মাহীসন্তোষ মসজিদ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মাহীসন্তোষ নগর
অবস্থান
অবস্থানধামুইরহাট উপজেলা, নওগাঁ জেলা, বাংলাদেশ
স্থাপত্য
স্থাপত্য শৈলীইসলামিক স্থাপত্য
সম্পূর্ণ হয়১৪৬৩ সাল

মাহীসন্তোষ মসজিদ বাংলাদেশের নওগাঁ জেলার ধামুইরহাট উপজেলায় অবস্থিত একটি প্রাচীন মসজিদ। এটি বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নথিভূক্ত একটি স্থাপনা।[১] মসজিদে প্রাপ্ত শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, মসজিদটি সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের আমলে ৮৬৭ হিজরিতে (১৪৬৩ খ্রি) নির্মিত এবং সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহের আমলে এটি ৯১২ হিজরিতে (১৫০৬ খ্রি) পুনঃনির্মিত হয়েছিল। ১৯১৬ সালে বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি এই মসজিদটির ধ্বংসাবশেষ যুক্ত ঢিবিটিতে খনন করে মসজিদটি আবিষ্কার করে।

অবস্থান[সম্পাদনা]

নওগাঁ জেলার ধামইরহাট উপজেলা সদর থেকে ১০ কি.মি উত্তর পশ্চিম ভারতের সীমান্ত ঘেঁষে আত্রাই নদীর পূর্ব তীরে হিন্দু বৌদ্ধ শাসনামলে গড়ে উঠেছিল প্রসিদ্ধ মাহীসন্তোষ নগরী।

মাহিসন্তোষ সমৃদ্ধির প্রেক্ষাপট[সম্পাদনা]

১২০৪/১২০৫ সালে বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের মধ্য দিয়েই মাহিসন্তোষের সমৃদ্ধির সূত্রপাত হয়ে সমগ্র সুলতানী যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এই ধারাবাহিকতা মোগল সম্রাট আকবরের শাসনকাল (১৫৫৬-১৬০৫) পর্যন্ত পরিলক্ষিত হয়েছে। মুসলিম শাসনামলে মাহীসন্তোষ বিভিন্ন নামে অভিহিত হয়েছে। বখতিয়ার খিলজি লক্ষণ সেনের রাজধানী লক্ষণাবতী গৌড় অধিকারের অনতিকাল পরেই তিনি গঙ্গারামপুরের সন্নিকটে দেবকোটে রাজধানী স্হানান্তর করেন।

ধর্ম চর্চার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে মাহীসন্তোষ[সম্পাদনা]

ইখতিয়ার উদ্দিন মোহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ বিজয়ের (১২০৪/১২০৫)

সাথে সাথেই অধিকৃত রাজধানী গৌড় থেকে স্থানান্তরিত ও নবপ্রতিষ্ঠিত রাজধানী দেবকোটের সন্নিকটে মাহীসন্তোষ দুর্গনগরে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থার সূচনা হয়।

ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রারম্ভে প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল মসজিদ,খানকা ও আস্তানা। এরপর ক্রমশঃ মসজিদ কেন্দ্রিক মকতব ও মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। সুলতানি শাসন আমলে বৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে মাহীসন্তোষ গড়ের মাদ্রাসাটি ছিল শীর্ষস্থানে। মাদ্রাসাটির প্রধান বিশিষ্ট সুফি-সাধক, পীর ও দরবেশের মর্যাদাসম্পন্ন জ্ঞানতাপস হযরত তাকিউদ্দিন আল- আরাবীর সুখ্যাতিতে দেশ-বিদেশের শিক্ষার্থীরা

জ্ঞানার্জন ও সুফি তত্ত্ব জ্ঞান চর্চার উদ্দেশ্যে মাহীসন্তোষ মাদ্রাসায় সমবেত হতো।

এখানে প্রতিষ্টিত হয় দেশ জোড়া প্রসিদ্ধ একটি মাদ্রাসা। উপমহাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ সুফি সাধক

" মাওলানা তাকিউদ্দিন আল- আরাবী " ছিলেন

সুলতানি আমলের ইতিহাস প্রসিদ্ধ মাহীসন্তোষ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। ইতিহাসের পাতায় যার নাম স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত আছে।

আলোচ্য মাহীসন্তোষ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা তাকিউদ্দিন আল আরাবির শিষ্য প্রখ্যাত সুফি সাধক বিহারের সায়খ মখদুম আল- মূলক শরফউদ্দিন ইয়াহিয়া মানেরীর পিতা প্রখ্যাত সুফি শায়খ ইয়াহিয়া মানেরী এবং পান্ডুয়ার প্রখ্যাত সুফি দরবেশ কুলের শিরোমনি নূর কুতুল উল আলম এর প্রচেষ্টায় উত্তর-পশ্চিম বাংলায় ইসলাম ধর্ম বিশেষ মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছিল।

বখতিয়ার খিলজির অধিকৃত বাংলার রাজধানী গৌড়

মাহিসন্তোষ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার সময়কাল,এর অবস্থান,আয়তন,অবকাঠামো, শ্রেণী বিন্যাস, শিক্ষক- শিক্ষার্থীর সংখ্যা,পাঠ্য বিষয় সমূহ এ সকল বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ[সম্পাদনা]

বখতিয়ার খলজি তাঁর অধিকৃত উত্তর পশ্চিম বাংলার

রাজ্যকে ইকতা নামের চারটি প্রশাসনিক ইউনিটে বিভক্ত করে খলজি মালিকদের মধ্যে চারজনকে মুকতা পদে নিয়োগ প্রদান করেন। মাত্র বছর দুয়েকের মধ্যে বখতিয়ার খিলজি আততায়ীর ছুরিকাঘাতে নিহত হবার পর খলজি মালিকদের মধ্যে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যাক্তি শিরান খলজি নিজেকে সুলতান হিসাবে ঘোষণা করেন। তিনি চারটি ইকতার মধ্যে একটি এই দূর্গ নগরীর প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেছেন বলে ধারণা করা হয়।

শিলালিপি থেকে জানা যায় ভূ-রাজনৈতিক কারণে গুরুত্বপূর্ণ এই নগরী মুসলিম শাসন কালে মাহীসূন ও মকসিদাহ সন্তোষ নামে পরিচিত ছিল। ইলিয়াসশাহী বংশের সুলতান রুকুনউদ্দীন বরবাকশাহ (১৪৪৯ -১৪৭৪ )

টাকশাল হিসেবে মাহিসন্তোষ:[সম্পাদনা]

বাংলাদেশে সুলতানি শাসনামলে আলাউদ্দিন হোসেন শাহ (১৩৪২-১৩৫৭) সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে বিশেষ কৃতিত্বের দাবিদার। তিনি সমগ্র বাংলাকে একত্রিত করে "শাহ্-ই- বাঙালা " বা " সুলতান-ই- বাঙালা " উপাধি গ্রহণ করেছিলেন।

হোসেনশাহী শাসনামলে মাহীসন্তোষ দূর্গ নগরীর গুরুত্ব অনেক বৃদ্ধি পেয়ে সমৃদ্ধির চরম শিখরে উন্নীত হয়। সূচিত হয় এক

নতুন অধ্যায়ের। এই সময় বাংলার রাজধানী পান্ডুয়ার সাথে মাহীসন্তোষ গড় একীভূত হয়েছিল। সুলতান রুকুন উদ্দিন বারবাক শাহের (১৪৪৯-১৪৭৪) নামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মাহীসন্তোষ নগরীর নতুন নামকরণ করা হয় " সরকার বারবকাবাদ "। বারবকাবাদ নগরীতে প্রশাসনিক ভবন- অট্টালিকা সহ মুদ্রা ছাপানোর আয়োজনের মাধ্যমে মাহীসন্তোষ " টাকশাল নগরীর " মর্যাদা

লাভ করে।

এই টাকশাল থেকে উৎকীর্ণ সাতটি মুদ্রা পাওয়া গেছে।এর ছয়টি রৌপ্য এবং একটি তাম্র মুদ্রা। এগুলোর মধ্যে চারটি রৌপ্য মুদ্রা রুকুন উদ্দিন বরবক শাহের শাসন আমলে তিনটি ১৪৬৮ সালে জারি করা হয়। বাকি তিনটি রৌপ্য মুদ্রা সুলতান শামসুদ্দীন মুজাফফর শাহের রাজত্বকালে ১৪৯০সালে অবশিষ্ট একটি রোপৌ ও একটি তাম্র মুদ্রা সুলতান নাসিরুদ্দিন শাহের আমলে ১৫২২ সালে জারিকৃত। এরপর বারবকাবাদ টাকশাল থেকে সম্ভবতঃ আর কোন মুদ্রা জারি করা হয়নি।

এই নগরীতে টাকশাল স্হাপন ও সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করে প্রাদেশিক মর্যাদায় উন্নীত করেন এবং উজির পদমর্যাদার কর্মকর্তা নিয়োগ প্রদান করেন।এরপর মাহীসন্তোষ বারবাকাবাদ নামে পরিচিতি লাভ করে। মোগল সম্রাট আকবরের দিওয়ান রাজা টোঢরমলের রাজস্ব সংস্কারের পর সমগ্র বাংলাদেশ ২৪টি সরকারে বিভক্ত করেন, তন্মধ্যে সরকার বারবাকাবাদ অন্যতম। সরকার বারবাকাবাদের অধীনে প্রায় সমগ্র বৃহত্তর রাজশাহী বিভাগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই সরকার ৩৮টি মহালে(পরগনায় )বিভক্ত ছিল, তার মধ্যে পরগনা সন্তোষ নামেরও উল্লেখ পাওয়া যায়।

মাহিসন্তোষ নামকরণের সার্থকতা:[সম্পাদনা]

মুসলিম যুগে হিন্দু বৌদ্ধ প্রভাব মুক্ত ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মায়িসন্তোষ ও মাহীসন্তোষ নামে অভিহিত করণের প্রবনতা লক্ষ্য করা যায়।এক্ষেত্রে প্রচলিত মতামতের বিশ্লেষণ হলো - কথিত আছে যে,মাছের পিঠে সওয়ার হয়ে এখানে একজন সুফীর আগমন ঘটেছিল। ফারসী ভাষায় মাহী শব্দের অর্থ মাছ। এছাড়াও উনিশ শতকের ইংরেজ গবেষক সহ প্রখ্যাত ঐতিহাসিকগণ বিভিন্ন নিবন্ধে মাহী সন্তোষ ও মায়ি সন্তোষ শব্দের ব্যবহার করেছেন। একজন মহিলা, পীর সাহেব ও অপরজন তার মেয়ে পাশাপাশি দুটি মাজারের প্রবেশপথে একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠার প্রস্তর লিপি উদ্ধার করা হয়েছিল। সেহেতু ফার্সি ভাষায় মায়ি শব্দের অর্থ মা আর গেন্জ্ঞ শব্দের অর্থ শহর। স্হানীয় লোকেরা এখনও ঐতিহাসিক মাহীসন্তোষকে মাহীগন্জ্ঞ বা মাইগন্জ্ঞ বলেই জানে।

নদীবন্দর ও অর্থনীতির কেন্দ্র হিসেবে মাহিসন্তোষ:

প্রাচীনকালে আত্রাই নদীর পলি বাহিত উর্বর সমৃদ্ধ এই জনপদে প্রচুর পরিমাণে ধান, পাট, ইক্ষু,তুলা, কার্পাস, রেশম, কমলা লেবু সহ অন্যান্য উৎপন্ন ফসল ও কৃষিজাত সামগ্রী ক্রয় বিক্রয়ের জন্য গড়ে ওঠা মাহীসন্তোষ বন্দরটি কালক্রমে একটি প্রসিদ্ধ নৌবন্দর হিসাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল।

মাহিসন্তোষের উর্বর ভূমিতে উৎপাদিত খাদ্যশস্য, চিনি, গুড়,ডাল সহ "গঙ্গাজল" নামের সূক্ষ্ম সুতিবস্ত্র "খাকি" নামীয় এক শ্রেণীর মোটা ও মজবুত বস্ত্রের প্রচুর চাহিদা থাকায় দেশ বিদেশের বণিকদের আগমন, শিল্পী, কারিগর,কামার, কুমোর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে বিপুল সংখ্যক লোকজনের বসবাস করার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সর্বোপরি রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার অনুষঙ্গটি যুক্ত ছিল বিধায় শহরায়ন প্রক্রিয়াটি ত্বরান্বিত হয়ে এক সময় বৃহৎ আকার ধারণ করেছিল। ক্রমাগতভাবে বিকশিত এই শহরটির আয়তন পাঁচ বর্গ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল।

সামরিক ঘাঁটি হিসেবে মাহীসন্তোষ:

দিগ্বিজয়ী বীর,মহাপরাক্রমশালী, প্রজারঞ্জক, মহানুভব রাজা মহীপালের (৯৫০-১০৪৩) রাজত্বকালেই মাহীসন্তোষ নগরী প্রতিষ্টিত হয়েছিল,এ বিষয়ে অধিকাংশ ঐতিহাসিক একমত পোষণ করেছেন। পাল রাজবংশের হৃত রাজ্য বঙ্গের রাজধানী গৌড় পুনরুদ্ধার করার পর কৌশলগত কারণেই তিনি মাহীসন্তোষে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করে বরেন্দ্র এলাকায় তাঁর শাসনের ভিত্তিকে সুদৃঢ় করেছিলেন।

পাল ও সেন যুগের অবসানের পর সুলতানি শাসন আমলে মাহীসন্তোষ গড়ের গুরুত্ব সম্পর্কে ইতিহাসে অনেক তথ্য জানা যায়। বখতিয়ার খিলজী তাঁর রাজধানী মালদহের লখনৌতি গৌড় থেকে উত্তর-পশ্চিম বঙ্গের প্রসিদ্ধ গঙ্গারামপুরের সন্নিকটে অবস্থিত দেবকোটে ( বর্তমানকালের দমদমা ? ) স্থানান্তরিত করেন। দেবকোট থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত মাহীসন্তোষ দুর্গ তিনি এবং তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর শিরান খলজী তত্ত্বাবধায়ন করতেন।১২০৬ সালে বখতিয়ার খিলজী আলী মর্দান খিলজী কর্তৃক নিহত হওয়ার পর শিরান খলজী সুলতান নির্বাচিত হন। এবার তিনিও আলী মর্দান খিলজীর ষড়যন্ত্রের কবলে পড়েন। আলী মর্দান খিলজীর প্ররোচনায় দিল্লির সুলতান কুতুবউদ্দিন শিরান খিলজীর বিরুদ্ধে অযোধ্যার শাসনকর্তা কায়েমাজ রুমীকে প্রেরণ করেন। শিরান খিলজী যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সুরক্ষিত মাহীসন্তোষ দুর্গে আত্মগোপন কালে খিলজী মালিকদের অন্তর্দ্বন্দ্বে নিহত হয়ে ১২০৮ সালে এখানেই সমাহিত হন।

মাহীসন্তোষ গড় দুর্গে ১৪৭৪ সালে সুলতানি শাসনাকালে স্মরণীয় মর্মান্তিক যুদ্ধ সংঘটিত হয়। পরাক্রমশালী কামরুপ রাজ কামেশ্বরের সঙ্গে হোসেন শাহী বংশের সেনাপতি গাজী ইসমাইলের এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। কামরূপ রাজ্য বিজয়ের জন্য যুদ্ধ অভিযানে সেনাপতি গাজী ইসমাইল সম্ভবতঃ প্রতি আক্রমণে পিছু হটে সুরক্ষিত মাহীসন্তোষ দূর্গে আশ্রয় গ্রহণ করে শত্রু পক্ষকে প্রতিহত করেছিলেন। যুদ্ধে ১২০ জন মুসলিম সৈন্য নিহত হলে তাদেরকে এখানেই সমাহিত করা হয়। বারোদুয়ারী মসজিদের নিকটে উত্তর দিকে প্রাচীর দিয়ে ঘেরা কবরটিই বীর সেনাদের গণকবর হিসেবে অনুমিত হয়। রাজধানী পান্ডুয়া থেকে দূরে মাহীসন্তোষে এই যুদ্ধ সংঘটিত হওয়ার যুক্তিসঙ্গত কারণ ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে, তদুপরি সুরক্ষিত মাহীসন্তোষ দূর্গের সামরিক গুরুত্ব সম্পর্কে ধারণা করা যায়।

এই যুদ্ধের পরবর্তীতে ঘোড়াঘাট দূর্গে পাল্টা আক্রমণে দিশেহারা কামেশ্বর রাজা মুসলিম সেনাপতি ইসমাইল গাজীর বীরত্বে ও তাঁর আধ্যাত্মিক গুনে মুগ্ধ হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন।কামরূপ কামাখ্যার রাজা কামেশ্বর মতান্তরে নীলাম্বর সহ সামরিক-বেসামরিক সর্বস্তরের লোকেরা বহুঈশ্বরবাদ পৌত্তলিক ধর্ম ত্যাগ করে একেশ্বরবাদ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করে।

মাহিসন্তোষ গড়ের ঐতিহ্যবাহী সরুপ:

মাহীসন্তোষ গড়ের যুদ্ধের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। এই যুদ্ধের ধারাবাহিকতায় ঘোড়াঘাটে সংগঠিত যুদ্ধের পর রংপুর, কোচবিহার,কামরূপসহ সমগ্র উত্তরবঙ্গে মুসলিম বিজয় বিস্তৃত হয়। গাজী উপাধি পাপ্ত জিন্দাপীর খ্যাত মুসলিম সাম্রাজ্য বিস্তারের পতাকাবাহী বীর সেনাপতিকে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মিথ্যা অভিযোগে সুলতানের আদেশে ঘোড়াঘাট দুর্গে শিরচ্ছেদ করা হয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী জানা যায় যে, গাজীর খন্ডিত মস্তক কাঁটাদুয়ারে,কর্তিত হস্ত ইসমাইল পুরে, ছিন্ন পদযুগল গড় মান্দারণে নিক্ষিপ্ত হয় এবং দেহ ঘোড়াঘাট যুদ্ধক্ষেত্রে পড়ে থাকে। এই সকল স্থানে পীর ইসমাইল গাজীর মাজার হিন্দু - মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে পবিত্র স্থান। পূর্বোক্ত চারটি মাজার বর্তমানকালেও জিয়ারত ,পূজা ও মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের কেন্দ্র স্থল হিসাবে গণ্য হয়।

বীরত্ব রূপে মাহিসন্তোষ:

কিংবদন্তির মহাপুরুষ গাজী ইসমাইলের বীরত্বগাথা ইতিহাসের এক বিশাল উপাখ্যান। সংক্ষিপ্ত পরিসরে বলা প্রয়োজন যে, অসাধারণ সাধু চরিত্র ও আধ্যাত্মিক জ্ঞান সম্পন্ন সাধক রূপে ইসমাইল গাজীর যেমন দেশজোড়া সুনাম ছিল। তদ্রুপ ন্যায়নীতি পরায়ন,পরোপকারী মহান শাসক রূপেও তাঁর খ্যাতি কম ছিল না। এজন্য জনশ্রুতি ও বিশ্বাসের রাজ্যে তিনি এমন একজন সক্ষম সামরিক পুরুষ যিনি যুগপৎভাবে অসাধারণ মাহাত্মে বুজুর্গ সুফী সাধকের মহিমায় পরিচিত এবং মরণোত্তর জীবনে একজন মহান পীরের দুর্লভ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত।

মোঘল আমলে মাহিসন্তোষ:

মোগল শাসনামলেও সরকার বারবকাবাদ এর মর্যাদা অক্ষুন্ন ছিল। যুগ শ্রেষ্ঠ মহামতি সম্রাট আকবরের দিওয়ান রাজা টোডরমল ১৫৮২ সালে বাংলাদেশকে১৯টি ও বিহারকে ৫টি মোট ২৪টি সরকারে বিভক্ত করেন।তন্মধ্যে পরগনা সন্তোষ কেন্দ্রীক সরকার বারবকাবাদ অখন্ড দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া জেলা এবং পাবনা ও বৃহত্তর রাজশাহী জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ছিল। মুঘল শাসনামলে মাহীসন্তোষ দুর্গের বারবকাবাদ সরকার দিল্লিকে ৫০টি মতান্তরে ৫০০টি অশ্ব এবং ৭০০০ পদাতিক সৈন্য সরবরাহ করতো। সম্রাট আকবরের নবরত্ন সভার অন্যতম সদস্য ও প্রখ্যাত ঐতিহাসিক আবুল ফজল রচিত প্রসিদ্ধ "আকবরনামা" গ্রন্থের বর্ণনা থেকে এসব তথ্য জানা যায়।

সম্রাট আকবরের শাসনকালে ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে বাংলার শেষ সুলতান দাউদ কাররানীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে উত্তর ও পশ্চিম বাংলা মোগল সাম্রাজ্য ভুক্ত হয়। সুলতানি শাসনামলেই বাংলাদেশে স্বাধীন জমিদারি প্রথার উদ্ভব হয়। জমিদারদের মধ্যে বারো ভূঁইয়াদের নেতা ইশা খানের সেনাপতি ১৫৮৩ সালে উত্তর পশ্চিম বাংলার তৎকালীন রাজধানী তান্ডা ও মাহীসন্তোষ দুর্গ দখল করে এবং অনতিকাল পরেই মোগলরা ঈসা খানের বাহিনীকে প্রতিহত করে রাজধানী তান্ভা ও মাহীসন্তোষ দুর্গের দখল পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।

মাহীসন্তোষ মাজারের উত্তর পূর্ব দিকে এবং মিঠাপুকুর (মহীপালের কীর্তি?) থেকে সামান্য উত্তরে মাহীসন্তোষ দুর্গ স্বাধীনতা উত্তোর কালে নব্বইয়ের এর দশক পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। রংপুর এলাকা থেকে আগত পরিযায়ী শ্রমিকরা এই প্রত্নসম্পদটি বিনষ্ট করে বসত বাড়ি নির্মাণ করেছে । নতুনভাবে গড়ে উঠা গ্রামটি ক্রমশঃ জনবহুল গ্রামে রূপান্তরিত হচ্ছে।

মাহিসন্তোষ গড়ের প্রত্নতত্ত্ব বিশ্লেষণ:[সম্পাদনা]

অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানে টিলা সাদৃশ্য এই প্রত্নস্থলকেই মাহীসন্তোষ গড় নামে অভিহিত করা হয়।এই গড়ের আয়তন উত্তর-দক্ষিণে ২২৫ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ১৭৫ মিটার প্রায়। আয়তাকার দুর্গটি সুউচ্চ প্রাচীর বেষ্টিত ছিল। দূর্গটিকে সুরক্ষিত করার পরিকল্পনায় আত্রাই নদীকে এর উত্তর এবং পশ্চিম দিক বিবেচনায় রেখে পূর্ব ও দক্ষিণে গভীর পরিখা খনন করে দুর্গটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছিল। পূর্ব দিকের পরিখাটি ভরাট হয়ে প্রায় সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ দিকের পরিখাটিতে বর্ষা মৌসুমে এবং বাণ- বণ্যায় জলপ্রবাহের আধিক্য থাকায় সেটির অপেক্ষাকৃত ক্ষীণকায় অস্তিত্ব এখনো বিদ্যমান আছে। এই প্রত্নস্থল থেকে উদ্ধারকৃত একটি জীর্ণ কামান ও কয়েকটি তরবারি কলিকাতা জাদুঘরে এবং রাজশাহী বরেন্দ্র জাদুঘরে অনুরূপ একটি কামান সংরক্ষিত আছে।

সম্পত্তির পরিমাণ:

স্থানীয় জনশ্রুতি থেকে জানা যায় উনিশ শতকেও মাহিসন্তোষের মসজিদ, মাদ্রাসা ও অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ২৭৫০ বিঘা লাখেরাজ সম্পত্তি ছিল। বলা বাহুল্য যে, মুসলিম যুগে এমন অনুদানের পরিমাণ ছিল আরো অনেক বেশি।

মাহীসন্তোষের ক্ষমতা হ্রাস:

আবার এই শহরটির অবনমনও শুরু হয় একই কারণে। বাংলায় মুসলিম রাজ্যের সীমানা বৃদ্ধি পাওয়ায় এবং রাজধানী স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে মাহিসন্তোষ দুর্গের গুরুত্ব হ্রাস পায়।

১৫৭৫ সালে গৌড়ে মহামারীতে হাজার হাজার মানুষ মারা যাওয়াতে সুবাদার মুমিন খাঁন গৌড় থেকে তান্ডায় রাজধানী স্থানান্তর করেন। পরবর্তী সময়ে এখান থেকে রাজমহলে এবং আরো পরে ঢাকায় রাজধানী স্থানান্তর করা হয়।ষোল শতকের শেষের দিকে অনেকাংশে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে শহরটি।রাজধানীর সঙ্গে দূরত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বারবকাবাদ শহরের গুরুত্ব ক্রমান্বয়ে হ্রাস পায়। অবশ্য এ সময়ে শহরটি একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায়নি। এটি মোটামুটিভাবে মোগল যুগ পর্যন্ত টিকে ছিল। মোগল ঐতিহাসিক আবুল ফজলের বর্ণনায় বারবকাবাদ শহরের উল্লেখ রয়েছে। উল্লেখ্য যে, সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের শাসনামলে (১৪৫৯-১৪৭৪ খ্রিঃ) মাহিসন্তোষ প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদায় উন্নীত হয়ে বারবকাবাদ নামে পরিচিতি লাভ করে। সম্রাট আকবর বারবকাবাদকে বাংলা সুবার অন্যতম সরকারের মর্যাদা দেন মাহিসন্তোষ কেন্দ্রিক এ সরকার দিনাজপুর, রংপুর, বগুড়া, রাজশাহী ও পাবনা জেলার অংশবিশেষ নিয়ে গঠিত ছিল।

নবাব মুর্শিদকুলি খান রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনয়নের জন্য ১৭২২ খ্রিস্টাব্দে বাংলা সুবাকে ১৩ টি চাকলায় এবং ১৬৬০টি পরগনায় বিভক্ত করেন। এতে বারবকাবাদ পরগনার কোন উল্লেখ নাই।

পরবর্তীকালে সম্ভবত মোগল যুগের শেষ ভাগে মহামারী বা অন্য কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে শহরটি পরিত্যক্ত হয়।

স্থাপত্য[সম্পাদনা]

২.২৫ মি পুরু দেওয়াল বিশিষ্ট আয়তাকার (বাইরে থেকে পরিমাপ ২৪ মি × ১৬.২০ মি) মসজিদটির চারকোণে চারটি অর্ধ অষ্টভুজাকার পার্শ্ববুরুজ ছিল। এগুলি ইট এবং পাথর দিয়ে নির্মিত। অভ্যন্তরভাগে ইট দিয়ে নির্মিত মসজিদটির ভেতর এবং বাইরের দেওয়ালের সম্মুখভাগ পাথরের ফলক দ্বারা আবৃত। মসজিদে প্রবেশের জন্য সম্মুখভাগে পাঁচটি প্রবেশপথ ছিল। খুব সম্ভবত কেন্দ্রীয় প্রবেশপথটি পাশের প্রবেশ পথগুলি অপেক্ষা বৃহদাকারের ছিল। উত্তর ও দক্ষিণের প্রতিপার্শ্বে তিনটি করে প্রবেশ পথ ছিল। প্রতি সারিতে চারটি করে দুই সারি প্রস্তর স্তম্ভের সাহায্যে মসজিদের অভ্যন্তর ভাগ (১৯.৫০ মি × ১১.৭০ মি) বিভক্ত করা হয়েছিল। ঘনক (cube) আকৃতির পাথরের ভিত্তির উপর প্রতিটি স্তম্ভ ছিল দন্ডায়মান। বর্গাকার প্রতিটি স্তম্ভের দন্ড (Shaft) তিনটি অংশে বিভক্ত। সর্বনিম্নের অংশের পরিমাপ ০.৪০ মি এবং এর গায়ে ছিল ত্রিকোণাকার নকশা। মাঝের অংশের পরিমাপ ১.৫৫ মি। এখানে শিকল এবং ঘণ্টার নকশা দেখা যায়। সবচেয়ে উপরের বহুভুজ (১৬ বাহু বিশিষ্ট) আকৃতির অংশটির পরিমাপ ০.৯৬ মি। এই অংশে শিকল ও ঘণ্টার নকশা এবং অর্ধ বৃত্তাকার ঝুলন্ত মুক্তার নকশা রয়েছে।

মসজিদের কেন্দ্রীয় ‘নেভ’ পাশের অংশ অপেক্ষা বড় এবং তিনটি আয়তাকার প্রকোষ্ঠে বিভক্ত। এগুলির ছাদ সম্ভবত বাংলা চৌচালা রীতির খিলান ছাদে (Vault) আচ্ছাদিত ছিল। আর এর দুপাশের অংশ দুটি সম্ভবত আচ্ছাদিত ছিল সর্বমোট ১২টি অর্ধগোলাকার গম্বুজে। আচ্ছাদনের এই ব্যবস্থা বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদ এর (১৪৫৯ খ্রি) সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

সম্মুখভাগের প্রবেশ পথের সমান্তরালে কিবলা দেওয়ালে রয়েছে পাঁচটি মিহরাব। কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পাশেরগুলি অপেক্ষা সামান্য বড়। মিহরাবটি বর্তমানে বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। মূলত এই মিহরাবটি একটি পাথরখন্ড দিয়ে নির্মিত এবং সুন্দর অলংকরণে সজ্জিত। শিকল ও ঘণ্টা, পদ্ম এবং তালপত্র নকশা (Palmette) প্রধান মোটিফ হিসেবে ব্যবহূত হয়েছে। উত্তর দিকের শেষ মিহরাবটির অভ্যন্তরে সুন্দরভাবে খোদাইকরা নকশা এখনও দৃশ্যমান। এটি দেখে মনে হয় পাথরের তিনটি টুকরো দিয়ে এটি নির্মিত। মিহরাবের কুলুঙ্গির কেন্দ্রীয় অংশ শিকল এবং ঘণ্টা নকশায় অলংকৃত। শিকল নকশার পাশে একটি ঝুলন্ত পুতির মালার নকশা ছিল। শিকল নকশার নিম্নাংশে ছিল ঝুলন্ত প্রস্ফুটিত পদ্মের নকশা। পাথরের টুকরাগুলির পার্শ্ববর্তী প্রান্তে গোলাকার এবং বর্গাকৃতির জ্যামিতিক নকশা আছে। মিহরাবের উপর এবং নিম্নভাগে সংযুক্ত গোলাপ নকশা এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে। এখানে ব্যবহূত শিকল এবং ঘণ্টার নকশার সঙ্গে দরসবাড়ি মসজিদ, ছোটসোনা মসজিদ এবং কুসুম্বা মসজিদ এর শিকল ও ঘণ্টা নকশার ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য রয়েছে।

মসজিদের আশে পাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা পাথরখন্ডের গায়ে অলংকরণের চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়। এই অলংকৃত পাথরখন্ড প্রমাণ করে যে, মসজিদের বাইরের দেওয়ালে পাথরে খোদাই করা অলংকরণ ছিল। আলংকারিক অংশগুলি মূলত জ্যামিতিক আকারের ফুলের নকশা, তালপত্র, খোটা (Nailheads), ত্রিভুজাকৃতির, প্যাঁচানো, শিকল ও ঘণ্টার নকশা এবং অর্ধবৃত্তাকার ঝুলন্ত হারের নকশা প্রভৃতি মোটিফ দিয়ে অলংকৃত ছিল। এখান থেকে বেশ কিছু পোড়ামাটির অলংকৃত ফলকের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গম্বুজের ড্রামের অভ্যন্তরে অলংকরণ হিসেবে এই পোড়ামাটির অলংকৃত ফলক ব্যবহূত হয়েছে। অলংকরণের এই পদ্ধতিও দরসবাড়ি, ছোটসোনা এবং কুসুম্বা মসজিদ এ দেখা যায়।

বহিঃস্থ নকশা[সম্পাদনা]

অন্তঃস্থ্য নকশা[সম্পাদনা]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

এই প্রত্নস্থল উৎখনন করতে গিয়ে বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি একটি শিলালিপি আবিষ্কার করে। এই শিলালিপি থেকে জানা যায় যে, ৯১২ হিজরি/১৫০৬ খ্রিস্টাব্দে আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এর আমলে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। অতি সম্প্রতি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নেওয়ার সময় আরেকটি শিলালিপি পাওয়া যায়। বর্তমানে এটি নতুন করে নির্মিত কাঁচা মসজিদের সম্মুখে স্থাপিত রয়েছে। শিলালিপিটি দুই সারিতে কালো কষ্টি পাথরে খোদাই করা। এটি সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহের আমলে জনৈক উলুগ খান হাসান কর্তৃক ৮৬৭ হিজরি/১৪৬৩ খ্রিস্টাব্দে একটি মসজিদ নির্মাণের স্মারক। দুটি শিলালিপি থেকে ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদটির নির্মাণকাল সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন উত্থাপিত হয়- মসজিদটি কি সুলতান বারবক শাহ এর আমলে, নাকি আলাউদ্দীন হোসেন শাহ এর আমলে নির্মিত; এটি কি সুলতান বারবক শাহের সময়ে নির্মিত এবং আলাউদ্দীন হোসেন শাহের সময়ে পুনঃনির্মাণ করা হয়েছিল; অথবা এই দুটির মধ্যে একটি শিলালিপি কি বাইরে থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং এটা কি মসজিদের ভিতরের সুরক্ষিত অবস্থায় রাখা ছিল? উপরিউক্ত কোন সম্ভাবনার পক্ষে যুক্তি দেখানোর উপায় নেই। তবে এটা খুবই সম্ভব যে [সুলতান আহমেদ]

মাহীসন্তোষ মসজিদ নওঁগা জেলার ধামইর হাট থানা সদর থেকে প্রায় ১৩ কিমি উত্তর-পশ্চিমে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের নিকটবর্তী এলাকায় অবস্থিত। প্রাক মুসলিম আমল থেকেই পরিচিত মাহীসন্তোষ এলাকাটি সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ এর আমলে (১৪৫৯-১৪৭৪) গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুলতান রুকনুদ্দীন বারবক শাহ এখানে একটি টাকশাল স্থাপন করেন এবং এটি তাঁর নামানুসারে বারবকাবাদ নামে পরিচিতি লাভ করে। এই শহরটির বিভিন্ন অংশে এখনও অনেকগুলি প্রত্নতাত্ত্বিক সম্ভাবনাময় ঢিবি দেখতে পাওয়া যায়। ১৯১৬ সালে বরেন্দ্র রিসার্চ সোসাইটি এই মসজিদটির ধ্বংসাবশেষ যুক্ত ঢিবিটিতে উৎখনন করে। তখন মসজিদটির সামান্য অংশ উন্মোচিত হয়েছিল। অতি সম্প্রতি স্থানীয় লোকজন জঙ্গল এবং মসজিদের ঢিবির ধবংসাবশেষ সরিয়ে ফেলে পুরানো মসজিদটির উপরে জুমার নামায পড়ার উদ্দেশ্যে নতুন একটি চৌচালা টিনের ছাদে আবৃত মসজিদ নির্মাণ করেছে। বর্তমানে টিকে থাকা বৈশিষ্ট্য থেকে এই মসজিদের আদি পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা করা সম্ভব।

চিত্রশালা[সম্পাদনা]

আরোও দেখুন[সম্পাদনা]

-->

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. আহমেদ, সুলতান (২০১৪)। "মাহীসন্তোষ মসজিদ"। ইসলাম, সিরাজুল; জামাল, আহমেদ এ.। বাংলাপিডিয়া (দ্বিতীয় সংস্করণ)। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ 

সহায়ক গ্রন্থঃ

১। কাজী মোহাম্মদ মিছের, রাজশাহী জেলার ইতিহাস -২য়খন্ড,পৃঃ১৭০-১৭৭।

২। ডঃ মুহম্মদ আব্দুর রহিম, ডঃ আবদুল মমিন চৌধুরী, ডঃ এ,বি, এম মহিউদ্দীন মাহমুদ,ডঃ সিরাজুল ইসলাম "বাংলাদেশের ইতিহাস;পরিবর্ধিত ও পরিমার্জিত সংস্করণ,পৃঃ১৪০-১৪২,১৮২,২৫৫,২৫৬।

৩। ড. ম. রেজাউল করিম "ধামইরহাট- পত্নীতলা;ইতিহাস ও ঐতিহ্য, প্রাচীন নগর মাহিসন্তোষ: ইতিহাস ও ঐতিহ্য, পৃঃ ১০৩,১০৪।

৪।মেহে্রাব আলী, দিনাজপুরে ইসলাম,পৃঃ ১১০-১২৭,১৩৭-১৪৪।

৫। আব্দুল করিম ( অধ্যাপক অবঃ), মাহিসন্তোষের ইতিহাস, পৃঃ ২০-২২।

৬। বরেন্দ্র জীবনী গ্রন্থমালা-৩ ঐতিহাসিক মাহিসন্তোষের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ তাকি উদ্দিন আল আরাবী,মাহবুব সিদ্দিকী,পৃঃ ৩৬,৪৪,৪৬,৪৮

৭। ধামইরহাট-পত্নীতল;ইতিহাস ও ঐতিহ্য পৃঃ ১০৪,১০৯ -১১৪।

৮। ঐতিহাসিক মাহির সন্তোষের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ তাকিউদ্দিন আল আরাবী পৃঃ ৬২,১৩২-১৩৫।

৯। ধামইরহাট উপজেলা পরিষদ কর্তৃক " উদ্ভাস" পত্রিকায় প্রকাশিত অধ্যক্ষ মো শহীদুল ইসলামের "ধামইরহাট উপজেলার ইতিহাস ঐতিহ্য ও প্রাসঙ্গিক আলোচনা" শিরোনামে প্রবন্ধ থেকে সংগৃহীত

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]

১.হাজার বছরের স্মৃতি ধামইরহাটের মাহিসন্তোষ[সম্পাদনা]