা বিনতে আবু বকরের অধীনে একটি বড় আকারের সেনাবাহিনী বিদ্রোহ করে লড়াইয়ের জন্য এগিয়ে যায়। সেনারা বসরা পৌছে এটি অধিকার করে এবং প্রায় ৪০০০ সন্দেহভাজন রাষ্ট্রদ্রোহীকে হত্যা করা হয়। এরপর আলি বসরার দিকে এগিয়ে যান এবং খলিফার সেনাবাহিনী প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হয়। আলি বা তালহা ও যুবায়ের কেউ লড়াইয়ে আগ্রহী ছিলেন না তবুও রাতের বেলা দুই বাহিনীর মধ্যে যুদ্ধ বেধে যায়। সুন্নি উৎস মতে যেসব বিদ্রোহীরা উসমানকে হত্যা করেছিল তারাই লড়াই শুরু করে কারণ তারা আলি ও বিরোধী সেনাদের আলোচনার কারণে ধরা পড়ার ভয়ে ছিল। এটি ইতিহাসে মুসলিমদের মধ্যে সংঘটিত প্রথম যুদ্ধ এবং এটি উটের যুদ্ধ বলে পরিচিত। আলির অধীন বাহিনী বিজয়ী হয় এবং বিরোধ মিটিয়ে ফেলা হয়। মুহাম্মদ (সা) এর ঘনিষ্ঠ সাহাবি তালহাযুবায়ের যুদ্ধে নিহত হন। আয়েশাকে মদিনায় পাঠানোর জন্য আলি তার পুত্র হাসান ইবনে আলিকে প্রেরণ করেন।

এ ঘটনার পর উসমানের হত্যার প্রতিশোধ নেয়ার জন্য আবার গুঞ্জন উঠে। এবার উসমানের আত্মীয় মুয়াবিয়া এ দাবি তোলেন। তিনি সিরিয়ার গভর্নর ছিলেন। আলি ও মুয়াবিয়ার মধ্যে সিফফিনের যুদ্ধ হয়। কিন্তু বিরোধ মীমাংসার জন্য নিযুক্ত আমর ইবনুল আস মুয়াবিয়ার প্রতি নিজের সমর্থন ব্যক্ত করায় তাকে হার মানতে হয়। এরপর আলি ও বিদ্রোহী খারিজিদের মধ্যে নাহরাওয়ানের যুদ্ধ হয়। তারা প্রথমে আলির সমর্থক থাকলেও মীমাংসার ব্যাপারে নিজেদের অমত থাকায় আলি ও মুয়াবিয়া উভয়ের বিরুদ্ধে চলে যায়। আলির সেনারা খিলাফতের বড় অঞ্চলের মুয়াবিয়ার কাছে হারিয়ে ফেলে। এসময় সিসিলি, উত্তর আফ্রিকা, স্পেনের উপকূল অঞ্চল ও আনাতোলিয়ার কিছু দুর্গ অন্য সাম্রাজ্যের হস্তগত হয়।

৬৬১ খ্রিষ্টাব্দে ইবনে মুলজাম নামক ব্যক্তি আলিকে হত্যা করে। বিপক্ষের সকল নেতাকে হত্যা করার খারিজিদের পরিকল্পনামাফিক তাকে হত্যা করা হয়। তবে তারা মুয়াবিয়া ও আমর ইবনুল আসকে হত্যা করতে ব্যর্থ হয়।

আলির (রা:) পুত্র ও মুহাম্মদ (সা) এর দৌহিত্র হাসান ইবনে আলি খিলাফতের জন্য মনোনীত হলেও খলীফা হতে পারেন নি। মুসলিমদের বিবদমান দুই দলের মধ্যে বিবাদ নিরসনের জন্য তিনি মুয়াবিয়ার সাথে চুক্তিতে আসেন। মুয়াবিয়া খিলাফতের দায়িত্ব পান এবং উমাইয়া খিলাফতের গোড়াপত্তন করেন। এর মাধ্যমে রাশিদুন খিলাফতের সমাপ্তি হয়।

সামরিক সম্প্রসারণ[সম্পাদনা]

আবু বকর ৬৩২ ৬৩৪
উমর ৬৩৪ ৬৪৪
উসমান ৬৪৪ ৬৫৬
আলি ৬৫৬ ৬৬১

রাশিদুন খিলাফত ধাপে ধাপে সম্প্রসারিত হয়। ২৪ বছরের মধ্যে এটি বিশাল সীমানার অধিকারী হয় যার মধ্যে উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য, ট্রান্সঅক্সানিয়া, ককেসাস, আনাতোলিয়ার অংশবিশেষ, সমগ্র সাসানীয় সাম্রাজ্য, বৃহত্তর খোরাসান, সাইপ্রাস, রোডস, সিসিলি, ইবেরিয়ান উপদ্বীপ আক্রমণ করা হয়, এবং বেলুচিস্তান জয় করা হয়। সাম্রাজ্যের পূর্ব সীমানা ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু নদ ও পশ্চিমে আটলান্টিক মহাসাগর পর্যন্ত পৌছায়।

সাসানীয় সাম্রাজ্যে আক্রমণ করলে তারা আত্মসমর্পণ না করে লড়াই চালিয়ে যায় এবং হারানো এলাকা পুনরুদ্ধারের জন্য চেষ্টা চালায়। মুসলিমরা পুরো সাসানীয় সাম্রাজ্য দখল করে নেয়। সমগ্র সাম্রাজ্য মুসলিমদের হাতে আসে। তবে সাসানীয়দের মত না হয়ে বাইজেন্টাইনরা সিরিয়া হারানোর পর পশ্চিম আনাতোলিয়ায় পিছু হটে। ফলে তারা মিশর, উত্তর আফ্রিকা, সিসিলি দ্বীপপুঞ্জ, সাইপ্রাস, রোডস হাতছাড়া করে। তবে মুসলিমদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের ফলে বিজয় অভিযান স্থগিত হয় এবং এর ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য নিজেকে সামলে নেয়ার সুযোগ পায়।

পারস্য সাম্রাজ্য বিজয়[সম্পাদনা]

খালিদ বিন ওয়ালিদের ইরাক জয়ের সময় অনুসৃত পথ।

সাসানীয় সাম্রাজ্যে মুসলিমদের অভিযান ৬৩৩ খ্রিষ্টাব্দে খলিফা আবু বকর কর্তৃক সূচিত হয়। চার মাসের মধ্যে প্রখ্যাত সেনাপতি খালিদ বিন ওয়ালিদ খুব দ্রুত গতিতে সাম্রাজ্য জয় করেন। রিদ্দার যুদ্ধের পর আবু বকর মেসোপটেমিয়া জয়ের জন্য খালিদকে পাঠান। ১৮,০০০ সেনা নিয়ে ইরাকে প্রবেশের পর খালিদ চারটি প্রধান লড়াইয়ে জয়ী হন, এগুলো হল ৬৩৩ এর এপ্রিলে সংঘটিত শিকলের যুদ্ধ, ৬৩৩ এর এপ্রিলের তৃতীয় সপ্তাহে সংঘটিত নদীর যুদ্ধ, ৬৩৩ এর মে মাসে সংঘটিত ওলাজার যুদ্ধ ও ৬৩৩ এর মে মাসের মধ্যভাগে উলাইসের যুদ্ধ। মে মাসের শেষ সপ্তাহে হিরার যুদ্ধের পর ইরাকের রাজধানী মুসলিমদের হস্তগত হয়।

এরপর জুন মাসে খালিদ আনবারের দিকে অগ্রসর হন। এখানে তিনি প্রতিরোধের সম্মুখীন হন এবং আনবারের যুদ্ধে বিপক্ষকে পরাজিত করেন। এরপর কয়েক সপ্তাহের অবরধের পর জুলাইয়ে প্রতিপক্ষ আত্মসমর্পণ করে। খালিদ এরপর দক্ষিণে অগ্রসর হন এবং জুলাইয়ের শেষ সপ্তাহে আইনুল তামিরের যুদ্ধের মাধ্যমে আইনুল তামির শহর জয় করেন। ইতিমধ্যে প্রায় সমগ্র ইরাক মুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে আসে। খালিদের কাছে উত্তর আরবের দুমাতুল জানদালে সাহায্যের ডাক আসে। সেখানকার মুসলিম সেনাপতি আয়াজ বিন গানাম বিদ্রোহী কিছু গোত্রের কারণে আটকা পড়েছিলেন। ৬৩৩ এর আগস্টের শেষ সপ্তাহে খালিদ দুমাতুল জানদালের যুদ্ধে বিদ্রোহীদের পরাজিত করেন। আরব থেকে ফিরে তিনি পারসিয়দের গঠিত সেনাবাহিনীর সংবাদ পান। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিনি বিশাল প্রতিপক্ষের সাথে লড়াইয়ের মাধ্যমে পরাজয় এড়ানোর জন্য প্রতিপক্ষকে পৃথক পৃথকভাবে পরাজিত করার সিদ্ধান নেন। পারসিয় সেনাবাহিনী ও খ্রিষ্টান আরব সাহায্যকারীদের চারটি বড় দল হানাফিজ, জুমিয়াল, সান্নি, ও মুজিয়াহতে উপস্থিত ছিল।

খালিদ তার সেনাদের তিনটি ইউনিটে বিভক্ত করেন এবং সিদ্ধান্ত নেন যে তিনটি সাহায্যকারী দলকে রাতের বেলা তিন দিক থেকে আক্রমণ করে একের পর এক মুজিয়াহর যুদ্ধ, সান্নির যুদ্ধজুমাইলের যুদ্ধে পরাজিত করা হবে। ৬৩৩ এর নভেম্বরে খালিদ শত্রুদের তিনটি যুদ্ধে পরাজিত করেন। এর চূড়ান্ত বিজয় ইরাকে পারসিয়দের কর্তৃত্বের অবসান ঘটায়। ডিসেম্বরে খালিদ ফিরাজ শহরের সীমান্তে পৌছান এবং এখানে তিনি সাসানীয়, বাইজেন্টাইন ও খ্রিষ্টান আরবদের সম্মিলিত বাহিনীকে ফিরাজের যুদ্ধে পরাজিত করেন। ইরাক জয়ের সময় এটি ছিল সর্বশেষ যুদ্ধ।[৮]

ইরাক জয় সমাপ্ত হওয়ার পর খালিদ মেসোপটেমিয়া ত্যাগ করেন এবং সিরিয়ায় বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের নেতৃত্ব দেন। তার পর মিসনা ইবনে হারিস মেসোপটেমিয়ার ভার নেন। এসময় পারসিয়রা আবার মেসোপটেমিয়া পুনরুদ্ধারের জন্য অগ্রসর হয়। মিসনা ইবনে হারিস মদিনা থেকে সেনা সাহায্য আসার আগ পর্যন্ত সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য ইরাকের মধ্যভাগ থেকে আরব মরুভূমির দিকে চলে আসেন। খলিফা উমর আবু উবাইদাহ শাকফির নেতৃত্বে অতিরিক্ত সেনা পাঠান। প্রথম দিকে কিছু সাফল্য সত্ত্বেও এই বাহিনী সেতুর যুদ্ধে পরাজিত হয় এবং আবু উবাইদাহ নিহত হন। ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দে ইয়ারমুকের যুদ্ধে মুসলিমদের বিজয় পর্যন্ত পাল্টা আক্রমণ পেছানো হয়। এরপর উমর সেনাদের পূর্বদিকে পাঠান এবং সাসানীয়দের উপর আক্রমণ পরিচালনার নির্দেশ দেন। উমর সিরিয়ান রণাঙ্গনের ৭৫০০ জন সেনাসহ মোট ৩৬,০০০ জন সেনা এতে নিয়োজিত করেন এবং সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসকে এদের নেতৃত্বের ভার দেন। কাদিসিয়ার যুদ্ধে পারসিয়রা প্রথমদিকে সাফল্য লাভ করলেও লড়াইয়ের তৃতীয় দিন মুসলিমরা জয়ী হয়। এ যুদ্ধে পারস্যের বিখ্যাত সেনাপতি রুস্তম ফারুখজাদ নিহত হয়। কিছু সূত্র অনুযায়ী পারসিয়ানদের পক্ষে ২০,০০০ জন ও আরবদের পক্ষে ১০,৫০০ জন নিহত হয়।

এ যুদ্ধের পর মুসলিমরা পারসিয়ান রাজধানী তিসফুন (আরবিতে “মাদাইন”ও বলা হয়) জয় করে। সংক্ষিপ্ত অবরোধের পর সম্রাট তৃতীয় ইয়াজদগিরদ পালিয়ে যান। অবরোধের পর মুসলিমরা পূর্বদিকে অগ্রসর হয়ে ইয়াজদগিরদ ও বাকি সেনাদের অনুসরণ করে। স্বল্প সময়ের মধ্যে মুসলিমরা জালুলার যুদ্ধে সাসানীয়দের একটি পাল্টা আক্রমণ প্রতিহত করে। সেসাথে কাসরে শিরিন, মাসাবাদানের সংঘর্ষেও তারা জয়ী হয়। ৭ম শতকের মধ্যভাগে আরবরা সমগ্র মেসোপটেমিয়া ও সেসাথে বর্তমানের প্রদেশ খুজিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়। বলা হয় যে, খলিফা উমর জাগ্রোস পর্বতমালার মধ্য দিয়ে তার সেনা পাঠাতে রাজি ছিলেন না। পরবর্তী ব্যাখ্যাকারদের মতে এর কারণ ছিল সেনাদের যাতে অতিরিক্ত দূরত্বে চলে না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখা। আরবরা সবেমাত্র বিশাল অঞ্চল জয় করেছে এবং এসব অঞ্চলের জন্য উন্নত প্রশাসন গড়ে তোলা প্রয়োজন ছিল। হারানো অঞ্চলে অভিযান চালানোর ব্যাপারে পারসিয়ান সরকার আগ্রহী ছিল। তবে বাইজেন্টাইনরা এর ব্যতিক্রম ছিল। উমর শেষ পর্যন্ত তার সেনাবাহিনীকে আরো অধিক জয়ের জন্য প্রেরণ করে এবং এর ফলে সামগ্রিকভাবে সাসানীয় সাম্রাজ্য মুসলিমদের হস্তগত হয়। সাসানীয় সম্রাট ইয়াজদগিরদ এরপরও প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার জন্য পদক্ষেপ নেন। ৬৪১ নাগাদ তিনি নতুন বাহিনী গড়ে তোলেন। আধুনিক ইরানের হামাদান থেকে চল্লিশ মাইল দক্ষিণে নাহাওয়ান্দের যুদ্ধে তারা লড়াই করে। রাশিদুন সেনাবাহিনীতে নুমান ইবনে মুকাররিন আল মুজানিকে সেনাপতি নিয়োগ দেয়া হয়। আক্রমণের পর পারসিয়ান সেনারা পরাজিত হয়। মুসলিমরা একে বিজয়ের বিজয় বলে অবিহিত করে এবং এটিকে সাসানীয় সাম্রাজ্যের সমাপ্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

ইয়াজদগিরদ আরেকটি সেনাদল গঠনে ব্যর্থ হন এবং ভবঘুরে হয়ে পড়েন। ৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে উমর সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্য জয়ের জন্য একটি বাহিনী পাঠান। বর্তমান সময়ের সমগ্র ইরান জয় করা হয়। এরপর বৃহত্তর খোরাসান (আধুনিক ইরানের প্রদেশ খোরাসান ও আধুনিক আফগানিস্তান এর অন্তর্ভুক্ত), ট্রান্সঅক্সানিয়া, বেলুচিস্তান, মাকরান, আজারবাইজান, দাগেস্তান, আর্মেনিয়া, ও জর্জিয়া (রাষ্ট্র) জয় করা হয়। পরবর্তীতে খলিফা উসমানের সময় এসব অঞ্চল পুনরায় জয় করা হয় বিশেষত যেগুলো উমরের শাসনের সময় জয় করা হয়নি। রাশিদুন খিলাফতের সীমানা পূর্বে সিন্ধু নদ ও উত্তরে আমু দরিয়া পর্যন্ত পৌছায়।

বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ[সম্পাদনা]

বাইজেন্টাইন সিরিয়া বিজয়[সম্পাদনা]

মানচিত্রে প্রদর্শিত রাশিদুন খিলাফতের লেভান্টে আক্রমণের সময় অনুসৃত পথ

খালিদের ইরাক বিজয়ের পর আবু বকর সিরিয়ায় সেনা প্রেরণ করেন। চারজন কমান্ডারের অধীনে চারটি পৃথক সেনাদল পাঠানো হয়। আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে প্রধান সেনাপতি করে তার অধীনে আমর ইবনুল আস, ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান, শুরাহবিল ইবনে হাসানাকে পাঠানো হয়। প্রত্যেক সেনাদলকে তাদের কাজ বুজিয়ে দেয়া হয়। আজনাদায়নে বাইজেন্টাইন সেনাদের কারণে তাদের অগ্রগতি ব্যহত হয়। আবু উবাইদাহ সেনাসাহায্য চেয়ে পাঠালে আবু বকর খালিদকে সেখানে যাওয়ার নির্দেশ দেন। খালিদ এসময় তিসফুন আক্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন। খালিদকে তার সেনাদের অর্ধেক নিয়ে সিরিয়া যাত্রা করতে বলা হয়। তিনি নির্দেশ মোতাবেক সেনাদের নিয়ে একটি ভিন্ন পথ ধরে সিরিয়ার দিকে যাত্রা করেন। ইরাক থেকে সিরিয়া যাওয়ার দুটি পথ ছিল। একটি মেসোপটেমিয়া হয়ে ও অন্যটি দুমাতুল জানদাল হয়ে যেত। খালিদ সিরিয়ান মরুভূমির মধ্য দিয়ে যাত্রা করেন এবং ৫ দিন পর উত্তর পশ্চিম সিরিয়ায় হাজির হন।

সাওয়া, আরাক, তাদমুর, সুখনাহ, আল কারইয়াতায়ন, হাওয়ারিন এলাকার সীমান্ত দুর্গগুলো মুসলিমদের হাতে পতন হয়। খালিদ দামেস্ক দামেস্কের পথ ধরে বুসরা যাত্রা করেন। এখানে আবু উবাইদাহ ও শুরাহবিলের সেনারা খালিদের সাথে যুক্ত হয়। আবু বকরের নির্দেশ মোতাবেক আবু উবাইদাহর কাছ থেকে খালিদ সম্পূর্ণ সেনাবাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব নেন। অতর্কিত আক্রমণের ফলে একটি সংক্ষিপ্ত অবরোধের পর বসরা ৬৩৪ এর জুলাই মাসে আত্মসমর্পণ (দেখুন বুসরার যুদ্ধ) করে। এর ফলে গাসানিয় রাজবংশের সমাপ্তি ঘটে।

খালিদ বিন ওয়ালিদের সিরিয়া আক্রমণের সময় অনুসৃত পথ।

বুসরা থেকে খালিদ অন্যান্য সেনাদলগুলোকে আদেশ দেন যেন তারা তার সাথে আজনাদায়নে মিলিত হয়। প্রথমদিককার মুসলিম ইতিহাসবিদদের মতে এখানে ৯০,০০০ হাজার (আধুনিক সূত্র মতে ৯,০০০)[৯] বাইজেন্টাইন সেনার একটি বাহিনী সমবেত হয়েছিল। ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ৩০ জুলাই আজনাদায়নের যুদ্ধে বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনী মুসলিমদের কাছে পরাজিত হয়। এই যুদ্ধের পর সিরিয়ার কেন্দ্র অধিকার করতে মুসলিমদের সামনের পথ পরিষ্কার হয়ে যায়। ১৯ সেপ্টেম্বর দামেস্ক জয় করা হয়। দামেস্ক অধিকারের পর বাইজেন্টাইন সেনাদেরকে তাদের পরিবার ও সম্পদ নিয়ে দূরে চলে যাওয়ার জন্য ৩ দিন সময় দেয়া হয়। অন্যথায় দামেস্কে অবস্থান করে কর দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়।

সিরিয়ার ইদলিবে বাইজেন্টাইন মন্দির।

তিনদিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর খালিদের নেতৃত্বে মুসলিম অশ্বারোহীরা মারাজ আল দিবাজের যুদ্ধে রোমান সেনাদের পরাজিত করেন।

৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দের ২২ আগস্ট আবু বকর মৃত্যুবরণ করেন এবং উমরকে নিজের উত্তরসুরি মনোনীত করে যান। উমর খালিদের স্থলে আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহকে মুসলিম সেনাদের প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিয়োগ দেন। আবু উবাইদাহর অধীনে বিজয় কিছুটা মন্থর হলেও তিনি খালিদের উপদেশের উপর বেশ নির্ভর করতেন এবং তাকে সবসময় তার নিজের পাশে রাখতেন।[১০]

সর্বশেষ বড় বাইজেন্টাইন গেরিসনটি ফাহলে অবস্থিত ছিল। আজনাদায়ন থেকে বেঁচে যাওয়া সৈনিকরা তাদের সাথে যোগ দেয়। এদের কারণে মুসলিম সৈনিকরা খুব বেশি উত্তর বা দক্ষিণে যেতে পারছিল না। আবু উবাইদাহ এ পরিস্থিতি মোকাবেলার সিদ্ধান্ত নেন। ২৩ জানুয়ারি ৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দে ফাহলের যুদ্ধে গেরিসনের পতন হয়। এ যুদ্ধ “ফিলিস্তিনের চাবি” হিসেবে প্রতীয়মান হয়। এ যুদ্ধের পর আবু উবাইদাহ ও খালিদ উত্তরে এমেসার দিকে যাত্রা করেন। ইয়াজিদ এসময় দামেস্কে অবস্থান করেন এবং আমর ইবনুল আস ও শুরাহবিল ইবনে হাসানা দক্ষিণে ফিলিস্তিন জয়ের জন্য অগ্রসর হন।[১০] মুসলিমরা ফাহলে অবস্থানের সময় দামেস্কের দুর্বল প্রতিরক্ষার কথা চিন্তা করে সম্রাট হেরাক্লিয়াস শহর পুরুদ্ধারের জন্য সেনাবাহিনী পাঠান। এমেসা যাত্রার পথে আবু উবাইদাহ ও খালিদের সাথে এ বাহিনীর সংঘর্ষ হয় ফলে তারা দামেস্কে উদ্দেশ্য সফল করতে পারেনি। মারজ আল রুমের যুদ্ধদামেস্কের দ্বিতীয় যুদ্ধে বাহিনীটি পরাজিত হয়। এমেসা ও চেলসিসের কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ শহর মুসলিমদের সাথে এক বছরের জন্য শান্তি স্থাপন করে। ফলে হিরাক্লিয়াস প্রতিরক্ষা ও নতুন সেনা সংগ্রহের জন্য সময় পান। মুসলিমরা শান্তিকে স্বাগত জানায় এবং অধিকৃত অঞ্চলে শাসন সুরক্ষিত করতে থাকে। এমেসা ও চেলসিসে নতুন সেনা আগমনের খবর পেয়ে মুসলিমরা এমেসার দিকে যাত্রা করে এমেসা অবরোধ করে। ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দের মার্চে শহর অধিকৃত হয়।[১১]

মানচিত্রে প্রদর্শিত সিরিয়ার মধ্যভাগে মুসলিম আক্রমণের সময় অনুসৃত পথ।

যুদ্ধবন্দীরা হেরাক্লিয়াসের সিরিয়া পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে চূড়ান্ত পরিকল্পনার কথা জানায়। তারা জানায় যে প্রায় ২ লক্ষ সেনার একটি দল খুব শীঘ্রই গড়ে তোলা হবে। জুন মাসে খালিদ এখানে থামেন। বিশাল সেনাবাহিনী তাদের গন্তব্যের দিকে যাত্রা করে। আবু উবাইদাহ এ সংবাদ পান। তিনি তার সকল অফিসারকে একত্রিত করে পরবর্তী পদক্ষেপের পরিকল্পনা করেন। খালিদ প্রস্তাব করেন যাতে সিরিয়া প্রদেশে (সিরিয়া, জর্ডান, ফিলিস্তিন) অবস্থানরত সকল সেনাদের একত্রি করা হয় এবং এরপর ইয়ারমুকের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা হয়।

আবু উবাইদাহ সকল মুসলিম সেনাপতিদেরকে নির্দেশ দেন যাতে বিজিত অঞ্চল থেকে সেনা সরিয়ে নেয়া হয়, সংগৃহিত কর ফিরিয়ে দেয়া হয় এবং ইয়ারমুকের দিকে যাত্রা করা হয়।[১২] হিরাক্লিয়াসের সেনারাও ইয়ারমুকের দিকে যাত্রা করে। মুসলিম সৈনিকরা ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দের জুলাইয়ে এখানে পৌছে। মধ্য জুলাইয়ের এক বা দুই সপ্তাহের আশেপাশে বাইজেন্টাইন সেনারাও পৌছে।[১৩] খালিদের মোবাইল গার্ড বাহিনী সাহায্যকারী আরব খ্রিষ্টানদের পরাজিত করে।

আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত কিছু ঘটেনি। যুদ্ধ সর্বমোট ছয় দিন ধরে চলে। আবু উবাইদাহ সমগ্র সেনাবাহিনীর কমান্ড খালিদের উপর ন্যস্ত করেন। ৬৩৬ খ্রিষ্টাব্দের অক্টোবরে পাঁচ গুণ বড় বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনী পরাজিত হয়। আবু উবাইদাহ ভবিষ্যত বিজয়ের ব্যাপারে পরিকল্পনার জন্য তার সকল উচ্চ অফিসারদের নিয়ে আলোচনা করেন। তারা জেরুজালেম বিজয়ের সিদ্ধান্ত নেন। জেরুজালেমের অবরোধ চার মাস পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এরপর খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাবের ব্যক্তিগত উপস্থিতির শর্তে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়।

খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব জেরুজালেম আসেন। ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল জেরুজালেম আত্মসমর্পণ করে। আবু উবাইদাহ অন্য কমান্ডার আমর ইবনুল আস, ইয়াজিদ ইবনে আবু সুফিয়ান, শুরাহবিল ইবনে হাসানাকে তাদের পূর্বের এলাকায় পুনরায় জয়ের জন্য পাঠান। বেশিরভাগ এলাকাই লড়াই না করে অধীনতা স্বীকার করে। আবু উবাইদাহ ও খালিদ ১৭,০০০ সৈনিকসহ উত্তর সিরিয়া জয়ের জন্য এগিয়ে যান। খালিদকে তার অশ্বারোহী বাহিনীর সাথে হাজির পাঠানো হয়। আবু উবাইদাহ কাসরিন শহরের দিকে যাত্রা করেন।

হাজিরের যুদ্ধে খালিদ একটি শক্তিশালী বাইজেন্টাইন সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেন এবং আবু উবাইদাহর পূর্বেই কাসরিন পৌছেন। শহরটি খালিদের কাছে আত্মসমর্পণ করে। ৬৩৭ এর জুন মাসে আবু উবাইদাহ এখানে পৌছান। এরপর আবু উবাইদাহ আলেপ্পোর দিকে যাত্রা করেন। খালিদ এসময় বরাবরের মত অশ্বারোহীদের নেতৃত্ব দেন। আলেপ্পোর অবরোধের পর অক্টোবরে শহর আত্মসমর্পণ করে।

আনাতোলিয়া অধিকার[সম্পাদনা]

খালিদ বিন ওয়ালিদের সিরিয়া আক্রমণের সময় অনুসৃত পথ।

সমগ্র উত্তর সিরিয়া জয়ের পর আবু উবাইদাহ ও খালিদ বিন ওয়ালিদ আনাতোলিয়ার দিকে এগিয়ে যান। বাইজেন্টাইন সেনাদের সম্মুখ ও পিছনের অংশ নিষ্কন্টক করার জনয আজাজ দুর্গ জয় করা হয়। এন্টিওকের পথে একটি নদীর কাছে রোমান বাহিনী তাদের গতিরোধ করে। এ নদীতে একটি লোহার সেতু ছিল। এজন্য এ যুদ্ধকে লোহা সেতুর যুদ্ধ বলা হয়। মুসলিমরা বাইজেন্টাইনদের পরাজিত করে। ৩০ সেপ্টেম্বর ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে এন্টিওক আত্মসমর্পণ করে। এ বছরের পরবর্তী সময়ে আবু উবাইদাহ খালিদ ও আয়াজ বিন গানাম নামে আরেকজন সেনাপতিকে দুটি পৃথক সেনাদলের দায়িত্ব দিয়ে আল জাজিরা অধিকারের জন্য পাঠান। এর অধিকাংশ এলাকাই শক্ত প্রতিরোধ ছাড়া অধিকার করা হয়। এর মধ্যে আনাতোলিয়ার অংশবিশেষ, এডেসা ও আরারাত অঞ্চল ছিল। অন্যান্য আনাতোলিয়া আনাতোলিয়ার পশ্চিমে তোরোস পর্বতমালার দিকে পাঠানো হয়। মারাশমালাটয়ার গুরুত্বপূর্ণ শহর খালিদ ৬৩৮ খ্রিষ্টাব্দের শরতে জয় করেন। উসমানের খিলাফতের সময় এ অঞ্চলের বেশ কিছু দুর্গ দখল করে নেয়। এরপর তার আদেশে নিয়ন্ত্রণ পুনস্থাপনের জন্য ধারাবাহিক অভিযান চালানো হয়। ৬৪৭ এ মুয়াবিয়া সিরিয়ার গভর্নর হিসেবে আনাতোলিয়ায় অভিযান পরিচালনা করেন। মুসলিমরা কাপাডোসিয়া আক্রমণ করে এবং কায়সারিয়া মাজাকা জয় করে। ৬৪৮ এ রাশিদুন সেনাবাহিনী ফ্রিজিয়া আক্রমণ করে। ৬৫০-৬৫১ সময়কালে কিলিকিয়াইসাওরিয়ায় সংঘর্ষের পর বাইজেন্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় কন্সটান্স উসমানের গভর্নর মুয়াবিয়ার সাথে সন্ধি চুক্তি করেন। এর ফলে কিছু সময়ের অবকাশ পাওয়া যায় এবং দ্বিতীয় কন্সটান্স আর্মেনিয়ার পশ্চিম অংশ ধরে রাখতে সক্ষম হন। ৬৫৪-৬৫৬ সময়কালে খলিফা উসমানের আদেশে বাইজেন্টাইন রাজধানী কনস্টান্টিনোপল আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়া হয়। কিন্তু ৬৫৬ খ্রিষ্টাব্দে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়লে তা কার্যকর করা যায়নি।

খলিফা উসমানের শাসনকালে তুরস্কের তোরোস পর্বতমালা আনাতোলিয়ায় রাশিদুন খিলাফতের পশ্চিম সীমান্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়।

মিশর বিজয়[সম্পাদনা]

মিশরে মুসলিম আক্রমণের সময় অনুসৃত পথ।

মুসলিমদের মিশর বিজয়ের সময় মিশর বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের অংশ ছিল। এক দশক আগে সাসানীয় সম্রাট দ্বিতীয় খসরু এটি অধিকার করে নেন। মুসলিমদের অভিযানের সময় বাইজেন্টাইনদের ক্ষমতা অনেক কমে যায় ফলে বিজয় সহজ হয়েছিল। ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দে আমর ইবনুল আসের নেতৃত্বাধীন ৪,০০০ সৈনিককে খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব প্রাচীন ফারাওদের দেশ জয়ের জন্য পাঠান। ৬৩৯ এর ডিসেম্বরে রাশিদুন সেনারা ফিলিস্তিন থেকে মিশরে প্রবেশ করে এবং দ্রুত নীল বদ্বীপ অঞ্চলে চলে আসে। রাজকীয় গেরিসন দেয়ালঘেরা শহরের দিকে পিছু আসে। এখানে তারা এক বছর বা তার কিছু বেশি সফলভাবে অবস্থান ধরে রাখে। কিন্তু আরো সেনাসাহায্য পাঠায় এবং আক্রমণকারী মূল বাহিনীর সাথে আরো ১২,০০০ হাজার সৈনিক ৬৪০ খ্রিষ্টাব্দে যুক্ত হয়। তারা হেলিওপলিসের যুদ্ধে বাইজেন্টাইনদের পরাজিত করে। এরপর সেনাপতি আমর আলেক্সান্দ্রিয়ার দিকে যাত্রা করে। ৬৪১ খ্রিষ্টাব্দের ৮ নভেম্বর আলেক্সান্দ্রিয়া তার কাছে চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করে। ধারণা করা হয় থিবাইড কোনো প্রতিরোধ না করে আত্মসমর্পণ করেছে।

এই মূল্যবান প্রদেশ বাইজেন্টাইনদের হাতছাড়া হওয়ার কারণ হিসেবে মিশরের গভর্নর সাইরাসের প্রতারণা ও বাইজেন্টাইন সেনাপতিদের অযোগ্যতাকে ধরা হয়।[১৪] সেসাথে সিরিয়ায় মুসলিম সেনাদের সাথে লড়াইয়ে অধিকাংশ সেনা হারানোকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সাইরাস স্থানীয় কপ্টিক খ্রিষ্টানদের উপর নির্যাতন করেন। তিনি মনোথেলিজমের একজন লেখক। কারো কারো ধারণা, তিনি গোপনে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

খলিফা উসমানের শাসনকালে ৬৪৫ খ্রিষ্টাব্দে আলেক্সান্দ্রিয়া পুনরুদ্ধারের একটি প্রচেষ্টা চালানো হলে আমর ইবনুল আস প্রতিহত করেন। ৬৫৪ তে দ্বিতীয় কন্সটান্সের একটি নৌ আক্রমন চালালে তা প্রতিহত করা হয়। এরপর থেকে বাইজেন্টাইনরা এ অঞ্চল পুনরায় অর্জনের জন্য আর প্রচেষ্টা চালায়নি।

মুসলিমদেরকে বাইজেন্টাইনদের চাইতে বেশি সহনশীল বিবেচনা করে কিছু কপ্ট মুসলিমদের সাহায্য করে। পরবর্তীতে এরা ইসলাম গ্রহণ করে। কর ও সেনাবাহিনীকে সহায়তা করার জন্য মিশরের খ্রিষ্টানদের সামরিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। তারা নিজস্ব ধর্মীয় ও শাসনতান্ত্রিক স্বাতন্ত্র ধরে রাখার সুযোগ পায়। অন্যরা বাইজেন্টাইনদের সাথে যোগ দেয় এ আশাতে যে তারা আরবদের বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।[১৫] খলিফা আলির শাসনকালে প্রাক্তন সেনাপতি আমর ইবনুল আসের অধীনে চলে যায়। মিশরের বিদ্রোহী সেনারা আলির নিযুক্ত মিশরের গভর্নর মুহাম্মদ ইবনে আবি বকরকে হত্যা করে।

উত্তর আফ্রিকা বিজয়[সম্পাদনা]

সেবেইটলার (সাফেটুলা) রোমান ধ্বংসাবশেষ

মিশর থেকে বাইজেন্টাইনদের বিদায়ের পর গ্রেগরি দ্য পেট্রিসিয়ানের অধীনে আফ্রিকার রোমান অধিকৃত অঞ্চল স্বাধীনতা ঘোষণা করে। গ্রেগরির শাসন মিশর থেকে মরক্কো পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। আবদুল্লাহ ইবনে সাদ পশ্চিমে অভিযানকারী পাঠাতেন। এসকল অভিযানের ফলে মুসলিমরা প্রচুর পরিমাণে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ অর্জন করে। এসকল অভিযানের সাফল্যের ফলে আবদুল্লাহ ইবনে সাদ উত্তর আফ্রিকা জয়ের জন্য নিয়মিত অভিযান পরিচালনা কথা অনুভব করেন।

মজলিস আল শুরাতে আলোচনার পর খলিফা উসমান অভিযানের অনুমতি দেন। ১০,০০০ সৈনিকের একটি বাহিনী সেনাসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য পাঠানো হয়। সিরেনিকার বারকা নামক স্থানে রাশিদুন সেনাবাহিনী একত্রিত হয়। এখান থেকে তারা ত্রিপলি জয়ের জন্য পশ্চিমে অগ্রযাত্রা করে। ত্রিপলি থেকে তারা সুফেটুলা যাত্রা করে যা তখন রাজা গ্রেগরির রাজধানী ছিল। আবদুল্লাহ ইবনুল জুবায়েরের চমৎকার রণকৌশলের কারণে গ্রেগরি যুদ্ধে পরাজিত ও নিহত হন। যুদ্ধের পর উত্তর আফ্রিকার মানুষ শান্তির জন্য এগিয়ে আসে। তারা বার্ষিক কর প্রদানে সম্মত হয়। উত্তর আফ্রিকাকে একীভূত না করে মুসলিমরা একে অনুগত রাষ্ট্র হিসেবে ধরে রাখে। চুক্তি মোতাবেক কর সংগ্রহের পর মুসলিমরা বারকা থেকে ফিরে আসে। প্রথম ফিতনার পর মুসলিম সেনারা উত্তর আফ্রিকা থেকে মিশরে চলে আসে। ৬৬৪ খ্রিষ্টাব্দে উমাইয়া খিলাফত পুনরায় উত্তর আফ্রিকায় অভিযান চালায়।

নুবিয়ার (সুদান) বিরুদ্ধে অভিযান[সম্পাদনা]

সুদানের মেরো অঞ্চলে কুশি শাসকদের পিরামিড

উমর খিলাফতের সময় ৬৪২ খ্রিষ্টাব্দে নুবিয়া অঞ্চলে অভিযান পরিচালনা করা হয়। কিন্তু ডনগোলার প্রথম যুদ্ধের পর মাকুরিয়ানরা বিজয়ের পর অভিযান ব্যর্থ হয়। সেনারা সফলতা ছাড়া নুবিয়া থেকে ফিরে আসে। দশ বছর পর আবদুল্লাহ ইবনে সাদ নুবিয়ায় আরেকটি বাহিনী পাঠান। এই বাহিনী নুবিয়ার অনেক গভীরে চলে যায় এবং নুবিয়ার রাজধানী ডনগোলার উপর অবরোধ আরোপ করে। এবারও মাকুরিয়া বিজয়ী হয়। এরপর দুপক্ষের মধ্য চুক্তি হয়। চুক্তি মোতাবেক কোনো পক্ষ কারো উপর আক্রমণ করবে না। প্রত্যেক পক্ষ নিজেদের এলাকায় অন্যদের স্বাধীন চলাচলের ব্যাপারে একমত হয়। নুবিয়া বার্ষিক ৩৬০ জন দাস মিশরে পাঠাতে সম্মত হয়। বিপরীতে মিশর নুবিয়ায় শস্য, ঘোড়া ও বস্ত্র চাহিদামত নুবিয়ায় পাঠাবে।

ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ বিজয়[সম্পাদনা]

জিমনেশিয়াম, সালামিস, সাইপ্রাস

উমরের খিলাফতের সময় সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়া ভূমধ্যসাগরের দ্বীপ জয় করার জন্য নৌবাহিনী গঠনের অনুমতি চান। কিন্তু সমুদ্রে সৈনিকদের মৃত্যুর সম্ভাবনার কথা ভেবে উমর তা ফিরিয়ে দেন। উসমানের শাসনামলে মুয়াবিয়া নৌবাহিনী গঠনের অনুমতি পান। ৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে মুয়াবিয়ার নেতৃত্বে আরবরা সাইপ্রাসে প্রথম আক্রমণ করে। সংক্ষিপ্ত অবরোধের পর রাজধানী সালামিস-কনস্টানশিয়া জয় করা হয়। স্থানীয় শাসকরা চুক্তি স্বাক্ষর করে। অভিযানের সময় মুহাম্মদ (সা) এর একজন আত্মীয় উম্মে হারাম লারনাকা নামক স্থানে সল্ট লেকে খচ্চর থেকে পড়ে মারা যান। তাকে এখানে কবর দেয়া হয়। স্থানটি পরবর্তীতে স্থানীয় মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের কাছে পবিত্র স্থান হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক পরে অটোমানরা এখানে মাজার নির্মাণ করে। চুক্তি ভঙ্গের একটি ঘটনার পর আরবরা পুনরায় ৬৫৪ খ্রিষ্টাব্দে ৫০০ জাহাজ সহযোগে সাইপ্রাস আক্রমণ করে। মুসলিমরা সাইপ্রাস দখল করে নেয়। এবার ১২,০০০ সৈনিকের গেরিসন সাইপ্রাস থেকে যায় এবং দ্বীপটি মুসলিমদের প্রভাবে আসে।[১৬] সাইপ্রাস ত্যাগ করার পর মুসলিম নৌবাহিনী ক্রিট ও এরপর রোডস যাত্রা করে ও স্বল্প প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়ে এগুলোকে জয় করে নেয়। ৬৫২-৬৫৪ সময়কালে মুসলিমরা সিসিলি অভিযান চালায় ও দ্বীপের বড় অংশ দখল করে নেয়। উসমানের হত্যাকান্ডের পর বড় ধরনের কোনো অভিযান চালানো হয়নি ও মুসলিমরা সিসিলি থেকে পিছু হটে আসে। ৬৫৫ খ্রিষ্টাব্দে বাইজেন্টাইন সম্রাট দ্বিতীয় কন্সটান্স মুসলিমদের আক্রমণ করার জন্য ফিনিকে আক্রমন করেন কিন্তু এই তারা ব্যর্থ হয়। যুদ্ধে ৫০০ বাইজেন্টাইন জাহাজ ধ্বংস হয়। সম্রাট নিজে খুব কষ্টে মৃত্যুর হাত থেকে বেঁচে ফেরেন।

ইবেরিয়ান উপদ্বীপে প্রথম মুসলিম অভিযান[সম্পাদনা]

উমাইয়া খলিফা ওয়ালিদ ইবনে আবদুল মালিকের শাসনকালে তারিক বিন জিয়াদমুসা ইবনে নুসাইর ৭১১-৭১৮ সময়কালে স্পেন বিজয় করেন। মুসলিম ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ ইবনে জারির আল তাবারি বলেন, উসমানের খিলাফতের সময় ৬৫৩ খ্রিষ্টাব্দে মুসলিমরা সর্বপ্রথম স্পেন আক্রমণ করে।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] অন্যান্য মুসলিম ঐতিহাসিক যেমন ইবনে কাসির আল তাবারির মতকে সমর্থন করেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

আল তাবারির মতে উত্তর আফ্রিকা আবদুল্লাহ ইবনে সাদ জয় করেন। তার দুজন সেনাপতি আবদুল্লাহ নাফিয়াহ ইবনে হুসাইন ও আবদুল্লাহ ইবনে নাফি ইবনে আবদুল কাইসকে স্পেনের উপকূল আক্রমণের জন্য দায়িত্ব দেয়া হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

খলিফা উসমানের শাসনের সময় স্পেন অভিযানের বিস্তারিত আল তাবারির বিবরণীতে পাওয়া যায় না। তবে আল তাবারির বিবৃতি স্বাধীন সূত্র দ্বারা সমর্থিত না।

বিজিত জনগোষ্ঠীর সাথে আচরণ[সম্পাদনা]

অধিকৃত অঞ্চলের অমুসলিম একেশ্বরবাদী সম্প্রদায় যেমন ইহুদি, জরস্ট্রিয়ান, খ্রিষ্টানদের জিম্মি বা সুরক্ষিত নাগরিক বলা হত। ইসলাম গ্রহণকারীদের সাথে অন্যান্য মুসলিমদের মতই আচরণ করা হত এবং তারা সমান আইনি অধিকার ভোগ করত। অমুসলিমরা তাদের ধর্মীয় মতে আইনি সুবিধা ভোগ করত।

জিম্মিরা তাদের ধর্ম চর্চা ও সম্প্রদায় ভিত্তিক স্বশাসনের সুবিধা পেত। জিজিয়া কর ও মুসলিম শাসনকে মেনে নেয়ার বিনিময়ে তাদের ব্যক্তিগত ও সম্পদের নিরাপত্তা দেয়া হত।[১৭] অন্যদিকে মুসলিমদের উপর জাকাত ও খারাজ প্রদানের নিয়ম ছিল।[১৮] অক্ষম জিম্মিদের জিজিয়া দিতে হত না। কিছু ক্ষেত্রে তাদের রাষ্ট্র থেকে অর্থ সাহায্য দেয়া হত।

জিম্মিদের প্রতি খুলাফায়ে রাশেদীনরা বিশেষ ব্যবস্থা প্রদান করেছিলেন। ইসলামি সাম্রাজ্য তাদের সুরক্ষা দিয়েছিল এবং তারা লড়াই করতে বাধ্য ছিল না বরং মুসলিমরা তাদের প্রতিরক্ষা দিতে দায়বদ্ধ ছিল। কখনো কখনো যখন যথেষ্ট সংখ্যক যোগ্য মুসলিম পাওয়া যেত না তখন জিম্মি উপযুক্ত সরকারি পদ দেয়া হত। জিম্মিরা নিজেদের উপাসনালয় রক্ষণাবেক্ষণের অনুমতিপ্রাপ্ত হত।

প্রশাসনিক কাঠামো[সম্পাদনা]

দামভান্দ পর্বত, ইরানের সর্বোচ্চ পর্বত, আলবুরজ পর্বতমালায় অবস্থিত।

দারুল ইসলামের প্রশাসনিক ভিত্তি মুহাম্মদ (সা) এর সময়ে স্থাপিত হয়। আবু বকর খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পর প্রথম ভাষণে বলেন, "যদি আমি আল্লাহ ও তার রাসুলের আদেশের বাইরে কিছু আদেশ দিই তবে আমার আদেশ মানবে না।" একে খিলাফতের ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। খলিফা উমর বলেন, "হে মুসলিমরা, যখন আমি ভুল কিছু করি তখন আমাকে তোমাদের হাত দিতে সোজা করে রাখ।" এর জবাবে মুসলিমরা দাঁড়িয়ে বলে, "হে আমিরুল মুমিনিন, যদি আপনি আমাদের হাতের মাধ্যমে সঠিক না হন তবে আমরা আমাদের তলোয়ার ব্যবহার করব।" একথা শুনে খলিফা উমর বলেন, "আলহামদুলিল্লাহ (সকল প্রশংসা আল্লাহর জন্য) যে আমার এমন অনুসারী রয়েছে।"[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] প্রশাসনিক ক্ষেত্রে উমর অন্য সবার চেয়ে দক্ষ ছিলেন। তার প্রশাসনিক দক্ষতার কারণে সাম্রাজ্যের অধিকাংশ প্রশাসনিক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন] আবু বকরের সময় সাম্রাজ্য স্পষ্টভাবে প্রদেশে বিভক্ত ছিল না। তবে এখানে অনেক প্রশাসনিক জেলা ছিল। উমরের খিলাফতের সময় সাম্রাজ্যকে বেশ কয়েকটি প্রদেশে ভাগ করা হয়। এগুলো হলঃ

  1. আরবকে মক্কা ও মদিনা এ দুই প্রদেশে ভাগ করা হয়।
  2. ইরাককে বসরা ও কুফা এ দুই প্রদেশে ভাগ করা হয়।
  3. জাজিরা প্রদেশ টাইগ্রিসইউফ্রেটিস নদীর উত্তর পর্যন্ত গঠন করা হয়।
  4. সিরিয়া নিজে একটা প্রদেশ ছিল।
  5. ফিলিস্তিনকে আয়লিয়া ও রামলাহ নামক প্রদেশে ভাগ করা হয়।
  6. মিশরকে ঊর্ধ্ব মিশর ও অধো মিশর নামক দুইটি প্রদেশে ভাগ করা হয়।
  7. পারস্যকে খোরাসান, আজারবাইজানফারস নামক প্রদেশে ভাগ করা হয়।

নিজের উইলে উমর আদেশ দেন যেন তাঁর মৃত্যুর এক বছর পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক পরিবর্তন করা না হয়। তাই খলিফা উসমান এক বছরের জন্য পূর্বের মতই প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখেন। পরবর্তী কালে এতে পরিবর্তন আনা হয়। তিনি মিশরকে এক প্রদেশে পরিবর্তন করেন এবং উত্তর আফ্রিকাকে নিয়ে নতুন প্রদেশ গঠন করেন। সিরিয়াও দুই প্রদেশের পরিবর্তে এক প্রদেশে পরিণত হয়।

উসমানের খিলাফতের সময় সাম্রাজ্য ১২টি প্রদেশে বিভক্ত ছিল। এগুলো হলঃ মদিনা, মক্কা, ইয়েমেন, কুফা, বসরা, জাজিরা, ফারস, আজারবাইজান, খোরাসান, সিরিয়া, মিশর এবং উত্তর আফ্রিকা।

আলির খিলাফতের সময় মুয়াবিয়ার শাসিত সিরিয়া ও আমর ইবনুল আস শাসিত মিশর ছাড়া বাকি দশটি প্রদেশে পূর্বের প্রশাসনিক কাঠামো বজায় রাখা হয়।

প্রদেশগুলো আরো জেলায় ভাগ করা হত। এগুলো একেকজন গভর্নর বা ওয়ালি দ্বারা শাসিত হত। প্রশাসনিক পর্যায়ের অন্যান্য কর্মকর্তারা হলেন”

  1. কাতিব, প্রধান সচিব
  2. কাতিব উদ দিওয়ান, সামরিক সচিব
  3. সাবিব উল খারাজ, রাজস্ব সংগ্রাহক
  4. সাহিব উল আহদাস, প্রধান পুলিশ
  5. সাহিব উল বাইতুল মাল, কোষাগার অফিসার
  6. কাজি, প্রধান বিচারক

অধিকাংশ প্রদেশে গভর্নর সেনাবাহিনীর কমান্ডার ইন চীফ হলেও কিছু প্রদেশে পৃথক সামরিক অফিসার থাকত।

খলিফা নিজে অফিসারদের নিয়োগ দিতেন। নিয়োগ লিখিতভাবে দেয়া হত। নিয়োগের সময় গভর্নরের দায়িত্ব কীভাবে নির্বাহ করতে হবে তা জানিয়ে দেয়া হত।[১৯]

অফিসারদের প্রতি উমরের আদেশ ছিলঃ

"মনে রেখ, আমি তোমাদেরকে আদেশদাতা বা অত্যাচারী হিসেবে নিয়োগ দিচ্ছি না। আমি তোমাদের নেতা হিসেবে পাঠাচ্ছি যাতে মানুষ তোমাদের উদাহরণ অনুসরণ করতে পারে। মুসলিমদের তাদের অধিকার প্রদান কর এবং তাদের আঘাত কর না পাছে তারা অপমানিত হয়। তাদের অন্যায় প্রশংসা কর না পাছে তারা আত্মগরিমায় ভোগে। নিজেদের দরজা তাদের জন্য বন্ধ কর না পাছে তাদের মধ্যে শক্তিশালী ব্যক্তি দুর্বলের অধিকার খর্ব করে ফেলে। এবং নিজেকে তাদের চেয়ে উচ্চতর হিসেবে আচরণ কর না, এটা তাদের উপর অত্যাচার।"
তাদরারত পর্বত, লিবিয়া।

আবু বকরের খিলাফতের সময় রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ছিল। তবে উমরের সময় রাজস্ব এবং আয়ের অন্যান্য উৎস বৃদ্ধি পায়। উমর দুটি কর প্রবর্তন করেন। একটি উশর বা আমদানী শুল্ক। রাষ্ট্র অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছিল। ফলে উমর লোভলালসা ও দুর্নীতি থেকে কর্মকর্তাদেরকে দূরে রাখার জন্য তাদেরকে কঠোরভাবে শাসন করার নীতি অবলম্বন করেন। তাঁর শাসনকালে, প্রত্যেক কর্মকর্তার নিয়োগের সময় নিম্নোক্ত শপথ নিতে হতঃ

  1. কখনো তুর্কি ঘোড়ায় চড়া যাবে না। (এটাকে সে সময় আভিজাত্যের বস্তু ধরা হত)।
  2. কখনো উৎকৃষ্ট পোষাক পড়া যাবে না।
  3. চালুনি দ্বারা চালা আটা খাওয়া যাবে না।
  4. দরজায় দারোয়ান রাখা যাবে না।
  5. জনসাধারণের জন্য সবসময় দরজা খোলা রাখতে হবে।

তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে এ নীতিগুলো কঠোরভাবে মেনে চলতেন। উসমানের খিলাফতকালে রাষ্ট্র অর্থনৈতিকভাবে আরো শক্তিশালী হয়ে উঠে। নাগরিকদের জন্য বরাদ্দ ভাতা ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয় এবং সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা অধিক স্থিতিশীল হয়ে উঠে। ফলে তাঁকে শপথের দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধারা প্রত্যাহার করতে হয়। নিয়োগের সময় ব্যক্তির সম্পদের হিসাব লিপিবদ্ধ করে রাখা হত। কোনো কর্মকর্তার সম্পদের মধ্যে অস্বাভাবিক বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেলে তাকে অবিলম্বে জবাবদিহিতার জন্য ডাকা হত এবং বেআইনি সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হত। প্রধান কর্মকর্তাদের হজের সময় মক্কায় আসতে হত। এসময় লোকেরা তাদের ব্যাপারে যেকোনো অভিযোগ করতে পারত। দুর্নীতি হ্রাসের করার জন্য উমর রাষ্ট্রীয় ব্যক্তিদের উচ্চ বেতনের ব্যবস্থা করেন। প্রাদেশিক গভর্নররা যদি নিজস্ব অঞ্চলে সেনাবাহিনীর প্রধান হতেন তবে তাদের যুদ্ধলব্ধ সম্পদের পাশাপাশি বার্ষিক পাঁচ থেকে সাত হাজার দিরহাম করে পেতেন।

বিচারিক কাঠামো[সম্পাদনা]

রাশিদুন খিলাফতের বেশিরভাগ প্রশাসনিক কাঠামো উমর কর্তৃক স্থাপিত হয়। বিচারবিভাগীয় প্রশাসনও তার মাধ্যমেই সূচিত হয় এবং মৌলিক কোনো পরিবর্তন ছাড়া অন্যান্য খলিফারা এক্ষেত্রে তাকে অনুসরণ করেন। পর্যাপ্ত ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর একটি বিচারবিভাগীয় কাঠামো দাড় করানো হয়। ইসলামের মূলনীতি অনুসারে বিচার কাজ পরিচালনা করা হত।

বিচার কাজ পরিচালনার জন্য সকল প্রশাসনিক পযায়ে কাজি নিযুক্ত করা হত। ইসলামি জ্ঞানের ব্যাপারে দক্ষতার উপর কাজি নির্বাচন করা হত। কাজিরা যাতে ঘুষ গ্রহণ না করে সেজন্য তাদের উচ্চ বেতন দেয়া হত। উচ্চ সামাজিক মর্যাদা আছে এমন লোকদের নিয়োগ দেয়া হত যাতে করে ঘুষ গ্রহণের প্রবণতা না থাকে এবং অন্যের সামাজিক অবস্থান দ্বারা প্রভাবিত না হয়। কাজিরা বাণিজ্যে অংশ নিতে পারতেন না। পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ করা হত এবং কোনো জেলা কাজি ছাড়া ছিল না।

খলিফা নির্বাচন বা নিয়োগ[সম্পাদনা]

ফ্রেড ডোনার তার দ্য আর্লি ইসলামিক কনকোয়েস্ট (১৯৮১) বইয়ে উল্লেখ করেন যে খিলাফতের সময় আরব গোত্রের নেতা নির্বাচনের পদ্ধতি ছিল এমন, নেতার মৃত্যুর পর নিজেদের মধ্য থেকে নতুন নেতা নির্বাচন করা হত, তবে এখানে আলোচনার কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়মনীতি বা আলোচনা সভা ছিল না। সাধারণত প্রার্থীরা মৃতের বংশ থেকেই হত তবে তার পুত্র হতে হবে এমন কথা ছিল না। অযোগ্য উত্তরাধিকারীর চাইতে দক্ষ ব্যক্তি অধিক উত্তমভাবে নেতৃত্ব দিতে পারবে। অধিকাংশ সুন্নি মতানুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধান বা গভর্নর বংশধারা থেকে হতে হবে এমন ভিত্তি নেই বলে অধিক যোগ্য ব্যক্তিকে বংশধারা থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়।

আবু বকর সমাজ কর্তৃক নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সুন্নিদের মতে এটি যথার্থ নিয়ম। সুন্নিদের মতে খলিফাকে নির্বাচন বা সম্প্রদায়ের সম্মতির ভিত্তিতে নির্বাচিত হতে হবে। রাশিদুন খিলাফতের পর খলিফার পদ উত্তরাধিকার সূত্রে বর্তাতে থাকে। সুন্নিদের মতে এটি খুলাফায়ে রাশেদীন যুগের সমাপ্তি।

আবু বকর আল বাকিলানি বলেন যে মুসলিমদের নেতাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আসতে হবে। আবু হানিফাও লিখেছেন যে নেতাকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে আসতে হবে।[২০]

সুন্নি বিশ্বাস[সম্পাদনা]

মুহাম্মদ (সা) এর মৃত্যুর পর সাকিফাহ নামক স্থানে একটি সভা শুরু হয়। এ সভায় আবু বকর মুসলিমদের কর্তৃক খলিফা নির্বাচিত হন। সুন্নি মুসলিমদের বিশ্বাস অনুযায়ী খলিফা হলেন ইসলামি আইনের অধীনে শাসন করার জন্য নিযুক্ত একজন অস্থায়ী রাজনৈতিক নেতা। আইনের ব্যাখ্যা দেয়ার ভার মুজতাহিদ বা সম্মিলিতভাবে অবিহিত ওলামা নামক আইনবিদদের উপর বর্তায়। প্রথম চারজন খলিফাকে রাশিদুন বলা হয়। এর অর্থ সঠিক পথের উপর পরিচালিত কারণ বিশ্বাস অনুযায়ী তারা কুরআন ও মুহাম্মদ (সা) এর সুন্নাহ বা দৃষ্টান্ত সর্বক্ষেত্রে সঠিকভাবে অনুসরণ করেছেন।

মজলিস আলশুরা: সংসদ[সম্পাদনা]

প্রথাগত সুন্নি ইসলামি আইনবিদদের মতে শুরা বা জনগণের পরামর্শ খিলাফতের কর্মকাণ্ডের অন্তর্গত। মজলিস আলশুরা খলিফাকে উপদেশ দেয়। কুরআনের নিম্নোক্ত আয়াত এর গুরুত্ব সম্পর্কে উল্লেখ করে:

...যারা তাদের প্রভুর ডাকে সাড়া দেয় ও নামাজ প্রতিষ্ঠা করে ও যারা আলোচনার মাধ্যমে তাদের কাজ সম্পাদন করে। [তাদের আল্লাহ ভালোবাসেন](কুরআন ৪২:৩৮)

...আর কাজকর্মে তাদের সাথে পরামর্শ করো। আর তুমি কোনো সংকল্প গ্রহণ করলে আল্লাহর প্রতি নির্ভর করবে।(কুরআন ৩:১৫৯)

মজলিস নতুন খলিফা নির্বাচনের দায়িত্ব পালনকারী। আল মাওয়ারদি লিখেছেন যে মজলিসের সদস্যদের তিনটি শর্ত পূরণ করতে হবেঃ তাদের অবশ্যই ন্যায়পরায়ণ হতে হবে, তাদের অবশ্যই ভালো খলিফার সাথে খারাপের পার্থক্য করার জ্ঞান থাকতে হবে, এবং তাদের অবশ্যই উত্তম খলিফা নির্বাচন করার জ্ঞান ও বিচারের ক্ষমতা থাকতে হবে। তিনি আরো বলেন যখন জটিল পরিস্থিতিতে কোনো খিলাফত ও মজলিস থাকবে না জনগণকে নিজেদের মধ্য থেকে মজলিস সৃষ্টি করতে হবে, খলিফার জন্য প্রার্থীদের তালিকা তৈরী করতে হবে, এরপর মজলিস প্রার্থীদের মধ্য থেকে কাউকে নির্বাচন করবে।[২০]

সাইদ কুতুবতাকিউদ্দিন আল নাবহানি মজলিস আলশুরার ভূমিকার কিছু আধুনিক ব্যাখ্যা দেন। কুরআনের শুরা নামক সূরার ব্যাখ্যায় কুতুব বলেন যে শাসককে কমপক্ষে কিছু সংখ্যক (সাধারণ অভিজাত) শাসিতের সাথে পরামর্শ করতে হবে। তাকিউদ্দিন আল নাবহানি লিখেছেন যে শুরা গুরুত্বপূর্ণ এবং এটি ইসলামি খিলাফতের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো তবে স্তম্ভ নয়। অমুসলিমরা মজলিসে দায়িত্বপালন করতে পারবে তবে ভোট বা গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাবে না।

শাসকের দায়বদ্ধতা[সম্পাদনা]

কুরআনের এই কপিটি উসমানের আমলে সংকলিত সর্বাপেক্ষা প্রাচীন কপি বলে গণ্য করা হয়।

কখন শাসকের অবাধ্যতা, অভিশংসন বা ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে তা নিয়ে সুন্নি ইসলামি আইনবিদরা আলোচনা করেছেন। সাধারণত যখন শাসক ইসলামে জনসাধারণের প্রতি তার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবে না তখন এসব পদক্ষেপ নেয়া যায়।

আল মাওয়ারদি বলেন যে শাসকরা যদি ইসলামে নির্দেশিত তার দায়িত্ব পালন করে তবে জনগণকে অবশ্যই তাদের আনুগত্য স্বীকার করতে হবে, কিন্তু যদি শাসকরা যদি অন্যায়কারী বা অকার্যকর হয় তবে তাদের অবশ্যই মজলিস আলশুরা কর্তৃক অভিশংসন করতে হবে। একইভাবে আল বাগদাদির মতে যদি শাসকরা ন্যায়বিচার সমুন্নত না রাখে, তবে মজলিসের মাধ্যমে উম্মাহ তাদের সতর্ক করবে এবং যদি তারা তা পালন না করে তবে খলিফাকে অভিশংসন করা যাবে। আল জুয়ায়নি বলেন যে উম্মাহর লক্ষ্য হল ইসলাম, তাই যে শাসক এ লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হবে তাকে অবশ্যই অভিশংসনের আওতায় আসতে হবে। আল গাজালির মতে খলিফা কর্তৃক নির্যাতন তাকে অভিশংসনের জন্য যথেষ্ট। শুধু অভিশংসনের উপর নির্ভর না করে ইবনে হাজার আসকালানি শাসকের ইসলামি আইন অনুযায়ী কাজ না করার কারণে জনগণের বিদ্রোহকে সমর্থন করেন। তার মতে এধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে যাওয়া হারাম এবং যারা খিলাফতের ভেতরে বিদ্রোহ করতে পারবে না তাদের বাইরে থেকে সংগ্রাম চালাতে হবে। আসকালানি কুরআনের দুটি আয়াত এ উদ্দেশ্যে উল্লেখ করেন:

...এবং তারা (কিয়ামতের দিন পাপিরা) বলবে, "হে আমাদের প্রভু! আমরা আমাদের নেতা ও প্রধানদের আনুগত্য করেছিলাম, এবং তারা আমাদের সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত করেছিল। হে আমাদের প্রভু! তাদেরকে আমাদের চেয়ে দ্বিগুণ শাস্তি দিন এবং ভয়াবহ অভিশাপ দিন..." (কুরআন ৩৩:৬৭)

ইসলামি আইনবিদদের মতে যখন শাসক সফল অভিশংসন দ্বারা সরে যেতে চাইবে না তখন সে দুর্নীতিপূর্ণ সেনাবাহিনীর সমর্থনে একনায়কে পরিণত হয়, যদি সংখ্যাগরিষ্ঠরা মত প্রকাশ করে তবে তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ পরিচালনার সুযোগ তাদের সামনে রয়েছে।[২০]

আইনের শাসন[সম্পাদনা]

নিম্নোক্ত হাদিসটি আত্মীয়তা ও দায়িত্ববোধের ব্যাপারে আইনের শাসনের নীতি প্রতিষ্ঠিত করে[২১]


আয়িশা থেকে বর্ণিত, কুরাইশের লোকেরা বনি মাখজুমের চুরি করা এক নারীর ব্যাপারে উদ্বিগ্ন ছিল। তারা বলল, "তার ব্যাপারে কে আল্লাহর রাসুলের কাছে মধ্যস্থতা করবে?" কেউ কেউ বলল, "আল্লাহর রাসুলের প্রিয় ব্যক্তি উসামা বিন জায়িদ ছাড়া কেউ এ কাজ করতে পারবে না।“ যখন উসামা এ ব্যাপারে আল্লাহর রাসুলের সাথে কথা বলেন আল্লাহর রাসুল বলেন, "তুমি কি আল্লাহর নির্দেশিত শাস্তির ব্যাপারে মধ্যস্থতা করতে চেষ্টা করছ?" এরপর তিনি উঠে বসেন ও বক্তব্য রাখেন এই বলে, "তোমাদের পূর্বের জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে কারণ তাদের মধ্যে কোনো অভিজাত ব্যক্তি চুরি করলে তারা তাকে ক্ষমা করে দিত এবং কোনো গরীব ব্যক্তি চুরি করলে তারা আল্লাহর নির্দেশিত শাস্তির আদেশ পালন করত। আল্লাহর শপথ, যদি আমার মেয়ে ফাতিমাও চুরি করে, আমি তার কেটে দেব।"

অধিকাংশ ইসলামি আইনবিদ বেশ কিছু শর্তারোপ করেন, যেমন, দারিদ্রতার কারণে চুরি করা ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া যাবে না, এধরনের আইন বাস্তবায়ন করার আগে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পৌছা কষ্টসাধ্য হয়ে যায়। রাশিদুন খিলাফতের একটি দুর্ভিক্ষ সংঘটনকালে দুর্ভিক্ষ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদন্ড স্থগিত করা হয়েছিল।

ইসলামি আইনবিদরা পরবর্তীতে আইনের শাসনের ধারণা তৈরি করেন, সকল শ্রেণীর প্রতি একই আইনের বাস্তবায়ন যেখানে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না এবং যেখানে উচ্চপদধারী ব্যক্তি ও সাধারণ নাগরিক সবাই একই আইন মানতে বাধ্য থাকবে। একজন কাজি বা বিচারকও ধর্ম, লিঙ্গ, বর্ণ, আত্মীয়তা বা পক্ষপাত করতে অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন না। এমন ঘটনার নজির আছে যেখানে খলিফাকে বিচারকের সামনে এসে তার সিদ্ধান্ত মানতে হয়েছে।[২২]

হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক নোয়াহ ফেল্ডমেনের মতে, উনিশ শতকে উসমানীয় সাম্রাজ্য কর্তৃক শরিয়া আইনের সংকলনের মাধ্যমে একসময়কার আইনের শাসন সমুন্নত রাখা পন্ডিত ও আইনবিদদের প্রতিস্থাপন ঘটে।[২৩]

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

রাশিদুন খিলাফতের সময় খলিফা উমর ও উসমান কর্তৃক স্থাপিত বৈপ্লবিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার প্রভূত উন্নতি সাধিত হয়। সর্বপ্রথম উমর এসব সংস্কারকে শক্ত ভিত্তির উপর দাড় করান, তারপর তার উত্তরসুরি উসমান যিনি নিজেও একজন দক্ষ ব্যবসায়ী ছিলেন, এর আরো সংস্কার সাধন করেন। উসমানের শাসনকালে জনগণ সমৃদ্ধশালী জীবন লাভ করে।

বাইতুল মাল[সম্পাদনা]

বাইতুল মাল (শাব্দিক অর্থ, সম্পদের ঘর) ছিল রাষ্ট্রের রাজস্ব ও অন্যান্য অর্থনৈতিক ব্যাপারে দায়িত্বপালনকারী বিভাগ। মুহাম্মদ (সা) এর সময় কোনো স্থায়ী বাইতুল মাল বা কোষাগার ছিল না। সংগৃহিত রাজস্ব সরাসরি বন্টন করে দেয়া হত। বেতন দেয়ার ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় কোনো খরচ ছিল না। ফলে কোষাগারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়নি।

আবু বকর অর্থ সংরক্ষণের জন্য স্থান নির্দিষ্ট করেন। যেহেতু সকল অর্থ সরাসরি বন্টন হয়ে যেত তাই কোষাগার সাধারণত তালাবদ্ধ থাকত। আবু বকরের মৃত্যুর সময় কোষাগারে শুধু এক দিরহাম ছিল।

বাইতুল মালের প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

উমরের খিলাফতকালে পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। বিজয় অভিযানে সংগৃহিত অর্থ বিশাল পরিমাণে আসতে থাকে। তিনি সেনাবাহিনীতে লড়াই করতে সক্ষমদের জন্য বেতনের ব্যবস্থা করেন। বাহরাইনের গভর্নর আবু হুরায়রা পাঁচ লক্ষ্য দিরহামের রাজস্ব পাঠান। উমর তার পরামর্শ সভার সাথে আলোচনার বসেন। উসমান পরামর্শ দেন যাতে ভবিষ্যতের জন্য অর্থ জমা রাখা হয়। ওয়ালিদ বিন হিশাম মত প্রকাশ করেন যাতে বাইজেন্টাইনদের মত কোষাগার প্রতিষ্ঠা করা হয় ও হিসাব সংরক্ষণ করা হয়।

আলোচনার পর উমর মদিনায় একটি কেন্দ্রীয় কোষাগার স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেন। আবদুল্লাহ বিন আরকামকে কোষাগারের অফিসার নিয়োগ দেয়া হয়। আবদুর রহমান বিন আউফ ও মুইকিব তার সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পৃথক একটি হিসাব বিভাগও চালু করা করা হয়। এটি সমস্ত খরচের হিসাব রাখত। পরবর্তীতে প্রদেশগুলোতে প্রাদেশিক কোষাগার স্থাপন করা হয়। স্থানীয় খরচ মেটানোর পর প্রাদেশিক কোষাগারগুলোর উদ্বৃত্ত অর্থ মদিনার কেন্দ্রীয় কোষাগারে পাঠাতে হত। ইয়াকুবির মতে কেন্দ্রীয় কোষাগারের আওতায় বেতন ও অন্যান্য ভাতা ছিল ৩০ মিলিয়ন দিরহামের বেশি।

কোষাগারের অর্থ রক্ষার জন্য বাইতুল মাল নামক পৃথক ভবন তৈরী করা হয়। বড় শহরগুলোতে ৪০০ জন রক্ষী এর পাহারায় নিয়োজিত থাকত।

পারস্য উৎসের মুদ্রা, সর্বশেষ পারস্য সম্রাটের চিত্রাঙ্কিত। মুসলিমরা এতে বিসমিল্লাহ বাক্যটি যোগ করে।

অধিকাংশ ঐতিহাসিক দলিল অনুযায়ী রাশিদুন খলিফাদের মধ্যে উসমান প্রথম মুদ্রা চালু করেন। কিছু সূত্র মতে উমর একাজ প্রথম শুরু করেন। পারস্য জয়ের সময় অধিকৃত অঞ্চলে তিন ধরনের মুদ্রা চালু ছিল, আট দাং এর বাগলি, চার দাং এর তাবারি ও তিন দাং এর মাগরিবি। উমর (কিছু সূত্র মতে উসমান) ছয় দাং এর দিরহাম চালু করেন।

সামাজিক কল্যান ও পেনসন দেয়ার ব্যবস্থা উমরের সময় শুরু হয়। সংগৃহিত কর থেকে দরিদ্র, বৃদ্ধ, এতিম, বিধবা ও অক্ষমদের আয়ের ব্যবস্থা করা হত। আল-গাজ্জালির মতে বিপর্যয় বা মহামারির সময় সরকারকে প্রত্যেক অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ করতে হবে। এসব নীতির কারণে খিলাফতকে প্রথমদিককার কল্যাণ রাষ্ট্র ধরা হয়।[২৪][২৫]

রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উৎস[সম্পাদনা]

রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক উৎস নিম্নরূপ:

  1. যাকাত
  2. উশর
  3. জিজিয়া
  4. ফায়
  5. খুমুস
  6. খারাজ

যাকাত[সম্পাদনা]

মুসলিমদের উপর যাকাত বাধ্যতামূলক ছিল। একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ (নিসাব) সম্পদ হলে তার ২.৫% যাকাত হিসেবে নেয়া হত এবং দরিদ্রদের দেয়া হত। মৌলিক বাসস্থান, পরিবহন এগুলোকে নিসাব হিসেবে ধরা হত না। যাকাত ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ।

জিজিয়া[সম্পাদনা]

জিজিয়া কর সক্ষম অমুসলিম পুরুষদের উপর ধার্য করা হত। মুসলিমদের ন্যায় যাকাতের পরিবর্তে তারা জিজিয়া দিত। তবে দাস, নারী, শিশু, পুরোহিত, বৃদ্ধ, অসুস্থ,[২৬] নির্জনবাসী ও দরিদ্রদের উপর ধার্য করা হত না। উল্লেখ্য যে অক্ষম অমুসলিমদের রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে প্রয়োজনের সময় ভাতা দেয়া হত। এরূপ ভাতা রাষ্ট্রীয় কল্যাণমূলক কাজের সর্বাপেক্ষা পুরনো নমুনা।

ফায়[সম্পাদনা]

ফায় হচ্ছে রাষ্ট্রীয় ভূমি থেকে প্রাপ্ত আয়। এটি কৃষিজমি, তৃণভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ আছে এমন হতে পারে।

খুমুস[সম্পাদনা]

গনিমত বা খুমুস হল যুদ্ধলব্ধ সম্পদ। এর এক পঞ্চমাংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হত এবং বাকি চার পঞ্চমাংশ সৈনিকদের মাঝে বন্টন করে দেয়া হত।

খারাজ[সম্পাদনা]

খারাজ হল কৃষিজমির উপর ধার্যকৃত কর।৭ম শতাব্দীতে মুসলিম বিজয় অভিযানের সময় খারাজ সাধারণত অধিকৃত প্রদেশের জমির উপর আরোপ করা হত এবং ভূতপূর্ব বাইজেন্টাইন ও সাসানীয় সাম্রাজ্যের কর্মকর্তারা তা সংগ্রহ করত। ব্যাপকভাবে বলা যায়, অমুসলিম প্রজাদের উপর ধার্য করকে খারাজ বলা হত। এ সময় খারাজ জিজিয়ার সমার্থক ধরা হত। মুসলিম ভূমি মালিকদের উশর নামক কর দিতে হত।

উশর[সম্পাদনা]

ভূমির উৎপাদনের উপর ১০% উশর ধার্য করা হত। সেসাথে যেসব রাষ্ট্র মুসলিমদের উপর নিজেদের পণ্যের ব্যাপারে কর ধার্য করত তাদের পণ্যের উপরও কার্যকর হত। মুসলিম ব্যবসায়ীরা প্রবাসে ব্যবসার জন্য গেলে সেখানে তাদের ১০% কর দিতে হত। উমর প্রথম উশর ধার্য করেন।

বরাদ্দ[সম্পাদনা]

বরাদ্দের সূচনা[সম্পাদনা]

ইয়ারমুকের যুদ্ধকাদিসিয়ার যুদ্ধের পর মুসলিমরা অধিক পরিমাণে সম্পদ অর্জন করে। কোষাগার সম্পদে পূর্ণ হয়ে উঠে ফলে উমর এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে মনস্থ করেন। কিছু ব্যক্তি মত দেয় যাতে জনসাধারণের জন্য ব্যবহারের উদ্দেশ্যে যাতে এ সম্পদ কোষাগারে জমা রাখা হয়। মুসলিমদের মধ্যে এ দৃষ্টিভঙ্গি সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। সিদ্ধান্ত হয় যে এক বছরের অর্জিত সম্পদ বন্টন করে দেয়া হবে।

পরবর্তী প্রশ্ন দাঁড়ায় যে কিভাবে তা বন্টন করা হবে। একটি মত উঠে আসে যে বন্টন জরুরি ভিতিতে দেয়া হবে এবং সবাইওকে সমানভাবে দিতে হবে। এর বিপক্ষে মত দেয়া হয় যে এ পরিমাণ সম্পদ বন্টন করে দেয়া হলে জনগণ অতিরিক্ত ধনী হয়ে উঠবে। তাই জরুরি বন্টনের পরিবর্তে ভাতা বরাদ্দের পরিমাণ ঠিক করা হয় এবং অর্জিত সম্পদের পরিমাণ যাই হোক না কেন পরিমাণ ঠিক রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বন্টনের নিয়ম নিয়ে দুটি মতের সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ বলে যে সকল মুসলিম সমান অংশ পাওয়া উচিত। উমর এ মত গ্রহণ করেননি। প্রত্যেককে ইসলামের প্রতি তার অবদানের ভিত্তিতে বন্টন করার নীতি তিনি গ্রহণ করেন।

এরপর প্রশ্ন আসে কিসের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে মাপা হবে। পরামর্শ দেয়া হয় যে খলিফাকে সর্বোচ্চ পরিমাণ বরাদ্দ দিয়ে শুরু করা হবে। উমর এ মত প্রত্যাখ্যান করেন এবং মুহাম্মদ (সা) এর গোত্রকে দিয়ে শুরু করেন।

মুহাম্মদ (সা) এর নিকটজনদের তালিকা তৈরীর জন্য উমর কমিটি গঠন করেন। এই কমিটি গোত্র অনুযায়ী তালিকা তৈরি করে। বনি হাশিমকে প্রথম গোত্র হিসেবে ধরা হয়। এরপর আবু বকরের গোত্রকে দ্বিতীয় ও উমরের গোত্রকে তৃতীয় হিসেবে ধরা হয়।

চূড়ান্ত স্কেলে উমর কর্তৃক বরাদ্দকৃত পরিমাণ ছিল:

  1. মুহাম্মদ (সা) এর স্ত্রীদের প্রত্যেকে ১২,০০০ দিরহাম।
  2. মুহাম্মদ (সা) এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের জন্য বার্ষিক ৭,০০০ দিরহাম।
  3. হাসান ইবনে আলিহোসেইন ইবনে আলি প্রত্যেকে ৫,০০০ দিরহাম।
  4. বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকে ৬,০০০ দিরহাম।
  5. হুদায়বিয়ার সন্ধি পর্যন্ত ইসলাম গ্রহণকারীদের প্রত্যেকে ৪,০০০ দিরহাম।
  6. মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণকারীদের প্রত্যেকে ৩,০০০ দিরহাম।
  7. রিদ্দার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীডের প্রত্যেকে ৩,০০০ দিরহাম।
  8. ইয়ারমুকের যুদ্ধকাদিসিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের প্রত্যেকে ২,০০০ দিরহাম।

এর আওতায় উমরের পুত্র আবদুল্লাহ ইবনে উমর ৩০০০ দিরহাম পান। অন্যদিকে উসামা ইবনে জাইদ পান ৪,০০০ দিরহাম।

সাধারণ মুসলিম নাগরিকরা ২,০০০ থেকে ২,৫০০ দিরহামের মধ্যে পেত। নিয়মিত বার্ষিক বরাদ্দ শুধু শহরে বসবাসকারীদের দেয়া হত কারণ তারা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদন্ডের ভূমিকা পালন করে। মরুভূমিতে বসবাসকারীরা রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম থেকে দূরে থাকত এবং এর উন্নয়নে তাদের ভূমিকা ছিল না। খলিফা উসমান তার শাসনামলে ভাতা ২৫% বৃদ্ধি করেন।[তথ্যসূত্র প্রয়োজন]

মূল্যায়ন[সম্পাদনা]

এ অর্থনৈতিক পরিমাপ জনগণের জীবনমানের উন্নতির দিক নির্দেশ করে। বাণিজ্যের বৃদ্ধির সাথে সাথে ইসলামি সাম্রাজ্যের নাগরিকরা অধিক উন্নতি লাভ করে। ফলে তারা বাইতুল মালে অবদান রাখতে সক্ষম হয় এবং আরো অধিক রাজস্ব অর্জিত হয়।

কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড[সম্পাদনা]

মসজিদগুলো শুধু ধর্মীয় কাজে আবদ্ধ না থেকে লোকজনের সমাবেশের কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত এবং লোকেরা এখানে সামাজিক, সাংস্কৃতিক বিষয়ে আলোচনা করত। উমরের খিলাফতকালে পূর্বে পারস্য থেকে পশ্চিমে মিশর পর্যন্ত চার হাজারের মত মসজিদ গড়ে উঠে। এ সময় মসজিদ আল-হারামমসজিদে নববী সম্প্রসারণ করা হয়। পরবর্তীতে খলিফা উসমান মসজিদ সম্প্রসারণের পাশাপাশি এর সৌন্দর্যবর্ধন করেন।

উমরের খিলাফতকালে অনেক নতুন শহরের পত্তন হয়। এর মধ্যে আছে কুফা, বসরা, ফুসতাত। নগর পরিকল্পনার মূলনীতি অনুযায়ী এই শহরগুলোর পত্তন করা হয়। শহরের প্রত্যেকটি রাস্তা শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত জামে মসজিদ অভিমুখী হত। সুবিধাজনক স্থানে বাজার স্থাপন করা হত। এ বাজারগুলো বাজার তদারকের জন্য নিযুক্ত অফিসারের আওতাধীন ছিল এবং তার কাজ ছিল বাজার সুষ্ঠভাবে পরিচালনা করা ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ করা। শহরগুলোকে বিভিন্ন কোয়ার্টারে ভাগ করা হত এবং প্রত্যেক কোয়ার্টার বিভিন্ন গোত্রের জন্য নির্দিষ্ট ছিল। খলিফা উমরে ধনী ও অভিজাতদের উপর বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন যাতে ইসলামে সব মানুষের সমতার নীতির প্রতিফলন হয়। পরবর্তীতে খলিফা উসমান এই নিষেধাজ্ঞা উঠিয়ে নেন কারণ এসময় সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থা অনেক উন্নত হয়। দ্বিতল বিশিষ্ট বাড়ি নির্মাণের অনুমতি দেয়ার ফলে সাম্রাজ্যজুড়ে অসংখ্য সৌন্দর্যমন্ডিত দালান গড়ে উঠে। উসমান তার ব্যক্তিগত খরচে নিজের জন্য মদিনায় একটি বড় বাড়ি নির্মাণ করেন। এটি আল জাওয়ার নামে পরিচিত ছিল।

প্রশাসনিক কাজের জন্য অনেক দালান নির্মিত হয়। শহরের দারুল আমারাত নামক কোয়ার্টারে সরকারি অফিস ও অফিসারদের জন্য বাড়ি তৈরী করা হয়। দাপ্তরিক রেকর্ড সংরক্ষণের জন্য দিওয়ান নামক দালান নির্মাণ করা হয়। কোষাগারের জন্য নির্মাণ করা হয় বাইতুল মাল। শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আটক রাখার জন্য মুসলিম ইতিহাসে সর্বপ্রথম কারাগার নির্মাণ করা হয়। দূরবর্তী স্থান থেকে আগত ব্যবসায়ী ও বণিকদের জন্য বিশ্রামাগার স্থাপন করা হয়। জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য রাস্তা ও সেতু নির্মাণ করা হয়। মদিনা থেকে মক্কার পথে আশ্রয়স্থল, কুয়া, খাবারের ঘর স্থাপন করা হয় যাতে হজ্জ করতে আসা ব্যক্তিদের যাত্রা সহজ হয়।

কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনানিবাস স্থাপন করা হয়। অশ্বারোহী বাহিনীর জন্য স্থায়ী আস্তাবলের ব্যবস্থা করা হত। এসব আস্তাবলে ৪,০০০ এর মত ঘোড়া রাখার ব্যবস্থা থাকত। বাইতুল মালের পশুর জন্য বিশেষ তৃণভূমি বরাদ্দ করা হত। সেচ ও পানীয় জলের জন্য খাল খনন করা হয়। বসরার গভর্নর আবু মুসা আল আশারির নামে নামকৃত আবু মুসা খাল ছিল নয় মাইল (১৪ কিমি) দীর্ঘ। এটি টাইগ্রিস থেকে বসরায় পানি নিয়ে আসত। মাকাল খাল নামক আরেকটি খাল টাইগ্রিস থেকে খনন করা হয়। আমিরুল মুমিনিন খাল নামক খালটি নীলনদকে লোহিত সাগরের সাথে সংযুক্ত করার জন্য খনন করা হয়। ৬৩৯ খ্রিষ্টাব্দের দুর্ভিক্ষে মিশর থেকে আরবে এই খাল দিয়েই খাদ্য নিয়ে আসা হয়, ফলে আরবের লাখ লাখ মানুষের জীবন রক্ষা পায়। কুফার গভর্নর সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসের নামে খননকৃত সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস খাল ইউফ্রেটিস থেকে আনবারে পানি সরবরাহ করত। মিশরের গভর্নর আমর ইবনুল আস খলিফা উমরের শাসনকালে ভূমধ্যসাগরের সাথে লোহিত সাগরের সংযোগের জন্য খাল খননের প্রস্তাব করেন। তবে অজ্ঞাত কারণে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়নি। ১২০০ বছর পর এরূপ খাল খনন করা হয় যা সুয়েজ খাল নামে পরিচিত। শুয়াইবা ছিল মক্কার বন্দর। এটি অপর্যাপ্ত ছিল বিধা খলিফা উসমান নতুন সমুদ্র বন্দরের জন্য জেদ্দাকে বেছে নেন এবং এখানে নতুন বন্দর নির্মাণ করা হয়। তিনি শহরের পুলিশ বিভাগকেও সংস্কার করেন।

সামরিক বাহিনী[সম্পাদনা]

কাদিসিয়ার যুদ্ধে রাশিদুন সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাসশাহনামার পান্ডুলিপিতে অঙ্কিত।
একজন মুসলিম পদাতিক সৈনিক। লোহা-ব্রোঞ্জের শিরস্ত্রাণ, ধাতবআচ্ছাদন ও চামড়ার বর্ম, কাধে ঝোলানো বেল্টে তলোয়ারের খাপ ও হাতে চামড়ার ঢাল পরিহিত।

রাশিদুন সেনাবাহিনী ৭ম শতকে ইসলামি সশস্ত্র বাহিনীর প্রাথমিক অংশ ছিল। এর পাশাপাশি নৌবাহিনী কাজ করত। সেনাবাহিনীতে উচ্চমাত্রার শৃঙ্খলা, কৌশলগত দক্ষতা, সংগঠন বজায় রাখা হত। এ সময় রাশিদুন সেনাবাহিনী সমস্ত অঞ্চলের মধ্যে সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী সেনাবাহিনী হিসেবে কার্যকর ছিল। রাশিদুন খিলাফতের সর্বোচ্চ সীমানায় পৌছানোর সময় এ বাহিনীতে সেনাসংখ্যা ছিল ১,০০,০০০।[২৭]

সেনাবাহিনী প্রধান দুটি ভাগ, পদাতিক ও হালকা অশ্বারোহীতে বিভক্ত ছিল। প্রাচীন ইসলামি যুগের সেনা উপকরণের পুনর্নির্মাণ কষ্টসাধ্য।[২৮] রোমান সেনাবাহিনী বা পরবর্তীকালীন মুসলিম সেনাবাহিনীর সাথে তুলনা করে এর ধারণা পাওয়া যায়। সৈনিকরা ইরাক থেকে আগত লোহা ও ব্রোঞ্জের নির্মিত শিরস্ত্রাণ ব্যবহার করত।[২৯]

শরীর রক্ষার জন্য চেইনমেইল নামক ধাতব বর্ম ব্যবহার করা হত। আরো উল্লেখ পাওয়া যায় যে সৈনিকরা একটির উপর একটি করে দুটি বর্ম পরিধান করত যার মধ্যে ভেতরেরটা ছিল চামড়া বা ফেব্রিকের তৈরী। লড়াইয়ের সময় সুরক্ষার জন্য ঢাল ব্যবহার করা হত।[২৮] সৈনিকরা সাধারণত তলোয়ারসজ্জিত থাকত। পাশাপাশি বর্শা ও ডেগার রাখা হত।[৩০][পৃষ্ঠা নম্বর] উমর মুসলিম শাসকদের মধ্যে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রের অঙ্গ হিসেবে সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠা করেন। ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে এ সংস্কার সাধিত হয়। সূচনাপর্বে কুরাইশ ও আনসার দিয়ে শুরু করা হয় এবং পরবর্তীতে সমগ্র আরব ও মুসলিম অধিকৃত অঞ্চলে তা কার্যকর হয়।

যুদ্ধকৌশল হিসেবে শত্রুর প্রত্যেকটি দুর্বল দিক খতিয়ে দেখা হত। চলাচল সক্ষমতা ছিল রাশিদুন সেনাদের শক্তি। অশ্বারোহী বাহিনীতে ঘোড়া ও উট উভয় থাকত। উটগুলোকে মরুভূমির মধ্য দিয়ে পরিবহন ও খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য নেয়া হত। খালিদ বিন ওয়ালিদের পারস্য সীমান্ত থেকে দামেস্কে যাত্রার সময় উটকে খাদ্য ও পরিবহন হিসেবে নেয়া হয়। অশ্বারোহী বাহিনী ছিল মূল হামলাকারী শক্তি এবং তা কৌশলগত চলাচলের জন্য রিজার্ভ হিসেবে কাজ করে। পদাতিক ও তীরন্দাজরা শত্রুসেনাদের সাথে লড়াইয়ে নিয়োজিত থাকত, এসময় শত্রুরা পুরোপুরি মাঠে নামার আগ পর্যন্ত অশ্বারোহীরা অপেক্ষা করত।

শত্রুসেনারা পুরোমাত্রায় মাঠে নেমে পড়লে অশ্বারোহীরা পার্শ্বভাগ থেকে আক্রমণ চালাত ও শত্রু শিবিরে হামলা করত। খালিদ বিন ওয়ালিদ ছিলেন বিদেশী ভূমি জয় ও দুটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যকে হটিয়ে দেয়া রাশিদুন খিলাফতের প্রথম সেনাপতি। সাসানীয় সাম্রাজ্য (ইরাক ৬৩৩-৬৩৪) ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের (সিরিয়া ৬৩৪-৬৩৮) বিরুদ্ধে অভিযানের সময় তিনি উচ্চমাত্রার কৌশল প্রণয়ন করেন যা দুই সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে কার্যকর বলে প্রমাণ হয়।

খলিফা আবু বকর অভিযান পরিচালনার স্থান এবং এজন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ সেনাপতিদের দিয়ে দিতেন। এরপর অভিযান সফল করার জন্য সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা সেনাপতিদের দেয়া হত। অন্যদিকে খলিফা উমর তার খিলাফতের সময় সেনাপতিদের নির্দেশনা দেয়ার নিয়ম চালু করেন এবং তারা কোথায় অবস্থান করবে, কখন পরবর্তী লক্ষ্যের দিকে অগ্রসর হবে, লড়াইয়ের সময় সেনাবাহিনীর ডান, বাম পার্শ্বের নেতৃত্ব কে দেবে তা ঠিক করে দিতেন। এর ফলে অভিযান তুলনামূলক মন্থর হলেও তা অভিযানকে সুসংগঠিত করে তোলে। খলিফা উসমান আবু বকরের নীতি অবলম্বন করে। তিনি সেনাপতিদের অভিযানের দায়িত্ব দিয়ে বাকি কাজ তাদের স্বাধীনভাবে করার অনুমতি দেন। খলিফা আলিও একই নীতি অবলম্বন করেন।


তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. http://www.taqawalife.com/2012/02/abu-ubaidah-bin-jarrah.html
  2. http://www.jewishvirtuallibrary.org/jsource/History/Caliphate.html
  3. Balazuri: p. 113.
  4. Tabari: Vol. 2, p. 467.
  5. Tabari: Vol. 2, p. 518
  6. Kazhdan, Alexander, সম্পাদক (1991), Oxford Dictionary of Byzantium, Oxford University Press, পৃ: 1892, আইএসবিএন 978-0-19-504652-6 
  7. Egypt was conquered in 658 by Amr ibn al-As. Madelung (1997), pp. 267-269
  8. A. I. Alkram। "Chapter 19: The Battle of Chains - Chapter 26: The Last Opposition"। Khalid bin Al-Waleed: His Life and Campaigns। The Sword of Allah। পৃ: 1। 
  9. D. Nicolle, Yarmuk 636 AD - The Muslim Conquest of Syria, p. 43: gives 9,000-10,000
  10. ১০.০ ১০.১ A.I. Akram। "Chapter 31: The Unkind Cut"The Sword of Allah: Khalid bin Al-Waleed: His Life and Campaigns। পৃ: 1। আসল থেকে Jan 5, 2003-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত 16 July 2010 
  11. "Chapter 32: The Battle of Fahl"Khalid bin Al-Waleed: His Life and Campaigns। The Sword of Allah। পৃ: 1। আসল থেকে Jan 10, 2003-এ আর্কাইভ করা। সংগৃহীত 16 July 2010 
  12. http://www.swordofallah.com/html/bookchapter34page1.htm[অকার্যকর সংযোগ]
  13. http://www.swordofallah.com/html/bookchapter33page1.htm[অকার্যকর সংযোগ]
  14. CATHOLIC ENCYCLOPEDIA: Cyrus of Alexandria ওয়েবচাইট এ আর্কাইভকৃত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১
  15. John, Bishop of Nikiu: Chronicle. London (1916). English Translation ওয়েবচাইট এ আর্কাইভকৃত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১
  16. Nadvi (2000), pg. 522
  17. Lewis (1984), pp. 10, 20
  18. Cl. Cahen in Encyclopedia of Islam - Jizya
  19. The Cambridge History of Islam, ed. P.M. Holt, Ann K.S. Lambton, and Bernard Lewis, Cambridge 1970
  20. ২০.০ ২০.১ ২০.২ Gharm Allah Al-Ghamdy ওয়েবচাইট এ আর্কাইভকৃত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১
  21. Sahih Bukhari, Volume 4, Book 56, Number 681
  22. (Weeramantry 1997, pp. 132 & 135)
  23. Noah Feldman (16 March 2008)। "Why Shariah?"। New York Times। সংগৃহীত 2008-10-05 
  24. Crone, Patricia (2005), Medieval Islamic Political Thought, Edinburgh University Press, পৃ: 308–9, আইএসবিএন 978-0-7486-2194-1 
  25. Shadi Hamid (August 2003), "An Islamic Alternative? Equality, Redistributive Justice, and the Welfare State in the Caliphate of Umar", Renaissance: Monthly Islamic Journal 13 (8)  (see online) ওয়েবচাইট এ আর্কাইভকৃত ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১
  26. Shahid Alam, Articulating Group Differences: A Variety of Autocentrisms, Journal of Science and Society, 2003
  27. Fratini, Dan (2006-04-01)। "The Battle Of Yarmuk, 636"। Military History Online। 2011-02-13-এ মূল থেকে আর্কাইভ 
  28. ২৮.০ ২৮.১ Hugh Kennedy (2001)। "CHAPTER SEVEN: Weapons and equipment in early Muslim armies"The Armies of the Caliphs: Military and Society in the Early Islamic State। London: Routledge। পৃ: 168। 
  29. Kennedy, Hugh (2001)। "CHAPTER EIGHT: Fortification and siege warfare"The Armies of the Caliphs: Military and Society in the Early Islamic State। London: Routledge। পৃ: 183। 
  30. Augus Mcbride