হরিবংশ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
হরিবংশের তিনটি পর্বের প্রথম দুটিতে কৃষ্ণের কাহিনি বর্ণিত হয়েছে। এই গ্রন্থ মতে কৃষ্ণ হলেন বিষ্ণুর অষ্টম অবতার। এই দুটি স্কন্দে কৃষ্ণের জন্ম থেকে যৌবনকালের বর্ণনা আছে। হিন্দু বৈষ্ণবরা এই কাহিনিগুলি মান্য করেন।[১][২]

হরিবংশ (हरिवंश; অর্থাৎ, হরি বা বিষ্ণুর পরম্পরা) সংস্কৃত সাহিত্যের একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। এই গ্রন্থে অনুষ্টুপ ছন্দে মোট ১৬,৩৭৪টি শ্লোক আছে। এই গ্রন্থটি হরিবংশ পুরাণ নামেও পরিচিত। এটিকে মহাভারতের "খিল" বা পরিশিষ্ট মনে করা হয়।[৩] বেদব্যাসকে এই গ্রন্থের রচয়িতা মনে করা হয়। মহাভারতের বিখ্যাত টীকাকার নীলকণ্ঠ চতুর্ধারা তাঁর টীকা ভারতভাবদীপ-এ হরিবংশকেও অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আদি পর্ব অনুসারে,[৪] হরিবংশ দুটি পর্বে বিভক্ত এবং এর মোট শ্লোকসংখ্যা ১২,০০০। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাওয়া ঊনবিংশ শতাব্দীর পাণ্ডুলিপিতে তিনটি পর্বের উল্লেখ পাওয়া যায়। এগুলি পুরাণ নামে পরিচিত - হরিবংশ পুরাণ, বিষ্ণু পুরাণভবিষ্য পুরাণ। এই পর্বগুলি মহাভারতের অষ্টাদশ পুরাণ তালিকার অন্তর্ভুক্ত।[৩]

হরিবংশ পর্বে ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি এবং কৃষ্ণের জন্ম পর্যন্ত পৌরাণিক সূর্য ও চন্দ্রবংশীয় রাজাদের বর্ণনা পাওয়া যায়। বিষ্ণু পর্বে মহাভারতের মূল ঘটনার আগে পর্যন্ত কৃষ্ণের জীবন বর্ণিত হয়েছে।[১] ভবিষ্য পর্বে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টির একটি বিকল্প তত্ত্ব, শিব ও বিষ্ণুর স্তোত্রাদি এবং কলিযুগের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে।[৫] হরিবংশে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে কৃষ্ণের উৎস সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলি পাওয়া যায়। তবে এই পুরাণ আগে লেখা কোনো গ্রন্থ থেকে অনুপ্রাণিত কিনা বা কৃষ্ণের উৎস-সংক্রান্ত তথ্যের অন্যতম আকর ব্রহ্মপুরাণের সঙ্গে এর কী সম্পর্ক তা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে।[৬]

কালপঞ্জি[সম্পাদনা]

সাগরের তীরে দ্বারকা
সাগরের তীরে দ্বারকা
দ্বারকা
দ্বারকা হল হরিবংশের একাধিক অধ্যায়ের প্রেক্ষাপট।[৭] শহরটি সমুদ্রতীরবর্তী বলে বর্ণিত। এটি অধুনা গুজরাত রাজ্যের অন্তর্গত; ঊনবিংশ শতাব্দীর একটি ছবিতে দ্বারকা (নিচে)।

পুরাণের "পঞ্চলক্ষণ" প্রথার দুটি হরিবংশে দেখা যায়। একটি হল "বংশ" বা রাজাবলি প্রথা। অপরটিতে রাখাল বালক হিসেবে কৃষ্ণের জীবন বর্ণিত হয়েছে।

হরিবংশের আখ্যানভাগ বেশ জটিল। এর কিছু কিছু অংশ খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় বা প্রথম শতাব্দীতে রচিত হয় বলে অনুমান করা হয়। হরিবংশের উৎস জানা যায় না। তবে খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীর আগেই হরিবংশ মহাভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। কারণ, "কবি অশ্বঘোষ মহাভারতের শ্লোক বলে কয়েকটি শ্লোক উদ্ধৃত করেছেন। এই শ্লোকগুলি শুধু হরিবংশেই পাওয়া যায়।" (দত্ত, ১৮৫৮)

হপকিনসের মতে, হরিবংশ মহাভারতের সর্বশেষ পর্ব। হরিবংশে রাসলীলার উল্লেখ পাওয়া যায়। তাই হাজরার মতে হরিবংশ খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতকের রচনা। তিনি মনে করেন, বিষ্ণুপুরাণভাগবত পুরাণ যথাক্রমে খ্রিস্টীয় পঞ্চম ও ষষ্ঠ শতাব্দীতে রচিত। দীক্ষিতের মতে, মৎস্য পুরাণের রচনাকাল খ্রিস্টীয় তৃতীয় শতাব্দী। হরিবংশে উল্লিখিত কৃষ্ণের জীবনকাহিনিগুলি তুলনা করলে বোঝা যায় এগুলি পূর্বোক্ত গ্রন্থগুলি থেকে গৃহীত। তাই বিষ্ণুপর্ব ও ভবিষ্যপর্বের রচনাকাল সম্ভবত তৃতীয় শতাব্দী।

হরিবংশ পর্বের রচনাশৈলী ও বিষয়বস্তু বিষ্ণুপর্ব ও ভবিষ্য পর্বের পূর্ববর্তী সময়ে রচিত। অশ্বঘোষ এই পর্ব থেকেই শ্লোক উদ্ধৃত করেছিলেন। সেই হিসেবে হরিবংশ পর্বটিকে খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে রচিত বলা চলে।

সংস্করণ[সম্পাদনা]

হরিবংশের দুটি সংস্করণ পাওয়া যায়। প্রথাগত সংস্করণে তিনটি পর্বে বিন্যস্ত মোট ২৭১টি অধ্যায় রয়েছে। এর মধ্যে হরিবংশ পর্বে ৫৫টি অধ্যায়, বিষ্ণু পর্বে ৮১টি অধ্যায় এবং ভবিষ্য পর্বে ১৩৫টি অধ্যায় রয়েছে। সটীক সংস্করণটি (১৯৬৯-৭১, পি. এল. বৈদ্য সম্পাদিত) প্রথাগত সংস্করণের এক-তৃতীয়াংশ। এই সংকরণে ১১৮টি অধ্যায় ও ৬০৭৩টি শ্লোক পাওয়া যায়। এর মধ্যে হরিবংশ পর্বে ১-৪৫ অধ্যায়, বিষ্ণু পর্বে ৪৬-১১৩ অধ্যায় এবং ভবিষ্য পর্বে ১১৪-১১৮ অধ্যায় দেখা যায়। বৈদ্যের মতে সটীক সংস্করণটি বিস্তারিত পাঠান্তর। তাঁর মতে মূল হরিবংশ এই সংস্করণের ২০শ অধ্যায়ে শুরু এবং ৯৮তম অধ্যায়ে শেষ হয়েছে।[৮]

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Maurice Winternitz (1981), History of Indian Literature, Vol. 1, Delhi, Motilal Banarsidass, আইএসবিএন ৯৭৮-০৮৩৬৪০৮০১০, pages 426-431
  2. Edwin Francis Bryant (2007), Krishna: A Sourcebook, Oxford University Press, আইএসবিএন ৯৭৮-০১৯৫১৪৮৯২৩, Chapters 4-21
  3. The Mahabharata in Sanskrit: Book I: Chapter 2 in sacred-texts.com website উদ্ধৃতি ত্রুটি: <ref> ট্যাগ অবৈধ; আলাদা বিষয়বস্তুর সঙ্গে "mahabharata" নাম একাধিক বার সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে
  4. The Mahabharata, Book 1, Chapter 2, Verses 377-378; M.N. Dutt Adi Parva, page 21
  5. Maurice Winternitz (1981), History of Indian Literature, Vol. 1, Delhi, Motilal Banarsidass, আইএসবিএন ৯৭৮-০৮৩৬৪০৮০১০, pages 432-435
  6. Ruben 115.
  7. Manmatha Nath Dutt, Vishnu Purana, Harivamsa (1896), pages 283-286
  8. [Harivaṃśa 1969-71: 785, XXX and 795]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  • Bowker, John, The Oxford Dictionary of World Religions, New York, Oxford University Press, 1997, p. 410
  • Winternitz, Maurice (1981) History of Indian Literature Vol. I. Delhi: Motilal Banarsidass.
  • Ruben, Walter (1941) "The Krsnacarita in the Harivamsa and Certain Puranas.” Journal of American Oriental Society. Vol. 61, No.3. pp. 115–127.
  • Lorenz, Ekkehard (2007) The Harivamsa: The Dynasty of Krishna, in Edwin F. Bryant (ed.), Krishna, A Source Book, Oxford University Press.
  • Shastri, Rajendra Muni, Jaina Sahitya mein Sri Krishna Charita, Jaipur, Prakrit Bharati Akademi, 1991.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]