বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব
বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব বলতে বাংলা ভাষাতে ব্যবহৃত যাবতীয় ধ্বনির বিবরণ, এগুলির উচ্চারণ ও ব্যবহারবিন্যাসের আলোচনাকে বোঝায়। বাংলা ভাষার ঔপভাষিক বৈচিত্র্য ব্যাপক এবং বিভিন্ন বাংলা উপভাষার ধ্বনিব্যবস্থাও তাই স্বতন্ত্র। এই নিবন্ধে কেবলমাত্র মান্য বা আদর্শ চলিত বাংলা ভাষার ধ্বনিতত্ত্বের বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
পরিচ্ছেদসমূহ |
স্বরধ্বনি[সম্পাদনা]
বাংলা ভাষাতে ৭টি পূর্ণ স্বরধ্বনি আছে; এগুলিকে অ, আ, ই, উ, এ, ও এবং অ্যা বর্ণ দিয়ে নির্দেশ করা যায়। পূর্ণস্বরধ্বনিগুলিকে নাকি স্বরে বা অনুনাসিকভাবেও উচ্চারণ করা যায় (ঁ দিয়ে নির্দেশ করা হয়)। এছাড়াও বাংলা ভাষাতে অর্ধস্বরধ্বনি আছে চারটি; এগুলি ই, উ, এ এবং ও স্বরধ্বনিগুলির অর্ধোচ্চারিত রূপ। পূর্ণ এবং অর্ধস্বরধ্বনিগুলি একত্রিত হয়ে বাংলায় ১৭টির মত দ্বিস্বরধ্বনি উচ্চারিত হয়; এগুলিকে অয়, অও, আউ, আয়, আও, ইই, ইউ, এই, এউ, এও, অ্যায়, অ্যাও, ওই, ওউ, ওয়, ওও দিয়ে নির্দেশ করা যেতে পারে।
লিখিত বাংলার বর্ণমালা, যা স্কুল কলেজে শিক্ষা দেওয়া হয়, সেগুলিতে ঈ, ঊ, ঋ, ৯-এর অস্তিত্ব থাকলেও উচ্চারণের ক্ষেত্রে এগুলি স্বরধ্বনি হিসেবে উচ্চারিত হয় না। দীর্ঘ ঈ এবং দীর্ঘ ঊ সংস্কৃতে দীর্ঘভাবে উচ্চারিত হলেও কথ্য বাংলাতে সবসময় দীর্ঘ উচ্চারিত হয় না। ঋ-কে রি এবং ৯-কে লি হিসেবে উচ্চারণ করা হয়। অন্যদিকে অ্যা স্বরধ্বনিটি বাংলার একটি মৌলিক পূর্ণ স্বরধ্বনি হলেও শিক্ষামাধ্যমে প্রচলিত বর্ণমালাতে একে সেভাবে স্থান দেয়া হয়নি। বাংলা ভাষাতে দ্বিস্বরধ্বনির সংখ্যা সতেরটির মত হলেও কেবল ওই এবং ওউ-এর জন্য আলাদা দুইটি বর্ণ আছে, যথাক্রমে ঐ এবং ঔ, এবং এগুলিকে স্কুলপাঠ্য বর্ণমালার স্বরবর্ণ ভাগে স্থান দেওয়া হয়েছে।
নিচে আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালাতে বাংলা স্বরধ্বনিগুলি উচ্চারণস্থল ও উচ্চারণকৌশল অনুযায়ী ছক আকারে দেখানো হল।
ব্যঞ্জনধ্বনি[সম্পাদনা]বাংলা ভাষাতে ব্যঞ্জনধ্বনি আছে মোটামুটিভাবে ৩১টি। এগুলিকে ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ, জ, ঝ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, থ, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, র, ল, শ, স, হ, ড়, ঢ় --- এই বর্ণগুলি দিয়ে নির্দেশ করা হয়। বাংলার স্কুলপাঠ্য বর্ণমালার ব্যঞ্জনবর্ণ ভাগে আরও কয়েকটি বর্ণ স্থান দেওয়া হয়েছে, যেমন – ঞ, ণ, ষ, স, ং, ঃ, ৎ, ঁ। ঞ বর্ণটি নিয়-র মত উচ্চারিত হয়। ণ আর ন বর্ণের উচ্চারণে তেমন কোন পার্থক্য নেই; তবে ট-বর্গীয় ধ্বনির (ট, ঠ, ড, ঢ) ঠিক আগে বসলে জিহ্বা উল্টিয়ে মূর্ধন্য ণ উচ্চারিত হয়। মূর্ধন্য ষ-এর উচ্চারণের বেলায় জিহ্বা উল্টানো হয় না; এটি তালব্য শ-এর মতই উচ্চারিত হয়। দন্ত্য স-ও তালব্য শ-এর মতই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উচ্চারিত হয়; কেবল যুক্তব্যঞ্জনে ত, থ, ন, র, ল-এর আগে শ, স – উভয়েই ইংরেজি s-এর মত (যেমন- স্বস্তি, আস্থা, স্নাতক, শ্রান্তি, শ্লীলতাহানি) এবং শব্দের শুরুতে যুক্তব্যঞ্জনে ক, খ, প, ফ-এর আগে বসা স ইংরেজি s-এর মত (স্কন্ধ, স্খলন, স্পর্শ, স্ফূর্তি) উচ্চারিত হয়। য বর্ণটি জ-এর মত উচ্চারিত হয়। ং-এর উচ্চারণ ঙ-এর মত। চন্দ্রবিন্দুর কাজ স্বরধ্বনিকে অনুনাসিকতা প্রদান করা; এটি কোন ব্যঞ্জনধ্বনি নয়। ৎ হল অন্ত্যস্বরবিহীন ত্ এবং ঃ হল অন্ত্যস্বরবিহীন হ্। য় বর্ণটি মূলত দ্বিস্বরধ্বনির দ্বিতীয় স্বরটি বোঝাতে ব্যবহৃত হয় (একটি উদাহরণ: ও+এ = ওএ > ওয়; যেমন – ধোয়, শোয়)।
মান্য চলিত বাংলা উচ্চারণে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে মোটামুটি সমতা বিধান করা হয়, তবে মান্য চলিত ভাষাভাষী বক্তাদের উচ্চারণের ক্ষেত্রেও এলাকাভেদে কিছু বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়:
অক্ষর/দল/সিলেবল[সম্পাদনা]মুখের ভাষার যে অংশ একবারে, এক ধাক্কায় উচ্চারণ করা যায়, সহজভাবে ধ্বনিবিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকেই সিলেবল, দল বা অক্ষর বলে। বাংলা ভাষার সিলেবলগুলির কেন্দ্রে বা নিউক্লিয়াসে থাকে একটি স্বরধ্বনি। এই কেন্দ্রের আগে বা পরে শূন্য, এক বা একাধিক ব্যঞ্জনধ্বনি বসতে পারে। অর্থাৎ বাংলা সিলেবলের বিন্যাস স্ব, স্বব, বস্বব, ববস্ব, ববস্বব, ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের হতে পারে। সব মিলিয়ে প্রায় পনেরটির মত বিন্যাস পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে বস্ব অর্থাৎ ব্যঞ্জন+স্বর সিলেবলটিই (খা, দু, পা, নি, ইত্যাদি) বাংলা ভাষাতে সবচেয়ে বেশি দেখতে পাওয়া যায়। নিউক্লিয়াসের স্বরধ্বনির আগে সর্বোচ্চ তিনটি ব্যঞ্জন থাকতে পারে, আর নিউক্লিয়াসের পরে সর্বোচ্চ থাকতে পারে দুইটি ব্যঞ্জনধ্বনি। সংকেত আকারে লিখলে বাংলা সিলেবলের সংগঠন এভাবে দেখানো যায়: (C) (C) (C) V (C) (C)। এখানে C ব্যঞ্জন এবং V স্বর নির্দেশ করছে। বন্ধনী দিয়ে বোঝানো হয়েছে C-এর উপস্থিতি ঐচ্ছিক। উল্লেখ্য খাঁটি বা তদ্ভব বাংলাতে V, CV, VC, CVC --- এই চার ধরনের সিলেবলই মূলত ব্যবহৃত হয়। নিউক্লিয়াসের স্বরধ্বনির আগে বা পরে দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনধ্বনি দেখতে পাওয়া যায় সংস্কৃত থেকে ধার করা তৎসম শব্দে এবং ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশী ভাষা থেকে ধার করা শব্দে। নিচে বাংলায় প্রচলিত সিলেবল বিন্যাসগুলির একটি তালিকা দেওয়া হল।
ধ্বনির উপস্থিতির নিয়ম[সম্পাদনা]
ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়ম[সম্পাদনা]
স্বরধ্বনির রূপান্তর[সম্পাদনা]
|
|||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||||