বিষয়বস্তুতে চলুন

ভীষ্ম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
ভীষ্ম
ভীষ্মের মূর্তি
ছদ্মনাম
  • দেবব্রত
  • গৌরাঙ্গ
  • ভীষ্ম
  • পিতামহ
  • গঙ্গাপুত্র
  • মহামহিম
  • গঙ্গাদত্ত
  • কুরুশ্রেষ্ঠ
লিঙ্গপুরুষ
পেশাকুরু সেনাবাহিনীর প্রধান সেনাপতি
অন্তর্ভুক্তিকৌরব
অস্ত্র
পরিবার
আত্মীয়কুরু বংশ-চন্দ্রবংশ
উদ্ভবহস্তিনাপুর

ভীষ্ম (সংস্কৃত: भीष्म), যিনি পিতামহ, গঙ্গাপুত্র এবং দেবব্রত নামেও পরিচিত, হিন্দু মহাকাব্য মহাভারতের এক কেন্দ্রীয় চরিত্র। তিনি ছিলেন প্রাচীন কুরু রাজ্যের একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ এবং মহাবীর সেনাপতি। প্রজ্ঞা, বীরত্ব, যুদ্ধকৌশল এবং অটুট নীতিবোধের জন্য প্রখ্যাত ভীষ্ম কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের প্রথম দশ দিন কৌরব বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন, যতক্ষণ না তিনি শরশয্যায় শায়িত হন।

মহারাজ শান্তনু এবং দেবী গঙ্গার গর্ভে তাঁর জন্ম; তাঁর প্রকৃত নাম ছিল দেবব্রত। তিনি ছিলেন সিংহাসনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী বা যুবরাজ। কিন্তু পিতা শান্তনুর সাথে সত্যবতীর বিবাহের পথ সুগম করার জন্য তিনি সিংহাসনের দাবি ত্যাগ করেন এবং আজীবন ব্রহ্মচর্য পালনের এক ভীষণ প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেন। এই অসামান্য ত্যাগের কারণেই তিনি 'ভীষ্ম' (অর্থাৎ 'যিনি ভীষণ বা কঠোর প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করেছেন') উপাধি লাভ করেন এবং 'ইচ্ছামৃত্যু'-র (নিজের মৃত্যুর সময় নির্বাচনের ক্ষমতা) বর প্রাপ্ত হন।

ভীষণ প্রতিজ্ঞা গ্রহণের পর ভীষ্মের সমগ্র জীবন কুরু বংশের প্রতি নিঃস্বার্থ আনুগত্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি হস্তিনাপুরের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত পরবর্তী শাসকদের (যাঁদের মধ্যে তাঁর বৈমাত্রেয় ভ্রাতা চিত্রাঙ্গদবিচিত্রবীর্য এবং তাঁদের উত্তরাধিকারী পাণ্ডুধৃতরাষ্ট্র অন্তর্ভুক্ত) প্রধান উপদেষ্টা ও রাজপ্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়কালে, বিচিত্রবীর্যের বিবাহের জন্য কাশীরাজললিতা অম্বাকে হরণ করার কারণে তাঁকে তাঁর অস্ত্রগুরু পরশুরামের সাথে দ্বন্দ্বে লিপ্ত হতে হয়েছিল। ভীষ্মের দিকনির্দেশনায় কুরু রাজ্য জটিল রাজনৈতিক ও পারিবারিক সংকট অতিক্রম করেছিল। পাণ্ডু ও ধৃতরাষ্ট্রের বিবাহ এবং তাঁদের সন্তান যুধিষ্ঠিরের নেতৃত্বাধীন পঞ্চ পাণ্ডব এবং দুর্যোধনের নেতৃত্বাধীন শত কৌরবদের লালন-পালনে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ বহু বিবাদ, এমনকি দুর্যোধন ও যুধিষ্ঠিরের মধ্যে কুরু রাজ্যের বিভাজনেও তিনি মধ্যস্থতা করেছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে ধর্মের প্রতি অনুগত হলেও, সিংহাসনের প্রতি তাঁর শপথ তাঁকে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কৌরবদের পক্ষ অবলম্বন করতে বাধ্য করেছিল।

যুদ্ধে ভীষ্ম ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও কৌশলী; তিনি দীর্ঘ দশ দিন পাণ্ডব বাহিনীকে প্রতিহত করে রেখেছিলেন। দশম দিনে, পাণ্ডব বীর অর্জুন, শিখণ্ডীর (অম্বার পুনর্জন্ম) আড়াল নিয়ে অজস্র বাণ নিক্ষেপ করে তাঁকে ধরাশায়ী করেন, যার ফলে তিনি শরশয্যায় নিক্ষিপ্ত হন। ভীষ্ম একান্ন দিন এই অবস্থায় অতিবাহিত করেন এবং পাণ্ডব ও কৌরব উভয় পক্ষকেই মূল্যবান উপদেশ প্রদান করেন। পবিত্র উত্তরায়ণ সংক্রান্তির শুভ লগ্নে দেহত্যাগের পূর্বে তিনি যুধিষ্ঠিরকে বিষ্ণু সহস্রনাম এবং রাজধর্ম, মোক্ষধর্ম ও দানধর্ম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান দান করেন।

সনাতন হিন্দু ঐতিহ্যে ভীষ্ম তাঁর ত্যাগ ও কর্তব্যের জন্য পূজিত হন। তাঁর প্রয়াণ দিবসটি মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিতে ভীষ্ম অষ্টমী হিসেবে পালিত হয়।

ব্যুৎপত্তি ও উপাধি

[সম্পাদনা]

প্রখ্যাত ভারততত্ত্ববিদ মোনিয়ার মোনিয়ার-উইলিয়ামসের মতে, ভীষ্ম (भीष्म) শব্দটির অর্থ "ভীষণ", "ভয়ানক" বা "উগ্র"। শব্দটি উগ্র দেবতা রুদ্র এবং রাক্ষসদের বর্ণনায়ও ব্যবহৃত হয়।[] মহাকাব্যে, দেবব্রত এই নামটি লাভ করেছিলেন কারণ তিনি এক ভীষণ বা কঠোর প্রতিজ্ঞা (ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা) গ্রহণ করেছিলেন এবং তা পালন করেছিলেন।[][] জন্মের সময় তাঁর নাম রাখা হয়েছিল দেবব্রত (देवव्रत), যার অর্থ 'যিনি দেবতাদের প্রতি অনুগত'।[]

যেহেতু ভীষ্ম ছিলেন গঙ্গার একমাত্র জীবিত পুত্র, তাই তাঁকে "গঙ্গার পুত্র" অর্থবোধক বহু উপাধিতে ভূষিত করা হয়। যেমন গঙ্গাপুত্র (गंगापुत्र), গাঙ্গেয় (गांगेय), গঙ্গাসুত (गंगासुत)। গঙ্গাদত্ত (गंगादत्त) শব্দটির অর্থ গঙ্গার দান।[] ভীষ্মের পিতৃনামীয় উপাধিগুলির মধ্যে রয়েছে শান্তনব (शान्तनव), শান্তনুপুত্র, শান্তনুসুত এবং শান্তনুজ।[] ভীষ্মকে নিম্নলিখিত নামেও অভিহিত করা হয়:

  • গৌরাঙ্গ (गौरांग) – গৌর বা উজ্জ্বল বর্ণের অধিকারী।
  • শ্বেতবীর (श्वेतवीर) – শ্বেতবর্ণের যোদ্ধা বা যিনি শ্বেত অশ্ব ও শ্বেত অস্ত্র ধারণ করেন।
  • ভারত (भारत) – ভরত বংশের উত্তরাধিকারী।
  • মহামহিম – মহামান্য বা অতিশয় মহিমান্বিত।
  • পরশুরামশিষ্য (परशुरामशिष्य) – পরশুরামের শিষ্য।
  • পিতামহ (पितामह) – ভীষ্ম পিতামহ নামেও পরিচিত; পাণ্ডব ও কৌরবরা তাঁকে এই নামে সম্বোধন করতেন।

[]

জন্ম ও বাল্যকাল

[সম্পাদনা]
শান্তনু গঙ্গাকে তাঁদের অষ্টম সন্তানকে জলে বিসর্জন দেওয়া থেকে বিরত করছেন, যিনি পরে ভীষ্ম নামে পরিচিত হন। রাজা রবি বর্মার আঁকা চিত্র।

ভীষ্মের জন্ম ও যৌবনের কাহিনী মূলত মহাকাব্যের আদিপর্বে বর্ণিত হয়েছে। তিনি ছিলেন চন্দ্রবংশীয় রাজা শান্তনু এবং তাঁর প্রথমা পত্নী দেবী গঙ্গার একমাত্র জীবিত পুত্র। বিশ্বাস করা হয় যে, তিনি ছিলেন দ্যু বা প্রভাস নামক এক বসু-র অবতার।[]

কিংবদন্তি অনুসারে, কুরু রাজ্যের রাজা তথা রাজা প্রতীপের কনিষ্ঠ পুত্র শান্তনু একবার মৃগয়ায় গিয়ে গঙ্গা নদীর তীরে এক অপরূপা রমণীকে দেখতে পান। তিনি তাঁর প্রেমে পড়েন এবং বিবাহের প্রস্তাব দেন। ওই রমণী তাঁর প্রস্তাবে সম্মত হন, কিন্তু একটি শর্ত আরোপ করেন যে, শান্তনু কখনই তাঁর কোনো কাজের কারণ জানতে চাইতে পারবেন না; এবং যদি এই শর্ত ভঙ্গ হয়, তবে তিনি শান্তনুকে ত্যাগ করবেন। শান্তনু এই শর্ত মেনে নেন এবং তাঁর সাথে সুখী দাম্পত্য জীবন অতিবাহিত করতে থাকেন। কিন্তু যখনই তাঁদের কোনো সন্তান জন্মগ্রহণ করত, রানি তাকে গঙ্গার জলে নিক্ষেপ করতেন। একে একে সাতটি পুত্র জন্মগ্রহণ করল এবং জলে নিমজ্জিত হলো, কিন্তু প্রতিশ্রুতির কারণে শান্তনু নির্বাক রইলেন। যখন রানি অষ্টম সন্তানটিকে নদীতে নিক্ষেপ করতে উদ্যত হলেন, তখন শান্তনু আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না; তিনি তাঁকে বাধা দিলেন এবং তাঁর নিষ্ঠুর আচরণের কারণ জানতে চাইলেন। শান্তনুর এই প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হয়ে সেই নারী নিজেকে দেবী গঙ্গা হিসেবে প্রকাশ করলেন এবং তাঁর কাজের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যার জন্য নিম্নলিখিত কাহিনীটি বর্ণনা করলেন।[][]

একদা স্বর্গীয় বসুগণ এবং তাঁদের পত্নীরা অরণ্যে বিহার করছিলেন। তখন দ্যু নামক বসুর পত্নী এক উৎকৃষ্ট গাভী দেখে তাঁর স্বামীকে সেটি হরণ করতে বললেন। সেই গাভীটি ছিল কামধেনু সুরভীর কন্যা নন্দিনী এবং ঋষি বশিষ্ঠের অধিকারে। ভ্রাতাদের সহায়তায় দ্যু গাভীটি চুরির চেষ্টা করলেন, কিন্তু বশিষ্ঠ তাঁদের ধরে ফেললেন এবং মর্ত্যলোকে নশ্বর মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করে দুঃখকষ্ট ভোগের অভিশাপ দিলেন। তাঁদের অনুনয়ে বশিষ্ঠ করুণা প্রদর্শন করে অন্য সাত বসুকে বললেন যে, জন্মের পরপরই তাঁরা মুক্তি পাবেন। কিন্তু চুরির মূল হোতা দ্যু-কে পৃথিবীতে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকার অভিশাপ ভোগ করতে হবে। পুত্রদের জন্মের পূর্বে গঙ্গা তাঁদের অনুরোধে কথা দিয়েছিলেন যে, জন্মের পরপরই তিনি তাঁদের হত্যা করে শাপমুক্ত করবেন।[][] এই কথা শুনে শান্তনু শোকে ও অনুতাপে দগ্ধ হলেন এবং শর্তভঙ্গ হওয়ায় গঙ্গা তাঁকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিলেন। অন্তর্ধানের পূর্বে, তিনি শান্তনুকে কথা দিলেন যে তাঁর উত্তরাধিকারীকে তিনি ফিরিয়ে দেবেন।[]

গঙ্গা তাঁর পুত্র দেবব্রতকে পিতা শান্তনুর হাতে অর্পণ করছেন। বি.পি. ব্যানার্জির চিত্রকর্ম।

গঙ্গা তাঁর পুত্রের নাম রাখলেন দেবব্রত এবং তাঁকে বিভিন্ন 'লোক'-এ (উচ্চতর জগত) নিয়ে গেলেন, যেখানে তিনি বহু বিশিষ্ট ঋষির তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত ও শিক্ষিত হলেন।[১০][১১][১২]

  • বৃহস্পতি এবং শুক্রাচার্য দেবব্রতকে রাজধর্ম (দণ্ডনীতি) এবং অন্যান্য শাস্ত্র শিক্ষা দিয়েছিলেন।
  • ঋষি বশিষ্ঠ এবং চ্যবন দেবব্রতকে বেদ ও বেদাঙ্গ শিক্ষা দিয়েছিলেন।
  • সনৎকুমার: দেবতা ব্রহ্মার জ্যেষ্ঠ মানসপুত্র তাঁকে আনুবীক্ষিকী বিদ্যা ও আধ্যাত্মিক বিজ্ঞান শিক্ষা দিয়েছিলেন।
  • মার্কণ্ডেয়: ভৃগু বংশীয় মৃকণ্ডু ঋষির অমর পুত্র, যিনি দেবাদিদেব শিবের বরে চিরযৌবন লাভ করেছিলেন, তিনি দেবব্রতকে যতিদের কর্তব্য শিক্ষা দিয়েছিলেন।
  • পরশুরাম: ঋষি জমদগ্নির পুত্র, ভীষ্মকে অস্ত্রবিদ্যা ও যুদ্ধকৌশল প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন।
  • ইন্দ্র: দেবতাদের রাজা। তিনি ভীষ্মকে দিব্যাস্ত্র প্রদান করেছিলেন।

ভীষ্ম বহু শক্তিশালী দিব্যাস্ত্রের অধিকারী ছিলেন এবং মায়াবী যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সক্ষম ছিলেন। মোহ সৃষ্টিকারী বা মানসিক আচ্ছন্নতা তৈরি করা অস্ত্র তাঁর ওপর কোনো প্রভাব ফেলত না।

বহু বছর পর, শান্তনু গঙ্গার তীরে ভ্রমণকালে লক্ষ্য করলেন যে নদীর জলপ্রবাহ ক্ষীণ হয়ে গেছে। তিনি দেখলেন এক তরুণ যুবক তীরের বাঁধ তৈরি করে জলস্রোত আটকে রেখেছে। সাদৃশ্য দেখে শান্তনু তাঁর পুত্রকে চিনতে পারলেন এবং গঙ্গার কাছে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রার্থনা জানালেন। গঙ্গা এক দিব্য নারীমূর্তিতে আবির্ভূত হলেন এবং প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুত্রকে শান্তনুর হাতে অর্পণ করলেন। গঙ্গা কর্তৃক প্রদত্ত হওয়ায় তরুণ দেবব্রত 'গঙ্গাদত্ত' নামেও পরিচিত ছিলেন।[১৩]

ভীষণ প্রতিজ্ঞা

[সম্পাদনা]
দেবব্রতের প্রতিজ্ঞা গ্রহণ, রাজা রবি বর্মার চিত্রকর্ম

দেবব্রতকে যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত করা হলো; তাঁর দৈব গুণাবলী ও যোগ্যতার কারণে প্রজারা তাঁকে অত্যন্ত ভালোবাসত। এরই মধ্যে, শান্তনু অরণ্যে গিয়ে এক ধীবর কন্যা সত্যবতীর সাক্ষাৎ পেলেন, যিনি যমুনা নদীতে নৌকা চালনা করতেন। শান্তনু তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে তাঁর পিতার কাছে বিবাহের প্রস্তাব দিলেন। কিন্তু ধীবর-সর্দার (দাশরাজ) শর্ত দিলেন যে, কেবল সত্যবতীর গর্ভজাত সন্তানই যদি কুরু রাজ্যের উত্তরাধিকারী হয়, তবেই তিনি এই বিবাহে সম্মত হবেন। যেহেতু শান্তনু ইতিপূর্বেই দেবব্রতকে সিংহাসন প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তাই তিনি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন এবং ভগ্নহৃদয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে এলেন। তিনি নির্জনবাস শুরু করলেন এবং শোকে ও একাকীত্বে শয্যাশায়ী হলেন। দেবব্রত পিতার এই বিষাদ লক্ষ্য করলেন এবং এক মন্ত্রীর মাধ্যমে এর প্রকৃত কারণ জানতে পারলেন।[]

দেবব্রত তৎক্ষণাৎ ধীবর-সর্দারের কুটিরে ছুটে গেলেন এবং সত্যবতীকে ভিক্ষা চাইলেন, কিন্তু ধীবর-সর্দার তাঁর পূর্বের শর্তের পুনরাবৃত্তি করলেন। পিতার সুখ ও সন্তুষ্টির জন্য, দেবব্রত সিংহাসনের ওপর নিজের সমস্ত অধিকার বর্জন করলেন এবং প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তিনি সত্যবতীর পুত্রকেই সিংহাসনে বসাবেন। কিন্তু এতেও সত্যবতীর পিতা আশ্বস্ত হতে পারলেন না; তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করলেন যে ভবিষ্যতে সত্যবতীর সন্তান ও দেবব্রতের সন্তানদের মধ্যে সিংহাসন নিয়ে বিবাদ হতে পারে। তাঁকে সন্তুষ্ট করার জন্য, দেবব্রত আজীবন ব্রহ্মচর্য পালনের এক কঠোর ব্রত গ্রহণ করলেন এবং নিজেকে দাম্পত্য সুখ থেকে বঞ্চিত রাখার শপথ নিলেন।[][১৪]

এই ভীষণ প্রতিজ্ঞা শুনে আকাশ থেকে দেবগণ পুষ্পবৃষ্টি করলেন এবং তিনি "ভীষ্ম" (যিনি ভীষণ প্রতিজ্ঞা করেছেন) নামে পরিচিত হলেন। ধীবর-সর্দারের সম্মতিতে ভীষ্ম সত্যবতীকে রথে করে পিতার নিকট নিয়ে এলেন এবং তাঁকে নিজের প্রতিজ্ঞার কথা জানালেন। পরম স্নেহময় পিতা শান্তনু তাঁকে 'ইচ্ছামৃত্যু' অর্থাৎ নিজের মৃত্যুর কাল নিয়ন্ত্রণের বর প্রদান করলেন।[১০][১৫][১৬] শীঘ্রই শান্তনু ও সত্যবতীর বিবাহ সম্পন্ন হলো এবং তাঁদের দুই পুত্র চিত্রাঙ্গদবিচিত্রবীর্য জন্মগ্রহণ করলেন।[]

কুরু রাজ্যের রাজকার্য

[সম্পাদনা]

পিতার মৃত্যুর পর, কুরু রাজ্যের শাসনকার্যে ভীষ্ম এক প্রধান ভূমিকা পালন করেছিলেন। উত্তরাধিকার সংকট দেখা দিলে তিনি রাজ্য পরিচালনা করতেন। তিনি তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্রদের বিবাহের আয়োজন করেছিলেন এবং তাঁর প্রপৌত্র, অর্থাৎ কৌরবপাণ্ডবদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন।

হরিবংশ গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, শান্তনুর মৃত্যুর পর শোক পালন বা অশৌচ চলাকালীন ভীষ্ম সত্যবতীর প্রতি লোলুপ দৃষ্টি দেওয়া পাঞ্চাল রাজ্যের উগ্রায়ুধ নামক এক শাসককে হত্যা করেছিলেন বং অর্থের বিনিময়ে তাঁকে ক্রয়ের চেষ্টা করেছিলেন।[১৭] মহাভারত অনুসারে, চিত্রাঙ্গদকে রাজা হিসেবে অভিষিক্ত করা হয়েছিল, কিন্তু শীঘ্রই তিনি এক গন্ধর্ব কর্তৃক নিহত হন। ভীষ্ম চিত্রাঙ্গদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করেন।[][১৮] রাজত্ব করার জন্য তখনো অতি অল্পবয়স্ক বিচিত্রবীর্যকে ভীষ্ম িংহাসনে বসালেও, তিনি প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত রাজ্যের প্রকৃত শাসনভার সত্যবতীর হাতেই ছিল। সেই সময়ে ভীষ্ম সত্যবতীকে সহায়তা করতেন।[১৯]

কাশীরাজ কন্যাদের স্বয়ংবর ও পরশুরামের সাথে যুদ্ধ

[সম্পাদনা]
অম্বার উপস্থিতিতে পরশুরাম ভীষ্মের প্রতি শর নিক্ষেপ করছেন। রজমণামা (মহাভারতের ফার্সি অনুবাদ) থেকে গৃহিত চিত্র, আনুমানিক ১৬১৬ খ্রিষ্টাব্দ।

বিচিত্রবীর্য যৌবনপ্রাপ্ত হলে, ভীষ্ম কাশী রাজ্যের তিন রাজকন্যা অম্বা, অম্বিকা এবং অম্বালিকাকেবিচিত্রবীর্যের সাথে বিবাহ দেওয়ার জন্য আনার সিদ্ধান্ত নিলেন। ভীষ্ম কাশী রাজ্যে পৌঁছালেন এবং রাজা শাল্বকে সহজেই পরাজিত করে রাজকন্যাদের জয় করলেন, যাঁরা তখন স্বয়ম্বর (এমন এক অনুষ্ঠান যেখানে কন্যা বহু সুপাত্রের মধ্য থেকে নিজের পতি নির্বাচন করেন) সভায় পতি নির্বাচনে রত ছিলেন। সৌভ বা শাল্ব রাজ্যের অধিপতি এবং অম্বার প্রেমিক শাল্ব ভীষ্মকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। হস্তিনাপুরে পৌঁছানোর পর, অম্বিকা ও অম্বালিকা বিচিত্রবীর্যকে বিবাহ করতে সম্মত হলেন, কিন্তু অম্বা ভীষ্মকে জানালেন যে তিনি শাল্বকে ভালোবাসেন। অম্বার অনুরাগের কথা জেনে ভীষ্ম তাঁকে সসম্মানে সৌভ রাজ্যে পাঠিয়ে দিলেন।

উদ্যোগ পর্বে অম্বা এবং ভীষ্ম ও পরশুরামের যুদ্ধের বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায়। অম্বা যখন শাল্বকে বিবাহ করার অনুরোধ জানালেন, শাল্ব তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি দাবি করলেন যে স্বয়ংবর সভায় তিনি ইতিপূর্বেই অপদস্থ হয়েছেন এবং অন্য পুরুষের দ্বারা বিজিত নারীকে তিনি গ্রহণ করতে পারেন না। অন্য একটি মতে, অম্বা হস্তিনাপুরে ফিরে এসে ভীষ্মকে অনুরোধ করেন বিচিত্রবীর্যের সাথে তাঁর বিবাহের ব্যবস্থা করতে, কিন্তু বিচিত্রবীর্যও তাঁকে বিবাহ করতে অস্বীকার করেন কারণ অম্বা অন্য পুরুষের প্রতি আসক্ত ছিলেন। নিরাশ্রয় অম্বা তাঁর এই দুর্দশার জন্য ভীষ্মকেই দায়ী করলেন এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ গ্রহণের সংকল্প করলেন। তিনি বহু রাজার দ্বারস্থ হয়ে ভীষ্মকে হত্যা করার অনুরোধ জানালেন, কিন্তু কেউই সম্মত হলেন না। অবশেষে ঋষিদের পরামর্শে তিনি ভীষ্মের গুরু পরশুরামের শরণাপন্ন হলেন এবং তাঁকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি আদায় করতে সক্ষম হলেন।[২০]

পরশুরাম কুরুক্ষেত্রে এসে ভীষ্মকে তাঁর সাথে সাক্ষাতের বার্তা পাঠালেন। ভীষ্ম সেখানে উপস্থিত হয়ে গুরুর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করলেন। পরিস্থিতি সমাধানের জন্য পরশুরাম তাঁকে অম্বাকে বিবাহ করার নির্দেশ দিলেন এবং বললেন এটিই তাঁর রাজধর্ম। কিন্তু ভীষ্ম নিজের ব্রহ্মচর্য ব্রতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। এতে পরশুরাম ক্রুদ্ধ হলেন এবং ভীষ্মকে মৃত্যুর হুমকি দিলেন। ভীষ্ম তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলেন। উভয়ের মধ্যে নিজ নিজ প্রতিজ্ঞা রক্ষার এক ভীষণ যুদ্ধ শুরু হলো। তেইশ দিন ধরে চলা এই যুদ্ধে তাঁরা উভয়েই দিব্যাস্ত্র প্রয়োগ করলেন। মা গঙ্গা তাঁদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেও সফল হলেন না।[২০] যুদ্ধের চব্বিশতম দিনে, ভীষ্ম পরশুরামের বিরুদ্ধে 'প্রস্বাপান্ত্র' প্রয়োগ করতে উদ্যত হলে দেবর্ষি নারদ এবং দেবগণ হস্তক্ষেপ করলেন এবং জগৎ ধ্বংসকারী এই মহাস্ত্রের ব্যবহারে উদ্বেগ প্রকাশ করলেন। পরশুরাম সংঘাত সমাপ্ত করলেন এবং যুদ্ধটি অমীমাংসিত ঘোষিত হলো। এই ঘটনার পর, অম্বা নিজেই প্রতিশোধ গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিলেন এবং দেবাদিদেব মহাদেবকে তুষ্ট করার জন্য কঠোর তপস্যা শুরু করলেন। শিব তাঁর সামনে আবির্ভূত হয়ে বর দিলেন যে, পরজন্মে তিনিই ভীষ্মের মৃত্যুর কারণ হবেন। এই বরে সন্তুষ্ট হয়ে অম্বা কাষ্ঠনির্মিত চিতায় আত্মাহুতি দিলেন। বহু বছর পর, তিনি পাঞ্চাল রাজ দ্রুপদের কন্যা শিখণ্ডিনী রূপে পুনর্জন্ম লাভ করেন।[২১]

রাজনৈতিক প্রভাব

[সম্পাদনা]
রজমণামায় চিত্রিত ভীষ্মের সাথে যুধিষ্ঠির, ফাত্তু কর্তৃক অঙ্কিত, ১৫৯৮

হস্তিনাপুরের সিংহাসনে আরোহণের স্বল্পকাল পরেই রাজা বিচিত্রবীর্য যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে পরলোকগমন করেন। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান, ফলে কুরুবংশ বিলুপ্তির চরম সংকটের সম্মুখীন হয়। এই পরিস্থিতিতে সত্যবতী ভীষ্মকে অনুরোধ করেন বিচিত্রবীর্যের বিধবা পত্নীদের বিবাহ করে রাজ্যভার গ্রহণ করতে অথবা অন্তত তাঁদের গর্ভে বংশধর উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে।[২২] কিন্তু ভীষ্ম তাঁর ভীষণ প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। এর পরিবর্তে তিনি প্রস্তাব করেন যে, কোনো ঋষির দ্বারা 'নিয়োগ' (প্রাচীন প্রথা যেখানে স্বামী মৃত বা অক্ষম হলে বংশরক্ষার জন্য অন্য পুরুষের দ্বারা স্ত্রীর গর্ভসঞ্চার করা হতো) পদ্ধতির মাধ্যমে বংশরক্ষা করা যেতে পারে।[২৩] তখন সত্যবতী তাঁর বিবাহপূর্বজাত পুত্র ব্যাসদেবকে আহ্বান করেন তাঁর পুত্রবধূদের গর্ভে সন্তান উৎপাদনের জন্য।[২৪][২৫][২৬] এর ফলে তিন সন্তানের জন্ম হয়  অম্বিকার গর্ভে ধৃতরাষ্ট্র, অম্বালিকার গর্ভে পাণ্ডু এবং এক পরিচারিকার গর্ভে বিদুর। ভীষ্ম এই তিন শিশুকে শিক্ষাদীক্ষা প্রদান করেন এবং তাঁদের বিবাহের ব্যবস্থা করেন। তিনি গান্ধার রাজের কন্যা গান্ধারীর সাথে ধৃতরাষ্ট্রের বিবাহ সম্পন্ন করেন।[২৭][২৮] এছাড়াও তিনি পাণ্ডুর জন্য মদ্র রাজের কন্যা মাদ্রীকে আনেন এবং বিদুরের সাথে দেবকের কন্যার বিবাহ দেন।[২৯][৩০]

জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা হওয়া সত্ত্বেও অন্ধত্বের কারণে ধৃতরাষ্ট্রকে সিংহাসন থেকে বঞ্চিত করা হয় এবং পাণ্ডু রাজা নিযুক্ত হন। কিন্তু পরবর্তীকালে পাণ্ডু সিংহাসন ত্যাগ করে স্ত্রীদের নিয়ে অরণ্যে গমন করলে ধৃতরাষ্ট্র কার্যকরী রাজা হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। এই সময়ে গান্ধারী কৌরব ভ্রাতাদের এবং পাণ্ডুর দুই পত্নী পঞ্চ পাণ্ডব ভ্রাতার জন্ম দেন। পাণ্ডুর অকালমৃত্যুর পর তাঁর প্রথমা স্ত্রী কুন্তী পুত্রদের নিয়ে হস্তিনাপুরে ফিরে আসেন। সত্যবতী, অম্বিকা এবং অম্বালিকা তখন তপস্যার উদ্দেশ্যে অরণ্যে গমনের সিদ্ধান্ত নেন এবং কুরু রাজ্যের সমস্ত দায়িত্ব ভীষ্মের ওপর ন্যস্ত করেন। রাজকুমারদের যুদ্ধবিদ্যা ও অস্ত্রচালনা শিক্ষার জন্য ভীষ্ম ব্রাহ্মণ যোদ্ধা দ্রোণকে নিযুক্ত করেন।[৩১]

শৈশব থেকেই কৌরবরা তাঁদের জ্ঞাতিভ্রাতা পাণ্ডবদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করতেন এবং একাধিকবার তাঁদের হত্যার ষড়যন্ত্র করেন। এমনই এক ঘটনা ছিল জতুগৃহ দাহ, যেখানে জ্যেষ্ঠ কৌরব দুর্যোধন পাণ্ডবদের অগ্নিদগ্ধ করে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন। এই সংবাদে ভীষ্ম অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়ে পড়েন, কিন্তু বিদুর তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে পাণ্ডবরা জীবিত আছেন। এই ঘটনা দুর্যোধন ও যুধিষ্ঠিরের মধ্যে উত্তরাধিকার সংক্রান্ত বিবাদকে উস্কে দেয়। এই সংকট নিরসনে ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্রকে উপদেশ দেন রাজ্যটি রাজকুমারদের মধ্যে বিভাজন করে দিতে। পাণ্ডবরা ইন্দ্রপ্রস্থে তাঁদের রাজধানী স্থাপন করেন এবং সার্বভৌমত্ব ও সম্রাটের মর্যাদা অর্জনের লক্ষ্যে রাজসূয় যজ্ঞ সম্পাদন করেন। ভীষ্ম তাঁদের সমর্থন করেন এবং এই যজ্ঞে উপস্থিত ছিলেন। যজ্ঞসভায় তিনি যুধিষ্ঠিরকে পরামর্শ দেন শ্রীকৃষ্ণকে সর্বোচ্চ অর্ঘ্য প্রদান করতে। কিন্তু এতে কৃষ্ণের শত্রু শিশুপাল ক্রুদ্ধ হন। তিনি প্রথমে ভীষ্মকে এই সম্মান প্রদানের দাবি জানালেও, ভীষ্ম কৃষ্ণের সম্মাননায় কোনো আপত্তি না তোলায় শিশুপাল ভীষ্মকে অপমান করতে শুরু করেন।[২৯]

হস্তিনাপুরের দ্যূতসভায় (পাশা খেলা) ভীষ্ম উপস্থিত ছিলেন, যেখানে পাণ্ডবদের সহধর্মিণী দ্রৌপদী ভরা রাজসভায় লাঞ্ছিত হন। যখন দ্রৌপদী প্রশ্ন তোলেন যে, খেলায় নিজেকে হারার পর যুধিষ্ঠির তাঁকে বাজি রাখার অধিকার রাখেন কি না, তখন ভীষ্ম উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন এবং ধর্মকে "সূক্ষ্ম" বলে অভিহিত করেন।[৩২]

ভীষ্ম বিরাট যুদ্ধেরও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যা ছিল কৌরব এবং ত্রিগর্তদের একটি যৌথ অভিযান। এর উদ্দেশ্য ছিল রাজা বিরাটের গোধন লুণ্ঠন করা এবং অজ্ঞাতবাসে থাকা পাণ্ডবদের আত্মপ্রকাশে বাধ্য করা। কিন্তু অর্জুন একাই সম্মিলিত কৌরব ও ত্রিগর্ত বাহিনীকে পরাজিত করেন। দ্বৈরথ যুদ্ধে অর্জুন ভীষ্মকে পরাজিত করেন। অর্জুন যখন 'সম্মোহন' অস্ত্র প্রয়োগ করেন, তখন ভীষ্ম ব্যতীত সমগ্র সেনাবাহিনী মোহগ্রস্ত বা সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ে; ভীষ্মের ওপর এই অস্ত্রের কোনো প্রভাব পড়েনি।

পাণ্ডবদের নির্বাসন ও অজ্ঞাতবাস সমাপ্ত হওয়ার পর ভীষ্ম ধৃতরাষ্ট্র ও দুর্যোধনকে উৎসাহিত করেন পাণ্ডবদের প্রাপ্য ইন্দ্রপ্রস্থ ফিরিয়ে দিতে এবং যুদ্ধ এড়াতে যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। শ্রীকৃষ্ণ যখন শান্তির প্রস্তাব নিয়ে হস্তিনাপুরের রাজসভায় আসেন, ভীষ্ম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দুর্যোধনের বৈরিতার কারণে কৃষ্ণ যখন তাঁর দিব্য রূপ প্রকাশ করেন, তখন যে অল্প কয়েকজন ব্যক্তি সেই বিশ্বরূপের তীব্র জ্যোতিতে অন্ধ হননি, তাঁদের মধ্যে ভীষ্ম ছিলেন অন্যতম।

কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ

[সম্পাদনা]

কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধে ভীষ্ম দশ দিন পর্যন্ত কৌরব বাহিনীর সর্বাধিনায়ক বা প্রধান সেনাপতি ছিলেন। হস্তিনাপুরকে সকল প্রকার বিপদ ও আক্রমণ থেকে রক্ষা করার প্রতিজ্ঞায় তিনি অনিচ্ছাসত্ত্বেও কৌরবদের পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন।

যুদ্ধের পূর্বে, কৌরব সেনাবাহিনীর সভায় ভীষ্ম যোদ্ধাদের শক্তিমত্তা বিশ্লেষণ ও শ্রেণীবিন্যাস করেন। এই সময় তিনি বিখ্যাত বীর কর্ণকে একজন 'অতিরথী' (যিনি মহারথীর চেয়ে নিম্নমানের যোদ্ধা) হিসেবে অভিহিত করেন। এতে কর্ণ অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হন এবং প্রতিজ্ঞা করেন যে, যতদিন ভীষ্ম সেনাপতি থাকবেন, ততদিন তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করবেন না। প্রকৃতপক্ষে, ভীষ্ম ও কর্ণ উভয়েই কর্ণের প্রকৃত বংশপরিচয় সম্পর্কে অবগত ছিলেন এবং কর্ণ যাতে তাঁর সহোদর ভ্রাতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ না করেন, তার জন্য এটি ছিল ভীষ্মের একটি কৌশল।

ভীষ্ম ছিলেন তাঁর সময়ের এবং ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী যোদ্ধা। পবিত্রা গঙ্গা দেবীর পুত্র এবং ভগবান পরশুরামের শিষ্য হওয়ার সুবাদে তিনি অসামান্য শৌর্য ও অজেয়তার অধিকারী ছিলেন। প্রায় পাঁচ প্রজন্মের সমান বয়সের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও, সেই সময়ে জীবিত কোনো যোদ্ধার পক্ষে ভীষ্মকে পরাজিত করা ছিল প্রায় অসম্ভব। যুদ্ধের প্রতিদিন তিনি অন্তত ১০,০০০ সৈন্য এবং প্রায় ১,০০০ রথী বিনাশ করতেন।

যুদ্ধের প্রারম্ভে ভীষ্ম প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে তিনি কোনো পাণ্ডবকে হত্যা করবেন না, কারণ পিতামহ হিসেবে তিনি তাঁদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন। পাণ্ডবদের হত্যা না করার কারণে দুর্যোধন প্রায়শই ভীষ্মকে অভিযুক্ত করতেন এই বলে যে, তিনি কৌরবদের হয়ে পূর্ণ শক্তিতে যুদ্ধ করছেন না। ভীষ্ম যুদ্ধের সময় কোনো কৌরব যাতে নিহত না হয়, তার জন্যও যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন, কারণ তিনি তাঁর সমস্ত প্রপৌত্রকেই ভালোবাসতেন।

যুদ্ধের অষ্টম দিনের রাত্রিতে দুর্যোধন ভীষ্মের কাছে গিয়ে অভিযোগ করেন যে, পাণ্ডবদের প্রতি স্নেহের কারণে তিনি পূর্ণ শক্তি দিয়ে যুদ্ধ করছেন না। পরদিন ভীষ্ম ও অর্জুনের মধ্যে এক ভীষণ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অর্জুন অত্যন্ত দক্ষ ও শক্তিশালী যোদ্ধা হলেও, প্রিয় পিতামহকে আঘাত করার মানসিক প্রস্তুতি না থাকায় তিনি গুরুত্বসহকারে যুদ্ধ করছিলেন না। ভীষ্ম এমনভাবে শরবর্ষণ শুরু করলেন যে অর্জুন এবং কৃষ্ণ উভয়েই আহত হলেন। পাণ্ডব সেনাবাহিনীর ওপর ভীষ্মের এই ধ্বংসলীলা এবং পূর্ণ শক্তিতে যুদ্ধ করতে অর্জুনের দ্বিধা দেখে শ্রীকৃষ্ণ ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি রথের চালকের আসন থেকে নেমে রথের একটি ভাঙা চাকা তুলে নিলেন এবং সেটিকে সুদর্শন চক্রের ন্যায় ব্যবহার করতে উদ্যত হলেন। এই দৃশ্য দেখে অর্জুন ও ভীষ্ম উভয়েই যুদ্ধ থামিয়ে দিলেন। হস্তিনাপুরের রক্ষক ভীষ্ম বিনম্র চিত্তে ভগবান বিষ্ণুর অবতারকে বললেন যে, কৃষ্ণ যদি এখনই তাঁর প্রাণ হরণ করেন তবে তিনি তৎক্ষণাৎ দেহত্যাগ করতে প্রস্তুত। অবশেষে অর্জুন কৃষ্ণকে তাঁর প্রতিজ্ঞা (যুদ্ধে অস্ত্রধারণ না করার) রক্ষার্থে শান্ত করলেন এবং তাঁরা রথে ফিরে এলেন। এভাবেই ভীষ্ম কৃষ্ণকে অস্ত্র উত্তোলনে বাধ্য করে নিজের প্রতিজ্ঞা পূর্ণ করলেন। এরপর অর্জুন অধিকতর শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবহার করে ভীষ্মকে আহত করলেন। আকাশ থেকে দেবতারা ভীষ্ম ও অর্জুনের এই দ্বৈরথ প্রত্যক্ষ করে তাঁদের প্রশংসা করলেন।

যুদ্ধ যখন এক প্রকার অচলাবস্থায় পৌঁছাল, তখন কৃষ্ণ পাণ্ডবদের পরামর্শ দিলেন স্বয়ং ভীষ্মের নিকট গিয়ে এই অবস্থা নিরসনের উপায় প্রার্থনা করতে। ভীষ্ম পাণ্ডবদের ভালোবাসতেন এবং জানতেন যে তিনি তাঁদের বিজয়ের পথে একমাত্র বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাই পাণ্ডবরা যখন তাঁর কাছে গেলেন, তিনি তাঁদের ইঙ্গিত দিলেন কীভাবে তাঁকে পরাজিত করা সম্ভব। তিনি জানালেন যে, যদি এমন কেউ তাঁর সামনে আসেন যিনি একসময় বিপরীত লিঙ্গের ছিলেন, তবে তিনি অস্ত্র ত্যাগ করবেন এবং আর যুদ্ধ করবেন না।

পরবর্তীতে কৃষ্ণ অর্জুনকে বললেন যে, শিখণ্ডীর সহায়তায় তিনি ভীষ্মকে ধরাশায়ী করতে পারেন। পাণ্ডবরা প্রথমে এই কৌশলে রাজি ছিলেন না, কারণ এটি ধর্মযুদ্ধ বা 'ধর্ম'-এর পথের পরিপন্থী বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু কৃষ্ণ একটি চতুর বিকল্প প্রস্তাব করলেন। এবং এভাবেই, যুদ্ধের দশম দিনে শিখণ্ডী অর্জুনের রথে চড়ে তাঁর রক্ষক হিসেবে সামনে এলেন। ভীষ্ম শিখণ্ডীকে দেখে অস্ত্র সংবরণ করলেন। এই সুযোগে অর্জুন অসংখ্য বাণ নিক্ষেপ করে ভীষ্মকে বিদ্ধ করলেন। অর্জুনের বাণে ভীষ্মের সর্বাঙ্গ জর্জরিত হলো। এভাবেই, পূর্বনির্ধারিত লিখন অনুযায়ী (অম্বাকে মহাদেবের বর যে তিনিই ভীষ্মের পতনের কারণ হবেন), অম্বার পুনর্জন্ম শিখণ্ডী ভীষ্মের পতনের কারণ হলেন।

ভীষ্মের পতন

ভীষ্ম যখন রথ থেকে পতিত হলেন, তখন তাঁর দেহ মাটি স্পর্শ করল না; অর্জুনের নিক্ষিপ্ত অজস্র তীরের ফলার ওপর তাঁর দেহ শূন্যে ভেসে রইল। শরশয্যায় শায়িত ভীষ্মের এই রূপ দেখে স্বর্গ থেকে দেবতারাও শ্রদ্ধায় অবনত হলেন এবং নীরবে এই মহাবীরকে আশীর্বাদ করলেন। উভয় পক্ষের তরুণ রাজকুমাররা যখন তাঁর চারপাশে সমবেত হয়ে কিছু করণীয় আছে কি না জানতে চাইলেন, তখন ভীষ্ম বললেন যে তাঁর শরীর শরশয্যায় থাকলেও মস্তকটি কোনো অবলম্বনহীন হয়ে ঝুলে আছে। এ কথা শুনে কৌরব ও পাণ্ডব রাজকুমাররা রেশম ও মখমলের বালিশ নিয়ে এলেন, কিন্তু ভীষ্ম তা প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি অর্জুনকে একজন যোদ্ধার উপযুক্ত বালিশ দিতে বললেন। তখন অর্জুন তাঁর তূণীর থেকে তিনটি বাণ বের করে ভীষ্মের মস্তকের নিচে এমনভাবে স্থাপন করলেন যে তীরের তীক্ষ্ণ ফলাগুলো ওপরের দিকে মুখ করে রইল। এরপর যুদ্ধজয়ের ক্লান্তি ও তৃষ্ণা মেটানোর জন্য অর্জুন মাটিতে একটি বাণ নিক্ষেপ করলেন, আর তৎক্ষণাৎ মাটি ভেদ করে এক ভোগবতী জলধারা (গঙ্গা) উত্থিত হয়ে ভীষ্মের মুখে প্রবেশ করল।[৩৩] বলা হয়, মা গঙ্গা নিজেই তাঁর পুত্রের তৃষ্ণা নিবারণের জন্য উঠে এসেছিলেন।[২০]

দশম দিনের যুদ্ধের পর, কর্ণ রাত্রে একাকী ভীষ্মের সাথে সাক্ষাৎ করতে যান। তখন ভীষ্ম তাঁর কাছে প্রকাশ করেন যে তিনি কর্ণের জন্মরহস্য সম্পর্কে পূর্বেই অবগত ছিলেন এবং তাঁকে পাণ্ডবদের সাথে সন্ধি করার আহ্বান জানান। ভীষ্ম আরও বলেন যে, কর্ণকে 'অতিরথী' বলা এবং তাঁকে যুদ্ধ থেকে বিরত রাখার প্রতিজ্ঞা করানো—এ সবই ছিল একটি কৌশল, যাতে কর্ণকে তাঁর ভ্রাতাদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে না হয়। তিনি স্বীকার করেন যে তিনি কর্ণকে মহারথী হিসেবেই গণ্য করেন এবং যোদ্ধা হিসেবে কর্ণের দক্ষতার প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। তথাপি কর্ণ পাণ্ডবদের পক্ষে যোগ দিতে অস্বীকার করেন এবং ভীষ্মের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি নিবেদন করে বিদায় গ্রহণ করেন।

মৃত্যু

[সম্পাদনা]

যুদ্ধের পর, শরশয্যায় শায়িত থাকা অবস্থায় ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে রাজধর্ম, রাষ্ট্রনীতি এবং রাজার কর্তব্য সম্পর্কে গভীর ও অর্থবহ উপদেশ প্রদান করেন। ভীষ্ম সর্বদা ধর্মকে প্রাধান্য দিতেন। তিনি আজীবন ধর্মের পথেই চলেছিলেন, কিন্তু নিজের প্রতিজ্ঞার কারণে তাঁকে অনিচ্ছাসত্ত্বেও রাজা ধৃতরাষ্ট্রের আদেশ পালন করতে হয়েছিল, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ছিল অধর্ম। এতে তিনি মানসিকভাবে অত্যন্ত ব্যথিত ছিলেন। তিনি নিশ্চিত ছিলেন যে ধর্মের জয় হবে এবং পাণ্ডবরাই বিজয়ী হবেন, কিন্তু যেভাবে তিনি যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন এবং নীরব ছিলেন, তা এক অর্থে পাপ হিসেবে গণ্য হয়েছিল এবং শরশয্যায় শায়িত হয়ে তিনি তার প্রায়শ্চিত্ত করেছিলেন। অবশেষে, ভীষ্ম তাঁর প্রাণশক্তি ও শ্বাসবায়ুকে নিয়ন্ত্রণ করে, ক্ষতমুখ বন্ধ রেখে দেহত্যাগের জন্য শুভ মুহূর্তের অপেক্ষা করতে লাগলেন। তিনি উত্তরায়ণ সংক্রান্তি অর্থাৎ সূর্যের উত্তরায়ণের প্রথম দিনের জন্য প্রায় ৫৮ রাত্রি শরশয্যায় অপেক্ষা করেছিলেন। তাঁর দেহত্যাগের পর সম্রাট যুধিষ্ঠির মহাসমারোহে তাঁর দাহকার্য সম্পন্ন করেন।

মহাভারত অনুসারে, মৃত্যুর পর তিনি মোক্ষ বা সদ্গতি লাভ করেন। তাঁকে মাতৃলোক (যা স্বর্গের চেয়েও ঊর্ধ্বে বিবেচিত হয়) প্রদান করা হয়। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের অষ্টমী তিথিটি ভীষ্ম পিতামহের প্রয়াণ দিবস হিসেবে পালিত হয়, যা ভীষ্ম অষ্টমী নামে পরিচিত। হিন্দুরা পুরুষানুক্রমে এই দিনে তাঁর উদ্দেশ্যে একোদ্দিষ্ট শ্রাদ্ধ পালন করেন; তবে যাদের পিতা জীবিত আছেন, তাঁরা এটি পালন করতে পারেন না। ভীষ্ম অষ্টমী থেকে শুরু করে ভীষ্ম দ্বাদশী পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী সমস্ত বিষ্ণু মন্দিরে 'ভীষ্ম পঞ্চক ব্রত' পালন করা হয়।বিশ্বাস করা হয় যে, যাঁরা এই পবিত্র দিনে নদী তীরে তর্পণ ও ধর্মানুষ্ঠান পালন করেন, তাঁরা ভীষ্মের মতো দৃঢ় গুণাবলী সম্পন্ন পুত্র লাভ করেন।[৩৪] আরও বলা হয় যে, যাঁরা এই ব্রত পালন করেন, তাঁরা সুখী জীবন লাভ করেন এবং মৃত্যুর পর মোক্ষ প্রাপ্ত হন।

অঙ্কর ভাট মন্দিরে চিত্রিত শরশয্যায় ভীষ্ম

জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে

[সম্পাদনা]

চলচ্চিত্র এবং টেলিভিশন

[সম্পাদনা]

ভীষ্মের জীবন অবলম্বনে ভারতের বিভিন্ন ভাষায় বহু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। ১৯২২ সালে প্রথম নির্বাক চলচ্চিত্রটি নির্মিত হয়। সবাক চলচ্চিত্র যুগে, ১৯৩৭ সালে হিন্দিতে প্রথম চলচ্চিত্রটি তৈরি হয়। এরপর ১৯৪২ সালে জ্যোতিষ ব্যানার্জি পরিচালিত একটি বাংলা চলচ্চিত্র মুক্তি পায়, যেখানে জহর গাঙ্গুলি নামভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন।

আধুনিক উল্লেখ

[সম্পাদনা]

ভারতীয় সেনাবাহিনীর জন্য রাশিয়া থেকে সংগৃহীত বিশ্বের অন্যতম উন্নত মেইন ব্যাটল ট্যাংক (MBT) টি-৯০-এর নামকরণ করা হয়েছে ভীষ্মের নামানুসারে।[৩৫][৩৬]

    উদ্ধৃতি

    [সম্পাদনা]
    1. Monier-Williams 1872, পৃ. 712।
    2. 1 2 3 4 5 6 7 Mani 1975, পৃ. 135।
    3. Long 2020, পৃ. 91।
    4. Monier-Williams 1872, পৃ. 432।
    5. Gandhi 2004, পৃ. 115।
    6. 1 2 Mani 1975, পৃ. 137।
    7. Mani 1975, পৃ. 134।
    8. 1 2 Ganguly, Adi Parva: Section 98
    9. Ganguly, Adi Parva: section 99
    10. 1 2 Ganguly, Adi Parva: section 100
    11. Ganguly, Shanti Parva: section 38
    12. "Why Devavrata came to be known as Bhishma?"Zee News (ইংরেজি ভাষায়)। ১২ এপ্রিল ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ২৯ আগস্ট ২০২০
    13. Narasimhan, Chakravarthi V. (১৯৯৯)। The Mahābhārata: An English Version Based on Selected Verses (ইংরেজি ভাষায়)। Motilal Banarsidass Publ.। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-২০৮-১৬৭৩-২
    14. Arora, Jai Gopal (২২ মার্চ ২০২২)। कलरव [Chirping] (হিন্দি ভাষায়)। New Delhi: Al- Lina Publications। পৃ. ৩৪–৪২। আইএসবিএন ৯৭৯-৮-৪৩৭০-৫৩৯৬-৬
    15. Ireland, Royal Asiatic Society of Great Britain and (১৮৭৯)। Journal of the Royal Asiatic Society of Great Britain and Ireland (ইংরেজি ভাষায়)। Cambridge University Press for the Royal Asiatic Society।
    16. "Devavrata's oath"The Hindu (ভারতীয় ইংরেজি ভাষায়)। ৭ জুলাই ২০১৬। আইএসএসএন 0971-751X। সংগ্রহের তারিখ ২৯ আগস্ট ২০২০
    17. Bhattacharya 2004, পৃ. 21–25।
    18. Ganguly, Adi Parva: Section 101
    19. Ganguly, Adi Parva: Section 102
    20. 1 2 3 Bhanu, Sharada (১৯৯৭)। Myths and Legends from India – Great Women। Chennai: Macmillan India Limited। পৃ. ৩০–৮। আইএসবিএন ০-৩৩৩-৯৩০৭৬-২
    21. "Mahabharata Story By Rajaji – Page 5 | Mahabharata Stories, Summary and Characters from Mahabharata"www.mahabharataonline.com। সংগ্রহের তারিখ ২৯ আগস্ট ২০২০
    22. Meyer pp. 165–6
    23. Ganguli, Kisari Mohan (১৮৮৩–১৮৯৬)। "SECTION CIV"। The Mahabharata: Book 1: Adi Parva। Sacred texts archive।
    24. Choppra, Kusum (১৭ জুন ২০১৭)। "Satyavati, the feminist who stood up to patriarchy"DNA India (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২৬ অক্টোবর ২০২০
    25. Ganguli, Kisari Mohan (১৮৮৩–১৮৯৬)। "SECTION CIII"। The Mahabharata: Book 1: Adi Parva। Sacred texts archive।
    26. Meyer p. 165
    27. Srivastava, Diwaker Ikshit (১১ ডিসেম্বর ২০১৭)। Decoding the Metaphor Mahabharata (ইংরেজি ভাষায়)। One Point Six Technology Pvt Ltd। আইএসবিএন ৯৭৮-৯৩-৫২০১-০০০-৪
    28. "The Mahabharata, Book 1: Adi Parva: Sambhava Parva: Section CX"www.sacred-texts.com। সংগ্রহের তারিখ ১ সেপ্টেম্বর ২০২০
    29. 1 2 Mani 1975, পৃ. 136।
    30. Debalina (২০ ডিসেম্বর ২০১৯)। Into the Myths: A Realistic Approach Towards Mythology and Epic (ইংরেজি ভাষায়)। Partridge Publishing। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৫৪৩৭-০৫৭৬-৮
    31. Dalal, Roshen (১৮ এপ্রিল ২০১৪)। Hinduism: An Alphabetical Guide (ইংরেজি ভাষায়)। Penguin UK। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৮৪৭৫-২৭৭-৯
    32. Hudson, Emily T. (২০১৩)। Disorienting Dharma: Ethics and the Aesthetics of Suffering in the Mahabharata (ইংরেজি ভাষায়)। OUP USA। আইএসবিএন ৯৭৮-০-১৯-৯৮৬০৭৮-৪
    33. Vyāsa Deva, Kṛṣṇa Dvaipāyana (২০১৮)। Mahābhārata : Sanskrit text and English translation; translation according to M.N. Dutt। Manmatha Nath Dutt, Ishvar Chandra, O. N. Bimali (4th সংস্করণ)। Delhi: Parimal Publications। পৃ. ৪২৭–৪২৮। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৭১১০-১৯৬-২ওসিএলসি 855398616
    34. "Bhishma Ashtami"। Drik Panchang। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জানুয়ারি ২০১৯
    35. Robert Jackson (১ মার্চ ২০০৭)। Tanks and Armored Fighting Vehicles। Parragon Incorporated। পৃ. ২৯৫–। আইএসবিএন ৯৭৮-১-৪০৫৪-৮৬৬৪-৪। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জুন ২০১২
    36. S. Muthiah (২০০৮)। Madras, Chennai: A 400-year Record of the First City of Modern India। Palaniappa Brothers। পৃ. ২৮৮–। আইএসবিএন ৯৭৮-৮১-৮৩৭৯-৪৬৮-৮। সংগ্রহের তারিখ ২৪ জুন ২০১২

    সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি

    [সম্পাদনা]

    বহিঃসংযোগ

    [সম্পাদনা]