বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব বলতে বাংলা ভাষাতে ব্যবহৃত যাবতীয় ধ্বনির বিবরণ, এগুলির উচ্চারণ ও ব্যবহারবিন্যাসের আলোচনাকে বোঝায়। বাংলা ভাষার ঔপভাষিক বৈচিত্র্য ব্যাপক এবং বিভিন্ন বাংলা উপভাষার ধ্বনিব্যবস্থাও তাই স্বতন্ত্র। এই নিবন্ধে কেবলমাত্র মান্য বা আদর্শ চলিত বাংলা ভাষার ধ্বনিতত্ত্বের বিবরণ দেওয়া হয়েছে।

স্বরধ্বনি[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষাতে ৭টি পূর্ণ স্বরধ্বনি আছে; এগুলিকে অ, আ, ই, উ, এ, ও এবং অ্যা বর্ণ দিয়ে নির্দেশ করা যায়। পূর্ণস্বরধ্বনিগুলিকে নাকি স্বরে বা অনুনাসিকভাবেও উচ্চারণ করা যায় (ঁ দিয়ে নির্দেশ করা হয়)। এছাড়াও বাংলা ভাষাতে অর্ধস্বরধ্বনি আছে চারটি; এগুলি ই, উ, এ এবং ও স্বরধ্বনিগুলির অর্ধোচ্চারিত রূপ। পূর্ণ এবং অর্ধস্বরধ্বনিগুলি একত্রিত হয়ে বাংলায় ১৭টির মত দ্বিস্বরধ্বনি উচ্চারিত হয়; এগুলিকে অয়, অও, আউ, আয়, আও, ইই, ইউ, এই, এউ, এও, অ্যায়, অ্যাও, ওই, ওউ, ওয়, ওও দিয়ে নির্দেশ করা যেতে পারে।

লিখিত বাংলার বর্ণমালা, যা স্কুল কলেজে শিক্ষা দেওয়া হয়, সেগুলিতে ঈ, ঊ, ঋ, ৯-এর অস্তিত্ব থাকলেও উচ্চারণের ক্ষেত্রে এগুলি স্বরধ্বনি হিসেবে উচ্চারিত হয় না। দীর্ঘ ঈ এবং দীর্ঘ ঊ সংস্কৃতে দীর্ঘভাবে উচ্চারিত হলেও কথ্য বাংলাতে সবসময় দীর্ঘ উচ্চারিত হয় না। ঋ-কে রি এবং ৯-কে লি হিসেবে উচ্চারণ করা হয়। অন্যদিকে অ্যা স্বরধ্বনিটি বাংলার একটি মৌলিক পূর্ণ স্বরধ্বনি হলেও শিক্ষামাধ্যমে প্রচলিত বর্ণমালাতে একে সেভাবে স্থান দেয়া হয়নি। বাংলা ভাষাতে দ্বিস্বরধ্বনির সংখ্যা সতেরটির মত হলেও কেবল ওই এবং ওউ-এর জন্য আলাদা দুইটি বর্ণ আছে, যথাক্রমে ঐ এবং ঔ, এবং এগুলিকে স্কুলপাঠ্য বর্ণমালার স্বরবর্ণ ভাগে স্থান দেওয়া হয়েছে।

নিচে আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালাতে বাংলা স্বরধ্বনিগুলি উচ্চারণস্থল ও উচ্চারণকৌশল অনুযায়ী ছক আকারে দেখানো হল।

বাংলা স্বরধ্বনি
  সম্মুখ কেন্দ্রীয় পশ্চাৎ
সংবৃত i   u
সংবৃত-মধ্য e   o
বিবৃত-মধ্য æ   ɔ
বিবৃত   a  

ব্যঞ্জনধ্বনি[সম্পাদনা]

বাংলা ভাষাতে ব্যঞ্জনধ্বনি আছে মোটামুটিভাবে ৩১টি। এগুলিকে ক, খ, গ, ঘ, ঙ, চ, ছ, জ, ঝ, ট, ঠ, ড, ঢ, ত, থ, দ, ধ, ন, প, ফ, ব, ভ, ম, র, ল, শ, স, হ, ড়, ঢ় --- এই বর্ণগুলি দিয়ে নির্দেশ করা হয়। বাংলার স্কুলপাঠ্য বর্ণমালার ব্যঞ্জনবর্ণ ভাগে আরও কয়েকটি বর্ণ স্থান দেওয়া হয়েছে, যেমন – ঞ, ণ, ষ, স, ং, ঃ, ৎ, ঁ। ঞ বর্ণটি নিয়-র মত উচ্চারিত হয়। ণ আর ন বর্ণের উচ্চারণে তেমন কোন পার্থক্য নেই; তবে ট-বর্গীয় ধ্বনির (ট, ঠ, ড, ঢ) ঠিক আগে বসলে জিহ্বা উল্টিয়ে মূর্ধন্য ণ উচ্চারিত হয়। মূর্ধন্য ষ-এর উচ্চারণের বেলায় জিহ্বা উল্টানো হয় না; এটি তালব্য শ-এর মতই উচ্চারিত হয়। দন্ত্য স-ও তালব্য শ-এর মতই বেশির ভাগ ক্ষেত্রে উচ্চারিত হয়; কেবল যুক্তব্যঞ্জনে ত, থ, ন, র, ল-এর আগে শ, স – উভয়েই ইংরেজি s-এর মত (যেমন- স্বস্তি, আস্থা, স্নাতক, শ্রান্তি, শ্লীলতাহানি) এবং শব্দের শুরুতে যুক্তব্যঞ্জনে ক, খ, প, ফ-এর আগে বসা স ইংরেজি s-এর মত (স্কন্ধ, স্খলন, স্পর্শ, স্ফূর্তি) উচ্চারিত হয়। য বর্ণটি জ-এর মত উচ্চারিত হয়। ং-এর উচ্চারণ ঙ-এর মত। চন্দ্রবিন্দুর কাজ স্বরধ্বনিকে অনুনাসিকতা প্রদান করা; এটি কোন ব্যঞ্জনধ্বনি নয়। ৎ হল অন্ত্যস্বরবিহীন ত্‌ এবং ঃ হল অন্ত্যস্বরবিহীন হ্‌। য় বর্ণটি মূলত দ্বিস্বরধ্বনির দ্বিতীয় স্বরটি বোঝাতে ব্যবহৃত হয় (একটি উদাহরণ: ও+এ = ওএ > ওয়; যেমন – ধোয়, শোয়)।

বাংলা ব্যঞ্জনধ্বনি
  উভয়ৌষ্ঠ্য দন্ত্য দন্তমূলীয় জিহ্বাগ্র্য-
পশ্চাৎ-দন্তমূলীয়
জিহ্ব্য-পশ্চাৎ-দন্তমূলীয় তালব্য কণ্ঠনালীয়
নাসিক্য m   n     ŋ  
স্পর্শ অঘোষ p
1

t̪ʰ
  ʈ
ʈʰ

tʃʰ2
k
 
ঘোষ b

d̪ʱ
  ɖ
ɖʱ
3
dʒʱ
ɡ
ɡʱ
 
উষ্ম f1
 
 
 
s2
z3
 
 
ʃ2
 
 
 
h
 
তরল     l, r4 ɽ4      

মান্য চলিত বাংলা উচ্চারণে পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে মোটামুটি সমতা বিধান করা হয়, তবে মান্য চলিত ভাষাভাষী বক্তাদের উচ্চারণের ক্ষেত্রেও এলাকাভেদে কিছু বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়:

  • /f/: "ফ" বর্ণটি বক্তাভেদে অঘোষ মহাপ্রাণ ওষ্ঠ্য স্পর্শধ্বনি [pʰ] হিসেবে কিংবা অঘোষ ওষ্ঠ্য উষ্মধ্বনি [ɸ]~[f] হিসেবে উচ্চারিত হতে পারে।
  • অনেক মান্য চলিত বাংলা বক্তার ভাষায় /s/ একটি বহুব্যবহৃত স্বরধ্বনিমূল (সিরকা [sirka], অস্থির [ɔst̪ʰir], ব্যস [bas] বা [bæs]')।
    • অনেক বক্তার উচ্চারণে /s/ এবং /ʃ/ ধ্বনিমূল দুইটি ভিন্নভাবে উচ্চারিত হয় (আস্তে [ast̪e] বনাম আসতে [aʃt̪e] 'to come')। আবার অনেকে এই দুটিকে একই ধ্বনি /s/ দিয়ে উচ্চারণ করেন।
    • কিছু বিদেশী শব্দ যেগুলিতে আদিতে /s/ ধ্বনি ছিল, সেটি মান্য চলিত বাংলাতে [tʃʰ] (পছন্দ [pɔtʃʰond̪o], হিন্দি-উর্দু پسند/पसंद থেকে) কিংবা {IPA|[ʃ]} (সবজি [ʃobdʒi], ফার্সি سبزى থেকে)।
  • /z/: বিদেশী কিছু শব্দের /z/ ধ্বনি বাংলায় [dʒ] উচ্চারিত হয় (সবজি [ʃobdʒi], ফার্সি سبزى থেকে)।
  • /ɽ/: বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে প্রচলিত মান্য চলিত বাংলা ভাষার অনেক বক্তা /ɽ/ এবং /r/ ধ্বনি দুইটিকে ভিন্নভাবে উচ্চারণ করেন না। তাদের মুখে পড়ে [pɔɽe]/পরে [pɔre], কড়া [kɔɽa]/করা [kɔra] একই রকম শোনায় (জোড়ার দ্বিতীয় শব্দটির মত)।

অক্ষর/দল/সিলেবল[সম্পাদনা]

মুখের ভাষার যে অংশ একবারে, এক ধাক্কায় উচ্চারণ করা যায়, সহজভাবে ধ্বনিবিজ্ঞানের পরিভাষায় তাকেই সিলেবল, দল বা অক্ষর বলে। বাংলা ভাষার সিলেবলগুলির কেন্দ্রে বা নিউক্লিয়াসে থাকে একটি স্বরধ্বনি। এই কেন্দ্রের আগে বা পরে শূন্য, এক বা একাধিক ব্যঞ্জনধ্বনি বসতে পারে। অর্থাৎ বাংলা সিলেবলের বিন্যাস স্ব, স্বব, বস্বব, ববস্ব, ববস্বব, ইত্যাদি বিভিন্ন রকমের হতে পারে। সব মিলিয়ে প্রায় পনেরটির মত বিন্যাস পাওয়া গেছে। এদের মধ্যে বস্ব অর্থাৎ ব্যঞ্জন+স্বর সিলেবলটিই (খা, দু, পা, নি, ইত্যাদি) বাংলা ভাষাতে সবচেয়ে বেশি দেখতে পাওয়া যায়। নিউক্লিয়াসের স্বরধ্বনির আগে সর্বোচ্চ তিনটি ব্যঞ্জন থাকতে পারে, আর নিউক্লিয়াসের পরে সর্বোচ্চ থাকতে পারে দুইটি ব্যঞ্জনধ্বনি। সংকেত আকারে লিখলে বাংলা সিলেবলের সংগঠন এভাবে দেখানো যায়: (C) (C) (C) V (C) (C)। এখানে C ব্যঞ্জন এবং V স্বর নির্দেশ করছে। বন্ধনী দিয়ে বোঝানো হয়েছে C-এর উপস্থিতি ঐচ্ছিক।

উল্লেখ্য খাঁটি বা তদ্ভব বাংলাতে V, CV, VC, CVC --- এই চার ধরনের সিলেবলই মূলত ব্যবহৃত হয়। নিউক্লিয়াসের স্বরধ্বনির আগে বা পরে দুই বা ততোধিক ব্যঞ্জনধ্বনি দেখতে পাওয়া যায় সংস্কৃত থেকে ধার করা তৎসম শব্দে এবং ইংরেজি ও অন্যান্য বিদেশী ভাষা থেকে ধার করা শব্দে। নিচে বাংলায় প্রচলিত সিলেবল বিন্যাসগুলির একটি তালিকা দেওয়া হল।

সিলেবলের গঠন উদাহরণ
V আ (যেমন- মি); ই (যেমন- তি)
CV কি, খা, দে, নে, তু (যেমন- তুমি)
VC এক, ওঠ্‌, আন্‌
CVC কান, চোখ, মুখ, ঢোল, ফুল, পাট, দম, লোক, বের, ফল
CCV শ্রী (বিশ্রী), প্রে (প্রেম), দ্রু (দ্রুতি), প্র (প্রসেসর), ফ্রি
CCVC ঘ্রাণ, প্রাণ, স্নান, ম্লান, ভ্রম, ক্রোশ, ট্রাক, ট্রেন, ক্লিপ, স্কুল, ড্রেন, প্লেন
CCCV স্ত্রী, স্পৃহা, স্ক্রু
CCCVC স্ত্রীর, স্প্রিং, স্ক্রিন
CVCC এগুলি বিরল।
VV ঐ, আয়, ঔ (ষধ)
CVV বউ, খায়, দেই, হয়
VVC আইন, ঐশ (ঐশ্‌-শরিক = ঐশ্বরিক)
CVVC বৌদ (বৌদ্‌-ধ = বৌদ্ধ), বাইশ, মাইক, লাইন
CCVV ত্রৈ (ত্রৈমাসিক), প্রা (প্রায়)
CCVCC স্টাইল
CCCVV স্ত্রৈ (স্ত্রৈণ), স্ট্রাই (স্ট্রাইকার)

ধ্বনির উপস্থিতির নিয়ম[সম্পাদনা]

  1. বিদেশী বা তৎসম নয়, এমন বাংলা শব্দের শুরুতে বা শেষে একাধিক ব্যঞ্জন পাশাপাশি বসে না।
  2. বাংলা শব্দের শুরুতে ঙ্‌ বসে না (তুলনীয় ভিয়েতনামীয়, তাগালোগ এবং আফ্রিকার বিভিন্ন ভাষার শুরুতে ব্যবহৃত ঙ ধ্বনি)। ড়, ঢ় দিয়েও শব্দ শুরু হয় না।
  3. বাংলা শব্দের শেষে হ্‌, বসে না।
  4. শব্দ বা সিলেবলের শুরু ছাড়া অন্য কোথাও অ বা অ্যা বসে না।

ধ্বনি পরিবর্তনের নিয়ম[সম্পাদনা]

স্বরধ্বনির রূপান্তর[সম্পাদনা]

  1. পরবর্তী সিলেবলের কেন্দ্রে ই বা উ থাকলে
    • পূর্ববর্তী সিলেবলের অ, ও হয়ে যায়। যত (উচ্চারণ জতো), কিন্তু মতি (উচ্চারণ মোতি)।
    • পূর্ববর্তী সিলেবলের অ্যা, এ হয়ে যায়। দেখা (দ্যাখা), কিন্তু দেখি।
    • পূর্ববর্তী সিলেবলের এ, ই হয়ে যায়। লেখা, কিন্তু লিখি।
    • পূর্ববর্তী সিলেবলের ও, উ হয়ে যায়। শোনা, কিন্তু শুনি।
    • ব্যতিক্রম: যদি পূর্ববর্তী সিলেবলের অ-টি একটি উপসর্গের হয়, তবে এর উচ্চারণ পরিবর্তিত হয় না। যেমন- অপূর্ব, সম্পূর্ণ।
  2. শব্দের শুরুতে র-ফলা যুক্ত ব্যঞ্জনের নিহিত অ, ও হয়ে যায়। যেমন- শ্রম (স্রোম্‌), ভ্রম (ভ্রোম্‌), ইত্যাদি। ব্যতিক্রম: ক্রয়।
  3. লিখিত বাংলায় পরের বর্ণে য-ফলা থাকলে আগের বর্ণটির অ, ও হয়ে যায়। যেমন- অরণ্য (অরোন্‌নো), সদ্য (শোদ্‌দো), পর্যন্ত (পোর্‌জোন্‌তো), পথ্য (পোত্‌থো)।
  4. লিখিত বাংলায় পরের বর্ণ ক্ষ বা জ্ঞ হলে আগের বর্ণের নিহিত অ, ও হয়ে যায়। যেমন- বক্ষ (বোক্‌খো), লক্ষ (লোক্‌খো), যজ্ঞ (জোগ্‌গোঁ)।
    • ব্যতিক্রম: যদি পূর্ববর্তী সিলেবলের অ-টি একটি উপসর্গের হয়, তবে এর উচ্চারণ পরিবর্তিত হয় না। যেমন- অজ্ঞ (অগ্‌গোঁ), সংজ্ঞা (শংগাঁ)।
  5. শব্দের মাঝে বা শেষে অবস্থিত নিহিত অ, সবসময় ও উচ্চারিত হয়। যেমন- ছাগল (ছাগোল্‌), প্রধানত (প্রোধানোতো), ভিন্ন (ভিন্‌নো)।
    • ব্যতিক্রম: যদি সিলেবলটি উপসর্গের পরে অবস্থিত শব্দমূল হয়, তবে সেই শব্দমূলের শুরুর অ, ও হয় না। যেমন- বিকল (বিকোল উচ্চারিত হয় না), হৃদয় (হৃদোয় উচ্চারিত হয় না)।