বেলাকোবার চমচম

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
পরিভ্রমণে ঝাঁপ দিন অনুসন্ধানে ঝাঁপ দিন
বেলাকোবার চমচম
Belakobar Chamcham - Kolkata 2019-06-06 072921.jpg
প্রকারমিষ্টিজাতীয় খাবার
উৎপত্তিস্থলভারত
অঞ্চল বা রাজ্যজলপাইগুড়ি, পশ্চিমবঙ্গ
প্রস্তুতকারীধীরেন সরকার ও কালিদাস দত্ত
পরিবেশন তাপমাত্রাসাধারণ তাপমাত্রা
প্রধান উপকরণছানা, দুধ, ময়দা, চিনি
রন্ধনপ্রণালী: বেলাকোবার চমচম  মিডিয়া: বেলাকোবার চমচম

বেলাকোবার চমচম পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যে এক অতি জনপ্রিয় ও ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি। বেলাকোবার চমচম এক বিশেষ ধরনের মিষ্টি। এটি সাধারণ চমচম থেকে আলাদা। উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ির বেলাকোবা নামক স্থানে এই বিশেষ প্রকৃতির চমচম প্রথম তৈরি হয় বলেই এই মিষ্টি বেলাকোবার চমচম নামে প্রসিদ্ধ। এটি ছানার তৈরি একপ্রকার মিষ্টি জাতীয় খাবার।[১][২]

ইতিহাস[সম্পাদনা]

ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ময়মনসিংহ জেলার টাঙ্গাইল মহকুমার অন্তর্গত ধলেশ্বরী নদীতীরস্থিত পোড়াবাড়ি অঞ্চলের চমচমের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। ক্রমের এই মিষ্টি পোড়াবাড়ির চমচম নামে খ্যাত হয় সারা বাংলায়। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের বলি হয়ে ওপার বাংলার টাঙ্গাইল থেকে এসে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার নিয়েছিযেন বেশ কিছু ছিন্নমূল মিষ্টান্ন শিল্পীরা। টাঙ্গাইল পূর্ব পাকিস্থানে চলে যাওয়ার ধলেশ্বরী নদীর পাড়ের বসতি ছেড়ে পশ্চিমবঙ্গের বেলাকোবায় চলে আসেন দুই বন্ধু ধীরেন সরকার ও কালিদাস দত্ত।[৩] ওই দুই মিষ্টান্ন শিল্পীর হাত ধরে বেলাকোবার চমচমের পথ চলা শুরু। টাঙ্গাইলের পোড়াবাড়ির চমচমের রহস্যময় রেসিপি এই দুই টাঙ্গাইল বাসীর হাত ধরে বেলাকোবা পাড়ি দেয় এবং কালক্রমে চিরাচরিত ঘরানা ছেড়ে নতুন ভাবে বেলাকোবার চমচম রূপে আত্মপ্রকাশ করে। রেল লাইন বেলাকোবাকে আড়াআড়ি দুই ভাগে ভাগ করেছে। বর্তমানে রেললাইনের দুই পারে দুই প্রবাদপ্রতিম চমচমশিল্পীর দুটি পৃথক চমচমের দোকান রয়েছে। কালক্রমে এঁদের হাত ধরেই বেলাকোবার চমচম এর খ্যাতি ক্রমশ বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে ও বিদেশে পাড়ি দেয়। এই দুটি দোকান ছাড়াও বেলাকোবায় একাধিক চমচমের দোকান রয়েছে। এই চমচমকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পর্যটন দফতরের তত্ত্বাবধানে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরবঙ্গে একটি পর্যটন শিল্পের আত্মপ্রকাশ করতে চলেছে।[৪]

প্রস্তুত প্রণালী[সম্পাদনা]

বেলাকোবার চমচমের প্রধান উপাদান হল ছানা, ময়দা, চিনির রস ও খোয়া ক্ষীর।[৫] পোড়াবাড়ির চমচমের ঘরানার সাথে বেলাকোবার চমচমের ঘরানার কতকগুলি মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। পোড়াবাড়ির চমচমের বৈশিষ্ট হলো কড়াপাক। কিন্তু, বেলাকোবায় চমচমে কড়াপাকের সাথে যুক্ত হয় অধিক পরিমাণে ক্ষীর। পেল্লাই আকারের গোলাপি চমচমে বরফের কুচির মত ছড়িয়ে দেওয়া হয় ক্ষীরের দানা। লোক মুখে বেলাকোবার চমচম নামে ছড়িয়ে পড়লো সেই মিষ্টান্ন।[৪]

জনপ্রিয়তা[সম্পাদনা]

উত্তরবঙ্গ তথা পশ্চিমবঙ্গ সর্বত্রই বেলাকোবার চমচম জনপ্রিয়। এই চমচমই বেলাকোবার অন্যতম পরিচিতি।[৪] শিলিগুড়ি ও জলপাইগুড়ি শহরের বহু মিষ্টির দোকানেই বেলাকোবার চমচম পাওয়া যায়। দোকানগুলিতে 'এখানে বেলাকোবার চমচম পাওয়া যায়' লেখা পোষ্টার টাঙানো থাকে। বেলাকোবার চমচম জনপ্রিয় হওয়ার কারণে কোন কোন দোকানদার স্থানীয় চমচমকে বেলাকোবার চমচম বলে বিক্রি করেন।[৩] জলপাইগুড়ি জেলায় ভ্রমণে আসা পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ বেলাকোবার চমচম। শিকারপুরে ঐতিহাসিক দেবী চৌধুরানীর মন্দির বা কাছেই ভ্রামরী দেবীর মন্দির দর্শন করতে এসে পর্যটকরা বেলেকোবার চমচমের খোঁজ করেন। এছাড়া বেলাকোবার চমচমের বিশ্বব্যাপী খ্যাতি রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য,[৩] সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের অনেক দেশেই বেলাকোবার চমচম রপ্তানি করা হয়।[৪][৬] পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেব বেলাকোবার চমচমের একজন বিশিষ্ট গুণগ্রাহী।[১]

বর্তমান অবস্থা[সম্পাদনা]

২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার শিকারপুর, বোদাগঞ্জ ও গজলডোবাকে কেন্দ্র করে একটি নতুন পর্যটন সার্কিটের পরিকল্পনা করেন। পরিকল্পনায় বেলাকোবার চমচমকে পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ বলে বিবেচনা করা হয়।[৭]

২০১৭ সালে রসগোল্লা জি আই স্বীকৃতি পাওয়ার পর বেলাকোবার চমচমের সাথে জড়িত মিষ্টান্ন ব্যবসায়ী ও কারিগররা বেলাকোবার চমচমের জি আই স্বীকৃতির ব্যাপারে আশাবাদী হন।[৩] বেলাকোবার চমচমের জি আই স্বীকৃতির আবেদনের প্রক্রিয়া শুরু হয়।[১] জলপাইগুড়ি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পশ্চিমবঙ্গ খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ দপ্তর ও জলপাইগুড়ি জেলা শিল্প কেন্দ্রকে চিঠি দিয়ে বলা হয় জি আই স্বীকৃতির ব্যাপারে উদ্যোগী হতে। এই পরিস্থিতিতে শিলিগুড়ির লিগাল এড ফোরামের সহযোগিতায় বেলাকোবা নাগরিক সমিতির পক্ষ থেকে বেলাকোবায় নাগরিক কনভেনশন ডাকা হয়।[১] কনভেনশনের পর বেলাকোবা নাগরিক সমিতির পক্ষ থেকে বেলাকোবার চমচমের জি আই স্বীকৃতি চেয়ে আবেদনপত্র জমা দেওয়া হয় জলপাইগুড়ির জেলা প্রশাসকের কাছে।[৮] পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মন্ত্রী গৌতম দেব বেলাকোবার চমচমের জি আই স্বীকৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করার প্রতিশ্রুতি দেন। রাজগঞ্জের বিধায়ক খগেশ্বর রায় স্বীকৃতির ব্যাপারে বিধানসভায় সরব হওয়ার আশ্বাস দেন।[৮]

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "জিআই স্বীকৃতি চায় চমচমও"আনন্দবাজার পত্রিকা। এবিপি গ্রুপ। ২০ নভেম্বর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ 
  2. "রসগোল্লা 'জাতে' উঠেছে, কম যায় না বাংলার বাকি মিষ্টিগুলিও"সংবাদ প্রতিদিন। প্রতিদিন প্রকাশনী। ১৪ নভেম্বর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১ জানুয়ারি ২০১৮ 
  3. "কৌলিন্যের কদরের আশায় লালমোহন, চমচমও"আনন্দবাজার পত্রিকা। এবিপি গ্রুপ। ১৬ নভেম্বর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ 
  4. রায়, অনির্বাণ (১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪)। "চমচমের স্বাদেই চাঙ্গা অর্থনীতি চায় বেলাকোবা"আনন্দবাজার পত্রিকা। এবিপি গ্রুপ। সংগ্রহের তারিখ ১ জানুয়ারি ২০১৮ 
  5. "হাঁড়ি উপুড় করলেও কিন্তু পড়বে না একফোঁটা দই"আনন্দবাজার পত্রিকা। এবিপি গ্রুপ। ১৬ এপ্রিল ২০১৩। সংগ্রহের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭  line feed character in |শিরোনাম= at position 19 (সাহায্য)
  6. ঘোষ, বাপি (২৭ নভেম্বর ২০১৭)। "সত্তর বছর ধরে চমচমের খ্যাতি বজায় রেখেছে বেলাকোবা"বঙ্গদর্শন। সংগ্রহের তারিখ ১ জানুয়ারি ২০১৮ 
  7. রায়, অনির্বাণ (১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৪)। "স্মৃতি নিয়ে শিল্পের আশায় বেলাকোবা"আনন্দবাজার পত্রিকা। এবিপি গ্রুপ। সংগ্রহের তারিখ ৩১ ডিসেম্বর ২০১৭ 
  8. "চমচমের জিআই স্বীকৃতি চেয়ে প্রস্তাব বেলাকোবায়"আনন্দবাজার পত্রিকা। এবিপি গ্রুপ। ৪ ডিসেম্বর ২০১৭। সংগ্রহের তারিখ ১ জানুয়ারি ২০১৮