ইবনে মাজাহ

উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে
Jump to navigation Jump to search
আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ আল-রাবি আল-কুয়াজুইনী
উপাধিইবনে মাজাহ
জন্ম৮২৪
মৃত্যু৮৮৭ বা ৮৮৯
জাতিভুক্তপারসিয়ান
লক্ষণীয় কাজ"সুনান-এ-ইবনে মাজাহ", কিতাব আত-তাফসীরকিতাব আত-তারিক

আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ আল-রাবি আল-কুয়াজুইনী (আরবি: ابو عبد الله محمد بن يزيد بن ماجه الربعي القزويني‎‎), (824 CE/209 AM—887/273), সাধারণতঃ ইবনে মাজাহ নামে পরিচিত, মধ্যযুগের একজন হাদীস বিশারদ। তিনি হাদীস বিষয়ক ছয়টি প্রধান গ্রন্থের সর্বশেষটি, সুনান-এ-ইবনে মাজাহ-এর সংকলক।[১]

জীবনী[সম্পাদনা]

ইরান-এর বর্তমান কালের মানচিত্র, যেখানে কুয়াজুইন এলাকাকে দেখানো হচ্ছে, এটি ইবনে মাজাহ-এর জন্ম ও মৃত্যু স্থান

নাম ও পরিচিতি : ইমাম ইবনু মাজাহ (রহঃ)-এর প্রকৃত নাম মুহাম্মাদ, পিতার নাম ইয়াযীদ, উপনাম আবু আব্দুল্লাহ, উপাধি الحافظ الكبير (আল-হাফিযুল কাবীর), নিসবতী নাম আর-রাবঈ, আল-কাযভীনী। তিনি ইবনু মাজাহ নামেই সমধিক পরিচিত। তাঁর পুরো বংশপরিক্রমা হ’ল- الحافظ الكبير المفسر أبو عبد الله محمد بن يزيد بن عبد الله بن ماجه الربعي القزويني‘আল-হাফিযুল কাবীর আল-মুফাসসির আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযীদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে মাজাহ আর-রাবঈ আল-কাযভীনী’। ইবনু মাজাহ-এর ‘মাজাহ’ নামটি কার উপাধি, এ ব্যাপারে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, মাজাহ তাঁর পিতার উপাধি, আবার কেউ বলেন, তাঁর দাদার উপাধি। এ মতবিরোধ নিরসনকল্পে ‘তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত ফিল কামূস’ গ্রন্থের প্রণেতা বলেন,لقب والده لا جده والصحيح هو الأول ‘মাজাহ তাঁর পিতার উপাধি, দাদার নয়। আর বিশুদ্ধ অভিমত হ’ল প্রথমটি’। শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিছ দেহলভী (রহঃ) ‘বুসতানুল মুহাদ্দিছীন’ গ্রন্থে লিখেছেন, মাজাহ ছিল তাঁর মায়ের নাম। তিনি আরো বলেন, ইবনু মাজাহ মুহাম্মাদের ছিফাত, আব্দুল্লাহর নয়। তিনি ২০৯ হিজরী মোতাবেক ৮২৪ খ্রিষ্টাব্দে ইরাকের প্রসিদ্ধ শহর কাযভীনে জন্মগ্রহণ করেন। মুসলিম জাহানের তৃতীয় খলীফা ওছমান বিন আফফান (রাঃ)-এর খেলাফতকালে এ শহরটি বিজিত হয়। এ শহরের প্রথম গভর্ণর বা প্রশাসক ছিলেন বিশিষ্ট ছাহাবী বারা ইবনু আযেব (রাঃ)। শিক্ষাজীবন : ইমাম ইবনু মাজাহ (রহঃ) নিজ দেশেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপন করেন। এরপর তিনি কুরআনুল কারীম হিফয সম্পন্ন করেন। অতঃপর উচ্চশিক্ষা অর্জন এবং হাদীছ সংগ্রহের জন্য তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের প্রায় প্রতিটি দেশ ও জনপদের যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছদের দ্বারস্থ হয়েছেন। ইমাম ইবনু মাজাহ ২৩০ হিজরী মোতাবেক ৮৪৪ খ্রীষ্টাব্দে ২২ বছর বয়সে হাদীছ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন শহরের মুহাদ্দিছগণের নিকটে গমন করেন। আল্লামা আবু যাহু ‘হাদীছ ওয়াল মুহাদ্দিছূন’ গ্রন্থে লিখেছেন, وارتحل لكتابة الحديث وتحصيله إلى الري، والبصرة، والكوفة وبغداد، والى الشام ومصر والحجاز، وأخذ الحديث عن كثير من شيوخ الأمصار- ‘ইমাম ইবনু মাজাহ (রহঃ) হাদীছ লিপিবদ্ধকরণ এবং শিক্ষার্জনের জন্য রায়, বছরা, কূফা, বাগদাদ, সিরিয়া, মিসর, হেজায প্রভৃতি দেশ ও জনপদে ভ্রমণ করেন এবং বহু মনীষীর নিকট থেকে হাদীছ সংগ্রহ করেন। আল্লামা আব্দুর রহমান মুবারকপুরী ও নওয়াব ছিদ্দীক হাসান খান ভূপালী তাদের গ্রন্থে লিখেছেন,

        ارتحل إلى العراق والبصرة والكوفة وبغداد ومكة والشام ومصر والري لكتابة الحديث،

অর্থাৎ ‘হাদীছ সংগ্রহের জন্য ইমাম ইবনু মাজাহ (রহঃ) ইরাক, বছরা, কূফা, বাগদাদ, মক্কা, সিরিয়া, মিসর, রায় প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন’। ইবনু হাজার আসক্বালানী (রহঃ) বলেন,سمع بخراسان والعراق والحجاز ومصر والشام وغيرهما من البلاد ‘তিনি খোরাসান, ইরাক, হেজায, মিসর, সিরিয়া প্রভৃতি দেশের মনীষীদের নিকট থেকে হাদীছ শুনেছেন’। হাদীছ সংগ্রহের জন্য কষ্টকর দেশ ভ্রমণের পরে তিনি ১৫ বছরের অধিক সময় ইলম চর্চায় নিমগ্ন থাকেন। শিক্ষকমন্ডলী : ইবনু মাজাহ (রহঃ) দেশ-বিদেশের অনেক মনীষীর নিকট শিক্ষাগ্রহণ ও হাদীছ সংগ্রহ করেছেন। তাঁর অসংখ্য উস্তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ’লেন- হাফেয আলী ইবনু মুহাম্মাদ আত-তানাফিসী, জুরারাহ ইবনুল মুগাল্লিস, মুসয়াব ইবনু আব্দুল্লাহ আয-যুবাইরী, সুয়াইদ ইবনে সাঈদ, আব্দুল্লাহ ইবনু মু‘আবিয়া আল-জুমাহী, মুহাম্মাদ ইবনু রুমহ, ইবরাহীম ইবনুল মুনযির আল-হিফমী, মুহাম্মাদ ইবনু আব্দুল্লাহ ইবনে নুমাইর, আবু বকর ইবনু আবু শায়বা, হিশাম ইবনু আম্মার, ইয়াযীদ ইবনু আব্দুল্লাহ ইয়ামামী, আবু মুছ‘আব আয-যুহরী, বিশর ইবনু মু‘আয আল-আকাদী, হুমাইদ ইবনু মাসয়াদা, আবু হুযাফা আস-সাহমী, দাঊদ ইবনু রুশাইদ, আবু খায়ছামা, আব্দুল্লাহ ইবনু যাকওয়ান আল-মুকবেরী, আব্দুল্লাহ ইবনু আমের ইবনে বাররাদ, আবু সাঈদ, আল-আমাযা, আব্দুর রহমান ইবনু ইবরাহীম দুহাইম, আব্দুস সালাম ইবনু আছেম আল-হিসিনজানী, ওছমান ইবনু আবু শায়বা প্রমুখ। বহু মুহাদ্দিছের নিকট থেকে হাদীছ শিক্ষাগ্রহণ ও সংগ্রহ করলেও ইমাম ইবনু মাজাহ (রহঃ) তাঁর সবচেয়ে প্রিয়তম উস্তাদ আবু বকর ইবনু আবু শায়বার নিকট থেকে সবচেয়ে বেশী উপকৃত হয়েছেন। ছাত্রবৃন্দ : ইমাম ইবনু মাজাহ (রহঃ)-এর অসংখ্য ছাত্রের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হ’লেন ইবরাহীম ইবনু দীনার আল-হাওশাবী, আহমাদ ইবনু ইবরাহীম আল-কাযভীনী (তিনি হাফেয আবু ইয়া‘লা আল-খলীলীর দাদা), আবুত তাইয়্যেব আহমাদ ইবনু রাওহিন আল-বাগদাদী আশ-শা‘রানী, আবু আমর আহমাদ ইবনু মুহাম্মাদ ইবনে হাকীম আল-মাদীনী আল-ইস্পাহানী, ইসহাক ইবনু মুহাম্মাদ আল-কাযভীনী, জা‘ফর ইবনু ইদরীস, হোসাইন ইবনু আলী ইবনে ইয়াযদানিয়ার, সোলায়মান ইবনু ইয়াযীদ আল-কাযভীনী, আবুল হাসান আলী ইবনু ইবরাহীম ইবনে সালামা আল-কাযভীনী, আলী ইবনু সাঈদ ইবনে আব্দুল্লাহ আল-আসকারী, মুহাম্মাদ ইবনু ঈসা আছ-ছাফফার প্রমুখ। মৃত্যু : ইবনু মাজাহ (রহঃ)-এর মৃত্যু তারিখ সম্পর্কে মতভেদ রয়েছে। ইবনু কাছীর ও জামালুদ্দীন ইউসুফ আল-মিযযী তাঁর মৃত্যু তারিখ, জানাযা ও দাফনকার্য সম্পাদন সম্পর্কে বলেন, كانت وفاة ابن ماجة يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ وَدُفِنَ يَوْمَ الثُّلَاثَاءِ لِثَمَانٍ بَقِيْنَ مِنْ رَمَضَانَ سَنَةَ ثَلَاثٍ وَسَبْعِيْنَ وَمِائَتَيْنِ عَنْ أَرْبَعٍ وَسِتِّيْنَ سَنَةً، ‘ইবনু মাজাহ (রহঃ) ২৭৩ হিজরী ২২ রামাযান মোতাবেক ২০ নভেম্বর ৮৮৬ খ্রীষ্টাব্দে সোমবার মৃত্যুবরণ করেন। পরের দিন মঙ্গলবার তাঁকে দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৪ বছর। কেউ কেউ বলেন, তিনি ২৭৫ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। ইমাম যাহাবী বলেন, তিনি ২৭৩ হিজরী রামাযান মাসে মৃত্যুবরণ করেন। তবে প্রথম অভিমতটিই অধিক বিশুদ্ধ। তাঁকে গোসল করান মুহাম্মাদ ইবনে আলী কেহেরমান এবং ইবরাহীম ইবনে দীনার। জানাযায় ইমামতি করেন স্বীয় ভাই আবু বকর এবং কবরে লাশ নামান তার ভাই আবু বকর ও আবু আব্দুল্লাহ এবং স্বীয় পুত্র আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ইয়াযীদ।

গ্রন্থ রচনা[সম্পাদনা]

আল-দাহাবীর মতানুসারে ইবনে মাজাহ-এর প্রধান রচনাগুলো হলো:[১]

  • সুনান-এ-ইবনে মাজাহ: প্রধান ছয়টি হাদীস গ্রন্থের একটি
  • কিতাব আত-তাফসীর: আল-কোরআন-এর তাফসীর
  • কিতাব আত-তারিক: ইতিহাস গ্রন্থ, মূলতঃ হাদীসের বর্ণনাকারীদের তালিকা

সুনান-এ-ইবনে মাজাহ[সম্পাদনা]

সুনান-এ-ইবনে মাজাহ একটি হাদীস সঙকলন, যেখানে ১,৫০০ অধ্যায় ও ৪,০০ হাদীস রয়েছে।[১] এই গ্রন্থটি সমাপ্ত করার পর তিনি এটি তৎকালীন সময়ে হাদীসের অন্যতম পন্ডিত আবু জুরাহ-কে পড়তে দিলে, পড়ার পর তিনি মন্তব্য করেছিলেন, "আমি মনে করি এটি মানুষের নিকট পৌছানো উচিত, অন্যান্য সঙকলন, বা তাদের বেশিরভাগই, পরিত্যাজ্য হয়ে পড়বে।"[১]

তথ্যসূত্র[সম্পাদনা]

  1. al-Dhahabi, Muhammad ibn Ahmad (১৯৫৭)। al-Mu`allimi, সম্পাদক। Tadhkirat al-Huffaz (Arabic ভাষায়)। 2। Hyderabad: Da`irat al-Ma`arif al-`Uthmaniyyah। পৃষ্ঠা 636। 

আরও দেখুন[সম্পাদনা]

  • Suhaib Hasan Abdul Ghaffar, Criticism of Hadith among Muslims with reference to Sunan Ibn Maja, Presidency of Islamic Research, IFTA and Propagation: Riyadh 1984. আইএসবিএন ০-৯০৭৪৬১-৫৬-৫.
  • Brown, Jonathan A. C. ‘The canonization of Ibn Mâjah: authenticity vs. utility in the formation of the Sunni ḥadîth canon’. Pages 169-81 in Écriture de l’histoire et processus de canonisation dans les premiers siècles de l’islam. Directed by Antoine Borrut. Revue des mondes musulmans et de la Méditerranée 129. Aix-en-Provence: Presses Universitaires de Provence, 2011.
  • Robson, James. 'The Transmission of Ibn Majah's "Sunan"', Journal of Semitic studies 3 (1958): 129–41.

বহিঃসঙযোগ[সম্পাদনা]