জমির উদ্দিন নানুপুরী

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে

শাহ সুফি জমির উদ্দিন নানুপুরী ( আরবি: جامر الدين نانوبوري, ১৯৩৬ - ২০১১) ছিলেন বাংলাদেশের একজন সুফি সাধক ও হানাফি সুন্নি আলেম। তিনি জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরের ২য় আচার্য ছিলেন। ইসলাম প্রচারক হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল। [১][২]

সুফি

শাহ জমির উদ্দিন নানুপুরী
جامر الدين نانوبوري
শাহ সুফি জমিরউদ্দীন নানুপুরী.jpeg
আচার্য,জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর
অফিসে
১৯৭৫ – ২০১১
পূর্বসূরীসুলতান আহমদ নানুপুরী
উত্তরসূরীসালাহউদ্দীন নানুপুরী
ব্যক্তিগত
জন্ম
জমির উদ্দিন

১৯৩৬
মৃত্যু২০১১
ধর্মইসলাম
পিতামাতা
  • আব্দুল গফুর (পিতা)
  • আমেনা বেগম (মাতা)
ব্যবহারশাস্ত্রহানাফি
আন্দোলনদেওবন্দি
উল্লেখযোগ্য কাজআল মানাহিল ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন

জন্ম[সম্পাদনা]

জমির উদ্দিন ১৯৩৬ সালে চট্টগ্রাম জেলার অন্তর্গত ফটিকছড়ির প্রসিদ্ধ নানুপুর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম আব্দুল গফুর এবং দাদার নাম মরহুম নেয়ামত আলী ও পরদাদার নাম মরহুম হিম্মত আলী।

শিক্ষাজীবন[সম্পাদনা]

তিনি স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলে ক্লাস ফোর পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এরই মধ্যে তিনি প্রত্যহ ফজরের পর স্থানীয় মকতবের শিক্ষক মরহুম আব্দুচ্ছালাম ও মায়ের নিকট কুরআন মাজীদ শিক্ষা করেন।

পিতার লক্ষ্য ছিল তাঁকে স্কুলে পড়াবেন এবং তার ছোট ভাই মাওলানা জিয়াউল হাসানকে মাদ্রাসায় পড়াবেন। পরবর্তীতে পিতার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয়ে যায় এবং তিনি হাটহাজারী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন।

তিনি হাটহাজারী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকে দাওয়ারে হাদীস তথা শিক্ষা সমাপনী বর্ষ পর্যন্ত এই দীর্ঘ সময়টিতে লাগাতার একটি বাড়িতে গৃহ-শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। দাওরায়ে হাদীসের বৎসর প্রথম ছয়মাসের পর বাকী দিনগুলোতে অতিরিক্ত ক্লাসের ব্যস্ততার কারণে সেই বাড়িতে যাওয়া আসা করা আর সম্ভবপর হয়ে উঠেনি।

তিনি দরসে নিজামীর নিয়ম অনুসারে পাঠ্যসূচীর অন্তর্ভুক্ত কিতাবাদি অধ্যয়নে অনেক পরিশ্রম করেছেন। “পাঞ্জগাঞ্জ” ও “ইলমুচ্ছিগা” পড়েছেন মুফতি আহমদুল হক্বের নিকটে। নাহবেমীর, হেদায়াতুন নাহু, কাফিয়া ইত্যাদি পড়েছেন মাওলানা আব্দুল আজিজে নিকট। মিরকাত কিতাব পড়েছেন মাওলানা হামেদের নিকট। কুদুরী কিতাব পড়েছেন মাওলানা আব্দুল ওয়াহ্হাবের নিকট।

এছাড়াও যুগশ্রেষ্ঠ ফিকাহবিদ মুফতিয়ে আজম মুহাম্মদ ফয়জুল্লাহ, মাওলানা আবুল হাসান, মাওলানা মুহাম্মদ আলী এবং বিখ্যাত মুহাদ্দিসীনে কিরামদের নিকট ছিহাহ সিত্তা তথা মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিজী, শামায়েল সহ নাসায়ী, ইবনে মাজা ইত্যাদি হাদীস গ্রন্থাদি অধ্যয়ন করেন। বিশেষ ভাবে মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম এবং মাওলানা ইউছুপ বিন্নুরী এই দুই যুগশ্রেষ্ঠ হাদীস বিশারদ থেকে তিনি বোখারী শরীফের সনদ লাভ করেন। [৩]

কর্মজীবন[সম্পাদনা]

তিনি হাটহাজারী থেকে ফারেগ হওয়ার পর প্রাথমিক অবস্থায় চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বাথুয়া মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন। সেখানে সুনামের সাথে শরহে জামী, সুল্লামুল উলুম, মাইবুজী, তাফসীরে জালালাইন ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদি পড়াতেন। সেখানে শিক্ষকতা করার পর নানুপুরের শাহ সুলতান আহমদের ইশারায় ১৯৬৫ সালে জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন। সেখানে কাফিয়া, শরহে জামী, সুল্লাম, জালালাইন শরীফ, নাসায়ী শরীফ সহ গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদির শিক্ষা দেন। শিক্ষকতার সাথে তিনি উল্লেখযোগ্য একটি সময় শিক্ষা সচিবের দায়িত্বও পালন করেন।

তাঁর কর্মদক্ষতার প্রতি লক্ষ্য করে শাহ সুলতান আহমদ ওনার জীবদ্দশাতেই তাঁকে আচার্য হিসেবে মনোনীত করেন। সুলতান আহমদের জীবদ্দশাতেই তিনি প্রায় দশ বছর যাবত এই জামিয়ার আচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। [৪]

আধ্যাত্মিকতা[সম্পাদনা]

উপমহাদেশে ছুফী ত্বরীকার প্রধানত চারটি সিলসিলা বিদ্যমান: চিশতিয়া, কাদেরিয়া, নকশবন্দিয়া ও মুজাদ্দেদিয়া। তিনি ছাত্রজীবন থেকেই আধ্যাত্মিকতা চর্চা করতেন। জামাতে হাফতুমে পড়াকালীন সময়ে তাঁর উস্তাদ মাওলানা আব্দুর রশীদ তাঁকে পটিয়ার মুফতি আজিজুল হক্বের নিকট বাইয়াত করান এবং উনাকে তাছাউফের উপর খিলাফত প্রদান করেন। আওলাদে রাসুল হুসাইন আহমদ মাদানির খলীফা আল্লামা শাহ আহমদ শফীকাতারের শায়খ বিখ্যাত আলেম আল্লামা শায়খ ইউছুফ রেফায়ীও তাঁকে খেলাফত প্রদান করেছেন। বিশেষভাবে নানুপুরের শাহ সুলতান আহমদ তাঁকে অত্যন্ত বিশ্বস্ততা ও মুহাব্বতের প্রতীক হিসেবে ত্বরীকতের সিলসিলায় বিশেষ এজাজত বা খেলাফত প্রদান করেছেন।[৫]

শাহ সুলতান আহমদের প্রতি তার শ্রদ্ধা ও ভক্তি ছিল সর্বাধিক। প্রতিটি মুনাজাতে তিনি সুলতান আহমদের কথা স্মরণ করতেন। তিনি সবসময় বলতেন যে, আমি নানুপুরীর (সুলতান আহমদ) আদর্শকে সার্বক্ষণিকভাবে আকড়ে ধরার চেষ্টা করি।[৬]

বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় উলামাগণের মধ্যে অনেকেই তাঁর সাথে বাইয়াত বা সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। বিজ্ঞ হাদীস বিশারদগণ, ফিকাহবিদ গণ, ওয়ায়েজ গণ, মুফাচ্ছিরগণ, সরকারী প্রশাসনিক লেভেলের অনেক আইনবিদ, মন্ত্রী, ডি.সি, এস.পি, এমপি, জর্জগণ, ইসলামী আন্দোলনের অনেক উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ, আরবসহ অনেক রাষ্ট্রের ব্যক্তিগণ তাঁর কাছে মুরিদ হয়ে তাঁর কথা মত নেক আমল করে নিজের জীবনকে পরিচালিত করেছেন। তিনি এই ইলমে তাছাউফ তথা পীর মুরিদিকে বিশেষ বিদ্যা হিসেবে গ্রহণ করেছেন।

তাঁর মা বলেন, আমরা তাহাজ্জুদ নামায পড়া শিখেছি আমার ছেলে থেকে। চট্টগ্রামের এক পার্বত্য এলাকায় তাঁর বয়ান শুনে একই সাথে বিয়াল্লিশ জন উপজাতি ইসলাম গ্রহণ করেন।

মৃত্যু[সম্পাদনা]

তিনি ৩ ফেব্রুয়ারি ২০১১ সালে বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত্রে নানুপুরের একটি জলসায় লাখ লাখ ভক্তবৃন্দের সামনে বয়ানের ফাঁকে ফাঁকে বার বার একটি কবিতা পড়ছিলেন।

হে আল্লাহ জীবনের সকল আশা ভরসা আমার অন্তর থেকে দূর হয়ে গেছে। আপনি আসুন, আমার ক্বলবের মধ্যে জায়গা নিন। অন্তর আপনারই জন্য খালি হয়ে গেছে।

এর দুদিন পরেই শনিবার দিবাগত রাতে এশার নামায আদায় করে নিজ প্রয়োজনাদি থেকে ফারেগ হয়ে পবিত্র কাপড় পরিধান করে আল্লাহর জিকির করতে করতে মৃত্যুবরণ করেন। [৭]

আরো দেখুন[সম্পাদনা]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. "মাওলানা শাহ্ সুফি জমির উদ্দিন নানুপুরী (রহ) | ধর্ম চিন্তা"ittefaq। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-২১ 
  2. "মাওলানা শাহ জমির উদ্দিন নানুপুরী রাহ. - মাসিক আলকাউসার"www.alkawsar.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-২১ 
  3. "বাংলার শত আলেমের জীবনকথা - সমর ইসলাম,মাওলানা এস এম আমিনুল ইসলাম"www.rokomari.com (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-২১ 
  4. আশরাফ আলী নিজামপুরী। দি হান্ড্রেড। পৃষ্ঠা জমির উদ্দিন নানুপুরী অধ্যায়। 
  5. খান, মাওলানা দৌলত আলী। "এক দুনিয়া বিমুখ আধ্যাত্মিক রাহবার"DailyInqilabOnline (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-২১ 
  6. "ফটিকছড়ি নানুপুর জামিয়া ওবাইদিয়ায় ইতিকাফকারীদের দৈনন্দিন আমল – qawmi vision- Most Popular Islamic Online Television" (ইংরেজি ভাষায়)। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-২১ 
  7. "জমীর উদ্দীন নানুপুরী রঃ এর আখেরী বয়ান ও হযরত যেভাবে ইন্তিকাল করলেন - মাওলানা রাশেদুল ইসলাম জমীরিী | বইবাজার.কম"BoiBazar.com। সংগ্রহের তারিখ ২০২০-০৭-২১