হিউয়েন সাঙ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
হিউয়েন সাঙের একটি পোর্ট্রেট

হিউয়েন সাঙ (বা হিউয়েন-সাং বা হুয়ান-সাং বা জুয়ানজ্যাং চীনা: 玄奘; Pinyin: Xuán Zàng; Wade-Giles: Hsüan-tsang শ্যুয়্যান্‌ ৎসাং) (৬০২ - ৬৬৪) ছিলেন বিখ্যাত চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু, পণ্ডিত, পর্যটক এবং অনুবাদক। তিনি চীন এবং ভারতের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপনের ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। ধারণামতে ৬৩০ খ্রিস্টাব্দের কোন এক সময়ে তিনি ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছিলেন। তিনি তার ভারত ভ্রমণ শুরু করেছিলেন লানপো বা লামখান থেকে। লামখানকে তৎকালীন ভারতবর্ষের লোকেরা লম্পক নামে ডাকত। তিনি বালখজুমধ, গচি, বামিয়ান এবং কপিশা হয়ে এ স্থানে এসেছিলেন। মূলত লামখান থেকেই তার ভারতবর্ষ ভ্রমণের সূচনা। তিনি মূলত গৌতম বুদ্ধের নিদর্শন এবং স্মৃতিধন্য স্থানসমূহ পরিদর্শন এবং ভারতবর্ষ থেকে বুদ্ধ ও অন্যান্য বৌদ্ধ ভিক্ষুদের রচনা সংগ্রহ করে নিয়ে যাওয়ার জন্যই এই ভ্রমণ শুরু করেছিলেন।

প্রারম্ভিক জীবন[সম্পাদনা]

হিনান প্রদেশে হিউয়েন সাঙ এর আবাসস্থল

হিউয়েন সাঙ লুজহু প্রদেশের (বর্তমান হিনান প্রদেশ) গৌসি টাউনের চিনহি গ্রামে ৬০২ খৃষ্টাব্দে জন্মগ্রহন করেন। তিনি একটি সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। তার পূর্বসূরী চেন শি ছিলেন হান সম্রাজ্যের একজন মন্ত্রী। তার দাদার বাবা চেন কিন পূর্ব ওয়েই সম্রাজ্যের শেনডেং প্রদেশের একজন বড় কর্মকর্তা ছিলেন আর তার দাদা চেন কাং উত্তোর কি সম্রাজ্যের রাজকীয় একাডেমির অধ্যাপক ছিলেন এবং সর্বশেষে তার বাবা চেন হুই, শুই সম্রাজ্যের একজন ম্যাজিষ্টেট হিসেবে কাজ করেছেন কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রতিহিংশার আশংকায় চাকরি ছেড়ে দেন। বিভিন্ন স্থান থেকে প্রাপ্ত তার আত্মজিবনী থেকে জানা যায় যে ইউয়েন সান খুব ছোটবেলা থেকেই কনফুসিয়াসের গতানুগতিক তত্বের উপর ব্যাপক আগ্রহ এবং পারদর্ধিতা প্রদর্শন করতে থাকে যা তার বাবাকে অবাক করে দেয়। তার ভাই বোনদের মতই হিউয়েন সাঙ তাদের বাবার কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা দিক্ষা লাভ করেন।

যদিও তার পরিবারের সকলে কনফুসিয়াসের তত্বের উপর বিস্বাসী ছিলো তার পরও হিউয়েন সাঙ তার বড় ভাই চেন সু এর পদাংক অনুসরন করে বৌদ্ধ ভিক্ষু হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ৬১১ খ্রৃষ্টাব্দে তার বাবার মৃত্যু হলে হিউয়েন সাঙ লুয়াং প্রদেশে জিংতু বুদ্ধ আশ্রমে তার ভাইয়ের সাথে প্রায় পাঁচ বছর কাটান। সেই বুদ্ধ আশ্রমে সেই সময় বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ হিসেবে মাহায়ানার চর্চা করা হত।

৬১৮ খৃষ্টাব্দের দিকে যখন সুই সম্রাজ্য ভেংগে পড়ে তখন হিউয়েন সাঙ এবং তার ভাই তাং সম্রাজ্যের রাজধানি চ্যাংগানে পালিয়ে যান এবং একটি বুদ্ধ আশ্রমে আরো প্রায় দুই বছর অতিবাহিত করেন। সেখানেই তিনি অভিধর্মকশা শাস্ত্র সম্পর্কে ধারণা এবং জ্ঞান লাভ করেন।

৬২২ সালে প্রায় ২০ বছর বয়সে তিনি একজন পূর্ণ বৌদ্ধ ভিক্ষু হয়ে ওঠেন। এই সময় তিনি বুদ্ধিজমের ওপর অনেক পড়ালেখা করেন এবং ভারতবর্ষ যেয়ে অরো জ্ঞানার্জনের ইচ্ছা পোষন করেন। এই চিন্তা করে তিনি তার ভাইকে রেখে পুনরায় তাং সম্রাজ্যের রাজধানিতে চলে যান এবং সেখানে সংস্কৃতি ভাষার উপর পড়ালেখা শুরু করেন। একই সময়ে তিনি বুদ্ধিজমের অধিবিদ্যার উপর আগ্রহী হয়ে ওঠেন।


তীর্থ যাত্রা[সম্পাদনা]

একটি ছবিতে হিউয়েন সাঙ কে পশ্চিমের দিকে যাত্রা করতে দেখা যাচ্ছে

৬২৯ সালে একটি স্বপ্ন দেখে ভারত যাত্রার প্রতি আকৃষ্ট হন। ঐ সময়ে তাং সম্রাজ্যের সাথে তুর্কদের যুদ্ধ চলছিল তাই তাং রাজা তাইজং সকল নাগরিকদের বিদেশ যাত্রা নিষেধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু হিউয়েন সাং ইউমেনে শহরের সদর দরজার বৌদ্ধ প্রহরীদের বুঝিয়ে শহর থেকে বেরিয়ে যী সক্ষম হন। তারপর তিনি ৬২৯ সালেই[১] কুইংঘি প্রদেশ হয়ে গোবি মরুভূমি পার হয়ে ৬৩০ সালে তুর্পান পৌছান যেখানে তিনি বৌদ্ধ রাজার সাথে দেখা করেন যিনি হিউয়েন সাং কে কিছু মূল্যবান জিনিষপত্র এবং যাত্রার জন্য রসদ সরবরাহ করেন।
তুর্পান থেকে আরো পশ্চিমে যেতে থাকলে ইয়ানজি ও কুচা হয়ে কিরজিকিস্তান পৌছান যেখানে তিনি তুর্ক খানের সাথে সাক্ষাৎ করেন। যদিও ৬৩০ সালের দিকে তুর্কদের সাথে তাং সম্রাজ্যের যুদ্ধ চলছিলো, যখন হিউয়েন সাং, খানের সাথে দেখা করেন তত দিনে তাং সম্রাজ্যের সাথে খানের বন্ধুত্বপূর্ন সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। কিরগিস্তান থেকে পরবর্তীতে তিনি বর্তমান উজবেকিস্তানের রাজধানি তাসখন্দে পৌছান। সেখান থেকে আরো পশ্চিমে পার্সিয়া নিয়ন্ত্রিত সমরখন্দ শহরে পৌছান। সমরখন্দে তিনি কিছু ধ্বংশ হয়ে যাওয়ে বৌদ্ধ স্থাপনা দেখে বিস্মিত হন। সমরখন্দ থেকে আরো পশ্চিমে আমু দরিয়া এবং তিরমিজে পৌছান যেখানে তিনি প্রায় এক হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষুর সাথে সাক্ষাৎ করেন।
আরো পশ্চিমে যেয়ে তিনি খুন্দুজ শহরে সেখানকার প্রিন্স তার্দুর অন্তুষ্টিক্রিয়া দেখার জন্য কিছুকাল অবস্থান করেন। সেখানেই তিনি ধর্মসীমা নামে এক বিখ্যাত বৌদ্ধ ভিক্ষুর সাথে সাক্ষাৎ করেন। সদ্য মৃত প্রিন্স তার্দুর উপদেশেই তিনি পরবর্তিতে আরো পশ্চিমে নব বিহার পরিদর্শন করেন। নব বিহারের বর্তমান নাম আফগানিস্তান। সেখানে তিনি অনেক বৌদ্ধ মঠ এবং মহাবিশ্ব গ্রন্থের অনুসারী প্রায় তিন হাজার বৌদ্ধ বিক্ষু দেখেন[২]। হিউয়েন সাঙ এর মতে নব বিহার হল প্ররথিবীর সর্ব পশিমে অবস্থিত দেশ যা বৌদ্ধ ধর্ম প্রতিপালন করে। নব বিহারে কিছুদিন অবস্থান করে ৬৩০ সালের দিকে তিনি আদিনপুর (বর্তমান জালালাবাদ) যান[৩]জালালাবাদ এসেই তিনি মনে করতে থাকেন যে তিনি ভারতবর্ষে প্রবেশ করেছেন।

ভারতবর্ষ[সম্পাদনা]

আদিনপুর ত্যাগ করে তিনি খাইবার পাস হয়ে পেশাওয়ার দিকে রওনা হন। যাওয়ার পথে তিনি অনেক বৌদ্ধ মঠ দেখেন কিন্তু সেগুলোতে সে তুলনায় বৌদ্ধ ভিক্ষু ছিল না। হিউয়েন সাঙ এর মতে পূর্বে পেশওয়ারের বৌদ্ধ ধর্ম সম্পর্কিত যে গৌরব ছিল তা তৎকালীন পেশওয়ার হারাতে বসেছিল। পেশাওয়ার থেকে তিনি সোয়াত উপত্যকার দিকে চলে যান যেখানে তিনি চোদ্দশ পরিত্যাক্ত বৌদ্ধ মঠ দেখতে পান যেখানে পূর্বে প্রায় আঠারো হাজার ভিক্ষু বসবাস করতেন। সোয়াত উপত্যাকা দিয়ে তিনি সিন্ধু নদ পার হন। সিন্ধু পার হয়ে তিনি কাশ্মীরের দিকে ধাবিত হন। কাশ্মীরে হিউয়েনের সাথে বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘাসের সাথে দেখা হয়ে যায়। সংঘাস ছিলেন ময়াহন গ্রন্থের পন্ডিৎ। হিউয়েন কাশ্মিরে ৬৩২ থেকে ৬৩৩ সাল পর্যন্ত অন্যান্ন জ্ঞানি বিক্ষুদের সাথে মাহায়ন অধ্যয়ন করে কাটান। এখানে অবস্থানকালেই তিনি তার বইয়ে খৃষ্টপূর্ব প্রথম শতকে অনুষ্ঠিত প্রথম বৌদ্ধ কাউন্সিলের ব্যাপারে লিখেছিলেন। এরপর তিনি আরোপূর্বের দিকে লাহোর ও মতিপুরের দিকে রওনা দেন।

রচনাসমূহ[সম্পাদনা]

  • Si-Yu-Ki: Buddhist Records of the Western World - হিউয়েন সাঙের মূল রচনার ইংরেজি অনুবাদ। ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন স্যামুয়েল বিল। ১৮৮৪ সালে লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৯ সালে দিল্লী থেকে পুনর্মুদ্রণ হয়। এর বাংলা অনুবাদের নাম হিউয়েন সাঙ ভ্রমণ কাহিনী। ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন খুররম হোসাইন। ঢাকার শব্দ গুচ্ছ প্রকাশনী থেকে বাংলা অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে ২০০৩ সালের ঢাকা বইমেলায়।

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • হিউয়েন সাঙ ভ্রমণ কাহিনী - খুররম হোসাইনের বাংলা অনুবাদ।
  1. "Note sur la chronologie du voyage de Xuanzang." Étienne de la Vaissière. Journal Asiatique, Vol. 298, 1. (2010), pp. 157-168.[১]
  2. http://ccbs.ntu.edu.tw/FULLTEXT/JR-AN/an160809.htm
  3. Proceedings of the Royal Geographical Society and monthly record (Great Britain) Volume 1, page 43 (Science) 1879.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]