চাণক্য

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
চাণক্য
Chanakya artistic depiction.jpg
শিল্পীর কল্পনায় চাণক্যের ছবি
জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০ অব্দ[১]
মৃত্যু খ্রিস্টপূর্ব ২৮৩ অব্দ[১]
পাটলিপুত্র (অধুনা পাটনা, বিহার, ভারত)
বাসস্থান পাটলিপুত্র (অধুনা পাটনা, বিহার, ভারত)
অন্য নাম কৌটিল্য, বিষ্ণুগুপ্ত
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান তক্ষশীলা
পেশা অধ্যাপক; চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উপদেষ্টা
যে জন্য পরিচিত মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা।
উল্লেখযোগ্য কাজ অর্থশাস্ত্র (authorship disputed), চাণক্যনীতি

চাণক্য (খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০-২৮৩ অব্দ)[২] ছিলেন একজন প্রাচীন ভারতীয় গুরু (শিক্ষক), দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা।

তিনি প্রাচীন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির অধ্যাপক ছিলেন। তিনি মৌর্য সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের উত্থানে প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করেন। তিনিই তরুণ চন্দ্রগুপ্তকে শিক্ষা দিয়েছিলেন। মৌর্য সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের নথিভুক্ত ইতিহাসে প্রথম সর্বভারতীয় সাম্রাজ্য। চাণক্য চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য ও তাঁর পুত্র বিন্দুসারের রাজ-উপদেষ্টার কাজ করেছিলেন।

চাণক্যকে কৌটিল্য বা বিষ্ণুগুপ্ত নামেও অভিহিত করা হয়। তিনি প্রাচীন ভারতের রাষ্ট্রবিজ্ঞান গ্রন্থ অর্থশাস্ত্র-এর রচয়িতা।[৩] তাঁকেই ভারতের প্রথম অর্থনীতিবিদ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মনে করা হয়। প্রাচীন ভারতের ইতিহাসে তাঁর অর্থনীতি তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল।[৪][৫][৬][৭] চাণক্যকে "ভারতের মেকিয়াভেলি" বলা হয়।[৮] যদিও তিনি নিকোলো মেকিয়াভেলির ১৮০০ বছর আগের মানুষ ছিলেন।[৯] গুপ্ত রাজবংশের শাসনের শেষ দিকে তাঁর বইটি হারিয়ে যায়। এটি আবার আবিষ্কৃত হয় ১৯১৫ সালে।[৫]

জন্ম[সম্পাদনা]

এই বিজ্ঞ ও প্রতিভাধর ব্রাহ্মণের জন্ম বর্তমান পাকিস্তানের তক্ষশীলায়; যেখানে উপমহাদেশে উচ্চতর জ্ঞান আহরণের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষাপীঠ অবস্থিত ছিল। রাজনৈতিক দর্শনের বাস্তব চর্চা ও রাষ্ট্রীয় কৌশলের প্রয়োগ পদ্ধতির নির্দেশনা দানে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। উপমহাদেশের প্রাচীন ইতিহাসে তার অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী।

বিষ্ণু গুপ্ত নামেও পরিচিত ছিলেন তিনি। কারণ এ নামটিই দিয়েছিলেন তার বাবা মা। এছাড়া তার বিখ্যাত ছদ্মনাম 'কৌটিল্য', যা তিনি তার বিখ্যাত সংস্কৃত গ্রন্থ 'অর্থশাস্ত্র' এ গ্রহণ করেছেন। রাষ্ট্রশাসন ও কূটনীতির কৌশলের সারসংক্ষেপ বলা যায় 'অর্থশাস্ত্রকে'। যেহেতু তিনি 'কূটিলা গোত্র' থেকে উদ্ভূত ছিলেন, অতএব তা টিকিয়ে রাখার জন্যে তিনি 'কৌটিল্য' ছদ্মনাম গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে তার অধিকতর প্রিয় নাম 'চাণক্য' এর উদ্ভব 'চানকা' থেকে, যে গ্রামে তার জন্ম হয়েছিল খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে।

নন্দ বংশকে উৎখাত[সম্পাদনা]

রাজা ধনানন্দ কর্তৃক বিস্তৃত নন্দরাজ্য, আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৭০
চন্দ্র গুপ্তের সাম্রাজ্যের প্রাথমিক অবস্থায় বিস্তৃতি

তার অসাধারণ কৃতিত্ব ছিল প্রচণ্ড শক্তিশালী নন্দ বংশের শাসন উৎখাত করে সম্রাট অশোকের পিতামহ চন্দ্র গুপ্ত মৌর্যকে ভারতের শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। চন্দ্র গুপ্ত মৌর্যকেই উপমহাদেশের প্রথম ঐতিহাসিক সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করা হয়। চন্দ্র গুপ্ত মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পাটালিপুত্রকে তার রাজ্যের রাজধানীতে পরিণত করেন। পাটালিপুত্র বিহারের আধুনিক শহর পাটনার কাছেই অবস্থিত ছিল। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২২ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৯৮ সাল পর্যন্ত চন্দ্র গুপ্ত রাজ্য শাসন করেন। তার সময়কালে সমগ্র রাজ্য জুড়ে শান্তি বিরাজমান ছিল, প্রজাদের প্রতি তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ এবং রাজ্য বিকশিত হয়েছিল সমৃদ্ধিতে। এ সম্পর্কে বিস্তারিত লিপিবদ্ধ করে গেছেন চন্দ্র গুপ্তের দরবারে গ্রিক দূত মেগাস্থিনিস তার 'ইন্ডিকা' গ্রন্থে।

নন্দ বংশের সর্বশেষ রাজা প্রজা সাধারণের কাছে প্রিয় ছিলেন না। একবার তিনি চাণক্যকে অপমান করেছিলেন। চাণক্য এই অপমানের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রতিজ্ঞা করেন। এদিকে তরুণ ও উচ্চাভিলাষী চন্দ্র গুপ্ত, যিনি নন্দ রাজার পদস্থ সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন, তিনিও ষড়যন্ত্র করছিলেন সিংহাসন দখলের। কিন্তু তার ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয় এবং জীবন বাঁচাতে তাকে পালাতে হয়। চন্দ্র গুপ্ত যখন বিন্ধানের জঙ্গলে পলাতক ও নির্বাসিত জীবন যাপন করছিলেন তখন ঘটনাচক্রে চাণক্যের সাথে তার সাক্ষাত হয়। চন্দ্র গুপ্ত তার জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেন চাণক্যকে এবং তখনই তাকে তার গুরু, উপদেষ্টা ও মন্ত্রণাদাতা হিসেবে মেনে নেন। পরবর্তীতে তিনি চন্দ্র গুপ্ত মৌর্যের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন।

চাণক্যের সক্রিয় সাহায্যে চন্দ্রগুপ্ত একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন এবং গুরুর তৈরি সুনিপুণ পরিকল্পনা অনুসারে পদক্ষেপ গ্রহণ করে শেষ পর্যন্ত নন্দ রাজাকে সিংহাসনচ্যুত করতে সক্ষম হন। অতঃপর মগধের সিংহাসনে আরোহণ করেন চন্দ্র গুপ্ত মৌর্য।

প্রধানমন্ত্রী চাণক্য[সম্পাদনা]

মৌর্য আমলের চাকা এবং হাতি প্রতীকযুক্ত রৌপ্যমুদ্রা, খ্রিস্টপূর্ব ৩য় শতক

এর আগে আলেকজান্ডারের আকস্মিক মৃত্যুতে গ্রিক শাসনের বিরুদ্ধে পাঞ্জাবে বিদ্রোহের সূচনা হয় এবং এ পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চন্দ্র গুপ্ত গ্রিক বাহিনীর ওপর হামলা চালিয়ে তাদেরকে পরাজিত করেন ও পাঞ্জাবকে নিজ শাসনাধীনে আনেন। পরে চন্দ্র গুপ্ত একে একে পশ্চিম ভারতের সকল রাজ্য বিজয় করে একটি শক্তিশালী সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। সাম্রাজ্য দক্ষতার সাথে পরিচালনার জন্যে তিনি একটি মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন চাণক্যকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ করে।

যে পরিস্থিতিতে চন্দ্র গুপ্ত নন্দ বংশকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজের বিশাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন তা অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণনা করা হয়েছে পঞ্চম শতাব্দীতে লিখিত একটি রাজনৈতিক নাটক 'মুদ্রা রাক্ষস'এ। এ নাটকের রচয়িতা বিশাখাদত্ত নামে এক প্রাচীন নাট্যকার। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই নাটকটি পঠিত, মঞ্চস্থ ও প্রশংসিত হয়েছে।

চন্দ্র গুপ্তের শ্রদ্ধেয় গুরু ও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে চাণক্য অবলীলায় বিলাসবহুল জীবন কাটাতে পারতেন জাঁকজমকপূর্ণ প্রাসাদে। কিন্তু তিনি এর পরিবর্তে খুব সাধারণভাবে একটি কুঁড়েঘরে বসবাসের জীবন বাছাই করে নিয়েছিলেন। এই কুঁড়েঘরটি অবস্থিত ছিল এক শ্মশানে। সেখানে ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে দূরে অবস্থান করে তিনি বহু শিষ্যকে রাজ্যশাসনের কৌশল শিক্ষা দিয়েছেন এবং নৈতিক ও আর্থ-সামাজিক বিষয়ে জ্ঞান দান করেছেন। এসব ছাড়াও তিনি তার রাজার দেয়া দায়িত্ব পালন করেছেন বিশ্বস্ততার সাথে। চন্দ্রগুপ্তের জীবনে তিনি ছিলেন অভিভাবক স্বর্গীয় দূতের মতো এবং সত্যিকার বন্ধু, দার্শনিক ও গুরু।

চাণক্যের অর্থশাস্ত্র[সম্পাদনা]

চাণক্যের বিরাট সাহিত্য কর্ম 'অর্থশাস্ত্র', যার শব্দগত অর্থ 'পৃথিবীতে সাধারণ কল্যাণ বিষয়ক বিবরণী।' এই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ রয়েছে শাসকের উদ্দেশ্যে পরামর্শ যে, কিভাবে একজন শাসককে তার প্রজাদের নিরাপত্তা, কল্যাণ ও জীবন মান উন্নত করার জন্যে কাজ করতে হবে এবং কিভাবে আরও ভূখণ্ড ও মূল্যবান সম্পদ নিজ সাম্রাজ্যভুক্ত করতে হবে। চাণক্য যে সব পরামর্শ বা নির্দেশনা সেই গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন সেসবের অধিকাংশই শুধু রাজ্যশাসন নয় বড় বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। চাণক্য উপমহাদেশে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রথম প্রবক্তা এবং তার কিছু নীতি বিশ্বজনীনভাবে প্রযোজ্য।

এই বিজ্ঞ ও বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন দার্শনিক ধর্ম, নীতিশাস্ত্র, সামাজিক আচরণ ও রাজনীতির ক্ষেত্রে বিশেষ কিছু পর্যবেক্ষণ বর্ণনা করেছেন। এসবের কিছু কিছু অন্যান্য বিবরণীতে সংগৃহীত হয়েছে। এ ধরণের একটি সংকলনের নাম 'চাণক্য নীতি দর্পণ'। তার কথাগুলো হয়তো আধুনিক যুগের পরিশীলিত কথাবার্তা থেকে ভিন্ন, কিন্তু দুই হাজার বছরের অধিক সময়ের ব্যবধানেও সেগুলো গুরুত্ব হারিয়ে ফেলেনি।

চাণক্য তার কালোত্তীর্ণ গ্রন্থ 'অর্থশাস্ত্রে' রাজাকে পরামর্শ দিয়েছেন, "যে রাজা শত্রুর গতিবিধি সম্পর্কে ধারণা করতে পারে না এবং শুধু অভিযোগ করে যে তার পিঠে ছুরিকাঘাত করা হয়েছে, তাকে সিংহাসনচ্যুত করা উচিত।" অর্থনৈতিক দুর্নীতি সর্বকালেই ছিল এবং চাণক্যের যুগেও তা নতুন কোন বিষয় ছিল না। সে কারণে তিনি লিখেছেন, "সকল উদ্যোগ নির্ভর করে অর্থের ওপর। সেজন্যে সবচেয়ে অধিক মনোযোগ দেয়া উচিত খাজাঞ্চিখানার দিকে। তহবিল তসরুপ বা অর্থ আত্মসাতের চল্লিশটি পদ্ধতি আছে। জিহ্বা'র ডগায় বিষ রেখে যেমন মধুর আস্বাদন করা সম্ভব নয়, তেমনি কোন রাজ কর্মচারীর পক্ষে রাজার রাজস্বের সামান্য পরিমাণ না খেয়ে ফেলার ঘটনা অসম্ভব ব্যাপার। পানির নিচে মাছের গতিবিধি যেমন পানি পান করে বা পান না করেও বুঝা সম্ভব নয়, অনুরূপ রাজ কর্মচারীর তহবিল তসরুপও দেখা অসম্ভব। আকাশের অতি উঁচুতেও পাখির উড্ডয়ন দেখা সম্ভব, কিন্তু রাজ কর্মচারীর গোপন কার্যকলাপ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া সমভাবে অসম্ভব।"

চাণক্য তার নীতিকথায় বলেছেন, "বিষ থেকে সুধা, নোংরা স্থান থেকে সোনা, নিচ কারো থেকে জ্ঞান এবং নিচু পরিবার থেকে শুভলক্ষণা স্ত্রী - এসব গ্রহণ করা সঙ্গত।"

"মনের বাসনাকে দূরীভূত করা উচিত নয়। এই বাসনাগুলোকে গানের গুঞ্জনের মতো কাজে লাগানো উচিত।"

"যারা পরিশ্রমী, তাদের জন্যে কোনকিছু হাসিল করা অসাধ্য কিছু নয়। শিক্ষিত কোন ব্যক্তির জন্যে কোন দেশই বিদেশ নয়। মিষ্টভাষীদের কোন শত্রু নেই।"

"বিরাট পশুপালের মাঝেও শাবক তার মাকে খুঁজে পায়। অনুরূপ যে কাজ করে অর্থ সবসময় তাকেই অনুসরণ করে।"

"মন খাঁটি হলে পবিত্র স্থানে গমন অর্থহীন।"

অনাড়ম্বর জীবন-যাপন[সম্পাদনা]

চাণক্য তার জীবদ্দশায়, এমনকি মৃত্যুর পরও ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয় ও ব্যতিক্রমী প্রতিভার অধিকারী পণ্ডিত, সাধু, দেশপ্রেমিক, গুরু ও কর্মবীর হিসেবে শ্রদ্ধেয়। প্রথমেই তিনি পাঞ্জাবকে বিদেশী শাসন (গ্রিক) মুক্ত করতে রাজাকে সাহায্য করেন। এরপর অযোগ্য শাসক নন্দ রাজাকে উৎখাত করে চন্দ্রগুপ্তের সাম্রাজ্যের সাথে আরও রাজ্য যুক্ত করেন এবং সাম্রাজ্যে শান্তি, সমৃদ্ধি ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তার ভূমিকা পালন করেন। সন্ন্যাসীর মতো জীবন যাপন করেন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেও। অসংখ্য শিষ্যকে তিনি জ্ঞান দান করেন। তিনি শিষ্যদের দেশপ্রেম, রাজার প্রতি আনুগত্য শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি প্রজাদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সবসময় রাজাকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। গ্রিক দার্শনিক সক্রেটিসের মতোই চাণক্যের চেহারাও সুন্দর বা আকর্ষণীয় ছিলনা এবং দৈহিক গড়নও ছিল আকর্ষণহীন। দুর্বল স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলেন তিনি, যদিও সক্রেটিসের মতোই পণ্ডিত ও দার্শনিক ছিলেন। সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন যে, "দেহের সৌন্দর্যের চাইতে চিন্তার সৌন্দর্য অধিকতর মোহময় ও এর প্রভাব যাদুতুল্য।" অন্যদিকে চাণক্য ছিলেন দক্ষ পরিকল্পনাবিদ। সিদ্ধান্তে তিনি ছিলেন অটল এবং অর্থহীন আবেগের কোন মূল্য ছিল না তার কাছে। নিজস্ব পরিকল্পনা উদ্ভাবন ও তা বাস্তবায়নে তিনি ছিলেন কঠোর।

চাণক্য শ্লোক[সম্পাদনা]

বাংলায় প্রচলিত কিছু চাণক্য শ্লোক নিচে উল্লেখ করা হলো-[১০]

  • অতি পরিচয়ে দোষ আর ঢাকা থাকে না।
  • অধমেরা ধন চায়, মধ্যমেরা ধন ও মান চায়। উত্তমেরা শুধু মান চায়। মানই মহতের ধন।
  • অনেকে চারটি বেদ এবং ধর্মশাস্ত্র অধ্যয়ন করলেও আত্মাকে জানে না, হাতা যেমন রন্ধন-রস জানে না।
  • অন্তঃসার শূন্যদের উপদেশ দিয়ে কিছু ফল হয় না, মলয়-পর্বতের সংসর্গে বাঁশ চন্দনে পরিণত হয় না।
  • অবহেলায় কর্মনাশ হয়, যথেচ্ছ ভোজনে কুলনাশ হয়, যাচ্ঞায় সম্মান-নাশ হয়, দারিদ্র্যে বুদ্ধিনাশ হয়।
  • অভ্যাসহীন বিদ্যা, অজীর্ণে ভোজন, দরিদ্রের সভায় বা মজলিশে কালক্ষেপ এবং বৃদ্ধের তরুণী ভার্যা বিষতুল্য।
  • অহংকারের মত শত্রু নেই।
  • আকাশে উড়ন্ত পাখির গতিও জানা যায়, কিন্তু প্রচ্ছন্নপ্রকৃতি-কর্মীর গতিবিধি জানা সম্ভব নয়।
  • আদর দেওয়ার অনেক দোষ, শাসন করার অনেক গুণ, তাই পুত্র ও শিষ্যকে শাসন করাই দরকার, আদর দেওয়া নয়।
  • আপদের নিশ্চিত পথ হল ইন্দ্রিয়গুলির অসংযম, তাদের জয় করা হল সম্পদের পথ, যার যেটি ঈপ্সিত সে সেই পথেই যায়।
  • আড়ালে কাজের বিঘ্ন ঘটায়, কিন্তু সামনে ভাল কথা বলে, যার উপরে মধু কিন্তু অন্তরে বিষ, তাকে পরিত্যাগ করা উচিত।
  • ইন্দ্রিয়ের যে অধীন তার চতুরঙ্গ সেনা থাকলেও সে বিনষ্ট হয়।
  • উপায়জ্ঞ মানুষের কাছে দুঃসাধ্য কাজও সহজসাধ্য।
  • উৎসবে, বিপদে, দুর্ভিক্ষে, শত্রুর সঙ্গে সংগ্রামকালে, রাজদ্বারে এবং শ্মশানে যে সঙ্গে থাকে, সে-ই প্রকৃত বন্ধু।
  • ঋণ, অগ্নি ও ব্যাধির শেষ রাখতে নেই, কারণ তারা আবার বেড়ে যেতে পারে।
  • একটি দোষ বহু গুণকেও গ্রাস করে।
  • একটি কুবৃক্ষের কোটরের আগুন থেকে যেমন সমস্ত বন ভস্মীভূত হয়, তেমনি একটি কুপুত্রের দ্বারাও বংশ দগ্ধ হয়।
  • একটিমাত্র পুষ্পিত সুগন্ধ বৃক্ষে যেমন সমস্ত বন সুবাসিত হয়, তেমনি একটি সুপুত্রের দ্বারা সমস্ত কুল ধন্য হয়।
  • একশত মূর্খ পুত্রের চেয়ে একটি গুণী পুত্র বরং ভাল। একটি চন্দ্রই অন্ধকার দূর করে, সকল তারা মিলেও তা পারে না।
  • কর্কশ কথা অগ্নিদাহের চেয়েও ভয়ঙ্কর।
  • খেয়ে যার হজম হয়, ব্যাধি তার দূরে রয়।
  • গুণবানকে আশ্রয় দিলে নির্গুণও গুণী হয়।
  • গুণহীন মানুষ যদি উচ্চ বংশেও জন্মায় তাতে কিছু আসে যায় না। নীচকুলে জন্মেও যদি কেউ শাস্ত্রজ্ঞ হয়, তবে দেবতারাও তাঁকে সম্মান করেন।
  • গুরু শিষ্যকে যদি একটি অক্ষরও শিক্ষা দেন, তবে পৃথিবীতে এমন কোনও জিনিস নেই, যা দিয়ে সেই শিষ্য গুরুর ঋণ শোধ করতে পারে।
  • গৃহে যার মা নেই, স্ত্রী যার দুর্মুখ তার বনে যাওয়াই ভাল, কারণ তার কাছে বন আর গৃহে কোনও তফাৎ নেই।
  • চন্দন তরুকে ছেদন করলেও সে সুগন্ধ ত্যাগ করে না, যন্ত্রে ইক্ষু নিপিষ্ট হলেও মধুরতা ত্যাগ করে না, যে সদ্বংশজাত অবস্থা বিপর্যয়েও সে চরিত্রগুণ ত্যাগ করে না।
  • তিনটি বিষয়ে সন্তোষ বিধেয়: নিজের পত্নীতে, ভোজনে এবং ধনে। কিন্তু অধ্যয়ন, জপ, আর দান এই তিন বিষয়ে যেন কোনও সন্তোষ না থাকে।
  • দারিদ্র্য, রোগ, দুঃখ, বন্ধন এবং বিপদ- সব কিছুই মানুষের নিজেরই অপরাধরূপ বৃক্ষের ফল।
  • দুর্জনের সংসর্গ ত্যাগ করে সজ্জনের সঙ্গ করবে। অহোরাত্র পুণ্য করবে, সর্বদা নশ্বরতার কথা মনে রাখবে।
  • দুর্বলের বল রাজা, শিশুর বল কান্না, মূর্খের বল নীরবতা, চোরের মিথ্যাই বল।
  • দুষ্টা স্ত্রী, প্রবঞ্চক বন্ধু, দুর্মুখ ভৃত্য এবং সসর্প-গৃহে বাস মৃত্যুর দ্বার, এ-বিষয়ে সংশয় নেই।
  • ধর্মের চেয়ে ব্যবহারই বড়।
  • নানাভাবে শিক্ষা পেলেও দুর্জন সাধু হয় না, নিমগাছ যেমন আমূল জলসিক্ত করে কিংবা দুধে ভিজিয়ে রাখলেও কখনও মধুর হয় না।
  • পরস্ত্রীকে যে মায়ের মত দেখে, অন্যের জিনিসকে যে মূল্যহীন মনে করে এবং সকল জীবকে যে নিজের মত মনে করে, সে-ই যথার্থ জ্ঞানী।
  • পাপীরা বিক্ষোভের ভয় করে না।
  • পাঁচ বছর বয়স অবধি পুত্রদের লালন করবে, দশ বছর অবধি তাদের চালনা করবে, ষোল বছরে পড়লে তাদের সঙ্গে বন্ধুর মত আচরণ করবে।
  • পুত্র যদি হয় গুণবান, পিতামাতার কাছে তা স্বর্গ সমান।
  • পুত্রকে যারা পড়ান না, সেই পিতামাতা তার শত্রু। হাঁসদের মধ্যে বক যেমন শোভা পায় না, সভার মধ্যে সেই মূর্খও তেমনি শোভা পায় না।
  • বইয়ে থাকা বিদ্যা, পরের হাতে থাকা ধন একইরকম। প্রয়োজনকালে তা বিদ্যাই নয়, ধনই নয়।
  • বিদ্বান সকল গুণের আধার, অজ্ঞ সকল দোষের আকর। তাই হাজার মূর্খের চেয়ে একজন বিদ্বান অনেক কাম্য।
  • বিদ্যাবত্তা ও রাজপদ এ-দুটি কখনও সমান হয় না। রাজা কেবল নিজদেশেই সমাদৃত, বিদ্বান সর্বত্র সমাদৃত।
  • বিদ্যা ব্যতীত জীবন ব্যর্থ, কুকুরের লেজ যেমন ব্যর্থ, তা দিয়ে সে গুহ্য-অঙ্গও গোপন করতে পারে না, মশাও তাড়াতে পারে না।
  • বিদ্যাভূষিত হলেও দুর্জনকে ত্যাগ করবে, মণিভূষিত হলেও সাপ কি ভয়ঙ্কর নয়?
  • বিদ্যার চেয়ে বন্ধু নাই, ব্যাধির চেয়ে শত্রু নাই। সন্তানের চেয়ে স্নেহপাত্র নাই, দৈবের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বল নাই।
  • বিনয়ই সকলের ভূষণ।
  • বিষ থেকেও অমৃত আহরণ করা চলে, মলাদি থেকেও স্বর্ণ আহরণ করা যায়, নীচজাতি থেকেও বিদ্যা আহরণ করা যায়, নীচকুল থেকেও স্ত্রীরত্ন গ্রহণ করা যায়।
  • ভোগবাসনায় বুদ্ধি আচ্ছন্ন হয়।
  • মিত ভোজনেই স্বাস্থ্যলাভ হয়।
  • যশবানের বিনাশ নেই।
  • যারা রূপযৌবনসম্পন্ন এবং উচ্চকুলজাত হয়েও বিদ্যাহীন, তাঁরা সুবাসহীন পলাশ ফুলের মত বেমানান।
  • যে অলস, অলব্ধ-লাভ তার হয় না।
  • যে গাভী দুধ দেয় না, গর্ভ ধারণও করে না, সে গাভী দিয়ে কী হবে! যে বিদ্বান ও ভক্তিমান নয়, সে পুত্র দিয়ে কী হবে!
  • রাতের ভূষণ চাঁদ, নারীর ভূষণ পতি, পৃথিবীর ভূষণ রাজা, কিন্তু বিদ্যা সবার ভূষণ।
  • শাস্ত্র অনন্ত, বিদ্যাও প্রচুর। সময় অল্প অথচ বিঘ্ন অনেক। তাই যা সারভূত তারই চর্চা করা উচিত। হাঁস যেমন জল-মিশ্রিত দুধ থেকে শুধু দুধটুকুই তুলে নেয়, তেমনি।
  • সত্যনিষ্ঠ লোকের অপ্রাপ্য কিছুই নাই।
  • সত্যবাক্য দুর্লভ, হিতকারী-পুত্র দুর্লভ, সমমনস্কা-পত্নী দুর্লভ, প্রিয়স্বজনও তেমনি দুর্লভ।
  • সাপ নিষ্ঠুর খলও নিষ্ঠুর, কিন্তু সাপের চেয়ে খল বেশি নিষ্ঠুর। সাপকে মন্ত্র বা ওষধি দিয়ে বশ করা যায়, কিন্তু খলকে কে বশ করতে পারে?
  • সুবেশভূষিত মূর্খকে দূর থেকেই দেখতে ভাল, যতক্ষণ সে কথা না বলে ততক্ষণই তার শোভা, কথা বললেই মূর্খতা প্রকাশ পায়।
  • হাতি থেকে একহাজার হাত দূরে, ঘোড়া থেকে একশ হাত দূরে, শৃঙ্গধারী প্রাণী থেকে দশহাত দূরে থাকবে। অনুরূপ দুর্জনের কাছ থেকেও যথাসম্ভব দূরে থাকবে।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. উদ্ধৃতি ত্রুটি: অবৈধ <ref> ট্যাগ; VKSubramanian1980 নামের ref গুলির জন্য কোন টেক্সট প্রদান করা হয়নি
  2. S. K. Agarwal (1 September 2008)। Towards Improving Governance। Academic Foundation। পৃ: 17। আইএসবিএন 978-81-7188-666-1। সংগৃহীত 2012-06-06 
  3. Mabbett, I. W. (1964)। "The Date of the Arthaśāstra"। Journal of the American Oriental Society (American Oriental Society) 84 (2): 162–169। জেএসটিওআর 597102ডিওআই:10.2307/597102। ISSN 0003-0279। 
  4. L. K. Jha, K. N. Jha (1998). "Chanakya: the pioneer economist of the world", International Journal of Social Economics 25 (2–4), p. 267–282.
  5. ৫.০ ৫.১ Waldauer, C., Zahka, W.J. and Pal, S. 1996. Kauṭilya's Arthashastra: A neglected precursor to classical economics. Indian Economic Review, Vol. XXXI, No. 1, pp. 101–108.
  6. Tisdell, C. 2003. A Western perspective of Kauṭilya's Arthasastra: does it provide a basis for economic science? Economic Theory, Applications and Issues Working Paper No. 18. Brisbane: School of Economics, The University of Queensland.
  7. Sihag, B.S. 2007. Kauṭilya on institutions, governance, knowledge, ethics and prosperity. Humanomics 23 (1): 5–28.
  8. "The Indian Machiavelli" or Political Theory in India Two Thousand Years Ago by Herbert H. Gowen. Political Science Quarterly Vol. 44, No. 2 (Jun. 1929), pp. 173–192. Published by: The Academy of Political Science.
  9. Herbert H. Gowen (1929). and in a much more conventional world.or Political Theory in India Two Thousand Years Ago, Political Science Quarterly 44 (2), p. 173–192.
  10. মো. আবুল হোসেন। চাণক্য-শ্লোক : কে ছিলেন চাণক্য?। প্রথম আলো ব্লগ। 

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]