মুন্সি আব্দুর রউফ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
মুন্সী আব্দুর রউফ
Munshi Abdur Rouf.Birsershtho.jpg
জন্ম ১ মে, ১৯৪৩
সালামতপুর, ফরিদপুর
মৃত্যু ২০ এপ্রিল, ১৯৭১
বুড়িঘাট, মহালছড়ি
জাতীয়তা বাংলাদেশী
জাতিসত্তা বাঙালি
নাগরিকত্ব  বাংলাদেশ
যে জন্য পরিচিত বীরশ্রেষ্ঠ
ধর্ম ইসলাম

মুন্সী আব্দুর রউফ (জন্ম: ১ মে ১৯৪৩[১] মৃত্যু: ২০ এপ্রিল, ১৯৭১), মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসের ল্যান্স নায়েক[২] হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবপ্রাপ্ত[৩][৪] একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। তিনি ১৯৬৩ সালের ৮ মে পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলসে যোগদান করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের সময়ে তিনি নিয়মিত পদাতিক সৈন্য হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের বুড়িমারীতে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ সমরে ১৯৭১ সালের ১৮ এপ্রিল তিনি মর্টারের আঘাতে শহীদ হন। তাকে রাঙামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলায় একটি টিলার ওপর সমাহিত করা হয়[৫]

জন্ম ও শৈশব[সম্পাদনা]

মুন্সি আব্দুর রউফ ১৯৪৩ সালের ১ মে ফরিদপুর জেলার মধুখালী উপজলোর (পূর্বে বোয়ালমারী উপজেলার অন্তর্গত) সালামতপুরে (বর্তমান নাম রউফ নগর)[৬] গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।[৭] তাঁর বাবা মুন্সি মেহেদি হাসান ছিলেন স্থানীয় মসজিদের ইমাম এবং মাতা মুকিদুন্নেছা। তাঁর ডাকনাম ছিলো রব। তাঁর দুই বোনের নাম ছিল জোহরা এবং হাজেরা।[৮] তিনি সাহসী ও মেধাবী ছিলেন কিন্তু লেখাপড়ার প্রতি ঝোঁক ছিলো না। শৈশবে তাঁর বাবার কাছে লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয়।

শিক্ষা ও কর্মজীবন[সম্পাদনা]

১৯৫৫ সালে তাঁর পিতার মৃত্যুর পর তিনি বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেন নি। সংসারের হাল ধরতে অষ্টম শ্রেণিতে লেখাপড়া ছেড়ে দিয়ে ১৯৬৩ সালের ৮ মে আব্দুর রউফ যোগ দেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসে। সেসময় তাকে ৩ বছর বেশি বয়স দেখাতে হয়েছিলো চাকুরীটি পাবার জন্য। চুয়াডাঙ্গার ইআরপি ক্যাম্প থেকে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ শেষ করে আব্দুর রউফ উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য পশ্চিম পাকিস্তানে যান। ছয়মাস পরে তাকে কুমিল্লায় নিয়োগ দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ স্বাধীনতা যুদ্ধের শুরুতে চট্টগ্রামে ১১ নম্বর উইং এ কর্মরত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগদান করেন।[৯], [১০] [১১] [১২] [১৩]

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা[সম্পাদনা]

১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে মুন্সী আব্দুর রউফ তাতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন করেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে তিনি চট্টগ্রামে ১১ উইং এ চাকুরিরত ছিলেন। তিনি মাঝারি মেশিনগান ডিপার্টমেন্টের ১ নং মেশিনগান চালক হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করতেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তিনি অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি-মহালছড়ি জলপথে[১৪] দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এই জলপথ দিয়ে পাকিস্তানী সশস্ত্র বাহিনীর চলাচল প্রতিরোধের দায়িত্ব পরে তার কোম্পানির উপর। কোম্পানিটি বুড়িঘাট এলাকার চিংড়িখালের দুই পাড়ে অবস্থান নিয়ে গড়ে তুলে প্রতিরক্ষা ঘাঁটি।

৮ এপ্রিল পাকিস্তানী বাহিনির দুই কোম্পানি সৈন্য মর্টার, মেশিনগান ও রাইফেল নিয়ে বুড়িঘাটের মুক্তিবাহিনীর নতুন প্রতিরক্ষা ঘাঁটিকে বিধ্বস্ত করতে সাতটি স্পিডবোট এবং দুটো লঞ্চ নিয়ে এগিয়ে আসতে থাকে। এটি ছিলো পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় কমান্ডো ব্যাটেলিয়নের কোম্পানি। [১৫] । মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কাছাকাছি পৌঁছেই পাকিস্তান বাহিনী আক্রমণ শুরু করে। স্পিড বোট থেকে মেশিনগানের গুলি এবং আর লঞ্চ দুটো থেকে তিন ইঞ্চি মর্টারের শেল নিক্ষেপ করছিলো মুক্তিযোদ্ধাদের দিকে। পাকিস্তানী বাহিনীর উদ্দেশ্য ছিলো রাঙামাটি-মহালছড়ির জলপথ থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের পিছু হটিয়ে নিজেদের অবস্থান প্রতিষ্ঠা।

অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের মুক্তিযোদ্ধারাও প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরিখায় পজিশন নিয়ে নেয়। কিন্তু পাকিস্তানী বাহিনীর গোলাগুলির তীব্রতায় প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভেঙ্গে যায় এবং তারা মুক্তিযোদ্ধাদের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করে ফেলে। যুদ্ধের এই পর্যায়ে প্রতিরক্ষা ঘাঁটির কমান্ডার আব্দুর রউফ বুঝতে পারলেন, এভাবে চলতে থাকলে ঘাঁটির সকলকেই পাকিস্তানী বাহিনীর হাতে মৃত্যু বরণ করতে হবে। তিনি তখন কৌশলগত কারণে পশ্চাদপসারণের সিদ্ধান্ত নিলেন। এই সিদ্ধান্ত সৈন্যদের জানানো হলে সৈন্যরা পিছু হটতে লাগল। পাকিস্তানী বাহিনী তখন আরো এগিয়ে এসেছে, সকলে একযোগে পিছু হটতে থাকলে আবারো একযোগে সকলকেই মৃত্যবরণ করতে হতে পারে ভেবে আব্দুর রউফ পিছু হটলেন না। সহযোদ্ধাদের পিছু হটার সুযোগ করে দিতে নিজ পরিখায় দাঁড়িয়ে অনবরত গুলি করতে লাগলেন পাকিস্তানী স্পিড বোটগুলোকে লক্ষ্য করে। পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে একা কৌশলে লড়ছিলেন তিনি। সাতটি স্পিড বোট একে একে ডুবিয়ে দিলে পাকিস্তানী বাহিনী তাদের দুটি লঞ্চ নিয়ে পিছু হটতে বাধ্য হয়। লঞ্চ দুটো পিছু হটে রউফের মেশিনগানের গুলির আওতার বাইরে নিরাপদ দুরত্বে অবস্থান নেয়। পাকিস্তানী বাহিনী এরপর লঞ্চ থেকে মর্টারের গোলা বর্ষণ শুরু করে। মর্টারের গোলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা রউফের একার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। একটি মর্টারের গোলা তার বাঙ্কারে এসে পরে এবং তিনি মৃত্যু বরণ করেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যুর আগে সহযোগী যোদ্ধারা সবাই নিরাপদ দুরত্বে পৌঁছে যেতে পেরেছিলো। সেদিন আব্দুর রউফের আত্মত্যাগে তাঁর কোম্পানীর প্রায় ১৫০ জন মুক্তিযোদ্ধার জীবন রক্ষা পায়।

রাঙামাটির নানিয়ার চরে তার কবর

সমাধিস্থল[সম্পাদনা]

শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফের সমাধি পার্বত্য জেলা রাঙামাটির নানিয়ার চরে অবস্থিত। তাঁর অপরিসীম বীরত্ব,সাহসীকতা ও দেশপ্রেমের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে সর্ব্বোচ সম্মান বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত করে। বাংলাদেশ রাইফেলস ১৯৭৩ সালে সিপাহী মুন্সী আবদুর রউফকে অনরারি ল্যান্স নায়েক পদে মরনোত্তর পদোন্নতি দান করে।[১৬]

সম্মাননা[সম্পাদনা]

২০১৪-এ পিলখানায় বাংলাদেশ রাইফেলস কলেজের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজ[১৭][১৮] তার স্মৃতিতে শালবাগান,চট্রগ্রাম-রাঙ্গামাটি সড়ক,সাপছড়ির মধ্যবর্তী স্থানে ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকসন ব্যাটালিয়ন (ECB-16)একটি স্মৃতিস্তম্ভ তৈরী করেছে।[১৯] মানিকছড়ি, মুসলিম পাড়া, মহালছড়ি,খাগড়াছড়ি এর একটি হাই স্কুল তারঁ নামে রাখা হয়েছে। [২০] সিলেটের একটি ক্রিকেট স্টেডিয়াম তার নামে রাখা হয়েছে।[২১] ফরিদপুর জেলার একটি কলেজ তারঁ নামে রাখা হয়েছে,যেটি সরকারীকরণ করা হয়েছে।[৬]

চিত্রমালা[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. প্রথম আলো
  2. Shaon, Ashif Islam। "At Pilkhana Darbar Hall, Hasina lauds BGB role"dhakatribune.com। Dhaka Tribune। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  3. Unb। "War heroes honoured"archive.thedailystar.net। The Daily Star। সংগৃহীত ১৮ জুন ২০১৫ 
  4. দৈনিক প্রথম আলো, "তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না"| তারিখ: ১৯-১২-২০১২
  5. General Information। "Bank Protective Work along the Graveyard of Bir Sharsta Munshi Abdur Rouf in Kaptai Lake of Upazila Naniarhcar dist: Rangamati Hill District form Km. 0.00 to 0.070 Km = 70m in Connection"dgmarket.com। dgmarket.com। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  6. ৬.০ ৬.১ Staff। "Birshreshtha Rouf's mother expresses gratitude to govt"newstoday.com.bd। Editor on behalf of Newscorp Publications Limited। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  7. Bangladesh Sangbad Sangstha। "Bir Sreshtha Rouf’s mother laid to rest"newagebd.net। the Chairman, Editorial Board ASM Shahidullah Khan on behalf of Media New Age Ltd। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  8. Alam, Rafiul। "Unforgettable Heroes of Bangladesh"albd.org। Bangladesh Awami League। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  9. যুগান্তর
  10. মানবকণ্ঠ
  11. সমকাল
  12. কালেরকণ্ঠ
  13. যায় যায় দিন
  14. Contributor। "BIR SRESHTHOS OF LIBERATION WAR OF BANGLADESH"amader-kotha.com। amader-kotha.com। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  15. Ahmed, Mostak। "MOSTAK AHMED March 27, 2012 Famous people in Bangladesh history (Part – I)"bangladesh-travel-assistance.com। Bangladesh Travel Assistance। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  16. মুন্সী আব্দুর রউফ
  17. Mia, Sajeeb। "Heading to 'Baisabi'"en.prothom-alo.com। Prothom Alo। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  18. Admin। "Latest News"abdurroufcollege.ac.bd। Birshrestha Munshi Abdur Rouf Public College। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  19. Chakma, Shantimoy। "MA Rouf Square in Rangamati"archive.thedailystar.net। The Daily Star। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  20. Staff। "Bir Shresto Munshi Abdur Rouf High School"somogrobangladesh.com। Somogro Bangladesh। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 
  21. Ministry of Sports। "Cricket"nsc.gov.bd। National Sports Council। সংগৃহীত ১৯ জুন ২০১৫ 

বহি:সংযোগ[সম্পাদনা]