বাংলাদেশ ও জাতিসংঘ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
বাংলাদেশ
Flag of the United Nations.svg Flag of Bangladesh.svg
জাতিসংঘ সদস্যবর্গ
সদস্যতাপূর্ণ সদস্য
হতে১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭৪; ৪৭ বছর আগে (1974-09-17)
স্থায়ী প্রতিনিধিরাবাব ফাতিমা

বাংলাদেশ ও জাতিসংঘের এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে।বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ১৩৬ তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে যোগদান করে। যোগদানের এক সপ্তাহ পর ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন।

কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব[সম্পাদনা]

নিউ ইয়র্ক সিটিতে জাতিসংঘ সদর দফতরে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে।[১] যার নেতৃত্বে রয়েছে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি। রাবাব ফাতিমা জাতিসংঘে বাংলাদেশের বর্তমান স্থায়ী প্রতিনিধি।[২] জেনেভাতে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন জেনেভা ভিত্তিক জাতিসংঘের অঙ্গগুলির প্রতি বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের প্রতিনিধিত্ব করে।[৩] ভিয়েনায় ভিয়েনার জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী মিশন বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে।[৪]

গার্ড অফ অনার

ইতিহাস[সম্পাদনা]

বাংলাদেশের সঙ্গে জাতিসংঘের সম্পর্কের সূচনা হয় ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা সংগ্রামের সময়ে। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুধু একটি মুক্তিআন্দোলন নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার দলনের বিরুদ্ধে আন্দোলন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে জাতিসংঘ মূলত যুক্ত হয়েছিল নিম্নোক্ত ক্ষেত্রে:

মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ; এবং

শরণার্থীদের সহায়তা দান।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা চেয়ে তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন জাতিসংঘ মহাসচিব উথান্টের কাছে। সে সময়ে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ঢাকাস্থ প্রতিনিধির সঙ্গে একটি বিশেষ বৈঠকও করেছিলেন তাঁরা। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মানুষের উপর যে গণহত্যা সংঘঠিত হয়, তা সারা বিশ্বে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। অন্যান্য বিশ্বনেতার সঙ্গে সেদিন জাতিসংঘ মহাসচিব উথান্ট এই গণহত্যাকে নিন্দা করে একে ‘মানব ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়’ বলে অভিহিত করেছিলেন।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল সরকার গঠনের পর এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বের জনমত ও রাষ্ট্রসমূহের সমর্থন ও স্বীকৃতি আদায় করা। এ উদ্দেশ্যে মুজিবনগর সরকারের একটি বিশেষ প্রতিনিধিদলকে ১৯৭১ সালের ২১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৬ তম অধিবেশনে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে জাতিসংঘ প্লাজায় একটি সাংবাদিক সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্বকে জানিয়ে দেয় যে আপোষ সম্ভাবনার পরিস্থিতি থেকে আমরা বেরিয়ে এসেছি। ১৯৭১ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের অধিবেশনে বাংলাদেশ প্রতিনিধিদের দীর্ঘ বক্তব্য পাঠানো হয় এবং এটি নিরাপত্তা পরিষদের অফিসিয়াল ডকুমেন্ট হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই প্রথম জাতিসংঘে বাংলাদেশের মানুষের বক্তব্য বাংলাদেশের প্রতিনিধির মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে উপস্থাপিত হয়।

দ্বিতীয় যে ক্ষেত্রটিতে জাতিসংঘ সক্রিয় ছিল সেটা হচ্ছে শরণার্থীদের সাহায্য প্রদান। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অমানবিক নির্যাতন ও গণহত্যার কারণে বাংলাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহত্যাগ করে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নেয়। এই শরণার্থীদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য যে ব্যবস্থাপনা ও অর্থবলের প্রয়োজন ছিল, তা কোনো রাষ্ট্রের পক্ষে এককভাবে মেটানো সম্ভব ছিল না। বাংলাদেশের ইতিহাসের সেই ক্রান্তিকালে ভারতে বাংলাদেশী শরণার্থীদের সহায়তার লক্ষ্যে জাতিসংঘ ব্যাপক ত্রাণ তৎপরতা চালায়। শরণার্থীদের সহায়তার কাজে জাতিসংঘের এ সম্পৃক্তির ফলে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম কৌশলগতভাবেও লাভবান হয়। পাকিস্তান এবং আরো কিছু দেশ এ সংগ্রামকে পাকিস্তানের ‘আভ্যন্তরীণ বিষয়’ এবং ভারত পাকিস্তান দ্বন্দ্ব বলে চিত্রিত করার যে অপপ্রয়াসে লিপ্ত ছিল, জাতিসংঘের এই সাহায্যের ফলে তা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। জাতিসংঘের শরণার্থী সংক্রান্ত হাইকমিশনার সদরুদ্দিন আগা খান সহ উচ্চপদস্থ জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বিভিন্ন শরণার্থী শিবির পরিদর্শন করেন। বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে ইউএনএইচসিআর ছাড়াও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী, ইউনিসেফ প্রভৃতি জাতিসংঘ-সংস্থা শরণার্থীদের জন্য কাজ শুরু করে।

অন্যদিকে, তৎকালে অধিকৃত-বাংলাদেশেও জাতিসংঘ ত্রাণ তৎপরতা শুরু করে। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে জন আর কেলির নেতৃত্বে ইস্ট পাকিস্তান রিলিফ অপারেশন (ইউএনইপিআরও) ত্রাণ তৎপরতা শুরু করে। পরে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে এই দায়িত্ব নেন আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল পদমর্যাদার পল ম্যাক্কি হেনরি। এ সময়ে মুজিবনগর সরকার অভিযোগ করে যে, পাকিস্তানি সৈন্যরা এ ত্রাণ কার্যক্রমের অপব্যবহার করছে। ১৬ নভেম্বর এ কার্যক্রমকে ‘পাকিস্তানি নিয়ন্ত্রণ মুক্ত’ করে জাতিসংঘ নিজেই এর সর্বময় কর্তৃত্ব গ্রহণ করে। এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান প্রশাসনের উপর একটি নৈতিক আঘাত।

১৯৭১ সালের জুন মাসে বিশ্ব ব্যাংকের উদ্যোগে প্যারিসে পাকিস্তান এইড কনসোর্টিয়ামের যে বৈঠক হয় তাতে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে না আসা পর্যন্ত নতুন সাহায্য দিতে দাতাগোষ্ঠী অস্বীকার করে। ‘পূর্ব পাকিস্তান কার্যত সরকারবিহীন রয়েছে’ বিশ্ব ব্যাংকের এ মন্তব্য বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামকে বেগবান করে। ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) আলোচ্যসূচিতেও বাংলাদেশের শরণার্থী সমস্যা গুরুত্বপূর্ণভাবে উত্থাপিত হয়।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে জাতিসংঘ বৃহৎ আকারের ত্রাণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম হাতে নেয়। ১৯৭১ সালের ২১ ডিসেম্বর জাতিসংঘ মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেইম জাতিসংঘ রিলিফ অপারেশনস ঢাকা (আনরড) নামে পরিচিত জাতিসংঘ ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন এবং একজন আন্ডার সেক্রেটারী জেনারেলকে এর দায়িত্বভার দেয়া হয়। স্যার রবার্ট জ্যাকসনের পরিচালনায় শুরু হয় এই জাতিসংঘ ত্রাণকার্য। এই কার্যক্রমের ব্যাপ্তির মুখে আনরডের নাম কিছুদিনের মধ্যে পরিবর্তিত হয়ে পরিণত হল আনরব-এ, যার পুরো নাম বাংলাদেশে জাতিসংঘ ত্রাণ কার্যক্রম। ১৯৭৩ সালে ৩১ ডিসেম্বর যখন পরিকল্পনা অনুযায়ী আনরব তার জরুরী ত্রাণ এবং পুনর্বাসন তৎপরতা শেষ করে তখন এক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, ওই সময় পর্যন্ত জাতিসংঘ পরিচালিত ত্রাণকার্যের মধ্যে সর্ববৃহৎ ছিল আনরবের ত্রাণকার্য।

বাংলাদেশ-জাতিসংঘ সম্পর্ক আরো জোরদার হয় যখন ১৯৭৩ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘ মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেইম বাংলাদেশ সফরে আসেন এবং প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। এ সফর দ্বারা জাতিসংঘ বাংলাদেশের জাতিগঠন প্রক্রিয়ায় সমর্থন দান করে। এ সময়ে জাতিসংঘের সহায়তায় যুদ্ধকালীন সময়ে বিধ্বস্ত চালনা পোর্টে ডুবে যাওয়া জাহাজসমূহও অপসারন করা হয়। এছাড়া ১৯৭৩ সালের জুলাই মাসে পাকিস্তানে আটকে পড়া বাঙালিদের ফিরিয়ে আনতেও জাতিসংঘ উদ্যোগ গ্রহণ করে।

বাংলাদেশের জাতিসংঘে যোগদান[সম্পাদনা]

স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেই জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির লক্ষ্যে বাংলাদেশ নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালায়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ জাতিসংঘ সনদের আদর্শ ও নীতিমালার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করে। স্বাধীনতার পরে বাংলাদেশের যে সংবিধান গৃহীত হয় তাতে এমন অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ও বাক্য রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে জাতিসংঘের সনদ ও ভাবধারার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে যে: ‘আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের সনদে বর্ণিত নীতিসমূহের প্রতি শ্রদ্ধা, এই সকল নীতি হবে রাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ভিত্তি’ (অনুচ্ছেদ-২৫)। বাংলাদেশের সংবিধানে মৌলিক অধিকার সম্পর্কিত এমন অধ্যায়, অনুচ্ছেদ ও বাক্য রয়েছে যা সুস্পষ্টভাবে জাতিসংঘের ভাবধারার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। বাংলাদেশের সংবিধানে মানবাধিকারের বিষয়টি সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণার আলোকে প্রণীত হয়েছে, যা আইনের শাসন, মৌলিক অধিকার, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতা, স্বাধীনতা এবং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দেয়।

১৯৭২ সালে জাতিসংঘ সদরদপ্তরে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন চলাকালে বাংলাদেশের তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রির নেতৃত্বে একটি পর্যবেক্ষক দল বাংলাদেশের সদস্যপদ প্রাপ্তির লক্ষ্যে তৎপরতা চালায়। কিন্তু জুলফিকার আলী ভুট্রোর সময়ে পাকিস্তান সরকারের প্ররোচনায় নিরাপত্তা পরিষদে চীনের ভেটো প্রয়োগের কারণে পর পর দু’বার বাংলাদেশ জাতিসংঘের সদস্য হতে ব্যর্থ হয়।

বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ১৩৬ তম সদস্য হিসেবে জাতিসংঘে যোগদান করে। যোগদানের এক সপ্তাহ পর ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভূমিকা[সম্পাদনা]

জাতিসংঘের সদস্যপদ প্রাপ্তির পর থেকেই বাংলাদেশ বিশ্বসভায় তার ভূমিকা রেখে চলেছে এবং জাতিসংঘের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক এবং নিরাপত্তা বিষয়ক বিভিন্ন কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত হয়েছে। জাতীয় নীতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ পাচঁটি প্রধান ক্ষেত্র যেমন উন্নয়ন, পরিবেশ, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও শান্তিরক্ষার উপর গুরুত্বারোপ করে থাকে।

জাতিসংঘে সদস্যপদ লাভের এক বছরের মধ্যে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয় এবং ১৯৭৬ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত এবং ১৯৮১ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত দু’বার অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) এর সদস্য হিসেবে কাজ করে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হুমায়ুন রশিদ চৌধূরী ১৯৮৬-৮৭ মেয়াদে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ দু’বার নির্বাচিত হয়, প্রথমবার জাপানকে পরাজিত করে ১৯৭৯-১৯৮০ সালে এবং দ্বিতীয়বার ২০০০-২০০১ সালে। বাংলাদেশের প্রথমবারের (১৯৭৯-৮০) নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সে সময়ে বিশ্বে ঠান্ডাযুদ্ধকালীন অবস্থা বিরাজমান ছিল এবং বিভিন্ন সংকটকালীন এজেন্ডা, যেমন: আরব-ইসরাইল উত্তেজনা, কম্বোডিয়ায় ভিয়েতনামীদের আগ্রাসন, আফগানিস্তানে সোভিয়েত অনুপ্রবেশ, ইরানের হোস্টেজ ইস্যু, ইরান-ইরাক যুদ্ধ, আফ্রিকান রাষ্ট্র রোডেশিয়ার স্বাধীনতা অর্জন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা ইত্যাদি নিরাপত্তা পরিষদের এজেন্ডা হিসেবে উত্থাপিত হয়। বাংলাদেশ জোট নিরপেক্ষ রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে কম্বোডিয়া এবং আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সোভিয়েত ভেটো প্রদানে বিরত রাখতে ব্যর্থ হলেও অবরুদ্ধ আরবভূমিতে ইহুদি বসতিস্থাপনে বাধা দেয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখে। তেহরানে আমেরিকান কূটনীতিকদের হোস্টেজ ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আইনের মূলনীতির স্বীকৃতির লক্ষ্যে বাংলাদেশ রেজ্যুলেশনে সমর্থন জ্ঞাপন করে। একই সময়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘের প্রতিনিধি হয়ে জিম্বাবুয়ে থেকে রোডেশিয়ার স্বাধীনতার প্রশ্নে যে নির্বাচন হয়, তার তদারকি করে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের যে অস্ত্রনিষেধাজ্ঞা কমিটি হয় তার সভাপতি নির্বাচিত হয়। বিশ্বের পরিবর্তিত কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা পরিষদে দ্বিতীয় মেয়াদে সদস্যপদ লাভের সময়েও (২০০০-২০০১) বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। এঙ্গোলা, বসনিয়া হার্জেগোভিনা, গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র (ডিআরসি), ইরাক, কসোভো, সিয়েরা লিয়ন এবং পূর্ব তিমুরের মতো বিষয়গুলো এ সময়ের নিরাপত্তা পরিষদের প্রাধান্য বিস্তারকারী ইস্যু হিসেবে বিবেচিত। এসময়ে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ দুটো কমিটি, সিয়েরা লিয়ন বিষয়ক কমিটি এবং অনুমোদনের ভূমিকা বিষয়ক কার্যকমিটির সভাপতি হিসেবে কাজ করে। এছাড়াও বাংলাদেশ ২০০০ সালের মার্চ মাসে এবং ২০০১ সালের জুন মাসে নিরাপত্তা পরিষদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করে।

১৯৭৪ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত নয়া আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার এক শক্তিশালী প্রবক্তা হিসেবে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল। ১৯৭৮ সালের শেষের দিকে জাতিসংঘ অধিবেশনে নিরস্ত্রীকরণ বিষয়ক প্রস্ত্ততিমুলক কমিটির সদস্য হিসেবে বাংলাদেশ দায়িত্ব পালন করে এবং ১৯৭৯ সালের আগস্ট মাসে পাশকৃত পারমানবিক অস্ত্র প্রসার রোধ বিষয়ক চুক্তি (এনপিটি) প্রণয়নে ভূমিকা রাখে। এ ছাড়া ১৯৮২-৮৩ মেয়াদে ৭৭ জাতি গ্রুপের চেয়ারম্যান এবং ১৯৮০ থেকে স্বল্পোন্নত দেশগুলির সমন্বয়ক হিসেবে বাংলাদেশ কাজ করেছে। বাংলাদেশ ১৯৮৫ সালে শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনের (ইউএনএইচসিআর) এবং ১৯৯৮ সালে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার সিটিডি কমিটির হাইকমিশনার নিযুক্ত হয়। বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৮৫ সালে দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৮৩-২০০০ মেয়াদে এবং ২০০৬-২০০৮ মেয়াদে কাজ করে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রধান সম্মেলনগুলোতে বরাবরই অংশগ্রহণ করে। বিশ শতকের নববইয়ের দশকে জাতিসংঘের আহবানে যতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন হয়েছে বাংলাদেশ সবক’টিতেই অংশগ্রহণ করেছে এবং বিভিন্ন ঘোষণা, প্লান অব অ্যাকশন প্রণয়নে অবদান রেখেছে। এই সম্মেলনগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: সবার জন্য শিক্ষা সম্মেলন (জোমটেইন, ১৯৯০), শিশু বিষয়ক বিশ্ব শীর্ষ সম্মেলন (নিউইয়ক,র্ ১৯৯০), ধরিত্রী সম্মেলন (রিওডি জেনিরো, ১৯৯২), পুষ্টি সম্মেলন (রোম, ১৯৯২), বিশ্ব মানবাধিকার সম্মেলন (ভিয়েনা, ১৯৯৩), আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্মেলন (কায়রো, ১৯৯৪), বিশ্ব সামাজিক উন্নয়ন শীর্ষ সম্মেলন (কোপেনহেগেন, ১৯৯৫), চতুর্থ বিশ্ব নারী সম্মেলন (বেইজিং, ১৯৯৫), দ্বিতীয় বিশ্ব আবাসন সম্মেলন (ইস্তাম্বুল, ১৯৯৬) এবং বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন (রোম, ১৯৯৬)। ১৯৯৫ সালে অনুষ্ঠিত বেইজিং সম্মেলনে বাংলাদেশ নিজে অংশগ্রহণের পাশাপাশি এনজিওগুলোকে অংশগ্রহণ করতেও উৎসাহিত করেছে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের উদ্যোগে গৃহীত অনেকগুলি আন্তর্জাতিক চুক্তি ও মানবাধিকার সনদের স্বাক্ষরদাতা ও অনুসমর্থনকারী দেশ। এসবের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কনভেনশন, চুক্তি এবং প্রটোকল যা বাংলাদেশ কর্তৃক স্বাক্ষর ও অনুসমর্থন হয়েছে সেগুলো হলো: সকল প্রকার বর্ণগত বৈষম্য বিলোপে আন্তর্জাতিক কনভেনশন, নারীদের বিরুদ্ধে সবধরনের বৈষম্য বিলোপে কনভেনশন (সিডো), শিশু অধিকার সংক্রান্ত কনভেনশন এবং অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার বিষয়ে আন্তর্জাতিক কভেন্যান্ট, এন্টি পারসোন্যাল মাইন ব্যবহার প্রতিরোধ বিষয়ক চুক্তি, মরুভুমিকরণ প্রতিরোধে জাতিসংঘ কনভেনশন (ইউএনসিসিডি), রিও জীববৈচিত্র্য কনভেনশন, ভিয়েনা কনভেনশন, মন্ট্রিল প্রটোকল, লন্ডন এমেন্ডমেন্ট, কোপেনহেগেন এমেন্ডমেন্ট, মন্ট্রিল এমেন্ডমেন্ট, বেইজিং এমেন্ডমেন্ট।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শান্তি ও সহযোগিতার প্রতি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ হয়ে বাংলাদেশ ১৯৯৯ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৫৪ তম অধিবেশনে অ্যাকশন ফর এ কালচার অব পিস কর্মসূচী ঘোষণার সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করে। এছাড়া বাংলাদেশ পিস বিল্ডিং কমিশনেরও প্রতিষ্ঠাতা-সদস্য। বর্তমানে জাতিসংঘের এক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতময় এলাকায় চলমান শান্তিরক্ষা কার্যক্রম, যার সঙ্গে বাংলাদেশ গভীরভাবে জড়িত। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী শীর্ষস্থানে থাকা দেশসমূহের অন্যতম বাংলাদেশ। বাংলাদেশের এ ভূমিকার সূত্রপাত ঘটে ১৯৮৮ সালে ইরান-ইরাক মিলিটারি অবজারভেশন গ্রুপ (ইউএনআইআইএমওজি) এবং নামিবিয়াতে কার্যরত ইউনাইটেড নেশনস ট্রাঞ্জিশন অ্যাসিসট্যান্স গ্রুপে (ইউএনটিএজি) যোগদানের মাধ্যমে। পরবর্তী সময়ে ইউনিকম (ইউএনআইকেওএম) ফোর্সের অংশ হিসেবে গালফ যুদ্ধের সময় কুয়েতে এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি প্রকৌশল ব্যাটালিয়ন পাঠানো হয়। তখন থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘ পরিচালিত ৪৫টি শান্তিরক্ষা মিশন কার্যক্রমের মাধ্যমে ২৫টি রাষ্ট্রে ৮৩,০০০ জন শান্তিরক্ষী পাঠানোর মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করে চলেছে। এই শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিশন গুলো হলো: নামিবিয়াতে ইউএন ট্রাঞ্জিশন অ্যাসিসট্যান্স গ্রুপ (ইউএনটিএজি), কম্বোডিয়াতে ইউএন ট্রাঞ্জিশন অ্যাসিসট্যান্স গ্রুপ (ইউএনটিএসি) এবং ইউএন মিলিটারি লিঁয়াজো টীম (ইউএনএমএলটি), সোমালিয়াতে ইউএন অপারেশনস (ইউএনওএসওএম), উগান্ডা/রুয়ান্ডাতে ইউএন অবজার্ভার মিশন (ইউএনওএমইউআর), মোজাম্বিকে ইউএন অপারেশনস (ইউএনওএমওজেড), যুগোশ্ললাভিয়াতে ইউএন মিশন (ইউএনপিআরওএফওআর), লাইবেরিয়াতে ইউএন মিশন (ইউএনএমআইএল), হাইতিতে ইউএন মিশন (ইউএনএমআইএইচ), তাজাকিস্তানে ইউএন মিশন অব অবজার্ভার (ইউএনএমওটি), পশ্চিম সাহারাতে ইউএন মিশন ফর দ্যা রেফারেন্ডাম (এমআইএনইউআরএসও), সিয়েরা লিওনে ইউএন অ্যাসিসট্যান্স মিশন (ইউএনএএমএসআইএল), কসোভোতে ইউএন মিশন (ইউএনএমআইকে), জর্জিয়াতে ইউএন অবজার্ভার মিশন (ইউএনওএমআইজি), পূর্ব তিমুরে ইউএন মিশন ইন সাপোর্ট (ইউএনএমআইএসইটি), কঙ্গোতে ইউএন অর্গানাইজেশন মিশন (এমওএনইউসি), কোত দ্য’ল্যূভরে এবং ইথিওপিয়া/ইরিত্রিয়াতে ইউএন অপারেশনস (ইউএনএমইই)। ২০১০ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত ১০,৫৭৪ জন (সামরিক বাহিনী এবং পুলিশ) শান্তিরক্ষী সদস্যকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণকারী দেশসমূহের তালিকায় শীর্ষে অবস্থান করে এবং ১২টি মিশনে ১১টি রাষ্ট্রে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা কর্মরত রয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা দেশের জন্য অন্যতম শীর্ষ বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনকারী শক্তি। বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা তাঁদের দায়িত্ববোধ, কর্মনিষ্ঠা এবং দক্ষতা দ্বারা উচু মর্যাদায় আসীন হয়েছে এবং তা বিশ্ববাসীর কাছে স্বীকৃত ও প্রসংশিত হয়েছে। সংকটকালীন সময়ে বিশ্বশান্তি রক্ষায় ঝুকিপূর্ণ দায়িত্ব পালনকালে ৮৮ জন বাংলাদেশী শান্তিরক্ষা কর্মী এ পর্যন্ত তাঁদের জীবন উৎসর্গ করেছে।

বাংলাদেশে জাতিসংঘের ভূমিকা[সম্পাদনা]

বর্তমানে বাংলাদেশে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রম ব্যাপক আকারে দেখা যায়। বাংলাদেশের জনগণের উন্নয়ন ও অগ্রগতির লক্ষ্যে ১০ টির বেশি জাতিসংঘ সংস্থা বিভিন্ন কর্মসূচীর মাধ্যমে সরকার এবং জনগণের সাথে একত্রিত হয়ে কাজ করে যাচ্ছে। জাতিসংঘ সংস্থাসমূহের কাজের ক্ষেত্রগুলো হচ্ছে অর্থনীতি, বিদ্যুৎ শক্তি, পরিবেশ, জরুরী সহায়তা, শিক্ষা, দুর্যোগ, খাদ্য, জেন্ডার ইস্যু, সুশাসন, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার, আদিবাসী জনগোষ্ঠী, অভিগমন, পুষ্টি, অংশীদারিত্ব, জনসংখ্যা, দারিদ্র, শরণার্থী, শহরায়ন, কর্মসংস্থান এবং জীবনধারণ। জাতিসংঘের সংস্থাসমূহ দেশের সুশাসনের লক্ষ্যে বিভিন্ন অ্যাক্ট ও অর্ডিন্যান্স তৈরিতে, এবং মানবাধিকার ইস্যু সমূহে ঝুকিপূর্ণ কর্মপরিকল্পনার উন্নয়নে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পরিবেশ বিষয়ে দিকনির্দেশনা দিতে এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে নীতিগত সমর্থন দিয়ে থাকে।

জাতীয় উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জাতিসংঘ উন্নয়ন সহায়তাকারী কাঠামোর (আনডাফ) মাধ্যমে জাতিসংঘের সকল সংস্থা একত্রিত হয়ে যৌথভাবে বাংলাদেশ সরকারের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বে উন্নয়ন ধারণার মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী বাংলাদেশে অবস্থিত জাতিসংঘের অন্যতম প্রধান শাখা জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী (ইউএনডিপি) জাতিসংঘ টিমের সাথে একত্রিত হয়ে আনডাফ-এর বাস্তবায়ন এবং উন্নয়নে সহায়তা করে থাকে। এই লক্ষ্যে ইউএনডিপি সরকারি সংস্থাসমূহকে সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং দেশের দারিদ্র বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি) তৈরিতে সহায়তা করে যাচ্ছে।

জাতিসংঘ শিক্ষা বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থার (ইউনেস্কো) উদ্যোগে সুন্দরবন এবং আরো কিছু ঐতিহাসিক স্থান বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। পনেরো শতকে নির্মিত পাহাড়পুর বিহার এবং বাগেরহাটের বিভিন্ন মসজিদের সংরক্ষণের লক্ষ্যে ইউনেস্কো ১৯৮৫ সালে এক আন্তর্জাতিক ক্যাম্পেইনের আয়োজন করে। ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির ক্ষেত্রেও ইউনেস্কো প্রধান ভূমিকা পালন করে এবং প্রতি বছর বিশ্বের সর্বত্র ইউনেস্কোর তত্বাবধানে এই দিন মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে থাকে।

জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)-এর তত্বাবধানে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দেশের সর্বত্র গভীর নলকুপ স্থাপনের উদ্যোগ নেয়া হয়। বিশ শতকের আশি ও নববইয়ের দশকে রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ, প্রজননকালীন স্বাস্থ্যসেবা, এবং দুর্যোগ মোকাবেলায় সহায়তার ক্ষেত্রে ইউনিসেফ বিশেষ ভূমিকা রাখে। বিশ্বখাদ্য ও কৃষি সংস্থা দেশের বৃহত্তর কৃষি সেক্টরের সাথে জড়িত এবং বাংলাদেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের যে লক্ষ্য তা পূরণে পর্যাপ্ত ধান, গম এবং অন্যান্য কৃষি উপকরণ দিয়ে সহায়তা করে থাকে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (ইউএনএফপিএ) বাংলাদেশের সাথে যৌথভাবে কৌশলগত পরামর্শকমূলক সেবা এবং কমোডিটি সাপোর্ট দিয়ে থাকে। বাংলাদেশে ইউএনএফপিএ এ পর্যন্ত ছয়টি কান্ট্রি প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেছে এবং বর্তমানে সপ্তম কান্ট্রি প্রোগাম (২০০৬-২০১০) বাস্তবায়নের কাজে নিয়োজিত রয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা এবং জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে স্থিতিশীলতা আনয়নের ক্ষেত্রেও ইউএনএফপিএ যুক্ত আছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বাংলাদেশের জনশক্তির শিক্ষা এবং প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে এবং বাংলাদেশের শ্রম আইন আইএলও’র নীতিমালার সাথে ভারসাম্য রেখে প্রণীত হয়েছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচী (ডব্লিউএফপি) বাংলাদেশের কাজের বিনিময়ে খাদ্য এবং ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) কার্যক্রমে বিরাট ভূমিকা রেখেছে। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইউএনএইচসিআর) বাংলাদেশ সরকারের সাথে মায়ানমার থেকে আগত ২৮,০০০ শরণার্থীর কল্যাণে এবং তাদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক এবং বাংলাদেশ ১৯৭২ সাল থেকে যৌথভাবে উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক দারিদ্র দূরীকরণের মাধ্যমে উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বাংলাদেশের সহযোগী হয়ে কাজ করে থাকে। বিশ্বব্যাংক অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা, বেসরকারী সংস্থা, সুশীল সমাজ, প্রাতিষ্ঠানিক লোকজন এবং স্থানীয় স্টক হোল্ডারদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। এছাড়াও বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রজেক্টে ঋণ সহায়তা দিয়ে থাকে। আন্তর্জাতিক অর্থ সংস্থা (আইএমএফ)-এর সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ট সম্পর্ক রয়েছে। আইএমএফ’র ঋণ দেশের আর্থিক ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আনয়নে সহায়তা করে থাকে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের বাণিজ্য সুবিধা উন্মুক্ত করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিওএইচও) ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশের জনগনের স্বাস্থ্য উন্ন্য়ন এবং স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণে প্রযুক্তিগত সহায়তা দিয়ে আসছে। ডব্লিউএইচও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য এবং ঔষুধ নীতি পর্যবেক্ষন করছে।

বাংলাদেশে অবস্থিত জাতিসংঘের অনেক সংস্থা আর্থ-সামজিক প্রজেক্ট তৈরিতে সহায়তার লক্ষ্যে দেশের জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচী, ফেলোশীপ অথবা গবেষণার জন্য ফান্ড প্রদান করে থাকে। বাংলাদেশের উন্নয়ন কৌশল জাতিসংঘের সংস্থা সমূহের সাথে সমন্বয়ের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং জাতিসংঘের এই সংস্থাসমূহের একটি করে অফিসও বাংলাদেশে রয়েছে।

বাংলাদেশ এবং জাতিসংঘের বিগত বছরের যে সম্পর্ক তা দ্বারা বাংলাদেশ সংবিধানের কার্যকারিতা সুস্পষ্ট। বাংলাদেশের ভাবমূর্তি জাতিসংঘের মাধ্যমে বিশ্বে আরো সমুন্নত হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দ্বিধা বিভক্ত এবং অর্থনৈতিক ভাবে প্রতিদ্ধন্ধিতা পূর্ণ দ্বিমেরু কেন্দ্রীক বিশ্বে জাতিসংঘ একমাত্র সংস্থা যা বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করে রাখতে পারে। বাংলাদেশ নীতিগতভাবে তাই জাতিসংঘের মূলনীতিসমূহ মেনে নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শান্তিরক্ষা[সম্পাদনা]

বাংলাদেশ সামরিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর মানচিত্র

বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনী জাতিসংঘের অন্যতম বৃহত্তম কমান্ড বাহিনী এবং ডিসেম্বর ২০১৭ সালে শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ৭২৪৬ জন এতে নিযুক্ত ছিল।[৫] ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ সর্বপ্রথম তার সৈন্যদের শান্তিরক্ষা অভিযানে প্রেরণ করেছিল। পূর্ব তিমর, লেবানন, দক্ষিণ সুদান, নামিবিয়া হাইতি, লাইবেরিয়া প্রভৃতি বেশ কয়েকটি দেশে বাংলাদেশ শান্তিরক্ষী মোতায়েন করা হয়েছে। ১৯৮৮ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত, দেড় হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী সেনা জাতিসংঘের শান্তিরক্ষায় অংশ নিয়েছে। ১৯৮৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত, শান্তিবাহিনী অভিযানে ১৩৫ সেনা নিহত হয়েছে।[৬] ২০১৭ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘকে তৃতীয় বৃহত্তম সংখ্যক ব্যক্তি সরবরাহ করেছিল।[৭]

উদ্যোগ[সম্পাদনা]

মাতৃভাষা দিবস[সম্পাদনা]

১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কো ২১ ফ্র‍েরুয়ারিকে

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। পৃথিবীতে বাঙ্গালিরা একমাত্র জাতি যারা নিজেদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করার জন্য এবং রাষ্ট ভাষা হিসেবে প্র‍তিষ্ঠিত করার জন্য নিজেদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে রাজপথ রঞ্জিত করেছে।বাঙ্গালিরা রাষ্ট্র ভাষা হিসাবে বাংলাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য জীবন দিয়েছেন। অবশেষে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মাতৃভাষার প্রতি এমন ভালোবাসা আর মমত্ববৌধ পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।এরই স্বীকৃতি স্বরুপ ইউনেস্কো ২১ ফ্রেরুয়ারি কে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করান। যে দিনটি ১৯৫২ সালে বাঙালি ভাষা আন্দোলনের অংশ হিসাবে বাঙালিদের পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার প্রতিবাদ করতে গিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে ।পুলিশের গুলিতে মারা গিয়েছিল[৮][৯]

লাদ।এর পরের বছর ২০০০ সালে প্রথম বিশ্বের ১৮৮ টি দেশে ২১ ফ্রেরুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হয়েছে। যা এখন পর্যন্ত চলমান রয়েছে

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "Bangladesh Permanent Mission to the United Nations"un.int। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  2. "New Permanent Representative of Bangladesh Presents Credentials"un.org। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  3. "Welcome to Permanent Mission of Bangladesh in Geneva"genevamission.mofa.gov.bd। ৩ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  4. "Permanent Missions to the United Nations (Vienna)"unodc.org। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  5. "Bangladesh: Three decades of service and sacrifice in UN peacekeeping"United Nations Peacekeeping (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  6. "Bangladesh in peacekeeping - challenges, tragedies and achievements"Dhaka Tribune। ২৩ অক্টোবর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  7. "Bangladesh 3rd in providing UN peacekeeping troops"The Daily Star (ইংরেজি ভাষায়)। ৯ ডিসেম্বর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  8. "Significance of Mother Language Day"theindependentbd.com। The Independent। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮ 
  9. "International Mother Language Day 2018"UNESCO (ইংরেজি ভাষায়)। ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮। সংগ্রহের তারিখ ৫ ডিসেম্বর ২০১৮