সহদেব

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সহদেব, জাভাদ্বীপীয় ছায়াপুতুল খেলায়।

হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতে সহদেব (Sanskrit: सहदेव, sahadéva) হলেন পাণ্ডব ভ্রাতাদের মধ্যে কনিষ্ঠতম। কুন্তীকে প্রদত্ত বরের সাহায্যে মাদ্রি অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে আহ্বান করে নকুল ও সহদেব নামে দুই যমজ সন্তানের জন্ম দেন। এই কারণে নকুল ও সহদেবকে আশ্বিনেয়ও বলা হয়।[১]

জন্ম ও বাল্যজীবন[সম্পাদনা]

ঋষি কিন্দম রাজা পাণ্ডুকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, পত্নীর সঙ্গে যৌনসংগম করতে গেলেই তাঁর মৃত্যু হবে। এই কারণে পাণ্ডু তাঁর দুই পত্নী কুন্তীমাদ্রীর সঙ্গে মিলিত হতে পারতেন না। কিন্তু ঋষি দুর্বাসা প্রথম জীবনে কুন্তীকে একটি বর দিয়েছিলেন। এই বরের সাহায্যে কুন্তী যেকোনো দেবতাকে আহ্বান করে তাঁর পুত্রের জননী হতে পারতেন। এই বর ব্যবহার করে কুন্তী তিন পুত্র লাভ করেন। তিনি তাঁর সপত্নী মাদ্রীকেও এই বর দেন। মাদ্রী অশ্বিনীকুমারদ্বয়কে আহ্বান করে নকুল ও সহদেবের জন্ম দেন।

পরে কিন্দমের অভিশাপ বিস্মৃত হয়ে মাদ্রীর সঙ্গে সহবাস করতে গেলে পাণ্ডুর মৃত্যু ঘটে। মাদ্রী এই ঘটনার জন্য নিজেকে দায়ী করে পাণ্ডুর চিতায় আরোহণ করে সতী হন। এইভাবে নকুল ও সহদেব অল্প বয়সেই তাঁদের পিতামাতাকে হারান।

দ্রৌপদীর উক্তি থেকে জানা যায়, কনিষ্ঠ পাণ্ডব সহদেব তাঁর অন্যান্য ভ্রাতাদের মতো যুদ্ধে ভয়ংকর এবং নৈতিকতা সম্পর্কে সদা সচেতন। তিনি ছিলেন অসিচালনায় দক্ষ এবং “নায়কোচিত, বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ও সদা ভয়ংকর। প্রাজ্ঞদের সভায় বুদ্ধি ও বাকবৈদগ্ধে তাঁর সমতুল্য কেউ ছিল না।”

আরও মনে করা হয় যে, সহদেব হলেন দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের অবতার। ভীষ্মবিদুরের মতো তিনি সেই অল্প কয়েকজন ব্যক্তি যাঁরা কৃষ্ণের সমসাময়িক ছিলেন এবং কৃষ্ণকে সর্বশক্তিমান ঈশ্বর বলে বুঝতে পেরেছিলেন। অনেক রাজা কৃষ্ণকে আগে সম্মান প্রদর্শন করতে অস্বীকৃত হলে, তিনিই কৃষ্ণের অগ্রপূজা করেন।

ভাগবত পুরাণ অনুসারে, সহদেব কৃষ্ণের সর্বশ্রেষ্ঠ ভক্তদের অন্যতম। কৃষ্ণ একবার সহদেবকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, যুদ্ধ থামানোর জন্য কি করা যায়। সহদেব বলেছিলেন, কৃষ্ণকে বেঁধে বন্দী করে সকল পাণ্ডব ও দুর্যোধনকে বনে পাঠিয়ে এবং কর্ণকে রাজা করে যুদ্ধ থামানো যায়। কৃষ্ণ তাঁকে বেঁধে ফেলতে বললে, সহদেব তাঁকে শিশু রূপে ধ্যান করেন এবং বেঁধে ফেলেন। সহদেবের ধ্যানে সৃষ্ট বন্ধনাবস্থায় কৃষ্ণ নড়াচড়ার ক্ষমতা হারালে তিনি সহদেবকে দিব্যদৃষ্টি দিয়ে আশীর্বাদ করেন এবং সহদেব তাঁর বন্ধন খুলে দেন।

বিবাহ[সম্পাদনা]

পরে কুন্তী ও পঞ্চপাণ্ডব হস্তিনাপুরে আসেন। নকুলের মতো সহদেবের দক্ষতা ছিল অসিচালনায়।[২] কথিত আছে, সহদেব ছিলেন বিনয়ী, লাজুক ও গুণী।[৩] তাঁর দক্ষতার জন্য তিনি ‘মহারথী’ উপাধি পান।

পঞ্চপাণ্ডব একসঙ্গে দ্রৌপদীকে বিবাহ করেন। পাঁচ ভাইয়ের ঔরসে দ্রৌপদীর গর্ভে একটি করে সন্তান জন্মগ্রহণ করে। সহদেব ও দ্রৌপদীর পুত্র ছিলেন শ্রুতসেন। সহদেব তাঁর মাসতুতো বোন তথা মদ্র রাজার কন্যা দ্যুতিমৎকেও বিবাহ করেন। তাঁর গর্ভে সহদেবের সুহোত্র নামে একটি পুত্র জন্মায়। কর্ণ সুহোত্রকে বধ করেছিলেন।

রাজসূয় যজ্ঞের সময় রাজ্যজয়[সম্পাদনা]

ইন্দ্রপ্রস্থের সম্রাট হওয়ার পর প্রথম পাণ্ডব যুধিষ্ঠির রাজসূয় যজ্ঞের সময় সহদেবকে দাক্ষিণাত্যের রাজ্যগুলি জয় করতে পাঠান। তাঁকে দাক্ষিণাত্যে পাঠানোর কারণ ছিল, ভীষ্ম বলেছিলেন দাক্ষিণাত্যের রাজারা অসিযুদ্ধে বিশেষ দক্ষ এবং সহদেব নিজে ছিলেন অসিযুদ্ধে পারদর্শী।[৪]

মহাভারতে ইন্দ্রপ্রস্থের দক্ষিণে একাধিক রাজ্য জয়ের উল্লেখ আছে। এগুলির মধ্যে কয়েকটি হল:[৫]

অজ্ঞাতবাস[সম্পাদনা]

অজ্ঞাতবাসে সহদেব গোপালকের কাজ নিয়েছিলেন।

পাশাখেলায় পরাজিত হয়ে যুধিষ্ঠির সহ পাণ্ডবদের তেরো বছরের জন্য নির্বাসনে যেতে হয়। নির্বাসনকালে জটাসুর এক ব্রাহ্মণের ছদ্মবেশে দ্রৌপদী, যুধিষ্ঠির, নকুল ও সহদেবকে অপহরণ করে। ভীম তাঁদের উদ্ধার করেন।

১৩ বছর পর বিরাট রাজ্যে অজ্ঞাতবাসকালে সহদেব তান্তিপথ নাম নিয়ে এক বৈশ্যের ছদ্মবেশ ধারণ করেন। পাণ্ডবদের মধ্যে তিনি জয়দবল নামে পরিচিত হন।[৬] তিনি বিরাট রাজার গোশালার রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ত্ব নিয়েছিলেন।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে ভূমিকা[সম্পাদনা]

সহদেব ছিলেন ভাল জ্যোতিষী। শকুনির পরামর্শে দুর্যোধন সহদেবের কাছে এসেছিলেন এই কথা জানতে যে কোন সময় যুদ্ধ শুরু করলে কৌরবরা বিজয়ী হবেন। সহদেব সৎ ছিলেন। তাই কৌরবরা তাঁর শত্রু জেনেও তিনি সঠিক সময়টি বলে দেন। এরপর কৃষ্ণ যুদ্ধ শুরুর অনেক আগেই একটি গ্রহণের পরিকল্পনা করেন। কৃষ্ণের চিন্তায় ভীত হয়ে সূর্য ও চন্দ্র তাঁর কাছে এসে বলেন যে এতে মহাবিশ্বে সময়ের একটি বড়ো অসঙ্গতি ঘটবে। তখন কৃষ্ণ ঘোষণা করেন যেহেতু পৃথিবী, চন্দ্র ও সূর্য একযোগে একসাথে এসেছে, সেহেতু এটিই একটি গ্রহণ।

সহদেব বিরাটকে পাণ্ডব বাহিনীর সেনাপতি হিসেবে চেয়েছিলেন। কিন্তু যুধিষ্ঠিরঅর্জুন বেছে নেন ধৃষ্টদ্যুম্নকে[৭]

যোদ্ধা হিসেবে সহদেব শত্রুপক্ষের সেরা কয়েকজন যোদ্ধাকে বধ করেন। সহদেবের রথের পতাকায় একটি রৌপ্য হংসের প্রতীক ছিল।[৮][৯] পাশাখেলায় পরাজয়ের সময় সহদেব শকুনিকে বধ করবেন বলে শপথ গ্রহণ করেছিলেন। যুদ্ধের অষ্টাদশ দিনে তিনি এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করেন। শকুনি ছাড়াও শকুনির পুত্র উলুকা ও ত্রিগত রাজকুমার নিরমিত্রকেও সহদেব বধ করেন।

যুদ্ধের পর[সম্পাদনা]

যুদ্ধের পর যুধিষ্ঠির সহদেব ও নকুলকে তাঁদের মায়ের রাজ্য মদ্রের রাজা নিযুক্ত করেন।[১০]

মৃত্যু[সম্পাদনা]

কলিযুগের আগমন ত্বরান্বিত হলে এবং কৃষ্ণের মৃত্যু ঘটলে পাণ্ডবরা তাঁদের একমাত্র জীবিত বংশধর পরীক্ষিতের হাতে রাজ্যভার তুলে দিয়ে হিমালয়ের পথে মহাপ্রস্থানের পথে যাত্রা করেন। যাত্রাকালে যুধিষ্ঠির ছাড়া অন্যান্যরা দুর্বল হয়ে পড়েন এবং দ্রৌপদীর পরেই সহদেবের মৃত্যু হয়। ভীম যুধিষ্ঠিরকে সহদেবের মৃত্যুর কারণ জিজ্ঞাসা করলে, তিনি বলেন সহদেবের জ্ঞানের অহংকারই তাঁর মৃত্যুর কারণ।[১১]

বিশেষ দক্ষতা[সম্পাদনা]

সহদেব তাঁর ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ছিলেন। যুধিষ্ঠির তাঁকে দেবগুরু বৃহস্পতির থেকেও অধিক বুদ্ধিমান বলে উল্লেখ করেছেন। এছাড়া সহদেব ও নকুল ছিলেন ভাল জ্যোতিষী। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের ঘটনা তিনি আগেই জানতে পেরেছিলেন। কিন্তু তাঁকে অভিশাপ দেওয়া হয়েছিল, সেই ঘটনার কথা কাউকে বললে তাঁর মাথা খণ্ডবিখণ্ড হয়ে যাবে। সহদেব যুদ্ধ পরিকল্পনাতেও বেশ দক্ষ ছিলেন।

পাদটীকা[সম্পাদনা]

  1. Gopal, Madan (১৯৯০)। K.S. Gautam, সম্পাদক। India through the ages। Publication Division, Ministry of Information and Broadcasting, Government of India। পৃ: ৭৩। 
  2. A. van Nooten, Barend। The Mahābhārata; attributed to Kṛṣṇa Dvaipāyana Vyāsa Volume 131 of Twayne's world authors series: India 
  3. "Mahabharata Text" 
  4. "Mahabharata Text" 
  5. "Mahabharata Text" 
  6. Subodh Kapoor, সম্পাদক (২০০২)। The Indian encyclopaedia : biographical, historical, religious, administrative, ethnological, commercial and scientific (1st সংস্করণ)। New Delhi: Cosmo Publications। পৃ: ৪৪৬২। আইএসবিএন 9788177552713 
  7. Menon, [translated by] Ramesh (২০০৬)। The Mahabharata : a modern rendering। New York: iUniverse, Inc.। পৃ: ৮৮। আইএসবিএন 9780595401888 
  8. "Mahabharata Text" 
  9. Subodh Kapoor, সম্পাদক (২০০২)। The Indian encyclopaedia : biographical, historical, religious, administrative, ethnological, commercial and scientific (1st সংস্করণ)। New Delhi: Cosmo Publications। পৃ: ৪৪৬২। আইএসবিএন 9788177552713 
  10. "Mahabharata Text" 
  11. Mahabharata Text