ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস
Engels.jpg
ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস, ১৮৭৭ সালে
জন্ম ২৮ নভেম্বর, ১৮২০
Barmen, Kingdom of Prussia (present-day Wuppertal, Germany)
মৃত্যু ৫ আগস্ট ১৮৯৫(১৮৯৫-০৮-০৫) (৭৪ বছর)
লন্ডন, ইংল্যান্ড, UK
জাতীয়তা German
যুগ উনিশ শতকের দর্শন
অঞ্চল পাশ্চাত্য দর্শন
ধারা মার্কসবাদ, বস্তুবাদ
আগ্রহ Political philosophy, economics, class struggle, capitalism
অবদান Co-founder of Marxism (with Karl Marx), alienation and exploitation of the worker, historical materialism
স্বাক্ষর Friedrich Engels Signature.svg

ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস (২৮ নভেম্বর, ১৮২০ - ৫ আগস্ট ১৮৯৫) ছিলেন জার্মান সমাজ বিজ্ঞানী, লেখক, রাজনৈতিক তাত্ত্বিক, দার্শনিক, এবং মার্কসের সাথে মার্কসবাদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। ১৮৪৫ সালে তিনি নিজের প্রত্যক্ষন এবং গবেষণার ভিত্তিতে ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা প্রকাশ করেন। ১৯৪৮ সালে কার্ল মার্কসের সাথে যৌথভাবে কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার রচনা করেন, পরে কার্ল মার্কসকে পুঁজি গ্রন্থটি গবেষণা ও রচনার জন্য অর্থনৈতিকভাবে সহায়তা করেন। মার্কসের মৃত্যুর পরে তিনি সেই বইয়ের দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড-দুটি সম্পাদনা করেন। আরো তিনি মার্কসের "উদ্বৃত্ত মূল্য তত্ত্ব" বিষয়ের নোটগুলো একত্রিত করেন এবং এগুলো পরে "পুঁজি"র চতুর্থ খণ্ড হিসেবে প্রকাশিত হয়।[১] তিনি পরিবার অর্থনীতি বিষয়েও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।

শৈশব[সম্পাদনা]

তিনি ১৮২০ সালে জার্মানীর বারামানে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন জার্মানের একজন বড় শিল্পপতি। অত্যন্ত রক্ষণশীল এবং গোঁড়া ধর্মীয় পরিবেশে তিনি ছোটবেলায় লালিত পালিত হয়েছিলেন। কিন্তু অতিমাত্রায় ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণ তাঁর মনে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। অচিরেই তিনি ধর্মের ব্যাপারে সংশয়ী হয়ে উঠলেন। ব্যবসা ও রাজনীতির প্রতি তাঁর ছিল বিশেষ ঝোঁক। এ কারণে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়াও ছেড়ে দিয়েছিলেন। ছোটবেলায় তিনি কবিতা লিখতেন, তাও তিনি বাদ দিয়েছিলেন। তিনি পিতার ব্যবসায় হাত লাগাতে লাগলেন এবং তৎকালীন রাজনৈতিক বিষয়ে এবং হেগেলীয় দর্শনের পঠন-পাঠন শুরু করলেন। হেগেলীয় দর্শন অধ্যয়নে তিনি এর বিশেষ ত্রুটিসমূহ লক্ষ্য করতে লাগলেন এবং তাঁর মনে এর বিপুল সমালোচনা জমা হতে লাগলো। তিনি বিভিন্ন বস্তুবাদী দর্শন দ্বারা আকৃষ্ট হতে লাগলেন এবং তৎকালীন কিছু কিছু প্রচলিত সাম্যবাদী চিন্তার সাথে পরিচিত হতে থাকেন, তবে এ সম্পর্কে তাঁর মনে সংশয় দেখা দেয়।[২]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

১৮৪২ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং এক বছর সেখানে চাকরি করেন। সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন অবস্থায় তিনি সমকালীন বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামরিক নীতি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান অর্জন করেন। সেনাবাহিনী থেকে ফেরার পরে তিনি তাঁর পিতার নির্দেশে ইংল্যান্ড গমন করেন। তবে এটা ছিল তাঁর পিতার অধীনে স্রেফ কেরানীর চাকরিমাত্র। তিনি প্রায় দুই বছর ইংল্যান্ডে অতিবাহিত করেন। তিনি সেখানে থাকাকালীন কারখানা শ্রমিকদের দুর্দশা সম্পর্কে বিশেষভাবে অবগত হন এবং রীতিমত গবেষণা করে ইংল্যান্ডে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা নামে এক গ্রন্থ রচনা করেন।এই গ্রন্থে তিনি শ্রমিকদেরকে তাঁদের ন্যায্য অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে তোলার চেষ্টা করেন। তিনি আরো দেখান যে, পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় পুঁজিপতি কারখানা মালিকদের দ্বারা শ্রমিকগণ আবশ্যিকভাবেই শোষিত হন। তবে এই ব্যবস্থা বেশিদিন চলতে পারে না, চলা সংগতও নয়। এই ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্বের কারণে তা ভেঙে পড়তে বাধ্য।

বিশেষ রাজনৈতিক কারণে মার্কস যখন ইংল্যান্ডে স্থায়ী বসবাসের জন্য নির্বাসন নেন, তখন এঙ্গেলসও ইংল্যান্ড চলে আসেন। ব্যক্তিগত জীবনে এঙ্গেলস ছিলেন অত্যন্ত উদার এবং হাসিখুশি ধরনের মানুষ। জীবনে বড় হবার লোভ তাঁর ছিল না। তিনি যা কিছুই করতেন তা কর্তব্য মনে করে বা ভালো লাগার তাগিদে করতেন। মার্কস-এর সহযোগিতা করার মানসিকতা থেকে তিনি দর্শন চর্চা করেছেন বলে স্বীকার করেছেন। মার্কস-এর মৃত্যুর পরেও ইংল্যান্ডে ছিলেন। তবে ১৮৯১ সালে তিনি ম্যানচেস্টার ছেড়ে লন্ডনে চলে আসেন এবং সেখানেই ১৮৯৫ সালের ৫ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।[২]

১৮৪৫ থেকে ১৮৪৭ সাল পর্যন্ত সময়টা এঙ্গেলস ব্রাসেলস ও প্যারিসে কাটান, এবং তাঁর বৈজ্ঞানিক চর্চার সঙ্গে সঙ্গে ব্রাসেলস ও প্যারিসের জার্মান শ্রমিকদের মধ্যে ব্যবহারিক কাজ মিলিয়ে নেন। এইখানে গুপ্ত জার্মান সমিতি কমিউনিস্ট লিগের সঙ্গে মার্কস ও এঙ্গেলসের যোগাযোগ হয়, এ সংঘ তাঁদের ওপর ভার দেয় তাঁদের রচিত সমাজতন্ত্রের মূলনীতি উপস্থিত করার জন্য। এভাবেই জন্ম নেয় ১৮৪৮ সালে ছাপা মার্কস ও এঙ্গেলসের সুবিখ্যাত ‘কমিউনিস্ট পার্টির ইশতেহার’। ছোট্ট এই পুস্তিকাখানি বহু বৃহৎ গ্রন্থের মূল্য ধরে সভ্য জগতের সমস্ত সংগঠিত ও সংগ্রামী প্রলেতারিয়েত আজও তার প্রেরণায় সজীব ও সচল। ১৮৪৮ সালের যে বিপ্লব প্রথমে ফ্রান্সে শুরু হয়ে পশ্চিম ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিস্তৃত হয় সেই সময় মার্কস এঙ্গেলস দেশে ফেরেন। সেখানে, প্রুশিয়ার রাইন অঞ্চলে তাঁরা কলোন থেকে প্রকাশিত গণতান্ত্রিক ‘নতুন রাইনিশ গেজেটের’ প্রধান হয়ে ওঠেন। রাইনিশ প্রুশিয়ার সমস্ত বিপ্লবী গণতান্ত্রিক প্রচেষ্ঠার প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠেন দুই বন্ধু।[৩]

১৮৭০ সালে এঙ্গেলস লন্ডনে ফেরেন এবং ১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যু পর্যন্ত তাদের কর্মভারাক্রান্ত মিলিত মানসিক জীবন চালিয়ে যান। এর ফল হল মার্কসের দিক থেকে পুঁজি আর এঙ্গেলসের দিক থেকে ছোট বড় একসারি বই। পুঁজিবাদী অর্থনীতির জটিল ঘটনাবলীর বিশ্লেষণ নিয়ে কাজ করেন মার্কস। আর অতি সহজ ভাষায় প্রায়ই বিতর্কমূলক রচনার সাধারণ বৈজ্ঞানিক সমস্যা এবং অতীত ও বর্তমানের বিভিন্ন ব্যাপার নিয়ে ইতিহাসের বস্তুবাদি বোধ ও মার্কসের অর্থনৈতিক তত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে লেখেন এঙ্গেলস। এঙ্গেলসের এইসব রচনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য দ্যুরিঙের বিরুদ্ধে বিতর্কমূলক রচনা, পরিবার ব্যক্তি মালিকানা ও রাষ্ট্রের উৎপত্তি (১৮৯৫), ল্যুদভিগ ফয়েরবাখ (১৮৯২), রাশিয়ার প্রসঙ্গে এঙ্গেলস (১৮৯৪)। মার্কস মারা যান, পুঁজি বিষয়ে তার বৃহৎ রচনা সম্পূর্ণরূপে গুছিয়ে যেতে পারেননি। খসড়া হিসেবে অবশ্যই তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বন্ধুর মৃত্যুর পর পুঁজির ২য় ও ৩য় খন্ড গুছিয়ে তোলা ও প্রকাশনের গুরুভার শ্রমে আত্মনিয়োগ করলেন তাঁরই অকৃত্রিম বন্ধু শ্রমিক শ্রেণির মহান শিক্ষাগুরু কমরেড ফ্রিডরিখ এঙ্গেলস।[৩]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

উইকিসোর্স
উইকিসোর্স-এ এই লেখকের লেখা মূল বই রয়েছে:

এঙ্গেলসের রচনাবলী[সম্পাদনা]

তথ্যসুত্র[সম্পাদনা]

  1. The "Theories of Surplus Value" are contained in theCollected Works of Marx and Englels: Volumes 30, 31 and 32 (International Publishers: New York, 1988).
  2. ২.০ ২.১ মো. আবদুল ওদুদ; প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সমাজ ও রাষ্ট্রের দার্শনিক চিন্তা, মনন পাবলিকেশন, ঢাকা; এপ্রিল, ২০০৮; পৃষ্ঠা- ৫৩৩; ISBN 984-30-0000712-6
  3. ৩.০ ৩.১ ভ্লাদিমির লেনিন; মার্কস এঙ্গেলস মার্কসবাদ; প্রগতি প্রকাশন, মস্কো; ১৯৭৫; পৃষ্ঠা- ৪৪-৪৯।