মোহাম্মদ রুহুল আমিন
মোহাম্মদ রুহুল আমিন | |
|---|---|
| জন্ম | ১৯৩৫ বাঘপাঁচড়া গ্রাম, নোয়াখালী |
| মৃত্যু | ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১ (বয়স ৩৫–৩৬) |
| জাতীয়তা | বাংলাদেশি |
| পেশা | ইআরএ-১ (ইঞ্জিন রুম আর্টিফিসার-১) |
| পরিচিতির কারণ | বীর শ্রেষ্ঠ |
মোহাম্মদ রুহুল আমিন (১৯৩৫ - ১০ ডিসেম্বর ১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী একজন শহিদ মুক্তিযোদ্ধা। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধে চরম সাহসিকতা আর অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ যে সাতজন বীরকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মান “বীর শ্রেষ্ঠ” উপাধিতে ভূষিত করা হয় তিনি তাদের অন্যতম।[১]
জন্ম
[সম্পাদনা]মোহাম্মদ রুহুল আমিন ১৯৩৫ সালে নোয়াখালী জেলার সোনাইমুড়ি উপজেলার বাঘপাঁচড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আজহার পাটোয়ারী এবং মাতার নাম জোলেখা খাতুন।[২] তিনি ছিলেন বাবা মায়ের প্রথম সন্তান। তারা ছিলেন ছয় ভাই বোন।
শিক্ষাজীবন
[সম্পাদনা]তিনি বাঘপাচঁড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে আমিশাপাড়া কৃষক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখান থেকে মেট্রিক পাস করেন।
কর্মজীবন
[সম্পাদনা]মোহাম্মদ রুহুল আমিন এসএসসি পাশ করে ১৯৫৩ সালে জুনিয়র মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে পাকিস্তান নৌবাহিনীতে যোগদান করেন।[৩] নৌবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেয়ার জন্য তিনি যান করাচির নিকটবর্তী আরব সাগরে মধ্যে অবস্থিত মানোরা দ্বীপে পাকিস্তানি নৌঘাঁটি (পি.এন.এস) বাহাদুরে। প্রাথমিক প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর সেখান থেকে পি.এন.এস. কারসাজে যোগদান করেন। পরবর্তীতে পি.এন.এস বাবর, পি.এন.এস খাইবার এবং পি.এন.এস তুঘরিলে দক্ষতার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ সালে পেশাগত প্রশিক্ষণ শেষ করেন। ১৯৬৫ সালে মেকানিসিয়ান কোর্সের জন্য নির্বাচিত হন। পি.এন.এস. কারসাজে কোর্স সমাপ্ত করার পর আর্টিফিসার পদে নিযুক্ত হন। ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রাম পি.এন.এস. বখতিয়ার নৌঘাঁটিতে বদলি হয়ে যান। ১৯৭১ সালের এপ্রিলে ঘাঁটি থেকে পালিয়ে যান। বাড়িতে গিয়ে ছাত্র, যুবক ও সামরিক আধাসামরিক বাহিনীর লোকদের মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেন। এর কিছুদিন পর ভারতের ত্রিপুরা সীমান্ত অতিক্রম করে আগরতলা সেক্টর প্রধান কোয়ার্টারে যান এবং সেখানে মেজর শফিউল্লাহর অধীনে ২ নম্বর সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে থেকে বিভিন্ন স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা
[সম্পাদনা]১৯৭১ সালের মার্চে রুহুল আমিন চট্টগ্রামে কর্মরত ছিলেন৷ একদিন সবার অলক্ষ্যে সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে বের হয়ে পড়েন নৌঘাঁটি থেকে৷ পালিয়ে সীমান্ত পার হয়ে তিনি চলে যান ত্রিপুরা৷ যোগ দেন ২ নং সেক্টরে৷ মেজর শফিউল্লাহের নেতৃত্বে ২ নং সেক্টরে তিনি সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন এবং স্থলযুদ্ধের বিভিন্ন অভিযানে যোগ দেন৷ ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়৷ এ উদ্দেশ্যে নৌবাহিনীর সদস্যদের যাঁরা বিভিন্ন সেক্টর ও সাব-সেক্টরে থেকে মুক্তিযুদ্ধ করছিলেন তাদেরকে সেপ্টেম্বর মাসে একত্রিত করা হয় আগরতলায় এবং গঠন করা হয় ১০ নং সেক্টর। ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিন নৌবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে আগরতলায় একত্রিত হয়ে কলকাতায় আসেন এবং যোগ দেন ১০ নং নৌ সেক্টরে৷ পরবর্তীকালে অবস্থার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নিজস্ব একটি নৌবাহিনী তৈরির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। ভারতীয় নৌবাহিনীর ক্যাপ্টেন মণীন্দ্রনাথ সামন্তের সার্বিক তত্ত্বাবধানে বিভিন্ন সেক্টর ও সাব-সেক্টর থেকে নৌবাহিনীর সদস্যদের একত্রিত করার ব্যবস্থা করা হয়। আর এ উদ্যোগের ফলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গঠিত হলে কলকাতায় চলে আসেন। ভারত সরকার বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী কে কলকাতা বন্দরে গার্ডেনরিচ ডক ইয়ার্ডে দুইটি গানবোট উপহার দেয়।[৪] সেখানে প্রতিটি বোটে কানাডীয় ধরনের ২টি বাফার গান লাগিয়ে এবং ব্রিটিশ ধরনের ৫০০ পাউন্ড ওজনের ৪টি মার্কমাইন বহনের উপযোগী করে গানবোটে রূপান্তর করা হয়। গানবোটগুলোর নামকরণ করা হয় 'পদ্মা' ও 'পলাশ'। রুহুল আমিন পলাশের প্রধান ইঞ্জিনরুমে আর্টিফিসার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে যশোর সেনানিবাসের পতন ঘটে। পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটতে থাকে। সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর নিয়ন্ত্রিত খুলনাস্থ নৌঘাট দখল করার পরিকল্পনা নিয়ে ভারতীয় গানবোট পাভেলের সাথে যুক্ত হয়ে ১০ ডিসেম্বর মংলা বন্দরে পৌঁছায়। সেখানে পাকিস্তানি সেনা ও নৌবাহিনী আত্মসমর্পণ করে। 'পলাশ' ও 'পদ্মা' মংলা বন্দর হয়ে খুলনার দিকে রওয়ানা দেয়। গানবোট 'পাভেল' সামনে আর পেছনে 'পলাশ' ও 'পদ্মা'।
যেভাবে শহীদ হলেন
[সম্পাদনা]

৬ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনী যশোর সেনানিবাস দখলের পর পদ্মা, পলাশ এবং ভারতীয় মিত্রবাহিনীর একটি গানবোট 'পাভেল' খুলনার মংলা বন্দরে পাকিস্তানি নৌঘাঁটি পি.এন.এস. তিতুমীর দখলের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ১০ ডিসেম্বর দুপুর ১২টার দিকে গানবোটগুলো খুলনা শিপইয়ার্ডের কাছে এলে অনেক উচুঁতে তিনটি জঙ্গি বিমানকে উড়তে দেখা যায়। শত্রুর বিমান অনুধাবন করে পদ্মা ও পলাশ থেকে গুলি করার অনুমতি চাওয়া হয়। কিন্তু অভিযানের সর্বাধিনায়ক ক্যাপ্টেন মনেন্দ্রনাথ ভারতীয় বিমান মনে করে গুলিবর্ষণ থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।
এর কিছুক্ষণ পরে বিমানগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে নিচে নেমে দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে গিয়ে ঘুরে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের জাহাজগুলোর উপর আচমকা গুলিবর্ষণ শুরু করে। প্রথম গোলা এসে পড়ে 'পদ্মা'য় এবং পরবর্তীতে 'পলাশে'। গোলা সরাসরি 'পদ্মা'র ইঞ্জিন রুমে আঘাত করে ইঞ্জিন বিধ্বস্ত করে। হতাহত হয় অনেক নাবিক। 'পদ্মা'-র পরিণতিতে পলাশের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কমান্ডার রায় চৌধুরী নাবিকদের জাহাজ ত্যাগের নির্দেশ দেন। রুহুল আমিন এই আদেশে ক্ষিপ্ত হন। তিনি উপস্থিত সবাইকে যুদ্ধ বন্ধ না করার আহ্বান করেন। কামানের ক্রুদের বিমানের দিকে গুলি ছুঁড়তে বলে ইঞ্জিন রুমে ফিরে আসেন। তবে বিমানগুলো উপর্যুপরি বোমাবর্ষণ করে পলাশের ইঞ্জিনরুম ধ্বংস করে দেয়। আহত হন রুহুল আমিন, তারপরও তিনি চেষ্টা চালিয়ে যান 'পলাশ'কে বাঁচানোর। তবে ইঞ্জিন বিকল হয়ে আগুন ধরে যায় এবং গোলার আঘাতে রুহুল আমিনের ডান হাতটি সম্পূর্ণ উড়ে যায়।
অবশেষে পলাশের ধ্বংশাবশেষ পিছে ফেলেই আহত রুহুল আমিন ঝাঁপিয়ে পড়েন রূপসা নদীতে এবং একসময় পাড়ে এসে পৌঁছান। কিন্তু ততক্ষণে সেখানে অপেক্ষা করতে থাকে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকারের দল। তারা বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে রুহুল আমিনকে হত্যা করে।[৫] তার মৃতদেহ বেশকিছুদিন সেখানে পড়ে ছিলো অযত্নে, অবহেলায়। পরবর্তীতে স্থানীয় জনসাধারণ বাগমারা গ্রামে রূপসা নদীর পাড়ে তাকে দাফন করে এবং সেখান একটি স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করা হয়।[৬]
বীর শ্রেষ্ঠ সম্মান
[সম্পাদনা]১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর সরকারি গেজেট নোটিফিকেশন অনুযায়ী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সাতজন বীর সন্তানকে মরণোত্তর বীর শ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। রুহুল আমিন সেই সাতজনের অন্যতম।[৭]
পুরস্কার ও সম্মাননা
[সম্পাদনা]বীর শ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নামে রো রো ফেরির নামকরণ করা হয়েছে।[৮] বীর শ্রেষ্ঠ আর্টিফিসার মোহাম্মদ রুহুল আমিনের জন্মস্থান নোয়াখালীর বাগপাঁচড়া গ্রামের নাম পরিবর্তন করে এখন রাখা হয়েছে তার নামে রুহুল আমিন নগর[৯]৷ বাড়ির সম্মুখে বীর শ্রেষ্ঠের পরিবারের দেয়া ২০ শতাংশ জমিতেই স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে নোয়াখালী জেলা পরিষদ ৬২ লক্ষ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করছে রুহুল আমিন স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগার৷ রুহুল আমিনের নামে চট্টগ্রামে বীর শ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন স্টেডিয়াম নির্মাণ করা হয়েছে।তার নামে অনেক পুরস্কারও প্রচলিত রয়েছে। [১০]
আরও দেখুন
[সম্পাদনা]তথ্যসূত্র
[সম্পাদনা]- ↑ কাজী সাজ্জাদ আলী জহির (২০১২)। "আমিন, বীর শ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল"। ইসলাম, সিরাজুল; মিয়া, সাজাহান; খানম, মাহফুজা; আহমেদ, সাব্বীর (সম্পাদকগণ)। বাংলাপিডিয়া: বাংলাদেশের জাতীয় বিশ্বকোষ (২য় সংস্করণ)। ঢাকা, বাংলাদেশ: বাংলাপিডিয়া ট্রাস্ট, বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। আইএসবিএন ৯৮৪৩২০৫৯০১। ওসিএলসি 883871743। ওএল 30677644M।
- ↑ "দৈনিক প্রথম আলো, "তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না"| তারিখ: ২৩-১২-২০১২"। ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ৩ জানুয়ারি ২০১৪।
- ↑ বাংলাদেশে ও সাত বীর শ্রেষ্ঠ'র কথা। ঢাকা: জনপ্রিয় প্রকাশনী, ৩৮ বাংলাবাজার (২য় তলা)। ২০০৭। পৃ. ৩৮। আইএসবিএন ৯৮৪-৭০০১৫-০০৭৩-০।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: আইএসবিএন ত্রুটি উপেক্ষা করা হয়েছে (লিঙ্ক) - ↑ আরাফাতুল ইসলাম (৬ এপ্রিল ২০১১)। "'রুহুলের মরদেহ উদ্ধার করে স্থানীয় মানুষ'"। ডয়চে ভেলে বাংলা। সংগ্রহের তারিখ ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ "শহীদ হলেন বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন"। দৈনিক প্রথম আলো। ১০ ডিসেম্বর ২০২৪। সংগ্রহের তারিখ ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫।
- ↑ বাংলাদেশে ও সাত বীর শ্রেষ্ঠ'র কথা। ঢাকা: জনপ্রিয় প্রকাশনী, ৩৮ বাংলাবাজার (২য় তলা)। ২০০৭। পৃ. ৪০। আইএসবিএন ৯৮৪-৭০০১৫-০০৭৩-০।
{{বই উদ্ধৃতি}}: উদ্ধৃতি শৈলী রক্ষণাবেক্ষণ: আইএসবিএন ত্রুটি উপেক্ষা করা হয়েছে (লিঙ্ক) - ↑ "আমিন, বীর শ্রেষ্ঠ মোহাম্মদ রুহুল"। বাংলাপিডিয়া। বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি। ১৮ মে ২০১৪। সংগ্রহের তারিখ ২৭ ডিসেম্বর ২০১৭।
- ↑ "Traffic chaos before Eid"। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম। সংগ্রহের তারিখ ১৮ জুন ২০১৫।
- ↑ "Trust Bank Limited"। atm.web.com.bd। ১৯ জুন ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ জুন ২০১৫।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার|অকার্যকর-ইউআরএল=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য) - ↑ "Stadium / Bir Shrestha Shahid Ruhul Amin Stadium"। thecricketsport.com। the Cricket Sport। ১৯ জুন ২০১৫ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভকৃত। সংগ্রহের তারিখ ১৮ জুন ২০১৫।
{{ওয়েব উদ্ধৃতি}}: অজানা প্যারামিটার|অকার্যকর-ইউআরএল=উপেক্ষা করা হয়েছে (সাহায্য)