করিমগঞ্জ জেলা

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
সরাসরি যাও: পরিভ্রমণ, অনুসন্ধান
করিমগঞ্জ জেলা
জেলা
আসামে করিমগঞ্জ জেলার অবস্থান
আসামে করিমগঞ্জ জেলার অবস্থান
দেশ  ভারত
রাজ্য আসাম
সদর করিমগঞ্জ
আয়তন
 • মোট ১৮০৯ কিমি (৬৯৮ বর্গমাইল)
সময় অঞ্চল আইএসটি (ইউটিসি+৫:৩০)
ওয়েবসাইট http://www.karimganj.nic.in

করিমগঞ্জ জেলা (সিলেটি:ꠇꠞꠤꠝꠉꠘ꠆ꠎ) ভারতের আসাম অঙ্গ-রাজ্যের একটি প্রশাসনিক জেলা। জেলার সদর দফতর করিমগঞ্জে অবস্থিত। করিমগঞ্জ ১৯৪৭ সালের আগে অধুনা বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের সাথে যুক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় বিতর্কিত গণভোটে করিমগঞ্জ সিলেট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

১৮৭৮ সালে করিমগঞ্জ শহরকে সদর হিসেবে তদানীন্তন ব্রিটিশ ভারতের নবসংগঠিত আসাম রাজ্যের সিলেট জেলার একটি মহকুমা হিসেবে করিমগঞ্জ মহকুমা গঠন করা হয়েছিল। ১৯৪৭ সালে ভারতের স্বাধীনতার সময় হওয়া দেশ বিভাজনে সিলেট জেলা পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) হস্তান্তরিত হয়, যদিও সেই সময়ের অবিভক্ত করিমগঞ্জ মহকুমা থেকে তিনটি থানার অঞ্চল নিয়ে গঠিত সংকুচিত করিমগঞ্জ মহকুমা ভারতের আসাম রাজ্যের কাছাড় জেলার এক মহকুমা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। এই অঞ্চলগুলি ছিল, রাতাবারী থানা, পাথরকান্দি থানা, বদরপুর থানা ও করিমগঞ্জ থানার অর্ধেক অঞ্চল। ১৯৮৩ সালের ১লা জুলাই থেকে আসাম সরকার করিমগঞ্জ মহকুমাকে পূর্ণ পর্যায়ভুক্ত জেলার স্বীকৃতি দেয়।

ইতিহাস[সম্পাদনা]

আদিযুগ[সম্পাদনা]

বর্তমান করিমগঞ্জ জেলার ইতিহাস সুস্পষ্ট নয়। উপলব্ধ উৎসের উপকরণ ও প্রামাণ্য সহায়তায় উক্ত অঞ্চলের ইতিহাসের সময়ানুক্রমিক সন্ধান চালানো হয়েছে। বৃহৎ ব্যবধানে একটিমাত্র রূপরেখা অংকন করা যায়। ভাস্করবর্মণের লিপিবদ্ধ করে যাওয়া নিধানপুর তাম্রলিপি থেকে জানা যায় যে, ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে প্রায় একশো বছর অঞ্চলটি কামরূপ সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। অগ্রদূত অভিবাসী ব্রাহ্মণদের পৃষ্ঠপোষকতায় অর্থনৈতিকভাবে লাঙল ব্যবহার করে চাষ করার আর্যীয় পদ্ধতিটিই এই সময়কালের সূচনা ছিল বলে জানা যায়। সমতট মরুন্দনাথের কলাপুর তাম্র ফলক থেকে জানা যায় যে, ৭ম শতাব্দীতে এই অঞ্চল উত্তর কাছাড়ের ছোট পাহাড়গুলির সঙ্গে পূর্ব্ববঙ্গের সমতট সাম্রাজ্যের অধীনে ছিল। অবশ্য এই সমস্ত কথা প্রমাণ করার জন্য কোনো ধরণের নিশ্চিত তথ্য ও প্রমাণ পাওয়া যায় না।

দশম শতাব্দীতে পূর্ব্ববঙ্গের প্রখ্যাত চন্দ্রবংশের রাজা শ্রীচন্দ্র সম্পূর্ণ এলাকাটি তাঁর বঙ্গ সাম্রাজ্যর অধীনস্থ করেছিলেন। এই সময়কালে পঞ্চখণ্ডে (করিমগঞ্জ শহর থেকে ৮ কিঃমিঃ দূরে; বর্তমান বাংলাদেশে অবস্থিত) অবস্থিত চন্দ্রপুর মঠ শিক্ষার উল্লেখনীয় কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ডি.সি. সরকারের মতে আদিতে এই চন্দ্রপুর মঠটি সমগ্র পূর্ব্ব ভারতের ভিতর হিন্দু-শিক্ষার জন্য কয়েকটি উৎকৃষ্ট কেন্দ্র ছিল।

গোবিন্দকেশব দেব ও ঈষাণদেবের ভতেরার লিপি থেকে জানা যায় যে, দ্বাদশ শতাব্দীতে সেখানে শ্রীহট্ট রাজ্য নামে একটি স্বাধীন রাজ্য ছিল এবং সমগ্র করিমগঞ্জ জেলার সঙ্গে কাছাড় সমভূমিরও কিছু অংশ এর অন্তর্ভুক্ত ছিল।

মধ্যযুগ[সম্পাদনা]

শাহজালাল নামক ইয়েমেন থেকে আসা একজন মুসলিম সুফি ফকির ১৩২৮ সালে সিলেট জয় করার পর শ্রীহট্টের সাথে করিমগঞ্জেরও বৃহৎ এলাকা একটি বঙ্গ সুলতানির অধীনে চলে যায়। সেইসময় করিমগঞ্জ জেলার বর্তমান পাথরকান্দি থানায় থাকা অঞ্চলটি ত্রিপুরার রাজার অধীনে ছিল। ১৩শ শতাব্দীর শেষভাগে মির্জা মালিক মহম্মদ টুরাণির অধীনে আসা বৃহৎ পার্সী বাহিনী এই অঞ্চলের বদরপুর শহর দখল করে। টুরাণি নিজেকে রাজা ঘোষণা করেন ও পরাজিত শহরাধ্যক্ষ খাচি চিফপুরের রাজার কন্যা উমাবতীকে বিয়ে করেন। সেই পরিবারটির পরবর্তী বংশধর মালিক প্রতাপ রাজা সমগ্র পাথরকান্দি জয় না করা পর্যন্ত তাঁদের সাম্রাজ্য অনেকদূর কাজ করেছিল। হুসেন শাহের রাজত্বকালে (১৪৮৩-১৫১৯) প্রতাপগড় বলে পরিচিত অঞ্চলটি‍ও সুলতানির অধীনে চলে আসে। হুসেন শাহ ও তাঁর পুত্র মেহুমুদ শাহের যথাক্রমে কালিগঞ্জ ও সুপ্রাকান্দিতে পাওয়া লিপি সমগ্র অঞ্চলটির বঙ্গ সুলতানি শাসনের অধীনে থাকা প্রমাণ করে। সিলেটের সাথে এই অঞ্চলটি ১৫৭৬ সালে সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে মোগল সাম্রাজ্যর অধীনে আসে। আইন-ই-আকবরীর মতে, জেলাটির বেশিরভাগ ভাগ অঞ্চল মোগল সিলহাট সরকারের অধীনে প্রতাপগড় রাজমহলে রাখা হয়েছিল। জেলাটি মোগল সিলহাট সরকার ও বাংলা সুবার অংশ হিসেবে ছিল।

ব্রিটিশ যুগ ও স্বাধীনতা আন্দোলন[সম্পাদনা]

১৭৮৫ সালে বাংলা সুবার দেওয়ানি ব্রিটিশ ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি হস্তগত করে ও করিমগঞ্জ জেলার একটি অংশ হিসেবে থাকা সিলেট জেলা ব্রিটিশের অধীনে যায়। তবুও, ১৭৮৬ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশরা অঞ্চলটিতে নিজেদের কর্তৃত্ব স্থাপন করতে সক্ষম হয়নি। রাধারাম নামক একজন স্থানীয় জমিদার দক্ষিণ করিমগঞ্জের এক বিশাল এলাকা নিজের প্রশাসনের মধ্যে এনেছিলেন। তাঁর পরবর্তী স্থানীয় রাজারা নবাব রাধারাম বলতে আরম্ভ করেছিলেন। তিনি ব্রিটিশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে দু'বার সফলতার সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন, যদিও অবশেষে পরাস্ত হয়ে ব্রিটিশের হাতে বন্দী হয়েছিলেন। কোম্পানির সৈন্যরা তাঁকে যখনই সিলেটে নিয়ে যায়, রাজারাম তখনই আত্মহত্যা করেন। তারপর থেকে অর্থাৎ ১৭৮৬ সাল থেকে ব্রিটিশরা করিমগঞ্জের সম্পূর্ণ অঞ্চল নিজেদের অধীনস্থ করে নিতে পেরেছিল।

১৮৫৭ সালের নভেম্বরে চট্টগ্রামে থাকা ৩৪ নং পদাতিক সৈন্যের তিনটি কোম্পানি বিদ্রোহ ঘোষনা করে এবং পরবর্তীকালে সেটি দক্ষিণ-পূর্ব সিলেট জেলা পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছিল।

ভারত বিভাজন ও বিভাজনের পরবর্তী সময়ে[সম্পাদনা]

১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের সময় সিলেট জেলার অধিকাংশই করিমগঞ্জ মহকুমার সাড়ে তিন থানা এলাকা (রাতাবারী, পাথরকান্দি, বদরপুর ও করিমগঞ্জ থানার অর্ধেক) বাদে পূর্ব পাকিস্তানের ভাগে চলে যায় এবং ১৯৭১ সালে এটি বাংলাদেশ নামে স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে স্বাধীনতা লাভ করে। ফলত করিমগঞ্জ মহকুমার বাকী রয়ে যাওয়া এই অর্ধাংশ একটি সম্পূর্ণ মহকুমা হিসেবে আসামের কাছাড় জেলার সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়। করিমগঞ্জ মহকুমাকে একটি জেলাতে পরিবর্তিত করা হয় ১৯৮৩ সালের ১ জুলাই।[১] করিমগঞ্জ শহরকে নবপ্রস্তাবিত করিমগঞ্জ জেলার জেলাসদর হিসেবে গড়া হয়।

ভূগোল[সম্পাদনা]

করিমগঞ্জ জেলার মোট ক্ষেত্রফল হল ১,৮০৯ বর্গকিলোমিটার (৬৯৮ মা),[২] যা তুলনামূলকভাবে আলাস্কার (Alaska) আফোগ্নাক দ্বীপের (Afognak Island) সমান।[৩] এটি উত্তর-পূর্ব দিকে কাছাড় জেলা, পূর্ব দিকে হাইলাকান্দি জেলা, দক্ষিণ দিকে মিজোরাম রাজ্য, দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ত্রিপুরা রাজ্য, ও পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে বাংলাদেশ দ্বারা পরিবেষ্টিত। করিমগঞ্জ জেলার মুখ্য শহর করিমগঞ্জ জেলাটির প্রশাসনিক মুখ্য কার্যালয়। করিমগঞ্জ শহর জেলাটির উত্তর পারে কুছিয়ারার দ্বারা বাংলাদেশের সঙ্গে সংলগ্ন। আসামের রাজধানী শহর গুয়াহাটি থেকে স্থলপথে এর দূরত্ব প্রায় ৩৩০ কিঃমিঃ ও রেলপথে প্রায় ৩৫০ কিঃমিঃ। এখান থেকে অন্যান্য মুখ্য স্থানসমূহের দূরত্ব এইপ্রকারঃ শিলচর-৫৫ কিঃমিঃ, শিলং-২২০ কিঃমিঃ, আগরতলা-২৫০ কিঃমিঃ।

কুছিয়ারা ও লঙ্গাই নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় অবস্থিত করিমগঞ্জ শহর বাংলাদেশের সীমান্তে অবস্থিত এবং কুছিয়ারা নদী এর মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। স্থানটির একটি বিশেষত্ব হল এর মাঝখান দিয়ে একেবঁেকে বয়ে যাওয়া সুদীর্ঘ গোলাকার খাল নটীখাল। আগে কুছিয়ারা ও লঙ্গাই নদীকে সংযোগ করে এর জলপথকে সংযোগ করার জন্য ও দুইটি নদীর জলপৃষ্ঠকে সমাবস্থা প্রদান করার জন্য এই খাল ব্যবহৃত হত। এখন বহু জায়গায় খননের জন্য ও রাস্তার নির্মাণকার্যে মাটি ভরে যাওয়ার ফলে এই খাল বন্ধ হয়ে গেছে। লাটু করিমগঞ্জের ইতিহাসপ্রসিদ্ধ গ্রামসমূহের মধ্যে একটি।

করিমগঞ্জের বনাঞ্চল একটি সময়ে বন্যপ্রাণীর জন্য প্রসিদ্ধ ছিল যদিও বর্তমানে মানুষের বসতি বৃদ্ধির জন্য এদের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এরমধ্যে হোলোক গিবন, কয়েক প্রজাতির বাঁদর, শুভ্র পাখির কাঁঠহাঁহ, এশিয়ান হাতী ইত্যাদির অবস্থিতির প্রমাণ পাওয়া যায় [৪][৫]। এর দক্ষিনাঞ্চলকে 'ধলেশ্বরী' বন্যপ্রাণী উদ্যান ('Dhaleswari' wildlife sanctuary) বলেও অভিহিত করা হয় [৬][৭]

অর্থনীতি[সম্পাদনা]

পরিবহণ[সম্পাদনা]

জনপরিসংখ্যান[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. Law, Gwillim (২০১১-০৯-২৫)। "Districts of India"Statoids। সংগৃহীত ২০১১-১০-১১ 
  2. Srivastava, Dayawanti et al. (ed.) (২০১০)। "States and Union Territories: Assam: Government"। India 2010: A Reference Annual (54th সংস্করণ)। New Delhi, India: Additional Director General, Publications Division, Ministry of Information and Broadcasting (India), Government of India। পৃ: 1116। আইএসবিএন 978-81-230-1617-7 
  3. "Island Directory Tables: Islands by Land Area"United Nations Environment Program। ১৯৯৮-০২-১৮। সংগৃহীত ২০১১-১০-১১। "Afognak 1,809km2" 
  4. Choudhury, A.U. (1999). Status and Conservation of the Asian elephant Elephas maximus in north-eastern India. Mammal Review 29(3): 141-173.
  5. Choudhury, A.U. (2004). Vanishing habitat threatens Phayre’s leaf monkey. The Rhino Found. NE India Newsletter 6:32-33.
  6. Choudhury, A.U. (1983). Plea for a new wildlife refuge in eastern India. Tigerpaper 10(4):12-15.
  7. Choudhury, A.U. (1983). Plea for a new wildlife sanctuary in Assam. WWF - India Newsletter 4(4):15.

বহিঃসংযোগ[সম্পাদনা]