বিশ্বের ইতিহাস

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
ইতিহাসের তিন প্রতীক: বালিঘড়ি, পুস্তক ও মানচিত্র

বিশ্বের ইতিহাস বলতে এখানে পৃথিবী নামক গ্রহে বসবাসকারী মানবজাতির ইতিহাস বোঝানো হয়েছে, গ্রহ হিসেবে পৃথিবীর ইতিহাস নয়। মানুষের ইতিহাস মূলত পুরাপ্রস্তর যুগে পৃথিবী জুড়ে শুরু হয়। আদিম যুগ থেকে প্রাপ্ত সকল প্রত্নতাত্ত্বিকলিখিত দলিল এর আওতাভুক্ত। লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রাচীন প্রামাণ্য ইতিহাসের[১] শুরু হয়।[২][৩] যদিও লিখন পদ্ধতি আবিষ্কারের পূর্ববর্তী যুগেও সভ্যতার নিদর্শন পাওয়া গেছে। প্রাগৈতিহাসিক যুগের সূচনা ঘটে পুরাপ্রস্তর যুগে। সেখান থেকে সভ্যতা প্রবেশ করে নব্যপ্রস্তর যুগে এবং এসময় কৃষি বিপ্লবের (খ্রিস্টপূর্ব ৮০০০-খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দ) সূচনা ঘটে। নব্যপ্রস্তর যুগের বিপ্লবে উদ্ভিদ ও পশুর গৃহপালন এবং নিয়মানুগ কৃষিপদ্ধতি রপ্ত করা মানব সভ্যতার একটি অনন্য মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত।[৪][৫][৬] কৃষির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে বেশির ভাগ মানুষ যাযাবর জীবনযাত্রা ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে কৃষকের জীবন গ্রহণ করে। তবে বহু সমাজে যাযাবর জীবনব্যবস্থা রয়ে যায়, বিশেষ করে ভৌগোলিকভাবে বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলিতে ও যেখানে আবাদযোগ্য উদ্ভিদ প্রজাতির অভাব ছিল। কৃষি থেকে প্রাপ্ত খাদ্য নিরাপত্তা ও উদ্বৃত্ত উৎপাদনের ফলে গোষ্ঠীগুলি ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেয়ে আরও বড় সামাজিক প্রতিষ্ঠানের জন্ম দেয়। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নও এক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।

কৃষির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে শস্য উৎপাদন ব্যবস্থারও বিকাশ ঘটে, যা সমাজে শ্রমবিভাগকে ত্বরান্বিত করে। শ্রমবিভাগের পথ ধরে সমাজে সুবিধাপ্রাপ্ত উচ্চশ্রেণীর উন্মেষ ঘটে ও শহরগুলো গড়ে উঠে। সমাজে জটিলতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে লিখন ও হিসাব পদ্ধতির ব্যবহার জরুরী হয়ে পড়ে।[৭] হ্রদ ও নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের মধ্যে অনেক শহর গড়ে উঠে। এদের মধ্যে উন্নতি ও উৎকর্ষতার দিক দিয়ে মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা,[৮] মিশরের নীল নদ তীরবর্তী সভ্যতা[৯][১০][১১]সিন্ধু সভ্যতা[১২][১৩][১৪] উল্লেখ্যযোগ্য। একই ধরনের সভ্যতা সম্ভবত চিনের প্রধান নদীগুলোর তীরেও গড়ে উঠেছিল কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো থেকে এব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয়নি।

প্রাচীন পৃথিবীর (প্রধানত ইউরোপ, তবে নিকট প্রাচ্যউত্তর আফ্রিকাও এর অন্তর্ভুক্ত) ইতিহাসকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়। ৪৬৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত প্রাচীন যুগ; পঞ্চম থেকে পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত মধ্য যুগ বা ধ্রুপদী-উত্তর যুগ,[১৫][১৬] যার মধ্যে রয়েছে ইসলামি স্বর্ণযুগ(৭৫০- ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দ) ও ইউরোপীয় রেনেসাঁ (১৩শ শতক থেকে শুরু)।[১৭][১৮] আধুনিক যুগের সূচনাকাল[১৯] ধরা হয় ১৫শ শতক থেকে ১৮শ শতকের শেষ পর্যন্ত যার মধ্যে রয়েছে ইউরোপের আলোকিত যুগ। শিল্প বিপ্লব হতে বর্তমান সময় পর্যন্ত আধুনিক যুগ বলে বিবেচিত। পাশ্চাত্য ইতিহাসে রোমের পতনকে প্রাচীন যুগের শেষ ও মধ্যযুগের সূচনা হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু পূর্ব ইউরোপ রোমান সাম্রাজ্য থেকে বাইজেনটাইন সাম্রাজের অধীনে আসে, যার পতন আরো অনেক পরে ঘটে। ১৫ শতকের মাঝামাঝি গুটেনবার্গ আধুনিক ছাপাখানা আবিষ্কার করেন[২০] যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ফলে মধ্যযুগের সমাপ্তি ঘটে এবং বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের সূত্রপাত হয়।[২১] ১৮ শতকের মধ্যে ইউরোপে জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসার এমন একটি চরম অবস্থায় উপনীত হয় যা শিল্প বিপ্লবকে অবধারিত করে তুলে।[২২]

বিশ্বের অন্যান্য অংশে, বিশেষ করে প্রাচীন নিকট প্রাচ্য,[২৩][২৪][২৫] প্রাচীন চীন[২৬]প্রাচীন ভারতে সভ্যতা ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়, যেমন চিনের চার অনন্য আবিষ্কার, ইসলামের স্বর্ণযুগ, ভারতীয় গণিত। তবে ১৮ শতকের পর হতে ব্যাপক ব্যাবসা-বাণিজ্য ও উপনিবেশায়নের ফলে সভ্যতাগুলো বিশ্বায়িত হতে থাকে। গত পাঁচশো বছরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার, জ্ঞান-বিজ্ঞান, ব্যাবসা-বাণিজ্য, অস্ত্রের ধ্বংসক্ষমতা, পরিবেশগত ক্ষতি প্রভৃতি অসামান্য গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বর্তমান বিশ্বের মানুষের সামনে একই সঙ্গে ব্যাপক সম্ভাবনা ও বিপদ এর দ্বার উন্মোচন করেছে।[২৭][২৮]

পরিচ্ছেদসমূহ

প্রাগৈতিহাসিক যুগ[সম্পাদনা]

আদিম মানব[সম্পাদনা]

বিজ্ঞানীদের মতে পৃথিবীতে আজ থেকে প্রায় ৩০ কোটি বছর আগে জীবনের উদ্ভব। কিন্তু আধুনিক মানব-সদৃশ জীব তথা হোমিনিডদের আবির্ভাব ঘটে আজ থেকে প্রায় ৭০ লক্ষ বছর আগে। তারা প্রাইমেট বর্গীয় জীবদের মত গাছের উপরে বসবাস করত। ফসিল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে আজ থেকে প্রায় ৪০ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকা মহাদেশে অস্ট্রালোপিথেকাস জাতীয় প্রাণীরা বাস করত (অস্ট্রালোপিথেকাস অর্থ “দক্ষিণাঞ্চলীয় এপ”)। ১৯৭৪ সালে ইথিওপিয়াতে ৩০ লক্ষ বছরের পুরনো একটি অস্ট্রালোপিথেকাস প্রাণীর ফসিলের সন্ধান পাওয়া যায়, যার নাম লুসি। অস্ট্রালোপিথেকাসরা মাটিতে দুই পায়ে হাঁটতে পারত। এরপর আজ থেকে ২৫ থেকে ১৫ লক্ষ বছর আগে আফ্রিকাতে হোমো হাবিলিস (অর্থাৎ “হাতের কাজে পটু মানব”) নামের প্রাণীর আবির্ভাব ঘটে, যাদেরকে প্রথম যথার্থ মানব হিসেবে গণ্য করা যায়। তাদের মস্তিষ্ক বড় ছিল এবং তারাই প্রথম লাঠি ও পাথর দিয়ে বানানো হাতিয়ার ব্যবহার করা শুরু করে। এর ১০ লক্ষ বছর পরে, অর্থাৎ আজ থেকে ১৫ লক্ষ বছর আগে হোমো ইরেক্টাস (“দন্ডায়মান মানব”) নামক আরেকটি মানব প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে। এই প্রজাতিটিই প্রথম আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ইউরোপএশিয়া মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। তাদের হাতিয়ার ও সরঞ্জামগুলি উন্নততর ছিল যা দিয়ে তারা শিকার করত, তারা আশ্রয়স্থল বানাতে পারত এবং আগুনের ব্যবহার জানত। এই হোমিনিডগুলি থেকেই ধীরে ধীরে বিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক মানব বা হোমো সেপিয়েন্স (“বুদ্ধিমান মানব”) নামক প্রজাতির আবির্ভাব ঘটে। তবে হোমো সেপিয়েন্সের দুইটি উপপ্রজাতি বহুদিন পাশাপাশি বাস করত। একটি ছিল নিয়ান্ডার্থাল মানব, যারা ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়াতে বাস করত। অন্যটি ছিল হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্স, তথা বর্তমান মানব প্রজাতি, যাদের আবির্ভাব আজ থেকে প্রায় ৪০ হাজার বছর আগে। নিয়ান্ডার্থাল মানবেরাই প্রথম মৃতদের সমাধি দেওয়া শুরু করে। কিন্তু আজ থেকে ২০ হাজার বছর আগে তারা বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং তাদের জায়গার এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকাতে কেবল হোমো সেপিয়েন্স সেপিয়েন্স উপপ্রজাতিটি বাস করা শুরু করে। একই সময়ে তারা এশিয়া অতিক্রম করে আমেরিকা মহাদেশে প্রবেশ করে। আধুনিক মানুষদের হাতগুলি পায়ের চেয়ে দীর্ঘ ছিল, তারা দুই পায়ে সোজা হয়ে হাঁটত এবং মুক্ত হাত দিয়ে হাতিয়ার ও অস্ত্রশস্ত্র ব্যবহার করত।

প্রাচীন যুগ[সম্পাদনা]

পুরাপ্রস্তর যুগে মানুষেরা পাথরে নির্মিত অস্ত্র, সরঞ্জাম ও উপকরণ ব্যবহার করা শুরু করে। এসময় তারা প্রকৃতিতে পশু শিকার করত এবং খাদ্য সংগ্রহ করত। তারা পাহাড় কেটে গুহাতে বাস করত এবং গুহার দেওয়ালে অনেক সময় তাদের শিকারকাহিনীর চিত্র এঁকে রাখত; অনেক সময় ধর্মীয় কারণেও তারা গুহাচিত্র আঁকত। ধারণা করা হয় এই যুগেই মানব ইতিহাসে বিজ্ঞান, শিল্পকলা ও ধর্মের উৎপত্তি ঘটে।

নব্যপ্রস্তর যুগে খামার পশুপালন ও কৃষিকাজের উদ্ভব ঘটে। এর আগে মানুষ খাবারের জন্য বন্য শস্যদানার ভান্ডারের উপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু প্রতিকূল শুষ্ক আবহাওয়ার সময় এগুলি খাবারের অযোগ্য হয়ে পড়ত। তাই মানুষেরা শস্যদানাগুলিকে আবার পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা চালাতো এবং এভাবে ধীরে ধীরে কৃষিকাজের জন্ম হয়। পশুপালন ও কৃষিকাজের উদ্ভব ছিল মানব ইতিহাসের একটি বৈপ্লবিক ঘটনা। এর ফলে খাদ্য সংগ্রহ ও উৎপাদনের ক্ষেত্রে মানুষের কর্মকাণ্ড ও আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আসে। তবে এই বিপ্লব সহসা একবারের জন্য ঘটেনি। প্রায় কয়েক হাজার বছর ধরে বিভিন্ন মানব বসতিতে বিভিন্ন সময়ে এরকম একাধিক কৃষি বিপ্লব ঘটেছিল।

কৃষিকাজ ও খামারে পশুপালনের মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সাথে সাথে সমাজব্যবস্থাতেও পরিবর্তন আসে। কৃষিকাজের কারণে অনেক মানুষ এক জায়গায় বাস করা শুরু করে। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা বৃদ্ধির কারণে জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। এভাবে ধীরে ধীরে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে একাধিক মানবসভ্যতার পত্তন হয়। শ্রমবিভাজন এবং সরকারের আবির্ভাব ছিল এই সভ্যতাগুলির অন্যতম দুই বৈশিষ্ট্য। জেরিকো ও চাতাল হুইউক এরকম দুইটি সভ্যতার উদাহরণ। অনেকে ধারণা করেন কৃষিভিত্তিক সভ্যতার মাধ্যমে মানবসমাজে পুরুষতান্ত্রিকতার জন্ম হয়। এর আগে পুরাপ্রস্তর যুগে পুরুষেরা শিকার করত এবং নারীরা খাদ্য সংগ্রহ করত, ফলে তাদের মধ্যে পরিস্কার শ্রমবিভাজন ছিল এবং কেউই কারও চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজে পুরুষেরাই কৃষিকাজ করত এবং নারীদেরকে গৃহস্থালি কাজে সীমিত করে রাখা হয়; ফলে সমাজে নারীর মর্যাদার অবনতি ঘটে।

নব্য প্রস্তরযুগের শেষ পর্বে এসে ধাতু বিশেষ করে তামা এবং লোহার সরঞ্জাম তৈরি করা শুরু হয়। কিন্তু এগুলি পাথরের তুলনায় নরম ও বেশি ভঙ্গুর ছিল তখনও প্রস্তরনির্মিত সরঞ্জামের কদর কমে যায়নি।

মেসোপটেমিয়া এবং সুমেরীয় জাতি[সম্পাদনা]

তাইগ্রিস ও ইউফ্রেতিস নদীর মধ্যবর্তী উর্বর অববাহিকাতে (যা বর্তমানে ইরাক নামে পরিচিত) বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতাগুলির একটি গড়ে উঠেছিল। এই জায়গাটি পরবর্তীতে মেসোপটেমিয়া নামে পরিচিতি লাভ করে, যার অর্থ “দুই নদীর মধ্যবর্তী ভূমি”। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে সুমেরীয়রা দক্ষিণ মেসোপটেমিয়াতে বসতি স্থাপন করে।

সুমেরীয়রা সোনা এবং রূপা দিয়ে এবং দামী পাথর দিয়ে বাহারী গহনা বানাতে পারত। এছাড়াও কুটিরশিল্পী ও মিস্ত্রীরা আসবাবপত্র, পানীয়পাত্র এবং বাদ্যযন্ত্র বানাত। উর শহরের রাজকীয় সমাধি খনন করে এইসব ধনসম্পদের দেখা পাওয়া গেছে।

খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ সালে উর শহরে রাজা উর-নাম্মু এক বিশাল জিগারুট বা ধাপবিশিষ্ট বিশালাকার মন্দির নির্মাণ করেন। কাদামাটির ইটে তৈরি পুরাতন মন্দিরগুলি ধ্বংস হয়ে গেলে সেগুলির উপরে নতুন মন্দিরগুলি নির্মাণ করা হত, ফলে ধীরে ধীরে মন্দিরের উচ্চতা বাড়তেই থাকত।

মেসোপটেমিয়ার উর্বর ভূমি শস্য উৎপাদনের জন্য খুবই অনুকূল ছিল। কৃষকেরা শীঘ্রই সেচকাজের জন্য খাল খনন করতে শিখে এবং এভাবে নদী থেকে তাদের জমিতে পানির সরবরাহ নিশ্চিত করে। খাদ্যের উৎপাদন বাড়তে শুরু করলে জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দ নাগাদ কিছু কিছু গ্রাম বড় হয়ে উদীয়মান শহরে পরিণত হয়। এদের মধ্যে উর এবং উরুক শহর দুইটি প্রথমে বড় নগরে এবং শেষে স্বাধীন নগর-রাষ্ট্রে পরিণত হয়।

শহরগুলি শাসন করতেন বয়স্কদের সমিতিরা। এই সমিতিগুলি যুদ্ধের সময় সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য লুগাল বা সামরিক শাসকদের কাজে নিয়োগ দান করতেন। প্রতিদ্বন্দ্বী নগরগুলির মধ্যে যুদ্ধের আবির্ভাব বেড়ে গেলে লুগালদের প্রতিপত্তি বেড়ে যায়। খ্রিস্টপূর্ব ২৯০০ অব্দ থেকে লুগালরা রাজার ভূমিকা পালন করতে থাকেন। তারা সারা জীবন দেশ শাসন করতেন।

প্রতিটি শহরের কেন্দ্রে একটি মন্দির দাঁড়িয়ে থাকত। সেই মন্দিরে শহরের পৃষ্ঠপোষক দেবতা বা দেবীর উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা হত। সুমেরীয়রা বিশ্বাস করত দেবদেবীরা প্রকৃতি ও প্রাত্যহিক জীবনের সমস্ত দিক নিয়ন্ত্রণ করে। তাই তারা প্রতিদিন দেবদেবীদেরকে খুশি রাখার জন্য কিছু না কিছু উৎসর্গ করত, নইলে তারা নাখোশ হয়ে শাস্তি হিসেবে যুদ্ধ, বন্যা বা রোগব্যাধি পাঠাতে পারেন।

সুমেরীয়রা দক্ষ গণিতবিদ ছিল। তাদের দুইটি গণনা করার পদ্ধতি ছিল। একটি ছিল দশমিক পদ্ধতি, যা বর্তমানে ব্যবহার করা হয়। অন্যটি ছিল ষষ্ঠিক বা ৬০ ভিত্তিক সংখ্যা পদ্ধতি। সুমেরীয়রাই সর্বপ্রথম এক ঘন্টাকে ৬০টি মিনিটে ভাগ করে। এছাড়াও তারা একটি পঞ্জিকা, জটিল আইনি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করে। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে সুমেরীয়রা চাকা উদ্ভাবন করে। কুমোরের কাজের জন্য এবং পশুটানা গাড়ির জন্য তারা চাকা ব্যবহার করত। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় উদ্ভাবন ছিল লিখন পদ্ধতি। খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ অব্দে সুমেরে লিখন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়। মূলত মন্দির ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের লেখ্যপ্রমাণ স্থায়ীভাবে ধরে রাখার জন্য লিখন পদ্ধতি ব্যবহৃত হত। কাদামাটির ফলকে কীলকাকৃতির প্রতীকগুলি উৎকীর্ণ করে শব্দ লেখা হত।

সুমেরীয়দের সমাজে অনেক পুরাণ ও লোককাহিনী প্রচলিত ছিল। তবে এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাতটি হল রাজা গিলগামেশের মহাকাব্য। গিলগামেশ চিরজীবী হওয়ার গোপনসূত্র আবিষ্কার করতে চেয়েছিলেন। তিনি খবর পান যে সাগরের তলদেশে একটি উদ্ভিদ আছে যা মানুষকে চিরজীবী বানাতে পারে। কিন্তু তিনি গাছটি ব্যবহার করার আগেই একটি সাপ এটি চুরি করে নিয়ে যায়।

খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ অব্দে সুমেরীয়রা দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার উবাইদ অঞ্চলে চাষবাস ও খামার করা শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে উরুক যুগের শুরু হয়। সুমেরীয়রা ধাতু গলাতে শেখে। তারা তাইগ্রিস ও ইউফ্রেতিস নদীতে পালতোলা নৌকায় চলাচল করা শুরু করে। ৩৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে এসে তারা তামা ও রাং (অর্থাৎ টিন) গলিয়ে ব্রোন্‌জ নামক মিশ্রধাতু তৈরির পদ্ধতি আবিষ্কার করে।

২৯০০ থেকে ২৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ছিল প্রাথমিক রাজবংশীয় যুগ। প্রধান প্রধান সুমেরীয় শহরগুলিতে রাজারা শাসন করতে শুরু করেন। ২৪০০ থেকে ২১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত সময়ে প্রথমে আক্কাদীয়রা, পরে গুতীয়রা সুমের দখল করে। ২৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আগাদে নামক সুমেরীয় শহর গোটা সুমের অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করত। খ্রিস্টপূর্ব ২১০০ সালে এসে উর শহর শৌর্য ও প্রতিপত্তির শীর্ষে পৌঁছে, এসময় এর রাজা ছিলেন উর-নাম্মু। ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে প্রথম গিলগামেশ মহাকাব্য মুখের ভাষা থেকে লিখে রাখা হয়। এলামীয়রা এসে উর শহর ধ্বংস করে দেয়। সুমেরীয় সভ্যতার পরিসমাপ্তি ঘটে। সুমেরীয়দের বাড়িঘর সম্ভবত বর্তমানে জলাভূমি আরবদের বাড়ির মত ছিল। এই আরবেরা দক্ষিণ ইরাকের তাইগ্রিস নদীর তীরে বসবাস করে।

আক্কাদীয় সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

ব্যাবিলোনীয় জাতি এবং হাম্মুরাবির সংবিধান[সম্পাদনা]

ফিনিসীয় জাতি[সম্পাদনা]

লিখন পদ্ধতির উদ্ভব[সম্পাদনা]

প্রাচীন মিশর[সম্পাদনা]

৫০০০ থেকে ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ছিল প্রাচীন মিশরের রাজবংশ-পূর্ব যুগ। খ্রিস্টপূর্ব ৫ হাজার অব্দের দিকে প্রাচীন মিশরে নীল নদের অববাহিকা ছোট ছোট গ্রামের আবির্ভাব ঘটে। সময়ের সাথে সাথে এই ছোট ছোট বসতিগুলি আকারে বড় হওয়া শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দের দিকে নীল নদের নৌকাগুলি মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মত পাল তুলে চলাচল শুরু করে। এক সময় দুইটি রাজ্য সৃষ্টি হয়। নীল নদের ব-দ্বীপ অঞ্চলে অবস্থিত রাজ্যটি ছিল নিম্ন মিশর। আর নীল নদের অববাহিকাতে অবস্থিত অঞ্চলটি ছিল ঊর্ধ্ব মিশর। ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে প্রাথমিক চিত্রলিপি বা হায়ারোগ্লিফ ব্যবহৃত হওয়া শুরু করে। ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে ঊর্ধ্ব মিশরের শাসনকর্তা রাজা মেনেস দুই মিশরকে একত্রিত করেন এবং মেমফিস শহরে তার রাজধানী স্থাপন করেন। তিনিই প্রাচীন মিশরের প্রথম রাজবংশটির গোড়াপত্তন করেন। আনু. ৩১০০ থেকে ২৬৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত “অতিপ্রাচীন” পর্বে দুইটি রাজবংশ প্রাচীন মিশরকে শাসন করে। আনু. ২৬৮৬ থেকে ২১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত “প্রাচীন” পর্বে ৩য় থেকে ৬ষ্ঠ রাজবংশগুলি মিশর শাসন করে; এসময় প্রথম পিরামিডগুলি নির্মাণ করা হয়। আনু. ২৫৮৯ থেকে ২৫৬৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ছিল ৪র্থ রাজবংশের রাজা খুফুর শাসনামল। তার আমলেই আনু. ২৫৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গিজাতে স্ফিংক্স এবং বিশাল পিরামিডটির (খুফুর সমাধি হিসেবে) নির্মাণকাজ শেষ হয় (এর আগে ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পিরামিডের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল)।

পিরামিডগুলি কীভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল, তা সঠিক করে কেউ জানে না। ধারণা করা হয় পাথরের বিশাল বিশাল খন্ড, যেগুলি একেকটি হয়ত ১ টনের মত ওজন ছিল, সেগুলিকে শ্রমিকদের দল কাঠের স্লেজগাড়িতে করে নির্মাণস্থলে টেনে নিয়ে আসত। তারপরে এগুলিকে কাদামাটি ও ইটের তৈরি সর্পিলাকৃতির ঘুরন্ত ঢাল বেয়ে উপরে ওঠানো হত। এভাবে স্তরে স্তরে পিরামিডটি তৈরি করা হত। শেষপর্যন্ত পিরামিডের উপরে শীর্ষ পাথরখন্ডটি বসিয়ে সমগ্র কাঠামোটিকে সাদা চুনাপাথরের তৈরি খন্ড দিয়ে ঢেকে দেওয়া হত। এর পরে নির্মাণকাযে সহায়তাকারী ঢালগুলি ভেঙে সরিয়ে ফেলা হত।

নীল নদ ছিল মিশরের প্রাণ। নদটি না থাকলে প্রাচীন মিশর একটি বন্ধ্যা মরুভূমিতে পরিণত হত। নীল নদ প্রাচীন মিশরীয়দের জন্য কেবল সুপেয় পানির উৎসই ছিল না, কৃষিকাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেচের পানির যোগানদাতাও ছিল। গ্রিক ইতিহাসবিদ প্রাচীন মিশরকে “নীলনদের উপহার” নামে বর্ণনা করেন। প্রতি বছর নীল নদে বন্যা হত এবং বন্যার পানিতে দুই তীর প্লাবিত হত। কৃষকদের কাছে বছর তিন ভাগে বা মৌসুমে বিভক্ত ছিল। প্রথমটি ছিল বন্যা মৌসুম, যার স্থায়ীত্ব ছিল জুলাই থেকে নভেম্বর এই পাঁচ মাস; এসময় নীল নদে বন্যা হত। বন্যার সাথে বয়ে আসা উর্বর পলিমাটি নীল নদের দুই তীরে জমা হত। এই উর্বর ভূমিতে কৃষকেরা গম এবং যবের চাষ করত, যা দিয়ে তারা রুটি ও মদ বানাত। এছাড়াও তারা শণের তৈরি কাপড় বানানোর জন্য শণগাছের চাষ করত। ডিসেম্বর থেকে মার্চ ছিল চাষাবাদের মৌসুম আর মার্চ থেকে জুলাই ছিল ফসল ওঠানোর মৌসুম। এছাড়া তার ফলমূল শাকসব্জির চাষাবাদ ও গরু-ছাগল-ভেড়া পালন করত। যখন বন্যার কারণে কৃষিকাজ ও খামারের কাজ করা সম্ভবপর হত না, তখন কৃষকদের রাজকীয় নির্মাণকাজে অংশ নিতে পাঠানো হত।

মিশরের প্রধান পরিবহন মাধ্যম ছিল নৌকা। মাছ ধরা, শিকার, মালামাল ও যাত্রী পরিবহন ইত্যাদির কাজে নৌকা ব্যবহার করা হত। যখন রাজারা মারা যেতেন, তাদের মরদেহ বড় নৌকাতে করে সমাধিতে নিয়ে যাওয়া হত। আনু. ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে মিশরীয় অভিযাত্রী হারকুফ নীল নদ ধরে পালতোলা নৌকা করে দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হন।

প্রাচীন মিশরের রাজারা ছিলেন দেশটির সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। রাজাকে দেবতা হোরুস হিসেবে উপাসনা করা হত। ১৫৫৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে রাজাকে “ফারাও” উপাধি প্রদান করা হয়। ফারাও শব্দটি মিশরীয় শব্দগুচ্ছ “পের আ” থেকে এসেছে যার অর্থ “মহান বাসস্থান”। রাজাকে সহায়তা করার জন্য দুইজন প্রধান মন্ত্রী ছিল, যাদের কাজ ছিল দেশ শাসন করা ও কর আদায় করা। এছাড়াও রাজকোষ, রাজকীয় নির্মাণকাজ (পিরামিড ও সমাধি নির্মাণ), শস্যাগার, গবাদিপশুপালন ও বৈদেশিক সম্পর্ক সংক্রান্ত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ছিল। মিশরের জনজীবনের সমস্ত দিক ফারাওয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল।

আনু. ২২৪৬ থেকে ২১৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ছিল ৬ষ্ঠ রাজবংশের ২য় পেপির শাসনামল; তিনিই সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে মিশর শাসন করেন। আনু. ২১৫০ থেকে ২০৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত “অন্তর্বর্তীকালীন” পর্বে ৭ম থেকে ১০ম রাজবংশগুলি মিশর শাসন করে। আনু. ২০৪০ থেকে ১৬৪০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত যুগকে বলা হয় “মধ্যবর্তী রাজ্য”। এসময় ১১শ থেকে ১৩শ রাজবংশগুলি শাসন করে; রাজা ২য় মেনতুহোতেপ মিশরকে একতাবদ্ধ করেন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেন। আনু. ১৬৪০ থেকে ১৫৫২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত পর্বটি ছিল “দ্বিতীয় অন্তর্বর্তীকালীন” পর্ব; ১৪শ থেকে ১৭শ রাজবংশগুলি এসময় মিশর শাসন করে। এ পর্বের শেষে এশিয়া থেকে আগত হিকসোস জাতির লোকেরা মিশর আক্রমণ করে।

আনু. ১৫৫২ থেকে ১০৮৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ছিল “নতুন রাজ্য”; ১৮শ থেকে ২০শ রাজবংশগুলি এসময় শাসন করে। আনু. ১৪৭৯ থেকে ১৪২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত রাজা ৩য় তুথমোসিস মিশর শাসন করেন। তার আমলে মিশরীয় সাম্রাজ্য শৌর্যের শিখরে পৌঁছায়। আনু. ১৩৬৪ থেকে ১৩৪৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত রাজা আখেনাতেন মিশর শাসন করেন। তার প্রধান স্ত্রী ছিলেন রাণী নেফারতিতি। আখেনাতের ও নেফারতিতির ছয়টি কন্যাসন্তান ছিল। এদের মধ্যে একজন কন্যা রাজা তুতানখামুনকে বিয়ে করেন। তুতানখামুন আনু ১৩৪৭ থেকে ১৩৩৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত মিশরের শাসক ছিলেন। আনু ১২৮৯ থেকে ১২২৪ খ্রিপূর্বাব্দ পর্যন্ত রাজা ২য় রামসেস ছিলেন সাম্রাজ্যটির শাসনকর্তা।

আনু ১০৮৫ থেকে ৬৬৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ছিল তৃতীয় অন্তর্বর্তীকালীন পর্ব। এসময় ২১তম থেকে ২৫তম রাজবংশগুলি মিশর পরিচালনা করে। আনু ৬৬৪ থেকে ৩৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দ ছিল প্রাচীন মিশরের ইতিহাসের শেষ পর্ব; ২৬তম থেকে ৩০তম রাজবংশগুলি এসময় মিশর শাসন করেন। এর মধ্যে আনু ৫২৫ থেকে ৪০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত পারস্য থেকে আগত পারসিকেরা ২৭তম রাজবংশ হিসেবে মিশর শাসন করেছিল।

আনু খ্রিস্টপূর্ব ৩৩২ সালে গ্রিক বংশোদ্ভূত মহান আলেকজান্ডার মিশরের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেন। আনু ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি আলেকজান্দ্রিয়া শহর পত্তন করেন। আনু ৩২৩ থেকে ৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত টলেমি রাজবংশগুলি মিশর শাসন করেন। রাণী ক্লিওপেট্রা খ্রিস্টপূর্বাব্দে আত্মহত্যা করলে মিশরের শেষ রাজবংশের পতন ঘটে এবং মিশর রোমান সাম্রাজ্যের একটি প্রদেশে পরিণত হয়।

হিব্রু জাতি[সম্পাদনা]

আসিরীয় ও হিত্তীয় জাতি[সম্পাদনা]

জুদা ও আসিরীয়দের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

মহাপ্রস্তরযুগীয় ইউরোপ[সম্পাদনা]

ক্রেতে দ্বীপে মিনোয়ান সভ্যতা[সম্পাদনা]

মাইসেনীয় গ্রিস[সম্পাদনা]

সিন্ধু অববাহিকার সভ্যতা[সম্পাদনা]

খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দের দিকে ভারতীয় উপমহাদেশের সিন্ধু নদের অববাহিকায় (বর্তমান পাকিস্তান) এক বিশাল সভ্যতা গড়ে ওঠে। ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ এটি সমৃদ্ধির শীর্ষে পৌঁছে।

সিন্ধু অববাহিকার সভ্যতাটি সুমের বা মিশরীয় সভ্যতার চেয়ে আকারে বড় ছিল। এখানে লোকেরা কৃষিকাজ, খামার ও পশুপালনে রত ছিল। এতে দুইটি বৃহৎ নগরী ছিল যাদের নাম ছিল হরপ্পামহেঞ্জোদারো। প্রতিটি নগরে ৪০ হাজারের মত লোক বাস করত। মহেঞ্জোদারোর সড়কগুলি চতর্ভুজাকৃতি ছকের মত সাজানো ছিল এবং প্রতিটি বাসাবাড়ি থেকে নালার মাধ্যমে পয়ঃনিষ্কাশনের সুন্দর ব্যবস্থা ছিল। পাহাড় বা টিলার উপরে নগরভবন ছিল এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের জন্য বিশাল স্নানাগার ছিল।

সিন্ধু সভ্যতাতে ব্যবসার জন্য একটি অত্যন্ত পরিকল্পিত ব্যবস্থা ছিল। নদীর উর্বর অববাহিকায় উৎপাদিত শস্য ও অন্যান্য কৃষিজাত দ্রব্য দিয়ে বণিকেরা বাণিজ্য চালাত। এছাড়া হস্তশিল্পে নির্মিত বস্তু, গয়না, দামী পাথর এবং বস্ত্রের ব্যবসা চলত। মেসোপটেমিয়ার সাথেও এই সভ্যতার আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ছিল। কিন্তু ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে এই শক্তিশালী সভ্যতাটির ধীরে ধীরে অবক্ষয় হতে থাকে। ধারণা করা হয় হয়ত ব্যাপক বন্যায় শস্যের ক্ষতি হয়েছিল। কিংবা সিন্ধু নদের গতিপথ পরিবর্তন হয়ে গিয়েছিল বলে পূর্বের উর্বর জমিগুলি শুকিয়ে অনাবাদী হয়ে পড়ে। আরেকটি তত্ত্ব অনুসারে অতিরিক্ত পশুচারণের ফলে জমি শুষ্ক হয়ে পড়ে এবং এগুলিতে আর ফসল ফলানো সম্ভব ছিল না।

১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে পশ্চিম এশিয়া থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় জাতির লোকেরা, যারা আর্য নামে বেশি পরিচিত, সিন্ধু অঞ্চলটিতে আগমন করে। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের সিন্ধু সভ্যতার নগরগুলিতে প্রচলিত ধর্মগুলির মিশ্রণ ঘটে এবং এটি হিন্দুধর্মের ভিত্তি গড়ে দেয়।

প্রাচীন চীন[সম্পাদনা]

চীনের সবচেয়ে প্রাচীন সভ্যতাগুলি ছাং চিয়াং, শি চিয়াং এবং হুয়াং হো নামের তিনটি নদীর অববাহিকাতে গড়ে উঠেছিল। কৃষকেরা নদীর পানি ব্যবহার করে জমিতে সেচ দিত। কিন্তু অনেক সময় বন্যারও শিকার হত। ২২০৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে ধারাবাহিকভাবে অনেকগুলি রাজবংশ চীন শাসন করেন। এর মধ্যে প্রথম যে রাজবংশটি সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা ভাল তথ্যপ্রমাণ যোগাড় করতে পেরেছেন, সেটি হল শাং রাজবংশ। এই রাজবংশটি ১৭৬৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শুরু হয় এবং তারা প্রায় সাতশত বছরেরও বেশি সময় ধরে চীন শাসন করে।

শাং রাজবংশের সময় প্রাচীন চীনা অক্ষরগুলির উদ্ভব ঘটে। এগুলি দেববৈদ্যদের অস্থির (ষাঁড়ের স্কন্ধাস্থি বা কচ্ছপের খোলের সমতল অংশ) উপরে লেখা হত। এগুলি প্রথমদিকে প্রকৃতির বিভিন্ন ঘটনা বা বস্তুর প্রতীকী চিত্ররূপ ছিল। তবে ধীরে ধীরে এগুলি আরও বিমূর্ত রূপ ধারণ করে। ১০২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চৌ রাজবংশ ক্ষমতায় আসে। চৌ রাজারা ২৫৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত শাসন করেন। এসময় চৌ রাজ্যগঠনকারী প্রতিদ্বন্দ্বী উপরাজ্যগুলি নিজেদের মধ্যে অনেকগুলি যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। কিন্তু এই সময়েই চীনের অর্থনীতিতে অনেক প্রবৃদ্ধি ঘটে। চীনের রেশম কাপড়, জেড পাথর ও সুক্ষ্ম চিনামাটির তৈজসপত্র বিদেশে রপ্তানি হত।

৫৫১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চীনের মহান শিক্ষক ও দার্শনিক কনফুসিয়াসের জন্ম হয়। যুদ্ধবিগ্রহের মধ্যে জন্ম হলেও তিনি কীভাবে শান্তিতে বসবাস করতে হয়, সে ব্যাপারে সারাজীবন জনসাধারণকে শিক্ষা দিয়ে যান। তাঁর রেখে যাওয়া পাঠগুলি বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ পর্যন্তও চীনের সরকারী চাকুরির প্রবেশিকা পরীক্ষার পাঠ্যসূচীর ভিত্তি ছিল।

৪৮১ থেকে ২২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত চীনের ছোট রাজ্যগুলি একে অপরের সাথে প্রায় ২৫০ বছর ধরে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিল। ধীরে ধীরে উত্তর-পশ্চিম থেকে ছিন নামের একটি যুদ্ধবাজ রাজবংশ আগমন করে এবং সমস্ত চীনদেশকে একতাবদ্ধ করে একটি বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত করে। এই ছিন রাজবংশের নামেই বর্তমানে দেশটির নাম হয়েছে চীন। একীকৃত চীনের প্রথম সম্রাট ছিলেন শি হুয়াংতি। তিনি চীনের সরকারব্যবস্থার গঠন পরিবর্তন করেন এবং মুদ্রা, ওজন ও অন্যান্য পরিমাপের এককগুলিকে আদর্শ মানে আনয়ন করেন। তাঁর আমলের আগে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের মুদ্রাগুলি ছিল তামার তৈরি এবং বিভিন্ন সরঞ্জামের মত আকৃতিবিশিষ্ট। শি হুয়াংতির নির্দেশে সমস্ত মুদ্রাকে বৃত্তাকৃতি দান করা হয় এবং তাদের প্রতিটির মাঝখানে একটি ছিদ্র রাখা হয় যাতে সুতার মাধ্যমে এগুলিকে একত্রে বহন করা সম্ভব হয়। দেশের বিভিন্ন অংশের সাথে সংযোগস্থাপনকারী সড়ক ও খালব্যবস্থা নির্মাণ করা হয়।

চীনের উত্তরের শত্রুভাবাপন্ন হুন জাতির লোকদের আক্রমণ প্রতিরোধের লক্ষ্যে উত্তর সীমান্ত জুড়ে চীনের মহাপ্রাচীর নির্মাণ করা হয়। ২১৪ থেকে ২০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ১০ বছর ধরে প্রাচীরটি নির্মাণ করা হয়। প্রাচীরটি প্রায় ২২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৯ মিটার উচ্চতাবিশিষ্ট ছিল। এটি এতটাই প্রশস্ত ছিল যে ঘোড়ায় টানা রথ এর উপর দিয়ে চলতে পারত। হাজার হাজার কৃষক ও শাস্তিপ্রাপ্ত অপরাধী প্রাচীরটির নির্মাণকাজে অংশ নেয়। তারা কপিকল ও বাঁশের কাঠামো ব্যবহার করে চারপাশের অঞ্চল থেকে মাটি উত্তোলন করে সেটিকে চাপ দিয়ে শক্ত কাদামাটির খণ্ড বানাতো এবং এভাবে প্রাচীরের উচ্চতা বৃদ্ধি করত। সবশেষে শক্ত কাদামাটির উপরে কাঁকরের স্তর বিছিয়ে দেওয়া হত। সৈনিকেরা শ্রমিকদের উপর নজরদারি করত। কাজে কোন গাফিলতি বা মানের অবনতি ঘটলে সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকদেরকে মেরে ফেলা হত। প্রাচীরের উপরে খানিক পর পর পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র বসানো থাকত যাতে সৈন্যরা শত্রুদের থেকে সুরক্ষিত থাকে।

শি হুয়াংতি ছিলেন একজন প্রখর বুদ্ধিসম্পন্ন রাজনীতিবিদ ও সমরনেতা। কিন্তু তিনি নির্মমও ছিলেন। তার ধ্যানধারণার সাথে পণ্ডিত বা বিশেষজ্ঞদের অমত হলে তিনি তাদেরকে হত্যা করে ফেলতেন। ২১২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি ভিন্ন মতাবলম্বী সমস্ত বই পুড়িয়ে ফেলেন। ২১০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শি হুয়াংতির মৃত্যু ঘটে এবং তার মাত্র ৪ বছর পরে ২০৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ছিন রাজবংশের পতন ঘটে। এরপর হান রাজবংশ ৯ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত চীন শাসন করেছিল।

ভূগর্ভে শিং হুয়াংতির একটি বিশালাকার সমাধি আবিষ্কৃত হয়েছে। তাঁকে পরজগতের জন্য সমস্ত উপকরণসহ সমাধিস্থ করা হয়েছিল। এর মধ্যে সবচেয়ে চমকপ্রদ হল পোড়া কাদামাটি দিয়ে নির্মিত বাস্তব আকারের ১০ হাজার চীনা সৈন্যের একটি বাহিনী।

প্রাচীন আমেরিকা মহাদেশ[সম্পাদনা]

পেরুর চাবিন সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

মেক্সিকোর ওলমেক সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

তেওতিহুয়াকান[সম্পাদনা]

জাপোতেক[সম্পাদনা]

ধ্রুপদী মায়া সভ্যতা[সম্পাদনা]

দক্ষিণ আমেরিকার নাজকা ও মোচে সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

প্রাচীন গ্রিসের সভ্যতা, সংস্কৃতি, রাজনীতি ও দর্শন[সম্পাদনা]

পেলোপন্নেসীয় যুদ্ধসমূহ[সম্পাদনা]

পারস্য সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

গ্রিস ও পারস্যের যুদ্ধসমূহ[সম্পাদনা]

আলেকজান্ডার ও পারস্য[সম্পাদনা]

পারসিক যুদ্ধগুলির পরে যে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, সেখান থেকে ম্যাসিডোনিয়া গ্রিসের কর্তৃত্বময় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। আলেকজান্ডার ছিলেন এই রাজ্যের তরুণ রাজা। তিনি গ্রিক সেনাবাহিনীকে নেতৃত্ব দিয়ে আবার পারস্য আক্রমণ করেন এবং পারস্যসহ বিপুল আয়তনের ভূখন্ড জয় করেন। পারসিকরা বর্তমান ইরান অঞ্চলটিতে বাস করত। তাদের সাম্রাজ্য পূর্বে ভারতের প্রান্তসীমা থেকে পশ্চিমে বর্তমান তুরস্ক অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। পারস্যের মহান সব রাজা, যেমন মহান কুরুশ, বিশাল ও দক্ষ সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। ৫৪৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে মহান কুরুশ লিডিয়া দখল করেন। ৫৩৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারসিকরা ব্যাবিলন তাদের নিয়ন্ত্রণে আনে। ৫২৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্যের রাজা কাম্বুজিয়া মিশর জয় করেন। ৫২১ থেকে ৪৮৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পর্যন্ত ১ম দরিয়ুশ পারস্যের রাজা ছিলেন। তাঁকে “রাজাদের রাজা” বলা হত। তিনি সাম্রাজ্যের ভেতর দিয়ে বার্তা দ্রুত পাঠানোর জন্য সুন্দর সড়কব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন। তিনি তারা সাম্রাজ্যকে সাত্রাপি নামক অনেকগুলি প্রদেশে বিভক্ত করেছিলেন। তিনি পর্সা বা পার্সেপোলিস নামের অসাধারণ সুন্দর রাজধানী শহর নির্মাণ করেন, যা বর্তমান যুগের ইরানের শিরাজ শহরের কাছে অবস্থিত। ৪৯৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকে পারস্যের সাথে গ্রিকদের চরম শত্রুতা শুরু হয়। প্রথমে রাজা দরিয়ুশ এবং পরবর্তীতে রাজা ক্ষিয়র্শা গ্রিস দখলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। ৪৮০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পারস্য তার বিশাল নৌবহর নিয়ে গ্রিস আক্রমণ করলেও সালামিসের যুদ্ধে তারা পরাজিত হয়।

এরপরে শক্তির ভারসাম্য গ্রিসের দিকে হেলে পড়ে। ৩৩৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ম্যাসিডোনিয়ার যুদ্ধবাজ রাজা ২য় ফিলিপ কায়েরোনেয়ার যুদ্ধে বিজয়ী হলে সমগ্র গ্রিস তাঁর নিয়ন্ত্রণে আসে। ৩৩৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ফিলিপকে হত্যা করা হলে তাঁর পুত্র আলেকজান্ডার মাত্র ২০ বছর বয়সে (জন্ম ৩৫৬ খ্রিপূ.) ক্ষমতায় আরোহণ করেন। কিন্তু এর পর মাত্র ১৩ বছরের মধ্যে আলেকজান্ডার প্রাচীন বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্যটি দখল করতে সক্ষম হন। একই সাথে তিনি বহু দূরে গ্রিক ও পারসিক সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেন। ৩৩৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার তার সেনাবাহিনী নিয়ে পারস্য আক্রমণ করেন। তিনি শুধু পারসিকদের রাজ্য দখলই করতে চাননি, গ্রিক রাজকোষের অভাবও মোচন করতে চেয়েছিলেন। ৩৩৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দে তিনি পারস্যের রাজা ৩য় দারিউসের বিশাল সেনাবাহিনীকে ইস্‌সুসের যুদ্ধে পরাজিত করেন। ৩৩২ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার মিশর দখল করেন। ৩৩১ খ্রিস্টপূর্বাব্দ নাগাদ গাউগামেলার যুদ্ধে পারসিকদের শেষবারের মত পরাজিত করে সমগ্র পারস্য সাম্রাজ্য অধিকারে নিয়ে এর রাজায় পরিণত হন। পারসিকদের তীরন্দাজ ও ঘোড়সওয়ারী যোদ্ধারা খুবই দক্ষ হলেও আলেকজান্ডারের রণকৌশলের কারণে তারা পরাজিত হয়। আলেকজান্ডার পারস্যের রাজধানী পার্সেপোলিস দখল করার পর এর অসাধারণ রাজপ্রাসাদটি ধূলায় মিশিয়ে দেন। তবে ক্ষমতায় আসার পর তিনি গ্রিক ও পারসিক জাতিদের মধ্যে বন্ধন সুদৃঢ় করতে তাঁর সরকার ও মন্ত্রীসভায় পারসিকদের জায়গা দেন। তিনি পারসিক পোশাক পরিধান শুরু করেন এবং রোখসানা নামের একজন পারসিক রাজকন্যাকে বিয়ে করেন। এর পর তিনি ভারত দখলের উদ্দেশ্যে পূর্ব দিকে রওনা দেন এবং ৩২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ভারতে পৌঁছান। সেখানে ভারতের রাজা পুরুর সাথে হিসাসপেস নদীর তীরের যুদ্ধে পুরুকে পরাজিত করেন। এটিই ছিল তার শেষ সমরাভিযান। তার ক্লান্ত সেনাবাহিনী সামনে অগ্রসর হতে অস্বীকৃতি জানায় এবং আলেকজান্ডার ৩২৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনে ফেরত যেতে বাধ্য হন। সেখানে তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ৩২ বছর বয়সেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পরে শীর্ষস্থানীয় সামরিক নেতাদের মধ্যে তাঁর সাম্রাজ্যটি ভাগ-বাটোয়ারা করে দেওয়া হয়।

প্রাচীন রোমের সভ্যতা[সম্পাদনা]

হানিবালের রোম আক্রমণ এবং পিউনিক যুদ্ধসমূহ[সম্পাদনা]

রোমানদের ব্রিটেন দ্বীপ বিজয়[সম্পাদনা]

কেল্টীয় জাতি[সম্পাদনা]

আলেসিয়াতে ভের্সাঁজেতরিক্সের পরাজয়[সম্পাদনা]

জার্মানীয় জাতিসমূহ[সম্পাদনা]

পূর্ব ইউরোপীয় তৃণভূমির জাতিসমূহ - স্কাইদীয়, হুন ও কুশান[সম্পাদনা]

রেশম পথ[সম্পাদনা]

প্রাচীন আফ্রিকান সংস্কৃতি[সম্পাদনা]

প্রাচীন ভারত[সম্পাদনা]

চন্দ্রগুপ্ত ও মৌর্য সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

সম্রাট অশোক এবং বৌদ্ধধর্মের প্রসার[সম্পাদনা]

গুপ্ত সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

হিন্দুধর্ম[সম্পাদনা]

চীন তিন রাজ্যে বিভক্ত[সম্পাদনা]

ছিন সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

হান চীন[সম্পাদনা]

রোমান সাম্রাজ্যের পতন[সম্পাদনা]

খ্রিস্টধর্মের প্রসার[সম্পাদনা]

ফ্রাংক জাতি এবং ক্লোভিসের অধীনে গলের একত্রীকরণ[সম্পাদনা]

বান্টু সভ্যতা[সম্পাদনা]

মধ্যযুগ বা ধ্রুপদী-উত্তর যুগ[সম্পাদনা]

বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

প্রায় ৫০০ বছর ধরে রোমান সাম্রাজ্য ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার এক বিশাল এলাকা জুড়ে এক অনন্য জীবনধারার প্রবর্তন করেছিল। কিন্তু ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে সাম্রাজ্যটির পশ্চিম অর্ধাংশে ধ্বস নামে। হানাদার জার্মান গোত্রগুলি সাম্রাজ্যের এই অংশে ছড়িয়ে পড়ে ও দখল করতে শুরু করে। কিন্তু পূর্ব অর্ধাংশে রোমান শাসন সুস্থসবলভাবে অব্যাহত থাকে। এই পূর্বাঞ্চলীয় রোমান সাম্রাজ্যটির আরেক নাম ছিল বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্য।

বাইজেন্টিয়াম ছিল গ্রিকদের প্রতিষ্ঠিত একটি প্রাচীন বন্দর শহর। এটিই বর্তমানে তুরস্কের ইস্তাম্বুল শহর হিসেবে পরিচিত। বাইজেন্টিয়াম ছিল বাইজেন্টীয় বা পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্রবিন্দু। এই সাম্রাজ্যের প্রথম সম্রাটের নাম ছিল মহান কোনস্তানতিন। তিনিই রোমের প্রথম খ্রিস্টধর্মাবলম্বী সম্রাট ছিলেন। তিনি ৩৩০ সালে রোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী রোম থেকে সরিয়ে বাইজেন্টিয়ামে নিয়ে আসেন। তাঁর নামে বাইজেন্টিয়ামের নাম বদলে কোনস্তানতিনোপল রাখা হয়। এটি বাইজেন্টীয় সম্রাটদের রাজধানী এবং পূর্বী খ্রিস্টান গির্জার কেন্দ্রে পরিণত হয়। বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্যে গ্রিক ও রোমান শিল্পকলা ও শিক্ষাপদ্ধতিকে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। বাইজেন্টীয় গির্জাগুলিতে (যেমন মাত্র ৬ বছরে নির্মিত ও ৫৩৭ খ্রিস্টাব্দে চালু হওয়া হাগিয়া সোফিয়া গির্জাটি) বহু শত রঙিন কাচ বা পাথরের টুকরো দিয়ে নির্মিত সুক্ষ্ম ফ্রেস্কো ও মোজাইক জাতীয় চিত্রকর্ম দেখতে পাওয়া যায়। ৪০৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট থেওডসিয়ুস কোনস্তানতিনোপলকে রক্ষার জন্য একটি মহাপ্রাচীন নির্মাণ শুরু করেন। ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে রোমকেন্দ্রিক পশ্চিমা রোমান সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ৫০১ খ্রিস্টাব্দে বাইজেন্টীয়দের সাথে পারস্যের ধারাবাহিকভাবে অনেকগুলি যুদ্ধের সূচনা ঘটে। ৫২৭ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট ১ম জুস্তিনিয়ান ক্ষমতায় আরোহণ করেন। তিনি ৫৬৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। জুস্তিনিয়ান ও তার সমরনেতা বেলিসারিয়ুসের অধীনে বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্য সমৃদ্ধির শিখরে পৌঁছে। এসময় ইতালি, গ্রিস, তুরস্ক এবং স্পেন, উত্তর আফ্রিকা ও মিশরের অংশবিশেষ এই সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। জুস্তিনিয়ানকে তাঁর ক্ষমতাশালী রাণী থেওদোরা শাসনকর্মে সহায়তা করেন। জুস্তিনিয়ান একটি আইন-সঙ্কলন প্রণয়ন করেন, যার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে বহু ইউরোপীয় দেশের আইনব্যবস্থা সৃষ্টি করা হয়।

কোনস্তানতিনোপল একটি ব্যস্ত বন্দর ছিল। এখানে সুদূর স্পেন, চীন ও রাশিয়া থেকে বণিকেরা এসে মিলিত হত। ৫৬৫ খ্রিস্টাব্দে জুস্তিনিয়ানের মৃত্যু ঘটলে বেশ কিছু যুদ্ধে অংশগ্রহণের পরে সাম্রাজ্যটি দুর্বল হয়ে পড়ে। ৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে আরবরা কোনস্তানতিনোপল শহরকে অবরোধ করে কিন্তু শেষে পরাজিত হয়। ১০ম শতকে এসে বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় স্বর্ণযুগ আরম্ভ হয়। বলকান উপদ্বীপ এবং রাশিয়া বাইজেন্টীয় প্রভাব বলয়ের অধীনে আসে। ১০৫৪ সালে কোনস্তানতিনোপলের গির্জা রোমের ক্যাথলিক গির্জা থেকে বিভক্ত হয়ে যায়। ১০৮১ সালে ১ম আলেক্সিয়ুস ক্ষমতায় আসেন এবং সরকারের সংস্কারসাধন করেন। কিন্তু পূর্বদিক থেকে আগত হানাদার গোত্ররা, বিশেষ করে আভার, স্লাভ ও বুলগার জাতির লোকেরা সাম্রাজ্যটির জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১২০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে তুর্কি ও বুলগারদের আক্রমণে সাম্রাজ্যটিতে ভাঙন ধরা শুরু করে। ১২০৪ সালে ক্রুসেড বা খ্রিস্টীয় ধর্মযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী যোদ্ধারা এসে কোনস্তানতিনোপল শহরটিতে লুটতরাজ করে। ১৩৪১ সালে সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে এবং ১৩৫৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই যুদ্ধ চলে। শেষ পর্যন্ত ১৪৫৩ সালে তুর্কিরা কোনস্তানতিনোপল পুরোপুরি দখল করলে অবশেষে হাজার বছরেরও বেশিদিন ধরে টিকে থাকা বাইজেন্টীয় সাম্রাজ্যটির পতন ঘটে।

শার্লমাইন এবং মধ্যযুগীয় খ্রিস্টান রাজ্যের গোড়াপত্তন[সম্পাদনা]

ভাইকিংদের অভিযান[সম্পাদনা]

মধ্যযুগীয় গির্জা ও পোপতন্ত্র[সম্পাদনা]

প্রজাদের অধিকার ও মাগনা কার্তা[সম্পাদনা]

থাং চীন[সম্পাদনা]

সুং চীন[সম্পাদনা]

মঙ্গোল সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

১৩শ শতকে মঙ্গোল যোদ্ধাদের বাহিনী এশিয়াইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। অমানবিক, অসুরীয় নির্মমতার সাথে শত্রুদের কচুকাটা করে তারা বিশ্বের ইতিহাসে বৃহত্তম স্থল সাম্রাজ্য গড়তে সক্ষম হয়।

মঙ্গোলরা আদিতে উরাল পর্বতমালা থেকে গোবি মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত মধ্য এশিয়ার সমভূমিগুলিতে বাস করত। তারা যাযাবরের মত পশুর পাল নিয়ে ঘুরে বেড়াত এবং ইউর্ত নামের অস্থায়ী পশমী তাঁবু খাটিয়ে বসবাস করত। তারা তাদের ভেড়া, ঘোড়া ও ছাগলের পালের জন্য নতুন নতুন তৃণভূমির সন্ধান করত। ষাঁড়ের গাড়িতে করে তাদের পশমী তাঁবুগুলি পরিবহন করত। ঘোড়াগুলি মঙ্গোলদের জীবনযাত্রার অপরিহার্য অংশ ছিল। তারা সবসময় মাদী ঘোড়ার সদ্যদোয়ানো দুধ পান করত। তারা কাঠের কাঠামো থেকে ঝোলানো চামড়ার থলেতে ঘোড়ার দুধ গাঁজিয়ে কুমিস নামের একটি ঝাঁজালো পানীয় বানাত। যুদ্ধবিজয়ের পরে উৎসবে সবাই কুমিস পান করত এবং ঘোড়ার লোম থেকে বানানো তারের বীণা বাজাত।

মঙ্গোলদের নেতাদেরকে "খান" নামে ডাকা হত। ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে তেমুজিন খান নামের মঙ্গোল নেতা সমস্ত মঙ্গোল গোত্রগুলি এক পতাকার নিচে নিয়ে আসেন। তাঁর নাম দেওয়া হয় চেঙ্গিস খান, অর্থাৎ “সবার প্রভু”। সারা জীবন ধরে অসংখ্য সমরাভিযানশেষে চেঙ্গিস খান শেষ পর্যন্ত পূর্বে প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল থেকে পশ্চিমে ইউরোপের দানিউব নদী পর্যন্ত এক সুবিশাল সাম্রাজ্য গঠন করেন, যার মধ্যে বিরাট পারস্য সাম্রাজ্যও ছিল এক অংশমাত্র। ১২১১ সালে চেঙ্গিস খান চীন আক্রমণ করেন এবং ১২১৫ সালের মধ্যে মঙ্গোলদের হাতে চীনের তৎকালীন রাজধানী বেইজিংয়ের পতন ঘটে। ১২১৭ সালে মঙ্গোলরা চীন ও কোরিয়া নিয়ন্ত্রণ করত। কারাকোরুম শহরে (বর্তমানে মঙ্গোলিয়াতে অবস্থিত) তাদের রাজধানী ছিল । ১২১৯ সালে মঙ্গোলরা পশ্চিমদিকে অগ্রসর হয়ে খোয়ারিজম সাম্রাজ্য (পারস্যতুরস্ক) আক্রমণ করে। ১২২৪ সালে তারা রাশিয়া, পোল্যান্ডহাঙ্গেরি আক্রমণ করে। চেঙ্গিস খান যুদ্ধক্ষেত্রে নির্মম হলেও তার সাম্রাজ্যে শান্তি বজায় রাখেন এবং শক্ত হাতে কিন্তু ন্যায়বিচারের সাথে শাসন করেন। তার সময়ে বাণিজ্যের বিকাশ ঘটে।

১২২৭ সালে চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পরেও মঙ্গোলরা আক্রমণ অব্যাহত রাখে। ১২২৯ সালে চেঙ্গিস খানের এক পুত্রসন্তান ওগাদাই খান মঙ্গোলদের নেতা হন। চেঙ্গিস খানের আরেক সন্তান বাতু খান এবং সুবোতাই খানের নেতৃত্বে ১২৩৭ সালে মঙ্গোল বাহিনী উত্তর রাশিয়া দখলের জন্য আক্রমণ করে। তাদের সেনাবাহিনীর নাম ছিল “স্বর্ণালী দঙ্গল”। ইউরোপে মঙ্গোলদের দ্রুতি ও হিংস্রতার কথা ছড়িয়ে পড়লে সেখানকার জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। প্রতিটি মঙ্গোল সেনা পাঁচটি ঘোড়া নিয়ে চলাচল করত এবং প্রত্যেকে তীরন্দাজি ও বর্শা নিক্ষেপে অত্যন্ত দক্ষ ছিল। ঘোড়সওয়ারী হয়ে তারা কেবল পা দিয়ে ঘোড়াদের নিয়ন্ত্রণ করত, এবং খালি দুই হাত তীর ছোঁড়া বা বর্শা নিক্ষেপের কাজে লাগাত। যুদ্ধের সময় তারা ছিল ক্ষমাহীন, নিষ্ঠুর যোদ্ধা। তারা গোটা শহরের সবাইকে সদলবলে হত্যা করে তাদের সম্পদ লুন্ঠন করে অন্য শহর আক্রমণ করতে যেত। ১২৪১ সালে মঙ্গোলদের নেতা ওগাদাই খানের মৃত্যুর সংবাদ পশ্চিমে এসে পৌঁছালে ইউরোপে অগ্রসরমান মঙ্গোলবাহিনী আবার এশিয়াতে ফেরত যায়, ফলে ইউরোপ পরিত্রাণ পায়।

চীনে মঙ্গোল শাসন এবং মিং চীন[সম্পাদনা]

আসুকা, নারা ও হেইয়ান যুগের জাপান[সম্পাদনা]

শোগুন জাপান[সম্পাদনা]

কোরিয়ার একীভবন ও চোসোন রাজ্য[সম্পাদনা]

মধ্যযুগীয় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াতে খমের, পাগান ও শ্রীবিজয় রাজ্যসমূহ[সম্পাদনা]

জাপানে মঙ্গোলদের প্রতিহতকরণ[সম্পাদনা]

মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামের উত্থান[সম্পাদনা]

৭ম শতকে আরব উপদ্বীপে নবী হযরত মুহাম্মদের প্রচারিত নতুন ধর্ম ইসলাম বিশ্বের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। মুহাম্মদের অনুসারীরা ধর্মীয় প্রচারণা এবং রাজ্যদখলের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেন। ৮ম শতকে এসে মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার অধিকাংশ এলাকাতে মুসলমানরা শাসন করত।

হযরত মুহাম্মদ আনুমানিক ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে আরব উপদ্বীপের মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন। মুহাম্মদের আগে আরব গোত্র বা জাতিগুলি ঐক্যবদ্ধ ছিল না। তারা ভিন্ন ভিন্ন দেবদেবী বা শ্বরের উপাসনা করত। মুহাম্মদ ছিলেন মক্কায় বসবাসকারী একজন ব্যবসায়ী। ৬১০ খ্রিস্টাব্দে ৪০ বছর বয়সে এসে তিনি স্বপ্নে ফেরেশতা জিব্রাইলের সাক্ষাৎ লাভ করেন এবং অবহিত হন যে তাঁকে আল্লাহ বা ঈশ্বরের নবী তথা বার্তাবাহকের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকে তিনি এক আল্লাহ বা ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস আনার ব্যাপারে ধর্মীয় প্রচারণা চালানো শুরু করেন। এই নতুন ধর্মের নাম দেওয়া হয় ইসলাম, যার ভাবানুবাদ দাঁড়ায় “(আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি) আনুগত্য”।

কিন্তু মক্কার অধিবাসীরা হযরত মুহাম্মদের প্রচারণা ও শিক্ষাদীক্ষাতে নারাজ হলে তিনি ৬২২ খ্রিস্টাব্দে মক্কা পরিত্যাগ করেন এবং দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে তৎকালীন ইয়াথরিব বা বর্তমান মদিনা শহরে আগমন করেন। তার এই মদিনামুখী যাত্রা আজও হিজরত নামে সুবিদিত এবং এই ঘটনাটিকে ইসলামী বর্ষপঞ্জিকার ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়। মদিনাতে মুহাম্মদ ও তার অনুসারীরা ইসলামের ইতিহাসের প্রথম মসজিদটি নির্মাণ করেন। মুহাম্মদ আল্লাহর কাছ থেকে দৈববাণীগুলি লাভ করতে থাকেন, তার অনুসারীরা এগুলিকে লিপিবদ্ধ করতে থাকে এবং এগুলিকে তাঁর মৃত্যুর পরে আল-কুরআন নামক ধর্মগ্রন্থে সংকলন করা হয়। ৬৩০ খ্রিস্টাব্দেই মুহাম্মদ ও তার অনুসারীরা মক্কা বিজয় করেন এবং ইসলাম গোটা আরব অঞ্চলের নতুন প্রধান ধর্মে পরিণত হয়। ৬৩২ খ্রিস্টাব্দে মুহাম্মদের মৃত্যু ঘটলে তাঁর নিকট অনুসারী ও শ্বশুর আবু বকরকে প্রথম খলিফা তথা ইসলামী বিশ্বের প্রধান নেতার মর্যাদা দেওয়া হয়। আরেক অনুসারীর দল মনে করত কেবল মুহাম্মদের বংশধর তথা তাঁর কন্যা ফাতিমার বংশধররাই ইসলামের নেতৃত্বদানের যোগ্য প্রার্থী। এদেরকে শিয়া মতাবলম্বী বলা হয়। অন্যদিকে সুন্নি মতাবলম্বীরা মনে করে যে যেকোন মুসলমান এই কাজ করতে পারে। শিয়া-সুন্নিদের মধ্যে এই মতবিভেদ আজও বিদ্যমান।

৬৩৪ খ্রিস্টাব্দে আবু বকরের পরে উমর খলিফা হন। ৬৪৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আরবরা সিরিয়া, ফিলিস্তিন এবং পারস্যের সিংহভাগ এলাকা দখল করে নিতে সক্ষম হয়। উমরের পরে ৬৪৪ সালে উমাইয়া-বংশীয় উসমান খলিফা হন। ৬৫৬ খ্রিস্টাব্দে শিয়াদের নেতা আলি খলিফা হন। ৬৬১ খ্রিস্টাব্দের পর থেকে এই ক্রমবর্ধমান ইসলামী সাম্রাজ্যটি উমাইয়া বংশের শাসকেরা সিরিয়ার দামেস্ক শহর থেকে পরিচালনা করা শুরু করে। মুসলমানদের বাহিনী ইউরোপেও অগ্রসর হয়। ৭৩২ খ্রিস্টাব্দে স্পেনের মুসলমান নেতা আবদ-আল-রহমানের নেতৃত্বে মুসলমানরা ফ্রান্স আক্রমণ করে। কিন্তু শার্ল মার্তেলের নেতৃত্বে ফ্রাংকদের সেনাবাহিনী তাদেরকে রুখে দিতে সক্ষম হয়। ৭৫০ খ্রিস্টাব্দে আবু আল-আব্বাস আব্বাসীয় রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। ৭৫৬ সালে উমাইয়া বংশের শেষ শাসনকর্তা দামেস্ক থেকে পালিয়ে স্পেনের কর্দোবায় চলে যান। ৭৬২ খ্রিস্টাব্দে নব্যগঠিত আব্বাসীয় রাজবংশ ইসলামী সাম্রাজ্যের রাজধানী দামেস্ক থেকে সরিয়ে বাগদাদ শহরে নিয়ে আসেন। বাগদাদ ইসলামী বিশ্বের সবচেয়ে সমৃদ্ধশালী এক রাজধানী নগরীতে পরিণত হয়। ৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে হারুন আল-রাশিদ বাগদাদের খলিফা হন এবং তাঁর আমলে আব্বাসীয়দের শাসন শৌর্যের শীর্ষে পৌঁছে।

বাগদাদের প্রতিষ্ঠা, ইসলামী সভ্যতা ও বিজ্ঞান[সম্পাদনা]

তুরে আরবদের ইউরোপ আক্রমণ প্রতিহত[সম্পাদনা]

সেলজুক তুর্কী জাতি[সম্পাদনা]

উসমানীয় তুর্কিদের উত্থান[সম্পাদনা]

ধ্রুপদী-উত্তর ভারত[সম্পাদনা]

সামন্তবাদী ইউরোপ[সম্পাদনা]

১৬শ শতকের পূর্বের আফ্রিকা[সম্পাদনা]

আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের প্রসার ও রেশম পথ[সম্পাদনা]

পবিত্র রোমান সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

খ্রিস্টধর্মের মহাবিভাজন[সম্পাদনা]

নরমানদের ইংল্যান্ড বিজয়[সম্পাদনা]

খ্রিস্টীয় ধর্মযুদ্ধ[সম্পাদনা]

ইউরোপে মহামারী ও দুর্ভিক্ষ[সম্পাদনা]

খ্রিস্টানদের স্পেন পুনর্বিজয়[সম্পাদনা]

একশ’ বছরের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধ[সম্পাদনা]

হুসীয় বিদ্রোহ[সম্পাদনা]

বারুদ ও আগ্নেয়াস্ত্র বিপ্লব[সম্পাদনা]

পশ্চিম আফ্রিকার সাম্রাজ্যসমূহ ও ইসলাম[সম্পাদনা]

মালি সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

ইফে ও বেনিন রাজ্য[সম্পাদনা]

বৃহত্তর জিম্বাবুয়ে[সম্পাদনা]

উত্তর আমেরিকাতে মিসিসিপি সংস্কৃতির প্রসার[সম্পাদনা]

মধ্য আমেরিকাতে তোলতেক ও আজতেক সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

দক্ষিণ আমেরিকার প্রাচীন সংস্কৃতি এবং ইনকা সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

ভারতে চোলা সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

দিল্লীর সুলতান রাজ্য[সম্পাদনা]

তৈমুর লংয়ের রাজ্য বিজয়[সম্পাদনা]

পলিনেশিয়ার বিস্তার ও নৌ-অভিযান[সম্পাদনা]

মাওরি জাতি[সম্পাদনা]

ইস্টার দ্বীপ[সম্পাদনা]

আধুনিক যুগ (প্রাথমিক পর্ব)[সম্পাদনা]

উসমানীয় ও সাফাভিদ সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

১৪৫৩ সালে উসমানীয়দের কোনস্তান্তিনোপোল দখল করে নেওয়ার মাধ্যমে তুর্কি স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। উসমানীয় তুর্কিরা পূর্ব ভূমধ্যসাগর এবং মধ্যপ্রাচ্য নিয়ন্ত্রণ করত। তাদের সেনাবাহিনী পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে ইউরোপীয়দের জন্য হুমকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এছাড়াও উসমানীয়রা পূর্বে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী পারস্যের মুসলমান রাজবংশ সাফাভিদদের বিরুদ্ধে অনেকবার যুদ্ধে লিপ্ত হয়। কোনস্তান্তিনোপোল দখলের পরে উসমানীয় তুর্কিরা এর নাম বদলে রাখে ইস্তাম্বুল। ইস্তাম্বুল উসমানীয় মুসলমান সাম্রাজ্যের কেন্দ্র ছিল। শৌর্যের শীর্ষে সাম্রাজ্যটি সমগ্র পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলটি ঘিরে ছিল। উসমানীয়রা তাদের বেশির ভাগ অঞ্চল বিজয় করে ১ম সুলায়মানের আমলে (১৫২০-১৫৬৬)। তুর্কিরা পারস্য (বর্তমান ইরান) রাজ্যে দখলের উদ্দেশ্যে আক্রমণ চালায়, বাগদাদ দখল করে, রোডস দ্বীপটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে এবং দানিউব নদী অতিক্রম করে হাঙ্গেরি পর্যন্ত চলে যেতে সক্ষম হয়, যেখানে তারা মোহাক-এর যুদ্ধে জয়ী হয়। ১৫২৯ সাল নাগাদ তুর্কিরা ভিয়েনা শহরের প্রাচীরের বাইরে অবস্থান নেয় এবং আপাতদৃষ্টিতে পশ্চিম ইউরোপ আক্রমণের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছায়। কিন্তু ভিয়েনার অবরোধ শেষ পর্যন্ত তুলে নেওয়া হয় এবং ইউরোপ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কিন্তু উসমানীয় যুদ্ধজাহাজগুলি ভূমধ্যসাগর নিয়ন্ত্রণ করা অব্যাহত রাখে। তুর্কি জলদস্যুরা (যেমন বিখ্যাত বারবারোসা বা খাইর-আদ-দিন-পাশা) বন্দরগুলিতে হামলা চালাতো, বাণিজ্যজাহাজ দখল করত এবং খ্রিস্টানদেরকে ক্রীতদাস হিসেবে ধরে নিয়ে যেত। ১৫৭১ সালে এসে উসমানীয়দের সমুদ্রশক্তি হ্রাস পায়। সে বছর একটি ইউরোপীয় নৌবহর লেপান্তোর যুদ্ধে গ্রিসের কোরিন্থ উপসাগরে তুর্কিদের পরাজিত করে।

রুশ সাম্রাজ্য[সম্পাদনা]

সম্রাট মহান পিওতর রাশিয়াকে একটি বিচ্ছিন্ন পশ্চাৎপদ জাতি থেকে একটি বৃহৎ ইউরোপীয় শক্তিতে রূপান্তরিত করেন। তাঁর মৃত্যুর প্রায় ৪০ বছর পরে আরেকজন মহান শাসক, মহান একাতেরিনা, পিওতরের উচ্চাভিলাষী প্রকল্প দীর্ঘায়িত করেন। ১৬৮২ সালে, মাত্র ১০ বছর বয়সে, ১ম পিওতর (পরবর্তীতে যাঁকে মহান পিওতর নাম দেওয়া হয়) রাশিয়ার জার বা সম্রাটে পরিণত হন। প্রথমে তিনি তাঁর সৎ ভাই ৫ম ইভানের সাথে একত্রে শাসনকাজ চালান। যখন ১৬৯৬ সালে ইভানের মৃত্যু হয়, পিওতর একাই ১৭২৫ সাল পর্যন্ত রাশিয়া শাসন করেন। ১৬৩৯ সাল থেকেই রাশিয়ার সীমানা বৃদ্ধি পেতে থাকে, কিন্তু তা সত্ত্বেও ইউরোপের বাকী দেশগুলির তুলনায় দেশটি ছিল অনেক পশ্চাৎপদ। পিওতর এ অবস্থা পরিবর্তনের ব্যাপারে দৃঢ়কল্প ছিলেন। তিনি ছিলেন দীর্ঘকায়, শক্তিশালী ও উদ্যমী এক মানুষ। তিনি ১৮ মাস ধরে সমগ্র ইউরোপ ভ্রমণ করেন, যেখানে তিনি রাজা, বিজ্ঞানী, এবং কৃষি, জাহাজ নির্মাণ ও শিল্পকারখানার সাথে জড়িত লোকজনের সাথে সাক্ষাৎ করেন। এমনকি নেদারল্যান্ডসের একটি জাহাজনির্মাণস্থলে তিনি কিছু সময়ের জন্য কর্মী ছিলেন। শেষ পর্যন্ত পিওতর যখন রাশিয়াতে ফেরত আসেন, তিনি তখন তাঁর নবলব্ধ জ্ঞান কাজে লাগাতে নেমে পড়েন। তিনি রাশিয়ার নৌবাহিনী গড়ে তোলেন এবং কৃষিখামার ও শিল্পকারখানা গড়তে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি রাশিয়ার সেনাবাহিনীর উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ সাধন করেন। বাণিজ্যের সুবিধার জন্য রাস্তা নির্মাণ ও খাল খনন করেন। ১৭০০ থেকে ১৭২১ সাল পর্যন্ত সুইডেনের সাথে মহান উত্তরীয় যুদ্ধ সম্পাদন করে পিওতর রাশিয়ার জন্য বাল্টিক সাগরে উপকূল জয় করেন। ফলে রাশিয়া এমন একটি সমুন্দ্রবন্দর লাভ করে যা শীতকালে বরফে জমে বন্ধ হয়ে যায় না। ১৭০৩ সালে বাল্টিক সাগরের উপকূলে তিনি সাংত পিতেরবুর্গ শহর প্রতিষ্ঠা করেন, যার ডাকনাম দেওয়া হল “ইউরোপমুখী জানালা”। তিনি ১৭১২ সালে রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকে সরিয়ে সাংত পিতেরবুর্গ শহরে নিয়ে আসেন। সাংত পিতেরবুর্গ ছিল একাধারে রাশিয়ার রাজধানী ও প্রধান বন্দর। ইউরোপের বিখ্যাত স্থপতিরা এখানে সম্রাট পিওতরের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ ও অন্যান্য প্রাসাদোপম বাসভবনগুলি নকশা করেন। শহরটি অনেকগুলি দ্বীপের উপরে দাঁড়িয়ে আছে, যেগুলি একে অপরের সাথে সেতুর মাধ্যমে সংযুক্ত। পিওতরের অধীনে চাষীদের বেশি আয়কর দিতে হত, ফলে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থার অবনতি ঘটে। ফসল ভাল না উঠলে তাদের অনেক সময় না খেয়েও দিনযাপন করতে হত। পিওতর ছিলেন বেশ নিষ্ঠুর প্রকৃতির। এক পর্যায়ে তিনি তাঁর নিজের পুত্রসন্তানকেও কারাবন্দী করে নির্যাতন করেন। এসব সত্ত্বেও ১৭২৫ সালে যখন পিওতরের মৃত্যু হয়, সামগ্রিকভাবে রাশিয়া অনেক বেশি নিরাপদ ও উন্নত একটি রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পায়। তার আগে ১৭২২-১৭২৩ সালে পারস্যের সাথে যুদ্ধ করে কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়ার প্রবেশগম্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৬২ সালে আরেকজন ক্ষমতাধর শাসক রাশিয়ায় আবির্ভূত হন: ২য় একাতেরিনা বা ক্যাথেরিন। তিনি ছিলেন প্রুশীয় (জার্মান) বংশোদ্ভূত, ১৭২৯ সালে তাঁর জন্ম হয়। কিন্তু ১৭৪৫ সালে রাশিয়ার শাসনক্ষমতার উত্তরাধিকারী ও পারিবারিক ভাই ৩য় পিওতরের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। জার হিসেবে ক্ষমতালাভের ৬ মাস পরেই তাঁর স্বামীকে হত্যা করা হয় এবং ১৭৬২ সালে একাতেরিনা নিজেকে রাশিয়ার সম্রাজ্ঞী হিসেবে ঘোষণা দেন। মহান একাতেরিনা ছিলেন নির্দয় ও উচ্চাভিলাষী। পিওতরের মতো তিনিও পশ্চিমা ঘরানার ধ্যানধারণাকে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি রাশিয়ার শিক্ষা ব্যবস্থা ও আইনের সংস্কার সাধনের জন্য পরিকল্পনা করেন, তবে এগুলি কোনটিই বাস্তবায়িত হয়নি। উসমানীয় সাম্রাজ্যের সাথে ১৭৭৪ ও ১৭৯২ সালে এবং সুইডেনের সাথে ১৭৯০ সালে যুদ্ধ করে তিনি রাশিয়ার জন্য নতুন নতুন অঞ্চল দখল করেন। এছাড়া তিনি পোল্যান্ডের বিশাল অঞ্চল করায়ত্ত করেন। তবে কৃষকদের জীবনযাত্রার কোনও মানোন্নয়ন হয়নি, ফলে ১৭৭৩ সালে তাঁর বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ জেগে ওঠে, যা তিনি শক্ত হাতে দমন করেন। ১৭৮৭ সালে একাতেরিনা রাশিয়া সফরে বের হন কিন্তু অভুক্ত কৃষকদের বদলে তাঁকে সুস্থ, সুন্দর পোষাক পরিহিত কৃষক ভূমিকায় অভিনেতাদের সাথে পরিচয় করানো হয়। ১৭৯৬ সালে একাতেরিনার মৃত্যু ঘটে এবং তাঁর পুত্র সিংহাসনে আরোহণ করেন।

আধুনিক যুগ (সাম্প্রতিক পর্ব)[সম্পাদনা]

মাঞ্চু চীন[সম্পাদনা]

১৭শ শতকের প্রারম্ভে ১৬৩০-এর দশকে চীনে মিং সম্রাটের অজনপ্রিয় সরকার ও এর উচ্চহারের করের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে চীনের উত্তর-পূর্বে অবস্থিত মাঞ্চুরিয়া অঞ্চলের গোত্রগুলি একতাবদ্ধ হতে শুরু করে। ১৬১৮ সালে এসে মাঞ্চুরা যথেষ্ট শক্তি অর্জন করে এবং মিং রাজত্বের লিয়াওথুং প্রদেশ দখলে নিতে সক্ষম হয়। এরপর ১৬৪৪ সালে চীনে আরেকটি বিদ্রোহের ফলশ্রুতিতে বেইজিং শহরটি বিদ্রোহীদের আয়ত্তে চলে যায়। মিং সরকারের কর্মকর্তারা বিদ্রোহীদের পরাজিত করার জন্য মাঞ্চুদের সাহায্য চান। কিন্তু এর পরিবর্তে মাঞ্চুরা চীনের ক্ষমতা নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় এবং একটি নতুন রাজবংশের পত্তন করে, যার নাম ছিল ছিং রাজবংশ। ছিং রাজারা এরপর আরও প্রায় ২৫০ বছর চীন শাসন করেন। আদিতে মাঞ্চুরা নিজেদেরকে চীনাদের চেয়ে উন্নত মনে করত এবং চীনাদের থেকে পৃথকভাবে বাস করত। তারা মাঞ্চু ও চীনাদের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ করে দেয় এবং চীনা পুরুষদের বেণী করে রাখতে বাধ্য করে। কিন্তু ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে মাঞ্চুরা চীনাদের ধরনে সরকার গঠন করে এবং সেখানে প্রাক্তন মিং সরকারের কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়। ধীরে ধীরে মাঞ্চুরা চীনাদের জীবনধারা ও রীতিনীতি গ্রহণ করতে শুরু করে এবং এর ফলে চীনা জনগণের কাছে তাদের শাসন আরও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। মিং রাজাদের সময়ে বেইজিং শহরে অনেক নতুন নতুন প্রাসাদ ও মন্দির বানানো হয় এবং শহরের চারপাশে নতুন প্রাচীর ও পরিখা নির্মাণ করা হয়। ছিং রাজারা বেইজিংয়ের প্রাচীরের ভেতরে অবস্থিত পুরাতন শহরটিতে কোনও হাত না দিয়ে প্রাচীরের বাইরে নতুন প্রাসাদ ও মন্দির নির্মাণ করে। ১৬৬১ সালে খাংশি ২য় ছিং রাজা হিসেবে শাসন করা শুরু করেন। তিনি তাইওয়ান, বহিঃস্থ মঙ্গোলিয়া, সাইবেরিয়ার অংশবিশেষ এবং তিব্বত চীনের অধীনে নিয়ে আসেন। ছিং রাজবংশের অধীনে ১৭শ ও ১৮শ শতকে চীন আবারও উন্নতি লাভ করা শুরু করে। মিংদের সময়ের চেয়ে চীনের আয়তন তিনগুণ বৃদ্ধি পায়। এমনকি ছিং রাজত্ব আয়তনে বর্তমান গণচীনের চেয়েও বেশি বড় ছিল। জনসংখ্যাও ১৫ কোটি থেকে তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫ কোটিতে পরিণত হয়। রেশম কাপড়, চীনামাটি, সুতির কাপড় ও বার্নিশকৃত দ্রব্যের উৎপাদন অনেক বৃদ্ধি পায় এবং বহির্বিশ্ব বিশেষ করে ইউরোপের সাথে বাণিজ্য বেড়ে যায়। চীনারা তাদের পণ্যদ্রব্যকে বিশ্বের সবচেয়ে উন্নতমানসম্পন্ন দ্রব্য হিসেবে গণ্য করত। এগুলির দাম হিসেবে তারা কেবল সোনা বা রূপা গ্রহণ করত। রপ্তানির জন্য চা উৎপাদন করা হত। এছাড়া চীন নিজের জনগণের জন্য সমস্ত খাদ্যদ্রব্য নিজেই উৎপাদন করত। সুক্ষ্ম চীনামাটিতে তৈরি, সুন্দর আকৃতির, ফুল ও পশুপাখির অলংকরণ করা পুষ্পাধার বা ফুলদানি ছিং রাজবংশের সময় পশ্চিমা দেশগুলিতে রপ্তানি করা হত। ১৬৯২ সালে সম্রাট খাংশি জেজুইট ধর্মপ্রচারকদেরকে চীনাদের কাছে খ্রিস্টধর্ম দীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেন। কিন্তু ১৭০৪ সালে জেজুইটরা বাদে বাকি সমস্ত ধর্মপ্রচারকদেরকে চীনা সংস্কৃতিকে অবহেলা করার অভিযোগে বহিস্কার করা হয়। ১৭২২ সালে সম্রাট খাংশি মারা যান। ১৭৩৬ সালে খাংশির পৌত্র ছিয়েনলুং চীনের সম্রাট হন এবং তিনি আরও ৬০ বছর চীন শাসন করেন। ১৭৭০ সালের পর থেকে মাঞ্চুদের ক্ষমতার প্রভাব কমতে শুরু করে। ছিয়েনলুং সেসময় একমাত্র কুয়াংচৌ বন্দরটি ইউরোপীয় ও মার্কিনী বণিকদের কাছে বাণিজ্যের জন্য উন্মুক্ত রাখেন এবং চীনকে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন রাখেন। ১৭৯২ সালে যুক্তরাজ্য সর্বপ্রথম চীনে তার রাষ্ট্রদূত পাঠায়। ইংরেজরা চীনের কাছে অধিকতর বাণিজ্য করার অধিকারের প্রার্থনা করে। কিন্তু ছিয়েনলুং এই দাবী প্রত্যাখ্যান করেন, ফলে চীন বিশ্ববাজার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকে। একই কারণে চীনে নতুন প্রযুক্তি গ্রহণের গতি ছিল অত্যন্ত ধীর। ১৭৯৬ সালে ছিয়েনলুং সিংহাসন ছেড়ে দেন। কিন্তু অবসরে থেকেও তিনি চীনা সরকারের উপর ক্ষমতার দাপট বজায় রাখেন। ১৮৪০-এর দশকে চীন সাম্রাজ্য দুর্বল হওয়া শুরু করে। অনেক বিদ্রোহের সূচনা হয়। পশ্চিমারাও চীনা আক্রমণ চালিয়ে সফল হয় কেননা চীন আক্রমণ প্রতিরোধে আর সুসমর্থ ছিল না।

আলোকময় যুগ[সম্পাদনা]

আলোকময় যুগ বলতে ইউরোপের ইতিহাসে ১৭শ শতক থেকে ১৮শ শতক পর্যন্ত যুগটিকে বোঝায়, যখন নতুন নতুন ধ্যান ধারণার বিকাশ ঘটেছিল। একে যুক্তির যুগ নামেও ডাকা হয়, কেননা এসময় লোকজন বিশ্বের বিভিন্ন ঘটনাবলি কেন ঘটে, তার পেছনের কারণগুলি খুঁজতে শুরু করে। এ প্রশ্নগুলি থেকেই আধুনিক বিজ্ঞানের জন্ম ও বিকাশ। সরকার কেমন হবে এবং মানুষ সমাজে কীভাবে বসবাস করবে, এগুলি নিয়েও এ যুগে নতুন নতুন ধারণার আবির্ভাব ঘটে।

কিছু কিছু ইউরোপীয় শাসক আলোকময় যুগের ধারণাগুলিকে উৎসাহের সাথে গ্রহণ করেন। সাধারণ মানুষও এগুলি গ্রহণ করে, কারণ তারা সরকারে তাদের মতামতের প্রতিফলন দেখতে চাচ্ছিল, অন্যের কথায় অন্ধের মত কাজ করতে চাচ্ছিল না। কিন্তু কিছু কিছু শাসক মনে করলেন যে এইসব নতুন নতুন ধ্যান ধারণা গোটা বিশ্বকেই চিরদিনের জন্য পালটে দেবে।

ফরাসি দার্শনিক রনে দেকার্ত (১৫৯৬-১৬৫০) যুক্তি দেন যে কেবল সেই ধারণাটিই সত্য, যেটিকে তথ্যপ্রমাণ বা যুক্তির সাহায্যে সত্য দেখানো সম্ভব। এ ধরনের যুক্তি খ্রিস্টান গির্জাগুলিকে বিচলিত করে তোলে। যেসব রাজা ও রাণী মনে করতেন যে তাদের দেশ শাসন করার “ঈশ্বরপ্রদত্ত” ক্ষমতা আছে, তারাও এসব যুক্তি শুনে উৎকণ্ঠিত হন। ইংরেজ দার্শনিক জন লক (১৬৩২-১৭০৪) মনে করতেন সকল মানুষ সমান ও মুক্ত এবং শাসকের কর্তৃত্ত্ব কেবল শাসিত জনগণের অনুমতির উপর নির্ভর করে। ১৬৮৭ সালে বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন আলো ও দৃশ্যমান বর্ণালীর তত্ত্ব, গতির তিনটি সূত্র এবং মধ্যাকর্ষণ বলের অস্তিত্ব নিয়ে লেখেন। বেনজামিন ফ্র্যাংকলিন (বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক ও রাষ্ট্রপরিচালনা বিশেষজ্ঞ) ১৭৪৩ সালে ফিলাডেলফিয়া শহরে মার্কিন দার্শনিক সঙ্ঘ প্রতিষ্ঠা যার সদস্যরা বিজ্ঞান ও দর্শন নিয়ে আগ্রহী ছিলেন। ফরাসি রসায়নবিদ অঁতোয়ান লাভোয়াজিয়ে (১৭৪৩-১৭৯৪) প্রথম প্রতিষ্ঠা করেন যে জ্বলন এক ধরনের রাসায়নিক বিক্রিয়া। ফরাসি লেখক ও সমালোচক দনি দিদরো ‘’অঁসিক্লোপেদি’’ নামের একটি বিশ্বকোষ সংকলন করেন, যেখানে বিভিন্ন বিষয়ের বিশেষজ্ঞরা জ্ঞানের সমস্ত ক্ষেত্রের উপরে লেখেন। বিশ্বকোষটি ১৭৫১ থেকে ১৭৭২ সাল পর্যন্ত ১৭টি খন্ড নিবন্ধ ও ১১ খন্ড চিত্র হিসেবে প্রকাশিত হয়। ১৭৫১ সালে কার্ল ফন লিনে (কারোলুস লিন্নেউস) তাঁর ফিলোসোফিয়া বোতানিকা নামক মহাগ্রন্থ প্রকাশ করেন, যেখানে প্রথমবারের মত উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতকে বিভিন্ন দলে ও প্রজাতিতে সংজ্ঞায়িত ও বিভক্ত করা হয়। ১৭৫৫ সালে স্যামুয়েল জনসন প্রকাশ করে কমপ্লিট ডিকশনারি অফ দ্য ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ বা ইংরেজি ভাষার পূর্ণাঙ্গ অভিধান। এতে ৪৪ হাজার শব্দ ছিল। ১৭৬৮ সালে প্রথম এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা প্রকাশিত হয়। ১৭৮৮ সালে লন্ডনে প্রথমবারের মত দ্য টাইমস দৈনিক পত্রিকাটি প্রকাশিত হয়।

আরেকজন ফরাসি দার্শনিক ভোলত্যার (১৬৯৪-১৭৭৮) তাঁর সমসাময়িক গির্জা ও সরকার উভয়েরই তীব্র সমালোচনা করতেন। ভলত্যারের আসল নাম ছিল ফ্রঁসোয়া মারি আরুয়ে। তিনি ছিলেন একাধারে বিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ ও ক্ষুরধার বুদ্ধিসম্পন্ন লেখক। তিনি একবার বলেছিলেন "আমি তোমার সাথে একমত না হতে পারি, কিন্তু আমি প্রাণ দিয়ে হলেও তোমার মত প্রকাশের অধিকার রক্ষা করব।" জঁ-জাক রুসো (১৭১২-১৭৭৮) একই কাজ করেন, এবং তাঁর ধারণাগুলির উপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে মার্কিনফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হয়। ১৭৯১ সালে টমাস পেইনের দ্য রাইটস অফ ম্যান ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা অর্জনের সময় মার্কিনীদেরকে প্রভাবিত করে। ম্যারি ওলস্টোনক্রাফট তাঁর আ ভিন্ডিকেশন অফ দ্য রাইটস অফ উইমেন গ্রন্থে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের সম-অধিকারের ব্যাপারে যুক্তি দেন। সেসময় ধর্নাঢ্য মহিলাদের বাসভবনগুলিতে শিল্প ও শিক্ষাজগতের মানুষেরা নিয়মিত আসর করতেন এবং সেখানে তারা সাম্প্রতিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার, নাটক, গ্রন্থ ও আলোচ্য বিষয়গুলি নিয়ে ভাবের আদানপ্রদান করতেন।

আলোকময় যুগের অন্যান্য উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কতুল্য ব্যক্তিত্ত্বের মধ্যে আছেন অ্যাডাম স্মিথ (অর্থনীতিবিদ), ডেভিড হিউম (ইতিহাসবিদ) এবং এমানুয়েল কান্ট (দার্শনিক) । প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে জ্ঞান, স্বাধীনতা ও সুখের অধিকারী হওয়ার –- আলোকময় যুগের এই বিশ্বাস এক নতুন বৈপ্লবিক ও গণতান্ত্রিক উৎসাহ-উদ্দীপনায় মানুষকে অনুপ্রাণিত করে তোলে, যা ১৯শ শতকে গিয়ে বিশ্বকে নতুন করে বদলে দেয়।

কৃষি বিপ্লব[সম্পাদনা]

১৭শ শতকের অন্তিম পর্যায় পর্যন্ত ইউরোপের মধ্যযুগের মতোই কৃষিকাজ ও খামারপালন করা হত। অধিকাংশ লোক গ্রামাঞ্চলে বাস করত এবং নিজেদের চাহিদার জন্য যতটুকু দরকার ঠিক ততটুকু খাবার উৎপাদন করত এবং অবশিষ্টাংশ থাকলে তা স্থানীয় হাট-বাজারে বিক্রি করে দিত। লোকজন তাদের গ্রামের আশেপাশে অবস্থিত তিন-চারটি মাঠ নিয়ে গঠিত ক্ষুদ্রাকার জমিতে কৃষিকাজ চালাত। মাটির উর্বরতা রক্ষা করার জন্য প্রতি বছর একটি মাঠে কোন শস্য বোনা হতো না, অনাবাদী রাখা হত। জনসংখ্যা যখন কম ছিল, তখন এই ব্যবস্থা ভালোই কাজ করছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং লোকজন আগের চেয়ে বেশি করে নতুন নির্মিত শহরগুলিতে স্থানান্তর করতে থাকে। কিন্তু শহরে শস্য উৎপাদনের জন্য কোন জমি ছিল না। সবার জন্য খাদ্যের যোগান নিশ্চিত করতে তাই শস্য উৎপাদনের নতুন পদ্ধতি খুঁজে বের করা দরকার হয়ে পড়ে। কৃষি নিয়ে সবচেয়ে প্রথম দিককার পরীক্ষা নিরীক্ষাগুলি নেদারল্যান্ডসে সংঘটিত হয়, যেখানে বেশি বেশি আবাদযোগ্য জমির অনেক জরুরী দরকার ছিল। ১৭১৫ সালে মধ্যে ওলন্দাজেরা হ্রদ শুকিয়ে ফেলে এবং সাগরে বাঁধ দিয়ে অনেক নতুন নতুন জমি সৃষ্টি করে। জমি থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য তারা বায়ুপ্রবাহচালিত কল ব্যবহার করত। ১৭৪৫ সালে পাখা-লেজবিশিষ্ট বায়ুকল উদ্ভাবন করা হয়। বায়ুপ্রবাহের দিক পরিবর্তিত হলে পাখা-লেজটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বায়ুকলের মূল পাখাগুলির মুখ ঘুরাতে সাহায্য করত। এর আগে প্রতিবার বাতাসের দিক পরিবর্তনের সাথে সাথে কোনও মানুষকে মূল পাখাগুলির মুখ ঘুরিয়ে বাতাসের মুখোমুখি করাতে হত। খাবারের চাহিদার কারণে ওলন্দাজ কৃষকেরা কোন জমিই পতিত রাখতে পারতো না। এর পরিবর্তে তারা শস্য আবর্তন নামের একটি পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা চালায়, যেখানে একই জমিতে চার ধরনের ফসলি শস্য চার বছর ধরে চক্রাকারে বপন করা হত। ১৭৩০ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে এই ধারণাটি অনুকরণ করে কৃষিকাজে প্রয়োগ করা হয়। লাঙলের অনেক উন্নতি সাধন করা হয় এবং ১৭০১ সালে জেথরো টাল নামের এক ব্রিটিশ উদ্ভাবক বীজ বপক বা সিড ড্রিল নামক যন্ত্র আবিষ্কার করেন। যন্ত্রটি ঘোড়ায় টানা হত। যন্ত্রটি মাটিতে সুষমভাবে ও ধারাবাহিকভাবে অনেকগুলি ছিদ্র তৈরি করত যাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বীজ পতিত হত। পেছনে পেছনে একজন কৃষিকর্মী ছিদ্রগুলির উপর দিয়ে মাটি টেনে বুঁজে দিত। এই যন্ত্রের উদ্ভাবনের ফলে একই সময়ে একাধিক সারিতে বহুসংখ্যক বীজ বপন করা এবং একই সময়ে একাধিক সারির আগাছা নির্মূল করা সম্ভবপর হয়। এর আগে অতীতে হাত দিয়ে জমিতে বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হত, ফলে সেগুলি সারিবদ্ধভাবে সুষমভাবে জমিতে পড়ত না এবং অনেক সময় পাখিরা সেগুলি খেয়ে ফেলত। বহু জায়গায় ভূমি পুনঃসংগঠিত করা হয়। বিশাল, উন্মুক্ত মাঠগুলিকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করা হয় এবং এগুলিকে ঘিরে দেওয়াল বা ঝোপঝাড়ের সীমানা দেওয়া হয়। ১৭৫৯ থেকে ১৮০১ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনে আইন করে সাধারণ জমি, যেগুলিতে আগে যে কেউ গবাদি পশুর ঘাস খাওয়ার জন্য ব্যবহার করতে পারত, সেগুলির মালিকদেরকে বেড়া তুলে দেওয়ার অধিকার দেওয়া হয়। জমির আয়তন বাড়ানোর জন্য অনেক সময় সমগ্র গ্রাম ধ্বংস করে ফেলা হয়। শিল্পশহরগুলিতে যত বেশি বেশি লোকজন অভিবাসী হতে থাকে, খাদ্য যোগানদার কৃষকের সংখ্যা ততই কমতে থাকে। ১৭৯৬ সালে হাঙ্গেরিতে কৃষকদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৮০০ সালের মধ্যে ব্রিটেনে মনোযোগ দিয়ে সংকর প্রজননের সুবাদে গড়ে একটি গাভীর ওজন ১৭০০ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। ১৭০০ থেকে ১৮৫০ সালের মধ্যে কৃষিক্ষেত্রের পরিবর্তনগুলি কৃষকদেরকে ক্রমবর্ধনশীল জনসংখ্যার ক্ষুধা মেটাতে সাহায্য করে। ১৮৪০ সালে কৃষিকাজে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহারের উপর প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়া[সম্পাদনা]

১৮শ শতকে চরম ক্ষমতাসম্পন্ন রাজারাণীরা ইউরোপেরা দেশগুলি শাসন করতেন। তারা অনুপম প্রাসাদ নির্মাণ করতেন, বড় বড় শিল্পী-সংগীতজ্ঞ-বুদ্ধিজীবীদেরকে তাদের “আলোকিত” দরবারে আকৃষ্ট করে নিয়ে আসতেন। এদের মধ্যে সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাধর দুইটি রাজ্য ছিল অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়া। হাবসবুর্গ রাজবংশ অস্ট্রিয়া শাসন করতেন। তারা ১৩শ শতক থেকেই ইউরোপের অন্যতম ক্ষমতাধর শাসকগোষ্ঠীদের একটি ছিল। ১৬শ শতকের প্রারম্ভে পবিত্র রোমান সম্রাট ৫ম চার্লস তাঁর বিশাল সাম্রাজ্য ভাগ করে দেন। একটি ভাগ স্পেন থেকে শাসন করা হত এবং অন্যটি অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা থেকে। ১৮শ শতকে এসে স্পেনীয় হাবসবুর্গ রাজপরিবারের অবসান ঘটলেও অস্ট্রীয় হাবসবুর্গেরা তখনও তাদের প্রতাপ প্রতিপত্তি ধরে রেখেছিলেন। ১৭৪০ সাল থেকে মারিয়া টেরেজা নামের রাণী অস্ট্রিয়া শাসন করা শুরু করেন। সিংহাসনের অধিকার নিয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বীদের সাথে যুদ্ধ লাগলেও ১৭৪৮ সাল নাগাদ মারিয়ার ক্ষমতা সম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন হাঙ্গেরিও তার অধীনে ছিল (সদ্য তুর্কিদের সাথে যুদ্ধ করে পুনরায় লব্ধ)। তিনি অস্ট্রিয়ার ক্ষমতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন এবং ভিয়েনাকে ইউরোপের শিল্পকলার কেন্দ্রে পরিণত করেন। সমস্ত ইউরোপ থেকে শিল্পীরা এসে ভিয়েনার বিশাল বিশাল ভবন নির্মাণ প্রকল্পে অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে ভের্সাই প্রাসাদের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নির্মিত (১৬৯৬-১৭১১) শোনব্রুন প্রাসাদটিতে ১৪৪০টি শয়নকক্ষ ছিল, এটি হাবসবুর্গ রাজাদের গ্রীষ্মকালীন প্রাসাদ হিসেবে ব্যবহৃত হত। ভোলফগাং আমাডেউস মোৎসার্ট (১৭৫৬-১৭৯০) মাত্র ছয় বছর বয়সে মারিয়া টেরেজার দরবারে সঙ্গীতবাদন করেছিলেন। ১৭৮০ সালে মারিয়া টেরেজার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র ২য় ইয়োজেফ সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন আলোকময় যুগের ধ্যানধারণায় বিশ্বাসী। গণতান্ত্রিক না হলেও তিনি দাসপ্রথা উঠিয়ে দাসদের মুক্ত করে দেন এবং বিত্তবান অভিজাতদের বিশেয় সুযোগ-সুবিধা রদ করে দেন। ১৭৪০ সালে ২য় ফ্রিডরিখ (মহান ফ্রিডরিখ) প্রুশিয়ার রাজদায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন একজন বিশিষ্ট সামরিক জেনারেল বা উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা। তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্র ও শক্তিশালী সেনাবাহিনী লাভ করেন, যেটিকে ব্যবহার করে তিনি প্রুশিয়াকে একটি বৃহৎ শক্তিকে পরিণত করেন। মহান ফ্রিডরিখ শক্ত প্রশাসকের পাশাপাশি একজন সংস্কৃতিপরায়ণ মানুষ ছিলেন। তিনি বিজ্ঞান ও কৃষিশিক্ষার উপর জোর দেন এবং শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করেন। ১৭৫৬ থেকে ১৭৬৩ সাল পর্যন্ত “সাত বছরের যুদ্ধ” সংঘটিত হয়, যেখানে ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া ও রাশিয়া একত্রিত হয়ে ব্রিটেন ও প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। যুদ্ধ শেষে প্রুশিয়া অস্ট্রিয়ার সাইলেসিয়া অঞ্চলটির কর্তৃত্ব পায়। অন্যদিকে ব্রিটেন ভারত ও আমেরিকা মহাদেশে অবস্থিত অনেকগুলি ফরাসি উপনিবেশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয়।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম[সম্পাদনা]

১৮শ শতকের মাঝামাঝি উত্তর আমেরিকাতে যুক্তরাজ্যের ১৩টি উপনিবেশ ছিল। এছাড়া সাত বছরের যুদ্ধে (১৭৫৬-১৭৬৩) যুক্তরাজ্য ফ্রান্সকে হারিয়ে কানাডার নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নিয়ে আসে। মার্কিন উপনিবেশগুলি কীভাবে শাসিত হবে, সে ব্যাপারে যুক্তরাজ্যের কোন মত পরিবর্তন না হলেও ঔপনিবেশিক জনগণ, যাদের নিজের শাসনব্যবস্থার উপর কোনও নিয়ন্ত্রণ ছিল না, তারা এ ব্যাপারে বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। মার্কিন বিপ্লবের ফলে উপনিবেশগুলি স্বাধীন হয় এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

যুক্তরাজ্য তার মার্কিন নাগরিকদের থেকে কর আদায় করত এবং করের টাকা দিয়ে উত্তর আমেরিকার প্রতিরক্ষা ব্যয় মেটাত। সেসময় প্রায় ২০ লক্ষ ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত মার্কিনী ছিল। তারা নিজেদের প্রায় সমস্ত খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্য উৎপাদন করত। তারা আমদানিকৃত চা এবং আইনী দলিলাদির উপর কর প্রদানের ব্যাপারে অত্যন্ত নাখোশ ছিল। ব্রিটিশ আইন প্রণয়নকারী সংসদে তাদের কোনও প্রতিনিধি ছিল না। ১৭৬৫ সালে তারা এই অন্যায্য ব্রিটিশ করের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা শুরু করে। তাদের শ্লোগান ছিল “প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কর প্রদান হল স্বৈরাচার”। যুক্তরাজ্যে এই বিদ্রোহ দমনের জন্য মার্কিন উপনিবেশগুলিতে সেনা মোতায়েন করে। ১৭৭০ সালে বস্টন গণহত্যা নামক ঘটনায় ব্রিটিশ সেনারা ঔপনিবেশিক জনতার ভিড়ে গুলি চালায় এবং এতে ৫ জনের মৃত্যু হয়। ১৭৭৩ সালে বস্টন পোতাশ্রয়ে ঔপনিবেশিকেরা চায়ের উপর বসানো করের প্রতিবাদে অনেক জাহাজের মালামাল সমুদ্রের পানিতে ফেলে দেয়, যে ঘটনার নাম দেওয়া হয় “বস্টন টি পার্টি”।

১৭৭৫ সালের এপ্রিল মাসে ম্যসাচুসেট্‌সের লেক্সিংটন শহরে ঔপনিবেশিক ও ব্রিটিশ সেনাদের মধ্যে সশস্ত্র সংঘর্ষ সংঘটিত হয়। ঔপনিবেশিকেরা জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে একটি সেনাবাহিনী গঠন করে এবং ১৭ই জুন বস্টনের কাছে বাংকার হিল নামক এলাকায় দুই সেনাবাহিনী ছোট আকারের এক যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সেই যুদ্ধে ব্রিটিশরা জয়ী হলেও মার্কিন বিপ্লব তথা মার্কিনীদের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পল রিভিয়ার এই যুদ্ধের অন্যতম বীর ছিলেন। তিনি বস্টন থেকে লেক্সিংটন পর্যন্ত ঘোড়ায় চড়ে গিয়ে ব্রিটিশ সেনাদের আগমনের আগাম খবর দেন। যদিও তিনি ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন, তাঁকে মার্কিন ইতিহাসে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করা হয়।

ব্রিটিশ সেনারা ইউরোপীয় বিভিন্ন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অভ্যস্ত ছিল। তারা আমেরিকাতে যুদ্ধ করতে এসে সমস্যার সম্মুখীন হয়। তারা কাঁধে কাঁধ লাগিয়ে সারিবদ্ধভাবে অগ্রসর হত এবং একসাথে গুলি ছুঁড়ত। কিন্তু মার্কিন দক্ষ গুলিচালক বা শার্পশুটারদের জন্য তারা সহজ লক্ষ্যে পরিণত হয়। ব্রিটিশ সৈনিকেরা লাল রঙের ও লম্বা পশ্চাদলেজবিশিষ্ট কোট পড়ত, এ জন্য তাদেরকে “লাল কোটের দল” বা “রেডকোট্‌স” বলা হত।

১৭৭৬ সালের ৪ঠা জুলাই যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ঔপনিবেশিক নেতারা মহাদেশীয় কংগ্রেস বা সম্মেলনে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র স্বাক্ষর করেন। ব্রিটিশ সরকার এটিকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করে। ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে ঔপনিবেশিকদের সেনাবাহিনী ব্রিটিশ সেনাদের পরাজিত করতে শুরু করে। ১৭৭৭ সালে নিউ ইয়র্কের সারাটোগা শহরটি ব্রিটিশদের হাতছাড়া হয়। কিন্তু ব্রিটিশরা পেনসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়া শহরটি আয়ত্তে নিয়ে আসে। ফ্রান্স (১৭৭৭), স্পেন (১৭৭৯), নেদারল্যান্ডস (১৭৮০) – সবাই ঔপনিবেশিকদের পক্ষ নেয়। ছয় বছর ধরে যুদ্ধ চলে ১৭৮১ সালে এর সমাপ্তি হয়। ঐ বছর এক অবরোধের পর ভার্জিনিয়ার ইয়র্কটাউন শহরে ব্রিটিশ সেনারা আত্মসমর্পণ করে। এর দুই বছর পরে ১৭৮৩ সালে যুক্তরাজ্য স্বাধীন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদান করে।

নেপোলিয়নের যুদ্ধসমূহ[সম্পাদনা]

নাপোলেওঁ বোনাপার্ত (১৭৬৯-১৮২১) গোলন্দাজ বাহিনীর পদস্থ কর্মকর্তা থেকে ফ্রান্সের সম্রাটের মর্যাদায় আসীন হন।

কানাডা[সম্পাদনা]

১৭৫৯ সালে জেনারেল জেমস উলফের নেতৃত্বে ব্রিটিশেরা ফরাসিদের কাছ থেকে কেবেক অঞ্চলটি দখল করে নেয়। ফলে নতুন ফ্রান্স বা ফরাসি কানাডা ১৭৬৩ সাল নাগাদ ব্রিটিশ কানাডার অংশে পরিণত হয়। কানাডীয় জনগণ ফরাসি, ব্রিটিশ ও আদিবাসী আমেরিকান ঐতিহ্যের সংমিশ্রণে একটি নতুন, অনন্য সংস্কৃতি গঠন করে। ১৭৭৪ সালে কেবেক অধ্যাদেশের মাধ্যমে ব্রিটিশ-শাসিত কানাডাতে ফরাসি-বংশোদ্ভূত কানাডীয়দের অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কানাডা ছিল সুবিশাল এক ভূমি যেখানে খুবই স্বল্প সংখ্যক লোক বাস করত। মার্কিন বিপ্লবের সময় (১৭৭৫-১৭৮৩) হাজার হাজার সংযুক্ত সাম্রাজ্য অনুসারীরা (United Empire Loyalists) মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে কানাডায় অভিবাসন করে। ১৭৭৫ সালেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কানাডা দখল করার চেষ্টা করে। ব্রিটেন ১৭৯১ সালে কানাডাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে দেয়: নিম্ন কানাডা (মূলত ফরাসিভাষী) এবং ঊর্ধ্ব কানাডা। পরবর্তীতে ১৮১২ সালের যুদ্ধে কানাডীয়রা মার্কিনীদের আগ্রাসন প্রতিরোধ করে। শুরুর দিকে শুধুমাত্র কানাডার পূর্ব অংশেই ইউরোপীয়রা বসতি স্থাপন করেছিল। দেশের পশ্চিম ও উত্তর মেরু-অঞ্চলীয় অংশগুলি আদিবাসী আমেরিকান ও ইনুইট জাতির লোকদের কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়। কিন্তু শীঘ্রই অভিযাত্রী ও পশুলোমের ব্যবসায়ীরা পশ্চিমদিকে অগ্রসর হতে থাকে এবং কৃষক ও রেলপথ নির্মাতারা তাদের অনুসরণ করে। ১৮২১ সালে হাডসনস্‌ বে কোম্পানিকে বৃহৎ হ্রদগুলির (Great Lakes) পশ্চিমের অঞ্চলগুলির নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হয়। ১৮৪১ সালে যুক্তরাজ্য ঊর্ধ্ব ও নিম্ন কানাডাকে একত্রিত করে এবং ১৮৬৭ সালে কানাডা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের একটি স্বশাসিত রাজ্যে পরিণত হয়। ১৮৬৯ সালে লোহিত নদী বিদ্রোহ (Red river rebellion) ঘটে কিন্তু তা কানাডাকে বিভক্ত করতে পারেনি। ১৮৭৫ সালে রাজকীয় কানাডীয় অশ্বারোহী পুলিশ (Royal Canadian Mounted Police) বা সংক্ষেপে “মাউন্টিজ” প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরুতে বাহিনীটিতে প্রায় ৩০০ জন অশ্বারোহী ছিল, যাদের কাজ ছিল দুর্গম জনহীন এলাকাগুলি টহল দেওয়া। ১৮৮০-র দশকে কানাডীয় প্রশান্ত মহাসাগরীয় রেলপথ নির্মাণের কাজ ১৮৮৬ সালে সমাপ্ত হলে বিশাল এই দেশটির পূর্ব ও পশ্চিম অর্ধাংশদ্বয় একত্রিত হয়। ১৮৯০ সালের মধ্যে দেশটি পূর্বে আটলান্টিক মহাসাগর থেকে পশ্চিমে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে এবং এর মধ্যে ইউকন অঞ্চলটিও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

দক্ষিণ আমেরিকার স্বাধীনতা[সম্পাদনা]

১৮০০ সাল পর্যন্তও উত্তর এবং দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে স্পেনপর্তুগাল শাসন করত। স্থানীয় জনগণের সিংহভাগ ঔপনিবেশিকের ভূমিকা পালন করতে এবং দূরবর্তী সরকারকে কর প্রদান করতে একদমই পছন্দ করত না। ইউরোপে নেপোলিওনীয় যুদ্ধ।নেপোলিওনীয় যুদ্ধের ফলে স্পেন ও পর্তুগালে বিশৃংখলার সৃষ্টি হলে উপনিবেশগুলি স্বাধীনতা অর্জনের চেষ্টা চালায়। ভেনেজুয়েলার সিমোন বোলিবার এবং আর্জেন্টিনার হোসে দে সান মার্তিন স্পেনীয় শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের মূল যুদ্ধটি পরিচালনা করেন। সান মার্তিন ১৮১৬ সালে তাঁর দেশের জন্য স্বাধীনতা অর্জন করতে সক্ষম হন। কিন্তু সিমোন বোলিবারের সংগ্রাম ছিল আরও দীর্ঘ ও প্রতিকূল। তিনি প্রথমে একটি বিপ্লবী সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং ১৮১০ সালে বাহিনীটি ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস শহর নিজেদের আয়ত্তে নিতে সক্ষম হয়। কিন্তু পরে স্পেনীয় সেনাবাহিনীর কাছে পরাজয় বরণ করে। বোলিবার ১৮১১ সালে বিদ্রোহী বাহিনীর নেতার দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আরও তিন বছর স্পেনীয়দের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। এরপর তিনি দ্বিতীয়বারের মত পরাজিত হন এবং এবারে তিনি জামাইকাতে নির্বাসনে যান। সান মার্তিনের বাহিনী আর্জেন্টিনা থেকে আন্দেস পর্বতমালা পার হয়ে চিলিতে যায় এবং চিলির জনগণকে স্পেন থেকে ১৮১৮ সালে স্বাধীনতা লাভ করতে সাহায্য করে। ১৮১৯ সালে তিনি একটি সেনাবাহিনী নিয়ে ভেনেজুয়েলা থেকে আন্দেস পর্বতমালা অতিক্রম করে কলম্বিয়াতে যান এবং সেখানে বোয়োকার যুদ্ধে অপ্রত্যাশিত আক্রমণের সুবাদে স্পেনীয় বাহিনীকে পরাজিত করেন। কলম্বিয়া স্বাধীনতা লাভ করে। এরপরে তিনি ১৮২১ সালে ভেনেজুয়েলাকে এবং ১৮২২ সালে ইকুয়েডরপানামাকেও মুক্ত করেন। এই সমস্ত রাষ্ট্রগুলিকে একটিমাত্র নতুন রাষ্ট্রের অধীনে নিয়ে আসেন, যার নাম দেওয়া হয় বৃহৎ কলম্বিয়া প্রজাতন্ত্র (Gran Colombia)। তিনি নিজেকে এই নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ঘোষণা করেন। অবশেষে ১৯২৪ সালে বোলিবারের বাহিনীর সহায়তায় আয়াচুচোর যুদ্ধে স্পেনীয় বাহিনীকে পরাজিত করে পেরুও স্বাধীনতা লাভ করে। এবং ১৮২৫ সালে স্বাধীন পেরুর অংশবিশেষ নিয়ে নতুন প্রজাতন্ত্র সৃষ্টি করে বোলিবারের নামানুসারে এর নাম রাখা হয় বোলিবিয়া বা বলিভিয়া। ১৮২৮ সালে উরুগুয়ে স্পেন থেকে স্বাধীনতা অর্জন করে। এর আগে ১৮২২ সালে ব্রাজিল পর্তুগাল থেকে স্বাধীন হয়।

শিল্প বিপ্লব[সম্পাদনা]

১৮শ শতকের মধ্যভাগে যুক্তরাজ্যে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়। ফলে সমাজব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে। মানুষ শিল্পকারখানায় কাজ করার জন্য গ্রাম থেকে শহরে আসতে শুরু করে। ১৮শ শতকের শুরুর দিকের দুইটি ঘটনা শিল্প বিপ্লবের গোড়াপত্তন করে। প্রথমত, ১৭০৯ সালে আব্রাহাম ডার্বি আবিষ্কার করেন যে লোহার আকরিক থেকে লোহা গলিয়ে বের করার জন্য কাঠকয়লার চেয়ে পাথুরে কয়লার অবশেষ বা কোক-কয়লা অনেক বেশি ভাল একটি জ্বালানি। দ্বিতীয়ত, ১৭১২ সালে টমাস নিউকোমেন একটি উন্নততর বাষ্পীয় ইঞ্জিন উদ্ভাবন করেন যার মাধ্যমে কয়লার খনি থেকে পানি উত্তোলন করে বের করে দেওয়া হত (এর আগে ১৬৯৮ সালে টমাস সেভারি খনি থেকে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রথম বাষ্পচালিত পানি উত্তোলন যন্ত্র উদ্ভাবন করেন।)। এই দুই ঘটনার ফলে খনি থেকে অনেক বেশি কয়লা উত্তোলন এবং ভারী শিল্পের জন্য উন্নত মানের লোহা নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়। ১৭৬০-এর দশক পর্যন্ত বেশির ভাগ পণ্য বাসায় অথবা ছোট কুটিরশিল্প জাতীয় কারখানাতে হাতে তৈরি করা হত। ধাতুর কারিগরেরা পেরেক, আলপিন, ছুরি তৈরি করতেন। সুতাতৈরিকারকেরা ও কাপড় বয়নকারীরা পশমলিনেনের জামাকাপড় তৈরি করতেন। কিন্তু ১৮শ শতকে এসে সুতির কাপড়ের চাহিদা দিনে দিনে বাড়তে থাকে। সুতির কাপড় ব্রিটেনে মূলত ভারত থেকে আমদানি করা হত। এর পরে কাঁচামাল হিসেবে তুলা আমদানি করে ব্রিটেনেই পোষাক তৈরি করা হত। ১৭৩৩ সালে জন কে ফ্লাইং শাটল নামক একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন এবং এর বদৌলতে বস্ত্রবয়ন প্রক্রিয়ার গতি এতই বেড়ে যায় যে সুতা কাটার কলগুলি বয়নকারীদের চাহিদা অনুযায়ী যথেষ্ট পরিমাণ সুতা উৎপাদন করতে পারত না। ১৭৪২ সালে ব্রিটেনে প্রথম সুতির কাপড় তৈরির কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর ১৭৬৪ সালে জেমস হারগ্রিভ্‌স স্পিনিং জেনি নামের একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যার সাহায্যে একজন ব্যক্তি একসাথে আটটি সুতা কাটতে পারত। জেমস হারগ্রিভ্‌স ছিলেন একজন দরিদ্র সূত্রধর। তিনি তার কন্যা জেনি-র নামে তাঁর উদ্ভাবিত যন্ত্রের নামকরণ করেন। কিন্তু অন্যান্য হাতে কাজ করা সুতাপ্রস্তুতকারীরা ভয় পেয়েছিলেন যে হারগ্রিভসের যন্ত্রটি তাদের কাজের সুযোগ নষ্ট করে দেবে, তাই তারা এরকম অনেক যন্ত্র ধ্বংস করেন। এর পাঁচ বছর পরে রিচার্ড আর্করাইট পানিচালিত হেভি স্পিনিং ফ্রেম নামক যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। এই নতুন যন্ত্রগুলির চালনার সুবিধার্থে বস্ত্রশিল্পকারখানাগুলিকে দ্রুতবাহী স্রোতবিশিষ্ট নদীর পাশে স্থাপন করা হত। ফলশ্রুতিতে সুতির কাপড়ের শিল্প দ্রুত উন্নতি ও প্রসার লাভ করতে শুরু করে। ১৭৬৯ সালে জেমস ওয়াট বাষ্পীয় ইঞ্জিনের অনেক উন্নতি সাধন করেন, যার ফলে ১৭৯০ সাল নাগাদ বাষ্পীয় শক্তি ব্যবহার করে শিল্পকারখানার যন্ত্রপাতি চালানো সম্ভব হয়। পানিকে বাষ্পে পরিণত করার জন্য প্রয়োজনীয় উত্তাপের যোগান দিতে কয়লার চাহিদা বৃদ্ধি পায়। বাষ্পচালিত ইঞ্জিন ব্যবহার করেই কয়লাখনি থেকে অবাঞ্ছিত পানি উত্তোলন করা হত। অন্যদিকে ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি নির্মাণের জন্য লোহার চাহিদাও বেড়ে যায়। কাঁচামালগুলিকে শিল্পকারখানায় নিয়ে আসার জন্য এবং সমাপ্ত পণ্যদ্রব্য নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রথমে খাল খনন করা হয় এবং পরবর্তীতে রেলপথ নির্মাণ করা হয়। ১৭৭৯ সালে প্রথম লোহার সেতু নির্মাণ করা হয়। ১৭৯৯ সালে বাষ্পীয় ইঞ্জিন চালিত কারখানা বা মিলে কাগজ, ময়দাবস্ত্র উৎপাদন করা শুরু হয়। দ্রুত শহরাঞ্চলের আকার বৃদ্ধি পেতে থাকে। কিন্তু বাসস্থান ও কর্মস্থলের অবস্থা ছিল অত্যন্ত অনুন্নত এবং অনেক মানুষ ক্ষুধা ও রোগব্যাধিতে ভুগত এবং কর্মস্থলে দুর্ঘটনার শিকার হত। পাঁচ বছর বয়স থেকেই শিশুরা কয়লা খনিতে কাজ করা শুরু করত। তাদের কেউ কেউ অনেক ভারী বোঝা টানত; অন্য শিশুরা সারাদিন ধরে খনির অন্ধকারে বসে থাকত এবং বায়ু চলাচলের জন্য দরজা খুলে দিত ও বন্ধ করে দিত। ১৮১১ সালে নতুন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে শিল্পকারখানা চালানোর বিরুদ্ধে “লাডাইট” বিদ্রোহ শুরু হয়। ১৮১৫ সালে হামফ্রি ডেভি একটি সতর্কতামূলক বাতি উদ্ভাবন করেন, যা খনিশ্রমিকদের বিস্ফোরক গ্যাস সম্পর্কে আগেই সাবধান করে দিত।

১৮২৫ সালে ইংল্যান্ডের স্টকটন থেকে ডার্লিংটন পর্যন্ত সর্বপ্রথম জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রেলপথ চালু করা হয়। ১৮৩০ সালে সর্বপ্রথম আন্তঃশহর বাষ্পীয় ইঞ্জিনচালিত রেলগাড়ি ইংল্যান্ডে নকশা ও নির্মাণ করা হয়, যার নাম ছিল “দ্য রকেট”। এরপর থেকে বাষ্পচালিত ইঞ্জিন দ্বারা যাত্রীবাহী আচ্ছাদিত রেলগাড়ি টানা হত। ১৮৪২ সালে ব্রিটিশ সংসদ সমস্ত নারী ও ১০ বছরের নিচের শিশুদের মাটির নিচের কয়লা খনিতে কাজ করা নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

ইউরোপে টালমাটাল[সম্পাদনা]

১৮১৫ সালে নেপোলিওনীয় যুদ্ধগুলি অবসানের পরে ইউরোপ বিশৃংখলায় পতিত হয়। পুরাতন ধারণা ও পুরাতন সরকারগুলি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলেও শিল্পবাদ ও গণতন্ত্রের সূচনালগ্ন ছিল এটি। প্রথমদিকে পরিবর্তনকামী জনগণের দাবী উপেক্ষা করা হয় কিংবা দমন করা হয়। তাই সমগ্র ইউরোপ জুড়ে শাসনব্যবস্থাতে যাদের কোন কথার দাম ছিল না, সেই সাধারণ জনগণের কাছে ক্রমেই একটিমাত্র হাতিয়ার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে: বিপ্লবফ্রান্সে ১৮৩০ সালে বিদ্রোহ ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে অজনপ্রিয় ১০ম শার্লের পরিবর্তে “নাগরিকদের রাজা” লুই-ফিলিপকে ক্ষমতায় বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়। সংবাদপত্রের মাধ্যমে গণজাগরণের খবর চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে, ফলে ইউরোপের অন্যান্য দেশেও বিদ্রোহ বিক্ষোভ শুরু হয়ে যায়। দুই বছরের মধ্যে ১৮৩২ সালে গ্রিস উসমানীয় সাম্রাজ্য তথা তুর্কি শাসন থেকে এবং ১৮৩১ সালে বেলজিয়াম নেদারল্যান্ডস থেকে নিজেদেরকে স্বাধীন ঘোষণা করে। ১৮৩৮ সালে ব্রিটেনে রাজনৈতিক সংস্কার দাবী করে “জনগণের সনদ” (People’s Charter) প্রকাশ করা হয়। আইরীয় রাজনীতিবিদ ফেয়ারগুস ও-কনর (যিনি ১৮৩২ সালে ব্রিটিশ সংসদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন) সমস্ত পুরুষের ভোটাধিকারের ব্যাপারে জাগরণের সৃষ্টি করেন এবং ১৮৪১ সাল থেকে ১৮৪৮ সাল পর্যন্ত সনদবাদীদের নেতৃত্ব দেন। ১৮৪৮ সালে সমগ্র ইউরোপ এতগুলি বিপ্লব ও বিদ্রোহে জনগণ ফেটে পড়ে যে এটিকে “বিপ্লবের বছর” আখ্যা দেওয়া হয়েছে। ঐ বছরের জানুয়ারি মাসের ২০ তারিখে ইতালির সিসিলি দ্বীপে একটি ছোট বিদ্রোহের মাধ্যমে এর সূত্রপাত হয়। এই বিদ্রোহের বদৌলতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ফেব্রুয়ারি মাসের ২৪ তারিখে ফ্রান্সেও বিদ্রোহের সূচনা হয়। ফ্রান্সে একদল আক্রমণাত্মক বিদ্রোহী নতুন প্রজাতন্ত্র ও সমস্ত পুরুষ মানুষের ভোটাধিকারের জন্য দাবী করে এবং ফরাসি সেনারা তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করে। শিঘ্রই সারা ইউরোপে বিদ্রোহের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটেনে সনদবাদীরা (Chartists) রাজনৈতিক সংস্কার এবং সমস্ত পুরুষ মানুষের ভোটাধিকার আদায়ের জন্য মিছিল করে। তবে বেলজিয়াম, নেদারল্যান্ডস এবং ডেনমার্কে শান্তিপূর্ণভাবে রাজনৈতিক সংস্কার সাধিত হয়। বার্লিনে একীভূত জার্মানি ও রাজনৈতিক সংস্কার দাবী করে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে; সেখানে পুরুষ, নারী ও শিশুদের উপর প্রুশীয় সেনারা হামলা করে এবং বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করে। ইতালীয়রাও একটি একীভূত ইতালি চাইছিল। অন্যদিকে বিশাল অস্ট্রীয় সাম্রাজ্যের বিভিন্ন ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী চাইছিল সাম্রাজ্যকে ভেঙে নিজ নিজ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হোক। প্যারিস, মিলান, রোম, ভেনিস, ফ্রাংকফুর্ট, বার্লিন, ভিয়েনা, প্রাগ, বুদাপেশত, ওয়ারস’ শহরগুলি ছিল এই বিপ্লবগুলির কেন্দ্রবিন্দু। ১৮৪৮ সালের বিপ্লবগুলি এক বছরের মধ্যেই ১৮৪৯ সালে দমন করে ফেলা হয়। ১৮৫২ সালে ফ্রান্সে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্র রদ হয়ে দ্বিতীয় সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু যে ধারণাগুলি বিপ্লবের চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছিল, সেগুলি ফুরিয়ে যায়নি। অনেক সরকার বুঝতে পারল যে তাদেরকে কিছু কিছু সংস্কার করতে হবে। সংস্কারকরা প্রশাসন চালানো এবং সম্পদ আরও ন্যায্য বন্টনের জন্য উপায় খুঁজে বের করলেন। ১৮৪৪ সালে ফ্রিডরিশ এঙেলস ইংল্যান্ডের ম্যানচেস্টার শহরে শ্রমিকদের জীবন নিয়ে গবেষণা করেন। ১৮৪৮ সালে জার্মান সমাজতন্ত্রবাদী কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রিডরিশ এঙেলস তাদের ধারণাগুলি সাম্যবাদী ইশতেহার নামক গ্রন্থে প্রকাশ করেন। এটি ভবিষ্যতের ঘটনাবলির উপরে বিশাল প্রভাব ফেলে।

আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতা[সম্পাদনা]

১৮৩০-এর দশকেই দক্ষিণ আফ্রিকার বুর জাতির শ্বেতাঙ্গ লোকেরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকদের থেকে পালাতে উত্তরে আফ্রিকা মহাদেশের অভ্যন্তরে বসতি স্থাপনের জন্য বিরাট অভিবাসন যাত্রা সম্পন্ন করেছিল। ১৮৭৯ সালে ইসান্ধলওয়ানার যুদ্ধে জুলু জাতির যোদ্ধারা ১৭০০ ব্রিটিশ সেনাকে হত্যা করতে সক্ষম হয়, যদিও পরে তাদের পরাজয় ঘটে।

১৮৮০ সালে আফ্রিকা মহাদেশের ৫ শতাংশেরও কম ভূখন্ড ইউরোপীয় কোন শক্তি দ্বারা শাসিত ছিল। বেশির ভাগ ইউরোপীয় জাতিই আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলে বাণিজ্যকুঠি স্থাপন করে সেগুলির মাধ্যমে ব্যবসা করেই সন্তুষ্ট ছিল। কেবল দক্ষিণ আফ্রিকাতে ব্রিটিশ এবং বুররা মহাদেশের অভ্যন্তরভাগে প্রবেশ করে নতুন বসতি স্থাপন করেছিল। কিন্তু ২০ বছরের মধ্যে এই অবস্থা সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে যায়। শুরু হয় আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতা। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক সেসিল রোডস ছিলেন এই স্বপ্নের এক অন্যতম প্রবক্তা। তিনি ১৮৯০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাতে যুক্তরাজ্যের অন্তরীপ উপনিবেশের প্রধানমন্ত্রী পদলাভ করেন। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ থেকে মিশর পর্যন্ত এক সুবিশাল ব্রিটিশ আফ্রিকান সাম্রাজ্য গড়ার উচ্চাভিলাষ প্রকাশ করেছিলেন।

১৯১৪ সালে আফ্রিকা দখলের প্রতিযোগিতাশেষে সাতটি ইউরোপীয় জাতি লাইবেরিয়া ও ইথিওপিয়া বাদে সমগ্র আফ্রিকা মহাদেশকে তাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। ১৮৮৪ সালের মধ্যেই বেলজিয়াম, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পর্তুগাল ও স্পেন হয় আফ্রিকাতে নতুন নতুন উপনিবেশ দাবী করেছিল কিংবা পুরনো উপনিবেশগুলিকে সম্প্রসারিত করেছিল। ১৮৮০ সালে বেলজিয়ামের রাজা ২য় লেওপোল্‌দ গোটা কঙ্গো অঞ্চলটিকে তাঁর নিজস্ব ব্যক্তিগত সম্পত্তি হিসেবে দাবী করেন। ১৮৮২ সালে যুক্তরাজ্য সুয়েজ খালে তাঁর প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত করতে মিশরের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয়। সদ্য-একীভূতকরণের ফলে প্রতিষ্ঠিত জার্মানি ও ইতালি রাষ্ট্রদ্বয়ও আফ্রিকাতে তাদের ভাগ বসায়। বিরাট কোন সংঘাত যাতে না হয়, সেজন্য ইউরোপীয় শক্তিগুলি ১৮৮৪ সালে বার্লিনে আফ্রিকা বিষয়ক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেয়। এই সম্মেলনে আফ্রিকান জাতিগুলির ইচ্ছা, সংস্কৃতি বা প্রাকৃতিক সীমানার ব্যাপারে কোনই ভ্রুক্ষেপ না করে ইউরোপীয়রা নিজেদের মধ্যে আফ্রিকাকে ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়। কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান, এমনকি শ্বেতাঙ্গ বুর আফ্রিকানদের সমস্ত প্রতিরোধ ইউরোপের অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত সেনাবাহিনীগুলি কঠোরভাবে দমন করে। ১৮৮৯ সালে ব্রিটিশরা মাতাবেলে জাতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হয় এবং তাদের ভূমি দখল করে তার নাম দেয় রোডেশিয়া। ১৮৯০ সালে ইতালীয়রা ইরিত্রিয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। তারা আবিসিনিয়াও (বর্তমান ইথিওপিয়া) দখলে নিতে চেয়েছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়। ১৮৯১ সালে জার্মানি তাংগানিকা (বর্তমান তানজানিয়া) দখলে নেয়। ফরাসিরা আলজেরিয়ার উত্তরাংশকে ফ্রান্সের উপনিবেশে পরিণত করে। ১৮৯৩ সালে ফরাসিরা মালি দখল করে। ১৮৯৪ সালে উগান্ডা ব্রিটিশ শাসনাধীন অঞ্চলে পরিণত হয়। ১৮৯৫ সালে কেনিয়ারও একই পরিণতি ঘটে এবং এটি পূর্ব আফ্রিকান রক্ষিত অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি পায়। ১৮৯৯ সালে দক্ষিণ আফ্রিকাতে ব্রিটিশ এবং স্থানীয় শ্বেতাঙ্গ বুরদের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। ১৯১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা সংযুক্তরাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯১১ সালে ব্রিটিশদের অধীন রোডেশিয়াকে ভেঙে উত্তর রোডেশিয়া (বর্তমান জাম্বিয়া) ও দক্ষিণ রোডেশিয়া (বর্তমান জিম্বাবুয়ে) গঠন করা হয়। ১৯১২ সালে মরক্কোকে ভেঙে এক অংশ ফ্রান্স ও অপরংশ স্পেনের অধীনে নিয়ে আসা হয়।

এই যুদ্ধগুলিতে হাজার হাজার আফ্রিকান মারা যায়। যারা বেঁচে ছিল, তাদের ঐতিহ্যবাহী জীবনধারণ পদ্ধতি ধ্বংস হয়ে যায়, ফলে তাদের অনেক ক্ষুধা ও কষ্টের মধ্যে পড়তে হয়। কিছু আফ্রিকানকে খনিতে সস্তা শ্রমিক হিসেবে বা কৃষি খামারের কর্মী হিসেবে জোর করে কাজ করানো হয়। তারা ইউরোপে রপ্তানির জন্য তুলা, চা, কফি ও কোকো উৎপাদন করত। ইউরোপীয়রা তাদের উপনিবেশগুলির সুবিধাজনক স্থানে খামার শুরু করে এবং সড়ক ও রেলপথ নির্মাণ করে। যেসমস্ত ইউরোপীয় উপনিবেশগুলির পরিচালনার মান উন্নত ছিল, সেখানে স্থানীয় জনগণের জন্য বিদ্যালয় ও চিকিৎসাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। কিন্তু যেসমস্ত ইউরোপীয় উপনিবেশের পরিচালনার মান খুবই নিম্ন ছিল, সেখানে আফ্রিকানদেরকে ক্রীতদাসের চেয়ে খুব বেশি মর্যাদা দেওয়া হত না। ইউরোপীয় শাসনের অধীনে আফ্রিকানরা নতুন নতুন ধ্যানধারণার সাথে পরিচিত হলেও তাদের জীবনধারা কীভাবে পরিচালিত হবে, সে ব্যাপারে তাদের কোন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

সমসাময়িক যুগ (বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধ)[সম্পাদনা]

নারীদের ভোটাধিকার[সম্পাদনা]

১৭৯২ সালে ম্যারি ওলস্টোনক্রাফ্‌ট তাঁর আ ভিন্ডিকেশন অফ দা রাইটস অফ উইমেন (১৭৯২) নামক গ্রন্থে নারীদের ভোটাধিকার নিয়ে কথা বলেছিলেন। ১৮৩০-এর দশকে যেসমস্ত দল রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য আন্দোলন করছিল, তাদের মূল লক্ষ্য ছিল সমস্ত পুরুষের জন্য ভোটাধিকার অর্জন; এতে নারীদের কোন স্থান ছিল না। কিন্তু ১৯শ শতকের মাঝামাঝি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি আন্দোলন শুরু হয়, যার লক্ষ্য ছিল সারা বিশ্বে নারীদের ভোটাধিকার অর্জন করা। ১৮৪৮ সালে নিউ ইয়র্কের সেনেকা ফল্‌স শহরে তাদের প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এরপর আরও অনেকবার এই বিষয়ে জনসমক্ষে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রায়শই তাদেরকে চরম বিরোধিতার শিকার হতে হয়। এই সম্মেলনগুলিতে প্রধান বক্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সোজোর্নার ট্রুথ এবং হ্যারিয়েট টাবম্যান, যারা উভয়েই ক্রীতদাস হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

সকল বিরোধিতা উপেক্ষা করে নারীদের ভোটাধিকার অর্জনের আন্দোলনটি ক্রমাগত শক্তিশালী হতে শুরু করে। ১৮৯০ সালে ওয়াইয়োমিং প্রথম মার্কিন অঙ্গরাজ্য হিসেবে স্থানীয় নির্বাচনগুলিতে নারীদের ভোটপ্রদানের অধিকার অনুমোদন করে। এর তিন বছর পরে ১৮৯৩ সালে নিউজিল্যান্ড বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে জাতীয় নির্বাচনে নারীদের ভোটাধিকার স্বীকার করে। নারীদের এই বিজয়ে উদ্বুদ্ধ হয়ে যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন নারী ভোটাধিকার সংস্থাগুলি ১৮৯৭ সালে একতাবদ্ধ হয়ে ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ উইমেন্‌স সাফ্রেজ সোসাইটিস (National Union of Women's Suffrage Societies, "নারীদের ভোটাধিকার দাবীকারী সমাজগুলির ইউনিয়ন") গঠন করে। ১৯০২ সালে অস্ট্রেলিয়া নারীদের ভোটাধিকার দেয়। প্রথমদিকে ব্রিটিশ নারীভোটাধিকার সংস্থাগুলি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু ১৯০৩ সালে এমেলিন পাংকহার্স্ট একটি নতুন সমিতি গঠন করেন, যার নাম ছিল “উইমেন্‌স সোশাল অ্যান্ড পলিটিকাল ইউনিয়ন” (Women’s Social and Political Union বা WSPU)। এই সমিতিটি কথার বদলে কাজের উপর বেশি জোর দিত। WSPU মিছিল করত এবং নারীদের অধিকারের অভাবের জন্য প্রয়োজনে সম্পত্তির ধ্বংসসাধন করত। ১৯০৫ সালে যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মত নারী ভোটাধিকার আন্দোলনকর্মী দুই নারীকে কারাবন্দী করা হয়। পরবর্তীতে সমিতির আরও অনেক সদস্যকে কারাবন্দী করা হয়। সেখানেও তারা অনশন পালনের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্যের প্রতি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করত। ১৯০৬ সালে ফিনল্যান্ডে নারীদের ভোটাধিকার দেওয়া হয় এবং ১৯০৭ সালে ফিনীয় সংসদীয় আইনসভাতে প্রথমবারের মত নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

১৯১৩ সালে যুক্তরাজ্যের নারী ভোটাধিকার আন্দোলনকর্মী এমিলি ডেভিডসন ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার সময় রাজার ঘোড়ার সামনে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মাহুতি দেন। ঐ বছর নরওয়ে নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করে। ১৯১৪ সালে ১ম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে বহু ব্রিটিশ নারী পুরুষদের ছেড়ে যাওয়া কাজ সম্পাদন করেন এবং প্রমাণ করেন যে তারা ঐ সব আপাতদৃষ্টিতে পুরুষালি কাজে সমান পারদর্শী। ১৯১৭ সালে রাশিয়াতে সব নারীদের ভোটাধিকার দেওয়া হয়। ১৯১৮ সালে যুক্তরাজ্যে ৩০ বছরের বেশি বয়সী সব নারীকে ভোটাধিকার দান করা হয় (পুরুষেরা ২১ বছর বয়স থেকেই ভোট দিতে পারতেন); ঐ বছর কানাডাতে নারীদেরকে পুরুষদের সমমর্যাদায় ভোটাধিকার দেওয়া হয়। ১৯১৯ সালে জার্মানি, অস্ট্রিয়া, পোল্যান্ড এবং চেকোস্লোভাকিয়া সবাই নারীদের ভোটাধিকার প্রদান করে। ১৯২০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমস্ত নারীকে ভোটাধিকার দেওয়া হয়। ১৯২৮ সালে ব্রিটিশ নারীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের ন্যূনতম বয়স কমিয়ে ২১ করা হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ[সম্পাদনা]

ইউরোপের কয়েকটি দেশের মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক বিবাদের জের ধরে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এরপর এটি মহাসমুদ্রে, মধ্যপ্রাচ্যে ও শেষে আফ্রিকাতে ছড়িয়ে পড়ে। ১৯১৪ সাল থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত সংঘটিত এই বিশ্বযুদ্ধে ৮৫ লক্ষেরও বেশি সৈন্য মারা যায়। এদের বেশিরভাগই দুর্বিষহ পরিখা যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করে। যুদ্ধটি এতই ভয়াবহ ছিল যে পরবর্তীতে লোকেরা বলেছিল যে এটি ছিল এক “মহাযুদ্ধ”, যে যুদ্ধ “সব যুদ্ধের শেষ যুদ্ধ”।

১৮৮০ থেকে ১৯০৭ সালের মধ্যবর্তী সময়ে ইউরোপীয় শক্তিগুলি নিজেদের মধ্য একাধিক মৈত্রী গঠন করে এবং তাদের স্থল সেনাবাহিনী ও নৌবাহিনীর সামর্থ্য বৃদ্ধি করতে থাকে। একদিকে ছিল যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়াজাপান নিয়ে গঠিত “মিত্রশক্তি”; এবং অপর দিকে ছিল “কেন্দ্রীয় শক্তি” বা অক্ষশক্তি যার সদস্যরা ছিল জার্মানি, অস্ট্রিয়া-হাঙ্গেরি, তুরস্ক এবং সার্বিয়াইতালি পরবর্তীতে মিত্রশক্তিতে যোগদান করে। ১৯১৪ সালের জুন মাসে গাভরিলো প্রিন্সিপ নামের একজন সার্বীয় নাগরিক সারায়েভো শহরে অস্ট্রীয় মহাডিউক ফ্রান্‌ৎস ফের্ডিনান্ডকে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডটিই ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভকারী স্ফুলিঙ্গ। ২৮শে জুলাই অস্ট্রিয়া সার্বিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। রাশিয়া সার্বিয়াকে রক্ষা করার প্রস্তুতি নিতে শুরু করে। জার্মানি প্রথমে রাশিয়া ও পরে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর পরে ইউরোপের শক্তিগুলি একে একে ধারাবাহিকভাবে যুদ্ধের আয়োজন শুরু করে দেয়। ১৯১৪ সালের ৪ঠা আগস্ট জার্মান সেনারা বেলজিয়াম আক্রমণ করে। এর ফলে ১৮৩০ সাল থেকে বেলিজিয়ামের মিত্র যুক্তরাজ্য যুদ্ধে যোগ দেয়। ২৬শে আগস্ট জার্মান সেনারা টানেনবের্গের যুদ্ধে রুশ বাহিনীকে পরাজিত করে। ১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্নের যুদ্ধে মিত্রবাহিনী প্যারিসের দিকে জার্মান সেনাবাহিনীর অগ্রযাত্রা রুখতে সক্ষম হয়। নভেম্বর মাসে ইপ্রের প্রথম যুদ্ধে ইংলিশ চ্যানেল সমুদ্রপ্রণালীতে জার্মান বাহিনীকে পৌঁছাতে বাধা দেওয়া হয়। ১৯১৫ সালের মে-জুন মাসে ইপ্রের দ্বিতীয় যুদ্ধে জার্মান সেনারা প্রথমবারের মত বিষাক্ত গ্যাস ব্যবহার করে। ১৯১৫ সালের ২২শে মে ইতালি মিত্রশক্তিতে যোগ দেয়। ১৯১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ফ্রান্সের ভেরদাঁ শহরে যুদ্ধ শুরু হয়, যা পাঁচ মাস ধরে চলে। ১৯১৬ সালের ১লা জুলাই সমের যুদ্ধ শুরু হয়, যা নভেম্বরে গিয়ে শেষ হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের প্রায় পুরোটাই স্থলভাগে সংঘটিত হয়েছিল। কেবল ১৯১৬ সালে জুটলান্ডে একটি বড় আকারের নৌযুদ্ধ সংঘটিত হয়। যুদ্ধের পশ্চিম মঞ্চের প্রায় পুরোটাই উত্তর ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের মাটিতে ঘটে। বাল্টিক সাগর থেকে কৃষ্ণ সাগর পর্যন্ত এলাকাগুলি ছিল পূর্ব রণমঞ্চ। এছাড়া ইতালি-অস্ট্রিয়া সীমান্ত, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যেও যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

ঘোড়া ও খচ্চর ব্যবহার করে সৈনিকদের জন্য খাদ্য ও অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করা হত। উভয় পক্ষই পরিখা খনন করে যুদ্ধে রত হয়। পরিখাগুলি ছিল ঠান্ডা, কর্দমাক্ত, ভেজা ও অস্বাস্থ্যকর। এগুলিতেই সেনারা খেত ও ঘুমাত এবং উপর থেকে নির্দেশ আসলে যুদ্ধে বের হত। অনেকসময় তারা শত্রুদের ছোঁড়া গোলার আক্রমণ থেকে রক্ষা পাবার জন্য ভূগর্ভে গর্ত বা বাংকার বানিয়ে সেখানে আশ্রয় নিত। কোন সেনাবাহিনীর পক্ষেই বিশাল ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া ছাড়া সম্মুখে অগ্রসর হওয়া সম্ভব ছিল না। সেনাদেরকে পরিখা থেকে বেরিয়ে এসে উপরে উঠে নিজেদের বসানো তারকাঁটার বেড়া অতিক্রম করে খোলা মাঠ (জনহীন ভূমি) পার হয়ে শত্রুপক্ষের শিবিরে পৌঁছাতে হত। মেশিনগান এবং ভারী আর্টিলারি কামানগুলি এত দ্রুত ও শক্তিশালী ছিল যে একেকবারে হাজার হাজার সেনা মৃত্যুবরণ করত। ১৯১৬ সালে কেবল সমের যুদ্ধেই ১০ লক্ষ সৈনিক মারা যায়।

১৯১৭ সালে রাশিয়া এত দুর্বল হয়ে পড়ে যে তারা জার্মানির সাথে শান্তিচুক্তির ব্যাপারে আলোচনা শুরু করে। এসময় কিছু সময়ের জন্য জার্মানি সুবিধাজনক অবস্থানে ছিল। একই বছরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মিত্রশক্তির পক্ষ নিয়ে যুদ্ধে যোগদান করে। ১৯১৭ সালের জুলাই মাসে ইপ্রের তৃতীয় যুদ্ধটি সংঘটিত হয়। ১৯১৮ সালে প্রায় ১০ লক্ষ মার্কিন সেনা মিত্রশক্তির শিবিরে যোগদান করলে মিত্রশক্তিরা সামনের দিকে এগোতে থাকে। অন্যদিকে জার্মানিতে খাদ্যাভাব ও অশান্তির সৃষ্টি হয়। সম্রাট দ্বিতীয় ভিলহেল্‌ম সিংহাসন ছেড়ে দেন। ১৯১৮ সালের ৩রা মার্চ রাশিয়া ও জার্মানির মধ্যে যুদ্ধবিরতি হয়। ১৯১৮ সালের ১১ই নভেম্বর সকাল ১১টায় জার্মানি এবং মিত্রশক্তির দেশগুলি যুদ্ধে বিরতি দেয় ও একটি সমাপনী শান্তিচুক্তিতে স্বাক্ষর করে। ফলে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে প্রথমবারের মত কোন যুদ্ধে যুদ্ধবিমানের ব্যাপক ব্যবহার করা হয়। প্রথমে এগুলিকে শত্রুদের পরিখা ও শত্রুসেনাদের গমনাগমন গোপনে নজরদারি করার জন্য ব্যবহার করা হত। পরবর্তীতে এগুলিকে আকাশযুদ্ধ এবং বোমাবর্ষণের কাজেও ব্যবহার করা হয়।

রুশ বিপ্লব[সম্পাদনা]

১৯শ শতকে রাশিয়াকে আধুনিকীকরণের লক্ষ্যে চাষীদেরকে মুক্ত করে দেওয়া হয়, কলকারখানা নির্মাণ করা হয় এমনকি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাও প্রচলন করা হয়, কিন্তুর এ উদ্দেশ্য সফল হয় নি। রুশ জার বা সম্রাট ২য় আলেকজান্ডার সংস্কার সাধন করলেও ১৮৮১ সালে তাঁকে হত্যা করা হয়। তাঁর পুত্র সম্রাট ৩য় আলেকজান্ডার ক্ষমতায় আসার পর পূর্বের সমস্ত সংস্কার রদ করে দেন। ফলে কিছু রুশ বেপরোয়া হয়ে বিপ্লবের সূত্রপাত ঘটায়।

ভ্লাদিমির ইলিয়িচ উলিয়ানর, যিনি লেনিন নামেই বেশি পরিচিত, ১৮৮৭ সালে একজন মার্ক্সবাদীতে পরিণত হন। তিনি ১৮৯৮ সাল থেকে বলশেভিকদের নেতায় পরিণত হন। পরবর্তীতে তিনি রুশ বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।

১৯০৫ সালে রাশিয়ার রাজধানী সাংত পিতেরবুর্গ বা সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরে দুই লক্ষ লোক শীতকালীন প্রাসাদের সামনে মিছিল সমাবেশ করে। সেসময় সেনাবাহিনীর সদস্যরা ধর্মঘটরত শ্রমিকদের উপর গুলিবর্ষণ করলে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহটি শুরু হয়, যা খুব শীঘ্রই দমন করা হয়। লেনিনসহ বিদ্রোহের অন্য নেতারা নির্বাসনে যান। লেনিন ১৯০৫ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত নির্বাসনে ছিলেন। সেসময় রাশিয়ার নতুন সম্রাট ২য় নিকোলাস জনগণকে আরও বেশি নাগরিক অধিকার ও সুবিধা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু শীঘ্রই তিনি এই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রাশিয়ার বেশিরভাগ জনগণের জীবনের মান মন্দ থেকে মন্দতর হতে থাকে। রেলপথে শহরগুলিতে খাদ্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। অর্থনীতি প্রায় ধ্বসে পড়ে ও দুর্ভিক্ষের সৃষ্টি হয়। অনেক রুশ রাসপুতিনকে অভিযুক্ত করে এই বলে যে তার কারণেই সম্রাট জনগণের অভিযোগ অগ্রাহ্য করেন। রাসপুতিন ছিলেন একজন ধর্মযাজক; তিনি দাবী করেন যে সম্রাটের অসুস্থ পুত্রকে তিনি সারিয়ে তুলতে পারবেন। ১৯১৭ সালে মার্চ মাসে আবার দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। এবার সেনাবাহিনীও দাঙ্গাকারী জনগণের পক্ষ নেয়। সম্রাট নিকোলাস ও তাঁর মন্ত্রীরা পদত্যাগ করেন। আলেকজান্ডার কেরেন্‌স্কির নেতৃত্বে একটি অস্থায়ী প্রজাতান্ত্রিক সরকার গঠন করা হলেও অশান্তি অব্যাহত থাকে। ১৯১৭ সালে লেনিন রাশিয়াতে ফেরত আসেন এবং তাঁর নেতৃত্বে বলশেভিকেরা রাষ্ট্রযন্ত্র দখল করার পরিকল্পনা করেন। নভেম্বর মাসে বিপ্লবীরা সাংত পিতেরবুর্গের শীতকালীন প্রাসাদে আক্রমণ করে এবং রাশিয়ার ক্ষমতা দখল করে। রাশিয়াতে তখন ভিন্ন একটি পঞ্জিকা ব্যবহৃত হত বলে এই ঘটনাটিকে "অক্টোবর বিপ্লব" নামে আখ্যা দেওয়া হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ক্লান্ত রুশ সেনারাও বলশেভিকদের সমর্থন দেয়। রাজপরিবারের সবাইকে (সম্রাট নিকোলাস, তাঁর স্ত্রী আলেকজান্দ্রা এবং তাদের পাঁচ সন্তান) প্রথমে কারাবন্দী করা হয় ও পরে তাদের মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা হয়।

বলশেভিকেরা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোতে সরিয়ে নিয়ে আসে। তারা জার্মানির সাথে শান্তিচুক্তি সম্পাদন করে ও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে রাশিয়াকে প্রত্যাহার করে নেয়। তারা বিশালাকার জমিদারিগুলিকে ভেঙে ফেলে এবং দরিদ্র চাষীদেরকে জমি বন্টন করে দেয়। শ্রমিকেরা কলকারখানার দায়িত্ব নেয় এবং রাষ্ট্র ব্যাংকব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেয়। ১৯১৮ সালে বলশেভিক লোহিতবাহিনী এবং সাম্যবাদ-বিরোধী শ্বেতবাহিনীর মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয় যা ১৯২০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ১৯২১ সালে বলশেভিকেরা যুদ্ধে বিজয় লাভ করে। এর পরের বছর ১৯২২ সালে রুশ সাম্রাজ্যের নাম বদলে সোভিয়েত সাম্যবাদী প্রজাতন্ত্রগুলির ইউনিয়ন তথা সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯২৪ সালে লেনিন মৃত্যুবরণ করেন। এসময় লেনিনের পরেই আরেক বলশেভিক নেতা লেওন ত্রোত্‌স্কি ছিলেন রাশিয়ার ২য় সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। কিন্তু লেনিনের মৃত্যুর পর স্তালিন ক্ষমতা দখল করলে ত্রোত্‌স্কি নির্বাসনে যান এবং পরে তাঁকে বিদেশেই স্তালিনের চরেরা হত্যা করে। স্তালিন একনায়কতান্ত্রিক পদ্ধতিতে রাশিয়া শাসন করেন। তাঁর শাসনামলে লক্ষ লক্ষ ভিন্ন মতাবলম্বীকে হত্যা করা হয় বা বন্দীশিবিরে পাঠানো হয়, যেখানে তারা মারা যায়।

আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতা[সম্পাদনা]

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী শান্তি[সম্পাদনা]

সোভিয়েত রাশিয়া[সম্পাদনা]

মহামন্দা[সম্পাদনা]

ফাশিবাদের উত্থান[সম্পাদনা]

স্পেনের গৃহযুদ্ধ[সম্পাদনা]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ[সম্পাদনা]

ইহূদী গণহত্যা[সম্পাদনা]

ভারত ও পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভ[সম্পাদনা]

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারতীয় উপমহাদেশ (বর্তমানের সার্কভুক্ত দেশগুলি) ছিল বিশ্বের বৃহত্তম উপনিবেশ। ১৮৫৮ সাল থেকে এটি সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। কিন্তু ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণ স্বাধীনতা চাচ্ছিল। ১৮৮৫ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠন করা হয়। ১৮৮৭ সালে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী আইন পড়তে লন্ডনে যান এবং ১৮৯৩ সাল থেকে দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯০৫ সালে ভারতীয় মুসলিম লীগ গঠন করা হয়। ১৯১৭ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস স্বশাসনের জন্য আন্দোলন শুরু করে। কিন্তু যুক্তরাজ্য এ ব্যাপারে আগ্রহী ছিল না। ১ম বিশ্বযুদ্ধে ভারতীয় সৈনিকদের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ব্রিটিশ সরকার ১৯১৯ সালে ভারত সরকার অ্যাক্ট নামক অধ্যাদেশ পাস করে। এর ফলে কিছু সংস্কার সাধিত হলেও ক্ষমতার সিংহভাগ যুক্তরাজ্যের হাতে থেকে যায়। একই বছরে অমৃতসরে ব্রিটিশ সেনারা ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদরত জনতার উপর গুলিবর্ষণ করে এবং এতে প্রায় ৪০০ লোকের মৃত্যু হয়। ভারতের স্বাধীনতার আন্দোলন আরও জোরদার হতে থাকে। ১৯২০ সাল নাগাদ মোহনদাস করমচান্দ গান্ধী (যাকে পরবর্তীতে “মহাত্মা” গান্ধী উপাধি দেওয়া হয়) ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের নেতায় পরিণত হন। তিনি ব্রিটিশদের সাথে অসহযোগিতার নীতি প্রবর্তন করেন এবং তাঁকে বেশ কয়েকবার কারাবন্দী করা হয়। কারাগারে বসে তিনি অনশন করে তাঁর আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। ১৯৩০ সালে গান্ধীর নেতৃত্বে বহু হাজার লোক লবন পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করে এবং অত্যধিক করযুক্ত লবন ক্রয় করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। ১৯৩৪ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতীয় মুসলিম লীগের সভাপতি পদে উন্নীত হন। ১৯৪৫ সালে ব্রিটিশ সরকার ভারতের স্বাধীনতার ব্যাপারে রাজী হয়। ভারতীয় উপমহাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হিন্দু ধর্মাবলম্বী ছিল। কিন্তু মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ভারতে বসবাসকারী বহুসংখ্যক মুসলমানদের জন্য একটি আলাদা রাষ্ট্রের জন্য আন্দোলন শুরু করেন, যেখানে মুসলমানদেরকে হিন্দুদের অধীনে শাসিত হতে হবে না। ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট ভারতীয় উপমহাদেশের উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বের দুইটি অঞ্চল স্বাধীন পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যার সর্বাধিনায়ক ছিলেন জিন্নাহ। ঠিক তার পরের দিন ১৫ই অগাস্ট ভারতীয় উপমহাদেশের বাকী অংশ ভারত নামক রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হয়, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু। তাৎক্ষনিকভাবে ভারতের সর্বত্র দাঙ্গা-হাঙ্গামা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। কোটি কোটি মানুষ ভারত থেকে পাকিস্তানে এবং পাকিস্তান থেকে ভারতের দিকে অভিবাসন শুরু করে। এই অত্যন্ত বিশৃঙ্খল, সংঘর্ষময় প্রক্রিয়াতে লক্ষ লক্ষ লোক মারা যায়। ১৯৪৮ সালে শ্রীলংকা স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তান পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। মহাত্মা গান্ধী দিল্লিতে এক শান্তি সমাবেশ চলাকালীন সময় একজন হিন্দু উগ্রবাদীর দ্বারা নিহত হন।

নেহেরু ও সমাজতান্ত্রিক গণতন্ত্র
নেহেরু পরবর্তী পর্ব
ইন্দিরা গান্ধী ও রাজীব গান্ধী
অযোধ্যার মসজিদ ধ্বংস ও বিজেপি-র উত্থান
বেনজির ভুট্টোকে ক্ষমতা থেকে অপসারণ ও পাকিস্তানে সামরিক শাসন

ফিলিস্তিন ও ইসরায়েল[সম্পাদনা]

জেরুজালেম শহর ও তার আশেপাশের এলাকাগুলি প্রাচীন যুগে ইহুদী বা হিব্রুভাষীদের বাসভূমি ছিল। সময়ের সাথে ইহুদীদেরকে বিভিন্ন শাসকগোষ্ঠী তাদের মূল ভূখন্ড থেকে বিতাড়িত করে। ১৯শ শতকের শেষে এসে বেশিরভাগ ইহুদী ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়াতে বসবাস করত। অন্যদিকে বহু আগেই ইহুদীদের প্রাচীন বাসভূমিটির নাম বদলে ফিলিস্তিন রাখা হয় এবং এটি বহু শতাব্দী ধরে আরব মুসলমানদের বাসভূমিতে পরিণত হয়। ২০শ শতকের শুরুতে এটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের একটি অংশ ছিল। কিন্তু ইউরোপীয় ইহুদীরা বহু হাজার বছর পরে তাদের আদি বাসভূমিতে ফেরত যাওয়ার চেষ্টা করলে বিদ্যমান আরব জনগোষ্ঠীর সাথে তাদের এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের সৃষ্টি হয়। ফিলিস্তিনে বসবাসরত বেশির ভাগ অধিবাসীই ছিল আরব। ১৮৮০-র দশকে স্বল্পসংখ্যক ইউরোপীয় ইহুদী ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন করতে শুরু করে। ১৮৮২ সালে প্রথম বসতিটি গঠিত হয়। এই ইহুদীদেরকে জায়নবাদী বলে ডাকা হত। ১৯১৭ সালে বালফুর ঘোষণার মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে একটি ইহুদী বাসভূমি স্থাপনের ব্যাপারে তাদের সমর্থন জানায়। ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের প্রেক্ষিতে তুর্কি উসমানীয় সাম্রাজ্যে ভাঙন ধরে। ১৯২০ সালে সেভ্‌রের চুক্তিতে উসমানীয় সাম্রাজ্যের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়। নবগঠিত লিগ অফ নেশন্‌স ১৯২২ সালে যুক্তরাজ্যকে সাময়িকভাবে স্বল্পমেয়াদের জন্য ফিলিস্তিন পরিচালনার অনুমোদন বা ম্যান্ডেট দেয়। ১৯২০-এ দশকে ইহুদীরা ফিলিস্তিনে বসতি স্থাপন অব্যাহত রাখে এবং ১৯২৯ সালে ইহুদী ও আরবদের মধ্যে প্রথম বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটে। ১৯৩০-এর দশকে, বিশেষ করে ১৯৩৩ সালের পর থেকে জার্মানিতে সেখানকার ইহুদীদের উপর অত্যাচার নির্যাতন শুরু হয়। কারাবন্দিত্ব বা মৃত্যু এড়াতে যেসব ইহুদীদের সামর্থ্য ছিল তারা জার্মানি পরিত্যাগ করা শুরু করে। কিছু ইহুদী অন্যান্য ইউরোপীয় রাষ্ট্র বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায়। অন্যান্য ইহুদীরা ফিলিস্তিনের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। ফিলিস্তিনের ইহুদী অভিবাসীদের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ার সাথে সাথে স্থানীয় আরবদের সাথে তাদের সংঘর্ষের সংখ্যা ও মাত্রাও বাড়তে থাকে। যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনে ইহুদী অভিবাসীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে।

২য় বিশ্বযুদ্ধের পরে আরও অনেক ইহুদী ফিলিস্তিনে অভিবাসনে আগ্রহী হয়। যুক্তরাজ্য বিষয়টি জাতিসংঘে উত্থাপন করে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে ফিলিস্তিনকে ভেঙে দুইটি রাষ্ট্র গঠন করা হবে যার একটি আরব এবং অন্যটি ইহুদী। জেরুজালেম একটি আন্তর্জাতিক শহরে পরিণত হবে, কেননা এটি ইহুদী, খ্রিস্টানমুসলমান সবার জন্যই একটি পবিত্র নগরী। ইহুদীরা জাতিসঙ্ঘের এই প্রস্তাবে রাজী হলেও আরবরা রাজী ছিল না। যুক্তরাজ্য ১৯৪৮ সালের ১৪ই মে তার নিয়ন্ত্রণ উঠিয়ে নেয় এবং একই দিনে ইহুদী নেতা দাভিদ বেন গুরিয়ন (ইসরায়েলের ১ম প্রধানমন্ত্রী ও জাতির জনক) ইসরায়েল রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। আরব রাষ্ট্রসমূহের সংগঠন আরব লীগ (সিরিয়া, লেবানন, ইরাক, ইরান, জর্দানমিশর) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু ইসরায়েল খুব দ্রুত তাদের সম্মিলিত সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে এবং আগের চেয়ে বেশি ভূমি দখল করে নিতে সক্ষম হয়। জেরুজালেমের অংশবিশেষ জর্দানের দখলে আসে। ১৯৪৯ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ঘটে এবং এর ফলে ইসরায়েল ১৯৪৭ সালের প্রস্তাবে উল্লিখিত ইহুদী রাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা লাভ করে। ১৯৬৭ সালে আরেকটি যুদ্ধে ইসরায়েল সমগ্র জেরুজালেম পুনরায় দখলে আনতে সক্ষম হয় এবং শহরটিকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে ঘোষণা দেয়। আরব দেশগুলি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়নি। ইসরায়েলও যুদ্ধে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূমি ফেরত দেওয়ার ব্যাপারে সদিচ্ছা প্রকাশ করেনি।

সমসাময়িক যুগ (বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ)[সম্পাদনা]

জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

ঠান্ডা যুদ্ধ[সম্পাদনা]

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধশেষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন বিশ্বের দুই পরাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। অতীতে মিত্র হলেও তাদের মধ্যে এক ধরনের প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরোক্ষ যুদ্ধ শুরু হয়, যার নাম দেওয়া হয় ঠান্ডা যুদ্ধ। সোভিয়েত ইউনিয়ন লোহিত বাহিনীর সাহায্যে পূর্ব ইউরোপের দেশগুলির সরকার পরিবর্তন করে সাম্যবাদী সরকার গঠন করালে এই ঠান্ডা যুদ্ধের সূচনা হয়। এর ফলে কার্যত ইউরোপে একটি লৌহপর্দার সৃষ্টি হয়, যার একপাশে ছিল মার্কিন প্রভাব-বলয়ভুক্ত পশ্চিম ইউরোপ এবং অপর প্রান্তে ছিল সোভিয়েত প্রভাবাধীন পূর্ব ইউরোপ। সাম্যবাদ যেন পশ্চিম ইউরোপেও ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৭ সালে "মার্শাল পরিকল্পনা" নামের একটি প্রকল্প হাতে নেয়, যেখানে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলির অর্থনীতিকে চাঙা করতে অর্থনৈতিক সাহায্যের ব্যবস্থা করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে জার্মানিকে বিভিন্ন মিত্রশক্তির মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যফ্রান্স দেশটির পশ্চিমভাগ নিয়ন্ত্রণ করত; অন্যদিকে দেশটির পূর্বভাগ নিয়ন্ত্রণ করত সোভিয়েত ইউনিয়ন। দেশটির রাজধানী বার্লিন শহরের পুরোটাই সোভিয়েত নিয়ন্ত্রিত অংশে পড়লেও সেটিও পশ্চিম ও পূর্ব এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। ১৯৪৮ সালে সোভিয়েতরা ৫ মাস ধরে পশ্চিম বার্লিন অবরোধ করে রাখে; তখন মিত্রশক্তিরা বিমানে করে প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করে। ১৯৪৯ সালে জার্মানি পূর্ব ও পশ্চিম দুই জার্মানিতে বিভক্ত হয়ে যায়। অনেক পরে ১৯৬১ সালে পূর্ব বার্লিনের সাম্যবাদীরা দুই বার্লিনের মধ্যে প্রাচীর নির্মাণ করে।

১৯৪৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল উত্তর আটলান্টিক চুক্তিভিত্তিক সংস্থা তথা নেটো (North Atlantic Treaty Organization, NATO) প্রতিষ্ঠিত হয়; এর সদর দপ্তর বেলজিয়ামের ব্রাসেল্‌সে অবস্থিত ছিল। এটি ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং বেশ কিছু পশ্চিম ইউরোপীয় রাষ্ট্রের মধ্যে যেকোন বহিরাক্রমণ প্রতিরোধের জন্য সৃষ্ট একটি সামরিক মৈত্রী। একই বছরে চীনের মূল ভূখন্ডে মাও সে তুংয়ের নেতৃত্বে সাম্যবাদীরা ক্ষমতায় আরোহণ করে। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত কোরীয় যুদ্ধ শুরু হয়। চীনের মদদে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়াকে আক্রমণ করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ কোরিয়াকে সামরিক সমর্থন দেয়। ১৯৫৩ সালে সোভিয়েত নেতা স্তালিনের মৃত্যু হয়। ১৯৫৫ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সাম্যবাদী রাষ্ট্রগুলির সাথে মিলে একটি মৈত্রী গঠন করে, যার নাম ছিল ওয়ারস’ চুক্তি। মার্কিন ও সোভিয়েত দুই পরাশক্তিই পারমাণবিক অস্ত্রশস্ত্রের এক বিশাল ভাণ্ডার গড়ে তোলে। ১৯৫৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সন্নিকটে অবস্থিত রাষ্ট্র কিউবাতে ফিদেল কাস্ত্রো একনায়ক হিসেবে ক্ষমতায় আসেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে মৈত্রী স্থাপন করেন। এর সূত্র ধরে ১৯৬২ সালে আরেকটি সংকটের সৃষ্টি হয়। সে বছর কাস্ত্রো তাঁর দেশে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষপণকেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডি মার্কিন নৌবাহিনীকে কিউবাকে অবরোধের আদেশ দেন। শেষ পর্যন্ত সোভিয়েতরা ক্ষেপণাস্ত্রকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পটি প্রত্যাহারে সম্মত হয়। পারমাণবিক যুদ্ধ যাতে শুরু না হয়, সেজন্য সোভিয়েত নেতা নিকিতা ক্রুশ্চেভের আদেশে ক্ষেপণাস্ত্রবহনকারী সোভিয়েত জাহাজগুলি ফেরত নিয়ে আসা হয়। অন্যদিকে ১৯৬০ সাল থেকে রুশ-চীনা সম্পর্কে ফাটল ধরা শুরু হয়।

ঠান্ডা যুদ্ধের সময় মার্কিন ও সোভিয়েত দুই পরাশক্তিই অস্ত্র নির্মাণের পেছনে বিশাল অংকের অর্থ খরচ করে। যদিও তারা নিজেদের মধ্যে কখনও যুদ্ধ করেনি, ১৯৫০-এর দশকে কোরীয় যুদ্ধে এবং ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অংশ নেয়। এছাড়াও বহু দশক ধরে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি ও নেতিবাচক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণায় লিপ্ত ছিল। পূর্ব ইউরোপের সাম্যবাদী রাষ্ট্রগুলিতে যেকোন প্রকার বিদ্রোহ সোভিয়েতরা শক্ত হাতে দমন করে। যেমন সোভিয়েতরা সাম্যবাদী শাসন বজায় রাখার জন্য ১৯৫৬ সালে হাঙ্গেরিতে এবং ১৯৬৮ সালে চেকোস্লোভাকিয়াতে সেনা অভিযান চালায়। ১৯৬৩ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষা বাতিলের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে।

মার্শাল পরিকল্পনা[সম্পাদনা]

উপনিবেশবাদের সমাপ্তি[সম্পাদনা]

মহাকাশ প্রতিযোগিতা[সম্পাদনা]

১৯৪০-এর দশকে জার্মান বিজ্ঞানীরা প্রথম দূর-নিয়ন্ত্রিত ক্ষেপণাস্ত্র নির্মাণ করে। তারা এ জন্য যে প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল, তা দিয়ে মহাকাশে ভ্রমণের দ্বার উন্মোচন হয়। এরই প্রেক্ষিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মহাকাশ প্রতিযোগিতার সূচনা হয়।

১৯৫৭ সালের ৪ঠা অক্টোবর সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাশূন্যে বিশ্বের সর্বপ্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপ করে, যার নাম ছিল স্পুতনিক ১। উপগ্রহটি ঘণ্টায় ২৮ হাজার কিলোমিটার বেগে ৯৬ মিনিটে একবার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করত এবং একটি বেতার সংকেত প্রেরণ করতে থাকে যা বিশ্বের সর্বত্র গৃহীত হয়। এরপরে স্পুতনিক ২ নামক উপগ্রহে করে লাইকা নামের কুকুরটি প্রথম প্রাণী হিসেবে মহাশূন্যে ভ্রমণ করে; মহাকাশযানটি পৃথিবীতে ফেরত আসতে পারেনি, ফলে মহাশূন্যেই লাইকার মৃত্যু ঘটে। ঠিক তার পরের বছরই ১৯৫৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ এক্সপ্লোরার ১ উৎক্ষেপন করে। দুই পক্ষই মহাকাশ বিজ্ঞানের পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে। ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত মহাশূন্য অনুসন্ধান উপগ্রহ লুনা ২ চাঁদে অবতরণ করে। ১৯৬১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বপ্রথম মানুষ পরিবহনকারী মহাকাশযান ভোস্তক ১ আকাশে উৎক্ষেপ করে। সোভিয়েত ইউরি গ্যাগারিন প্রথম নভোচারী হিসেবে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন; তিনি ১৯৬১ সালের ১২ই এপ্রিল পৃথিবীপৃষ্ঠ থেকে ৩০০ কিলোমিটার উচ্চতায় ভোস্তক মহাকাশযানে বসে প্রায় ৮৯ মিনিট ধরে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেন। ১৯৬৩ সালে ভালেন্তিনা তেরেস্কোভা প্রথম নারী হিসেবে মহাশূন্যে ভ্রমণ করেন। ১৯৬৫ সালে রুশ নভোচারী আলেক্সি লেওনভ প্রথম নভোচারী হিসেবে মহাশূন্যে পদচারণা করেন।

এইসব সোভিয়েত সাফল্যের জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৭০ সালের মধ্যে একজন মানুষকে চাঁদে পদার্পণ করানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা হাতে নেয়। ১৯৬৮ সালে মার্কিন মহাকাশযান অ্যাপোলো ৮ প্রথমবারের মত চাঁদ প্রদক্ষিণ করে। মার্কিনীদের মূল পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ১৯৬৯ সালে বাস্তবায়িত হয়। সেবছর ২১শে জুলাই অ্যাপোলো ১১ মিশনের অংশ হিসেবে মার্কিন নভোচারী নিল আর্মস্ট্রং প্রথম মানুষ হিসেবে চাঁদে অবতরণ করেন ও চন্দ্রপৃষ্ঠে পায়চারি করেন। তার সাথে দ্বিতীয় মানুষ হিসেবে বাজ অলড্রিনও চাঁদে পদার্পণ করেন।

১৯৭০-এর দশকে যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, ভারত এবং জাপান ক্ষুদ্রাকৃতির মহাকাশযান উৎক্ষেপ করে। এগুলি বেশিরভাগই ছিল কৃত্রিম উপগ্রহ, যেগুলিকে যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাসের কাজে ব্যবহার করা হত। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মহাশূন্যের গভীর থেকে গভীরতর অংশে অনুসন্ধানী যান পাঠানো শুরু করে যেগুলি মঙ্গল, শুক্র, বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন গ্রহগুলি থেকে ছবি ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক তথ্য পাঠাতে থাকে।

সোভিয়েতদের পাঠানো মহাকাশযান ১৯৭০ সালে শুক্রগ্রহে এবং ১৯৭১ সালে মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করে। ১৯৭২ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শেষবারের মত চাঁদে মানববাহী অ্যাপোলো মিশন পরিচালনা করে। ১৯৭৫ সালে মার্কিন ও সোভিয়েত মহাকাশযান মহাশূন্যে একে অপরের সাথে সংযুক্ত হয়। ১৯৭৭ সালে মার্কিন মহাশূন্যযান ভাইকিং মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করে। ১৯৮২ সালে সোভিয়েত অনুসন্ধানী মহাকাশযান শুক্রগ্রহে অবতরণ করে ও সেখান থেকে শুক্রগ্রহের পৃষ্ঠের রঙিন আলোকচিত্র পৃথিবীতে প্রেরণ করে। ১৯৮৬ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রথম মহাশূন্য স্টেশন মির উৎক্ষেপন করে। ১৯৯৫ সালে রুশ নভোচারী ভালেরি পোলিইয়াকভ মির মহাকাশ স্টেশনে টানা ৪৩৭ দিন সময় কাটান। মির মহাকাশ স্টেশনটি ২০০১ সাল পর্যন্ত কক্ষপথে ছিল।

১৯৮০-র দশকে ফ্লোরিডার কার্নাভাল অন্তরীপ থেকে বহু মার্কিন মহাকাশ মিশন উৎক্ষেপ করা হয়। ১৯৭৯ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন মহাকাশ অনুসন্ধানী যান ভয়েজার ২ বৃহস্পতি, শনি, ইউরেনাস ও নেপচুন গ্রহের পাশ দিয়ে উড়ে যায় ও অনেক আলোকচিত্র তুলে পাঠায়। ১৯৮১ সালে ফেরতযোগ্য মহাকাশযান বা শাটলগুলির উড্ডয়ন শুরু হয়। সেবছর প্রথম এরকম একটি যান কলাম্বিয়া পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। দু’বার দুর্ঘটনার কারণে এই মহাকাশযানগুলি হারানো যায়। এর মধ্যে ১৯৮৬ সালের চ্যালেঞ্জার দুর্ঘটনাটি উল্লেখযোগ্য। এর আগে ১৯৮৪ সালে দুইজন মার্কিন নভোচারী মহাকাশযানের সাথে সংযোগ ছিন্ন করে মহাকাশে ওড়াওড়ি করেন।

১৯৯০ সালে একটি মার্কিন ফেরতযোগ্য মহাশূন্যযান হাবল দূরবীণটি মহাকাশে স্থাপন করে আসে। ঠান্ডা যুদ্ধের অবসানের পর ১৯৯০-র দশক থেকে মার্কিন ও রুশ বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন প্রকল্পে একত্রে কাজ করেছেন। আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন এমন একটি প্রকল্প। ইতিমধ্যে কম্পিউটার প্রযুক্তির অনেক উন্নতি ঘটে এবং ১৯৯৭ সালে মার্কিন প্যাথফাইন্ডার মহাকাশযানটি মঙ্গলগ্রহে অবতরণ করে। সেটি পৃথিবী থেকে নিয়ন্ত্রণযোগ্য সোজোর্নার নামের একটি চলমান অনুসন্ধানী যন্ত্র বা রোবট সেখানে রেখে আসে যাতে মঙ্গলগ্রহের পৃষ্ঠ পর্যবেক্ষণ করা যায়। এর পাঠানো মঙ্গলের ছবিগুলি মানুষেরা পৃথিবীতে বাসায় বসে তাদের টেলিভিশনের পর্দায় দেখতে পায়। ২০০০ সালে গ্লোবাল সার্ভেয়ার নামক যন্ত্র মঙ্গলগ্রহে পানির অস্তিত্বের সন্ধান পায়।

মার্কিন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি[সম্পাদনা]

ম্যাকার্থিবাদ[সম্পাদনা]

সাম্যবাদী চীন[সম্পাদনা]

উপনিবেশ-পরবর্তী আফ্রিকা[সম্পাদনা]

দ্য গোল এবং ৫ম ফরাসি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা[সম্পাদনা]

ইন্দোনেশিয়াতে সুহার্তোকে হটিয়ে সুকার্নো[সম্পাদনা]

ব্রাজিলের সামরিক কু[সম্পাদনা]

পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা[সম্পাদনা]

নাগরিক অধিকার আন্দোলন[সম্পাদনা]

কোরীয় যুদ্ধ[সম্পাদনা]

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় হস্তক্ষেপ[সম্পাদনা]

লাতিন আমেরিকায় বিপ্লব এবং মার্কিন হস্তক্ষেপ[সম্পাদনা]

চিলিতে পিনোশের ক্ষমতা দখল[সম্পাদনা]

চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব ও পুঁজিবাদের বিকাশ[সম্পাদনা]

আধুনিক মধ্যপ্রাচ্য[সম্পাদনা]

নাসের ও সর্ব-আরববাদ
আরব-ইসরায়েল সংঘাত
সুয়েজ সংকট
মধ্যপ্রাচ্য ও খনিজ তেল অর্থনীতি

১৯৬৮-এর সাংস্কৃতিক বিপ্লব[সম্পাদনা]

আফগানিস্তানে সোভিয়েত আক্রমণ[সম্পাদনা]

ইরানী বিপ্লব[সম্পাদনা]

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধসমূহ[সম্পাদনা]

ইরান-ইরাক যুদ্ধ[সম্পাদনা]

ইরাকের কুয়েত আক্রমণ এবং প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ[সম্পাদনা]

সাম্যবাদের পতন[সম্পাদনা]

আপার্টহাইটের সমাপ্তি[সম্পাদনা]

সোভিয়েত পতন-পরবর্তী সংঘাত[সম্পাদনা]

ইউরোপীয় ইউনয়ন[সম্পাদনা]

পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক উত্থান[সম্পাদনা]

ইসলামী সন্ত্রাসবাদের উত্থান[সম্পাদনা]

কম্পিউটার প্রযুক্তি ও যোগাযোগ বিপ্লব[সম্পাদনা]

জৈব প্রযুক্তি[সম্পাদনা]

জনসংখ্যা বিস্ফোরণ[সম্পাদনা]

চিকিৎসাবিজ্ঞানের উন্নতি এবং নতুন রোগব্যাধি[সম্পাদনা]

সমসাময়িক যুগ (একবিংশ শতাব্দী)[সম্পাদনা]

১১ই সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী আক্রমণ[সম্পাদনা]

আফগানিস্তান ও ইরাকের যুদ্ধ[সম্পাদনা]

বিশ্বায়ন ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট[সম্পাদনা]

জলবায়ু পরিবর্তন ও সবুজ বিপ্লব[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Crawford, O. G. S. (1927). Antiquity. [Gloucester, Eng.]: Antiquity Publications [etc.]. (cf., History education in the United States is primarily the study of the written past. Defining history in such a narrow way has important consequences ...)
  2. According to David Diringer ("Writing", Encyclopedia Americana, 1986 ed., vol. 29, p. 558), "Writing gives permanence to men's knowledge and enables them to communicate over great distances.... The complex society of a higher civilization would be impossible without the art of writing."
  3. Webster, H. (1921). World history. Boston: D.C. Heath. Page 27.
  4. Tudge, Colin (১৯৯৮)। Neanderthals, Bandits and Farmers: How Agriculture Really Began। London: Weidenfeld & Nicolson। আইএসবিএন 0-297-84258-7 
  5. Bellwood, Peter. (2004). First Farmers: The Origins of Agricultural Societies, Blackwell Publishers. আইএসবিএন ০-৬৩১-২০৫৬৬-৭
  6. Cohen, Mark Nathan (1977) The Food Crisis in Prehistory: Overpopulation and the Origins of Agriculture, New Haven and London: Yale University Press. আইএসবিএন ০-৩০০-০২০১৬-৩.
  7. Schmandt-Besserat, Denise (জানুয়ারি–ফেব্রুয়ারি ২০০২)। "Signs of Life" (PDF)Archaeology Odyssey: 6–7, 63। 
  8. McNeill, Willam H. (১৯৯৯) [1967]। "In The Beginning"। A World History (4th সংস্করণ)। New York: Oxford University Press। পৃষ্ঠা 15। আইএসবিএন 0-19-511615-1 
  9. Baines, John and Jaromir Malek (২০০০)। The Cultural Atlas of Ancient Egypt (revised সংস্করণ)। Facts on File। আইএসবিএন 0-8160-4036-2 
  10. Bard, KA (১৯৯৯)। Encyclopedia of the Archaeology of Ancient Egypt। NY, NY: Routledge। আইএসবিএন 0-415-18589-0 
  11. Grimal, Nicolas (১৯৯২)। A History of Ancient Egypt। Blackwell Books। আইএসবিএন 0-631-19396-0 
  12. Allchin, Raymond (ed.) (১৯৯৫)। The Archaeology of Early Historic South Asia: The Emergence of Cities and States। New York: Cambridge University Press 
  13. Chakrabarti, D. K. (২০০৪)। Indus Civilization Sites in India: New Discoveries। Mumbai: Marg Publications। আইএসবিএন 81-85026-63-7 
  14. Dani, Ahmad Hassan (১৯৯৬)। History of Humanity, Volume III, From the Third Millennium to the Seventh Century BC। New York/Paris: Routledge/UNESCO। আইএসবিএন 0-415-09306-6  অজানা প্যারামিটার |coauthors= উপেক্ষা করা হয়েছে (|author= ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে) (সাহায্য)
  15. "Internet Medieval Sourcebook Project"। Fordham.edu। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৪-১৮ 
  16. "The Online Reference Book of Medieval Studies"। The-orb.net। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৪-১৮ 
  17. Burckhardt, Jacob (1878), The Civilization of the Renaissance in Italy, trans S.G.C Middlemore, republished in 1990 আইএসবিএন ০-১৪-০৪৪৫৩৪-X
  18. "''The Cambridge Modern History. Vol 1: The Renaissance (1902)"। Uni-mannheim.de। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৪-১৮ 
  19. Rice, Eugene, F., Jr. (১৯৭০)। The Foundations of Early Modern Europe: 1460–1559। W.W. Norton & Co.। 
  20. "What Did Gutenberg Invent?"। BBC। সংগ্রহের তারিখ ২০০৮-০৫-২০ 
  21. Grant, Edward. The Foundations of Modern Science in the Middle Ages: Their Religious, Institutional, and Intellectual Contexts. Cambridge: Cambridge Univ. Pr., 1996.
  22. More; Charles. Understanding the Industrial Revolution (2000) online edition
  23. William W. Hallo & William Kelly Simpson, The Ancient Near East: A History, Holt Rinehart and Winston Publishers, 1997
  24. Jack Sasson, The Civilizations of the Ancient Near East, New York, 1995
  25. Marc Van de Mieroop, History of the Ancient Near East: Ca. 3000–323 BC., Blackwell Publishers, 2003
  26. "Ancient Asian World"। Automaticfreeweb.com। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৪-১৮ 
  27. Reuters – The State of the World The story of the 21st century
  28. "Scientific American Magazine (September 2005 Issue) The Climax of Humanity"। Sciam.com। ২০০৫-০৮-২২। সংগ্রহের তারিখ ২০০৯-০৪-১৮